দুরাকাঙ্খের বৃথা ভ্রমণ
আচার্য্য কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য্য
ভূমিকা
উনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালীর নবজাগরণের ইতিহাস বড় বিচিত্র।
পলাসীর যুদ্ধের পর হইতেই ক্লাইভ, ওয়ারেন হেস্টিংস প্রভৃতির নেতৃত্বে ইংরেজ সওদাগরেরা বাংলা দেশকেই ব্যবসায়ের কেন্দ্র করিয়া যে অর্থলোলুপতা প্রদর্শন করিয়াছিলেন, তাহার একমাত্র শুভফল-বাংলা দেশে ইংরেজী শিক্ষার বিস্তার। কোম্পানীর কর্মচারীরা যাহা সুরু করিয়াছিলেন, মিশনরীরা আসিয়া তাহারই বিস্তার সাধন করিলেন এবং ফলে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্দ্ধের মধ্যেই শিক্ষায় দীক্ষায়, সাহিত্যে সমাজে, এমন কি, রাষ্ট্রীয় আন্দোলনে দ্রুত উন্নতি করিয়া বাঙালী ভারতবর্ষের অপর সকল প্রদেশকে পিছনে ফেলিয়া রাখিয়া চলিল; ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত হইল; মাইকেল, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব ঘটিল এবং ইণ্ডিয়ান ন্যাশন্যাল কংগ্রেসের ভিত্তিও স্থাপিত হইল।
সুতরাং উনবিংশ শতাব্দীর এই নবজাগরণের ইতিহাস জানিবার জন্য এ যুগের বাঙালীর সহজ কৌতূহল আছে। কিন্তু এ যুগের কোন বিধিবদ্ধ প্রামাণিক ইতিহাস নাই। বিভিন্ন সামাজিক, নৈতিক ও শিক্ষা-সম্পর্কীয় আন্দোলনের মধ্যে, অধুনা-দুষ্প্রাপ্য সাময়িক-পত্রিকার পৃষ্ঠায় এবং কয়েক জন কৃতী পুরুষের ব্যক্তিগত জীবনী হইতে এই যুগের ইতিহাস আমাদিগকে কষ্ট করিয়া সংগ্রহ করিতে হইতেছে। একটা মোটামুটি কাহিনী পাইতেছি বটে, কিন্তু যুগের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখ, কৌতুক-কৌতূহলের ঘনিষ্ঠ পরিচয় এই সকল বিচ্ছিন্ন উপকরণের মধ্যে বড়-একটা মিলিতেছে না।
গত যুগের এক জন কৃতী পুরুষের ব্যক্তিগত জীবন ও স্মৃতিকথার সাহায্যে যুগের অন্তরতম রহস্যের খানিকটা সন্ধান আমরা জানিয়াছি, বর্তমান প্রসঙ্গ তাঁহারই জীবনী ও কীর্ত্তির সামান্য পরিচয় দিবার জন্য লিখিত হইয়াছে। তিনি আচার্য্য কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য্য। উনবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ দশকে জন্মগ্রহণ করিয়া বিংশ শতাব্দীর চতুর্থ দশক পর্যন্ত দীর্ঘ ৯২ বৎসর তিনি বাঙালীর জাতীয় মনের বহু ঘাত-প্রতিঘাত ও তজ্জনিত পরিবর্ত্তন স্বয়ং লক্ষ্য করিয়াছেন এবং আমাদের নিতান্ত সৌভাগ্য যে, 'পুরাতন প্রসঙ্গ' নামক পুস্তকে গল্পচ্ছলে কথিত তাঁহার বক্তব্য লিপিবদ্ধও হইয়াছে। এক হিসাবে, বিস্মৃত ও বর্তমান যুগের মধ্যে যোগসূত্ররূপে তাঁহার এই কাহিনীগুলি অত্যন্ত মূল্যবান্ এবং তাঁহার বহুবিচিত্র কর্মজীবনও আমাদের নিকট কম মূল্যবান্ নয়।
১৮৬৯ সনে কৃষ্ণকমল তাঁহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা "রামকমলের জীবনবৃত্ত" লিখিয়া 'বেকন' পুস্তকের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা-স্বরূপ প্রকাশ করেন। ইহাতে তিনি তাঁহার পিতৃ-পিতামহ সম্বন্ধে যেটুকু সংবাদ দিয়াছেন, নিম্নে-তাহা উদ্ধৃত করিতেছি:-
১২৪০ শালের ১৬ই চৈত্র কলিকাতা শহরের সিমুন্সিয়া পল্লীর অন্তঃপাতী মালিরবাগান নামক স্থানে রামকমলের জন্ম হয়। তাঁহার পিতার নাম রামজয় তর্কালঙ্কার। ইনি জাতিতে বারেন্দ্র শ্রেণী ব্রাহ্মণ ছিলেন, এবং বরেন্দ্র ভূমির অন্তর্গত ও গৌড় দেশের ভূতপূর্ব্ব রাজধানী মালদহ নগরের অধিবাসী ছিলেন। কলিকাতার সুপ্রসিদ্ধ রাধাকৃষ্ণ বসাকের বিমাতার যত্নাতিশয়ে রামজয়ের গিতা আসিয়া পুত্র সমেত কলিকাতাবাসী হয়েন। ঐ বসাক গোষ্ঠী হইতেই একটা বাসবাটী, এক বিগ্রহ ঠাকুর এবং মাসিক কিঞ্চিৎ বৃত্তির বিধান করা হয়, রামজয়ের পিতা এবং তদীয় পরলোকের পর রামজয় নিজে, উভয়েই সেই বৃত্তি উপলক্ষ করিয়া সংসারযাত্রা নির্বাহ করিয়াছিলেন। রামজয় ব্রাহ্মণপণ্ডিতের ব্যবসায়ী ছিলেন; সংস্কৃত শাস্ত্রে তাঁহার বিশেষ ব্যুৎপত্তিও ছিল, বিশেষতঃ ভাগবত পুরাণ নামক দুরূহ দূরবগাহ পুরাণ গ্রন্থের রসজ্ঞ বলিয়া তাঁহার কিঞ্চিৎ প্রতিষ্ঠাও ছিল। কিন্তু এতদ্দেশীয় অধ্যাপকমণ্ডলী মধ্যে তাঁহার নামের সেরূপ প্রভা প্রকাশ পায় নাই।... তিনি পুত্রের শৈশবদশাতেই এতদ্দেশীয় রীতি অনুসারে মুগ্ধবোধ ব্যাকরণ অধ্যয়ন করান। দ্বাদশবর্ষ বয়ঃক্রমের মধ্যেই উল্লিখিত সুকঠিন ব্যাকরণ সমগ্র, অমরকোষ অভিধান, এবং ভট্টিকাব্য ও শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের কিয়দংশ পাঠ সাঙ্গ হইলে রামকমলের পিতৃবিয়োগ হয়; তৎকালে রামজয়ের এক কন্ঠা ও রামকমল ব্যতীত আর এক পুত্র কৃষ্ণকমল বর্তমান থাকে। তন্মধ্যে রামকমল ভগিনী অপেক্ষা বয়সে ছোট এবং সহোদর অপেক্ষা বড় ছিলেন।-ইং ১৮৬০ শালের ১১ই জুন তারিখে রামকমল অকস্মাৎ আত্মহত্যা দ্বারা মানবলীলা সংবরণ করেন।
আনুমানিক ১৮৪০ সনে কৃষ্ণকমল জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কালীপ্রসন্ন সিংহের 'সমবয়স্ক ছিলেন। ছাত্রজীবন সম্বন্ধে কৃষ্ণকমল - তাঁহার স্মৃতিকথায় বলিয়াছেন:- "তখন আমার বয়স আন্দাজ ৬/৭ বৎসর; বোধ হয় ইংরাজি ১৮৪৭ সাল হইবে। আমি আমার দাদার সঙ্গে সংস্কৃত কলেজে যাইতাম। তিনি আমাকে একটা বেঞ্চে বসাইয়া রাখিতেন। এই রকম ২।২ দিন যাইতে যাইতে একদিন বিদ্যাসাগর মহাশয় আমাকে বলিলেন, 'আয় তোকে ইস্কুলে ভর্তি করে দি।' তখন কোনও ছাত্রের বেতন দিবার পদ্ধতি ছিল না; কাযেই ইস্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রতিবন্ধক হইল না।・・・ইস্কুলে ভর্তি হইয়াই আমার 'মুগ্ধবোধ' পড়া আরম্ভ হইল। প্রথম দুই বৎসর প্রাণকৃষ্ণ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কাছে অধ্যয়ন করিলাম। তৃতীয় বৎসর গোবিন্দ শিরোমণি। মহাশয়ের ক্লাসে ও চতুর্থ বৎসর দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের কাছে 'মুগ্ধবোধ' অধ্যয়ন করিলাম। এই চারি বৎসরে 'মুগ্ধবোধ' পড়া শেষ হইল। অঙ্কের অধ্যাপক শ্রীনাথ দাস, ইংরাজির অধ্যাপক প্রসন্নকুমার সর্ব্বাধিকারী। আমি তাঁহাদের উভয়ের কাছেই পড়িয়াছি।"
আসলে কৃষ্ণকমল আট বৎসর বয়সে ১৮৪৮ সনের প্রথম ভাগে সংস্কৃত কলেজে শিক্ষার্থী হিসাবে প্রবেশ করেন। সংস্কৃত কলেজের পুরাতন নথিপত্র হইতে এই সংবাদ পাওয়া যায়। সংস্কৃত কলেজের তৎকালীন সেক্রেটরী রসময় দত্ত ১৫ মে ১৮৪৮ তারিখে কাউন্সিল-অব-এডুকেশনের সেক্রেটরী জে. ময়েট (Mouat) সাহেবকে নিয়োষ্কৃত পত্রখানি লেখেন:-
I have the honor to report that since my letter No. 373 dated 25th January 1848 the undermentioned Students have been admitted in the Sanscrit College.
কৃষ্ণকমল সংস্কৃত কলেজের এক জন কৃতী ছাত্র; তিনি জুনিয়র সিনিয়র বৃত্তি লাভ করিয়াছিলেন। সংস্কৃতে তাঁহার অসাধারণ পারদর্শিতা ছিল।
১৮৫৭ সনে এন্ট্রান্স পরীক্ষার প্রবর্তন হয়। এই বৎসর এপ্রিল মাসে কৃষ্ণকমল সংস্কৃত কলেজ হইতে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও ঐ বৎসর প্রেসিডেন্সী কলেজের আইন-বিভাগ হইতে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিয়াছিলেন। তাঁহারা উভয়েই পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন। পরীক্ষার পর ১৮৫৭ সনেই কৃষ্ণকমল প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন। তিনি তাঁহার স্মৃতিকথায় বলিয়াছেন:-"১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে যুনিভার্সিটি স্থাপিত হইলে, ঐ বৎসরই এনট্রান্স পরীক্ষা দিয়া সংস্কৃত কলেজ ত্যাগ করিলাম। আমি প্রেসিডেন্সি কলেজে এক বৎসর অধ্যয়ন করিয়া কয়েক মাস ডটন্ কলেজে পড়িয়াছিলাম।"
প্রেসিডেন্সী কলেজে প্রবেশ করিবার কয়েক মাস পরে-১৮৫৮ সনের এপ্রিল মাসে কৃষ্ণকমল কিছু দিনের জন্য নিরুদ্দেশ হন। তাঁহার স্মৃতিকথায় প্রকাশ:-"প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হইলাম। -এক বৎসর পরে কাহাকেও কিছু না বলিয়া পশ্চিমে যাইলাম।"
কৃষ্ণকমলের নিরুদ্দেশের কথা সমসাময়িক সংবাদপত্রে প্রকাশিত তাঁহার জ্যেষ্ঠভ্রাতা রামকমলের একটি বিজ্ঞাপন হইতে জানিতে পারা যায়। বিজ্ঞাপনটি এই':-
বিজ্ঞাপন। আমার ভ্রাতা শ্রীমান কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য্য গত বৈশাখ শনিবার দিবস নিরুদ্দেশ হইয়াছে। তাহার বয়স ১৬/১৭ বৎসর কিন্তু খর্বাকৃতি জন্য অল্প বোধ হয়, গৌরাঙ্গ, কৃশ, সংস্কৃত কালেজ হইতে প্রেসিডেন্সি কালেজে অধ্যয়নে প্রবৃত্ত হইয়াছিল যে কেহ তাহার অনুসন্ধান করত ধৃত করিতে পারেন, প্রভাকর যন্ত্রালয় অথবা নরমেল স্কুলে আমার নিকট সংবাদ দিলে তাঁহার নিকট যথোচিত বাধিত ও উপকৃত হইব। শ্রীরামকমল ভট্টাচার্য্য। নরমেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক। 'সংবাদ প্রভাকর', ২০ এপ্রিল ১৮৫৮। ৮ বৈশাখ ১২৬৫।
এই পুস্তকখানি সম্বন্ধে কৃষ্ণকমল তাঁহার স্মৃতিকথায় বলিয়াছেন:- "পুস্তকখানি আমি সতের আঠার বৎসর বয়সে রচনা করি, কিন্তু পাঁচ সাত বৎসর ছাপান হয় নাই, পরে প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক হইয়া আন্দাজ ইংরাজি ১৮৬৪ সালে উহা মুদ্রিত করিয়াছিলাম।"
রাজনারায়ণ বসুকে লিখিত একখানি পত্রে ('সুপ্রভাত', আশ্বিন ১৩১৭) কৃষ্ণকমল সম্বন্ধে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর যে মন্তব্য করিয়াছিলেন, নিম্নে তাহা উদ্ধৃত করিয়া প্রবন্ধের উপসংহার করিলাম:- "কৃষ্ণকমল is not যে সে লোক-he is a terrible fellow. He knows how to write and how to fight and how to slight all things divine."
শ্রীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়আষাঢ়, ১৩৪৬
বিংশতিতম হেমন্ত আমার দেহ শীতবাত দ্বারা আঘাত করিলে আমি স্বধৰ্ম্মভ্রষ্ট হইয়া খ্রীষ্টের উপদিষ্ট পথ অবলম্বন করিলাম। তৎকালে 'আশা ছিল, যে কত বিবি আমার নয়নভঙ্গির চাতুর্য্যে মোহিত হইয়া প্রাণনাথ করিতে ব্যস্ত হইবে, কত ইংরাজ আপনপ্রার্থিত প্রিয়তমার অলাভে হতাশ হইয়া অশ্রুপাত ও আমায় শাপদান করিবে এই সকল অদম্য মনোরথে সমাকৃষ্ট হইয়াই আমার খ্রীষ্টধর্ম অবলম্বন করিতে প্রবৃত্তি হয়। যদি শ্রদ্ধার কথা জিজ্ঞাসা কর, শ্রদ্ধা আমার অন্য ধর্মে যেমন, খ্রীষ্টধর্ম্মেও সেইরূপ অর্থাৎ কিছুই নহে। আমি মাতার চরিত্র উচ্চারণ করিয়া শপথ করিতে পারি, যদি পৃথিবীর কোন ধর্ম্মে আমার বিশ্বাস থাকে। আমি ধৰ্ম্মকে ঐহিক মহাবাসনা-পূরণের উপায় চিরকাল মনে করিতাম, কিন্তু আমার অদ্যাপি স্থির নিশ্চয় আছে, যে খ্রীষ্টধৰ্ম্ম পৃথিবীতে প্রচলিত আর সমুদয় ধৰ্ম্ম অপেক্ষা অল্প অনুপকারী। এই ধর্ম্মের অবলম্বী জাতিরা এক্ষণে শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষবিষয়ে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ, তাহাদিগেরই অধিষ্ঠান এখন লক্ষ্মী ও সরস্বতীর প্রিয়নিকেতন হুইয়াছে। কিন্তু যাহারা ইহাকেই খ্রীষ্টধর্ম্মের ঐশ্বরিকতার যুক্তি বলিয়া নির্দ্দেশ করে, আমি তাহাদিগকে মনের সহিত ঘৃণা করি।
আমি খ্রীষ্টান হইয়া যে সকল আশা সিদ্ধ করিব মনে করিয়াছিলাম, তাহার একটিও সফল হইল না। কোন বিবিই প্রণয়িভাবে আমার প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন না। বাঙ্গালি বলিয়া ইংরাজেরা ঘৃণা, এবং ধঃৰ্ম্মভ্রষ্ট বলিয়া স্বজাতীয়েরা পরিহার করিতে লাগিলেন। তথাপি আমার কিছুমাত্র ক্ষোভ হইল না। প্রমোদরত মানস ও স্ফূর্তিযুক্ত শরীরের সাহায্যে আমার প্রফুল্লতার কোন হানি হয় নাই। মিশনরিরা যে অত্যল্পমাত্র বৃত্তি দিতেন, তাহাতে আবশ্যক ব্যয়ও নির্ব্বাহিত হইত না। অতএব বাঙ্গালাভাষার একজন লেখক হইয়া বসিলাম উৎকৃষ্টই হউক, আর অপকৃষ্টই হউক আমার রচনাদ্বারা আপনার অনেক আনুকূল্য হইল, লোকের উপকার হইয়াছে কি না তাহা লোকেই বলিতে পারে আমার সৈ বিষয়ে অবধান ছিল না, পয়সার দরকার বড়, যাহাতে হউক পয়সা পাইলেই হইত। এইরূপে কিছুকাল কাটাইলাম। কিন্তু যৌবনের উত্তপ্ত রক্ত ইহাতে সন্তুষ্ট হইল না। সচ্চরিত্র ও সন্তুষ্টস্বভাব হইয়া বিস্তীর্ণ অর্ণবাম্বরার এক কোণে অজ্ঞাতরূপে বিলীন হইতে হইবে এই ভাবনা আমার বিষের ন্যায় হইল। মন কিছুতেই সুস্থির থাকিল না। বাঙ্গালাভাষায় উৎকৃষ্ট গ্রন্থ রচনা করিয়া বিখ্যাতি লাভ করিতে অভিলাষ ছিল না, অতএব চেষ্টাও হইল না। আমি বাঙ্গালার অধিবাসী, ভাষা, এমন কি সকলই অতিশয় ঘৃণা করিতাম। অতি পাপাচার ক্ষুদ্রদেহ কতকগুলি কৃষাণের স্বজাতীয় হইয়াছি এই 'ভাবিয়াই আমার কত ক্ষোভ হইত, আবার তাহাদের দেশে তাহাদের ভাষায় কিছু আনুকূল্য করিয়া তাহাদিগের মনোরঞ্জন করিব বরং মলিনগাত্র বীভৎসাচার নগ্নাঙ্গ পিশাচদিগের সহবাস তাহা অপেক্ষা প্রার্থনীয়, আমার তখন মনের গতি এইরূপ ছিল। এইরূপ বিদ্বেষী হইয়া এদেশে থাকিতে মন সরিল না। লেখনীদ্বারা যাহা উপার্জন করিয়াছিলাম, তাহাদ্বারা বোম্বাই নগরাভিমুখ এক ফরাশি জাহাজে এক গৃহ ভাড়া করিলাম এবং স্থির করিলাম যে, ইংরাজেরা ঘৃণা করিয়াছে, বাঙ্গালিদিগের সমাজও পরিত্যাগ করিলাম, অতএব এক্ষণে হাইদরের অধিরাজ্যে আপনার সৌভাগ্য উপার্জন করিব। এইরূপ অধ্যবসায়ে আরূঢ় হইয়া ফ্লোরেন্সনামক জাহাজে অধিরোহণ করিলাম। গদার শুভ্র জলে ভাসিয়া জাহাজ দুই দিনেই সমুদ্রে উপস্থিত হইল। সাগর-দ্বীপ নয়নগোচর হইল। হিন্দুদিগের কুসংস্কার ও তীর্থযাত্রার এই স্থান সাগরের তরঙ্গে সঞ্চিত সিকতোচ্চয়দ্বারা মরুস্থল হইয়া আছে। শীতাতপ অতি অস্বাস্থ্যকর। সকলেই আপনার মাতা, বা ভগিনী বা অন্য কোন পীড়ার গঙ্গাসাগর হইতে যেরূপ বিবর্ণকপোল ও ক্ষামাদ হইয়া প্রত্যাগত হয়েন তাহা দেখিয়া সাগর-দ্বীপের শীতাতপের অপকর্ষ অনুমান করিতে পারেন।
আমাদিগের জাহাজে সপ্তদশবর্ষবয়স্কা এক ফরাশি-যুবতী ছিলেন। তাঁহার নাম জুলিয়া। তাঁহার স্বামীও এই জাহাজে ছিলেন। স্বামীর বয়ঃক্রম চল্লিশ বর্ষের ন্যূন ছিল না। বুঝিতেই পার, এমন স্ত্রীর এমন স্বামীর প্রতি কেমন অনুরাগ হয়। জুলিয়া দেখিতে অতি সুরূপা। তাহার অলকগুলি কুঞ্চিত হইয়া এরূপ মধুরভাবে কপোলদেশে পতিত হইত যে দেখিলে মোহিত হইতে হয়। নয়নযুগল উজ্জ্বল বিশাল ও ভ্রমরের ন্যায় নীল। কপোলতল এরূপ স্বচ্ছ, যে মুখ দেখা যায়। আমি দেখিয়া অবধি যুবজন-সুলভ ভাবের অনধীন থাকি নাই। জুলিয়ার স্বামী আমার নবীন বয়স ও নির্ভয় ব্যবহার দেখিয়া অবশ্যই উদ্বিগ্ন এবং কোন বিষম ঘটনার শঙ্কায় জড়ীভূত থাকিতেন। তিনি আমার প্রতি অতি অপরিচিতভাবে ব্যবহার করিতে লাগিলেন, তথাপি তাহার পত্নীর সহিত আমার সাক্ষাৎকার বা কথোপকথন স্পষ্টরূপে নিষেধ করিতে পারেন নাই। ইউরোপের প্রথা এদেশের মত যুবতী স্ত্রীর পরপুরুষের সহিত আলাপ করিতে নিষেধ করে না, অতএব আমি জুলিয়ার প্রতি শিষ্টাচার প্রদর্শন করিতে বিমুখ হই নাই। এইরূপে আমাদিগের পথ অতীত হইতে লাগিল। কোন দিন একটি হাঙ্গর, কোন দিন জগন্নাথের মন্দিরের চূড়া, কোন দিন মছলীবন্দরে মাস্তুলের বন, কোন দিন সফেন উর্মিমালায় আহত উপকূলে অধিষ্ঠিত মান্দ্রাজ-নগরের প্রাসাদাগ্র এই সকল দেখিতে দেখিতে আমরা বঙ্গোপসাগরের নীল জল ভেদ করিয়া যাইতে লাগিলাম।
একদিন অত্যন্ত গ্রীষ্ম বোধ হইল, চন্দ্রের স্ময়মান রশ্মিজাল সমুদ্রের উরঃস্থলে চিক্ চিক্ করিতেছিল, বরুণদের যেন শয়ান ছিলেন, অত্যন্ন বাতাঘাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লহরী সঞ্চালিত হইতেছিল, জগৎ স্তব্ধীভূত বোধ হইল, জলের মধুর কলকল ধ্বনি কর্ণে সূক্ষ্মরূপে আঘাত করিতেছিল, এই সময়ে আমি জাহাজের ছাদে আসিয়া প্রকৃতির অনির্বচনীয় শোভা দেখিয়া চক্ষু জুড়াইতেছিলাম। জুলিয়া হংসীসদৃশ পদবিক্ষেপে গ্রীষ্ম পনয়নার্থ সেই স্থানে আসিয়া বসিল। জাহাজের আর সকলে নিদ্রাগত বা কার্য্যব্যাসক্ত ছিল। সেই কালে জুলিয়ার মনোহারী বদনশোভা দর্শন করিলে কেই বা অপহৃত-মানস না হইত। মনে করিয়া দেখ, আমি কিরূপ অবস্থায় পড়িয়াছিলাম। আবার জুলিয়া বলিল, "সমুদ্রোপরি জ্যোৎস্না কি মধুর।" "মধুর” এই শব্দটি এরূপ মধুরভাবে উচ্চারিত হইল যে আমি কি বলিব। আমি কহিলাম, "তাহার সন্দেহ কি। আবার এক অনির্বচনীয় শান্তভাব সর্ব্বব্যাপী হওয়াতে এই কাল অতি মধুর হইয়াছে।” আমরা এইরূপে বিশ্রব্ধভাবে কথোপকথনে প্রবৃত্ত হইতেছিলাম, এই কালে তনু মেঘাবরণদ্বারা শশী অপাবৃত হইলেন। আমি পুরোবর্তী প্রলোভনের প্রতিরোধ করিতে পারিলাম না। জুলিয়ার করকমল ধারণ করিলাম। ইহার মধ্যেই সমীরণ প্রবল হইয়া উঠিল, উত্তরে কপিলবর্ণ বিদ্যুৎ উন্মিষিত হইতে লাগিল, তরঙ্গের উৎসেধ কিছু কিছু বাড়িতে লাগিল, জলের শব্দ কোলাহল হইয়া উঠিল, একত্ররাশীকৃত পালগুলি ফরফর ইত্যাকার নিনাদযুক্ত হইল, অন্তরীক্ষ পরিবর্তমান কৃষ্ণবর্ণ মেঘরাশিদ্বারা আচ্ছন্ন হইয়া তারকাপ্রদীপ লুক্কায়িত করিল, চন্দ্র যে স্থানে অন্তর্হিত হইয়াছিলেন, সেই ভাগ তাঁহার প্রভা-নিচয়দ্বারা চিহ্নিত ছিল, কিন্তু এক্ষণে তাহা দর্শনপথ হইতে বিনষ্ট হইল। এখন সম্পূর্ণ অন্ধকার হইল। ঝঞ্ঝা প্রচণ্ডবেগে মাস্তলে আঘাত করিতে লাগিল, সমুদ্র প্রকোপিত হইয়া মহোমিরূপ কশাদ্বারা জাহাজকে তাড়ন করিয়া ইতস্তত বিক্ষিপ্ত করিতে লাগিল। গর্জনকারী তরদেরা একবার গুহার ন্যায় নিম্ন হইয়া পুনর্ব্বার শিখরের ন্যায় উচ্চ হইল এবং বাত্যাবেগে উড্ডীন ফেনরাশিদ্বারা আমাদিগকে আচ্ছন্ন করিল। বিদ্যুৎ নয়ন প্রতিঘাত করিবার ক্ষণকাল পরেই বংশস্ফোটসম বজ্র মাথার উপর দিয়া গড়াইয়া কর্ণ বধির করিল। জুলিয়ার ভয়প্রযুক্ত আর্ত্তরণে জাহাজের সকলে উপরে উঠিয়া আইল। জাহাজ ভয়ানকরূপে বিক্ষিপ্ত হইতেছিল। এক একবার এক পার্শ্বে নত হইয়া যেন আমাদিগন্ধে সর্পের ন্যায় ক্রুদ্ধ উম্মির গ্রাসে ফেলিয়া দেয়, আবার অপর দিক্ হইতে তরঙ্গবেগ এমনি সবেগে আঘাত করে, যে তৎক্ষণাৎ প্রতিকূল দিকে অবনত হয়। একবার এরূপ ত্বরিতাও শীঘ্র প্রক্ষিপ্ত হইল, যে জুলিয়া রূপ, করিয়া সাগরগর্তে পতিত হইল। ক্ষণকাল পরেই আবর্তযুক্ত পয়োরাশি তাহাকে বেষ্টনপূর্ব্বক রসাতলে লইয়া গেল। আমার সেই সময়ের আন্তরিক কষ্ট যুধ্যমান মহাভূতদিগের প্রচণ্ডতাকে অতিক্রম করিয়াছিল। ভাবিলাম এখনি প্রিয়ার অনুবর্তী হই, কিন্তু গূঢ় জীবনতৃষ্ণা সে ব্যাপার হইতে নিবৃত্ত করিল। জাহাজের লোকেরা বা তাহার স্বামীও তখন জানিতে পারে নাই, যে অত্যুজ্জ্বল ভূষণটি বরুণদেবের বলি হইয়াছে, আমিও প্রকাশ করিলাম না। বায়ু উত্তরোত্তর বাড়িতেই লাগিল। আমি মাস্তল না ধরিয়া স্থির থাকিতে পারিলাম না। এই সময়ে আমার বিপদ্গ্রস্ত জাহাজের দুর্দশা মনে পড়িল। আমি যেন স্বচক্ষে দেখিলাম, যে যাত্রীরা ক্ষুধায় কাতর হইয়া পরস্পরকে গ্রাস করিতে আরম্ভ করিয়াছে, যেন আমার ক্ষুৎক্ষাম দেহ হইতে মাংস কর্ত্তনপূর্ব্বক কটাহে সিদ্ধ করিতে দিয়াছে। উঃ কি ভয়ানক! আমি কাল্পনিক ভয়ে চীৎকার করিয়া উঠিলাম। ভাবিলাম, যদি জাহাজ রক্ষা পায়, তবে সেই দশা হইবে, যদি রক্ষা না পায় তবে অবশ্য মৃত্যু। এই চিন্তিয়া জাহাজের ছাদে যে বোট্ থাকে, তাহা সমুদ্রে সত্বরে ভাসাইলাম এবং তৎক্ষণাৎ তাহার উপরে লাফিয়া পড়িলাম। তরঙ্গের বেগে বোট্ বিপর্যস্ত হইবার উপক্রম হইল। আমি তাহাকে বায়ুর গতিতে সমর্পণপূর্ব্বক স্থিরভাবে উপবিষ্ট থাকিলাম। মনে করিতে পার, যে আমার তখন ভয়ের সীমা ছিল না, কিন্তু আমার যাহা কিছু ভয় ছিল, সে সকলই মানুষ হইতে। আমি মহাভূতের প্রকোপে আত্মসমর্পণ করিতে কিছুমাত্র ত্রস্ত হই নাই। এরূপ শান্ত ও গম্ভীরভাবে অবস্থিত রহিলাম, যে একজন অমায়িক খ্রীষ্টানের দেখিয়া ঈর্ষ্যা হইত। প্রকৃত খ্রীষ্টানের পরকালে শান্তিভোগের আশাদ্বারা চিত্ত সুস্থির থাকিতে পারে। সে সুখদ্বীপে পরিক্রম করিবে, স্বচ্ছ গিরিনদীর তটজাত সুদৃশ্য পুষ্পের আমোদে পরিতৃপ্ত হইবে, জগৎপিতার গরীয়ান্ প্রভাময় মৃত্তির সৌম্য কান্তি দ্বারা নয়ন সার্থক করিবে। এবম্বিধ মহামনোরথ অবশ্যই মানুষের লঘু চিত্তকে নিবৃত করিতে পারে। কিন্তু আমার সে সকল আশা ছিল না, আমি জানিতাম, যে রুধির অপরিশুদ্ধ ও মস্তিষ্ক বিকল হইলেই দৈহিক ও মানসিক জ্ঞান নিবৃত্ত হইবে, শরীর জলে পচিয়া স্ফীত হইবে, তাহার কিয়দংশ জলচরেরা কতক বা খেচরেরা ভক্ষণ করিবে ইত্যাদি। অতএব আমি দেহের অসারতা, আত্মার অত্যন্তাভাব ও পরলোকের অঘটনীয়তা জানিয়া কি নিমিত্ত খেদ করিব? যদি কিছু ইচ্ছা হইত, তবে জুলিয়ার দেহস্পর্শ, তাহার মুখদর্শন ও তাহার সহিত প্রণয়ালাপদ্বারা বিপদের লঘুকরণ। কিন্তু হায় সে অতীত-জলসাৎ হইয়াছে। এই ভাবিয়া আমার তখন গুটিকতক অশ্রুবিন্দু নির্গত হইয়া কপোল আর্দ্র করিল। বায়ু পূর্ব্বদিক্ হইতে বহিতেছিল। এই নিমিত্ত মনে করিয়াছিলাম, যে আমার বোট্ ভাসিতে ভাসিতে ভারতবর্ষের পূর্ব্ব উপকূলে উপস্থিত হইবে। কিন্তু সারীত্রে বোটুখানি একবার অত্যুচ্চ জলস্তম্ভোপরি উঠিল আবার মহাবেগে গ্রাসোদ্যত তরঙ্গের গহ্বরে প্রক্ষিপ্ত হইতে লাগিল। আমার অনেকবার বমি হইল, তন্দ্বারা ক্রমে নিসহ হইয়া পড়িলাম। এখন শয়ন না করিলে চলিল না। দৌর্ব্বল্যে চক্ষু মেলিতে পারিলাম না। এক একবার চাহিলে কেবল বিদ্যুতের প্রভা লোচনকে পরিপূর্ণ করিত। ক্রমে আন্তরিক স্ফুরি অবসান হইয়া আসিল, শিরোদেশের অভ্যন্তর যেন কেহ বরফের পাতে মুড়িয়া দিল, এই শীতানুভব ভ্রূপৰ্য্যন্ত উপস্থিত হইলে চক্ষু ব্যথিত হইয়া জ্বলাবিষ্কার করিল। বোট্ স্থির আছে, কি চলিয়া যাইতেছে কিছুই অনুভব করিতে পারিলাম না। ঝঞ্চার, গর্জন ও জলের কোলাহল অতি সূক্ষ্মরূপে শ্রবণ-গোচর হইতে লাগিল, 'মাত্র কাষ্ঠের কঠিন স্পর্শেও ত্বগিন্দ্রিয়শূন্য হইল। আমি সেই অবধি কি হইল তাহা জানি না। তখনই অচেতন হইলাম।
আমার পুনশ্চেতনাগমে দেখিলাম, যে দুই নীলবর্ণ উজ্জ্বল নয়ন 'আমার উপর চাহিয়া আছে। দেখিতে দেখিতে জানিলাম, যে মুখ 'অতিকোমল-কপোল-যুক্ত, ললাট সুবর্ণের সপ্রভ ও বক্ষঃস্থল কাঁচলি দ্বারা 'আবৃত। পার্শ্বে এক বৃদ্ধা আমাকে অঞ্চলে ব্যজন করিতেছে। আমার প্রথমে এই দর্শন স্বপ্ন বোধ হইল, কিন্তু দেখিলাম অতি সূক্ষ্ম পদার্থগুলিও 'পারমার্থিক অবস্থায় যেরূপ থাকে, সেইরূপেই আছে। আমি অতিশয়, বিস্ময়ের সহিত পুরোবর্তিনী যুবতীর মুখে দৃষ্টিপাত করিলাম। সে মধুর-স্বরে বৃদ্ধাকে কিছু বলিল, আমি তাহার বিন্দুবিসর্গও বুঝিতে পারিলাম না। পরে আমাকে উঠাইবার নিমিত্ত হস্ত ধারণ করিল। আস্তে আস্তে উঠিয়া দেখিলাম যে আমি সমুদ্রোপরে আপনার বোটেই রহিয়াছি। সমুদয় শেষ হইয়া গিয়াছে, এক্ষণে সাগরের শান্ত জলে উপকূলের তরুবর্গের প্রতিবিম্ব পড়িয়াছে। তথাকার উপকূল শিলাময় এবং স্থানে স্থানে দুই তোলা অপেক্ষাও স্থার্বিক উচ্চ, ইহার প্রায় কুত্রাপি উঠিবার উপায় নাই। আমার বোট্ যেখানে লাগিয়াছিল, তথায় এক কৃত্রিম ঘৃণিত সোপানশ্রেণী ছিল। এই সকল সোপান আস্ত পাথর কাটিয়া রচিত হইয়াছে। জলে থাকিলে একেবারে দুটি তিনটির অতিরিক্ত সোপান দেখা যায় না। ফলতঃ ঠিক্ কলিকাতার মনুমেন্টের সিঁড়ির মত। সমুদ্রের পাড়ের উপর নারিকেল, সুপারি প্রভৃতি বৃক্ষ দেখা গেল। বোট্ যেখানে লাগিয়াছিল, তথায় ভূমির কিয়দংশ জলের মধ্যে প্রবেশ করিয়া অন্তরীপের আকার ধারণ করিয়াছে। এই অন্তরীপে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঝোপ উদ্ভূত হইয়া স্থলভাগ হরিদ্বর্ণ করিয়াছে। মধ্যে মধ্যে আকন্দের কাল-রেখা-শবলিত শ্বেত কুসুম বিকসিত হইয়াছে আমি যুবতীর ভুজে ভরার্পণপূর্ব্বক দুর্ব্বলভাবে স্থলে উত্তীর্ণ হইয়া মৃদুগতিতে সোপানে উঠিতে আরম্ভ করিলাম। এই স্থানের পাড় অপেক্ষাকৃত নিম্ন ছিল, শীঘ্র উঠিতে পারা গেল। দেখিলাম স্থান অতি রমণীয়, স্থলের দিকে বরাবর চন্দন, তাল, এলালতালিঙ্গিত চূত ও তাম্বুলবল্লীপরিণদ্ধ সুপারি, এই সকল বৃক্ষের অতি বিস্তৃত অরণ্য হইয়াছিল। চক্ষু যত দূর গেল, কেবল নানা বর্ণে বিচিত্রিত পত্রকুঞ্জই লক্ষিত হইল। সমুদ্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া অবলোকন করিলাম, যে আমাদিগের নিম্নে জলরাশি অভেদ্য ও অচল শিলা-বপ্রের উপর শনৈঃ শনৈঃ আঘাত করিয়া বারম্বার অপসৃত হইতেছে। পাড় ঠিক্ খাড়াভাবে সমুদ্রের গভীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়াছে। আমি অতিশয় দুর্ব্বল ছিলাম, যুবতীর অবলম্ব পাইয়া সহকার বৃক্ষের ছায়াযুক্ত একটি ক্ষুদ্র পথ অবলম্বন করিলাম। তখন দিনমণি প্রখরতাধারণে উন্মুখ হইতেছিলেন। এমন কালে এই শীতল পথ পাইয়া আমার অনেক নিবৃতি হইল। আম্রবনের ঘন পল্লবে পথ অন্ধকারময় ছিল। বায়ু অতি মৃদুভাবে পত্রকুঞ্জে প্রবেশিয়া এক প্রকার কর্ণসুখদ শব্দ আবিষ্কৃত করিতেছিল। আমার বমনজনিত শারীরিক সমুদয় উত্তাপ এই শীতল স্থানে প্রবেশ করিবামাত্র অপগত হইল। দুই রশি পথ এই ভাবে অতিক্রম করিয়া সম্মুখে অতি প্রাচীন ও শক্ত এক অট্টালিকা দেখিলাম। ইহার সর্ব্বাংশ ধূসর পাষাণে নির্মিত। তন্নিমিত্ত কখন চুণকাম বা বর্ণলেপ প্রয়োজন করে না। পাষাণনিৰ্ম্মিত কড়িকাটের অগ্রভাগ ভিত্তি হইতে বহির্গত আছে। অত্যুচ্চ তোরণে দুই লৌহকীলদন্তুর কপাট লগ্ন আছে। কোন প্রকার শস্ত্রই তাহার ভেদ করিতে সমর্থ নহে, এমন কি আমার বোধ হইল কামানের গোলাও শীঘ্র কিছু করিতে পারে না। অট্টালিকা তাদৃশ আয়ত নহে, কিন্তু অত্যন্ত উচ্চ। প্রবেশের একটি ব্যতীত দ্বার নাই। আর চারি দিকে কোন স্থানেই জানালী নাই, কেবল মধ্যে মধ্যে গবাক্ষ আছে। আমি দুই অবলার সহিত ভিতরে প্রবেশ করিলাম। একটি অর্দ্ধবয়স্ক সবলকায় ভৃত্য তাঁহাদিগের অভ্যর্থনা করিল। তাহারা আমাকে উপরিতলে লইয়া গিয়া এক কোমলশয্যাযুক্ত পর্য্যঙ্কে শয়ন করিতে ইঙ্গিত করিল। আমি হস্তসংজ্ঞাদ্বারা জানাইলাম, যে আমার শয়ন করিতে অভিলাষ নাই অত্যন্ত ক্ষুধা হইয়াছে। তাহারা বুঝিতে পারিয়া কতগুলি ভজিত জনার ও চিনিমিশ্রিত ছাগদুগ্ধের সর রৌপ্য পাত্রে আনিয়া দিল। আমার বাস্তবিক ক্ষুধা হইয়াছিল, উৎকর্ষ অপকর্ষ বিবেচনা না করিয়া খাইতে লাগিলাম। আহার শেষ হইলে অত্যন্ত নিদ্রা উপস্থিত হইল, অতএব সেই পর্য্যঙ্কেই শয়ন করিলাম।
প্রায় সন্ধ্যার সময় আমার জাগরণ হইল। তখনও দেখিলাম পার্শ্বে যুবতী উপবিষ্ট আছে। তাহার আকার দর্শনে নিতান্ত অচতুরও পূর্ব্বরাগের চিহ্ন দেখিতে অসমর্থ হইত না। তাহার নয়ন বারম্বার আমার প্রতি প্রেরিত হইয়া সংগতিসময়েই নিবত্তিত হইত, এবং তৎক্ষণাৎ কপোলতল হ্রীচিহ্নস্তূপে পল্লবাভায় ঈযৎ রঞ্জিত হইত। কিন্তু কথা কহিবার পথ ছিল না। মানুষের সর্ব্বস্বস্বরূপ জিহ্বা থাকিয়াও আমাদিগের পক্ষে তাহার অসম্ভাব হইল। বাস্তবিক সে অতি মধুরদর্শনা। আমার ভারতবর্ষের কোন্ স্থানে উত্তরণ হইয়াছে তাহার কিছুই নির্ণয় ছিল না অতএব সে কোন্ দেশীয় কামিনী তাহা প্রথমে জানিতে পারি নাই। তথাপি তাহার সুকোমল অঙ্গ, চিক্কণ কপোলযুগল, কৃষ্ণসারসদৃশ নয়নদ্বয়, এবং সংস্কৃতকবিদিগের সতত বণিত সুবর্ণতুল্য দেহপ্রভা, এই সকল দেখিয়া এক জন ভারতবর্ষীয়ের মন অনায়াসেই 'অপহৃত হইতে পারে। যে আমি গতরাত্রে জুলিয়ার স্বর্গযাত্রার অনুগামী হইতে চাহিয়াছিলাম, এখন যেই সময়ের পর চব্বিশ ঘণ্টা অতীত হইতে না হইতেই সেই আমি আর এক যুবতীর প্রণয়বশম্বদ হইতে পরাম্মুখ হইলাম না। ইহারই নাম মানুষের অচঞ্চলতা, ইহারই নাম মানুষের জিতেন্দ্রিয়তা, আর ইহারই নাম মানুষের একপত্নীব্রততা। হে মূঢ়জনকর্তৃক পরার্ঘ্য বার জগতে উদেঘাষিত প্রণয়সর্ব্বস্ব, যদি তোমার অর্থ এই হয়, যদি উদ্দাম রিপুর চরিতার্থতা করাই প্রণয়পদবাচ্য হয়, যদি কবিরা যে সকল লোভনীয় মনোরম প্রণয়বার্তার বর্ণন করেন, সে সমুদয়ই অযথার্থ ও কল্পনাসমর্থিত হয়, তবে যেন উত্তরকালে সুখাশায় কেহ তোমার অনুবৃত্তি করে না! আমি তখন ধৰ্ম্মবোধকে এই বলিয়া সান্ত্বনা করিলাম, যে, এখন যে আমার মনোহরণ করিতেছে, সে আমাকে সাগরের গ্রাস হইতে উদ্ধার করিয়াছে, অতি বিপদের সময় আশ্রয় দিয়াছে, আমাকে অপ্রার্থনায় গৃহের অতিথি করিয়াছে এবং তাহাতেও সন্তুষ্ট না হইয়া আপনার যৌবন ও সুখ আমার আয়ত্ত করিবার অভিলাষ দেখাইতেছে। ঈদৃশ মহোপকারী জনের প্রত্যুপকার না করিলে মনুষ্য নামের অবাচ্য হইতে হয়। আবার প্রত্যুপকারই কেমন মধুর, তাহার সহিত অখণ্ডনীয় সূত্রে বদ্ধ হইয়া চিরকাল সুখ সম্ভোগ। আমি এই সকল ভাবিয়া তৎকালে ধৰ্ম্মকে ফাঁকি দিলাম।
যুবতীর প্রযত্নে ও বৃদ্ধার পরিচর্যায় দিন চারি পাঁচে আমার স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধৃত হইল। আমি তাহাদিগের ভাষার দুটি একটি কথা বুঝিতে সমর্থ হইলাম, কিন্তু যুবতী কোন্ জাতীয় রমণী, সে কিরূপে যৌবনে এরূপ স্বতন্ত্র হইয়াছে, তাহার অট্টালিকা কোন নগরের সমীপবত্তি কি না, আমি ভারতবর্ষের কোন্ স্থানে আছি, এই স্থান জনপদ কি অরণ্যমধ্য এই সমুদয় মৃত্যুর উত্তরকালীন অবস্থার ন্যায়, জন্মের পূর্ব্বতর দশার ন্যায়, ঈশ্বরের ন্যায়, চন্দ্রলোকের অভ্যন্তরবৃত্তান্তের ন্যায়, আমার নিকট অপরিজ্ঞাত ও অস্ফুট রহিল। প্রতিদিনই পূর্ব্বনিদিষ্ট গৃহের পর্য্যঙ্কে উপবিষ্ট হইয়া ভিত্তিস্থিত নানা শস্ত্রাবলী দেখিতে লাগিলাম, জনার ভাজা ও ছাগদুগ্ধের সর খাইতে লাগিলাম, এবং বৃদ্ধা ও যুবতীর পরস্পর কথোপকথন শ্রবণ করিয়া আপনার ভাষাজ্ঞানের কিছু কিছু আধিক্য করিতে লাগিলাম।
পোনের দিন এই ভাবে অতিবাহিত হইল। যুবতী আমার প্রতি সেইরূপ প্রেমভাবে দৃষ্টিপাত করে, আমিও তাহার প্রতিদান করি। কিন্তু এই পর্যন্তই শেষ। আমি এখন ক্রমে তাহার ভাষা কিছু কিছু বুঝিতে শিখিলাম।' তাহাদিগের মুখে জানিতে পারিলাম, যে সেই অট্টালিকা এক জন পল্লিগারের ছিল। পল্লিগার বহুকাল ত্রিবাস্কোড় রাজের অধীন থাকিয়া ঐ স্থানে আপনার গিরিদুর্গ নির্মাণ করিয়া বাস করিত। যুবতী তাহারই দুহিতা, নাম কমলাদী। ঐ অট্টালিকা হইতে ত্রিবাস্কোড় নগর অধিক দূরবর্তী হইবে না, অধিকতঃ ডেড় দিনের পথ। এতও হইত না যদি তথায় যাইবার কোন সুপথ থাকিত। চারি দিকে অনেক ক্ষুদ্র শৈল থাকাতে প্রপাত, অন্তর্দেশ, গিরিনদী ইত্যাদি দুর্গম স্থান পার হইয়া ঐ স্থান হইতে ত্রিবাঙ্কোরে যাওয়া যায়। সমীপে লোকালয় নাই, কেবল পল্লিগার একাকী বাস করিত, সে এবং তাহার ভার্য্যা লোকান্তরিত হইয়াছিল তদনুসারে কমলাদী গৃহস্বামিনী হইয়াছে। তাহাদিগের ক্ষেত্র ছিল তথায় উদ্ভিজ্জ আহার উৎপন্ন হইত, ছাগযূথ ছিল, তাহার দুগ্ধ পরিপোষক ভোজন হইত। পূর্ব্বোক্ত ভৃত্য এই সমুদয়ের তত্ত্বাবধারণ করিত। কখন নগরে যাইবার প্রয়োজন হইলে সেই যাইত। নির্ঝরের স্ফটিকজল তাহারা পান করিত। সমুদ্রের স্বাস্থ্যকর শীতল, বায়ুতে পরিসেবিত বেলাভাগে তাহারা বিহার করিত। বসন্তকালে সিংহলের দারুচিনির গন্ধযুক্ত ধীর সমীর দ্বারা তাহাদের চতুঃপার্শ্বস্থ রমণীয় বন আমোদিত হইত। অট্টালিকার সন্নিকটে প্রবহমানা ক্ষুদ্র গিরিনদীতে স্নান করিয়া তাহারা দেহের তাপশান্তি করিত। এবম্বিধ মনোহারী বিবিক্ত স্থানে কমলাদী সুরলোকের বিদ্যাধরীর ন্যায় বাস করিত। তাহার যৌবন অদ্যাপি অক্ষত ছিল। তাহার রূপে কালিদাসের "অনাঘ্রাতং পুষ্পং কিশলয়মলুনং কররুহৈঃ” এই বাক্য সম্যক্ সংগত হইত। সে, পুরুষ যে চঞ্চল, নিষ্ঠুর ও কৃতঘ্নতার প্রধান নিদর্শন তাহা অদ্যাপি শিক্ষা করে নাই, তাহার সরল চিত্ত জ্বর নিকট বক্রভাবের উপদেশ পায় নাই। অনায়াসেই আমাতে সমপিত ও পাষাণের ন্যায় নিশ্চল হইল। তাহারই বাস্তবিক, পবিত্র প্রণয় হইয়াছিল, সেই শরৎকালের নির্মল সুধাকর ও মহোজ্জল দিনকরবিম্বের বিস্ময়নীয় সৌন্দর্য্য দর্শন করিয়া মনের মালিন্য দূর করিয়াছিল। তাহার হৃদয় যেন সায়ংকালে সাগরগর্ভে নিমজ্জনোদ্যত আরক্ত তরণিমণ্ডলের নিকট অনুরাগ শিক্ষা করিয়াছিল। এত দিন মনোমত পাত্র না পাইয়া সেই অনুরাগ প্রতিফলিত হয় নাই। আমাকে সে, 'রূপবান্ বলিয়াই হউক, প্রণয়ের অনিবন্ধনতাপ্রযুক্তই হউক, অন্তরের সহিত ভাল বাসিতে লাগিল। যে অবধি অতি অল্প মাত্রার কথা কহিতে শিখিয়াছিলাম, সেই পর্যন্তই মুগ্ধভাবে আপনার মনের সমুদায় কথা বলিত, কিছুমাত্র লজ্জা বোধ না করিয়া গাত্র অনাবৃত রাখিত। তাহার সারল্য এমন চমৎকারী ছিল! আমি সংসারে কেবল বাহ্য প্রেম দেখিয়াছি, ধরণীতে এমন সরস বস্তু আছে, তাহা স্বপ্নেও জানিতাম না। আমার বাঞ্ছা হইল, সমুদয় হৃদয় দ্রবীভূত করিয়া এমন সুজনকে ঢালিয়া দি। আমি স্থির করিলাম, যে অবনিমণ্ডলে যদি কিছু সুখ থাকে, যদি দুর্জনের অসূয়া, জিগীযুদিগের জ্বর্দান্ত সংহারক সমর ও উৎপীড়কদিগের লৌহসদৃশ কঠিন দণ্ড পৃথিবীকে একেবারে বাসের অযোগ্য না করিয়া থাকে, তবে বোধ হয় এমন সুখ আর কোথাও পাওয়া যাইবে না, আমি এই স্থানে চিরতৃপ্তিতে জীবন ভোগ করিয়া মাতার সদৃশ অবনীতে দেহার্পণ করিব। তখন কবিরা আপনাদের মধুর সংগীতে যাহার বর্ণন করেন, আমার সেই অবস্থা লাভ হইয়াছে বোধ হইল।
কমলাদীর ভাষায় সম্পূর্ণরূপে ব্যুৎপন্ন হইতে আমার দুই মাস লাগিল। এই দুই মাস কাল আমি গৃহ হইতে বহির্গত হই নাই। অট্টালিকার নানা গৃহের নানাবিধ সজ্জা দেখিয়া বেড়াইতাম। এই সকল গৃহের মধ্যে কমলাদীর বাসাগার অতি রমণীয়। ইহা হইতে সাগরের নীল জল অসংখ্য ক্ষুদ্র দ্বীপে অবাকীর্ণ লক্ষিত হইত। কল্লোলধ্বনি প্রভাতে কমলাদীর নিদ্রা ভঙ্গ করিত। সুমন্দ বায়ুর প্রবাহে তাহার শয্যাস্তরণ চঞ্চলিত হইত। অস্তোন্মুখ দিনকরকিরণ গবাক্ষমার্গদ্বারা প্রবিষ্ট হইয়া ইহার ভিত্তি রঞ্জিত করিত। ইহার এক পার্শ্বে টবে রোপিত দুটি গোলাপ গাছ ছিল। তাহার নয়নহারী পাটলবর্ণ কুসুমের আমোদে গৃহ সর্ব্বদা আমোদিত থাকিত। ভিত্তিতে হনুমান রাম লক্ষ্মণ প্রভৃতি রামায়ণের নায়কবর্গের প্রতিমা চিত্রিত ছিল। পর্য্যঙ্ক ধূমলবর্ণ এক গদি ও তদুপরি কুসুমী বর্ণেরঞ্জিত এক আস্তরণ দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। কমলাদী এই শয়নে আপনার পরিপেলব অঙ্গ নিমগ্ন করিয়া নয়নে নিদ্রাকে অবকাশ দান করিত। আমার ইচ্ছা হইত যে যদি আমিই শয়নীয় হইতাম। অট্টালিকার নিম্নতলে একটি সংকীর্ণ বিবরাকার গৃহ ছিল। কমলাদী বৃদ্ধার সহিত পরিক্রমে বহির্গত, আমি একদিন সেই গৃহে প্রবেশ করিলাম। তথায় মৃত পল্লিগারের যুদ্ধে বিনিযোজিত নানা অস্ত্র সজ্জিত ছিল। প্রায় তিন হাত ব্যাসের একখানি ঢাল এবং রাক্ষসের, সন্নহনযোগ্য লৌহবৰ্ম্ম দেখিয়া আমি সমধিক বিস্মিত হইলাম। যে কেহ পল্লিগারদিগের ছবি দেখিয়াছে সেই জানে, যে এই সকল প্রকাণ্ড বীরেরা কেমন বেশ ধারণ করিয়া যুদ্ধে গমন করে। কিন্তু ইউরোপীয় সৈনিকদিগের সাহসের নিকট ঈদৃশ মূর্ত্তি ভীষণ হয় না এবং তাহাদের গুলিক্ষেপের নিকট এমন দুর্ভেদ্য বৰ্ম্মও দেহ রক্ষা করিতে পারে না।
দুই মাস অতীত হইলে কমলাদী বিবাহের প্রস্তাব করিল। তুমি মনে করিয়াছিলে, যে ইহার পূর্ব্বেই আমরা পরস্পরের সহিত যথেচ্ছ ব্যবহার করিয়াছি। কিন্তু বাস্তবিক তা নয়। কমলাদী নিতান্ত সরল হইলেও ধৰ্ম্মানুযায়ী বিবাহ-বিধির নির্বাহ স্মৃতি আবশ্যক বোধ করিত। তাহার এমন মধুর প্রস্তাবে কে না সম্মত হয়। এ স্থলের বিবাহ, মাল্যবিনিময় প্রভৃতি সামান্য আচারে সম্পন্ন হয়, আমরা সেই বিধিতে পরস্পর সূত্রিত হইলাম। আমাদিগের পূর্ব্বরাগ কখন কোন অন্তরায় দ্বারা বিহত হয় নাই, এক্ষণেও আমরা নির্বিঘ্নে বাস করিতে লাগিলাম। এক্ষণে আমরা বাহুদামে পরস্পরকে সংযত করিয়া নানা স্থানে বিহার করিতে লাগিলাম, বকুল বৃক্ষের তলে উপবেশন করিতাম, গিরিনদীতে বিহরমান হংসযুথে কৌতুকযুক্ত হইতাম, আম্রকুঞ্জে অবিরলিতকপোলে কথা কহিয়া রাত্রির অতিপাত করিতাম, নগ্নসর্ব্বাঙ্গ হইয়া নির্ঝরের ক্ষরণশীল জলে ধৌত হইতাম, সমুদ্রতটে কত খেলা খেলিতাম, বর্ষাকালে জলবিন্দুসিক্ত শিলাতলে উপবিষ্ট হইয়া ময়ূর মন্ত্রীর কেকা সহিত নৃত্য ও পক্ষবিস্তার দর্শন করিতাম, শরৎ কালের নির্মূল জ্যোৎস্নার সহিত কমলাদীর কপোলপ্রভার উপমা দিতাম, গ্রীষ্মের যুথিকা লইয়া তাহার ভ্রমরনীল অলকে বসাইয়া দিতাম, হেমন্তের বান্ধুর আপাণ্ডু গণ্ডস্থলে পরাইয়া দিতাম, মধু মাসের মধু বায়ু সেবন করিতে করিতে তাহার বদন-সুধা পান করিয়া মাস নামের সার্থকতা করিতাম। আর'কত বলিব, সংস্কৃত কবিরা যে স্থানে যেরূপ বর্ণন করিয়াছেন, আমরা সে সকলের স্বাদগ্রহ করিতে অবশিষ্ট রাখি নাই। যদি আমার চিরকাল ইন্দ্রিয়-সুখে কাল যাপন করিবার অভিলাষ থাকিত, যদি দুরাশা কর্ণে জপতা না করিত, তবে আমি কমলাদীর সহিত অবিচ্ছেদে সুখ ভোগ করিতাম। প্রিয়বাদিনী প্রিয়দর্শনা ভার্য্যা, মানুষের বিষচক্ষু হইতে দূরবর্ত্তিতা, প্রকৃতির অতি মনোহর অবস্থা নিরীক্ষণ এবং স্বতন্ত্রতা, ইহা অপেক্ষা সংসারে আর সুখ কি আছে। আমার সে সকলই ছিল। নিবিড় অরণ্যমুকুটিত শৈলমালা প্রতিদিন লোচনগোচর হইয়া অপরিসীম আনন্দ দান করিত, নির্ঝর হইতে ঝঝ'র শব্দে শ্রুতিশীল বারি বীণা অপেক্ষাও অধিক মধুধারা কর্ণে বমন করিত, ঘন পত্রাচ্ছন্ন তরুমালায় সূর্যতাপ হইতে ছাদিত নদীর তটভাগে হংসতুল অপেক্ষা সমধিক কোমল নব শষ্প শয়নীয় বিস্তার করিয়া রাখিত, কলকণ্ঠ পতত্রিরা মধুর স্বর আবিষ্কৃত করিয়া নাগরিকাদিগের আমোদদায়ী গায়কবর্গকে ধিক্কার করিত, কস্তুরী মৃগদিগের অধ্যাসনে সুরভীকৃত শিলাতল শ্রমহারী বিষ্টরস্বরূপ হইয়া উপবেশনের নিমিত্ত আহ্বান করিত। ইহা অপেক্ষা মধুরতর আবাস আর কি হইবে? আবার এমন স্থানে যেরূপ সৌন্দর্য্য যেরূপ প্রণয়, যেরূপ শুচারিত্র ছিল তাহাতে কি এমন স্থান সেই সুরলোক অপেক্ষা রমণীয়তর নহে? তথায় কোন সংস্কৃত নাটকের একজন পাত্র বলিয়াছে, যে যথায় আহারও নাই, পানও নাই, কেবল মীনের মত অনিমিষে চাহিতে হয়।
কিন্তু আমার মন ইহা অপেক্ষা অনেক ভিন্ন মনোরথ দ্বারা বীজিত হইতেছিল। নবতানিবন্ধন রমণীয়তা অতীত হইলেই আমার চিত্ত অন্য দিকে ধাবিত হইল। ভাবিলাম আমি কি এত অল্প বয়সেই সংসার আরম্ভ করিব? জগতের কেহ আমায় জানিবে না? কমলাদীর সংসর্গেই জীবনক্ষেপ করিব? আমার আকাঙ্ক্ষা কি যশোমন্দিরে অপরিজ্ঞাত বিবিক্তবাসিনী এক কামিনীর প্রণয়ী হইয়াই চরিতার্থ হইল? কিন্তু তখন কমলাদী হইতে মন তত ভ্রষ্ট হয় নাই, তখনও তাহার পেলব পরীরম্ভে মহাসুখ অনুভব করিতাম, অতএব তাদৃশ বিরক্তি জন্মিল না।
এক বৎসর এইরূপে অতীত হইল। তখন কমলাদীর বয়ঃক্রম উনবিংশতিতে অধিরোহণ করিল। আমি চতুবিংশতিতম বর্ষে পদার্পণ করিলাম। কমলাদী সর্ব্বদা গুরুজনের ভয় বা লজ্জা না থাকাতে আমার বক্ষেরই ভূষণ স্বরূপ থাকিত। যৌবনের যাবতীয় সুখ আমার অনুভূত হইতে লাগিল। কিছু দিন পরে স্তনের অগ্রভাগ মলিন হইল, কপোল পাণ্ডু, শরীর কৃশ ও দুর্বল, এবং অরোচক ইত্যাদি গর্ভের চিহ্ন নির্গত হইল। আমার এই ঘটনায় অন্তরস্থ নির্বেদ একেবারে জাগরূক হইয়া উঠিল, আমি মনে করিলাম, যে আর আমার এ স্থলে বাস শ্রেয়স্কর নহে। আর একটি স্নেহের পাত্র হইলে কি সমুদয় বন্ধন ছেদ করিয়া পলাইতে পারিব। কমলাদীকে 'পরিত্যাগই আমার কত জাগর, কত চিন্তা, কত উদ্বেগের হেতু হইবে। 'আমাকে সে সমুদয়ের অধীনতা হইতে মুক্ত হইবার নিমিত্ত কত প্রয়াস 'পাইতে হইবে, আবার অপত্য হইলে তাহার অস্ফুট বাক্য সুমধুর স্মিত "ও নিজ জননীর সদৃশ প্রিয়দর্শন মুখকমল দেখিলে কি তাহা ছাড়িতে 'পারিব? এইরূপ ভাবিয়া আমি অবিজ্ঞাতরূপে পলায়নে স্থিরনিশ্চয় হইলাম। আমার মন এরূপ চঞ্চল! যদি ইহাতে অতি অল্পমাত্রায়ও সন্তোষের সংযোগ থাকিত।
যে আমি প্রথমে কমলাদীর সহিত চিরকাল সুখে বাস করিবার প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম, সেই আমার এখন যত শীঘ্র সম্ভব, সেই সুখময় সারল্যধাম হইতে দূরীভূত হইবার প্রবল অভিলাষ হইল। যৌবন কি ভয়ানক সময়! যশোবাসনা এই সময়ে মানুষকে অন্ধীভূত করিয়া সাক্ষাৎ সংহারের অন্ধকারময় কুহরে নিক্ষেপ করে। এই সময়ের প্রেতপ্ত মানস যথার্থ সুখে সুখী না হইয়া লোকসমাজে বিখ্যাতি লাভকেই মানুষের অন্ত্য উদ্দেশ্য বোধ করে। সন্তোষরত্ব তখন অপরিচিত থাকে, তখন মহোদ্যমযুক্ত কার্য্য না করিলে যেন বিনোদনশূন্য হইতে হয়। আমার, অবিলম্বে অপসরণই নির্ধারিত হইল। পাথেয় স্বরূপ কতকগুলি সুরম্য বস্ত্র ও কমলাদীর পিতার অস্ত্রা গার হইতে একখানি তীক্ষ্ণ তরবারি গ্রহণ করিলাম।
পূর্ব্বদিক্ অরুণোদয়ের চিহ্ন ধারণ করিলে আমি শনৈঃ শনৈঃ অট্টালিকা হইতে বহির্গত হইলাম। তখনও পক্ষীরা একপাদে অবস্থান পরিত্যাগ করে নাই, তখনও দুটি একটি নক্তঞ্চর ক্ষুদ্র পশু আপনার গর্তে প্রবেশ করে নাই। আমি এই অহোরাত্রের সন্ধি সময়ে বহির্গত হইয়া অতি শীঘ্র উত্তরদিব্বর্তী ক্ষুদ্রশৈলে অধিরোহণ করিলাম। বন্ধুর আরোহণ-পথে হস্ত পদের সাহায্য লইয়া উঠিতে হইল। দক্ষিণে ও বামে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণ্টকবৃক্ষ গাত্র ঘর্ষণ করিতে লাগিল। উর্দ্ধে লম্বমান শিলাবিভঙ্গ যেন আমাকে প্রোথিত করিবার ভয় দেখাইতে লাগিল। চারি দিক্ ঝোপ ও কণ্টকবনে পরিপূর্ণ হইয়াছিল। আমি পথ জানিতাম না। তথাপি যেদিকে উঠিবার স্থান পাইলাম, তথায়ই যাইতে লাগিলাম। ক্রমে যত উর্দ্ধে উঠি, ততই ভাঙ্গা পাথর, ফাটা মৃত্তিকাস্তূপ ও দুরারোহ পাহাড় আমার পথে বিঘ্নস্বরূপ হইতে লাগিল। অতিশয় প্রয়াসের সহিত এই সকল অতিক্রম করিতে মধ্যাহ্নকাল উপস্থিত হইল। দুই প্রহর রৌদ্রে পাথর তপ্ত হইয়া উঠিল। অত্যন্ত 'কষ্ট পাইতে লাগিল। আমার পাদুকারহিত চরণ তাহাতে তথাপি অসীম অধ্যবসায়ের সহিত বনফল দ্বারা ক্ষুধার শান্তি করিয়া আপনার ভ্রমণেই রত থাকিলাম। আমি অনাচ্ছন্ন মস্তকে সূর্য্যের প্রখর কিরণ সহ্য করিতে করিতে হস্ত ও পদের বিনিযোগ করিয়া সরীসৃপের ন্যায় যাইতে লাগিলাম। এই সময়ে একস্থলে পথশেষ হইল। পর্ব্বতের সানুদেশের ধারে আমি আপনাকে দণ্ডায়মান দেখিলাম। প্রায় পঞ্চাশ হাত নিয়ে এক জলপ্রবাহ ভয়ানক গর্জন ও শুভ্রবর্ণ ফেণরাশি উদ্বমন করিতে করিতে মহাবেগে নিম্নগামিনী হইতেছিল। স্রোতের অপর পারে অনেক নীচ এক পাহাড় ছিল। এক বৃহৎ অশ্বত্থ বৃক্ষ সেই পাহাড় হইতে উদ্ভূত হইয়া আপনার বিশাল শাখা, আমি যে পারে ছিলাম, সেই পার' পর্যন্ত বিস্তৃত করিয়াছিল। আমার সাহস তখন অতিশয় বাড়িয়াছিল। আমি স্রোতের ভীষণ নিনাদ ও তাহার হৃদয়কম্পী বেগে অবধান না করিয়া তৎক্ষণাৎ অশ্বত্থের শাখা ধরিলাম। সেই শক্ত শাখায় আরূঢ় হইয়া আমি মার্গরোধী জল-প্রপাতের উপর ধিক্কার দিয়া অপর পারে অবতীর্ণ হইলাম। এক্ষণে দেখিলাম, পাহাড় ফুরাইল। তরঙ্গসম ক্ষেত্রমণ্ডলে জনার, সিলেট প্রভৃতি শস্যচয় কম্পমান হইতেছিল। দূরবর্তী তরুসমূহ লোকালয়ের নিকটবর্তিতা সূচন করিল। আমি অত্যন্ত শ্রান্ত হইয়া চারি ধারে তালমালা দ্বারা বেষ্টিত পুষ্করিণীর ঘাসযুক্ত গড়ানিয়া পাড়ে বসিয়া তাহার শীতবায়ু সেবন করিতে লাগিলাম। তালপত্রের ঝর্ঝর ধ্বনি আমার শ্রবণে ক্লান্তির সময় অতি মধুর হইল। ক্ষণকাল পরে এক গোযূথ একটা গোপাল বালকের অনুগত হইয়া পুষ্করিণীতে জল পান করিতে লাগিল। কত দিন এদৃষ্টি দর্শন করি নাই, এখন অতি মধুর বোধ হইল। তখন রৌদ্রের তাপ শান্তির উন্মুখ হইতেছিল। আমি গোপালদারকের উপদিশ্যমান পথ অবলম্বনপূর্ব্বক গ্রামে উপস্থিত হইলাম। 'তথাকার আতিথেয় অধিবাসীরা পরম সমাদরের সহিত সেদিন বাস করিতে দিল। পরদিন প্রভাত হইবামাত্র তাহাদিগের নির্দিষ্ট পথ অবলম্বন করিলাম। মাঠের শোভা, দেশীয় লোকের অবস্থা, নারীগণের সুশ্রীকতা, এই সকল দেখিতে দেখিতে দুই প্রহরের সময় ত্রিবাঙ্কোড়ে উপস্থিত হইলাম। তথায় সঙ্গে আনীত বস্ত্রের বিক্রয় দ্বারা কতকগুলি মুদ্রা বিনিময়ে পাইলাম। ত্রিবাঙ্কোড় হইতে পাঁচ দিনের মধ্যেই ত্রিবাঙ্কোড় দেশের পরিবেষ্টক মৃত্তিকানিম্মিত প্রাকার পার হইয়া হাইদরের রাজ্যে পদার্পণ করিলাম। আমার নিশ্চয় হইল যে, হাইদরের সেনাদলে ভুক্ত হইয়া আমার অবমাননাকারী ইংরাজদিগের উপর বিলক্ষণ বৈরনির্যাতন করিব।
হাইদরের রাজ্যের প্রান্তভাগেই তাঁহার অপক্ষপাতিতা, ন্যায়াচার ও পুত্রের ন্যায় প্রজা পালনের যশ শ্রবণ করিলাম। কত অনাথ অবলা তাঁহার প্রসাদে দুষ্ট লোকের ক্রুরতা হইতে পরিত্রাণ পাইয়া তাঁহার সাধুবাদ করিতেছে, কত উপেক্ষিত গুণবান্ ব্যক্তিরা তাঁহার গুণগ্রাহিতায় উচ্চ পদে অধিরোপিত হইয়া প্রশংসা করিতেছে, এই সকল লক্ষ্য করিলাম। কি হিন্দু, কি মুশলমান, কাহাকেও তাঁহার আধিপত্যে অপরক্ত দেখিলাম না। তাঁহার সৌরাজ্যের চিহ্ন সর্ব্বত্র দেখিতে পাইলাম। 'কৃষাণেরা অতি প্রফুল্লভীবে মাঠের কার্য্য করিয়া অপর্যাপ্ত আহার উৎপন্ন করে, মহীসুর প্রদেশের সর্ব্বভাগেই উদ্যান, ক্রয়বিক্রয়ের কলকলপূর্ণ নগর, স্ময়মান গ্রামাবলী ও লুব্ধকহীন রাস্তা। দুষ্টেরা তাঁহাকে সর্ব্বশক্তিমান্ বিষম শত্রুর মত দেখিত, সজ্জনেরা অতি দয়ালু জনকের মত বোধ করিত। তাঁহার রাজস্ব অতি সুনিয়মে দত্ত ও গৃহীত হইত। কোন জমীদার যে রাজদত্ত ক্ষমতার সাহায্য পাইয়া দরিদ্রদিগের উপর দৌরাত্ম্য করিবেন, তাহার কিছু পথ ছিল না।
করিয়া আপনাকে তাঁহার কার্য্যে আমি তখন তিন দিনের মধ্যেই তথায় তাঁহার সেনানাথের নিকট আমার, এই সকল সদ্গুণ শ্রবণ ব্যাপৃত করিতে অত্যন্ত আগ্রহ হইল। তাঁহার রাজধানীতে উত্তীর্ণ হইলাম। উপস্থিত হইয়া এক জন সামান্য সৈনিক হইবার অভিলাষ প্রকাশ করিলাম। সেনানাথ অতি সুজন ছিলেন, তাঁহার মুখে দাক্ষিণ্য স্পষ্টরূপে লিখিত ছিল। তিনি আমার প্রার্থনা অগ্রাহ্য করিলেন না। কিন্তু আমার বৈদেশিক বেশ ও বাঙ্গালীর মত আকার দেখিয়া অতিশয় আশ্চর্যান্বিত হইলেন। যাহা হউক, আমি ইংরাজদিগের প্রতি সাতিশয় দ্বেষ প্রকাশ করাতে তাঁহার সংশয় অপনীত হইল।
এইরূপে কিছু কাল সামান্য সৈনিক পদেই আমাকে সন্তুষ্ট থাকিতে হইল। অনন্তর দৈবযোগে আমার আশাসিদ্ধির উপায় হইল। যৎকালে আমি হাইদরের সেনায় নিবিষ্ট হইয়াছিলাম, সেই সময়ে তাঁহার জাগরূক চক্ষে ধূলি নিক্ষেপ পূর্ব্বক কয়েক জন প্রসিদ্ধ দস্থ্য রাজ্যে অত্যাচার করিত। প্রায় প্রতি মাসেই কেহ না কেহ তাহাদিগের উপদ্রব সহ্য করিতেন ও রাজসমীপে আসিয়া আক্ষেপ করিতেন। হাইদর অতি কঠিন শাসন ব্যবস্থিত করিয়াও তাহাদিগকে ধরিতে সমর্থ হইলেন না। দুরাচারেরা সৈনিকদিগের বন্দুককে অবগণনা করিত, চৌকীদারদিগের অবধীনকে তুচ্ছ জ্ঞান করিত। পরিশেষে তাহারা এমন সাহসিক হইল, যে শ্রীরঙ্গপত্তনের অভ্যন্তরে দৌরাত্ম্য আরম্ভ করিল। নগরের মধ্যে সন্ধ্যার পর কেহ ভয়ে বাহির হইতে পারিত না। তাহারা রাত্রিকালে দস্যুবৃত্তি করিয়া দিবাভাগে যে কোথায় লুকাইত, তাহা কেহ অনুসন্ধান পাইত না। হাইদর ঘোষণা করিয়া দিলেন, যে যদি কেহ দস্যুদিগকে ধৃত করিয়া দিতে পারে, তবে তাহাকে দেশের এক ওমরা করা যাইবে, এবং যদি তৎকালে কোন উচ্চ পদ খালি থাকে, তবে প্রার্থনা করিলে সে সেই পদে অধিরোপিত হইবে। এই সৌভাগ্য আমার নিমিত্তই সঞ্চিত ছিল।
আমি একদিন সন্ধ্যার প্রাক্কালে নগর হইতে বহির্গত হইয়া পশ্চিম দিকে যে একটা ক্ষুদ্র শৈল ছিল, তথায় ভ্রমণ করিতে গেলাম। এই শৈল অতি রমণীয়। ইহার উপরিস্থ নীলবর্ণ নানা তরুর পত্রকুঞ্জ পরিদৃষ্ট হইয়া মনে কত মহীয়ান্ ভাবের আবির্ভাব করে। ইহার পার্শ্ব গড়ানিয়া। তথায় শ্বেত, রক্ত, কাল পুষ্পে শোভিত অনেক ঝোপ আছে। ইহার তলভাগ নিবিড় শরবনে আচ্ছাদিত। উপরের ঝাউ বৃক্ষের হহ শব্দ বিষণ্ণভাবে কর্ণে আহত হয়। সায়ংকালের প্রাক্কালে এই সকল ঝোপ, বৃক্ষ ও জঙ্গল এরূপ এক প্রকার ভয়মিশ্রিত আনন্দের উৎপাদন করে, যে তাহা অনির্বচনীয়। আমি এমন স্থান চিরকাল বড় ভাল বাসিতাম। শৈশবেই আমার এমন স্থানের পল্লবজালে আবৃত হইয়া শুইয়া থাকিতে, ঘুঘুর বিষাদজনক কলরব শ্রবণ করিতে এবং বায়ুর তীক্ষ্ণ হিল্লোলে স্পৃষ্ট হইতে বড় অভিলাষ হইত। আমার এমন স্থান মনে করিয়াই নয়ন জলার্দ্র হইত। আমি কথিত দিনে সেই স্থানে যাইয়া আপনার শ্রমখিন্ন অঙ্গ পত্রোচ্চয়ে চালিয়া দিলাম। আমার শরীর পুরোবর্তী শরবন দ্বারা আচ্ছাদিত রহিল।
এই সময়ে আমার নিয়ে যেন মানুষের স্বর শ্রবণ করিলাম। প্রথমে আমার আশ্চর্য্যের সীমা রহিল না। আমার শরীর আপাদ মস্তক কম্পবান্ ও উৎপুলক হইল, এবং অতিশয় ঘাম্ বহিতে লাগিল। আস্তে আস্তে কর্ণের তলস্থিত পত্ররাশি অপনয়নপূর্ব্বক স্পষ্টই আমার দুই তিন জনের কথোপকথন শ্রবণগোচর হইল। একজন কহিল, "ওহে, আমাদের ধরিবার জন্য পুরস্কার অঙ্গীকার করিয়াছে, তবে এখন ওর্ ঘরে না একবার যাইলে মজা নাই।" আমি ইহাতেই বুঝিয়া লইলাম, যে-কাহারা কথা কহিতেছে। আমার তখন আহলাদও হইল, ভয়ও হইল। দস্যুদিগের নির্জন স্থান পাইয়াছি বলিয়া আহলাদ হইল, যদি এখনি যাই, তবে রাত্রিকালে শরবনে পদশব্দ শুনিয়া তৎক্ষণাৎ বহির্গত হইয়া বিনাশ করিবে, এইরূপ ভাবিতেছিলাম, ইত্যবসরে একটি শৃগাল খশ খশ করিয়া শরবনের উপর দিয়া চলিয়া গেল এবং প্রান্তে যাইয়া চীৎকার করিল। আমার বিলক্ষণ সুবিধা হইল। আমি অকুতোভয়ে শরবনে চলিয়া গেলাম, দস্যুরা নিঃসন্দেহ পূর্ব্বোক্ত শৃগাল মনে করিয়া কিছু বলিল না।
আমি দ্রুতবেগে সেনানাথের নিকট উপস্থিত হইয়া সংবাদ দিলাম। তিনি স্বয়ং পচিশ জন গৃহীতশস্ত্র সৈনিক সঙ্গে লইয়া আমার সহিত তথায় উপস্থিত হইলেন, এবং অবিলম্বে যে স্থানে কথা শুনিয়া-ছিলাম, সেই ভাগ অর্দ্ধচন্দ্রাকারে বেষ্টনপূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন, "এই বেলা বিনীতভাবে বশীভূত হও। নতুবা এখনি সকলের মস্তক চূর্ণ করিব।" বাস্তবিকও দস্যুদিগের পলাইবার উপায় ছিল না। তাহারা পাহাড়ের গড়ানিয়া পার্শ্বে সুড়ঙ্গ করিয়া লুক্কায়িত থাকিত। সুড়ঙ্গের মুখ শরবনে ছন্ন এবং নিকটে লোকালয়ের অসম্ভাব থাকাতে তাহারা এতদিন নির্বিঘ্নে ছিল। কিন্তু এখন প্রবেশপথ রুদ্ধ হইল। অতএব তাহারা একে একে বহির্ভূত হইয়া সৈনিকগণের অধীন হইল। কিন্তু এক্ষণে সেনানাথ ও আমি দুই জনে তাহাদের সুড়ঙ্গে প্রবেশ করিলাম। প্রবেশ করিয়া দেখিলাম, দিব্য একটি সজ্জিত ক্ষুদ্র গৃহ, তাহার চারি ধারে 'আয়না, দেয়ালগিরি ইত্যাদি সামগ্রী রহিয়াছে। একটি সিন্দুক ছিল, 'তাহা উদঘাটন করিয়া দেখা গেল, অনেক বস্ত্র, কতগুলি মুদ্রা এবং 'খানকতক শাণিত তরবারি।
সেই সমুদয় লইয়া আমরা নগরে প্রত্যাগমন করিলাম। হাইদর দস্যদিগকে যাবজ্জীবন কারাবাস দণ্ড বিধান করিলেন। তিনি আমাকে তাঁহার সেনার অর্দ্ধভাগের নেতা করিলেন। সেনানাথ আমাকে আপনার সমকক্ষ দেখিয়া কিছুমাত্র মাৎসর্য্য প্রকাশ করিলেন না। ফলতঃ আমার উদ্যম, সাহস ও কলহবিরাগ দেখিয়া তিনি আমাকে অতিশয় স্নেহ করিতেন, এমত কি, সন্তানের মত দেখিতেন। আমার সৌভাগ্য সংপূর্ণরূপে উজ্জ্বল হইল, সকল আশা ফলবতী হইল। আমি হাইদরের রাজসভায় একজন ওমরা হইয়া বাস করিতে লাগিলাম।
হাইদরও আমার প্রতি সবিশেষ সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি আমাকে নিদর্শনস্বরূপ উল্লেখ করিয়া আপন পুত্র টিপুকে অপকৃষ্ট বলিয়া তিরস্কার করিতেন। এই নিমিত্তই টিপুর আমার প্রতি আন্তরিক মহান্বেষ হইল। আমি টিপুর ঈর্ষ্যাপীড়িত মনে বিশ্বাস ও মিত্রতা জন্মাইবার অশেষ চেষ্টা করিয়াছিলাম, কিন্তু কোন প্রকারে কৃতকার্য্য হইতে পারিলাম না। হাইদর চিতেদ্রুগ নামক প্রসিদ্ধ গিরিদুর্গ অধিকার করিবার সময় আমার সাহস ও কৌশল দেখিয়া অতিমাত্র আহলাদিত হইয়াছিলেন এবং আপনার দুহিতার সহিত পাণিগ্রহণের প্রস্তাব করিয়াছিলেন, কিন্তু আমি টিপুরই অসূয়াধিক্য পরিহারের নিমিত্ত তাহাতে সম্মত হই নাই?
কিছু দিন পরেই হাইদর বহুকালজ্বলিত ইংরাজদিগের প্রতি কোপ উদগার করিতে আরম্ভ করিলেন। যে কেহ ভারতবর্ষের ইতিহাস পাঠ করিয়াছেন, তিনিই ১৭৮০ খ্রীষ্টাব্দের যুদ্ধের বৃত্তান্ত সম্যক্ অবগত আছেন। ইহার কিছু দিন পূর্ব্বে হাইদরের চিরস্মরণীয় কথাও তিনি বিস্তৃত হয়েন নাই। তিনি ইংরাজদিগকে বলিয়া পাঠাইয়াছিলেন "যে এত দিন'আমি কিছু বলি নাই! আচ্ছা! তাতে কিছু এসে যাবে না।” সকলেই জানেন, তাঁহার তুরগসেনা মান্দ্রাজের আড়াই ক্রোশ দূর পর্যন্ত আসিয়া ইংরাজদিগের মনে কেমন ভয় জন্মিয়াছিল, মহীসুরে যাইবার সকল গিরিমার্গ কেমন অবরোধ করিয়াছিল, কত দ্রুতবেগে কার্ণাটিকের এক নগর হইতে অপর নগরে দুই অরিদলের মধ্য দিয়া যাইত, কত কৌশল, কত প্রয়াণ, কত প্রতিপ্রয়াণ করিত। আমি এই সকল যুদ্ধের অনেক ব্যাপারে ভার গ্রহণ করিয়াছিলাম। আমারই অধীনস্থ সেনাদল কাপ্তেন বেলি সাহেবের সেনা সম্পূর্ণরূপে পরাভব করে, আমি পণ্ডিচরিতে নির্ভয়ে উপস্থিত হইয়া ফরাশি গবর্ণরের নিকট হাইদরের দৌত্যকার্য্য নির্বাহ করি। এই যুদ্ধে হেষ্টিংস্ সাহেব একেবারে সকল অন্ধকার দেখিয়াছিলেন, তাঁহারই আদেশে তখন মারহাট্টাদিগের সহিত সমর চলিতেছিল, আবার হাইদর এই সময়ে বিরোধিভাব ধারণ করিলেন, তিনি কি করিবেন, কিছুই স্থির করিতে পারিতেন না। কিন্তু ঘটনাক্রমে মেজর কুট্ সাহেব তৎকালে সৈনাপত্য ভার গ্রহণ পূর্ব্বক অনেক প্রয়াস ও কৌশলে হাইদরের বর্দ্ধমান প্রভাবের লঘুতা করিয়া দিলেন। সংগ্রাম নিবৃত্ত না হইতেই হাইদর এক *প্রাচীন রোগে আক্রান্ত হইয়া লোকান্তরিত হইলেন। তাঁহার তনয় টিপু এক্ষণে উত্তরাধিকারী হইয়া পশ্চিম ও পূর্ব্ব দুই উপকূলেই যুদ্ধে সমান রক্ষা আপনার অসাধ্য ভাবিলেন এবং অচিরে সন্ধি প্রার্থনা করিলেন। ইংরাজেরা বিলক্ষণ শিক্ষা পাইয়াছিল, এক্ষণে আগ্রহ সহকারে তাঁহার প্রার্থনা গ্রাহ্য করিল। সন্ধির সর্ব্ব প্রথম পণবন্ধ আমাকে ইংরাজদিগের হস্তে অসমর্পণ। আমি তাহাদিগের প্রতি অতিমাত্র শত্রুতা করিয়া-ছিলাম, তাহাদিগের স্বার্থে বড় আঘাত করিয়াছিলাম, এই নিমিত্তই ইংরাজদিগের আমার প্রতি দ্বেষ হইল। কিন্তু আমি কিছু অন্যায় করি নাই, সেনাপতি হইলে যুদ্ধে আর পাঁচ জন শত্রুর প্রতি যেমন ব্যবহার করে, আমিও সেইরূপ করিয়াছিলাম। অতএব আমাকে করতলস্থ করিবার অভিলাষ গুপ্তভাবে সিদ্ধ করিবার নিমিত্ত প্রয়াস পাইতে লাগিল। যদি প্রকাশিতভাবে তাহারা একজন সেনাপতিকে আপনাদিগের হস্তগত হইবার নিমিত্ত পণবন্ধ পত্রে প্রার্থনা করিত, তাহা হইলে ইউরোপে মুখ দেখাইবার পথ থাকিত না। অতএব টিপুর সহিত দূতদ্বারা এই কথাবার্তা স্থির হইল, যে, টিপু আমাকে ধরিয়া ইংরাজদিগের হস্তে সমর্পণ করিবেন। টিপুর মহাদ্বেষ ছিল, তিনি এই উপায়ে আমাকে অপসারণ করিতে বিমুখ হইলেন না।
আমি অতি শীঘ্রই এই বৃত্তান্ত জানিতে পারিলাম। আমার তখন টিপুর রাজ্যে ক্ষমতা অল্প ছিল না। সৈনিকেরা আমার নিতান্ত বশীভূত ছিল। সৈনাপত্যের বেতন মিতব্যয়িতা সহকারে ব্যয় করাতে অনেক বিভব সঞ্চয় করিয়াছিলাম। এই দুই সুবিধার সুকৌশল-যুক্ত বিনিয়োগ করিলে টিপুর রাজ্যে বিলক্ষণ গোলযোগ বাধিত। কিন্তু আমি তাদৃশ ধৰ্ম্মজ্ঞানশূন্য ছিলাম না। তাঁহার পিতার উপকার দ্বারা বলী হইয়া সেই বল তাঁহার পুত্রের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করিতে আমার একবারও অভিলাষ হইল না। আমি আপনার সমুদয় সামগ্রীর সহিত টিপুর রাজ্য পরিত্যাগ করিয়া মালোয়া অভিমুখে যাত্রা করিলাম।
যাইবার সময় টিপুকে এই পত্র লিখিয়াছিলাম:
"তুমি আমার প্রতি যেরূপ ব্যবহার করিতে উদ্যুক্ত হইয়াছ, তদনুসারে তোমাকে আমার কোন নামে সম্বোধন করিবার অভিলাষ নাই। যদি তোমার বুদ্ধি অবিচলিত থাকে, তাহা হইলে জানিতে পারিবে, যে আমি তোমার অনেক উপকার করিয়াছি এবং তোমার মাৎসর্য্য উদ্দাম না হইলে আরও কত করিতাম। তুমি আমাকে ইংরাজহস্তে সমৃর্পণ করিতে সম্মত হইয়া আপনার শক্তির অপমান করিয়াছ। তুমি হাইদরের ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়া আপন দেশের একজন প্রজাকে শত্রুর প্রসাদের সহিত বিনিময় করিতে লজ্জাবোধ করিলে না। যাহা হউক, আমার বশীভূত সৈনিকগণকে আমি তোমাকে সমর্পণ করিতে কিছুমাত্র মমতা প্রকাশ করি নাই। লোকে অবশ্যই আমার মহানুভাবতা ও তোমার লঘুচিত্ততা চিরকাল উদ্ঘোষণা করিবে। তোমার ইংরাজদিগের নিকট এই কাপুরুষতার ফল শীঘ্রই দৃষ্ট হইবে। আমার মন যেন তোমাকে হাইদরের শূন্য হইতে পরিনিম্মিত রাজ্যের শেষ পুরুষ মনে করিতেছে। যদি কিছু ঐশ্বরিক ক্ষমতা থাকে, তবে যাহাতে আমার এই আশঙ্কা বিফল হয়, তাহাই যেন সেই ক্ষমতা দ্বারা নিষ্পাদিত হয়, ইহা আমি মনের সহিত প্রার্থনা করি।”
আমার ভবিষ্যদ্বাণী কিরূপে সত্য হইয়াছে, তাহা ইতিহাসজ্ঞ ব্যক্তি মাত্রেই অবগত আছেন। আমার মহীসুর পরিত্যাগ সময়ে ত্রিশ জন তুরগসাদী অনুচর ছিল। ইংরাজেরা আমাকে ধরিবার নিমিত্ত কত চেষ্টা করিয়াছিল, কত স্থানে থানা বসাইয়াছিল, কত কৌশল করিয়াছিল। আমি অরণ্য গিরিপথ প্রভৃতি দুর্গম বন্ধু অবলম্বন করিয়া কয়েক দিনের মধ্যেই মালোয়ায় পহুছিলাম। সিন্ধিয়া সাতিশয়, অভ্যর্থনা করিলেন, এবং আপন সভার একজন সভাসদ করিলেন। আমি তাঁহার অনুগ্রহচ্ছায়ায় উপবিষ্ট হইয়া শান্তিসুখে কাল অপনয়ন করিতে লাগিলাম। তৎকালে ইংরাজদিগের সহিত তাঁহার সন্ধি ছিল। এই নিমিত্ত ইংরাজেরা তাঁহাকে আমার সমর্পণ প্রার্থনা করিলেন। কিন্তু তীব্রপ্রতাপ মারহাট্টা অতি কোপনভাবে উত্তর করিলেন যে, "ইংরাজ-দিগের কোন অধিকার নাই, যে একজন স্বতন্ত্র রাজার প্রতি এইরূপে প্রজানির্বাসনের আজ্ঞা করিয়া পাঠান। মালোয়ারাজ অতিশয় আশ্চর্য্য হইবেন, যদি কোম্পানির স্বদেশীয় রাজার নিকট লব্ধ চার্টরে হিন্দুস্থানের অধিরাজদিগকে এইরূপে অপমান করিবার ক্ষমতা অর্পিত থাকে।"
ইংরাজদিগের আমার প্রতি এই দ্বেষচিহ্ন প্রকাশ করা অবধি আমি জ্বলিয়া উঠিলাম। আমার তাহাদিগের অপকার করাই জীবনের প্রধান কাৰ্য্য হইয়া উঠিল। আমি সিন্ধিয়াকে বুঝাইয়া দিলাম, যে এক দল বণিক্ কত পরিশ্রম, কত ছল, কত দৌরাত্ম্য, কত অন্যায় করিয়া এক্ষণে এত প্রবল হইয়াছে। তাহারা উত্তরকালে তাঁহার উত্তরাধিকারীদিগকে হস্তগত করিতে উপেক্ষা করিবে না। আমি দেখাইয়া দিলাম, যে দেশীয় সেনা বর্তমান অবস্থায় কোন ক্রমেই ইংরাজদিগের সমকক্ষ হইতে পারিবে না; যে, তাহাদিগের সুশিক্ষা ইউরোপীয় রীতিক্রমে নির্বাহিত হইলে অতি উৎকৃষ্ট সেনা হইতে পারিবে; যে, ইউরোপীয় রীতিক্রমে শিক্ষা দিলে ফরাশিদিগকে আহ্বান করিতে হইবে, কারণ ফরাশিরা ইংরাজদিগের স্বভাবশত্রু। তাহারা এত ধূর্ততা খেলিতে পারে নাই, বলিয়া হিন্দুস্থানে প্রভুতা উপার্জন করিতে পারে নাই, নচেৎ তাহাদিগের সভ্যতা, যুদ্ধে পারদর্শিতা, সাহস ও কৌশল ইংরাজদিগের অপেক্ষা এক কেশও ন্যূন নহে, বরং অনেক স্থলে অধিক হইবে। আরও কহিলাম, যে, যদি হিন্দুস্থানের একজন প্রবল রাজা তাহাদিগকে আহ্বান করে, তবে ফরাশিরা প্রফুল্লচিত্তে তাহার কার্য্যে আপনাদিগকে ব্যাপৃত করিতে তৎপর হইবে।
আমার এই সকল প্রবোধনা সফল হইল। বরগোইন্ নামক একজন ফরাশি তাঁহার সেনাকে শিক্ষা দিতে নিযুক্ত হইল। অত্যল্প কালেই এই বন্দোবস্তের শুভ ফল দৃষ্ট হইল। সিন্ধিয়ার সেনা দেশীয় সকল রাজার অপেক্ষা সমধিক বলবান, ও শিক্ষিত হইল। সিন্ধিয়ার মহারাষ্ট্র তন্ত্রে ক্ষমতার আতিশয্য হইল। দিল্লীর সম্রাট্ তাঁহার করতলস্থ হইলেন। ফলত দেশীয় কোন নরপতিই তাহার সদৃশ প্রভাবশালী হইতে পারে নাই। তথাপি আমার অন্তরস্থ অভিলাষ সিদ্ধ হইল না। আমার বাঞ্ছা ছিল, যে একেবারে ফোর্ট উইলিয়ম দুর্গের ভিত্তিতে কামানের গোলা না লাগাইলে বৈর নির্যাতন হয় না। কিন্তু সিন্ধিয়া অসমীক্ষ্যকারী ছিলেন না। ইংরাজদিগের সহিত অন্তরে বিরক্ত থাকিলেও অকারণ বিগ্রহে প্রবৃত্ত হইতে তাঁহার অভিলাষ ছিল না। তিনি সন্ধির সুশান্ত পক্ষচ্ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ পূর্ব্বক প্রজার উপকার করণেই তৎপর ছিলেন। অতএব তাঁহা হইতে আমার দুরন্ত বৈরের নির্যাতন অসম্ভব হইয়া উঠিল। আমি তখন ক্রোধে এরূপ অন্ধ ছিলাম, যে এমন এক কার্য্যে প্রবৃত্ত হইলাম, যাহাতে যশ, মান, প্রাণ এই সকল সংশয়িত হইয়া উঠিল।
মালোয়ার রাজকুমারী চিকের অন্তরাল হইতে আমার দর্শন পাইয়া প্রণয়জালে পতিত হইয়াছিলেন, আমি শ্রুতিপরম্পরায় এরূপ শ্রবণ করিয়াছিলাম। তিনি সেই অবধি আহার নিদ্রা প্রায় পরিত্যাগ করিয়া বিরহের সম্পূর্ণ দশা ভোগ করিতেছিলেন, তথাপি স্বভাবসিদ্ধ বিনয়ের বশম্বদ হইয়া পিতা বা মাতাকে বলিতে পারেন নাই। তাঁহার পিতাও একজন বৈদেশিককে কন্যা সম্প্রদান পূর্ব্বক আপন কুলে কলঙ্ক দান করিতে সম্মত ছিলেন না। কিন্তু আমি ভাবিলাম, যে আমার অতিশয় সৌভাগ্যের কথা, রাজকুমারী স্বজাতীয় কত সুপুরুষকে উল্লঙ্ঘনপূর্ব্বক একজন অর্থহীন বৈদেশিককে পাণি দানে উৎসুক হইয়াছেন, স্বর্গে আমার নিমিত্ত অবশ্যই কিছু সঞ্চিত থাকিবে। এই ভাবিয়া স্থির করিলাম, যদি আমি গোপনীয়ভাবে দেশীয় বিধি অনুসারে বিবাহ করি, তবে সিন্ধিয়া কি ক্রোধভরে আপনার প্রিয়তম দুহিতারও সর্ব্বনাশ করিবেন? ইহা কখনই সম্ভাবিত নহে। তিনি আমার প্রতি ক্রুদ্ধ হইলেও দুহিতার অনুরোধে অবশ্যই রক্ষা করিবেন এবং তাঁহার মনোদুঃখ পরিহারার্থে অবশ্যই মহোচ্চ পদে অধিরোপিত করিবেন। এই ক্ষমতার অধিকারী হইয়া তাহার জীবন সময়ে দেশের ওমরাদিগকে অতিশয় প্রয়াস পাইয়া সন্তুষ্ট ও স্বপক্ষ করিতে চেষ্টা করিব। পরে তাঁহার পরলোক হইলে তাঁহার গৃহীত পোষ্য পুত্রকে ওমরাদিগের সাহায্যে রাজ্যভ্রষ্ট করা তাদৃশ দুঃসাধ্য হইবে না। তখন দেখা যাইবে যে হিন্দুস্থানের অত্যুৎকৃষ্ট সৈন্য লইয়া ইংরাজদিগের প্রতিকূলে কি করা যায়।
আমার এই ষড়যন্ত্রের আমার দুই জন পরমবন্ধু মারহট্টা সমুদয় জাানিত। আমি তাহাদিগকে কহিলাম, "যদি আমার এই কল্প সিদ্ধ হয়, তবে তোমরা মালোয়ার মহামাত্য হইবে। যদি ব্যর্থ হয়, তাবে নিঃসংশয় থাকিও, যে কাটিয়া কাটিয়া লবণই দিউক, নখের ভিতর পেরেক্ই চালাক, তোমাদের নামোচ্চারণ বিষয়ে আমার অধর হীরাকষ দ্বারা মাঁটা থাকিবে।" এই কথা বলিয়া কিরূপে পুরোহিতের আনয়ন করিবে, কোথায় বিবাহ হইবে, রাজকুমারী বিবাহের সময় কিরূপ ছদ্মবেশ অবলম্বন করিবেন ইত্যাদি উপদেশ দিয়া সন্ধ্যাগমে রাজকুমারীর অন্তঃপুরাভিমুখে গমন করিলাম, পথে যাইবার সময় আমার চরণদ্বয় যেন পশ্চাৎ সরণ করিতে লাগিল। আমি কখনও কোন কর্ম করিতে ভয় পাই নাই, কিন্তু এবার যেন কে আমাকে যাইতে নিষেধ করিতেছে এইরূপ ভাবিতে লাগিলাম। যে কেহ আমার পশ্চাতে আসে, সেই যেন ধরিতে আসিতেছে, এইরূপ মনে হইতে লাগিল। পেচক বালকদিগের ন্যায় চীৎকার করিয়া আমায় কম্পবান্ করিল। একটু কিছু নড়িলেই চকিত হইতে লাগিলাম। আমার বস্ত্রের অভ্যন্তরে একখানি দড়ির মই ছিল। তাহার এক প্রান্তে দুইটা আংটা ছিল। পাছে কেহ দেখিতে পায় এই ভয়ে আমার ঘাম হইতে লাগিল। সন্ধ্যার পরেই কৃষ্ণপক্ষের নিশার ঘোর অন্ধকার জগতকে আবরণ করিল। আমি কত প্রবোধ দিয়া মনকে সাহসযুক্ত করিলাম, কিন্তু আকাশে যেন কে আমাকে কত তিরস্কার করিতেছে এইরূপ বোধ হওয়াতে সমুদয় উৎসাহ জল হইয়া গেল। এইরূপে আমি খিড়কীর উদ্যানের পুরুষদ্বয় পরিমাণ উচ্চ প্রাচীর কাঁপিতে কাঁপিতে উল্লঙ্ঘন করিলাম। বাগানে প্রবেশ করিবামাত্র এক বৃহৎ জ্যোতির্মণ্ডল আমার নয়নকে আঘাত করিল। দেখিলাম রাজতনয়ার প্রাসাদ পরমোজ্জল শোভা ধারণ করিয়াছে। অপাবৃত বাতায়ন দ্বারা প্রভা নির্গত হইয়া বৃক্ষদিগের পত্র পর্যন্ত রঞ্জিত করিয়াছিল। পেচকের পক্ষে সূর্যালোকের ন্যায় আমার এই আলোক বিষাদজনক হইল। সেই সময়েই মধ্যে প্রবেশ করিতে সাহস হইল না। এক ঝোপের ভিতর শঙ্কাকম্পিত চিত্তে লুক্কায়িত থাকিলাম। উঃ, তখন আমার এক মুহূর্তও যুগের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। আমি পাপ সম্পূর্ণরূপে না করিয়াই তাহার ফলভোগ করিলাম। সেই সময়ের কন্ঠ কি আমি বাক্যে বর্ণন করিতে পারি? যত উদ্বেগ, যত শঙ্কা, যত বিষময় ভাবনা আমার হৃদয়কে চর্ব্বণ করিতে আরম্ভ করিল, তাহাদের ভয়ানক স্বরূপ কি শব্দ দ্বারা অন্যের হৃদয়ঙ্গম করা যায়। চারি দিকের মধুর সৌরভ আমার অসহ্য হইল। আমি পরম রমণীয় শোভায় দৃষ্টিপাত করিতে কষ্টবোধ করিতে লাগিলাম। আমার তখন বিলক্ষণ বোধ হইল যে মানুষের সুখ ও দুঃখ মনের অবস্থারই অনুসারী। তথাপি পাপের পথ এমনি পরিষ্কার ও মসৃণ, যে একবার তাহাতে পদার্পণ করিলে প্রত্যাগমন করিতে পার না। দুরাচার পাপপিশাচ তোমাকে কত সাদরে আলিঙ্গন করিবে, কত প্রণয় দেখাইবে, তুমি তাহার বাহ্য মাধুর্য্যে মোহিত না হইয়া থাকিতে পার না। পরিশেষে যখন একেবারে বিনিপাতের গর্ভে ক্ষিপ্ত হও তখন তোমার অনুতাপ উপস্থিত হইয়া গাত্র জর্জরীভূত করে, মন নীরস করে এবং তীক্ষ্ণরূপে কশাঘাত করিতে থাকে। আমি তখনও নিবৃত্ত হইলে কিছু মাত্র ক্ষতি হইত না। কিন্তু দুঃপ্রবৃত্তি সমধিক বলবতী, আমাকে যেন বাঁধিয়া রাখিল।
নিশীথ সময় উপস্থিত হইল। আমি গোপন স্থান হইতে বহির্ভূত হইয়া আকাশে দ্যোতমান তারাবলী দেখিলাম। তাহারা যেন আমার কার্য্য দেখিবার নিমিত্ত চিক্ চিক্ করিতেছিল। পর্ব্বতের শীতবাত হুহু শব্দ করিয়া আমার মুখে লাগিয়া যেন দুষ্কার্য্য হইতে নিবৃত্ত করিতে লাগিল। আমি এই অচেতন পদার্থের বারণ না শুনিয়া রাজকুমারীর জানালায় উঠিলাম। সমুদয় নিস্তব্ধ ছিল, সকল আলোক নির্বাণ হইয়াছিল, কেবল একটিমাত্র প্রদীপ সুপ্ত নৃপতনয়ার মুখে আপনার প্রভাজাল ছড়াইয়া দিতেছিল। আমি এক উচ্চ পর্য্যঙ্কে শয়ান রাজকুমারীর শরীর দর্শন করিয়া যেন জড়ীভূত হইয়া গেলাম। সেই ভক্তিযোগ্য রূপ দর্শন করিলে মনে কোন প্রকার অসং প্রবৃত্তির আবির্ভাব হয় না। আমার সেই আকারকে যেন অলৌকিক জীব বোধ হইল। পবিত্রতা যেন মূর্ত্তিমতী হইয়া আমা হইতে ভক্তির আকর্ষণ করিতে লাগিল। এরূপ মহিমা, এরূপ কান্তিচয়, এমন অধর্ষনীয়তা কখন দেখি নাই। তাঁহার রূপ মধুর, তথাপি মনে এক প্রকার সম্ভ্রমের উৎপাদন করে। তোমার বোধ হইত না, যে এ পদার্থ অন্য লোকের উপাদানে নিশ্চিত অথবা পার্থিব শোক, তাপ ও রিপুর বশম্বদ। আমি চকিত হইয়া ক্ষণকাল এই মনোহর বস্তু নিধ্যান করিতে লাগিলাম। আমার সমুদয় মালিন্য, সমুদয় অসদাশয় দূরীভূত হইল। এই সময়ে রাজতনয়া জাগরিত হইয়া আমি যে জানালায় ছিলাম, অকস্মাৎ সেই দিকেই দৃষ্টিপাত করিলেন, আমাকে দেখিতে পাইয়াই কোপ-প্রস্ফুরিতাধরে কহিলেন "দুরাত্মন্, আমি তোর অভিসন্ধি অনেক দিন জানিতে পারিয়াছি। তুই মনে করিয়াছিলি, যে এরূপ কৃতঘ্ন দুরাচারকে এক মারহাট্টা অবলা পানি দান করিবে। যাহার শিরায় শিবাজীর রক্ত বহিতেছে, সে এই চারিত্রভ্রংশকর কায্যে প্রবৃত্ত হইবে? আমি তোকে ভাল বাসিয়াছিলাম, কিন্তু এক্ষণে বুঝিলাম, তুই আমার প্রীতির নিতান্ত অযোগ্য। তথাপি আমি মহানুভাবতা গুণে বলিতেছি, যে এই দণ্ডেই পলায়ন কর, নচেৎ আগামী দিনের সূর্য্য তোকে এইখানে দেখিলে মালোয়া রাজ্য তোর কলঙ্কিত রুধিরে কলুষিত হইবে।” এই বলিয়া পাথেয়স্বরূপ হস্তের এক আভরণ উন্মোচন করিয়া দিলেন। আমি কাঁপিতে কাঁপিতে গ্রহণ পূর্ব্বক তৎক্ষণাৎ উদ্যান হইতে বহির্গত হইলাম।
আমার তখন প্রাণভয়ই প্রবল প্রবর্তনা হইল। সেই রাত্রেই ঊর্দ্ধশ্বাসে পূর্ব্বাভিমুখে চলিতে আরম্ভ করিলাম। তখন আমার মনে বিস্ময়, ভয় ও দুঃখের পরস্পর যুদ্ধ হইতে লাগিল। আমি সর্ব্বসাধারণ পথ পরিত্যাগ পূর্ব্বক বিন্ধ্যপর্ব্বতের পাদবর্তী মহারণ্যে প্রবেশিলাম। আমার আরণ্য পশুর ভয় কিছুমাত্র ছিল না। যদি কোন হিংস্র জন্তু আমাকে মানসিক যাতনা হইতে মুক্ত করিতে আসিত, তাহা হইলে আমি অতিশয় আহ্লাদের সহিত আমিষপিণ্ডের ন্যায় আপনার শরীর তাহার নিকট উপনীত করিতাম। যখন আমি অরণ্যে প্রবেশ করিলাম, তৎকালে রাত্রির অবশেষ ছিল। কাননের সূচীভেদ্য অন্ধকার আমার নিকট স্বাগতীকৃত হইল। আমি কিছুমাত্র গণনা না করিয়া পত্রবনের মধ্যে চলিয়া যাইতে লাগিলাম। কতদূর যাইয়া অতিশয় শ্রান্তি বোধ হইল। রাশীকৃত শুষ্ক পর্ণের উপর শয়ন করিয়া সর্পের ক্ষায় দুশ্চিন্তা দ্বারা দহ্যমান হইতে লাগিলাম।
প্রভাতের সহিত পক্ষীরা কলরব করিয়া উঠিল। সেই গহন কাননে মধ্যাহ্নকাল ব্যতীত অন্য কোন সময়েই সূর্যকিরণ প্রবেশ করে না। আমার সেই সময়ে আবার জীবনতৃষ্ণা প্রবল হইল। গত রাত্রে কত আশা করিয়াছিলাম, রাজকুমারীর পাণিগ্রহণ করিব, মালোয়া রাজ্যের একজন সম্ভ্রান্ত লোক হইব, হয়ত এক সময়ে সিংহাসনেও অধিরোহণ করিব। হা পরমেশ্বর, প্রভাতে ক্ষুধার শাস্তির নিমিত্ত ইতস্তত বিচরণ করিতে হইল! দেব, তুমি এইরূপেই মানুষের ভাগ্য লইয়া খেলা কর! আমি বনফল অন্বেষণার্থে চারি দিকে নয়ন প্রয়োগ করিতে লাগিলাম। ক্ষণকাল পরে এক প্রকার দুর্গন্ধ অনুভূত হইল। আমি কারণ জানিবার নিমিত্ত অতিশয় কৌতুকযুক্ত ও উদ্বিগ্ন হইলাম। কিন্তু পশ্চাদ্ভাগে দৃষ্টিপাত করিবামাত্র আস্ত মানুষ গিলিতে সমর্থ এক ব্যাঘ্র ওত পাতিয়া বসিয়া আছে নয়নগোচর হইল। আমি ভয়ে লাফাইয়া উঠিলাম। ব্যাঘ্র চক্ষু লাল করিয়া এক ভয়ানক গর্জন ছাড়িল, পদাগ্রে পৃথিবী বিদীর্ণ করিল, এবং লাঙ্গুলে চড়াৎ করিয়া মৃত্তিকায় আঘাতপূর্ব্বক আমার অভিমুখে উল্লম্ফ প্রদান করিল। আমি শশব্যস্তে হাতে আর কিছু না থাকাতে, রাজকুমারীর প্রদত্ত অলঙ্কারখানি স্বভাবত ছুঁড়িয়া দিলাম। শার্দুল মহাকোপে আমার দিকে আসিতেছিল, অকস্মাৎ অলঙ্কারের চাকচিক্য দেখিয়া চমকিয়া উঠিল এবং নখদ্বারা ধারণপূর্ব্বক দন্তে রাখিয়া ভাঙ্গিয়া ফেলিল। আমি এই অবকাশে পাঁচ হাত অন্তরস্থিত বটবৃক্ষে যাইয়া উঠিলাম। তাহার জটাসমূহ স্তম্ভাকারে মৃত্তিকাতে বদ্ধমূল হওয়াতে বৃক্ষ এক থিয়েটরের সদৃশ হইয়াছে। আমি আপাতত হিংস্রের দশন হইতে রক্ষা পাইলাম ভাবিয়া রাজকুমারীর ঔদার্য্যগুণে ধন্যবাদ করিতে লাগিলাম। শার্দ্দল আপনার উপহার পলায়ন করিল দেখিয়া গলরন্ধ হইতে এক প্রকার গদগদ চীৎকার আবিষ্কৃত করিল। "কতক্ষণ থাকিতে পারিস্, থাক্ এই বলিতেই যেন আমার প্রতি জ্বলিত দৃষ্টি প্রক্ষেপ করিল। আমি ক্ষুধায় জর্জর হইয়া সেই বটশাখায় বসিয়া রহিলাম। ব্যাঘ্রও বৃক্ষতল হইতে একটুও নড়িল না। ক্ষুধাতৃষ্ণা সহ্য করিয়া পলায়িত শীকারের শীর্ষ চর্ব্বণ করিবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করিয়া উপবিষ্ট থাকিল। এক একবার তাহার ক্রোধহুঙ্কার দিগদিগন্ত পূর্ণ করিতে লাগিল।
আমি তাহার দৃঢ় নিশ্চয় দেখিয়া মনে করিলাম, যে বর্ব্বরের নখর হইতে রক্ষা পাইয়া ক্ষুধার মর্মভেদক যন্ত্রণায় বুঝি প্রাণত্যাগ করিতে হইল। সেই অহোরাত্র এইরূপ অতিবাহিত হইল। ব্যাঘ্র তথাপি স্থান ছাড়িয়া গেল না। এত বিলম্ব হইতেছে বলিয়া তাহার যেন কোপের আরও বৃদ্ধি হইতে লাগিল। আমি তাহার ভীষণ দৃষ্টিপাত ও নিষ্ঠুর দন্ত কড়মড়ি সহ্য করিতে না পারিয়া আপনাকে পত্রজালের ভিতর লুক্কায়িত করিলাম। আমার তখন অনাহারজনিত সাতিশয় কষ্ট হইতে আরম্ভ হইল। গাত্র স্রস্ত হইতে লাগিল, শরীর নিতান্ত দুর্বল হইল। ভাবিলাম, দৌর্বল্যে শাখার উপর থাকিতে অসমর্থ হইয়া ব্যাঘ্রের মুখগহ্বরে পতিত হইব। এইরূপ মনে করিতেছিলাম, এই সময়ে অকস্মাৎ "গোঁ গোঁ” ইত্যাকার শব্দ শ্রবণগোচর হইল। আমি বহির্ভূত হইয়া দেখিলাম, ব্যাঘ্রের উদর হইতে ফিল্কি দিয়া রক্ত ছুটিতেছে। সে অতি যাতনায় এপাশ ওপাশ করিতেছে এবং পূর্ব্বোক্ত প্রকার শব্দ করিতেছে। ক্ষণকাল পরে তাহার শরীর ক্রমে চাঞ্চল্য পরিত্যাগ করিতে লাগিল। হাঁ করা মুখ মাটিতে স্রস্ত হইয়া পড়িল। গল হইতে একটু একটু হুঙ্কার নির্গত হইতেছিল। তাহার লাঙ্গুল এক একবার ধরণীতে আছড়াইতেছিল। কিয়ৎকালানন্তর তাহার সমুদয় জীবনচিহ্ন অন্তর্হিত হইল। অমনি তৎক্ষণাৎ এক কৃষ্ণকায় পুলিন্দ কর্ণকঠোর আক্রন্দের সহিত লতাবন হইতে রূপাণিকা করে লাফাইয়া পড়িল। তাহার শ্যাম গণ্ডস্থল নানাবিধ গিরিমৃত্তিকার বর্ণে রঞ্জিত হইয়া শ্বেত, নীল ও রক্ত কমলে আচ্ছন্ন কালিন্দীজলের শোভা ধারণ করিয়াছিল। তাহার শিরস্থিত রক্তষ্ণিষে এক ময়ূরপুচ্ছ সন্নিবেশিত হইয়া কদলীপত্রের ন্যায় হেলিয়া পড়িয়াছিল। তাহার অপাঙ্গ সিন্দুরে লোহিত হইয়া এক ভয়ানক জ্যোতি প্রক্ষেপ করিতেছিল। দুই পার্শ্ববত্তি তৃণীরদ্বয় হইতে কঙ্কপত্র বহির্ভূত দেখা গেল। গুণযুক্ত ধনুকখানি স্কন্ধে নিক্ষিপ্ত ছিল, পরিধান এক কৌপীন। তাহার সর্ব্বাদ পাষাণের ন্যায় দৃঢ় বোধ হইল। সে করস্থিত রূপাণিকা দ্বারা ব্যাঘ্রের শীর্ষ দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন করিল। তৎক্ষণাৎ পূর্ণ ভিস্তির ছিদ্র করিয়া দিলে জল যেমন বেগে নির্গত হয় সেইরূপ এক রুধিরস্রোত বহির্গত হইয়া পুলিন্দের মসীসদৃশ হস্ত সিন্দুরময় করিল। পরে সে ব্যাঘ্রের চর্ম পৃথক্ করিতে প্রবৃত্ত হইল। সেই সময়ে এক জীর্ণ পর্ণ বৃত্ত হইতে স্রস্ত হইয়া তাহার মস্তকে পড়িল। সে চমকিয়া উপর দিকে দৃষ্টিপাত করিবামাত্র আমাকে দেখিতে পাইল। অমনি ক্ষিপ্র-[৪৩]হস্ততা প্রদর্শনপূর্ব্বক ধনুকে বাণ যোজনা করিল। আমার স্বর ক্ষুধায় অতিশয় ক্ষীণ হইয়াছিল, তথাপি যত পারিলাম, তত উচ্চগলা করিয়া কহিলাম, "আমায় মারিও না, মারিও না, আমি শরণাগত, আমি অতিথি।” ইহা শুনিয়াই বাণ সংহার পূর্ব্বক অবতীর্ণ হইতে ইঙ্গিত করিল। আমি তাহার আহ্বানানুসারে নামিয়া তাহার পার্শ্বে দণ্ডায়মান হইলাম এবং সাতিশয় ক্ষুধা প্রকাশ করিলাম। সে তৃণের অভ্যন্তর হইতে তিন আঙ্গুল পুরু, ঘুঁটের অগ্নিতে দগ্ধ এক ময়দার পিণ্ড প্রদান করিল। আমার এক দিন আহার হয় নাই অতএব এই খাদ্য নিতান্ত ঘৃণিত হইল না। আমি প্রকৃত ঔদরিকের মত খাইতে লাগিলাম।
তাহার ব্যাঘ্রচর্ম পৃথক্ করণ শেষ হইলে আমাকে অনুগামী হইতে আদেশ করিল। জঙ্গলের মধ্য দিয়া তাহার সঙ্গে কতক দূর গমনপূর্ব্বক কতকগুলি কুটার দেখিতে পাইলাম। প্রত্যেক কুটারই এক প্রকাও তরুর ছায়ায় অবস্থিত। চারি দিক্ দেবদারুবনে বেষ্টিত। তাহাদিগের তমোময় আভা চিন্তাপ্রবণ মানসে অনেক ভাবনার উদয় করিতে সমর্থ, এক এক আরণ্য লতা উগ্রগন্ধ বৃহদাকার পুষ্পমণ্ডলে মণ্ডিত হইয়া দেবদারুকে আলিঙ্গন করিয়াছে। অধিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাঘ্র, অথবা বন্য-বরাহের উপদ্রব নিবারণার্থ অখণ্ড বংশদ্বারা রচিত প্রায় দশ বার হস্ত উচ্চ এক বৃতি আছে। এই বৃতির স্থানে স্থানে এক এক সাধারণ প্রবেশ ও নিষ্ক্রমণের পথ আছে। পুলিন্দ আমাকে লইয়া আপনার পরিবারের নিকট অতিথি বলিয়া পরিচয় দিলেন। অসভ্যাবস্থ লোকদিগের আতিথেয়তা এক প্রধান ধৰ্ম্ম। এমন কি, অতিথিকে বাস দিবার নিমিত্ত তাহারা কখন কখন প্রতিবেশীর সহিত কলহে প্রবৃত্ত হয়। তাহার পরিবারেরা আমার আগমনে অতিশয় আহলাদ প্রকাশ করিতে লাগিল। পুলিন্দের যুববয়স্ক দুহিতারা অবাধে আমার সমীপে আসিয়া কেহ আমার কেশকলাপে স্থূল কৃষ্ণ অঙ্গুলি দিয়া খেলা করিতে লাগিল, কেহ আমার গাত্রবস্ত্র পরীক্ষা করিতে লাগিল, কেহ বা আমার হাত লইয়া অঙ্গুলিস্থিত অঙ্গুরীয়কের হীরকপ্রভা দেখিতে লাগিল। তাহাদিগেরও প্রায় সর্ব্বাদ নগ্ন, কেশ অতি নীল, অধর সাতিশয় স্কুল ও সিন্দুর দ্বারা বিশ্বের মত লাল। পুলিন্দ আমাকে কহিল, "তুমি অতিথি হইয়াছ। আপনার গৃহের ন্যায় আমাদিগের নিকট অবস্থান কর, তোমার কিছুমাত্র শঙ্কা নাই" এই বলিয়া চলিয়া গেল। তাহার পত্নী ও দুহিতারা মৃগমাংস ও ভাত খাইতে দিল। আমি তাহা খাইয়া সেদিন তাহাদিগের একটি কুটারে বিচালির শয্যায় শয়নপূর্ব্বক ব্লাত্রিপাত করিলাম।
পরদিন প্রাতে সেইী অধিষ্ঠানের দলপতি আমাকে দেখিতে আইলেন। আমি তাঁহাকে আমার ইংরাজদিগের নিকট হইতে ভয় বিজ্ঞাপন করিলাম এবং বিশেষ কহিলাম, যে তাহাদিগের রাজ্যে আমায় জানিতে পারিলে কারারুদ্ধ করিবে। তিনি কহিলেন, "তোমার এই স্থান হইতে যাইবার কোন প্রয়োজন নাই, তুমি চিরকাল আমার আতিথেয়তার উপর নির্ভর করিতে পারিবে। কোম্পানির সেনা কোন কালে এখানে প্রবেশ করে না।" এই কথা বলিয়া আমাকে তাঁহার গৃহে লইয়া চলিলেন, যাইবার সময় পুলিন্দের দুহিতারা কতবার তাহাদিগের মসীময় দেহ আমার শরীরের সহিত সংসৃষ্ট করিল এবং দলপতির আজ্ঞা অনুল্লঙ্ঘনীয় ভাবিয়া বিষন্নমুখ হইল। দলপতির গৃহে আসিয়া দেখিলাম, যে তাঁহার দলপতিত্বের চিহ্ন কেবল তাঁহার পরিবারের গাত্রে কতগুলি লৌহাভরণ ও ময়ূরপুচ্ছের আধিক্য। যোড়শবর্ষবয়স্কা তাঁহার এক দুহিতা ছিল। তাহার বেশভূষণ দর্শন করিয়া আমি অতিকষ্টে হাস্য সম্বরণ করিলাম। ময়ূরপুচ্ছ হইতে পালক তুলিয়া অতিস্ফীত কপোলে বসাইয়া দিয়া বিচিত্রিত করিয়াছে। তিসীপুষ্প সদৃশ দুই উরুতে লোহিত বসন জড়ান আছে। সম্পূর্ণরূপে পরিবৃদ্ধ স্তনদ্বয় চুচুক ব্যতীত সর্ব্বাগ্রে সিন্দুরাক্ত হইয়া ঠিক্ দুই বৃহৎ গুঞ্জাফলের মত দেখিতে হইয়াছে। শীর্ষস্থ কেশপাশ ঘাড়ে এক খোঁপা বাঁধা আছে। তাহাতে দুটি একটি পুষ্পও প্রদত্ত হইয়াছে। বেগুনের মত সর্ব্বাঙ্গ চিকণ। তাহার এই রূপের দাস হইয়া কত কৃষ্ণকায় প্রণয়ী প্রতিদিন সাক্ষাৎকার লাভার্থ আসিয়া হতাশে ফিরিয়া যাইত। তাহার গর্ব্ব দেখিলে মনে হইত, বুঝি সে আপনাকে সকল স্ত্রী অপেক্ষা সুরূপা মনে করে। আমি তাহাদের বাটীতে যাইবামাত্র সে দৌড়িয়া দেখিতে আইল এবং আপনার প্রেমকিঙ্করদিগের প্রতি ভ্রূক্ষেপও না করিয়া পিতার সম্মুখেই আমাকে বাহুদ্বারা বেষ্টন করিল এবং বারম্বার আমার কপোলে অধর ঘর্ষণপূর্ব্বক এরূপ ঘৃণা জন্মাইয়া দিল যে আমার মনে হইল, পালাইতে পারিলে বাঁচি।
দলপতি তাহাকে অপসৃত হইতে আজ্ঞা প্রদানপূর্ব্বক কহিলেন, "এই আমার গৃহ। তুমি সন্তানের ন্যায় প্রতিপালিত হইবে। তুমি আমাদিগের ব্যবসায় ও কাৰ্য্য শিক্ষা কর, তোমার কোথাও যাইবার প্রয়োজন নাই।” আমি, জন্তুর শুভাশুভ বিধানে ভবিতব্যতা দেবীরই প্রভুতা জানিয়া, শিরঃকম্পন দ্বারা তাহার প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করিলাম এবং সেই অবধি পুলিন্দদলভুক্ত হইয়া বাণ শিক্ষা, লম্ফ প্রদান, বৃক্ষারোহণ, বৃতি নির্মাণ, লতারজ্জু রচন প্রভৃতি আরণ্য জনের প্রয়োজনোপযোগী শিল্প শিক্ষা করিতে লাগিলাম। পুলিন্দদিগের সহিত মৃগয়ায় যাইতাম, নিকটবর্তী হ্রদে নৌকাবাহন দ্বারা মৎস্য ধরিতাম, কুম্ভীরের ন্যায় জলে সন্তরণ করিতাম, বরাহের অনুসরণে ন্যগ্রোধ বৃক্ষের কোটরে বিলীন হইতাম, তথাকার ভুজঙ্গমের সবিষ মুখ হস্তদ্বারা নিপীড়ন পূর্ব্বক অতি দূরে নিক্ষেপ করিতাম, উড্ডীন ময়ূরের প্রতি শরক্ষেপ পূর্ব্বক ভূতলে পাতিত করিতাম, পর্ব্বতপৃষ্ঠে আরোহণ পূর্ব্বক জল-প্রপাতের কল্লোলশব্দ শুনিতে শুনিতে মৃগয়ার যোগ্য পশু অন্বেষণ করিতাম, সরল নামক দেবদারুর ধুনার দিগন্ত বিস্তৃত সৌরভে আমোদিত হইয়া বনে বিচরণ করিতাম, এবং নিহত পশুর ভার স্কন্ধে বহন পূর্ব্বক ক্ষুদ্র শৈলের শাম্বলময় পার্শ্বদেশ হইতে অবতীর্ণ হইতাম। অতি অল্পকালের মধ্যেই আমার আচার ও রুচি পুলিন্দদিগের সদৃশ হইল। আমার ক্রীড়াও সেই অসভ্য জাতিদিগের অনুরূপ হইয়া উঠিল। হ্রদের চারি ধারে বাঁশ, ঝাউ, দেবদারু প্রভৃতি তরু দ্বারা বেষ্টিত। তাহাদিগের প্রতিবিম্ব হ্রদগর্ভে অধোমুখ ভাবে পতিত হইয়া এক গরীয়ান্ দর্শনীয় পদার্থ হইত। আমি এক শাখার উচ্চ অগ্রে উপস্থিত হইয়া ঝুপ্ কিরিয়া জলে ঝাঁপ দিতাম। কত গভীর জলে তলাইয়া গিয়া পুনর্ব্বার অনেক দূরে উত্থান পূর্ব্বক সকলকে বিস্মিত করিতাম। কখন বা দেবদারুর সর্ব্বোচ্চ শাখায় দোলা খাটাইয়া এপার ওপার করিয়া দোল খাইতাম। কখন কৌশল প্রদর্শনার্থ ভারাসহ ক্ষুদ্র ডালে দাঁড়াইতাম, এবং তাহা বিভগ্ন হইয়া পড়িতে না পড়িতে উর্দ্ধস্থ আর এক শক্ত শাখা অবলম্বন পূর্ব্বক ঝুলিয়া পড়িতাম। এইরূপে আমি একজন প্রকৃত পুলিন্দ হইয়াছিলাম। আমার শরীর শীতাতপের পরিবর্ত সহ্য করিয়া বিলক্ষণ কষ্টসহ ও সবল হইয়াছিল, বর্ণ অনেক মলিন হইয়াছিল, এবং খর্ব্বকায়দিগের অপেক্ষা প্রাংশু দেহ থাকাতে আমার তাহাদিগের নিকট অতিশয় গৌরব ও শোভা হইত। প্রতি পুরুষ আমাকে দলপতির প্রিয়পাত্র জানিয়া অনুগ্রহাকাঙ্ক্ষী হইতে বাসনা করিত, প্রতি অবলাই দীর্ঘকায় ও শ্রীযুক্ত আকার দেখিয়া প্রণয় প্রকাশ করিতে ব্যগ্র হইত।
আমি এইরূপ ক্ষমতাসহকারে বহুকাল পুলিন্দ সমাজে বাস করিতে পারিতাম, এমন কি সংসারের আস্বাদ গ্রহণ পূর্ব্বক আমার চিত্তের এক দিনের নিমিত্ত সভ্য সমাজে যাইতে ঔৎসুক্যমাত্র ছিল না এবং আমি মনে করিয়াছিলাম, যে এই সকল সরলহৃদয় প্রাকৃতিক মনুষ্যের নিকট সুখে জীবন ক্ষেপ করিব। কিন্তু দলপতিদুহিতার রূপগন্ধ আমার তথায় বাস করিবার সকল আশা উচ্ছেদ করিল। সে মনে করিয়াছিল, যে আমি তাহার রূপে অবশ্যই মোহিত হইব এবং তাহার নিকট প্রণয় যাচ্ঞা করিব। কিন্তু সে মনোরথ সিদ্ধ না হওয়াতে স্বয়ং, আমাকে বিরক্ত করিতে আরম্ভ করিল। প্রতিদিন আসিয়া আমার কাছে বসিত, আমার গালে দুই হাত বুলাইয়া দিত, এক একবার বাহুদ্বারা বেষ্টন করিত এবং আরও কত কি অনুরাগের চিহ্ন প্রকাশ করিয়া আমার চিত্তকে রুগ্ন করিত। আমি আপনার সমুদয় ধৈর্য্যের আহ্বান পূর্ব্বক এই সকল উৎপাত সহ্য করিতাম। পরিশেষে নিতান্ত বাড়াবাড়ি হইল। সে আপনার জনক সন্নিধানে আমার সহিত বিবাহের প্রস্তাব তুলিল এবং আমার ধৈর্য্যকে প্রণয়ের চিহ্ন মনে করিয়া দশগুণ করিয়া বলিল। তিনি আমাকে অতিশয় স্নেহ করিতেন, তাঁহার মনে এইরূপ ইচ্ছা বহুদিন অবধি ছিল, কিন্তু দুহিতার ইচ্ছা না জানিলে আপনি বিবাহের কথা তুলিতে অসম্মত ছিলেন। এখন তাহারই সাতিশয় আগ্রহ দেখিয়া কালবিলম্ব ব্যতিরেকে সম্মতিদান ও দুহিতার অভিরুচির প্রশংসা করিলেন। বিবাহের উদ্যোগ আরম্ভ হইল। অন্যান্য স্থান হইতে নিমন্ত্রিতেরা উপস্থিত হইতে আরম্ভ হইল। আমার এই বিপদের সময় কিছু উপায় স্থির করিতে না পারিয়া পলায়নমাত্র পরায়ণ দেখিলাম। কিন্তু অরণ্যে একাকী কিরূপে পলাইব, কোথায় যাইব, এমন কোন স্থানই আছে, যথায় ইংরাজেরা আমাকে স্বহস্তগত করিবেক না। এই সকল চিন্তায় মহা ব্যাকুল হইলাম। দৈবক্রমে এই কালে অনাহূত হইয়া এক উপায় উপস্থিত হইল।
বিবাহে নিমন্ত্রিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আর এক জন প্রবল দলপতির তরুণবয়স্ক তনয় আসিয়াছিল। সে প্রথমে আমার ভাবিনী বধূর পাণিগ্রহণে সাতিশয় ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিল এবং এমন আশাও পাইয়াছিল, যে সেই এক সময়ে তাহার বর হইবে। কিন্তু এক্ষণে এক জন নবাগত বিজাতীয়কে স্বয়ংবৃত দেখিয়া স্বভাবতই অসন্তুষ্ট ও আমার মহাবিদ্বেষী হইল। আমি নানা বাহ্য চিহ্নে তাহার মনের ভাব অবগত হইয়া তাহাকে কহিলাম, যে "নির্জনে তোমার এক প্রিয় নিবেদন করিব।” পরে সন্ধ্যার প্রাক্কালে এক লতাকুঞ্জে দুই জনে প্রবেশ পূর্ব্বক তাহাকে কহিলাম, "চিদ্র, তোমার প্রিয়ার পাণিগ্রহণ করিতে আমার কিছুমাত্র অভিলাষ নাই। নিরুপায় ভাবিয়া আমি সম্মতি প্রদর্শন করিয়াছি। যদি তুমি কোন পলায়নের উপায় করিয়া দিতে পার, তাহা হইলে তোমাকে চিরকাল সর্ব্বশ্রেষ্ঠ মিত্র মনে করিব। কিন্তু ইহা স্মরণ রাখ, যে ইংরাজ রাজ্যে জ্ঞাতভাবে বাস করিবার আমার পথ নাই।” আমি অতি ধীর ও অমায়িকভাবে এই বাক্য উচ্চারণ করিলাম। কিন্তু সে আমার তাদৃশ সুরূপার পরিত্যাগহেতু বুঝিতে না পারিয়া বিস্মিত এবং আমি বারম্বার তাহাকে কহিলে আহ্লাদিত হইল। পরে কহিল, "তোমার এই স্থান হইতে অপসরণের বিলক্ষণ সুবিধা করিয়া দিতে পারি। এই পূর্ব্বপশ্চিমে আয়ত বিন্ধ্যাটবীর অনেক ভাগ আমাদিগের জাতীয় লোকের অধ্যুষিত আছে। এই সকল অধিষ্ঠানের পরস্পর বিরোধ থাকিলেও অতিথির কার্য্য সম্পাদন করিতে কেহ এক মুহূর্তকাল পরাঙ্মুখ হয় না। তথাপি তোমার আমাদিগের জাতির সহিত সহবাস জানিলে, তোমার ভাবী শ্বশুর আমি বোধ করি, তথাকার জঙ্গলে e এরূপ অবমানিত হইয়া কখন ক্ষমা করিবে না। উড়িষ্যার সমীপে ছদ্মবেশে বাস করা পরামর্শসিদ্ধ। অনেক আরণ্য জাতি বাস করে, তুমি তাহাদিগের দলভুক্ত হইলে ইংরাজেরা কোন কালে তোমার অনুসন্ধান পাইবে না। তোমার তথায় যাইবার ভাবনা নাই, প্রত্যেক অধিষ্ঠানের এক জন পথদর্শক তোমাকে তাহার পূর্ব্বদিকস্থিত অধিষ্ঠানে রাখিয়া আসিবে। এইরূপে কয়েক দিনের মধ্যেই তুমি বিন্ধ্যাটবীর পূর্ব্ব প্রান্তে উপস্থিত হইবে এবং তথায় আপনার বাসস্থান মনোনীত করিয়া লইবে।” আমি এই পরামর্শে তৎক্ষণাৎ সম্মত হইয়া "পরদিন প্রাতঃকালে দুই জনে দুই দিক্ হইতে বহির্গত হইব এবং এই লতাকুঞ্জই সংগতিস্থল হইবে" এই স্থির করিয়া গৃহে প্রত্যাগমন করিলাম। আমার উদ্বিগ্নচিত্তের সে দিবস বিশ্রাম হইল না। সারা রাত্র আপনার নিয়তির ঈদৃশ বৈষম্য ভাবিতে ভাবিতে কালাপনয়ন করিলাম।
পূর্ব্বদিক্ ঈষৎ লোহিতবর্ণ হইলেই আমি গাত্রোত্থান পূর্ব্বক পূর্ব্বনিদিষ্ট লতাকুঞ্জে যাইয়া দেখিলাম, দলপতিতনয় আমার নিমিত্ত অপেক্ষা করিতেছেন। তৎক্ষণাৎ তরুগণের অন্ধকারে গুপ্ত থাকিয়া আমরা যাত্রা করিলাম। তখন সম্যক্ আলোকোদয় হয় নাই। বনের স্তব্ধভাব অতি রমণীয় ছিল। দুটি একটি ঊযাগায়ক পক্ষী শাখায় এক পদে অবস্থিত হইয়া মাধুর্য্য বর্ষণ করিতেছিল। আমাদিগের পথের দুই ধারে ঝাউ ও দেবদারু গাছ ছিল। প্রাভাতিক পরিশুদ্ধ বায়ু তাহাদিগের ভিতর দিয়া ঝর্ ঝর্ করিতে করিতে শয়নোত্তপ্ত দেহ শীতল ও উজ্জীবিত করিতেছিল। হ্রদের বারি সুস্নিগ্ধ ও শান্তভাব অবলম্বন করিয়া যেন সাক্ষাৎ মহিমা মূর্তিধর হইয়া নিদ্রাকালীন স্থির-ভাবের নিদর্শন দেখাইতেছিল। দলপতিকুমার এমন মনোরম স্থানে প্রায় তিন ক্রোশ পথ আমার সহিত আসিয়া আর এক অধিষ্ঠান হইতে আমাকে এক জন পথদর্শক করিয়া দিলেন। তথায় প্রাতরাশ নির্বাহণ পূর্ব্বক পুনর্ব্বার চলিতে আরম্ভ করিলাম। এইরূপে কত সুন্দর গিরি, নয়নতর্পণ কানন, মন্দপ্রবাহ তরঙ্গিণী, শৈবালময় সরোবর, নবশদে হরিণ্ময় শাদ্বল, বায়ুহিল্লোলে কম্পিতশীর্ষ শালিনিচয়, মাঠোদ্ভূত পদ্মের মূলভাগে অবনত কলম ধান্য, এই সকল দেখিতে দেখিতে অহোরাত্র অবিশ্রামে গমন পূর্ব্বক কয়েক দিবসে সাগরের ন্যায় অপার বিন্ধ্যাটবীর অন্ধকারময় গর্ভ পরিত্যাগ পূর্ব্বক উড়িষ্যার ক্ষেত্রমণ্ডল নয়নগোচর করিলাম।
যে সময়ে ইংরাজ অধিকারে পদার্পণ করিলাম, তাহা সন্ধ্যার প্রাক্কাল ছিল। সেই স্থান হইতে জগন্নাথের মন্দিরের চূড়া লক্ষিত হইল। আমি তখন অতি শ্রান্ত হইয়া সমীপবর্তী এক তরুতলে নিষণ্ণ হইলাম। তথাকার নিকটে লোকালয় ছিল না। আমার উত্তরে প্রায় আধ ক্রোশ অন্তরে একটি ক্ষুদ্র শৈল দেখিলাম। তৎকালে আকাশ অতিশয় পরিষ্কার ছিল। বেলা অধিক না থাকাতে এবং আপনিও সবিশেষ শ্রান্ত হওয়াতে মনে করিয়াছিলাম, যে আজি এই তরুতলেই অতিপাত করিব।
আমি এই ভাবে নিষণ্ণ আছি, এই সময়ে এদেশে যাহাকে তুফান বলে, সেই ঝড় উপস্থিত হইল। সমুদ্র হইতে বাতাস বহিয়া নদীর পয়োরাশির স্রোত ফিরাইয়া দিল এবং ফেণ উদ্বমন করিতে করিতে সেই পয়োরাশি মুখস্থিত দ্বীপে আঘাত করিতে লাগিল। বায়ু দ্বারা দ্বীপের উপকূল হইতে সিকতাস্তম্ভ এবং জঙ্গল হইতে ঘন পত্রোচ্চয় সম্মাজ্জিত হইয়া গেল। সেই পত্রজাল বাত্যাবেগে নদী ও মাঠ পার হইয়া আকাশের কত উর্দ্ধে উন্নীত হইল। এক একবার বাঁশঝাড়ে বাত্যার বেগ ব্যয় হইতে লাগিল। ইহারা অতি প্রাংশু বৃক্ষের মত উচ্চ হইলেও মাঠের ঘাসের ন্যায় আন্দোলিত হইতে লাগিল। আমার আশ্রয়তরু এরূপ তেজে কম্পিত হইতে লাগিল, যে চাপা পড়িবার আশঙ্কায় আমি মাঠের দিকে ধাবমান হইলাম। পুরোবর্তী স্রোতস্বিনীর জল উচ্চলিত হইয়া উঠিয়া তীরদেশ প্লাবিত করিল এবং আমাকে গ্রাস করিবার নিমিত্ত মহাবেগে মাঠের উপর দিয়া আসিতে লাগিল। আমি যেখানে উচ্চ ভূমি পাইলাম, সেই স্থানেই উঠিয়া পড়িতে লাগিলাম। রাত্রি বাড়িতে লাগিল, এবং আমি দুই ঘণ্টাকাল ঘোর অন্ধকারে, কোথায় যাইতেছি কিছুই নির্ণয় না করিয়া চলিতে লাগিলাম। এই সময়ে এক তড়িৎপ্রভা কাদম্বিনী ভেদ ও গগনমুণ্ডল উদ্দীপন করিয়া দক্ষিণে সংক্ষোভিত সাগর এবং বামভাগে দুই ক্ষুদ্র শৈলের মধ্যস্থলে নিহিত এক উপত্যকা দেখাইয়া দিল। আমি আশ্রয়ের নিমিত্ত দৌড়িয়া সেই উপত্যকার দিকে গমন করিলাম এবং প্রবেশস্থানেই বজ্রের হৃদয়কম্পক গর্জন শ্রবণ করিলাম। ইহার দুই পার্শ্বে পাহাড় ও মধ্যভাগে প্রকাণ্ডাকার বৃক্ষমণ্ডলীদ্বারা আচ্ছন্ন। যদিও ঝড় ভীষণ গর্জনপূর্ব্বক তাহাদিগের শিরোভাগ নত করিতেছিল, তথাপি তাহাদের স্কন্ধদেশ পার্শ্ববর্তী পাষাণের মত অচল ছিল। এই প্রাচীন বনান্ত বিশ্রামস্থান বোধ হইল, কিন্তু তাহার ভিতরে প্রবেশ করা দুঃসাধ্য ছিল। ইহার সীমায় নানা লতা উদ্ভূত হইয়া বৃক্ষস্কন্ধে জড়াইয়া এক প্রকার লতাদুর্গ প্রস্তুত করিয়া-ছিল। আমি অতি কষ্টে তাহাদিগের বন্ধন পৃথক্ করিয়া প্রবেশ করিলাম এবং ভাবিলাম ঝড় হইতে রক্ষা হইল। মহাবেগে বৃষ্টি পড়িয়া আমার চারিদিকে অসংখ্য স্রোত বহাইয়া দিল। আমি এই বিপদে একটি আলোক এবং উপত্যকার অতি সংকীর্ণভাগে বৃক্ষতলে অধিষ্ঠাপিত এক কুটীর দর্শন করিলাম। আমি তৎক্ষণাৎ সেই দিকে ধাবমান হইয়া দ্বারে আঘাত করিবামাত্র এক সৌম্যাকার পলিতকেশ পুরুষ কপাট খুলিয়া দিল। আমি আপনাকে আশ্রয়ার্থী অতিথি বলিয়া বিজ্ঞাপন করাতে সে আমাকে কুটীরের মধ্যবর্তী এক মাদুরে উপবেশন করাইয়া আমার সমুখে আম, যাম, আতা এবং নারিকেল জল ও চিনিতে পরিপক্ক এক শরাব ভাত আনিয়া দিল। পরে আপনি এক যুবতী অবলার কাছে যাইয়া বসিল।
আমার এক্ষণে সমুদয় আশঙ্কা অপগত হইল। কুটীরখানি পাষাণের ন্যায় অচল হইয়া ছিল। ইহা অতি সংকীর্ণভাগে এক বটবৃক্ষতলে নির্মিত ছিল। ইহার পত্রোচ্চয় এরূপ ঘন, যে একবিন্দু বৃষ্টিও তাহা ভেদ করিতে পারে নাই। যদিও ঝড় ভয়ঙ্কর রূপ গর্জন করিতে লাগিল, এবং বজ্র কর্ণকঠোর নিতের সহিত আমার উপর দিয়া গড়াইয়া যাইতে-ছিল, তথাপি কুটীর মধ্যের ধূম বা প্রদীপ কিঞ্চিন্মাত্র চঞ্চল হয় নাই। বৃদ্ধ অনির্বচনীয় স্নেহের সহিত সেই যুবতীর প্রতি চাহিতেছিল। সে বসিয়া গলায় পরিবার নিমিত্ত পদ্মবীজের মালা গাঁথিতেছিল। একটি বৃদ্ধ কুকুর ও তাদৃশ একটি মার্জার জাজ্বল্যমান বহ্নির নিকট শুইয়া ছিল। কুকুর এক একবার চক্ষু চাহিয়া তাহার প্রভুর প্রতি দৃষ্টিপাত ও দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিতেছিল। আমার আহার সমাপ্ত হইলে বৃদ্ধ যুবতীর প্রতি সংকেত করিবামাত্র সে আমার সমুখে এক নারিকেলের খোল রাখিয়া তাহাতে লেবুর রস, ইক্ষুরস ও জলে নিম্মিত এক পানীয় ঢালিয়া দিল। আমি সানন্দ চিত্তে পান করিয়া শরীর শীতল করিলাম। পরে বৃদ্ধ আমার কাছে বসিয়া কোথা হইতে আসিতেছি, কোথায় যাইব, কি জাতি, কি ব্যবসায় ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করিল। আমি সংক্ষেপে আত্মবৃত্তান্ত নিবেদন করিলে সে বিস্ময়বিস্ফারিত লোচনে কহিল, "তোমার এত অল্প বয়সে ঈদৃশ লীলা হইয়াছে। আমার আখ্যান এরূপ আশ্চর্য্য নহে, বোধ করি শুনিতে অকৌতুক হইবে না।" আমি অতিশয় অনুরোধ পূর্ব্বক' আগ্রহ প্রকাশ করিলে এইরূপে আপনার বৃত্তান্ত কহিল।
"তুমি বাঙ্গালি, অতএব মালবারের সামাজিক ব্যবস্থা সম্যক্ অবগত নহ। তথায় ব্রাহ্মণ প্রভৃতি সাত জাতি আছে। সর্ব্বাপেক্ষা অধম জাতির নাম পরিয়া। পরিয়ারা বিশুদ্ধ জাতির নয়নগোচর হইলে নিহত হয়। বিশুদ্ধ জাতিরা তাহার দর্শন পর্য্যন্ত এরূপ অপবিত্রতাজনক বোধ করে। আমি এই পরিয়া জাতির গৃহে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলাম। আমার সমুদয় সংসারই শত্রু ছিল। আমি প্রথমে এইরূপ ভাবিতাম "যদি সকলেই তোমার শত্রু হয়, তবে আপনি আপনার বন্ধু হও। তোমার বিপদ এমন গুরুতর নহে, যে তোমার বন্ধু তাহা সহ্য করিতে পারে না। বৃষ্টি যত কেন মুষলধার হউক না, এক ক্ষুদ্র পক্ষীর গাত্রে একেবারে দুই এক বিন্দুর অধিক লাগে না।" আমি এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে আহারান্বেষণে বনে বনে ও নদীর ধারে ধারে ফিরিতাম, কিন্তু প্রায়ই আরণ্যফল ব্যতীত আর কিছু পাইতাম না এবং সর্ব্বদাই শ্বাপদের ভয়ে শঙ্কিত থাকিতাম। আমি ইহাতে নিশ্চয় করিলাম, যে প্রকৃতি একাকী মানুষের নিমিত্ত কিছু দেন নাই অতএব যে সমাজ আমাকে ঘৃণা করে, তাহারই ভিতর থাকিতে হইবে। এইরূপ স্থির করিয়া, ভারতবর্ষে যে সকল পরিত্যক্ত ক্ষেত্র আছে, যাহাদের প্রভুরা দুর্দশাগ্রস্ত হইয়াছে, সেই সকল ক্ষেত্রে গমনপূর্ব্বক যাহা কিছু পাইতাম ভক্ষণ করিতাম। এই ভাবে আমি নানা স্থানে ভ্রমণ করিতে লাগিলাম। যদি কখন কোন প্রয়োজনীয় বৃক্ষের বীজ পাইতাম, তবে এই ভাবিয়া রোপণ করিতাম যে আমার না হউক, অন্যের উপকার হইবে। আমার এই অবস্থায় অপেক্ষাকৃত স্বাচ্ছন্দ্য বোধ হইল। আমার নগর দেখিবার নিমিত্ত বড় অভিলাষ ছিল। আমি দূর হইতে নগরের প্রাকার, উচ্চ অট্টালিকা, নিম্নস্থ নদীতে অগণনীয় পোতশ্রেণী, রাজমার্গে সার্থ বণিগুদল এই সকল দেখিতাম। আমি দেখিতাম পৃথিবীর সর্ব্বভাগ হইতে পণ্য আনীত হইতেছে, বিভিন্ন রাজ্যের দূতেরা সাহায়ক প্রার্থনার্থে আসিয়াছে, এবং সৈনিকেরা কার্য্যকালে অতিদূরবর্তী প্রদেশ হইতে উপনীত হইতেছে। যত সাধ্য, আমি নগরের নিকটে যাইয়া বিস্ময় সহকারে পর্যটকবর্গের পদোদ্ধত ধূলিস্তম্ভ দর্শন করিতাম এবং উপকূলে সাগরতরঙ্গের আঘাত সদৃশ গোলমাল শ্রবণ করিয়া তথায় যাইবার নিমিত্ত অতিশয় উৎসুক হইতাম। কিন্তু অপবিত্র জাতি বলিয়া প্রবেশের অনুমতি ছিল না। তখন আপনাআপনি কহিতাম, এরূপে বিভিন্নাবস্থ লোকে বা যে স্থানে আপনাদিগের শ্রম, ধন, ও আমোদ সংযুক্ত করিয়াছে, নিঃসংশয় সে স্থান অতি রমণীয়। দিবাভাগে যাইবার অনুমতি নাই বটে, কিন্তু রাত্রে আমাকে কে নিষেধ করে? নিরুপায় মুষিক যাহার কত শত্রু আছে, সে অন্ধকারের আবরণে যথাইচ্ছা গমন করে, সে ভিক্ষুর কুটীর হইতে রাজার প্রাসাদে গমন করে। যদি তারালোকেই সুখে জীবনক্ষেপ হয়, তবে আমার সূর্যালোকের প্রয়োজন কি? দিল্লীর সন্নিধানে আমি এইরূপ ভাবিয়াছিলাম। আমার রাত্রে নগর প্রবেশ করিবার সাহস হইল। আমি লাহোর গেট্ দ্বারা প্রবেশ করিলাম। প্রথমে এক নির্জন নগরমার্গে ভ্রমণ করিতে করিতে দেখিলাম, দুই ধারে বণিকদিগের দোকান। স্থানে স্থানে দৃঢ়রূপে আবৃত সরাই এবং গভীর স্তন্ধীভাবের আস্পদ বাজার রহিয়াছে। আমি নগর-গর্ভে অগ্রসর হইয়া যমুনাকূলবর্তী, প্রাসাদ ও উদ্যানে পরিপূর্ণ ওমরাদিগের পল্লী দর্শন করিলাম। এই ভাগ নানা বাদ্যধ্বনি ও বাইদিগের সংগীত শব্দময় হইয়া ছিল। বাইরা মশালের আলোকে নদীকূলে নৃত্য করিতে-ছিল। আমি এই মাধুর্য্য সম্ভোগ করিতে এক উদ্যানতোরণে দাঁড়াইবা-মাত্র দাসেরা দরিদ্র বলিয়া যষ্টিদ্বারা তাড়াইয়া দিল। আমি ওমরাপল্লী ত্যাগ করিয়া অনেক পাগোদার সমীপ দিয়া চলিয়া গেলাম। এই সকল পাগোদার কতগুলা দুর্ভাগ্য লোক প্রণিপাত ও রোদন করিতেছিল। আরও কিঞ্চিদ্দুরে মোল্লাদিগের সময় নিবেদনের চীৎকার শুনিয়া মসজীদের নিকট আসিয়াছি বুঝিলাম। এই স্থানে ইউরোপীয়দিগের ধ্বজযুক্ত কুঠী ছিল। তথা হইতে অনবরত "খবরদার খবরদার" করিতে-ছিল। আমি পরে আর একটি অট্টালিকার নিকট দিয়া যাইবার সময় শৃঙ্খলার ঝন্ঝন্ শব্দ ও আর্ত্তরব শ্রবণ করিয়া বুঝিলাম, যে কারাগার। আমি চিকিৎসালয় হইতে দুঃখের ধ্বনি শ্রবণ করিলাম। তথা হইতে গাড়িপোরা শব নির্গত হইতেছিল। পথে দেখিলাম, চোরেরা দৌড়িয়া পলাইতেছে ও চৌকীদারেরা অনুসরণ করিতেছে। ভিক্ষুদল বারম্বার আঘাত খাইয়াও বড়মানুষের দ্বারে উচ্ছিষ্টের নিমিত্ত ভিক্ষা করিতেছে। যাহারা উপজীবিকার্থ অসতী হইয়াছে, এমন স্ত্রীলোকও অনেক দেখিলাম। পরিশেষে এক প্রাঙ্গণে উপস্থিত হইলাম। তাহার মধ্যস্থলে বাদশাহের প্রাসাদ। প্রাঙ্গণের চারিধারে নবাবদিগের তাঁবু ছিল। প্রত্যেকের পৃথক্ প্রকার মশাল, নিশান ও চামরযুক্ত বৃহদাকার যষ্টি। দুর্গটা এক পরিখায় বেষ্টিত ও গোলন্দাজ সৈন্যে রক্ষিত। চারি-দিকে বাতি জ্বলিতেছিল, তাহার আলোকে দেখিলাম, প্রাসাদের চূড়া মেঘস্পর্শী হইয়াছে। আমার প্রবেশ করিতে ইচ্ছা থাকিলেও চারিদিকে যে সকল কোঁড়া ঝুলিতেছিল, তাহা দেখিয়াই প্রাণ উড়িয়া গেল। আমি কয়েক জন কাফুরি দাসের সমীপে উপস্থিত হইয়া তাহাদিগের সেব্যমান বহ্নিতে শীতঘনীকৃত আপনার অঙ্গকে পুনরুষ্ণ করিলাম।
পরদিন সমাধিস্থানে যাইয়া দিনাতিপাত করিলাম। তথায় প্রেতদিগকে দত্ত আহারের উপযোগ দ্বারা ক্ষুধা শান্তি হইল। আমি ভাবিলাম, জীবিতেরা নিষ্ঠুরতা প্রদর্শনপূর্ব্বক আমাকে সমাজ হইতে তাড়াইয়া দিয়াছে, কিন্তু তাহাদিগের কুসংস্কারের সাহায্য পাইয়া প্রতিপালিত হইতেছি। আমি এই ভাবে প্রতি দিন দিবাভাগ মৃত্যুর নিবেশে ও রজনী পুরমধ্যে ভ্রমণপূর্ব্বক ক্ষেপণ করিতে লাগিলাম। এক দিন এক ব্রাহ্মণী আপনার মৃত স্বামীর সহগমনার্থ সজ্জিত হইয়া কোন আচার নিষ্পন্ন করিতে সেই সমাধিস্থানে দেখা দিলেন। আমি তাঁহাকে অনেক বুঝাইয়া সহগমন রূপ দুর্ব্যবসায় হইতে নিবৃত্ত করিলাম এবং তাঁহার বন্ধুবর্গের মনে "তিনি ডুবিয়া গিয়াছেন” এই বিশ্বাস উৎপাদনার্থে তাঁহার অবগুণ্ঠন নদীজলে প্রক্ষেপ পূর্ব্বক তাঁহাকে লইয়া এই দেশে উপস্থিত হইলাম। আমাদিগের প্রণয়ের ফলস্বরূপ এই দুহিতা জন্মগ্রহণ করিয়া আমাদিগের অন্তঃকরণের আনন্দগ্রন্থিস্বরূপ হইয়াছিলেন। কিন্তু ওঃ! বেদনা যেন উন্মীলিত হইতেছে! এই শূন্য কুসংস্কারময় জগতে যে কেবল আমাকে ভাল বাসিত, তাহার নয়নানন্দ মূর্ত্তি এক ক্রুর মরকদ্বারা পৃথিবী হইতে অপনীত হইল, এই বলিয়া পরিয়া নিজ দুহিতার উৎসঙ্গে পলিত শীর্ষ ক্ষেপপূর্ব্বক বারম্বার তাহার প্রতি সস্নেহ নয়নে চাহিয়া মূর্চ্ছিত হইল। মুখে শীতল পানীয় চর্চ্চা করিলে পুনরুজ্জীবিত হইল। কহিল যৎকালে আমার এই হৃদয়রত্ন শৈশব দশায় বর্তমান ছিল, এবং প্রিয়তমা সহধৰ্ম্মচারিণী জীবিত ছিল, সেই কালে এক জন সাহেব জগন্নাথের পণ্ডিতের নিকট হইতে প্রত্যাবর্তনের সময় এই স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল। আহা, সে আমার সুখে কত মমতা প্রকাশ করিতে লাগিল এবং আমার সারল্যের কত প্রশংসা করিল। কিন্তু হায়, সে জানিতেছে না যে আমার সংসারের প্রায় সমুদয় প্রলোভন অপগত হইয়াছে, কেবল এই পীযুষদর্শনা দুহিতা আমাকে অদ্যাপি জীবনে অভিলাষী রাখিয়াছে! হায়, আমার দেহ নির্জীব হইলে এই বিস্তীর্ণ অর্ণবাম্বরায় কে বৎসার ভার গ্রহণ করিবে। আমরা এমন অধম জাতি, যে এই দেশে ইহার কাহাকেও রক্ষিতা করিবার উপায় নাই। হা, যদি সহসা আমার অভদ্র ঘটিয়া উঠে, বৎসে তোর দুর্দশায় কে দৃষ্টিপাত করিবে, হে পরমেশ্বর এবম্বিধ জীববর্গকে সৃষ্টি করিয়া যে তোমার কি গূঢ় অভিপ্রায় সিদ্ধ হইতেছে, মানুষ কি তাহা কখন জানিতে পারিবে না, কেবল অন্ধকারে পদে পদে স্খলিত হইয়া আপনার কৌতুক ভরে বিদীর্ণ হইবে। ইহা বলিয়া দুই পিতা দুহিতায় অশ্রুপাত করিতে লাগিল। আমি বৃদ্ধের এই আখ্যান শ্রবণ ও স্বচক্ষে তাহার মনোযাতনা নিরীক্ষণ করিয়া সাতিশয় ক্ষুব্ধ হইলাম। গম্ভীরভাবে ক্ষণকাল তাহার সারল্য, সাধুতা ও দুর্ভাগ্য ভাবিতে ভাবিতে আমার অন্তঃকরণ আর্দ্র হইল। আমি কহিলাম, "তাত, তুমি আমার সম্বোধনে বিস্ফারিত নয়ন হইও না। আমি এই অবলার রক্ষিতা হইয়া চিরকাল তোমাকে এই সম্বোধন করিব। যদি আমার স্থিরতার প্রতি কোন সংশয় হয়, যদি তোমার এরূপ মনে হয়, যে আমি রিপুবিশেষের পরবশ হইয়া তোমার মহার্ঘ্য নিধি, বার্দ্ধক্যের অবলম্বন, ও জীবনের সারকে বিনিপাত কুহরে ফেলিবার চেষ্টা করিতেছি, তবে, হে পরমেশ্বর, তুমি সাক্ষীস্বরূপ হইয়া মনের অন্ধকার দূর কর, তোমার নয়ন মহীয়ান্ তারামণ্ডল দেখিতে পায়, অণু সদৃশ সূক্ষ্ম, বায়ু অপেক্ষাও দ্রুতগামী মানবচিত্তেও তাহার সেইরূপ প্রসার আছে। তোমার ইহা অগোচর নাই, যে আমার এই বাক্য মায়িক কি প্রকৃত। আমি তোমার এই গরীয়ান কৃতি বিশ্বমণ্ডলের পবিত্র নাম লইয়া শপথ-আমি আরও বলিতেছিলাম, কিন্তু পরিয়া সাতিশয় আগ্রহ সহকারে "বৎস, বিরত হও, আমি তোমার অমায়িকতা বিষয়ে কণামাত্র সন্দিহান নহি” এই বলিয়া দুহিতার অঙ্গুলি আমার মুখে অর্পণ করিয়া অবশিষ্ট বাক্যের উচ্চারণ বিনিবারিত করিল। আমি অকৃত্রিম প্রেম প্রকাশ পূর্ব্বক অবলার করধারণ করিলাম এবং কহিলাম, "তাত, আমি তোমার উপদেশপূর্ণ চরিত্র হইতে শান্তিসুখ শিক্ষা করিলাম। আমার এখন সংসারের চাকচিক্যময় পদার্থে অসারতা বোধ হইল। আমি এরূপ মূঢ় ও উন্মত্ত ছিলাম যে, যে বিশ্বে প্রত্যেক বজ্র বৃষভসদৃশ গর্জিত দ্বারা সর্ব্বস্রষ্টার নাম উচ্চারণ করিতেছে, যথায় চকোর চন্দ্রের প্রতি চাহিয়া সেই নাম বুঝাইয়া দিতেছে এবং চন্দ্র আবার সুধাময় কিরণদ্বারা চকোরের নয়নে সেই নাম লিখিয়া দিতেছে, এমন বিশ্বে থাকিয়াও সেই সর্ব্বস্রষ্টাকে জানিতে পারি নাই। কিন্তু আমি এখন তোমার ভক্তি হইতে তাহা শিক্ষা করিলাম, এবং তাঁহার করুণার অসীমতা জানিয়া আমার কিছুমাত্র নিরাশতা নাই। আমি সে পরমেশ্বরকে সাক্ষী করিয়া তোমার দুহিতার এই পাণিগ্রহণ করিলাম। ইহা জীবন থাকিতে পরিত্যাগ করিব না।" পরিয়া মহাহ্লাদে অশ্রুপাত করিতে লাগিল। আমি পরিয়াদুহিতার পাণির সহিত মানসেরও অধিকারী হইয়াছি।
এক্ষণে আমার শ্বশুর লোকান্তরিত হইয়াছে। আমি তাহার দেহ সমাহিত করিয়া স্থানের পরিচয়ার্থ মল্লিকার চারা বসাইয়া দিয়াছি। সেই স্থানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাদ আপনাদিগের অঙ্ক রাখিয়া যায় এবং সূর্য্যের অবিজ্ঞাত হস্ত তাহার উপরে পুষ্প বর্ষণ করে। আমার এখন সন্তোষ-রত্নের অধিগম হইয়াছে। আমার এখন রাজ্যলাভের অভিলাষ নাই, দেশে দিগন্তবিস্তারী প্রখ্যাতি করিবারও ইচ্ছা হয় নাই। আমি সংসারের দুশ্চিন্তা, জনসমাজের অসূয়া, সংহারক সমরের দুর্বার্তা হইতে দূরতর থাকিয়া শনৈঃ শনৈঃ সেই বিধাতার সন্নিধানে উপস্থিত হইতেছি এবং এক দিন অবশ্যই সেই সাধারণ বিশ্রাম গৃহে শয়ান হইয়া সুখে নিদ্রাণ হইব।
