বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা
হরিপ্রভা তাকেদা
ভূমিকা
রবীন্দ্রনাথের জাপানযাত্রী প্রকাশেরও আগে ঢাকার উদ্ধার আশ্রমের হরিপ্রভা মল্লিকের জাপান সফরের বিবরণী প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলা ভাষায় জাপান-বিষয়ক সেটাই প্রথম গ্রন্থ। বিয়ের ছয় বছর পর ১৯১২ সালে স্বামীর সঙ্গে জাপান-যাত্রা করেন হরিপ্রভা তাকেদা এবং সেই ভ্রমণ ও চার মাসকাল জাপানবাসের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেন বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা গ্রন্থে।
আমার যখন বিবাহ হয় তখন কেহ মনে করে নাই যে আমি জাপান যাইব। কাহারও ইচ্ছাও ছিল না। কিন্তু আমার বড়ই ইচ্ছা হইত আমি একবার যাই। সে ইচ্ছা স্বপ্নেই পৰ্যবসিত হইত। বিবাহের পর শ্বশুর-শ্বাশুড়ির আশীর্ব্বাদ লাভ করিতে ইচ্ছা হইত। তাঁহাদের নিকট পত্র লিখিয়া যখন তাঁহাদের ফটোসহ আশীর্ব্বাদ পূর্ণ একখানি পত্র পাইলাম ও তাঁহারা আমাদের দেখিবার জন্য আগ্রহান্বিত হইয়া পত্র লিখিলেন, আমার প্রাণ তখন আনন্দে ভরিয়া গেল। তাঁহাদিগকে ও তাঁদের দেশ দেখিবার আকাঙ্ক্ষা প্রাণে জাগিয়া উঠিল। ঈশ্বরেচ্ছায় আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইতে চলিল। যখন জাপান হইতে পুনঃপুনঃ পত্র পাইয়া যাওয়া মনস্থ করিলাম তখনও ভাবিতে পারি নাই আমাদের উদ্দেশ্য সফল হইবে। কারণ চারিদিকের অবস্থা কত প্রতিকূল। অর্থবল সামান্য, শরীর অপটু, সম্মুখে শীতকাল, আত্মীয়গণের অনিচ্ছা, অনেকের নানা ভয়প্রদর্শন। যাহা হউক এ সকল বাধা সত্ত্বেও সর্ব্ববিঘ্নহারী পরমেশ্বরের ইচ্ছায় সকলই প্রস্তুত হইল। ১৯১২ সালের ৩০এ অক্টোবর যাত্রার সমস্ত ঠিক হইল।
৩রা নবেম্বর, ১৯১২— বাবা ও ভাইভগ্নীগণ আমাদের নারায়ণগঞ্জে জাহাজে উঠাইয়া দেন। ঢাকার জাপানী সওদাগর মিঃ কোহারা তাঁহার পত্নীসহ ট্রেনে উঠাইয়া দেন এবং ৫০ টাকা ও জাহাজে ব্যবহারোপযোগী দ্রব্যাদি উপহার স্বরূপ প্রদান করেন। নারায়ণগঞ্জে নামিবার পূৰ্ব্ব হইতে শান্তি ও খুকী (আমার ভগ্নীদ্বয়) কাঁদিতে লাগিল। গত রাত্রেও তারা খুব কাঁদিয়াছে। জাহাজে উঠাইয়া সকলেই অশ্রুপূর্ণ নয়নে বিদায় হইলে বাবা অশ্রুসিক্ত নয়নে 'ব্রহ্মকৃপাহি কেবলম্' বলিয়া আশীর্ব্বাদ করিলেন। যতক্ষণ দেখা গেল তাকাইয়া রহিলাম। ট্রেন ঢাকায় ফিরিয়া চলিল। তখনও উহারা ট্রেন হইতে কাপড় নাড়িতেছিলেন। আমিও নাড়িলাম। জাহাজও ছাড়িয়া দিল। অনেকক্ষণ চুপ করিয়া রহিলাম। কত কি চিন্তার উদয় হইতে লাগিল। যখনি মনে হইল, প্রিয়জনগণ হইতে কত বহুদূরে যাইতেছি, তখনই দুই চক্ষু জলে পূর্ণ হইল। জাহাজে অত্যন্ত ভিড়। বসিবার স্থান ছিল না। যাদব বাবুর এক আত্মীয়া তাকেদাসানকে চিনিতে পারিয়া তাঁর বিছানায় আমাকে বসিতে ও বিশ্রাম করিতে স্থান দেন। দশ দিন পূর্ব্বে তাঁহার দুই বৎসরের একমাত্র পুত্র মারা গিয়াছে। তিনি সেই শোকে কাতর। অল্প কথাই তাঁহার সঙ্গে হইল। জাপান যাব বলিলাম; ইহাতে সকলেই আনন্দ প্রকাশ করিলেন। ১০টার সময় গোয়ালন্দে ট্রেনে উঠিলাম। অত্যন্ত ভিড়, স্থান পাওয়া দুষ্কর। অত্যন্ত শীত বোধ হইল। গার্ড স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া জাহাজ হইতে নামার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সঙ্গে লইলেন। তিনি ট্রেনের অন্য লোকদের সরাইয়া আমাদের জিনিষপত্র তুলিয়া দিলেন, একখানা পূর্ণ বেঞ্চ খালি ক'রে দিলেন। এইরূপে আমাদের বেশ সুবিধা হইল। পরে অন্য লোক এসেছিল কিন্তু আমাদের বিশেষ কিছু কষ্ট হয় নাই। ৪ঠা নবেম্বর—প্রায় ৮ ঘটিকার সময় কলিকাতার সিমেসানের বাড়ীতে উঠিলাম। তিনি বাড়ী ছিলেন না, তাঁর স্ত্রী আদরের সহিত আমাদিগকে গ্রহণ করিলেন। আমাকে ছেড়ে উনি বাজারে গেলেন না, চাকর গেল। চা, বিস্কুট, কলা, খাবার খাইলাম। রান্নার ভাল রকম বন্দোবস্ত ক'রে দিলেন। সিমেসান বাড়ী আসিলে ১১ টার সময় তাকেদাসান্, তিনি ও আর একজন জাপানী এই তিন জন জাপানী ধরণের রান্না আহার করিলেন। আমি ও মিসেস্ সিমেসান্ একত্র আহার করিলাম। রসুন দিয়ে রান্না হয়েছিল বলিয়া ডাল ভাত ছাড়া আর কিছুই খাইতে পারিলাম না। ওঁরা দাইকে রসুন দিতে বারণ ক'রে দিলেন। খাওয়ার পর তাকেদাসা সিমেজের সহিত টিকিট করিতে গেলেন। ১৯০ ভাড়া, ৪১ খোরাক। বৈকালে ফিরে এলেন। সিমেসান্ বলিলেন, ভিতরের গরম কাপড় আরও দরকার, তাই বৈকালে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে বাজারে গেলাম। বাজারের উপর দিয়ে মেম্দের মতো জিনিষ কিনিতে এই প্রথম চলিলাম। প্রথমতঃ আপত্তি করিলাম, গাড়ী করে যাইব বলিলাম কিন্তু শেষে নিকটে বলে হেঁটেই চলিলাম। ২৩ খরচ হাইয়ার জোড়া জুতা, এক জোড়া স্লিপার, মোজা, দস্তানা, গঞ্জি ইত্যাদি কিনিয়া সন্ধ্যার পূর্ব্বেই বাড়ী ফিরিলাম। জিনিষ নাকি ভালই হইয়াছিল। রাত্রে মাংস হয়েছিল। পুরুষদের জন্য জাপানী ধরণে, আমাদের জন্য ভিন্ন। অনেক ভাত খাইলাম। খাওয়ার পর তাকেদাসান্ ও সিমেসান্ বাজারে গেলেন। ক্ষুর, বিস্কুট ইত্যাদি কিনে আনলেন। আমি ও সিমেজের স্ত্রী তাঁদের বিছানায় ঘুমাইলাম। উহারা বারান্দায় মাটিতে বিছানা ক'রে ঘুমাইলেন। বেশ ঘুম হইল।
৫ই নবেম্বর— প্রত্যুষে নীরবে ঈশ্বরের নাম নিয়ে উঠিলাম। চা খাইয়া তাকেদাসান্ বাজারে গেলেন। দুপ্রহরে আহার হইল। বৈকালে খাওয়া ভালো হবে কিনা মনে ক'রে খাওয়ার অনেক বন্দোবস্ত করা হইল। বৈকালে জাহাজে উঠিতে হইবে। আমি মোটেই আহার করিতে পারিলাম না। পুরুষদের জন্য জাপানী রান্না। বৈকালে তাকেদাসান্ তাঁহার বাপ মা'র জন্য তিন খানা র্যাপার কিনে আনলেন। সন্ধ্যার সময় একজন জাপানী ভদ্রলোক— হাতরিসান্ (এঁদের বাড়ী তাকেদাসানের গ্রামের খুব নিকটে, সিমেজের বাড়ীও তাকেদাসানের বাড়ীর খুব নিকট) সস্ত্রীক (জাপানী স্ত্রী) আমাদের সঙ্গে দেখা করিতে আসিলেন। ইঁহারা দুই বাক্স বিস্কুট রাস্তার জন্য আমাদের দিলেন। বৈকাল থেকে মনটা কেমন করিতে লাগিল। সন্ধ্যার সময় খেয়ে রওনা হইলাম। খাওয়া ভাল হইল না। সিমেজ্ ও হাতরিসান্ জাহাজে উঠিয়ে দিলেন। জাহাজে আসিবার সময় মন খারাপ ছিল। চোখের জল রাখিতে পারিলাম না। সিমেজের স্ত্রী বলিলেন, “যখন বেরিয়েছ, ভয় করিও না, সাহস করে চলে যাও। মন খারাপ করিও না; যেয়ে খবর দিও” ইত্যাদি। সিমেড় ও হাতরিসান্ বিদায় কালে বলিলেন, “সুন্দর দেশ, আশা করি আপনি খুব সুখী হইবেন। শীতের জন্য আপনার বড় কষ্ট হইবে। খুব সাবধানে থাকিবেন। আপনার যাত্রা শুভ হউক।”
জাহাজ ঘাট হইতে ওরা চলিয়া গেলেন। এখন আর আমাদের কোন কষ্ট নাই। মন বেশ প্রফুল্ল। জাহাজে উঠিলাম। ভয়ানক গোলমাল ও বিশৃঙ্খলা। জাহাজটি মালের জাহাজ; থাকিবার স্থান ঠিক হয় নাই। মাল উঠান হইতেছে। ১-৩০ ঘণ্টা এদিক ওদিক করে কাটাইলাম। একজন জাহাজের কর্ম্মচারী তাঁর কামরায় বিশ্রাম করিতে দিলেন। ১১টার পর নির্দ্দিষ্ট কামরায় গেলাম। ঘরখানি বোধ হয় ৭ হাত লম্বা, ৪ হাত চওড়া, ৫ হাত উচ্চ, এর চেয়ে কম ছাড়া বেশী নয়। আলমারীর তাকের মত দুইটী দুইটী করিয়া তিন দিকে ছয়টি তাক। প্রত্যেকটীতে একজন করিয়া ৬ জন থাকিবার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু অসতর্ক হইয়া একটু উঁচু হইলে মাথায় খুব ব্যথা পাইতে হয়। চারিদিকে ঘেরা, পড়িবার ভয় নাই। ঘরের অপর দিকে আমাদের জিনিষ পত্র, সব গুছাইয়া রাখিয়াছে। ইলেকট্ৰীক লাইট জ্বলিতেছে। মোমবাতি জ্বালা নিষেধ। একটা কেরোসিনের ওয়াল ল্যাম্প আছে। প্রয়োজন হইলে তাহাই জ্বালান হয়। গরম বলিয়া একখানি পাখা দিয়া গেল। গরম জল দিল। উপরোক্ত শুইবার স্থানগুলির মধ্যে দুইটী অন্য মাল দিয়ে ভরা, দুইটীর ভিতরের তক্তা ছিল না, দুইটী ব্যবহারোপযোগী ছিল। আমরা একটীতেই আজ রহিলাম। প্রায় ১২টা ১টার সময় ৩ জন জাপানী স্ত্রীলোক ও একজন পুরুষ এই গৃহে আসিল। তাহারা কোন রকমে দুইটী সীট্ (seat) ঠিক ক'রে প্রত্যেকটীতে দুইজন করে রাত্রি কাটাইল। বড় গরম ও গোলমাল, ঘুম মোটেই হইল না।
৬ই নবেম্বর— ভোর ৫টার সময় জাহাজ ছাড়িল। বোঝা যায় না যে জাহাজ চলিতেছে। কেবল অল্প শব্দ। এই দেশ ছেড়ে চলিলাম। বাহিরে ডেকের উপর দাঁড়াইয়া কলিকাতার শেষ দৃশ্যগুলি দেখিতে লাগিলাম। মনটা খুব খারাপ বোধ হইল। মনে হইল কোথায় যাচ্ছি। এখন আর ফিরিবার উপায় নাই। গত রাত্রে জাহাজে উঠিয়াই তাকেদাসানের জ্বর হইয়াছে। মাথা ও শরীরে ব্যথা। রাত্রে মোটেই ঘুম হয় নাই। রাত্রি হইতে একোনাইট বেলেডেনো ঔষধ দিলাম। প্রাতেও অল্প জ্বর আছে। প্রায় ৩ ঘণ্টা জাহাজ চলিয়া ৮টার সময়— বোধ হয় ভাটা পড়াতে— বন্ধ হইল। সারা দিন রাত বন্ধ রাহল। প্রায় ৬০০ ছাগল ভেড়া এই জাহাজে করে সিঙ্গাপুর যাইতেছে। সেইগুলি আমাদের খুব নিকটে। বাথরুমে ঐগুলির পাশ দিয়ে যেতে হয়। আর আমাদের ঘরের পাশে জাহাজের ভাঁড়ার ঘর। খাদ্যদ্রব্যাদি সব এই ঘরে থাকে। সে ঘরে বোধ হয় শুকনো মাছ আছে। এই দুইয়ের গন্ধে আমরা আর টিকিতে পারি না। কত এসেন্স ব্যবহার করি, কিছুতেই পারি না। পরে উপরের ডেকে যেয়ে বসিলাম, আমরা পিছনের দিকে আছি, কাজেই দক্ষিণের বাতাস সেখানেও গন্ধ বহন করিতে লাগিল প্রাতে চা মাখন ও রুটি দিয়ে গেল। আমি চা ও বিস্কুট খাইলাম। ১১/১২টার সময় তাকেদাসানের জন্য উক্ত জাপানীদের সঙ্গে খাবার আসিল। আমার জন্য ভাত ও কারী। ভাতগুলি ভাল লাগিল। জাপানে চাউল আঠা আঠা, খেতেও সুস্বাদু। একটার সঙ্গে অন্যটা মিলিত কিন্তু সব আস্ত। বৈকালেও সেই কারী আভাত। আমি কলা ও ভাত খাইলাম ৷ আজ মালপত্র সরাইয়া বাকি সীট্ (Seat) গুলি খালি ক'রে দিল। আজ এক এক জন এক এক বিছানায় রহিলাম। রাত্রে বেশ ঘুম হইল। নীরবে প্রার্থনা করিলাম
৭ই নবেম্বর— ভোরে ৬টার পূর্ব্বে জাহাজ ছাড়িল। হাত-মুখ ধুয়ে কাপড়চোপড় প'রে উপরে গেলাম। নদী ক্রমশঃই বিস্তীর্ণ হইতেছে। আমার ইচ্ছা ঠিক যেখানে সমুদ্র ও নদীর মিলন হইয়াছে সে স্থানটা দেখিব। চা আসিল, নীচে এসে চা খেয়ে আবার উপরে গেলাম। নদী খুব প্রশস্ত। শেষে আর কূল কিনারা কিছুই দেখা যায় না। ভাবিলাম, এই বুঝি সমুদ্র। কিন্তু কৈ জলতো নীল নয়। নদীর জলের মত। জাহাজ দোলে না। তাকেদাসান বলিলেন, অল্প পরেই সমুদ্র, এখনও নদী শেষ হয় নাই। কিছুক্ষণ পরে পরিষ্কার জল দেখা দিল। নদী ও সমুদ্রের সঙ্গম স্থলে আসিয়া দাঁড়াইয়াছি। পরিষ্কার জল দেখিয়া এই সময় স্নান করিতে গেলাম।
তাকেদাসান্ আজ স্নান করিলেন। তাঁর আর জ্বর নাই। আজ আমাকে আলুসিদ্ধ ও ডিমসিদ্ধ ভাত দিতে বলিলাম, তাহাই দিল। আমি আজ বেশ তৃপ্তির সহিত আলুসিদ্ধ ভাত খাইলাম। ভাগ্যে ভাতটা ভাল, তাই রক্ষা। নতুবা বড়ই মুস্কিল হইত। আমি চিরকালই ফেনা ভাত খাইতে ভালবাসি। এও প্রায় সেই রকম। এই ভাতের ফেন গালে না, ভাতেই থাকে ! ভাতগুলি আঠা আঠা, মিষ্টস্বাদ, গন্ধও ভাল। সুতরাং প্রতিদিন আলুসিদ্ধ ভাত দিলেই বেশ তৃপ্তির সহিত খাইতে পারি। রোজ ভাতের সহিত দু'বেলা দু'পেয়ালা চা দেয়। প্রাতে রোজ চা দেয়। বিস্কুট অন্য সময় যখন ইচ্ছা খাই। খাওয়ার আর কোন কষ্ট হয় না।
খাওয়ার পর ক্ষুদ্র জানালা দিয়ে মুখ ধুইতে যাইয়া দেখি, এখন জল ঘোর সবুজ—নীলাভ। বুঝিলাম এবার সত্যসত্যই সমুদ্রে পড়িয়াছি। ভারী আনন্দ হইল। তাড়াতাড়ি উপরে ডেকে গেলাম। যেতে পাঁচ মিনিট দেরি হইল। যেয়ে দেখি, একবারে নীল জল, নীল কালির মত। জাহাজ এখন অল্প দুলিতেছে। প্রায় নৌকার মতই, কি তাহা অপেক্ষা কম। অনেকক্ষণ কিছু না ধ'রে দাঁড়াতে পারি না। সমুদ্র দেখে বড়ই আনন্দ হইল। নীচে নীল জল, উপরে নীলাকাশ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য ঢেউ— কেবলই ঢেউ, পরস্পর যেন একটার গায় একটা ঢলিয়া পড়িতেছে। অসীম অনন্ত জল, কি সুন্দর! কি আনন্দ! নদী যেখানে এসে তাহার সর্ব্বস্ব নিয়ে সমুদ্রে প্রাণ দিয়াছে, সে স্থানটি দেখিবার বড়ই হিচ্ছা ছিল। কিন্তু তাহা দেখিতে পাইলাম না। নদী কেমন তার সর্ব্বস্ব নিয়ে এসে সমুদ্রে প্রাণ দিয়াছে। সমুদ্র হইতে তার প্রাণ পাইয়া আবার সমুদ্রেই তার মিলন ও গতি। মিলিয়াছে তবুও নীল জল ও ঘোলা জল সম্পূর্ণ ভিন্ন রহিয়াছে। আমরাও কি সেই পরম পিতা পরমেশ্বর হইতে উৎপন্ন হইয়া পাপ তাপ ও মলিনতা সব বহন করিয়া সৰ্ব্বস্ব লইয়া তাঁর চরণেই প্রাণ বিসর্জন করিতে পারিব? তিনি শুদ্ধ, পবিত্র ; আমরা পাপী, তাই তার নিকট দীন হয়ে তাতেই মিলিতে চাহিব। এই মিলনেরই অনেক দেরি, তাই বুঝি সমুদ্রের ঐ অপূর্ব্ব মিলন দেখিতে পাইলাম না।
বৈকালে অন্য জাপানী চারিজন অন্যত্র চলিয়া গেল। আজ থেকে কেবল আমরাই বোধ হয় এখানে থাকিব। বৈকালে এস্রাজ বাজাইলাম। বসিবার স্থান নাই। বিছানায় বসিলে উপরে মাথা ঠেকে। উপরের ডেকে অনেক লোক, নীচে ছাগল। বাক্সের উপর বসে আস্তে আস্তে কয়টা গান করিলাম। “অসীম সাগর বক্ষে জয় মা জননী ব'লে” গানটী 'ফুটন্ত ফুলের মাঝে' সুরে গাইলাম।
বৈকালে আলুসিদ্ধ ও তরকারী ভাত দিল। এখন আমি চামচে দিয়ে ভাত খাই। শরীর বেশ ভাল; মনেও আনন্দ। রাত্রে ঘুম ভালই হয়। দিনরাত জাহাজ চলিতেছে। ঘণ্টায় নাকি ১০ মাইল করিয়া চলে।
৮ই নবেম্বর— প্রাতে হাত মুখ ধুইয়া উপাসনা ক'রে উপরে ডেকে গিয়ে বসিলাম। অসীম অনন্ত সমুদ্র বই আর কিছুই দেখিবার নাই। উপরে সুন্দর বাতাস। কিন্তু অনেক লোক, বসিবার স্থান বড় পাওয়া যায় না। নীচে বড় গরম। রাতেও বড় গরম বোধ হয়। প্রথম দিন শেষরাত্রে শীত করেছিল। আজকাল গায় কাপড় রাখা যায় না। শরীর বেশ ভাল। সিঙ্গাপুরে লোকগুলি ও ছাগলগুলি নেমে যাবে, তারপর আমাদের কল বিষয়ে সুবিধা হবে। আজকাল স্নানের জায়গায় লোক বেশী। পাইখানাও অপরিষ্কার থাকে। কাজেই সিঙ্গাপুর পর্যন্ত কষ্ট হবে। জাহাজে পোষ্ট-অফিস নাই। চিঠি দেওয়া মুস্কিল।
৯ই নবেম্বর--- আজ রেঙ্গুনে জাহাজ পৌছিবার কথা। মনে করিতেছি, রেঙ্গুনে চারুদের বাসাতেই উঠিব। এই কয়েক দিনেই মনে হচ্ছে— কত দূর এসেছি। কত দিন হয়ে গেল। গতরাত্রে খুকীকে স্বপ্নে দেখেছি, যেন আমি তাকে পড়ার জন্য মারিতেছি। আবার যেন রেঙ্গুনে তাকে নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছি। কাল মাকেও স্বপ্নে দেখেছি।
৮টার সময় দূরে দ্বীপপুঞ্জ দেখা যাচ্ছে। দুই একটি জাহাজ দ্বীপের কিনারে আছে। দ্বীপে পাহাড় আছে। এখানে সমুদ্রের জল সবুজ। কারণ ভূমি নিকটে। ১১টার সময় জাহাজ দ্বীপের খুব নিকটে। সমুদ্রের দিকে ছোট ছোট রাস্তা ও গাছ দেখা যায়। আজ বড় গরম। সিঙ্গাপুর পৰ্য্যন্ত কষ্টেই যাইবে বোধ হয়।
১০ই নবেম্বর— প্রাতে জাহাজ রেঙ্গুনে নদীর মুখে কিছুক্ষণ বন্ধ থাকিয়া প্রায় ২/৩টার সময় রেঙ্গুন পৌঁছিল। রেঙ্গুনে আমার এক সহাধ্যায়ী থাকেন। তাঁদের বাড়ীতে উঠিলাম। তাঁহারা খুব যত্ন করিলেন। বেশ আনন্দে কাটাইলাম। নেমেই বাবার নিকট পত্র ও টেলিগ্রাম দিলাম। বৃষ্টির বিরাম নাই। অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হচ্ছে। রেঙ্গুন সহরে বেড়াবার ইচ্ছা ছিল কিন্তু বাহির হওয়া মুস্কিল। ১২ই প্রত্যুষে জাহাজ ছাড়ার কথা ছিল বলিয়া ১১ই বৈকালে আহারাদির পর জাহাজে ফিরিলাম। কিন্তু জাহাজ ১৩ই ছাড়িল।
১৩ই নবেম্বর— রেঙ্গুনে জাহাজের ডাক্তার আরোহীদের পরীক্ষা করার পর দুইটার সময় জাহাজ ছাড়িল। রেঙ্গুন হইতে আজ আমাদের ক্যাবিনে আরো দুই জন জাপানী উঠিলেন। ইহাদের একজন সাংহাই ও একজন জাপান যাইবেন। আমরা অন্য ক্যাবিনে গেলাম। এই ক্যাবিনটি বেশ ভাল। ঘরে টেবিল, চেয়ার, গদি দেওয়া বেঞ্চ, বিছানা, আর্শি ইত্যাদি; পার্শ্বেই স্নানাগার। সকল রকমেই সুবিধাজনক ও সুসজ্জিত; প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণীর ক্যাবিনের মত। জাপানী 'বয়' (Boy) যখন যা প্রয়োজন হয় করে দেয়। ‘ডেকে’ও বেশ জায়গা আছে— বেড়ান যায়, ঘরেও বেশ বাতাস আসে। এদিকে জাহাজের বড় কর্মচারীরা থাকেন, তাই এমন সুবন্দোবস্ত। আমাদের সম্মুখের গৃহ ওদের ভোজনাগার ( dinner room)। এখানে আমাদের আশাতীত সুবিধা হয়েছে। বিন্দুমাত্র অসুবিধা নাই। সমুদ্রপীড়া হয় নাই। জাহাজ বেশ স্থিরভাবে ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতেছে। আজকাল মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়, গরম মাঝে মাঝে খুব বেশি। আমার সামান্য একটু জ্বর হইল। আমি মাঝে মাঝে এস্রাজ বাজাই, আস্তে আস্তে গান করি, সেলাইও এক আধটুক করি। প্রায়ই ডেকের উপর বেড়াই ও অনন্তের রচিত অনন্ত নীলাকাশ ও নীল সমুদ্র দেখি। সূর্যাস্তের সময় দৃশ্য বড়ই সুন্দর।
১৭ই নবেম্বর— প্রাতে পিনাঙ্ পৌছিলাম। শরীর অসুস্থ থাকায় ও বৃষ্টি হওয়াতে তীরে নামিলাম না। ১৮ই বৈকালে জাহাজ ছেড়ে ২০এ প্রাতে সিঙ্গাপুর পৌঁছিলাম। সারাদিন বৃষ্টি। ২১এ সহরে বেড়াতে চলিলাম। সমুদ্রের তীরবর্ত্তী স্থানগুলি বড় সুন্দর। সমুদ্রের তীরেই ছোট ছোট পাহাড়, তদুপরি সুদৃশ্য পুষ্পবৃক্ষাদি পূর্ণ বাগান পরিবেষ্টিত ছবির মত সুন্দর সুন্দর বাড়ী। জাহাজঘাট থেকে হেঁটেই সহরে গেলাম। অনেকটা দূর। রাস্তায় ধূলা নাই, তৈলে সিক্ত। সহরে রাস্তার উভয় পার্শ্বে দোকান, তৎসম্মুখে ফুটপাথ। ফুটপাথের উপর ছাদ। রৌদ্র বৃষ্টিতে পথিকদের কষ্ট হয় না। সস্তায় ট্রাম, ঘোড়ার গাড়ী, রিক্স (মানুষটানা গাড়ী) ইত্যাদি চলে। চীনা ও মালয়ী লোকই বেশি। এখানে জাপানিও অনেক আছে। ফিরিবার সময় ট্রামে, ফিরিলাম। আমি এই প্রথম ট্রামে উঠিলাম। এখানে সমুদ্রতীরে কতকগুলি ভিক্ষুক শ্রেণীর লোক বাস করে। যখন জাহাজ আসে বা ছাড়ে সেই সময় ছোট ছোট নৌকায় তাহারা জাহাজের নিকটস্থ হয়। জাহাজ থেকে আরোহীরা জলে পয়সা ফেলে দেয়, উহারা নৌকা থেকে জলে লাফিয়ে পড়ে ডুব দিয়ে জল থেকে পয়সা নিয়ে নৌকায় উঠে। ২/৩টি পয়সা একবারে লইতে পারে। এতে সকলেই তামাসা দেখে আর উহারাও কিছু কিছু উপার্জ্জন করে। আমাদেরও কয়েক সেন্ট (cent--- এখানকার পয়সা) খরচ হইল। বৈকালে একটি জৰ্ম্মন জাহাজ আসিল, তীরে লাগিবার পূর্ব্বে ব্যান্ড বাজাইল। এখানে খুব গরম। বৃষ্টি প্রায়ই আছে। এদিকে নাকি খুবই বৃষ্টি হয়।
২২এ নবেম্বর-- রাতে আমাদের জাহাজ সিঙ্গাপুর ছাড়িল। আমরা ডেকে দাঁড়াইয়া দেখিলাম। পরে ঘরে এসে চা খাইলাম। আধ ঘণ্টাখানেক পর দাঁড়ান অসম্ভব হইয়া উঠিল। কারণ, এখন স্থির সমুদ্র ক্রমে অস্থির হইয়া উঠিতেছে। বিছানায় শুইয়া পড়িলাম। জাহাজ খুব দুলিতে লাগিল I শরীর অস্থির--- গা বমি বমি করিতে লাগিল। অত্যন্ত কষ্ট বোধ হইতে লাগিল। কিছুতেই শান্তি নাই। পরে মা মা এই নাম নীরবে করিতে করিতে শান্তি লাভ করিলাম ও ঘুমাইয়া পড়িলাম। আবার জাগিলেই ঐ মস্ত্ৰে অস্থিরতা দূর হইয়াছে ও ঘুমাইয়াছি, কোনও ভয় হয় নাই। দুজনেরই শরীর অত্যন্ত খারাপ, জাহাজশুদ্ধ সকলেরই প্রায় তাই। আকাশ ঘনমেঘাচ্ছন্ন। বৃষ্টি, প্রবল উত্ত’রে বাতাস, চন্দ্র সূর্য্য নক্ষত্র সব অদৃশ্য। সমুদ্রের ঢেউ ও গৰ্জ্জন ভয়ানক। জাহাজ সম্মুখে পশ্চাতে দুলিতেছে। আমরা জাহাজের মধ্যভাগে, তাই কষ্ট কম। যাহারা সম্মুখ ও পশ্চাদ্দিকে, তাদের অবস্থা আরও কষ্টকর। ২৭এ পর্যন্ত একই অবস্থা। তবে প্রথম দিনের মত শারীরিক উদ্বেগ কিছুই নাই। আমি সৰ্ব্বদা শুয়েই থাকি। উঠিলে পড়িয়া যাই, মাথা ঘোরে। হোসই পা বলিলেই হয়, কমলালেবু ও বিস্কুট কিছু কিছু খাই। আহারে রুটি মোটেই নাই। শুয়ে থাকিলে কোন কষ্ট হয় না। উনি (Mr. Takeda) খান বেড়ান, কোন কষ্ট নাই। ২৮এ আকাশ একটু পরিষ্কার দেখা গেল। সমুদ্র ও জাহাজ কিছু স্থির হইল। আমি উঠিয়া স্নান করিলাম, কয়েক দিন পর বেশ রুচির সহিত আহার করিলাম। সারাদিন বসে রইলাম, ২৯এ আবার ঘন মেঘ দেখা দিল। প্রবল বাতাসে জাহাজ এবার আড়াআড়ি ভাবে দুলিতে লাগিল। মধ্যাহ্ন-আহারের পর শুইয়া পড়িলাম। বৈকাল হইতে জাহাজ অত্যন্ত দুলিতে লাগিল। সমুদ্রের ঢেউ ভয়ানক গৰ্জ্জনে জাহাজের উপর হুস হুস ক'রে এসে সব ভিজিয়ে দেয়। জিনিষপত্র যাহা উপরে ছিল নীচে প'ড়ে একবার এ পাশে আবার ও পাশে গড়াইতে লাগিল। পরে দুইজন ‘বয়’ এসে সব জিনিষ নীচে পরস্পর ঠেকা দিয়ে রেখে গেল। কিছু না ধরে কেহই দাঁড়াতে পারে না। বেঞ্চে বসলে সম্মুখ দিকে প'ড়ে যেতে হয়। বিছানার চারিদিকে কাঠের ফ্রেম, তাই পড়বার ভয় নাই। তবুও আমাদের বিছানা পাশাপাশি ভাবে থাকাতে ও কিছু লম্বা হওয়াতে একবার পায়ের দিকে নেমে যেতে হয়, আবার মাথার দিকে উঠতে হয়। বিছানা জোর ক'রে ধ'রে ধাক্কা সামলাতে হয়। ঘুম হয় না। মাথা একবার নীচে যায়, আবার উপরে উঠে। এত দুলিতে লাগিল যে বলা যায় না। খাওয়া হলো না; জাহাজে প্রায় ১০০০ চাইনীজ আরোহী, সব উপবাস। ৩০এ— আকাশ, সমুদ্র, জাহাজ সকলেরই এক অবস্থা। কেবল ভাত সিদ্ধ ক'রে চাইনীজরা আহার করিল। কিন্তু তাহাতেও কত বিড়ম্বনা। কিছু না ধরে দাঁড়াতে পারে না। সমস্ত শরীরে ভাত পড়ে একাকার। তাকেদাসান্ চা রুটী খেলেন। আমার আহারে রুচি নাই। কিন্তু শারীরিক কোন উদ্বেগ নাই। কমলালেবুই আমার আহার। এই ভাবে ২ ডিসেম্বর প্রত্যুষে হংকং পৌছিলাম। জাহাজখানি নাকি ঘণ্টায় ১০/১১ মাইল চলে ৷ এই কয়দিনে ৪/৫ মাইলও চলিয়াছে। ৫/৬ দিনের স্থানে নয় দিনে হংকং আসিলাম। আজ অত্যন্ত শীত, কাল থেকে হঠাৎ যেন শীত পড়িল; আগে বেশ গরম ছিল।
হংকংএ বেড়াতে নামিলাম। সহরটী একদিকে যেমন সুদৃশ্য তেমনি জাঁকজমকে পূর্ণ। পর্ব্বতময় স্থান বলিয়া রাস্তাগুলির কোনটা উঁচু, কোনটা নীচু। ৫/৬ তালা পর্য্যন্ত উচ্চ বড় বড় বাড়ি। নিম্নতলে রাস্তার উভয় পার্শ্বে সুসজ্জিত দোকান। ফুটপাথের ওপর ছাদ। রাস্তায় ট্রাম, রিক্স ও ডিন চেয়ার (অনেকটা ছাদশূন্য পাকিরা হলো। ঘোড়ার গাড়ী দেখিলাম না। হংকং পীকে ট্রামে উঠিতে হয়। পীক্ ট্রামওয়ে এক আশ্চর্য্য জিনিষ। পীকের উপরে ট্রামওয়ে ষ্টেশনস্থিত ইঞ্জিনের চাকায় আবদ্ধ লৌহরজ্জুদ্বারা দুইটী ট্রাম বাধা থাকে। চাকাটী ঘুরান হয়, তৎসঙ্গে ট্রাম দুইটী সমসূত্রে আকর্ষিত হয়ে একটী উপরে উঠে ও অপরটী নামিয়া আসে। খাড়া পাহাড়ের ওপরে এরূপে যাতায়াত আশ্চর্য্য ব্যাপার! নীচ থেকে বোন হয় যেন ক্ষুদ্র পিপীলিকা প্রাচীর বাহিয়া উঠিতেছে নামিতেছে। যেখানে শেষ হইয়াছে সেখানে পীক্ হোটেল (Peak Hotel) নামে একটী হোটেল আছে। এখান থেকে হেঁটে উপরে উঠিতে হয়। উপরে সুন্দর সুন্দর বাড়ী ও বাগানাদি আছে। স্থানে স্থানে বিশ্রামের জন্য বেঞ্চ। রাস্তার উভয় পার্শ্বে নানা প্রকার সুদৃশ্য বৃক্ষাদি আছে। পীকে হেঁটে উঠিবার জন্য একটী রাস্তা আছে। পাহাড়ের উপর হইতে সমুদ্রের বড় বড় জাহাজগুলি অতি ক্ষুদ্ৰ দেখায়।
রাতে সমুদ্র হইতে হংকং-এর দৃশ্য আরও মনোহর। পাহাড়ের উপর সহরে ও গৃহে গৃহে আলো দেখিয়া বোধ হয় যেন অসংখ্য নক্ষত্র আকাশে শোভা পাইতেছে! বাস্তবিক স্থানটি বড়ই সুন্দর! এখানে নানা দেশীয় লোকের বাস। অধিকাংশই বোধ হয় চাইনীজ।
৪ই ডিসেম্বর বৈকালে ৪টায় জাহাজ ছাড়িল। আকাশ পরিষ্কার, এবার আর কোন কষ্ট হল না, কারণ ঝড় বৃষ্টি আর হয় নাই। জাহাজও বেশ স্থির ভাবে চলিতেছে। ৯ই প্রাতে সাংহাই পৌছিলাম। শীতের জন্য ঘরে পাইপে গরম জল দেওয়া হয়েছে; তাহাতে ঘরখানি বেশ গরম থাকে। ইয়াংসিকিয়াং খুব বড় নদী। এখানে অসম্ভব শীত। এত ওভারকোট ইত্যাদি শীতবস্ত্র পরিধান করিয়াও শীতে শরীর যেন অবসন্ন হইয়া যাইতে লাগিল। সহরটী বেশ পরিষ্কার। এত পরিষ্কার সহর ভারতে দেখি নাই। রাস্তাগুলো ইটে বাঁধান, সিমেন্ট করা, সাদা ধবধবে, ধূলা নাই। দুইদিকে সুন্দর চাইনীজ ধরণের বাড়ী। প্রায় ৫ ঘণ্টা হেঁটে বেড়ালাম। রাস্তার উভয় পার্শ্বে বৃক্ষ আছে। কিন্তু তাহা শীতের জন্য পত্র শূন্য। ১০ই বৈকালে সাড়ে ৩ টায় জাহাজ সাংহাই ছাড়িল।
১৩ই ডিসেম্বর— প্রাতে জাপানের প্রথম পোর্ট ‘মোজি’ পৌছিলাম। আজ আমার বড়ই আনন্দ! কারণ জাপান রাজ্যে আসিয়াছি। এখানে ডাক্তার জাহাজের আরোহীদের পরীক্ষা করিলেন। আমরা নৌকা ক'রে নেমে বেড়াতে গেলাম। জাপান দেখে বেশ আনন্দ হইল। বৃষ্টি হওয়াতে রাস্তা কৰ্দ্দমময় ছিল, জুতা পায়ে চলা মহা মুস্কিল; তার ওপর আবার খুব শীত। দেখিবার জিনিষ বিশেষ কিছুই নাই। সহরটী অপরিষ্কার ও কদমময় দেখা গেল। নিকটেই সমুদ্রের অপর পারস্থ সহর সিমোনোসেকি। ফেরী ষ্টীমারে করে গেলাম। সহর প্রায় একরকমই। এখানে ‘তেনজিন সামা'র (স্বর্গবাসীর) একটি দেবমন্দির দেখিলাম। সমুদ্রতীরস্থ পাহাড়ের ওপর মন্দিরটী স্থাপিত। উঠিবার জন্য সিঁড়ির প্রবেশপথে প্রস্তর-নির্ম্মিত ‘তোরিন’ নামক ফটক। দরজার চৌকাঠের নিম্ন দিকের কাঠখানা না থাকিলে যেরূপ হয়, ঠিক সেই ধরণে দুইদিকে কাষ্ঠ, প্রস্তর বা লৌহাদি দ্বারা প্রস্তুত দুইটি স্তম্ভ ও ওপরে আড়াআড়ি ভাবে আর একটী-দুটী থামকে সংযোগ করিয়াছে। অভ্যন্তরে নির্জ্জন শান্তির আলয় স্বরূপ সুদৃশ্য বাগান ও মন্দির, সম্মুখে সমুদ্র, উপর হইতে বড়ই সুন্দর দেখা যায়।
এখানে অনেক জাপানী আমাকে বিদেশী দেখে ব্যগ্র হয়ে দেখিতে লাগিল।
১৫ই ডিসেম্বর--- বৈকালে কোবে পৌঁছিলাম। জাহাজ লাগিবার পূৰ্ব্বে ডাক্তার পরীক্ষা করিলেন। হংকংএর পর হইতে মাত্র ৩/৪ জন জাপানী আরোহী ছিলেন। আমরা এখানে নামিব, পূর্ব্বেই এক হোটেলে জানান হয়েছিল। হোটেলের লোক এসে আমাদের জিনিষপত্র গুছাইয়া লইল। আমরা নৌকা ক'রে তীরে উঠিলাম। কাষ্টম্ হাউসে (Custom House ) জিনিষগুলি দেখাইতে হইল। বৃষ্টি হইয়া রাস্তা এতো খারাপ হইয়াছে যে চলা দুষ্কর। এদেশের রাস্তা ভালো নয়। রাস্তায় ফুটপাথ নাই। এদেশীলোক বুগুরি নামক কাঠের খড়ম পরিয়া বৃষ্টি ও বরফ পাতের সময় চলাচল করে। বুগুরির তলার উচ্চ কাঠের দ্বারা মাটী উঠিয়া উঠিয়া রাস্তায় প্রায় হাঁটু পর্যন্ত কাদা হয়। এরা উচ্চ হইতে উচ্চতর বুগুরি ব্যবহার করে, তাহাতে এদের কিছু যায় আসে না; কিন্তু জুতাধারীদের বড় বিপদ। রাস্তার দুইধারে কাষ্ঠনির্মিত বাড়ী। জাহাজ হইতে সমুদ্রতীরে মাঝে মাঝে ছোট ছোট কাঠের কুঠরী দেখিয়া ভাবিতাম, আমাদের দেশে নদীতীরে যেমন মাঝে মাঝে গ্রামের পর্ণকুটীর দেখা যায় ইহাও বুঝি সেইরূপ। কিন্তু সহরের রাস্তার উভয় পার্শ্বেও সেইরূপ ছোট ছোট কুঠরিতে দোকানাদি সাজান রহিয়াছে। মাঝে মাঝে পোষ্টাফিস, কাছারী, থিয়েটারের বাড়ী ইত্যাদি ইষ্টক নিৰ্ম্মিত দেখা যায়।
আমরা হোটেলে উঠিলাম। বাড়িটা কাঠের; প্রাচীর, গৃহের মেজে, সব কাষ্ঠ-নিৰ্ম্মিত। মেজেতে মাদুর মোড়া, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। নীচে জুতা খুলে চক্চকে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠিলাম। বসিতে তুলাভরা ‘ফুতন’ (আসন) দিল। হোটেলের দাসীগণ, যখন যাহা প্রয়োজন হয়, অত্যন্ত যত্নের সহিত ও বিনীতভাবে সম্পন্ন করে। ইহাদের আদর যত্ন বড়ই প্রীতিকর। প্রবেশ মাত্র মাথা নোয়াইয়া অভিবাদন করিয়া জিজ্ঞাসাদি করে ৷ হাঁটু গেড়ে বসিয়া নম্র ও সুমিষ্ট ভাবে কথা বলে। সম্মুখ হইতে যাওয়ার সময় মাটীতে মাথা ঠেকাইয়া প্রণাম করে।
সন্ধ্যাকালে দুইজন পত্রিকার সম্পাদক সাক্ষাৎ করিতে আসিলেন এবং আমাদের বিষয় জ্ঞাত হইয়া সংবাদপত্রে আমাদের সংবাদ ও ছবি দিতে চাহিলেন। ইন্ডিয়ায় তাকেদাসানের এক জাপানি বন্ধু— কাওয়াগুচি সান্ (Kawaguchi san) আমাদের বিবাহের পর কাশী হইতে যে পত্র লিখেছিলেন তাহা দেখান হইল। পত্র খানির মর্ম্ম এই— “তুমি যাঁহাকে বিবাহ করিয়াছ তাঁহার পিতা অতি সৎলোক বলিয়া খ্যাত। অনেকের নিকট তাঁহার সুনাম শুনিতে পাই। এই সকল সুলোকের সহিত সর্ব্বদা সদ্ভাবে থাকিবে। আশা করি তুমি যুদ্ধে পশ্চাৎপদ হওয়ার ন্যায় জাপানীদের দুর্নাম করিবে না।”
তৎপরদিন খবরের কাগজে বাহির হইল, “মি. তাকেদা ইন্ডিয়ার অমুকের কন্যাকে বিবাহ করিয়া কয়েক বৎসর পর সস্ত্রীক পরমানন্দে স্বদেশে আগমন করিয়াছেন। আনন্দ যেন তাঁহার চক্ষু হইতে উহ্লাইয়া পড়িতেছে।” ইত্যাদি।
জাপান হইতে টেলিগ্রাম করার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু প্রতি শব্দে প্রায় ৩ ক'রে খরচ হয় ব'লে করিলাম না।
১৭ই ডিসেম্বর——- শীতে ৭টার পূর্ব্বে উঠা কষ্টকর। প্রত্যুষে হোটেলের ভৃত্যগণ প্রাতঃকালীন আহারের (এখানে প্রাতে ভাত খায়) বন্দোবস্ত করিয়া আমাদের জিনিষপত্র গুছাইয়া দিল। পূর্ব্বরাত্রে বিল করিয়া হিসেব পরিষ্কার ক'রে দেওয়া হয়েছিল। হোটেলে দৈনিক ১.৫ ইয়েন খরচ; মধ্যাহ্নাহার ভিন্ন। একজন ভৃত্য আমাদের টীকিটাদি করিয়া ট্রেনে উঠাইয়া দিল। ইন্ডিয়ায় ফিরিবার সময় পুনঃ এই হোটেলে আসিতে অনুরোধ করিল। প্রাতে ৮টার ট্রেনে রওনা হইয়া অপরাহ্ন ৩টায় বাড়ীর নিকটবর্ত্তী ষ্টেশনে পৌছিলাম। এখানে ট্রেনের ব্যবস্থা বেশ সুখকর। গাড়ীর সম্মুখ ও পশ্চাৎ দিকে দুটী দরজা এবং সকল ট্রেনগুলিতে লম্বাভাবে চলাচল করার জন্য সেতু আছে। মাঝে মাঝে স্টেশনে গাড়ীগুলি ঝাড়ে ও জল দিয়া মুছিয়া দেয়। তৃতীয় শ্রেণীর গাড়ীগুলি আমাদের দেশের দ্বিতীয় শ্রেণীর ন্যায়। বেঞ্চগুলিতে গালিচার ন্যায় নরম গদি পাতা। সেকেন্ড ক্লাসে মখমলের গদি। নিষ্ঠীবন, সিগারেটের ছাই প্রভৃতি ফেলিবার জন্য পাত্র থাকে। আমাদের দেশে গাড়ীগুলি যেমন একেবারে অপরিষ্কার হয়ে থাকে, এখানে সেরূপ হয় না; হলেও মাঝে মাঝে পরিষ্কার করা হয়। শীতের জন্য গরম জলের পাইপ আছে। আরোহীগণ সঙ্গে অধিক জিনিষ লয় না, সমুদায় জিনিষ মালগাড়ীতে দেয়। ট্রেনে উঠিবার সময় ঠেলাঠেলি করিতে হয় না। স্থানীয় কৰ্ম্মচারী ও যাত্রীগণ পরস্পর পরস্পরের সুবিধার দিকে দৃষ্টি রাখিয়া সাহায্য করিতে প্রস্তুত। জাতীয় একতা পথে ঘাটেও পূর্ণরূপে অনুভব করা যায়। পৰ্ব্বতময় দেশ বলিয়া ট্রেন মাঝে মাঝে পর্ব্বতের মধ্য দিয়া যায়। যখন অধিকক্ষণ অন্ধকারে থাকে, তখন আলো জ্বালাইয়া দেওয়া হয়। সকল ট্রেনে চলাচল করার বন্দোবস্ত থাকায় দেখিলাম অনেকে তাদের জিনিষ বিক্রয়ের জন্য সকল ট্রেনেই ঘুরিয়া অনর্গল তাহার বর্ণনা ও প্রশংসা করিয়া বেড়াইতেছে ও বিক্রয় করিতেছে। ইহাতে বেশ সুবিধা মনে হইল। এক ষ্টেশনে উঠিয়া চলন্ত অবস্থাতে অন্ততঃ বিজ্ঞাপনটা দেওয়া হয়। ষ্টেশনে মাঝে মাঝে সংবাদপত্র বিক্রয় হয়। এখানে দৈনিক সংবাদপত্রের ছড়াছড়ী। ট্রেনে সকলের হাতে এক একখানি পত্রিকা। ষ্টেশনে ভাত, ওচা, মেঠাই, দুধ ইত্যাদি বিক্রয় হয়। রাস্তায় চলিতে চলিতে ভাত খাওয়া বন্ধ হয় না। ছোট কাঠের বাক্সে করিয়া ভাত তরকারি এক একটী খোপে রাখিয়া বিক্রয় করে। সঙ্গে ভাত খাওয়ার জন্য দুটী কাঠি ফিতা দিয়া বাঁধা থাকে। ১ বাক্স ভাত চার আনা, আট আনা বিক্রয় করে। ষ্টেশনে আমার দুই দেবর এসেছিলেন। আমরা নামিতে নামিতেই দেখি ষ্টেশন ক্রমে লোকারণ্য হইতেছে। সকলে ‘ইন্দোজিন' দেখিবার জন্য ছুটিয়া আসিতেছে। আমরা রিক্সে করে বাড়ী আসিলাম। জাপানে ঘোড়ার গাড়ী নাই বলিলেই হয়। এখানে রিক্সে একজন বসে ও মানুষ ঘোড়ার মতো টানে।
সন্ধ্যার অল্প পূর্ব্বে বাড়ী এসে পৌঁছিলাম। বাড়ী একখানা গ্রামে; চারিদিকে মাঠ। এখন মাঠে গম মুলা গাছ। অন্যান্য বৃক্ষ ও “কুবানোকি” (সিল্ক-পোকা বৃক্ষের পাতা খায়) প্রভৃতি অনেক পত্রশূন্য বৃক্ষ শুষ্ক অবস্থায় দণ্ডায়মান। ষ্টেশন হইতে এই গ্রামটী অনেক দূরে। গ্রামের নিকটস্থ হইতেই আত্মীয় স্বজনগণ পরিবেষ্টন করিয়া বহুলোক একত্রে আনন্দ প্রকাশ ও অভিবাদনাদি করিতে লাগিলেন। আমরা গৃহ প্রবেশের পূর্ব্বে নিকটস্থ পূর্বোল্লিখিত “তোরিন” অভ্যন্তরস্থ নির্জ্জন স্থানে ক্ষুদ্র প্রার্থনায়— যিনি আজ আমাদের বুকে ক'রে, কত অবস্থায় রক্ষা করে, এতোদিনের প্রাথিত স্থানে আনিয়া প্রিয় ও পূজনীয় জনগণের সহিত মিলিত হইবার সুযোগ দান করিলেন, সেই বাঞ্ছাকল্পতরু ভগবানকে ধন্যবাদ দিলাম। আমরা গৃহে আসিলে, আমাদের বসিবার আসন, অগ্নিপাত্র, দুগ্ধ-শর্করা ব্যতীত এদেশীয় “ওচা” (চা) ও কিছু পিষ্টক দিলেন। তাকেদাসানের আত্মীয়স্বজন-গণ, আজ আমরা আসিব ব'লে নিমন্ত্রিত হইয়া একত্র হইয়াছিলেন। আজ নয় বৎসর পরে যে পিতামাতা ও আত্মীয়গণ বহুদিন পুত্রের কোনো সংবাদ না পাইয়া বিদেশে তাঁহার মৃত্যুই স্থির করিয়াছিলেন ও পরে সংবাদ পাইয়াও মিলিত হইবার আশা প্রায় ছাড়িয়া দিয়াছিলেন, তাঁহারা আজ কত আনন্দিত হইলেন! চারিদিকে উপস্থিত সকলে ঘিরিয়া আনন্দ করিতে লাগিলেন। খুব শীত। আমরা অগ্নির পার্শ্বে বসিলাম। আমি এদেশী নিয়মে হাঁটু ভেঙ্গে বসিলাম, হাঁটু ভাঙ্গিয়া পা দু'খানি পিছনের দিকে রাখিয়া তদুপরি বসিতে হয়। অনভ্যাসে আমাদের বড় কষ্ট হয়। একে একে সকলে দেখা করিতে লাগিলেন। ছোট বড় সকলেই টুপী খুলিয়া জানুর উপর উপবেশন পূৰ্ব্বক মস্তক অবনত করিয়া (আমাদের দেশে পদধূলি লওয়া ব্যতীত প্রণামের নিয়মানুসারে) পরস্পর পরস্পরকে অভিবাদন করিলেন। একে একে সকলে নিজ নিজ পরিচয়ের সঙ্গে অভিবাদন, কুশলাদি জিজ্ঞাসা, ধন্যবাদ ও আনন্দ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। প্রত্যেক প্রশ্নে ও উত্তরে উভয়ে ৩/৪ বার মাথা নীচু করা এদের প্রথা। আমি জাপানী ভাষা বলিতে পারি না ব'লে নীরবে প্রণাম করিলাম। প্রথমে ভাবিয়াছিলাম, আমি গুরুজনদের প্রণাম করিতেছি, কিন্তু দেখি, দেশীয় প্রণালী অনুসারে উঁহারাও মাথা মাটিতে ঠেকাইয়া আছেন।
আমার শাশুড়ী ঠাকুরাণী স্বহস্তে আমার খাবার প্রস্তুত ক'রে দিলেন। শীতের জন্য বড় কষ্ট পাইতেছি ইত্যাদি বলিয়া তাড়াতাড়ি বিছানা প্রস্তুত ক'রে দিলেন ও শীঘ্র শয়ন করিতে বলিলেন। নিমন্ত্রিতগণ আহারের পর নিজ নিজ গৃহে গমন করিলেন। পরদিন বৈকালে আমার খুড়তত দেবরের বাড়ী বেড়াতে নিয়ে গেলেন। তাঁহার সিল্কের কারবার। গুটী থেকে সূতা বাহির করা হইতেছে দেখিলাম। ২০/২৫ জন মেয়ে গুটীগুলি গরম জলে ফেলিয়া সূতা বাহির করিতেছে। প্রত্যেকে এক একটি পৃথক চাকায় সূতা আটকাইয়া দেয় আর একত্রে সব চাকা ঘুরিয়া ঘুরিয়া সূতা জড়ায়, তৎপর পোকাগুলি ফেলিয়া দেয়।
আমাদের আসার সংবাদ শুনিয়া অনেক লোক সৰ্ব্বদাই আমাদের দেখিতে ও ভারতের কথা শুনিতে আসিতেন। আমাদের দেশের আহারাদি, পরিচ্ছদ, আচার, রীতি, ধর্ম্ম, আমার আত্মীয়বর্গ ইত্যাদি অনেক বিষয় সম্বন্ধে অনেকে জিজ্ঞাসা ক'রে জানিলেন। তাকেদাসান্ বুদ্ধদেবের সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং অন্যান্য ভারতীয় মহাপুরুষ, ভারতের সতীধর্ম্ম ইত্যাদি নানা বিষয়ের গল্প বললেন। গল্প শোনার জন্য সন্ধ্যাকালে পাড়ার ছোট ছোট মেয়েরা দিবসের কাজ শেষ করিয়া এসে জড় হইত ৷ ক্রমে গৃহখানি লোকে পূর্ণ হইত। বৈকালে স্কুলের ছেলে মেয়েরা আমায় দেখিবার জন্য দলবদ্ধ হইয়া আমাদের বাড়ির প্রাঙ্গণে খেলিতে আসিত। প্রতিদিন এরূপে আসিয়া আমায় অনেক সময় ব্যস্ত করিয়া তুলিত। ছেলেদের গোলমাল ও উৎপাত বন্ধ করিবার জন্য অনেকে চেষ্টা করিতেন। পরে শ্বশুর মহাশয় দরজা বন্ধ করিয়া তাহাদের তাড়াইয়া দিতেন। ছোট ছোট ছেলে মেয়ে অনেকে প্রথমে আমার নিকট আসিতে লজ্জা ও ভয় করিত। অপেক্ষাকৃত বড় মেয়েদের মধ্যে কেহ কেহ সাহস করিয়া আসিয়া আমাকে নানা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রশ্ন করিয়া আলাপ করিতে চাহিত। তাদের দেখাদেখি ছোট মেয়েরা এসে খাবার কি খেলনা পেয়ে পরে ততটা দূরত্ব ছেড়ে প্রাতে আমার নিকট ভয়ে ভয়ে এসে জুটিত।
২০এ ডিসেম্বর প্রাতে ৯টায় নাগোয়া সহরে রওনা হই ৷ হেঁটে গ্রামের নিকটস্থ ক্ষুদ্র সহর কোচিনো যাই। এখান থেকেই প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি গ্রামে সরবরাহ করে। এখান থেকে ট্রামে যাই। ভারত হইতে আসিবার সময়কার জাহাজের কাপ্তেনের A Takeda নামে এক ভাই নাগোয়াতে থাকেন। তিনি কোবে থাকা কালে তাঁহার (উক্ত কাপ্তেনের) নিকট আমাদের সংবাদ পাইয়া তাঁর ওখানে বেড়াইতে যাইতে বলেন ও পরে নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া যান। আমরা প্রায় ১০টায় ওঁদের বাড়ীতে পৌঁছিলাম। উঁহারা খুব আনন্দের সহিত আমাদের গ্রহণ করিলেন। এখানে আমাদের দেশীয় চা পাওয়া যায়। ওঁদের “ওচার” পরিবর্ত্তে চা-বিস্কুট দিলেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর বেড়াতে গেলাম। একটী সুন্দর বড় ‘ইতো’ নামক দোকান আছে। কাঠের তিনতালা বাড়ীটি, মেজেটা কার্পেট ও মাদুর মোড়া। জুতার নীচে একটা কাপড়ের ঢাকনি দিয়ে দিল। এদেশী কাষ্ঠপাদুকা (গেতা) পরে গেলে, নীচে ভৃত্যদের নিকট খুলে রেখে যেতে হয়; তারা কাঠের নম্বর লেখা একটী পাশ দেয়, সেটা ফিরিবার সময় দিলে গেতা ও গচ্ছিত অন্য যে কোনো জিনিষ ফেরৎ দেয়। দোকান সুন্দর নানাবিধ দ্রব্যে সুসজ্জিত। দেশী বিদেশী পোষাক পরিচ্ছদ, সৌখীন প্রয়োজনীয় দ্রব্য হইতে দেশী ও বিদেশী আহারের বন্দোবস্ত পৰ্য্যন্ত আছে। এখানেই আমাদের খাওয়া হইল। এর ভিতরে একটী গৃহে নানারূপ ফুল, বৃক্ষ, লতা প্রভৃতি রাখা হইয়াছে। বাহিরের শীত ঘরে প্রবেশ করিতে পারে না, সে জন্য এই শীতেও গাছগুলি সতেজ ও ফুলগুলি প্রস্ফুটিত রহিয়াছে। মাঝে মাঝে দর্শকগণের তৃপ্তির জন্য কনসার্ট বাজনা বাজিতেছে। নাগোয়াতে যে যে কাজ ছিল তাহার সুবিধার জন্য উক্ত ভদ্রলোক যথেষ্ট সাহায্য করিলেন। এখানে রাত্রে থাকিয়া পরদিন প্রাতে Ise নামক স্থানে গেলাম। ইহা এদের একটী তীর্থস্থান। সারাদিন কিছু কিছু বৃষ্টি হইল। মিঃ তাকেদার শরীর হঠাৎ খারাপ হওয়াতে এখানে এক হোটেলে রইলাম।
২২এ ডিসেম্বর প্রাতে আহারের পর মন্দির দেখিতে রিক্সে করিয়া চলিলাম। মন্দিরের প্রবেশ পথে সুবৃহৎ ‘তোরি’তল হইতে মাথার টুপী ও আবরণাদি খুলিয়া প্রবেশ করিতে হয়। এখানে প্রহরী থাকিয়া নিয়ম পালন করাইতেছে। একটী ক্ষুদ্র স্রোতস্বতী পাহাড়ের গাত্র বাহিয়া ঝির ঝির করিয়া যাইতেছে। প্রথমেই তার পবিত্র জলে হস্ত মুখ প্রক্ষালন করিতে হইবে। এই শীতে বাগানের বাতাসে সমস্ত শরীর জমিয়া যাওয়ার উপক্রম, তাহাতে আবার শীতল জলে হাত দেওয়া! কি করিব, একটু স্পর্শ করিলাম ৷ স্বচ্ছ পরিষ্কার জল। সুন্দর ও সু-বৃহৎ বাগান। বহু পুরাতন দেবদারু ও তদনুরূপ বৃক্ষ রহিয়াছে। একটী গৃহে মন্দিরে দেবতা কামিসামার যুদ্ধে যাওয়ার জন্য কয়েকটী ঘোড়া, একটী তাঁর সাজগৃহ। মাঝে মাঝে এরূপ কয়েকটা ঘর। ইহা যুদ্ধাদিতে সাহায্যকারী দেশহিতৈষী দেবতার মন্দির। দেশে যুদ্ধ বিদ্রোহ, কোন অশান্তি বিপদ দুর্ভিক্ষ প্রভৃতি হইলে দেশের রাজা হইতে সকলেই নাকি দলে দলে সৰ্ব্বদা পূজার্চ্চনা করেন। বৃহৎ বাগানের অভ্যন্তরে মন্দির-দ্বার, মন্দিরের দ্বারদেশ শ্বেতবস্ত্রের পরদায় আচ্ছাদিত। একটী বাগান আছে, তাহাতে দেবতাদের সেবার্থ কিছু দিয়া বিদায়, মন্দিরে ঠাকুর দর্শন এখানেই শেষ। মন্দির চারিদিকে কাঠের প্রাচীর বেষ্টিত একখানি বাড়ী। তাহাতে ক্রমে ক্রমে তিনটী দরজা অতিক্রম করিয়া ভিতরে একটী গৃহে ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত। বাহির হইতে মন্দিরের পিতল নির্ম্মিত বাড়ীটী কেবল দেখা যায়। সাধারণের ভিতরে প্রবেশাধিকার নাই। জানি না ঠাকুরের রূপ কিরূপ। এই সুবিশাল মন্দিরে সেই নিরাকার দেবতা প্রতিষ্ঠিত—- ইহাই বেশ অনুভব করা যায় ও এখানকার ঠাকুর দর্শনাভাবটা সে অনুভবেরই সাহায্য করে। দেখিলাম অনেকে মন্দিরে আসিতেছেন। বাগানের একদিকে রুশযুদ্ধে অধিকৃত ২টা বৃহৎ কামান, চীন যুদ্ধের একটী, আরও ছোট ছোট কয়েকটী কামান ও যুদ্ধ-জাহাজের একটী বৃহৎ নঙ্গর রাখা হইয়াছে। ‘ইসে’তে এইরূপ আর একটী বাগান পরিবেষ্টিত মন্দির আছে। এখানকার একটি পুকুরে লাল মাছ ও বড় বড় নানা রকম মাছ আছে। পরিষ্কার স্বচ্ছ জলে মাছগুলি খাবার পাওয়ার লোভে দর্শকদের সামনে আসিয়া একত্র হয়। পুকুরের পাড়েই বিস্কুটাদি বিক্রয় হয়, দর্শকগণ মাছগুলিকে খাওয়ায় ও আমোদ করে। মন্দির দর্শন করিয়া সন্ধ্যার সময় ট্রেনে বাড়ী ফিরিলাম। মিঃ তাকেদার একটী খুব বড় ফোঁড়া হওয়াতে কয়েকদিন খুব কষ্ট হইল।
১লা জানুয়ারী নববর্ষ। পূর্ব্বদিন ঘরের মাদুর তুলিয়া সব পরিষ্কার করা হয়। সকলে নববস্ত্রে ভূষিত হইয়া আমোদ আহ্লাদ করে। জানুয়ারী মাসের প্রথম দিন সহরে লোকেরা নববর্ষের আমোদ করিয়া থাকে। সাত দিন নববর্ষের আমোদ হয়। কয়দিন ধরিয়া মন্দিরে পূজাদি হয়। নানাবিধ ক্রীড়া কৌতুক, সৈন্যদের কুচ কাওয়াজ ইত্যাদি হয়। গ্রামে এতদ্দেশীয় নববর্ষ উপলক্ষে আমোদ প্রমোদ হইয়া থাকে। প্রাতে নববস্ত্র পরিধান করিয়া মন্দিরে প্রণাম করিয়া আইসে। ছেলে মেয়েরা সকলে বেড়ায়, খেলা করে, ঘুড়ি উড়ায়। বাড়ীঘর পাতা ও নিশান দিয়া সজ্জিত করে। ২রা তারিখ প্রাতে স্নান করিয়া সকল কার্য্যে হাত দেয়। যার যে কাজ তাহা কিয়ৎ পরিমাণে আরম্ভ করিয়া শুভক্ষণ করিয়া রাখে। পিষ্টকাদি প্রস্তুত করিয়া আগে গৃহদেবতাকে উৎসর্গ করিয়া পরে সকলে আহার করে। জানুয়ারীর ১৪ই আমরা টোকিও যাই। সেখানে কুড়ি দিন আমরা আমার ছোট ননদের বাড়ী ছিলাম। এখানে তাঁহার স্বামীর দোকান আছে। ১৩ই সন্ধ্যার ট্রেনে রওনা হইয়া ১৪ই প্রাতে ষিমবাসী (টোকিওর ষ্টেশন) নামিলাম। এদেশে আরোহী ভিন্ন অন্য লোক ট্রেনের নিকটে যাইতে পারে না। যদি কেহ আত্মীয়কে ট্রেনে উঠাইয়া দিতে ইচ্ছা করে, তবে প্ল্যাটফরমে আসিবার জন্য কয়েক পয়সার টিকিট কিনিতে হয়।
টোকিও জাপানের রাজধানী টোকিওতে বিশেষ বিশেষ কয়েকটী বাড়ী ব্যতীত সকলই কাঠের বাড়ী। সহরটী রাজধানী হিসাবে বিশেষ কিছু জমকাল ব’লে বোধ হয় না। রাস্তায় সর্ব্বদা রিক্স, ট্রাম চলে, কদাচিৎ ঘোড়ার গাড়ী দেখা যায়। সহরের রাস্তাগুলি খুব বিস্তৃত। বৃষ্টির পর রাস্তার অবস্থা সৰ্ব্বত্রই সমান হয়। কাষ্ঠ-পাদুকা পরিয়া চলাতে আরও গভীর কাদা হয়। ট্রাম বেশ সুবিধাজনক, পাঁচ পয়সার এক টিকিটে সহরের যে কোন স্থানে যাওয়া যায়। ট্রাম বদলাইতে হইলেও এক টিকিটেই চলে। গাড়ী একখান করে চলে; শ্রেণীবিভাগ নাই। ট্রামের সম্মুখে ও পশ্চাদ্দিকে দ্বার। ট্রামে উঠিলে কন্ডাক্টার টিকিট দিয়া যায়, নামিবার সময় তাহাকে টিকিট খানা দিয়ে যেতে হয়। নির্দিষ্ট লাল রংয়ের স্তম্ভ চিহ্নিত স্থানে ট্রাম থামে। থামিবার পূর্ব্বে কন্ডাক্টার পরবর্ত্তী স্থানের নাম বলে ও নামিবার লোক আছে কি না জিজ্ঞাসা করে, উত্তর না পাইলে থামায় না। সময় সময় সাবধানে ধীরে ধীরে উঠা নামা করিবার উপদেশ দেয়। রাস্তার ধারে স্থানে স্থানে এক একটি ক্ষুদ্র কুঠরীতে পুলিশ ব'সে থাকে। তাহার কাছে কোন বিষয় জিজ্ঞাসা করিলে ব'লে দেয়। জাপানে পুলিশের নিকট তরবারী থাকে। পুলিশ কোনরূপ অত্যাচার উৎপীড়ন না করিয়া শান্তিরক্ষা করে এবং সকলের সহিত শিষ্ট ব্যবহার করে। স্থানে স্থানে টেলিফোন করার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘর আছে, পাঁচ পয়সা দিয়া টেলিফোনে পাঁচ মিনিট কথা বলা যায়। ১৬ই জানুয়ারী— আমরা একটি মেয়েদের স্কুল দেখিতে গিয়াছিলাম। স্কুলের এক শিক্ষয়িত্রী আমাদের সব দেখাইলেন। ইনি ইংলন্ডে গিয়াছিলেন; সুশিক্ষিতা, ইংরাজী বেশ জানেন। ২/৩ ঘণ্টা ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখিলাম। সংসারে উন্নত জীবন লাভ করিয়া প্রকৃত মানুষ হইতে হইলে ও সন্তানসন্ততি এবং দেশবাসীদের মানুষ করিতে হইলে যে শিক্ষার প্রয়োজন তার বুঝি কোনটিরই এখানে অভাব নাই। স্কুলটিতে রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা, ভূবিদ্যা, সাধারণ শরীরতত্ত্ব ইত্যাদি কলেজের পাঠ্য উন্নত বিষয় হইতে রন্ধনকার্য্য, ধোপার কাজ, গৃহাদি পরিষ্কার, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যানের কাজ, সেলাই, গান বাজনা, শিল্প কাজ, ড্রইং, নীতিশিক্ষা, ইংরাজী ভাষা ইত্যাদি শিক্ষা দেওয়া হয়। শিশুদের বই পড়ান হয় না। তাহাদিগকে কাগজ কাটা, ছবি আঁকা, মাটির দ্রব্যাদি প্রস্তুত করা ও গল্পচ্ছলে নীতি বিষয়ে নানা প্রকার শিক্ষা দেওয়া হয়। মাটি দিয়া 'ফুজিয়ান' (পাহাড়), ‘সুমিদা' (নদী) প্ৰস্তুত ক'রে ভূগোল শিক্ষা দেয়। ছড়া বলার মত গান ক'রে বড় বড় নগরের ও সহরের বড় বড় স্থানের নামগুলি মুখস্থ করে। শিশুদের হস্তনির্ম্মিত মাটির দ্রব্যগুলি ও চিত্রগুলি দেখিলে অবাক হইতে হয়।
একটি ক্লাসে দেখিলাম ৩/৪ বৎসরের শিশুগণ কাগজ ও তুলি লইয়া ছবি আঁকিতেছে। তাহাদের ক্ষুদ্র হস্তের ছবিগুলি দেখিবার জিনিষ। আর একস্থানে কতকগুলি শিশু বাগানে কাজ করিতেছে। কোথাও বা মেয়েরা কেমিষ্ট্রী আলোচনা করিতেছে। কাচের পাইপের ভিতর নানারূপ গ্যাস সংযোগ বিয়োগে নানা শিক্ষালাভ করিতেছে। মেয়েদিগকে আদব কায়দা, পরস্পর সম্মান রাখার জন্য যে সকল কথা বলিতে হয়, বিনম্রতা, গুরুজনে ভক্তি ইত্যাদি শিক্ষা দেওয়া হইতেছে। জাপানে পরস্পর সম্মান প্রদর্শন করিয়া কথা বলার আদব কায়দা দেখিলে ইহাদের বিনম্র ভাব বোঝা যায়। যেমন প্রাতে উঠিয়া সন্তান পিতামাতার নিকট, অপরে অপরের নিকট মাথা নীচু করিয়া প্রাতঃপ্রণাম করিবে, এরূপ শয়নকালে ও অন্যান্য সময় করিয়া থাকে। তবে কথাগুলি বিভিন্ন। পাড়া প্রতিবেশীর সহিত সাক্ষাৎ হইলে নমস্কার জানান হয়। বাড়ীতে কেহ বেড়াইতে আসিলে তাঁহাকে অতি নম্রতার সহিত হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া অভিবাদন পূর্ব্বক সাদরে গ্রহণ করিয়া যত প্রকারে হয় নিজের ক্ষুদ্রতা জানাইয়া তাঁহার প্রতি শিষ্ট ব্যবহার করিয়া থাকে। অভিবাদন, ধন্যবাদ প্রদান যেন প্রতি কথায় লাগিয়াই রহিয়াছে। একটু অনুগ্রহ পাইলেই মাথা নীচু করিয়া ধন্যবাদ প্রদান করিতে থাকে। কথা বলিবার এরূপ রীতি যে, তাহাতে নিজের ক্ষুদ্রতা প্রকাশ পায় ও অপরকে যথেষ্ট সম্মান দেওয়া হয়। বিদায়কালে অভিবাদনাদি করিয়া বিদায় লইলে ‘আবার এস’ বলিয়া বিদায় দেয়। জাপানে নিরক্ষর স্ত্রী পুরুষ অতি বিরল। গবর্ণমেন্টের বিশেষ চেষ্টায় সকলেই ৮ বৎসর বয়স হইতে স্কুলে যাইতে বাধ্য। পূর্ব্বে প্রায় মা-র নিকট হইতেই শিক্ষা প্রাপ্ত হয়।
জাপানী অক্ষর বড় কঠিন। নির্দ্দিষ্ট কতকগুলি অক্ষর আছে, তাহার প্রত্যেকটীর কোন কোনটা ৮/১০ রকম আকারে লিখিত হয়। তাছাড়া এদের এক একটী শব্দের জন্য এক এক রকম অক্ষর আছে; তাহা যে যত শিখিতে পারে সে তত বিদ্বান বলিয়া গণ্য। এরা নিজ নিজ উন্নতির জন্য যে কোন নীচ কাজ করিতে অপমান বোধ করে না। একখানি পত্রিকায় দেখিয়াছি, একজন ভারতবাসী জাপানে কলেজে অধ্যয়ন কালে একদিন বর্ষার মধ্যে যখন হাঁটিয়া বাসায় যাইতেছিলেন তখন তাঁর একজন জাপানী সহাধ্যায়ী তাঁর নিকট রিক্স আনিয়া দরকার আছে কি না জিজ্ঞাসা করেন। উক্ত ভারতবাসী তাঁহাকে চিনিতে পারিয়া কিছু বলিতে চেষ্টা করিতেই জাপানী ছাত্রটি বলে, “আমি গাড়োয়ান, অন্য কথার প্রয়োজন নাই।” ভারতবাসী গাড়ীতে না যাওয়াতে তিনি অন্যদিকে ভাড়ার অনুসন্ধানে প্রস্থান করেন। এরূপ ঘটনা জাপানে বিরল নহে। স্কুল কলেজে পড়ে এরূপ অনেক ছাত্র ছুটী পাইলেই গাড়ীভাড়া করিয়া আনিয়া তাহা টানে, বাজারের মাছ তরকারী কুলির মত বাড়ী বাড়ী সরবরাহ করে। (এখানে বাজারে সমুদয় জিনিষ বিক্রেতা অর্ডার মত বাড়ী বাড়ী পাঠাইয়া দেয়) এরূপ সুযোগ মত যে যাহা পারে করিয়া থাকে। আমার এক ননদের স্বামীর নিকট একটী ভৃত্য এইরূপ কুলির কাজ করিয়া জীবিকা নির্ব্বাহ করে। মধ্যাহ্নে কিছুক্ষণ ছুটী পায়, সে সময় পড়ে। রাত্রে একজনের নিকট ইংরাজী শিক্ষা করে। তার ইচ্ছা কিছু ইংরাজী শিখিয়া সে ইউরোপে ও আমেরিকায় যাইবে।
১১ই মাঘ— মাঘোৎসব। এতদুপলক্ষে টোকিও প্রবাসী একজন ভারতবাসীর গৃহে ব্রহ্মোপাসনার বন্দোবস্ত হইল। আরও ৩/৪ জন ভারতবাসী উপস্থিত ছিলেন। সকলে এক আহারাদি হইল।
টোকিওতে কয়েকটী পার্ক আছে। তন্মধ্যে একটী “আসাকু কোয়েন” আমোদ প্রমোদের স্থান। পার্কে প্রবেশ করিলে একটী মন্দির। তৎপরে স্থানে স্থানে সার্কাস, বায়স্কোপ, নাটক ইত্যাদি কত কিছু হইতেছে। প্রাতঃকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত এগুলি খোলা থাকে। অল্প পয়সায় খুব ভাল ভাল তামাসা যতক্ষণ ইচ্ছা দেখা যায়। অনেক লোক দেখিতে আসে। অত্যন্ত ভিড় হয়। নানা প্রকার বাজনা বাজে। এখানে একটী ‘খানসামার’ দেবমন্দির আছে। আমরা ৩/৪ দিন এখানে বেড়াতে এসেছি। “উয়েনো’ নামক আর একটী পার্ক অনুচ্চ পাহাড়ের উপর অবস্থিত। এখানে অনেক সময় অন্তযুদ্ধ হয়। এবং সেই যুদ্ধের গোলা গুলির চিহ্ন এখনও দেখা যায়। এখানে একটী চিড়িয়াখানা ও একটী মিউজিয়ম আছে। মিউজিয়মে, মৃত মিকাডোকে কবর দিতে লইয়া যাইবার জন্য যে সুদৃশ্য মূল্যবান বাক্সটী ব্যবহার করা হইয়াছিল তাহা আছে। একটী বৃহৎ পুষ্করিণীতে গ্রীষ্মকালে পদ্মফুল ফুটিয়া বড়ই সুন্দর দেখায়।
টোকিওর মধ্যস্থলে স্বর্গগত মিকাডোর প্রাসাদের নিকটেই অতি সুন্দর ‘হিবিয়া' নামক ‘কোয়েন' (পার্ক) ইউরোপীয় ফ্যাসানে প্রস্তুত। বিস্তীর্ণ স্থান। পুষ্করিণীর ভিতরে ফোয়ারা হইতে জল উঠিতেছে। অনুচ্চ ক্ষুদ্র পাহাড়, খেলিবার মাঠ, কয়েকটী। সুদৃশ্য সাক্ষী, নানারূপ পুষ্পবৃক্ষ ইত্যাদি আছে। রাস্তাগুলি সুন্দর বাঁধান।
এখান থেকে অল্প দূরে 'কুদন' নামক স্থানে ‘শোকনষা' (বীরপূজার মন্দির) নামক একটী মন্দির; এখানে প্রতি বৎসর অত্যন্ত জাঁকজমকের সহিত দেশের মৃত বীরগণের উদ্দেশ্যে পূজা হয়। মন্দিরপার্শ্বেই অস্ত্র প্রদর্শনী। বিগত যুদ্ধের দ্রব্যাদি, বীরগণের ফটো ও স্মৃতিচিহ্নগুলি রক্ষিত রুশ ও চীন-যুদ্ধে ব্যবহৃত ও অধিকৃত অসংখ্য কামান, টর্পেডো, মাইন, বন্দুক, তরবারি ইত্যাদি কত কি যে রহিয়াছে তাহার সংখ্যা নাই। পূর্ব্বকালীন যুদ্ধাদির সাজ, অস্ত্রাদি ও দেশের জন্য যে বীরগণ প্ৰাণ দিয়া দেশের কল্যাণ সাধন করিয়াছেন এবং যাঁহারা দেশবাসীগণ কর্তৃক দেবতাজ্ঞানে পূজিত হইতেছেন তাঁহাদের ফটো ও স্মৃতিচিহ্নগুলি রক্ষিত হইয়াছে। পোর্টআর্থার বিজয়ী স্বর্গীয় জেনারেল নোগী ও তৎপত্নী যে বস্ত্ৰ পরিধান করিয়া ও যে তরবারি দ্বারা আত্মহত্যা করেন তাহা ও তাঁহার গৃহসজ্জাদি রক্ষিত। দেখিবার জন্য প্রতি জনকে পাঁচ পয়সার টিকিট কিনিয়া প্রবেশ করিতে হয়। বাহিরেও অনেক বড় বড় কামান রাখা হইয়াছে।
রাজপ্রাসাদ বাহির হইতে কিছুই দেখা যায় না। স্বর্গীয় সম্রাটের প্রাসাদ ‘মারু নোউচি’ ক্রমান্বয়ে দুইটী পরিখা ও দুইটী উচ্চ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। ইহার নিকটেই বর্তমান রাজপ্রাসাদ। ইহাও উচ্চ প্রাচীরে বেষ্টিত। নগরের ন্যায় বিস্তীর্ণ রাজবাটীর চারিদিকে কাছারী, বিশ্ববিদ্যালয়, থিয়েটারের স্থান প্রভৃতি বড় বড় ইষ্টক ও প্রস্তর নির্ম্মিত অট্টালিকা; এখানে বড় বড় লোকের বাস।
২৯এ জানুয়ারী— টোকিও হইতে ট্রেনে ৫ ঘণ্টার পথ ‘নিক্কো' নামক স্থানে গিয়াছিলাম। নিক্কো অতি সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যপূর্ণ পৰ্ব্বতময় স্থান। পাহাড়ের উপর চিত্র বিচিত্র নানা বর্ণে রঞ্জিত কাষ্ঠ ও পিত্তল নির্ম্মিত সুদৃশ্য বাড়ী ও প্যাগোডা (মন্দির)। ইহা পূর্ব্বকালের রাজবাড়ী ছিল।
একটী জলপ্রপাত হইতে ভয়ানক শব্দে হুড়হুড় করিয়া জল পড়িতেছে। যে পথে জল যাইতেছে তদুপরি একটী সুদৃশ্য লাল রংয়ের কাঠের সেতু আছে। ইহা পবিত্র সেতু বলিয়া ইহার উপর গমনাগমন নিষেধ। এখানে অত্যন্ত শীত। সবই তুষারাচ্ছন্ন। শীতে যেন শরীর আড়ষ্ট হইয়া যাইতেছিল। আমরা কয়েক ঘণ্টা মাত্র এখানে ছিলাম
জাপানের পূর্বতন রাজধানী কিয়োতো এঁদের পুণ্য তীর্থস্থান রূপে গণ্য। এখানকার নানা কারুকার্য্য বিশিষ্ট বড় বড় ‘ওথেলা’গুলি (দেবমন্দির) দর্শনীয়। একটী বাড়ীতে পূজাদি উপলক্ষে পূর্ব্বের রাজগণ আসিলে বসিতেন। বর্তমান রাজারও বসিবার ঘর আছে। গৃহের চতুদিকস্থ বারান্দাগুলি এরূপভাবে প্রস্তুত যে হাঁটিবার সময় পাখীর ডাকের মতো নানারূপ শব্দ হয়। সাধারণে পাঁচ পয়সার টিকিট কিনিয়া একবার বেড়াইতে পারে। ওথেলায় পিতল ও কাষ্ঠ নির্ম্মিত নানা কারুকার্য্য বিশিষ্ট সুদৃশ্য বড় বড় আলমারীতে ‘ওসাকাসান'- বুদ্ধমূর্ত্তি। সম্মুখে পিতলের ফুলদানীতে ফুলপাতা, পিতলের পাত্রে ধুনা এবং পিতল নির্ম্মিত ঝাড় ও প্রদীপ। সম্মুখে আলো ও ধুপধুনা জ্বালাইয়া উৎকৃষ্ট বেশধারী ‘বোসান' (পুরোহিত) উন্নত আসনে উপবিষ্ট হইয়া মন্ত্রপাঠ করেন। মাঝে মাঝে বৃহৎ ঘণ্টায় ঢং ঢং শব্দ করা হয়। বোসানদের পোষাক ভিন্ন রকমের এবং ইঁহারা মস্তক মুণ্ডন করেন। উপস্থিত লোকেরা মনোযোগের সহিত মন্ত্র শ্রবণ করে ও মাঝে মাঝে ‘নামান্দাত নামান্দাত' (অনেকটা হরিধ্বনি বা ঈশ্বরের কোন নামোচ্চারণের ন্যায়) শব্দে চারিদিক প্রতিধ্বনিত করে। যুক্তকরে ক্ষুদ্র রুদ্রাক্ষ বা কাচের মালা হাতে জড়াইয়া নমস্কার করে। পরে অপর একজন উপদেশ দেন। পূজা শেষ হইলে প্রতি জনের নিকট হইতে এক একটী ছোট ডালায় দুই, এক বা অর্দ্ধ পয়সা হিসাবে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। জাপানের ওথেলাগুলি সবই প্রায় এক ধরণেরই, পূজাদিও প্রায় এক পদ্ধতিতেই সম্পন্ন হয়, তবে মন্ত্রাদি ধর্ম অনুসারে বিভিন্ন রকম। কিয়োতোর মন্দিরে প্রতি বৎসর বিশেষ পূজার সময় বহুলোক গমনাগমন করে। এখানে (মোমোইয়ামা) পাহাড়ের উপর স্বর্গীয় মিকাডোর সমাধিস্থান। এখন সমাধি ও রাস্তাদি প্রস্তুত হইতেছে, সেজন্য কাহাকেও দেখিতে দেওয়া হয় না। পাহাড়ের কতকটা নীচে দর্শনার্থীরা [রাজার] উদ্দেশ্যে প্রণাম করিয়া যায়। প্রায় সকল রাজাদের এখানে সমাহিত করা হয়, কিয়োতোয় একটী বৃহৎ বুদ্ধমূৰ্ত্তি আছে। মূর্ত্তিটী কাষ্ঠনির্ম্মিত, উপরে পিতলের গিল্টি করা।
ওসাকা একটী বড় নগর। এখানে আমার এক ননদের বাটীতে দুই দিন রহিলাম। ওসাকা কলকারখানা, কারবার প্রভৃতির স্থান। এ দেশী আহার আমার পক্ষে অরুচিকর বলিয়া আমার নিজের তরকারী প্রায়ই নিজে রান্না করিতে আরম্ভ করিলাম। এ দেশে প্রাতে, মধ্যাহ্নে ও সন্ধ্যায় তিনবার অন্নাহার করে। রন্ধনাদি আমাদের দেশ হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভাতের ফেনা ফেলা হয় না। একেবারে এরূপ ভাবে জল দেওয়া হয়, যাহাতে চাউলগুলি ঠিক্ রকম সিদ্ধ হয়। তৈল, ঘৃত ও মশলা ছাড়া তরকারী, মাছ ও মাংস ‘সইও' নামক এক প্রকার দুর্গন্ধযুক্ত লবণাক্ত তরল পদার্থ দিয়া সিদ্ধ বা অর্দ্ধসিদ্ধ করা হয়। মাংসগুলি নাম মাত্র সিদ্ধ করিয়া লওয়া হয়, কাঁচা শুষ্কমৎস্য ও লবণাক্ত মৎস্য পোড়া ইত্যাদি ইহারা খুব আহার করে। মূলা এদেশের অতি প্রিয় খাদ্য। এখানে খুব বড় বড় মোটা মোটা মূলা জন্মে। মূলা কাঁচাও খায়; আবার লবণ মাখিয়া কিছু শুকাইয়া এক স্থানে বন্ধ করিয়া রাখে, যখন পচিয়া যায় তখন আহার করে। ছোট অনুচ্চ টেবিলের উপর কয়েকটী ছোট ছোট চীনা বাটিতে মাছ, তরকারী, মূলা, কুলের চাটনী ইত্যাদি ও এক বাটি ভাত খাওয়ার জন্য দেওয়া হয়। ভাত একটী পাত্রে লইয়া একজনে ঐ বাটিতে ভাত উঠাইয়া দেয়। বাম হস্তে ভাতের বাটী ধরিয়া আহার করে। দুটী কাঠি ভাত খাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। কোন দ্রব্য হাত দিয়া খাওয়া এদের নিয়ম বিরুদ্ধ।
এরা দুধের কোন জিনিষ প্রস্তুত করে না। ঘি বা কোন মিষ্ট দ্রব্য প্রস্তুত করে না। এখানকার মেঠাই মটর ডাউল বা চাউল দিয়া প্রস্তুত হয়। চাউলগুলি ভিজাইয়া বাষ্পে সিদ্ধ করিয়া তাহা একটী পাত্রে রাখিয়া পিটাইয়া নরম করে। তাহাই নানারূপে কাটিয়া শুকাইয়া রাখে। পরে তরকারীতে সিদ্ধ করিয়া বা আগুণে নরম করিয়া আহার করে। ইহাই এদেশের পিষ্টক উহাতে আবার চিনি গুড় চা ইত্যাদি দিয়া ছোট ছোট করিয়া কাটিয়া রাখে। শুকাইয়া শক্ত হয়। পরে পোড়াইতে দিলে বিস্কুটের ন্যায় হয়। মটর ডাউল দ্বারা ‘তোফু’ নামক এক প্রকার ছানার মত জিনিষ প্রস্তুত করে। খেতেও ছানার মত ঠাণ্ডা, মন্দ নয়। ইহা ভাজিয়াও খায়। তোফু ভাজা ছোট ছোট করিয়া বিট প্রভৃতি কুচাইয়া কিঞ্চিৎ সইও দিয়া ভাত রাঁধে, তাহা অনেকটা আমাদের পোলাও শ্রেণীর আহার্য্য। ইহাকে ‘গোমোকু' বলে। ময়দা দিয়া সরু সরু লম্বা ক'রে কেটে সিদ্ধ করিয়া তরকারী সঙ্গে খায়, ইহা ‘উদন’। নিমন্ত্রণাদিতে প্রথমতঃ বসাইয়া হিবাচী (অগ্নিপাত্র) ফুতন (বসিবার আসন) দিয়া কয়েকবার পরস্পর কয়েকটী কথায় কথায় অভিবাদনাদি হইলে পর ওচা ও পিষ্টক বা বিস্কুটাদি দিয়া গ্রহণ করিতে অনুরোধ করার সঙ্গে আবার অভিবাদন ও অভিবাদনের পর ধন্যবাদ দিয়া গ্রহণ করিতে হয়। এর পর ‘সাকে’ (এ দেশীয় মদ) ও ‘সাকেনো সাকানা' (একটী ট্রের উপর নানা প্রকার সিদ্ধ বা ভাজা তরকারী শুকনা ও পোড়া মাছ এক একটা বাটিতে সাজান থাকে)। এসকল আহারের পর ভাত খাওয়া হয়।
এখানে বাড়ীগুলি কাঠের। ফটকের দরজায় একটী ঘণ্টা বাঁধা থাকে ৷ দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঘন্টার শব্দ হয়, তাহাতে গৃহস্বামী জানিতে পারেন। দরজার চৌকাঠের উপরে ও নীচে খাঁজ কাটা থাকে। দরজায় কব্জা দেওয়া হয় না, ঐ খাঁজে আটকান থাকে। এক দিক হইতে অপর দিকে ঠেলে দিতে হয়। গৃহের প্রাচীরও প্রায় কাঠের। এক দিক বাঁশের বেড়ার উপর মাটি প্রভৃতির লেপ দিয়া প্রস্তুত হয়, বাকি সমুদায় কাঠের। ঐরূপ উপর ও নীচের চৌকাঠের খাঁজের ভিতর কাঠের বেড়াগুলি আকান থাকে। দিনে সবগুলি ঠেলে একদিকে একত্র করে রাখা হয়, রাত্রে বন্ধ করা হয়। অভ্যন্তরস্থ বেড়াগুলি কাগজের। কাঠের ফ্রেমে আঠা দিয়া কাগজ লাগান থাকে, সেগুলি ঐরূপ চৌকাঠের খাঁজে আটকান থাকে ও ইচ্ছামত এদিক ওদিক ঠে’লে দেওয়া যায়। গৃহখানি ভূমি হইতে প্রায় এক ফুট উচ্চ কাঠের মাচার উপর অবস্থিত। ঘরের মেজে মোটা মাদুর দ্বারা আবৃত। ঘরের ছাদ মাটির খোলা বা খড় দ্বারা প্রস্তুত। গৃহে আসবাবপত্র প্রায় কিছুই নাই। বসিবার জন্য চেয়ার টেবিল ব্যবহৃত হয় না। ইহারা জুতা বা পাদুকা লইয়া গৃহে প্রবেশ করে না। মেজেতে ‘ফুতনে'র উপর হাঁটু গাড়িয়া বসে। ঘর বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ধূলা ময়লা নাই; বিছানাদি কাঠের বা কাগজের সুদৃশ্য বেড়ায় আবদ্ধ এক কোণে বন্ধ ক'রে রাখা হয়। একদিকে এক কোণে হয়ত মনোহর দৃশ্যপূর্ণ ছবি দেওয়ালে টাঙ্গান, একটা সুদৃশ্য সুসজ্জিত ক্ষুদ্র কৃত্রিম বৃক্ষ বা কিছু সুন্দর জিনিষ রক্ষিত। কোন স্থলে ছবি বা ফটো টাঙ্গান থাকে। গৃহ-সজ্জার মধ্যে ইহাই প্ৰায় যথেষ্ট। একখানি বড় ঘর কাগজের বেড়া দিয়া খণ্ড খণ্ড করা হয়। প্রতি গৃহে এক একটা সুদৃশ্য পিতল নিৰ্ম্মিত বাক্সে গৃহ-দেবতা বুদ্ধ-মূর্ত্তি রক্ষিত। প্রতিদিন গৃহস্বামী ধূপ ধুনা ও আলো জ্বালিয়া প্রাতে ও সন্ধ্যায় পূজা করেন। গৃহকর্ত্রী কয়েকটী ভাতের ডেলা সাজাইয়া ভোগ দেন ও ফুলদানীতে ফুল ও পাতা সাজাইয়া রাখেন। কাঠের ঘরগুলি বাহির হইতে বিশেষ সুন্দর বোধ হয় না। বাহির হইতে পর্ণ কুটীরের ন্যায় বোধ হয়, কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করিলে বেশ সুন্দর দেখা যায়। প্রতি বাড়ীর সম্মুখে এক একটী ক্ষুদ্র উদ্যান থাকে; তন্মধ্যে হয়ত একটী নকল পাহাড়ের মত উচ্চস্থান ও কয়েকটী সুন্দর সুন্দর গাছ থাকে। বাগানটী সর্ব্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। খুব ছোট সহরে, বাড়ীতে ও হোটেলাদিতে ইলেক্ট্রিক লাইট জ্বলে। সহরের ও গ্রামের বাড়ীতে বিশেষ কোন পার্থক্য দেখা যায় না। আমাদের দেশে গ্রামের লোক সহর প্রথম দেখিলে যেমন খুব আশ্চর্যান্বিত হয়, এখানে সেরূপ সহর প্রথম দর্শনে আশ্চর্য্য হওয়ার বিষয় কিছু দেখা যায় না। কেবল রাস্তার বিশালতা ও ট্রাম, ইহাই বিশেষত্ব। তাহাও গ্রামের নিকটস্থ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শহরেও দেখা যায়। বাড়ি ঘর সব প্রায় একরূপ। বড় সহরের বাড়ীতেও সম্মুখভাগে এক খণ্ড ভূমিতে ক্ষুদ্র একটী উদ্যান থাকে। কলের জল, রন্ধনাদির জন্য অনেক স্থলে কয়লার পরিবর্তে গ্যাস ব্যবহৃত হয়।
এখানে অত্যন্ত অগ্নিভয়। অত্যন্ত ভূমিকম্প হয় বলিয়া ও কাঠ সস্তা হওয়াতে এবং উইপোকা না থাকায় কাঠের বাড়ী প্রস্তুত করে। কোন রকমে অগ্নিসংযোগ হইলে সৰ্ব্বনাশ হয়। রাত্রে অগ্নি সতর্কভাবে রাখার জন্য পাহরাওয়ালা দুটী কাষ্ঠখণ্ড ঠক্ ঠক্ করিয়া বাজাইয়া পাহারা দেয়। এখন ভূমিকম্প সহ্য করিতে পারে এরূপ বড় বড় বাড়ী প্রস্তরাদি দ্বারা প্রস্তুত হইয়াছে। এদের পোষাক আমাদের পক্ষে অদ্ভুত ব'লে বোধ হয়। স্ত্রী-পুরুষের প্রায় এক ধরনেরই পোষাক। পোষাকের মধ্যে ‘কিমোনো’ প্ৰধান; ইহা পা পর্যন্ত পড়ে। সম্মুখের দিকটা খোলা, দুই ধার একটার উপর আর একটা রেখে ‘ওবি’ নামক একটা চওড়া মূল্যবান ফিতা দ্বারা ‘কিমোনো’টী বন্ধ করা হয়। 'ওবি'টা খুব লম্বা। কোমরে জড়াইয়া পশ্চাদ্দিকে একটী ফাঁস দিয়ে রাখে। কিমোনোর হাতের নীচে কতকটা কাপড় থ'লের মত ঝোলান থাকে। ইহা পকেটের কাজ করে। ইহা পুরুষের চেয়ে মেয়েদের বেশী লম্বা হয়। ‘ওবি’টী পুরুষ অপেক্ষা স্ত্রীলোকের চওড়া হয়। স্ত্রী-পুরুষের পোষাকের বিভিন্নতার মধ্যে আর যে যৎসামান্য পার্থক্য আছে তাহা বোঝা যায় না। স্ত্রীলোকেরা ‘ওবি’র ফাঁস খুব বড় ক'রে দেয় ও একটা সরু ফিতা দ্বারা ‘ওবি’টী আটকাইয়া রাখে। শীতকালে ইহার উপরে ‘হাওরী' নামক একটী পোষাক পরিধান করে। ইহা জানুর অল্প নিম্ন পর্য্যন্ত থাকে, সামনের দিক্টা খোলা, একটি সুদৃশ্য ফিতা দ্বারা বুকের উপর আঙ্কান থাকে। হাতের থ’লেগুলি ‘কিমোনো'র থ'লের সমান হয়। কাজকর্ম্মের সময় সামনের দিকে একখণ্ড কাপড় ফিতা দিয়া কোমরে জড়াইয়া রাখে। অন্য কাপড় ইহাতে ময়লা হয় না। শীতকালে পোষাকের রং গ্রীষ্মকাল অপেক্ষা গাঢ়—- প্রায় কাল বর্ণের হয় এবং পোষাকের ভিতরে তুলা দেওয়া থাকে।
পুরুষ স্ত্রীলোক কেহই খালিপায়ে থাকে না। মোজার পরিবর্তে ‘তাবি’ নামক সাদা বা কাল রংয়ের কাপড়ে প্রস্তুত মোজা ব্যবহার করে। এইগুলি পায়ের গাঁট পর্য্যন্ত থাকে। ‘গেতা' নামক কাষ্ঠপাদুকা ব্যবহার করে। আজকাল জুতা মোজা ও ইয়ুরোপীয় পোষাক অনেকেই পরিধান করে। মেয়েরা অনেক স্থানে ইউরোপীয় পরিচ্ছদ পরিধান করিয়া কাজ করে। পুরুষের ত কথাই নাই। জাপানী মেয়েদের জাপানী পোষাকে যেমন সুন্দর দেখায় বিদেশী পোষাকে সেরূপ দেখায় না। বালিকারা খুব রঙ্গিন পোষাক পরে। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপরের পোষাকটা অরঞ্জিত হয়, কিন্তু নীচের কিমোনোগুলি খুব রঙ্গিনই থাকে।
মেয়েরা চুলের খুব যত্ন করে। মাসের মধ্যে ২/১ বার চুল পরিষ্কার করা ভিন্ন চুল ভিজায় না। এদের মত আজানুলম্বিত সুদীর্ঘ কৃষ্ণ কেশ খুব কমই দেখা যায়। চুল বাঁধার ফ্যাসানও অনেক। মাথায় টুপী বা কাপড় কিছুই দেয় না। সুন্দর করিয়া চুল বাঁধিয়া নানা প্রকার নকল ফুল ফিতা কাঁটা গুঁজে দেয়। স্বহস্তে এত সুন্দর করিয়া চুল বাঁধা অসাধ্য, সেজন্য অপর লোকে বাঁধিয়া দেয়। তাহারা চুল বাঁধিয়াই জীবিকা নির্ব্বাহ করে। বাঁধিতে সময়ও যথেষ্ট লাগে। ৫/৭ দিন পর্য্যন্ত কোনরূপ অপরিষ্কার হয় না। চুল ঠিক রাখার জন্য ইহারা বালিশে মাথা না রাখিয়া একটী অনুচ্চ কাষ্ঠখণ্ডের উপর ঘাড়টা রাখিয়া শয়ন করে। কাষ্ঠখানির উপরের দিকটা অর্দ্ধচন্দ্রের ন্যায় কাটা বা পুতুলের বালিসের ন্যায় একটী ছোট বালিস বাঁধা। ঐ খাঁজটায় বা বালিসটীতে ঘাড় থাকে, মাথা শূন্যে থাকে। এরা গহনা প্রায় ব্যবহার করে না। আংটী, মাথায় কাঁটা, ফুল, চিরুণী ও ঘড়ি-চেন এই যথেষ্ট।
এদেশে ছোট ছেলেদের সাঁওতালদের মত পিঠে বেঁধে রাখে। ছেলে পিঠে নিয়ে সমস্ত কাজকর্ম্ম স্বচ্ছন্দে করে। এক প্রকার নরম কাগজের রুমাল গামছার পরিবর্তে ব্যবহার করে। সর্ব্বদা একটু কাগজ সঙ্গে থাকে তদ্বারা নাক মুখ মোছা ইত্যাদি সকল প্রয়োজনীয় কাজ করে।
এই গ্রামটীতে অনেক লোকের বসতি। নিকটেই ছোট ছোট সহর আছে; এ গ্রামে খুব সিল্কের চাষ হয়। প্রতিগৃহে সিল্ক-পোকা পালন ও গুটী হইতে সূতা প্রস্তুত করে। বাড়ী বাড়ী তাঁত আছে। এখানে চাউল পরিষ্কার প্রণালী আমাদের দেশ হইতে ভিন্ন প্রকার। আতপ চাউল ব্যবহার করে। আমাদের দেশে যেমন কেবল ঢেঁকিদ্বারা ধান ভেনে চাউল প্রস্তুত করে, এখানে সেরূপ করে না। ইহারা চাউল প্রস্তুত করিতে ২/৪টী যন্ত্র ব্যবহার করে। একটী কাঠের যাঁতাদ্বারা ধানগুলি পেষণ করে। ঝাড়িবার জন্য কুলা ব্যবহার না করিয়া একটী আবদ্ধ বাক্সে উপরের খোলা মুখ দ্বারা চাউলগুলি ধীরে ধীরে ঢালে ও বাক্সের অভ্যন্তরস্থ পাখা ঘুরাইতে থাকে। বিপরীত দিকে বাক্সের একদিক খোলা থাকে, তদ্দ্বারা তুষগুলি বাহির হয় ও নিম্নের একটী খোলা মুখ দিয়া চাউল পড়ে। তৎপরে আবার জালদ্বারা প্রস্তুত চালনীর মত বাক্সে ঢালে। চাউল নীচে পড়ে ও ধানগুলি উপরে থাকে। পরে অল্প ছাঁটিয়া কুঁড়া পরিষ্কার করে। এইরূপে কতকগুলি যন্ত্রসাহায্যে অল্পায়াসে, অল্প সময়ে প্রচুর চাউল প্রস্তুত হয়।
অনেক স্থলে মেয়েরা মাঠে স্বামীসহ কৃষিকৰ্ম্ম করে। বাজারে, দোকানে, ষ্টেশনে, পোষ্টাফিসে সর্ব্বত্র মেয়েরা কাজ করে। আমোদ প্রমোদ স্থলে, যেখানে অত্যন্ত জনতা হয়, মেয়েরা সেখানে তত্ত্বাবধান করে। তামাসা দেখার জন্য টিকিট বিক্রয়াদি মেয়েরাই করে। মেয়েদের অবরোধ নাই; তাহারা পুরুষের সঙ্গে একত্রে কাজকর্ম্ম করে, চলে ফেরে, তাহাতে কোন বাধা বা সঙ্কোচ নাই। মেয়েরা সাধারণতঃ প্রত্যুষে শয্যাত্যাগ করিয়া ঘরের দরজাগুলি খুলিয়া দেয়। তৎপর রন্ধন আরম্ভ হয়। ইতিমধ্যে সকলে উঠিয়া মুখ ধুইতে যায়। গৃহিণীরা বিছানাদি সব ভিতরে বন্ধ করিয়া ঘর পরিষ্কার, ‘হিবাচী'তে (অগ্নিপাত্র) অগ্নি ও চায়ের জল বসাইয়া দেয়। সকলে একত্র আহার করে ৷ তৎপর ৮টার সময় ছেলেরা সব স্কুলে যায়। মা সন্তানদের পুস্তকাদি ও মধ্যাহ্ন আহারের জন্য ‘বেন্তো’ (ভাত, কিছু মূলা ও অল্প তরকারী বা মাছ ইত্যাদি) একটী ছোট বাক্সে বেঁধে দেন। মেয়েরা স্কুলে যাওয়ার সময় সাধারণ পোষাকের উপর নীচের দিকে একটী ঘাঘরার মত পরে। গৃহকর্তা কয়েক মিনিট গৃহদেবতার পূজা করিয়া স্বকর্ম্মে প্রস্থান করেন। মেয়েরা সংসারের অন্যান্য কার্য্যে মনোনিবেশ করেন, এই কাজগুলি সংসারের অর্থসমাগমের উপায় হয়। মধ্যাহ্নে ঘণ্টা খানেকের মধ্যে হয়ত রন্ধন ও খাওয়া শেষ হইয়া যায়। সারাদিন নানা কার্য্যে থাকিয়া সন্ধ্যাকালে সকলে একত্রে আহারাদি সম্পন্ন করেন। স্নান এখানে প্রায় সকলেই সন্ধ্যাকালে করে। গরম জলের টবে শরীর ডুবাইয়া স্নান করে। ওরূপ স্নান শীতকালে খুব আরামপ্রদ, কিন্তু জাপানীরা গ্রীষ্মকালেও প্রতিদিন গরম জলেই স্নান করে। স্থানে স্থানে সরকারী স্নানাগার আছে। যাহাদের বাড়ীতে গরম জলের বন্দোবস্ত না থাকে তাহারা সেখানে স্নান করে। একটী চৌবাচ্চায় গরম জল থাকে। সকলে তাহার ভিতরে শরীর ডুবাইয়া স্নান করে। প্রতিজনকে স্নানের জন্য ২/৩ পয়সা ক'রে দিতে হয়। কোন প্রকারে তাড়াতাড়ি ডুব দিয়া শুদ্ধ হওয়ার জন্যই এরা স্নান করে না, প্রতিজন প্রতিদিন প্রায় অৰ্দ্ধ ঘণ্টা দেহ মাৰ্জ্জনা করিয়া পরিষ্কার করে। সময় সময় অপরের সাহায্যও লইয়া থাকে। এখানে কেহ খালিগায় খালিপায় থাকে না। এদের পোষাক পরিচ্ছদ বেশ সভ্য। কিন্তু স্নানের সময় সরকারী স্নানাগারেও সকলে একত্রে বিবস্ত্র হইয়া স্নান করিতে লজ্জা বোধ করে না। এমন কি ভৃত্য দ্বারা দুই এক পয়সা দিয়া গাত্র মার্জ্জনা করাইয়া লয়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকে সূক্ষ্ম দৃষ্টি রাখিয়া ইহারা স্বাস্থ্য রক্ষা করিয়া থাকে।
বৈকালে ও সন্ধ্যাহারের পর সন্তানগণসহ আমোদ প্রমোদ, তাহাদের নীতিশিক্ষা দেওয়া, সঙ্গে লইয়া বেড়ান ইত্যাদি জননীর কার্য্য। শয়নের পূর্ব্বে পত্রিকা-পাঠ, সেলাই আদি করে। আমাদের দেশে রন্ধন ভোজন যেমন একমাত্র কার্য্য, ইহাদের তা নয়। কি দরিদ্র কি ধনী, জাপানী স্ত্রীগণ দিবসের প্রায় অর্ধ্বাংশ অর্থাৎ ১২ ঘণ্টার বেশী রন্ধন, ভোজন ও নিদ্রায় কাটায় না। অথচ এদের তিনবার রন্ধন ও আহার করিতে হয়। অপর অৰ্দ্ধাংশে নানা কার্য্যে ব্যাপৃত থাকিয়া নিজের, পরিবারের, দেশের ও জাতির উন্নতির চেষ্টা করে।
মেয়েদের পতি, পতির আত্মীয়-স্বজন ও শ্বশুর শাশুড়ীর সেবা পরম ধর্ম্ম। ইহার কোনরূপ অন্যথা হইলে স্ত্রী অত্যন্ত লাঞ্ছিত হন। এমন কি, শাশুড়ীর অপছন্দ হইলে স্বামী অনায়াসে স্ত্রী পরিত্যাগ করিতে পারেন।
এদের স্ত্রী পরিত্যাগ ও পুনর্বিবাহ প্রথা প্রচলিত আছে। কিন্তু কম লোকেই এরূপ করিয়া থাকে। একাধিক বিবাহ করে না। ঘটক বিবাহ ঠিক করিলে পিতামাতা বর কন্যার মত স্থির হইলে নির্দ্দিষ্ট দিনে কন্যা তাহার পোষাক পরিচ্ছদ গৃহসামগ্রী সমুদয় লইয়া উৎকৃষ্ট বেশে সুশোভিত হইয়া শ্বশুর-বাড়ী যাত্রা করে। ক'নে বহুমূল্য রেশমের পোষাক পরিয়া পরিপাটীরূপ চুল বাঁধিয়া মুখে পাউডার দিয়া সৌন্দর্য্যের মাত্রা আরও বৃদ্ধি করে। এইরূপে সাজসজ্জা করিয়া রিক্সে করিয়া যখন যায় তখন তাহাকে পরীর মত দেখা যায়। শ্বশুর-বাড়ী হইতে কন্যাকে নিতে দুই একজন লোক আসে, তদ্ব্যতীত আরও দুই একজন লোক তৎসঙ্গে গমন করে। যাত্রাকালে রাস্তার ছেলেরা উচ্চৈঃস্বরে আনন্দ ধ্বনি করে। পাত্রী পৌছিলে তাহাকে অভ্যর্থনা করিয়া লইয়া বরকনে একত্রে গৃহদেবতাকে প্রণাম করে। ক’নে এ সময় মাথায় একটা পাতলা কাপড় দিয়া মুখ ঢাকিয়া রাখে। উভয়ে তিনবার একটু একটু জাপানী মদ ‘সাকে' পান করে ও গুরুজনদের দেয়। ইহাতেই বিবাহ হইয়া গেল। পরে সকলে খাওয়া দাওয়া করে।
এদেশে প্রায় সকলেই সাকে নামক জাপানী মদ পান করে। বিশেষ নিমন্ত্রণাদিতে পান করিতে হয়। আমাদের প্রায়ই এ বিষয়ে ক্ষমা চাইতে হইত ৷
এদের জন্ম মৃত্যুতে পূজা মন্ত্রাদি অনুষ্ঠান আছে কিন্তু বিবাহে কিছুই নাই। কেননা বিবাহটা এরা শারীরিক সম্বন্ধ বলিয়াই মনে করে। তজ্জন্য ইহাতে বাহিরের আমোদ ব্যতীত আত্মিক কোন অনুষ্ঠানের প্রয়োজন বোধ করে না। তবে মাঝে মাঝে বিধবা হইয়া স্ত্রী পেট কাটিয়া সহমরণে যায় বা চুল কাটিয়া সন্ন্যাসিনীর বেশে পতির স্মৃতি ধারণ করিয়া অনন্ত মিলনের দিকে ধাবিত হয়। হয়ত বা পিতামাতা কন্যার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিবাহ দিতে ইচ্ছুক হইলে কন্যা তার প্রেমাস্পদ সহ একত্রে সমুদ্রে ঝাঁপ দেয় বা পেট কাটিয়া (হারাকিরি) উভয়ে অনন্ত মিলনের জন্য জীবন বিসর্জ্জন করে। জাপানীরা কোনরূপ অপমানিত হইলে নিজের জীবনে ঘৃণা হইলে বা দেশের কল্যাণের জন্য প্রয়োজন হইলে তৎক্ষণাৎ (কি স্ত্রী কি পুরুষ) তরবারী বা ছোরা দ্বারা হারাকিরি করিয়া জীবন বিসর্জ্জন দেয়। অল্প বয়সে এরা বিবাহ করে না; পুরুষের সাধারণতঃ ২৫ হইতে ৩০ এবং মেয়েদের ১৬ হইতে ২০ বৎসর বয়সে বিবাহ হয়। ইহার কমে হয় না। বিবাহ যোগ্য যুবক যুবতী পরস্পরকে সাধারণতঃ নিজেরা মনোনীত করে। অথবা অভিভাবক স্থির করার পর স্বস্ব মতামত প্রকাশ করে। কোন কোন স্থলে মেয়ের মতামতের অপেক্ষা করা হয় না।
এখানকার কোন ভূমি জঙ্গলপূর্ণ হইয়া পড়িয়া থাকিতে দেখা যায় না। ক্ষেত্রগুলি পরিষ্কার ও সুসজ্জিত। ধান্য, গোধুম ও অন্যান্য শস্য থাকে থাকে সারি সারি করিয়া বপন করা হয। শাক-সবজী, কফি ও অন্যান্য নানাপ্রকার তরকারী জন্মে। ইহারা মলমূত্রাদি পচাইয়া কৃষিক্ষেত্রে সাররূপে ব্যবহার করে। মটরের মত নানা প্রকার ডাল হয়; মটর ডালও হয়। ইহা প্ৰথমে ইন্ডিয়া হইতে আমদানী হইয়াছিল বলিয়া ইহাকে ‘ইন্দোমানে' অর্থাৎ ইন্ডিয়ার ডাল বলে। দারুণ শীতে যে সকল বৃক্ষলতা পত্রাদিশূন্য হইয়া কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায় দণ্ডায়মান ছিল, এক্ষণে বসন্তকালে তাহা পুষ্পপল্লবে সুশোভিত হইয়াছে। এসময় ‘সাকুরানোহারা'- বসন্তের চেরী ফুল ও অন্যান্য ফুল বৃক্ষ আচ্ছাদন করিয়া প্রস্ফুটিত হয়। কোন কোন স্থানে অনেক পরিমাণে চেরী ফুলের বাগান আছে। অসংখ্য লোক তাহা দেখিতে আসে। তাহাদের বিশ্রামের জন্য কয়েক খানি ঘর প্রস্তুত করা হয়। ঘণ্টা হিসাবে তাহার ভাড়া দিতে হয়। নানারূপ আমোদ প্রমোদের বন্দোবস্ত হয়, দোকান ও আহারাদির বন্দোবস্তও থাকে। চারিদিকে প্রস্ফুটিত চেরী বৃক্ষ। আমাদের গ্রামের নিকটবর্ত্তী এক বৃহৎ বাগানে আমরা একদিন বসন্তের আনন্দ সম্ভোগ করিতে গিয়াছিলাম। বসন্তে জাপানের দৃশ্য বড়ই মনোরম! এখানে ফুলের বড় যত্ন আদর। বসন্তের চেরী ও শরতের ক্রিসনথিমম্ (কিকুনোহানা) জাপানে প্রসিদ্ধ। ফুল দ্বারা নানা দ্রব্য সজ্জিত করিয়া নানা ক্রীড়া কৌশল দেখান হয়। সকলে ফুল দেখিতে ও আমোদ প্রমোদের জন্য আসে। গেইষাগণ (নৰ্ত্তকী) নৃত্যগীতাদি করে; তাহারা নানা বর্ণের পোষাক পরিয়া মাথায় বিবিধ বর্ণের কৃত্রিম ফুল পাতা প্রভৃতির কাঁটা দিয়া চুল বাঁধে, মুখে পাউডার, ঠোঁটে রং ইত্যাদি বেশ ভুষায় সজ্জিত হইয়া একখানি পাখা লইয়া বা কেবল হাত ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া নৃত্য করে।
জাপানে বৌদ্ধ ও ষিন্তোধৰ্ম্ম প্রচলিত। এখন খৃষ্টধর্ম্ম অনেকে গ্রহণ করিয়াছে। বৌদ্ধ ধর্ম্ম ঠিক বুদ্ধের ধর্ম্মই যে ঠিক রহিয়াছে তা নয় ৷ যিন্তো ধর্ম্মের প্রভাব সকলের উপরে। পরলোকস্থ মহাপুরুষ বীরগণকে পরলোকবাসী আত্মাকে ইহারা দেবতা জ্ঞানে পূজা করিয়া থাকে। তাঁরা বিপদে দুঃখে যুদ্ধাদিতে সঙ্গে সঙ্গে থাকিয়া সাহায্য করিতেছেন। জাপানীরা সম্রাটকে দেবতার মত জ্ঞান করে। যুদ্ধাদি ও অন্যান্য দুঃসময়ে সম্রাটের পুণ্যবলে তাঁর গুণে এবং পরলোকস্থ আত্মাগণের আশীর্ব্বাদে ও সাহায্যে সফলতা লাভ হয় বলিয়া মনে করে।
পরলোকস্থ বীরাত্মাদের জন্য খুব সমারোহে পূজা উৎসব হইয়া থাকে। তাহাকে ‘যোকনষা' বলে। মাঝে মাঝে দেবদেবীর মন্দির আছে। বৌদ্ধ ও ষিন্তো প্রায় সকলেই এ সকল পূজাদি করে। পরলোকবাসীদের প্রতি ভক্তি, সম্রাটের প্রতি শ্রদ্ধা, স্বদেশের প্রতি ভালবাসা, কর্ম্মে আসক্তি, ইহাই জাপানের ধর্ম্ম। সূর্য্যোপাসক ও খৃষ্টধৰ্ম্মাবলী লোক আজকাল অনেক হইতেছে। বৌদ্ধ মৃতদেহ দাহ করা হয় ও ষিন্তোদের মৃতদেহ সমাহিত করা হয়। পরিবারস্থ কাহারও মৃত্যু হইলে তাহার নাম লিখিত একখণ্ড কাষ্ঠ অতি যত্নে গৃহদেবতার একপার্শ্বে রাখা হয়। প্রতিদিন ধুনা আলো দিয়া তাহার সম্মুখে আহাৰ্য্য সামগ্রী ভোগ দেওয়া হয়। জাপানের সম্রাট ষিন্তোধর্ম্মাবলম্বী; আমার শ্বশুর-পরিবার বৌদ্ধ।
আমার প্রতি এদেশবাসীগণের আশ্চর্য্য ব্যবহার দেখিলে অবাক হইতে হয়। আমার শাশুড়ী ঠাকুরাণী ও অন্যান্য আত্মীয়গণ সর্ব্বদা আমার যাহাতে কোন কষ্ট না হয় তাহাই করিতেন। আমার সকল কাজ তিনি ক'রে দিতেন। কূপ হইতে কদাচিৎ জল তুলিতে বা বস্ত্রাদি কাচিতে গেলে তাহা আমার হাত হইতে জোর করিয়া লইয়া নিজে সম্পন্ন করিতেন, আমি আপত্তি করিলে বলিতেন, “শীতে কষ্ট হইবে ও অসুখ হইবে।” ৬০ বৎসর বয়স হইয়াছে কিন্তু এত পরিশ্রম করিতে পারেন, যাহা আমাদের মত ২/৩ জনেও সমর্থ হয় না। আমি আহারাদি প্রস্তুত, গৃহ পরিষ্কার প্রভৃতি যে কোন কাজ করিতে যাইতাম, আমাকে সরাইয়া নিজে সমাধা করিতেন। ঠাণ্ডা জল কখনও ব্যবহার করিতে দিতেন না। আমার রুচিকর খাদ্য যাহা পারিতেন প্রায়ই প্রস্তুত করিয়া বা কিনিয়া দিতেন। শীতে অগ্নিপাত্র লইয়া যখন বসিয়া থাকিতাম, আমার গাত্র কম্বলাদি শীতবস্ত্র দ্বারা ঢাকিয়া দিতেন, স্নান করিবার সময় গাত্র মার্জ্জনা করিয়া দিতেন। অকৰ্ম্মণ্য ভাবে বসিয়া থাকিতে কষ্টকর বোধ হইত বলিয়া আমাকে কিমোনো প্রভৃতি সেলাই করিতে দিতেন। যে সকল স্থানে কোন আনন্দের ব্যাপার বা কিছু দর্শনীয় থাকিত তথায় লইয়া যাইতেন। তাকেদাসানের ভ্রাতৃবধু তাঁহার শিশুপুত্রকে প্রায় আমার নিকটে রাখিতেন, পাড়া প্রতিবেশী ও আত্মীয়গণ আমাকে তাঁহাদের বাড়ী লইয়া গিয়া গৃহের কার্য্যাদি, চিত্রিত কার্ড ইত্যাদি দেখাইতেন। আমাকে বিদেশী বলিয়া কোনরূপ ঘৃণা বা অসন্তোষ প্রকাশ ত দূরের কথা, কিসে আমার চিত্ত বিনোদন করিবেন তজ্জন্য সর্ব্বদা ব্যস্ত থাকিতেন। কেবল নিজ বাটীতে নয়, যে কোন স্থানে নিমন্ত্রিত হইয়া বা নিজ প্রয়োজনে যাইতাম, বিদেশী বলিয়া সকলেই আমাকে দেখিতে আসিতেন ও নানা সংবাদ শুনিতে আগ্রহান্বিত হইতেন। আমাদের অভ্যর্থনার জন্য যে কি বন্দোবস্ত করিবেন তাহা ঠিক করিতে পারিতেন না। সাধ্যানুসারে যত্নাদি করিয়াও, আমার অত্যন্ত কষ্ট অসুবিধা হইতেছে, কিছুই করিতে পারিতেছেন না— ইত্যাদি বলিয়া দুঃখ প্রকাশ করিতেন। মোট কথা, বিদেশীর প্রতি ইঁহাদের আন্তরিক সহানুভূতি দেখিয়া মোহিত হইতে হয়। কোন ভারতবাসীর পরিবারে কয়েক দিনের জন্য ঝি ছিল না। তাঁহার স্ত্রী শিশু পুত্রটীকে লইয়া ভয়ানক শীতকালে সকল কার্য্য স্বহস্তে সম্পন্ন করিতেন। তাঁহাদের বাটীর নিকটস্থ এক সম্ভ্রান্ত ধনী জাপানী পরিবারের একটী বালিকা সর্ব্বদা তাঁহাদের সাহায্য করিতেন। মেয়েটীর স্কুলের পড়া শেষ হইয়াছে। ইঁহার জ্যেষ্ঠা ভগ্নী গ্র্যাজুয়েট ও ইংরাজীতে অভিজ্ঞা। বালিকাটী সর্ব্বদা ওঁদের বাড়ী এসে সন্তান রাখা, বাসন ধোওয়া, রন্ধনাদির সাহায্য ইত্যাদি সব ক'রে দিতেন।
তাকেদাসান্ ভারতে আসার পর একবার অনেকদিন পর্য্যন্ত সংবাদাদি না পাইয়া সকলে তাঁহার মৃত্যুই স্থির করিয়াছিলেন। সে জন্য দীর্ঘ নয় বৎসর কাল পরে সন্তানকে পাইয়া পিতামাতা ও আত্মীয়গণ পরমাহ্লাদিত হইয়াছিলেন। এতদুপলক্ষে খুব উৎসবানন্দ হইল। সমুদয় আত্মীয়-স্বজনগণ এসময় মিলিত হইয়াছিলেন। হিন্দুদের মত এদের এক এক পরিবারের এক একজন করিয়া পুরোহিত (বোসান) থাকেন। উৎসব উপলক্ষে মাতৃপক্ষ, পিতৃপক্ষ ও অপরাপর ১২ জন পুরোহিত ও আত্মীয়বর্গ নিমন্ত্রিত হইয়াছিলেন। এসময় প্রায় ৬০ জন স্বজন আত্মীয়সহ ফটো তোলা হয়। বাটীস্থ সুসজ্জিত গৃহে, বুদ্ধমূর্ত্তির সম্মুখে উৎকৃষ্ট ও মূল্যবান বেশধারী ১২ জন ‘বোসান' সমস্বরে মন্ত্র পাঠ করিতে লাগিলেন। তৎপর পরিবারস্থ পুরুষেরা উচ্চৈঃস্বরে মন্ত্র বা স্তোত্র পাঠ করিলে একজন ‘বোসান’ সকলকে উপদেশ দান করিলেন। ১৭ই ফেব্রুয়ারি প্রাতে ৮টায় আরম্ভ হইয়া ৩/৪ ঘণ্টাব্যাপী পূজাদি হইল। বৈকালে ৪টা হইতে সন্ধ্যা পর্য্যন্ত ও তৎপরদিন প্রত্যুষে স্তোত্রপাঠ ও উপদেশাদি প্রদত্ত হইল। রাত্রে ‘বোসান’গণ ও আমরা একত্রে আহার করিলাম। সে সময় পুরোহিতগণের সহিত আলাপ হইল। কেহ কেহ আমাদিগকে নিমন্ত্রণও করিলেন। হিন্দু পুরোহিতগণের ন্যায় ইঁহাদিগকে টাকা দিতে হয় ও তদ্দ্বারাই ইঁহারা সাধারণ অপেক্ষা পরম সুখে বাস করেন। পুনরায় পূর্ব্বদিনের ন্যায় পূজাদি হইয়া কাৰ্য্য শেষ হইল। এতদুপলক্ষে তিন চারিশত আত্মীয় ও পাড়া প্রতিবাসীদের খাওয়ান হইয়াছিল। পূজার পূর্ব্বে নোটিশ দেওয়া হইয়াছিল। অনেক লোক বিশেষভাবে আমাকে দেখিবার জন্যই আসিয়াছিলেন। এত লোক হইয়াছিল যে পূজার পর যে চাঁদা সংগ্রহ করা হয় তাহাতে প্রতিজনের নিকট হইতে এক, অর্দ্ধ বা সিকি পয়সা ক'রে প্রায় ১৫/১৬ ইয়েন (২৩/২৪ টাকা, ১ টাকা আটআনায় ১ ইয়েন) আদায় হইয়াছিল। এই টাকা মন্দিরাদিতে কোন কার্য্যে ব্যয়িত হয়। সকলে আমাকে দেখিবার জন্য এত ব্যগ্র যে ভিড়ের ভিতরে আমার থাকা কষ্টকর হওয়াতে আমার দেবরেরা সকলকে ঠেলিয়া আমাকে টানিয়া গৃহমধ্যে লইয়া গিয়া গৃহদ্বার বদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন। যখন দেখিবার জন্য সকলে খুব ব্যগ্র হইতেন, ২/৩ মিনিটের জন্য আমাকে বাহিরে আসিতে বলিতেন। ইহার পর কোথায়ও এরূপ পূজাদি হইলে বেশি লোক জড় করিবার জন্য আমায় নিমন্ত্রণ করিত। এসকল গ্রামে ও অন্যান্য সহরে, যেখানে বিদেশী বড় কেহ দেখেন নাই, এরূপ স্থানে আমার চলা ফেরা এক রকম কষ্টকর বোধ হইত। কারণ অসংখ্য লোক আমাকে প্রায় ঘিরিয়া ফেলিত। বুদ্ধমূর্ত্তির সম্মুখে পূজার সময় সকলে নামাম্দাউত ধ্বনি করিয়া থাকে; ইহার প্রকৃত শব্দটি নামু আমিদা বুৎসু (Namu Amida - butsu— I adore, Thee O Eternal Buddha) ইহা সংস্কৃত ভাষা, নমঃ অমিতাভ বুদ্ধ এই কথাটী সংক্ষেপে ঐরূপে উচ্চারণ করে। এদেশে সকল উপযুক্ত অর্থাৎ ২১ বৎসর বয়স পূর্ণ হইলে শরীর নীরোগ থাকিলে সকল পুরুষের যুদ্ধ শিখিতে হয়। এসময় অধ্যয়ন শেষ না হইলে তৎপর ৪০ বৎসরের মধ্যে কলেজের পড়া শেষ হইলে যুদ্ধ শিখিতে যাইতে বাধ্য হয়। এখানকার বয়স গণনা অদ্ভুত। যে সময় জন্ম হয় এমন কি ডিসেম্বরের শেষ দিন হলেও তৎপরবর্ত্তী জানুয়ারী মাস আসিলেই তাহার দুই বত্সর বলা হয়। এইরূপে চারিমাসকাল সকলের আদর যত্নে আনন্দিত মনে জাপানের নানদেশ ও নানাস্থান দেখিয়া ১২ই এপ্রিল জাপান হইতে যাত্রা করি এবং মে'লে ২৫ দিনে ভারতে পৌঁছাই।
আসিবার সময় শাশুড়ী ঠাকুরাণী ও এক ননদ তাঁহার পুত্রসহ 'কোবে' পর্য্যন্ত আসিয়া আমাদিগকে জাহাজে তুলিয়া দিলেন। বিদায় কালে কাঁদিতে কাঁদিতে বিদায় লইলেন। আমি তাকেদাসানকে বলিতে বলিলাম, “সকলে আমার কত যত্ন আদর করিলেন; কিন্তু আমার কর্তব্য আমি পালন করিতে পারিলাম না।” তাহাতে তাঁহারা— “বিদেশে কত কষ্ট পাইতে হইল, কিছু করিতে পারিলাম না” ইত্যাদি বলিয়া দুঃখ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। বিদেশে এমন সরলস্বভাবা স্নেহপরায়ণা শ্বশ্রুঠাকুরাণীর মা'র মত যত্ন ভালোবাসা পাইয়া ইঁহার সহিত বাস করিতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু সে সম্ভাবনা কেথায়? –
