রাজা প্রতাপাদিত্যের চরিত্র
শ্রীযুক্ত হরিশ্চন্দ্র তর্কালঙ্কার সঙ্কলিত
PREFACE
Rájá Pratápáditya lived in the reign of Akbar in the Jessore District and founded a splendid city in a place which is now part of the Sunderbunds. IHis Biography, one of the few historical ones we have in Bengali, was compiled 50 years ago as text book for the College of Fort William. The present Memoir retains the subject of the former but in a totally different style. The work has been sought after in Germany as throwing some light on the condition of a Hindu prince under the Musalmans.
It mentions that the Raja's immediate ancestors lived at Sútgnn, then a great emporium of trade, now an obscure village. They went to Gaur, obtained influence there with the king; Raja Pratúpálitya received a grant of land in what is now the Sunderbunds, then a fertile populous district, but refusing subsequently to pay tribute, the Emperor Akbar sent an army against him; he was taken prisoner and carried in an iron cage to Benares where he died.
কিয়ৎ কাল পরে তাঁহার পত্নী গর্ভবতী ও দশম মাসে পুত্রবতী হইলেন। পুর নারীগণ অভিনব কুমারের অপরূপ রূপ সন্দর্শনে আহ্লাদিত হইয়া প্রতিবাসিদিগকে পুত্রজন্ম সংবাদ প্রদানার্থ শুভসূচক শঙ্খধ্বনি আরম্ভ করিল। তদাকর্ণনে গ্রামস্থ সকলে অবগত হইল যে সরকারের একটী দৌহিত্র ভূমিষ্ঠ হইয়াছে। দীন দরিদ্র দুঃখি ব্রাহ্মণাদি তাবতেই বিবেচনা করিল আমরা এসময়ে সরকারের বাটীতে উপস্থিত হইলে তিনি আমাদিগকে অবশ্য কিঞ্চিৎ২ দিবেন সন্দেহ নাই, কিন্তু অগ্রে যাইলে কিছু অধিক পাইব এই বোধে সকলে সত্ত্বর হইয়া তাঁহার বাটীতে আাগমন করিতে লাগিল এবং বাদ্যকরেরা আসিয়া স্ব২ যন্ত্রে বাদ্য আরম্ভ করিল, প্রতিবাসিরাও অনেকে কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া তাঁহার বাদীতে উপস্থিত হইলেন। রামচন্দ্র সন্তানের মুখচন্দ্র সন্দর্শন করিয়া সন্তোষ-সহকারে সকলকেই কিঞ্চিৎ২ দিয়া বিদায় করিলেন। তাহারা তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে প্রশংসা করিতে২ প্রস্থান করিল।
রামচন্দ্র কুলাচার অনুসারে একাদশ দিবসে মহা সমারোহ পূর্ব্বক বিধিবোধিত কৰ্ম্ম সমাপন করিয়া পুত্রের নাম ভবানন্দ রাখিলেন। কালক্রমে তাঁহার আর দুই সন্তান হয়, মধ্যমের নাম গুণানন্দ এবং কনিষ্ঠের নাম শিবানন্দ রাখিয়াছিলেন। ঐ তিন সহোদর বুদ্ধিতে বৃহস্পতিতুল্য, বাল্যকালেই সংস্কৃত বাঙ্গালা ও পারসীকাদি বিবিধ ভাষায় সুপণ্ডিত হয়েন, বিশেষতঃ কনিষ্ঠ অতিকর্ম্মঠ হইলেন! তিনি আপন পিতার অধীনে কর্ম করিতে আরম্ভ করেন। কার্য্যবশতঃ সেই দপ্তরের সিরিস্তাদার কায়স্থ-কুলোদ্ভব কান্তারের সহিত তাঁহার অপ্রণয় হওয়াতে রামচন্দ্র নানা প্রকারে উত্ত্যক্ত হইয়া কর্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক গৌড় রাজধানীতে গমন করিলেন।
তৎকালে ঐ রাজধানীতে কেবল বাদশাহের এক দুর্গ আর বাঙ্গলা, ও বেহারের কর আদায় কারণ এক দপ্তরখানা মাত্র ছিল। ঐ দুয়ের অধ্যক্ষ নবাব শোলেমান গররাণী নামক এক জন পাঠান ছিলেন। তিনি প্রথম অবস্থায় তাদৃশু ধনাঢ্য ছিলেন না,হুমায়ুন বাদশাহের হিন্দুস্থান শাসন কালে তিনি ঐ কৰ্ম্মে নিযুক্ত হয়েন। রামচন্দ্রের তথায় গমনের কএক বৎসর পূর্ব্বে, তিনি ভাগ্যবশতঃ বাঙ্গলা বেহার ও উড়িষ্যা এই তিন প্রদেশের সুবাদার হইয়া অসীম ধন উপার্জন করত সর্ব্বত্র সম্ভ্রান্ত হইয়াছিলেন।
হুমায়ুনের লোকান্তর প্রাপ্তি হইলে পর তাঁহার পুত্রেরা রাজ্যের লোভ সম্বরণ করিতে না পারিয়া দিল্লীর সিংহাসন আরোহণ উপলক্ষে পরস্পর ঘোরতর সমরে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, সুতরাং সিংহাসন কিয়ৎকাল শূন্য থাকে। কাহারও ঈদৃশ সামর্থ্য ছিল না যে স্বয়ং সিংহাসনে আরোহণ করিয়া রাজনীতির অনুসারে দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন ও প্রজাগণের হিতাহিত চিন্তা এবং দেশদেশান্তর হইতে রাজস্ব আদায়ের তত্ত্বাবধারণ করেন; সুতরাং তৎকালে বিদেশীয় প্রধান২ কর্ম্মচারিরা দিল্লীর প্রতি হতাদর হইয়া স্বেচ্ছাচারী হইতে লাগিল।
শোলেমান সেই সময়ে কতিপয় সৈন্যদল সংগ্রহ করিয়া স্বয়ং সেনাপতি হইয়া উড়িষ্যা জয় করেন দিল্লীতে কিছু মাত্র কর প্রেরণ করেন নাই, তিন দেশ হস্তগত করিয়া রাজস্ব আদায় পূর্ব্বক কেবল স্বীয় কোষ পরিপূর্ণ করিতে লাগিলেন।
কএক বৎসর বিবাদের পর হুমায়ুনের জ্যেষ্ঠ পুত্র আকবর ভ্রাতাদিগের অভিমতিতে দিল্লীর সিংহাসনে অভিষিক্ত হইয়া বাদশাহ হইলেন। শোলেমান তৎশ্রবণে অনুপম উপঢৌকন লইয়া তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে গমন করেন। সময়ক্রমে বাদশাহের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইলে, বাদশাহ শোলেমানের শীলতায় ও তদত্ত উপঢৌকনে পরিতুষ্ট হইয়া অনুগ্রহ পূর্ব্বক তাঁহার প্রতি বাঙ্গলা প্রভৃতি তিন প্রদেশের কর্তৃত্ব পদে স্থিরতর থাকনের লিপি প্রদানে অনুমতি করিলেন। শোলেমান ঐ লিপি এবং সঙ্গমসূচক এক পরিচ্ছদ পাইয়া আপনাকে কৃতকৃতার্থ বোধ করত, স্বরাজধানীতে প্রত্যাগমন পূর্ব্বক পূর্ব্ববৎ সুবাদারি কর্ম্ম নির্ব্বাহ করিতে লাগিলেন।
রামচন্দ্র গৌড় রাজধানীতে সপরিবারে উপস্থিত হইয়া এক গৃহস্থের বাটীতে অবস্থিতি করেন। পরে এক দিন কোন সুযোগে নবাবের সহিত সাক্ষাৎ করিলে পর তিনি তাঁহার পুত্রদিগের নিবেদন অনুসারে তাঁহাকে কাননগো দপ্তরে মুহরিগিরি কর্ম্মে নিযুক্ত করেন। রামচন্দ্র সেই কর্ম্মে প্রবিষ্ট হইয়া অর্থ সঙ্গতি হওয়াতে তথায় গৃহাদি নির্মাণ করাইয়া বাস করিলেন। *
তাঁহার কনিষ্ঠ পুত্র অতি চতুর, কোন কার্য্য উপলক্ষ করিয়া অনুক্ষণ নবাবের নিকট যাইতেন, ইহাতেই তিনি তাঁহাকে কৰ্ম্মাঠ জানিয়াছিলেন। কাননগো দপ্তরের অধ্যক্ষের মৃত্যু হইলে পর নধাব তাঁহাকে অনুগ্রহ পূর্ব্বক তৎপদে নিযুক্ত করিয়া এবং পরিচ্ছদ দিয়া সম্ভ্রান্ত করিলেন। শিবানন্দ রাজকার্য্য সুচারু রূপে নির্ব্বাহ করাতে নবাব তাঁহাকে অতি স্বমাদর করিতে লাগিলেন, তদবধি ভাঁহাদিগের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি হইতে লাগিল।
নবাবের কনিষ্ঠ পুত্র দায়ুদ পাঠশালায় পারসীকাদি বিদ্যা শিক্ষা করেন। শিবানন্দ আপন জোষ্ঠ সহো- দরের পুত্র শ্রীহরিকে এবং মধ্যম ভ্রাতার পুত্র জানকী- বল্লভকে নবাব-তনয়ের সমানবয়স্ক দেখিয়া ঐ তিন জনের গাঢ়তর প্রণয় জন্মাইবার নিমিত্ত ভ্রাতুষ্পুত্রদিগকে সেই পাঠশালায় বিদ্যাভ্যাস করিতে প্রবৃত্ত করিয়া দেন। তাঁহারা দুই জন নবাবের কনিষ্ঠ পুত্রের সহিত লেখা পড়া আরম্ভ করিলেন। সমান বয়স্ প্রযুক্ত তিন জন মিলিত হইয়া বালক্রীড়া এবং নগরভ্রমণাদি করিতেহ তাঁহাদিগের ঈদৃশ অলৌকিক প্রণয় জন্মিয়াছিল যে কেহ কাহাকে না দেখিয়া ক্ষণকাল সুস্থির থাকিতে পারিতেন না।
এক দিন দায়ুদ কথাপ্রসঙ্গে তাঁহাদিগকে কহিয়াছি- লেন যে আমি যে কৰ্ম্ম পাইব তাহারি নায়েব তোমা- দিগকে করিব, আর যদি বাদশাহ হই তবে উজীর করিয়া নিকটে রাখির, সত্য করিতেছি, ইহার অন্যথা কদাচ হইবেক না।
গৌড়েশ্বর শোলেমানের পরলোক প্রাপ্তি হইলে পর তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র বাজিদ পিতৃশাসিত তিন প্রদে- শের ঈশ্বর হয়েন। পরে মৃত নবাবের জামাতা হসো তাঁহার প্রাণ সংহার করিয়া এক সপ্তাহ নবাব হইলেন। শোলেমানের ভক্ত সেনাপতি আমির লুদি দক্ষিণ দেশে থাকিতেন, তিনি ভদ্বৃত্তান্ত শ্রবণে অতি ক্রোধা- স্বিত হইয়া রাজধানী আক্রমণ পূর্ব্বক যুদ্ধে হসোকে বিনাশ করেন। পরে নবাবের কনিষ্ঠ পুত্র দায়ূদকে সেই সিংহাসনে বসাইয়া পূর্ব্ব প্রভুর ন্যায় তাঁহাকে সম্মানকরত স্বীয় কর্ম্মে প্রস্থান করিলেন।
দায়ুদ নব্রাব হইয়া প্রজাগণের প্রতিপালনে প্রবৃত্ত হইবার পূর্ব্বে, পূর্ব্বকৃত অঙ্গীকার অনুসারে ঐ দুই সুহৃৎ ভ্রাতাকে অনুগ্রহসূচক পরিচ্ছদ প্লদান করিলেন, এবং জ্যেষ্ঠ শ্রীহরিকে মহারাজ বিক্রমাদিত্য উপাধি দিয়া সর্ব্বাধ্যক্ষ মুখ্যপাত্র, আর কনিষ্ঠ জানকীবল্লভকে রাজা বসন্তরায় উপাধি দিয়া ভূমিসংক্রান্ত সমুদায় কর্ম্মের অধ্যক্ষ করিলেন। দুই ভ্রাতা দুই প্রধান কর্ম্মে নিযুক্ত হইয়া পরম আহ্লাদিত হইলেন। তাঁহারা যাহা২ করিতেন নবাব তাহাতে অন্যমত করিতেন না।
দায়ুদ নবাব হইয়া আত্মসুখে পরাত্মখ হওত প্রজা- দিগের ন্যায়ান্যায়ের বিচার ধর্মশাস্ত্রানুসারে অপক্ষপাতে করিতেন এবং সদা শাস্ত্র অনুশীলন, সদালাপ, আশ্রিত প্রতিপালন ও অতিথি অভ্যাগত দীন দরিদ্র প্রভৃতিকে ইচ্ছামত দানাদিদ্বারুও সর্ব্বত্র এমত বিখ্যাত হইয়াছিলেন যে আবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলেই তাঁহাকে প্রশংসা করিত।
নবাব এইরূপে যশঃসঞ্চয় করত দুই বন্ধুর পরামশ অনুসারে সমস্ত প্রজ। ও সৈন্য সামন্ত অনুগত রাখিয়; দিল্লীতে রাজকর প্রেরণ পূর্ব্বক কএক বৎসর সুনিয়মে রাজ্য শাসন করিলেন। পরে গ্রহবৈগুণ্যবশতঃ দৃষ্ট মতি উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে হতবৃদ্ধি করিল। তাহাতে তাঁহার মনোমধ্যে কত প্রকার কুমন্ত্রণার উদয় হইতে লাগিল। এক দিন তিনি মনে২ বিবেচনা করিলেন যে আপামর সাধারণ লোকেই আমার সুখ্যাতি করিয়া থাকে এবং সমস্ত সৈন্য ও প্রজাগণ বশীভূত, কেহ কোন প্রতিকুলভাচরণ করিবেক এমত সম্ভাবনা নাই। শুবে কেন দিল্লীশ্বরের অধীন থাকিয়া বৃশাককর প্রদান করি। বরং সেই ধনদ্বারা সৈন্যবৃদ্ধি করিয়া স্বাধীন হওয়া উচিত। আমার ধনের ভাবনা নাই, কোষ পরিপূর্ণ এবং অসংখ্য সৈন্যও আছে। যে ধন বৎসর২ দিল্লীতে প্রেরণ করিয়া থাকি, তাহা আর দিব না। তাহাতে যদি বাদশাহ আমার প্রতি কোন অত্যাচার করিতে প্রবৃত্ত হয়েন, আমিও তদমুযায়ি কর্ম করিব, ইহাতে ক্ষতি কি। ইহা কিছু অসঙ্গত কৰ্ম্ম নহে, এ হিন্দুর দেশ, পুর্ব্বে হিন্দুদিগেরই অধিকার ছিল। মুসলমানেরা নিজ বাহুবল ও পরাক্রমে তাহাদিগকে জয় করিয়া এ দেশ অধিকার করিয়াছে। দিল্লীর অধিপতি 'মুসলমান, আমিও সেই জাতি, তবে তিনি কেন আমার নিকট কর গ্রহণ করেন, আমিই বা কি জন্য দি। তাঁহার নামে মুদ্রা মুদ্রিত করা যায় এবং তিনি সিংহা- সনে আরোহণ করিয়া অসংখ্য মানবগণের উপর প্রভুত্ব করেন; আমি এক জন সামান্য দাসের মত তাঁহার অধীন হইয়া আছি, এ কি অন্যায়। আমি তাঁহাকে আর কর দিব না, স্থানে২ উপযুক্ত সেনা নিবেশ করিয়া স্বদেশে নির্ব্বিঘ্নে কর্তৃত্ব করিব, তিনি "আমার কি করিবেন।
দায়ুদের আসন্নকালে এইরূপ বিপরীত বুদ্ধি উপস্থিত হইল। তিনি দিল্লীতে যে কর প্রদান করিতেন তাহা এককালে বন্ধ করিলেন এবং নিজ অধিকারোৎপদ্ম ধনদ্বারা সুশিক্ষিত প্রচুর সৈন্য সংগ্রহ করিয়া দিল্লীর পথিমধ্যে স্তানে২ শিবির নির্মাণ পূর্ব্বক তাহাতে স্থাপন করিতে লাগিলেন। আট. দশ বৎসর ঐরূপ করাতে তাঁহার বিসুল ধন সঞ্চয় ও তগণ্য সৈন্য বৃদ্ধি হইল। পরে তিনি বোধ করিলেন এখন আমাকে আর কে পায়, আমার কোন বিষয়ের অপ্রভুল দেখিনা, তবে কেন মিথ্যা কালক্ষেপ করি, প্রকৃত কর্ম্মের চেষ্টা দেখা যাউক। এই স্থির করিয়া স্বনামে মুদ্রা প্রচলিত করণের ও গৌড়ে অপূর্ব্ব রাজসিং হাসন নির্মা- ণের আয়োজনে ব্যস্ত হইয়া, শ্বেত রক্ত পীত প্রভৃতি নানাবর্ণের বিবিধ প্রকার প্রস্তররাশি নানা স্থান হইতে আনাইলেন।
পঞ্চাশ হাজার অশ্বারূঢ় সৈন্য এবং তদমুরূপ ওলন্দাজ ও পদাতিক ইত্যাদি প্রায় তিন লক্ষ সৈন্যগণের সেনাপতিদিগকে নবাব আহ্বান করিয়া আদেশ করি- লেন যে তোমরা শীঘ্র যাও, সকলে আপন২ সৈন্য সহ থাকিয়া উত্তর পশ্চিম ও দক্ষিণের পথ এমত সাবধানে রক্ষা করিবে যে বিপক্ষ পক্ষের কেহ যেন দেশের মধ্যে কোনমতে প্রবেশ করিতে না পারে। তোমরা আপন২ স্থানে থাকিয়া আমার ভাণ্ডার হইতে সৈন্যগণের খাদ্যদ্রব্য অনায়াসে পাইবে, ইহা বলিয়া তাহাদিগের সমক্ষে কোষাধ্যক্ষফে ডাকাইলেন, এবং কহিয়া দিলেন যে ইহাঁরা যখন যে২ দ্রব্যের নিমিত্ত সংবাদ পাঠাইবেন, তুমি সে সমুদায় সামগ্রী অবিলম্বে পাঠাইবে, আমাকে আর জিজ্ঞাসার প্রয়োজন নাই।
ভবানন্দ মজুমদার নবাবকে এইরূপ বিষয়-মদে মত্ত দেখিয়া বিবেচনা করিলেন ইহার উন্নতি এই পর্যন্তই শেষ হইল, কবে কখন দিল্লীশ্বরের কোপে পতিত হইবেন তাহার স্থির নাই। অতএব এক্ষণে আর সপরি- বারে ইহাঁর নিকটবর্তী থাকা কোন মতে উচিত নহে।
আপন ভ্রাতার সহিত এই মন্ত্রণা স্থির করিয়া মজমদার মহারাজ বিক্রমাব্দিত্যকে নির্জনে ডাকিয়া কহিলেন বাপু শ্রীহরি! আমার একটী পরামর্শ শুন, দায়ুদের হতবুদ্ধি ঘটিয়াছে, ইনি এক্ষণে দুর্বৃত্ব হইয়া উঠিয়াছেন, ইহাঁর আর নিষ্কৃতি নাই। রাজ্যমদে ইহাকে জ্ঞানশূন্য করিয়াছে, ইনি অল্প কালের মধ্যেই রাজ্যচ্যুত হইবেন সন্দেহ নাই। দেখ হিন্দুস্থানে দিল্লীশ্বর আকবর বাদশাহকে না মানে এমন লোক নাই। গড় চিতোর প্রভৃতি দেশের রাজারা তাঁহার বশীভূত, তিনি ইহাকে নিপাত করিবেন ইহাতে কি সংশয় আছে! অতএব এক্ষণে সপরিবারে ইহার নিকট থাকিলে বিপদ ঘটিতে পারিবেক। এদেশে তোমাদিগের কর্তৃত্ব থাকিতে থাকিতেই গোপনে কোন রম্যস্থান অন্বেষণ করিয়া তথায় এক পুরী মির্মাণ করহ, তথায় যাইয়া বন্ধুবান্ধব সহিত থাকা যাউক। পরে কার্য্যের গতিক বুঝিয়া যাহা কর্ত্তব্য হয় করিতে পারিব, নতুবা ইহার পরে সপরিবারে বিপদ সাগরে মগ্ন হইতে হইবেক।
ভবানন্দ মজমদার, শ্রীহরি ও জানকীবঙ্গভের সহিত এই পরামর্শ স্থির করিয়া নিভূত স্থান অন্বেষণ করিতে দেশ বিদেশে লোক পাঠাইলেন, তাহারা দক্ষিণ অঞ্চলে সমুদ্রের নিকট এক স্থান মনোনীত করিয়া আইল। ঐ স্থান পূর্ব্বে চাঁদ খাঁ মশন্দরির অধিকার ছিল। তাঁহার উত্তরাধিকারী কেহ না থাকাতে ঐ দেশ ক্রমশঃ এমত দুর্গম জঙ্গল হইয়াছে যে তথায় যাতা- য়াত করা কঠিন, ভয়ানক অরণ্য দিয়া নৌকা ব্যতীত যাইবার আর কোন উপায় নাই। ঐ বনে ব্যাস্ত্র, মহিষ, বরাহ প্রভৃতি নানা হিংস্র জন্তু আছে এবং নদী সকল বৃহৎকায় কুম্ভীরপূর্ণ, ঐ ভয়ঙ্কর বনের নাম বাদা- বন, তাহার দক্ষিণাংশ অদ্যাবধি সুন্দরবন নামে প্রসিদ্ধ আছে। ঐ স্থানের সকল বৃত্তান্ত অরগত হইয়া সকলের তাহাই মনোনীত হইল।
বিক্রমাদিত্যের পিতা তৎপর হইয়া তথায় পুরী নির্মাণের নিমিত্ত এক জন বিশ্বস্ত লোক প্রেরণ করি- লেন। সে যাইয়া নগরের উপযুক্ত স্থান স্থির করিয়া তথাকার বন কাটাইল, এবং নদীতে সেতু বন্ধ করত প্রথমে এক প্রশন্ত পথ প্রস্তুত করিল। পরে দীর্ঘ প্রস্থে ছয় ক্রোশ স্থানের চারি দিকে গড় কাটাইয়া মধ্যস্থানে অপূর্ব্ব সাত মহল বাচী নিৰ্ম্মাণ করিল এবং তাহার চতুষ্পার্শ্বে হাট বাজার বসাইয়া ঐ স্থান অতি সুশোভিত করিল, ভবানন্দ স্বয়ং মন্ত্রিগণ সহিত যাইয়া দেখিলেন রম্য স্থান হইয়াছে। তথায় বাস করিতে সকলেরই মনন হইল।
ভবানন্দ সেই স্থানে থাকিয়া গৌড় হইতে সমুদায় দ্রব্য সামগ্রী নৌকাযোগে ঐ নূতন বাদীতে আনাইলেন এবং শুভক্ষণে পরিজনগণের সহিত গৃহ প্রবেশ করিয়া মনের সুখে বাস করিতে লাগিলেন, কোন উপদ্রবের ভাবনা রহিল না। শ্রীহরি জানকীবল্লভ ও শিবানন্দ-কাননগো এই তিন জন গৌড় রাজধানীতে বাসা করিয়া রহিলেন, আর সকলে ঐ মূতন বাটীতে যাইয়া রহিলেন।
এই প্রকারে ছয় সাত বৎসর অতীত হয়। পরে দিল্লীশ্বরের কর্ণগোচর হইল যে গৌড়ের সুবাদার দায়ুদ অনেক কাল অবধি কর দেয় নাই। এখান হইতে যে কেহ রাজস্ব আনিতে যায় তাহাকে মারিয়া ফেলে কি, কি করে তাহার কিছুই অন্বেষণ পাওয়া যায় না। বিস্তর সৈন্য ও ধন সংগ্রহ করিয়াছে। কর না দিয়া সেই স্থানের বাদশাহ হইতে এবং আপন নামে টাকা মুদ্রিত করিতে মানস করিয়াছে। এই কথা শুনিবা মাত্র বাদশাহাধে হুতাশনের ন্যায় জ্বলিয়া উঠিলেন, কাহার সাধ্য তাঁহার সম্মুখে যায়, সকলের বিষয়কর্ম করা ভার হইল। আকবরের তুল্য পরাক্রান্ত রাজা হিন্দুস্থানে কখন হয় নাই ও হইবে না।
বাদশাহের আজ্ঞানুসারে রাজা তোড়লমল, দায়ুদের শিরশ্ছেদন পূর্ব্বক সমুদায় দ্রব্য সামগ্রী দিল্লীতে প্রেরণের নিমিত্ত, দুই লক্ষ সৈন্যের অধ্যক্ষ হইয়া মহাদম্ভে বহির্গত হইলেন। দায়ুদের দিল্লীস্থ উকীল ঐ সংবাদ পূর্ব্বে পাঠাইয়াছিলেন, তাহাতে দায়ুদ ভীত হইয়া স্বীয় সমুদয় মৈন্য পশ্চিমের পথে স্থানে২ রাখিয়া তাহাদিগকে সাবধান করিয়া কহিয়া দিলেন যে কোন মতে বাদশাহের সৈন্যগণকে গঙ্গা পার হইতেনা দেয়। তোড়লমল গৌড় লক্ষ করিয়া আসিতে২ দুই মাসে কাশীর নিকট পৌছিয়। দেখিলেন, যে সুবাদারের সৈন্য গঙ্গাতীরে শিবির স্থাপন করিয়া রহিয়াছে। তাহাদিগকে দেখিয়া বাদশাহের সৈন্যগণ কেহ সহসা নদী পারে যায় এমত সাহস করিতে পারিলেক না। কএক দিবস পরে নৌকা করিয়া কতক সৈন্য আসিতে উদ্যত হইল, কিন্তু তাহারা ভীরে না আসিতে আসিতেই দায়ুদের সৈন্যেরা কামান মারিয়া নৌকাসমেত তাহাদিগকে ডুবাইয়া দিল, উপরে কেহ উঠিতে পারিল না। এই প্রকারে দিল্লীশ্বরের অনেক সৈন্য মারা পড়িল। তোড়লমল কোন উপায় করিতে না পারিয়া, প্রভুর গোচর কারণ ঐ সমস্ত বিবরণ সম্বলিত এক পত্র লিখিলেন। বাদশাহ পত্রের তাৎপর্য্য জ্ঞাত হইয়া ক্রোধভরে একে- বারে সমস্ত সৈন্য সামন্ত সসজ্জ হইতে আদেশ করিলেন।
দিল্লীর চতুষ্পার্শ্বস্থ সমুদয় সৈন্য সামন্ত একল হইলে, প্রধানহ সেনাপতিদিগকে আহ্বান করিয়া আজ্ঞা করি- লেন যে তোমরা গৌড়ে যাইয়া, দারুদের মুণ্ড নিশানের কলস করিয়া দাও। এই আজ্ঞা শ্রবণমাত্রে সকলে হর্ষে পুলকিত হইয়া, কেহ বা ল ঝম্প কেহ বা হুঙ্কার শব্দ করত সজ্জনান হইতে লাগিল। জয়ঢক্কা তুরী ভেরী প্রভৃতি বিবিধ বাদ্যের শব্দ আরম্ভ হইল। সেন।- পতিরা স্বব সৈন্য লইয়া বাহু আস্ফালন করত গৌড়ে যাত্রা করিলেন। বাদশাহ তাহাদিগের পশ্চাৎ২ মৃগয়া করিতে২ আসিতে লাগিলেন। এই সমস্ত ব্যাপার দেখিয়। দায়ূদের উকীল বিবেচনা করিলেন যে, আমা- দিগের প্রভুর আর রক্ষা নাই, যাহা হউক সংবাদ পাঠান অতি কর্ত্তব্য। এই বিবেচনা করিয়া লোকদ্বারা সমুদায় ব্লত্তান্ত দায়ুদকে জ্ঞাত করাইলেন।
বাদশাহ সকল সৈন্য সামন্ত লইয়া মহাক্রোধে আনি- তেছেন, ইহা শুনিয়া দায়ুদ প্রথমে মুর্দ্দিত হইলেন, কিঞ্চিৎকাল পরে চেতনা পাইয়া, কি করি, কোথা যাই, প্রাণ রক্ষার উপায় কি, এইরূপ চিন্তায় ব্যাকুল হইয়া, মহারাজ বিক্রমাদিত্য ও রাজা বসন্তরায়কে ডাকিয়া নির্জ্জনে কহিলেন, আমার আর জয়ের সম্ভাবনা নাই, দিল্লীশ্বর স্বয়ং সৈন্যগণের অধ্যক্ষ হইয়া আমাকে আক্রমণ করিতে আসিতেছন, পৃথিবীতে এমন কে আছে যে তাঁহার সম্মুখবর্তী হইয়া যুদ্ধ করে। বুঝি আমার শেষ দশা উপস্থিত, নতুষা কেন এমন কুবুদ্ধি ঘটিল। আমি শৃগাল হইয়া দুর্দ্দান্ত সিংহের সহিত যুদ্ধ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি। যাহাহউক যাহা করা গিয়াছে, তাহার চিন্তায় আর কি হইবে, এক্ষণে যাহা কর্তব্য হয় তোমরা করহ, আমার কোন বিষয়ে কিছু বুদ্ধি আইসে না। আমার বল, বুদ্ধি, ভরসা সকলই তোমরা, যুদ্ধ , বিষয়ে যাহা হয় করহ, আমার মত গ্রহণের কোন আবশ্যক নাই।
ায়ুদ ঐ দুই ভ্রাতাকে সমস্ত জ্ঞাত করাইয়া কহিলেন, এক্ষণে আর কোন উপায় নাই, আমার সৈন্য যে কিছু আছে সমস্তই দিল্লীশ্বরের পথ রোধ করিতে প্রেরণ করহ, আর তোমরা দুই ভাই আমার নিকট থাকহ। আমরা পশ্চাতে থাকিয়া সৈন্যগণের খাদ্য আহরণ ও প্রজাগণের কোন ক্লেশ না হয় এমত করিতে চেষ্টা পাই। গৌড়ে আমার যে কিছু ধন সম্পত্তি আছে সমুদায় একাদিক্রমে তোমাদিগের নূতন বাটীতে পাঠা- ইয়া দাও, সময়ানুসারে আন। যাইবেক।
দুই ভাই অতি বিশ্বাসপাত্র ছিলেন, একারণ নবাৰ সোণা রূপা প্রভৃতি থাতুদ্রব্য ও মণি মুক্তা প্রবালাদি বহুমূল্য যাবতীয় সামগ্রী তাঁহাদিগের হস্তে সমর্পণ করিলেন এবং নগরবাসী লোকেরা ভয়ে পুরাতন বস্ত্র অবধি তাঁহাদিগের নিকট রাখিলেক। দুই তাই নৌকা- যোগে সমুদায় সম্পত্তি আপন নগরে পাঠাইলেন। গৌড়ের শোভা আর কিছুই রহিল না কেবল সকলে সামান্য লোকের ন্যায় বাস করিয়া রহিল। গৌড়ের সমুদায় সামগ্রী ঐ মূতন নগরে লইয়া যাওয়াতে তথা- কার সকল লোক ঐ নগরের নাম যশোহর রাখিল, অদ্যাবধি সেই স্থানকে যশোহর কহে।
বাদশাহ সকল সৈন্য সহিত প্রয়াগে উপস্থিত হইয়া তাহাদিগকে অগ্রসর হওনের আদেশ করিয়া তথায় অবস্থিতি করিলেন। তৎকালে প্রয়াগে যে দুর্গ প্রস্তুত হইয়াছিল তাহা অদ্যাপি আছে। দিল্লীশ্বরের সৈন্যগণ এক বৎসরের মধ্যে কোনক্রমে পর পারে আগমনের উপায় না পাইয়া হতাশ প্রায় হইয়াছিল। দৈবের নির্বন্ধ কে খণ্ডাইতে পারে। এক দিবস রাত্রিযোগে দায়ুদের শিবিরে আত্মবিচ্ছেদ উপস্থিত হওয়াতে সকলে পরস্পর যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইল, বিপক্ষগণের আত্রমণ সিবারণের প্রতি কাহারও মনোযোগ রহিল না। এই অবকাশে দিল্লীশ্বরের সৈন্যগণ পার হইয়। দায়ুদের সেন। সকল ছিন্ন ভিন্ন করিল। অকম্মাৎ আহত হইয়া অনেকে প্রাণত্যাগ করিল, আরছ সকলে অস্ত্রশস্ত্র পরি- ত্যাগ করিয়া শিবাগণের ন্যায় সত্বর গতিতে কে কো- থায় পলায়ন করিল, তাহাদিগের অম্লসন্ধান হইল না।
বাদশাহের সৈন্যগণ নদী পার হইয়া শিবিরে প্রবেশ করাতে সকলে রণে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিয়াছে, এই সংবাদ শ্রবণমাত্রে দায়ুদের মস্তকে যেন বজাঘাত হইল। তিনি দুই প্রিয় বন্ধুকে ডাকিয়া কহিলেন, ভাইরে আমি এখন নিরুপায় হইয়াছি, পরে যাহাহউক এক্ষণে কি করা যায়। যাবৎ শ্বাস তাবৎ আশ, বাদশাহের এখানে আগমন হইলে মঙ্গলের চেষ্ট। পাইবে, এক্ষণে তোমরা দুই ভাই ছদ্মাবেশে থাকহ এবং আমি সপরি- বারে রাজমহলের পর্ব্বতে প্রয়ান করি; মধ্যে২ আমার তত্ত্বামুসন্ধান করিও। তোমাদিগের সংবাদ না পাইলে কদাচ তথা হইতে নীচে আসিব না। প্রিয়তম বান্ধবেরা বিদায় হই, আর সাক্ষাৎ হয় বা না হয়। এইরূপ কহিতে২ গৌড়াধিপ দায়ুদের নেত্রজলে পৃথিবী ভাসিয়া গেল। দুই ভ্রাতা বন্ধুবিচ্ছেদশোকে বিহ্বল হইয়। ক্রন্দন করিতে২ ভূতলে পতিত হইলেন। পরে দায়ুদ ভাঁহাদিগকে সান্ত্বনা করিয়া কিঞ্চিৎ ধন ও এক বৎসরের খাদ্য সামগ্রী লইয়া পর্ব্বতে আরোহণ করি- লেন। মহারাজ বিক্রমাদিত্যেরা দুই ভাই বৈরাগী বেশ ধারী হইয়া বরেন্দ্র ভূমিতে যাত্রা করিলেন।
বাদশাহের সেনাপতি রাজা তোড়লমল ও রাজা ওমরাও সিংহ সকল সৈন্য লইয়া যে২ স্থানে দায়ু- দের সৈন্য ছিল সর্ব্বত্র জয়ী হইয়া লুঠ করিতে২ আসিতে লাগিলেন। রাজমহলের নিকট উপস্থিত হইয়া তথাকার দুর্গ আক্রমণ করিতে তৎপর হইলেন। অনায়াসে সে স্থান হস্তগত হইল। সেনাপতিরা গৌড় রাজধানী লক্ষে সকল সৈন্য সসজ্জ করিয়া গমন করিলেন।
সকলে গৌড়ে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন যে সেখানে দায়ুদ কি তাঁহার অমাত্যগণ কেহই নাই, দুর্গ শ্মশান ভূমি হইয়াছে, গৃহ সকল শূন্য, কিঞ্চিন্মাত্র তথায় নাই। তিন সুবার হিসাবের কোন কাগজপত্র না পাওয়াতে, তাঁহারা দুই জন কি প্রকারে রাজস্ব আদায় আদির সুশৃঙ্খল নিয়ম স্থির করিবেন, এই চিন্তায় মগ্ন হইয়া বিমর্শমনে দুই তিন দিন সে স্থানে থাকিলেন। পরে পুনর্ব্বার রাজমহলে যাইয়া তথায় এবং গৌড়ে ও তাহার চারিদিকের নিকটবর্তি প্রদেশে ঘোষণা দিলেন, দায়ুদ পলায়ন করিয়াছেন, তাঁহার প্রধান২ কর্মুচারির মধ্যে যদি কেহ তিন সুবার বিষয়জ্ঞ থাকেন তবে তিনি রাজমহলে আসিয়া বাজগণের নিকট সমস্ত বিবরণ জানাইলে রাজারা তাঁহার প্রতি বিশেষ বিবেচনা করিবেন, তিনি পূর্ব্ব কর্ম্মে নিযুক্ত হইয়া যে২ মনোগত অভিপ্রায় প্রকাশ করিবেন তাহা সঙ্গত বোধে গ্রাহ্য করা যাইবেক। রাজারা অভয় দিতেছেন, কদাচ তাঁহাদিগকে প্রাণে নষ্ট করিবেন না, বরং সমাদর করিবেন ইহাতে কোন সন্দেহ নাই।
এই রূপ ঘোষণার অনুসন্ধান পাইয়া ছদ্বাবেশী দুই ভাই রাজমহলে উপস্থিত হইলেন এবং বাদশাহের সেনাপতিদিগের নিকট চর পাঠাইলেন। রাজারা চরের প্রমুখাৎ দাযুদের দুই প্রিয়পাত্রের আগমন বার্ত। শুনিয়া আহলাদিত হইলেন, এবং চরকে কহি- লেন, তুমি যাও, তাঁহাদিগকে আন, তাঁহারা হিন্দু- লোক আমরাও তাহাই। তুমি যাইয়া বল আমরা সত্য করিয়া কহিতেছি, তাঁহাদিগের হিংসা কোন মতে হইবেক না, আমাদিগের সহিত যথেষ্ট আনুগত্য এবং অধিক সম্ভ্রম হইবেক, যেমন তাঁতারা দায়দের নিকট ছিলেন আমাদিগের কাছেও সেইরূপ থাকি- বেন। ইহা স্থির জানিও, কোনক্রমে তাহার অন্যথা হইবেক না।
রাজারা মহারাজ বিক্রমাদিত্যের চরকে এইরূপ কহিয়া তদমুরূপ পত্র লিখিলেন। তাঁহারা দুই ভাই সেই পত্রে বিশ্বাস পাইয়া তাঁহাদিগের নিকট গমন করিলেন। সাক্ষাৎ হইলে পর রাজারা অতিশয় সন্মান পুরঃসর দুই ভ্রাভাকে উত্তম খেলাত্ দিয়া সে দিবস বিদায় করিলেন। পর দিবস বিক্রমাদিত্য ও তাঁহার ভ্রাতা সভাস্থ হইলে রাজারা সমাদর পূর্ব্বক তাঁহা- দিগকে নিকটে বসাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, দায়ুদ কোথায় আপনারা জানেন! তাঁহারা উত্তর করিলেন না মহ'রাজ আমরা স্থির কহিতে পাবি না যে তিনি 'কোথায় গিয়াছেন, কিন্তু শুনিয়াছি রাজমহলের পর্ব্বতে আরোহণ করিয়াছেন, ইহা ব্যতীত আর কিছু জানি নাই। রাজারা পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কাগজ পত্রের কিছু সন্ধান জান কি না! বিক্রমাদিত্য কহিলেন হাঁ মহারাজ তিন সুবার পৃথকহ সমস্ত কাগজ আমাদিগের নিকটে আছে। আর যে২ বিষয় আমরা অবগত আছি পশ্চাৎ প্রকাশ করিব। অগ্রে আপনারা যে অঙ্গীকার করিয়াছেন তাহা প্রতিপালন করুন। রাজারা কহিলেন তোমরা লিখন দ্বারা স্বীর অভিলাষ প্রকাশ করিলে তদমুসারে অবশ্য আজ্ঞা করা যাইবেক।
বিক্রমাদিত্যেরা দুই ভাই পত্রদ্বারা জানাইলেন যে বঙ্গ দেশে গঙ্গানদীর পূর্ব্ব ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পশ্চিম যশোহর নামে যে রাজ্য আছে তাহা আমাদিগের অধিকার; আপনারা এদেশে যাবৎ থাকিবেন ঐ রাজ্যে আমাদিগের কর্তৃত্ব ভার এবং খুড়া মহাশয়ের উপর
পূর্ব্বমত কাননগো দপ্তরের সমুদায় ভার থাকে, এই আমাদিগের প্রার্থনা। রাজারা ঐ দরখাস্ত গ্রাহ্য করিয়া প্রয়াগ হইতে জমিদারির শনন্দ আনাইয়া দিলেন এবং তাঁহাদিগকেই সকল কার্য্যের অধ্যক্ষ করিয়া, তিন প্রদেশে সুনিয়ম সংস্থাপন করিবার নিমিত্ত গৌড় রাজধানী গমন করিলেন। মহারাজ বিক্রমাদিত্য ও শিবানন্দ কাননগো, দেশে কর আদা- য়ের রীতি প্রচার করিবার পূর্ব্বে রাজা বসন্তরায়কে পূর্ব্ব দেশের রাজ। করিয়া "সহারাজ বসন্তরায়" এই উপাধি দিয়া যশোহরে পাঠাইলেন এবং আপনারা গৌড়ে থাকিয়া কর আদায় প্রভৃতি সকল কৰ্ম্ম নিষ্পা- দন করিতে লাগিলেন।
এখানে দায়দের খাদ্য দ্রব্য অপ্রতুল হওয়াতেতাঁহার ভৃত্য মাশুমখাঁ পর্ব্বত হইতে নামিয়। সামগ্রী ক্রয় করিতে রাজমহলে আসিয়া ঐ সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইল এবং যাইয়া দায়ূদকে সবিশেষ জানাইল যে বাদশাহের প্রেরিতরাজারা মহাশয়ের বিস্তর অন্বেষণ করিয়া অনুসন্ধান ন। পাইয়া অবশেষে মহাশয়ের প্রতিষ্ঠিত রাজাদিগকে পূর্ব্বমত কাৰ্যাধ্যক্ষ করিয়াছেন, মহাশয়কে পাইলে তাহাদিগকে বোধ হয় এমত করিতেন না যাহা হউক এক্ষণেও যদি মহাশয় যাইয়া তাঁহাদিগের সহিত সাক্ষাৎ করেন তবে মহাশয়ের পক্ষে অনেক সুবিধা হইতে পারে।
দায়ুদ কহিলেন তোমার কথায় আমার বিশ্বাস হইতেছে না, তাহা হইলে বিক্রমাদিত্য আমাকে অবশ্যই সংবাদ করিতেন। চাকর কহিল মহাশয় যাহ। কহিতেছেন ইহা প্রমাণ বটে, কিন্তু এক্ষণে শঠের কাল পড়িয়াছে, তাহারা হিন্লোক, অতি দুষ্টস্বভাব, তাহাতে আবার নিজে কর্তৃত্ব ভার পাইয়াছে, এক্ষণে মহাশয়ের সহিত আর সম্পর্ক কি? আপনি বাদশাহের লোকের নিকট গমন করিলে আপনাকে তাঁহারা পরিত্যাগ করিবেন না, অবশ্যই পূর্ব্ব পদে নিযুক্ত করিবেন। আমি এই সমাচার শুনিয়া আসিতেছি। দায়ুদ কহি- লেন তুমি পুনর্ব্বার নীচে যাইয়া কোন লোক দ্বারা অনুসন্ধান লইয়া আইস, যদি কিছু উপকার দর্শে তবে আমি যাইয়া তাঁহাদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিব।
মাশুমখা দায়ুদের কথায় পর্ব্বত হইতে পুনর্ব্বার নামিয়া, ওমরাও সিংহের চাকরের সহিত মিলিয়া তাহাকে সকল বিষয় জ্ঞাত করিল। সে যাইয়া আপন প্রভু সিংহরাজের নিকট ঐ কথা উপস্থিত করিলে রাজা স্বয়ং গোপনে গৌড় হইতে রাজমহলে আসিয়া মাশু- মখাঁকে কিঞ্চিৎ পারিতোষিক দিয়া কহিলেন, তুমি শীঘ্র যাইয়া দারুদকে লইয়া আইস, কোন মতে বিলম্ব করিও না, পুনর্ব্বার তোমাকে উত্তম পারিতোষিক দিব, আর তিনি আইলে তাঁহারও ভাল হইবেক। নির্ব্বোধ মাশুমখাঁ সিংহের কথায় তুষ্ট হইয়া মহা আনন্দে পর্ব্বতে যাইয়া দায়ুদকে সমুদায় বিবরণ নিবেদন করিল কপালের লিখন কে খণ্ডাইতে পারে, দায়ুদের নিয়ত কাল উপস্থিত, সুতরাং নীচে আসিতে তাঁহার ইচ্ছা হইল।
বেগম এ বিষয় জ্ঞাত হইয়া নবাবকে কৃতাঞ্জলি হইয়া নিবেদন করিলেন আপনি সহসা এমত কৰ্ম্ম কদাচ করিবেন না। সহসা কোন কৰ্ম্ম করিলে অবিবেচনা প্রযুক্ত হঠাৎ কোন বিপদ্ ঘটিতে, পারে। বিক্রমাদিত্য আপনকার অভি বিশ্বাসি পাত্র, সে যদি এমত বুঝিত তবে কি কোন লোক দ্বারা এ বিষয়ের সমাচার পাঠা- ইত না, অবশ্যই পাঠাইত, অথবা অপনারা এক জন আসিত। আপনি মুর্খ লোকের কথায় বিশ্বাস করিবেন না, সে কি বুঝে?
দায়ুদ কহিলেন আমার নিভান্ত মন টানিতেছে, নীচে যাই, গেলে আমার সুপ্রভুল হইবেক, তাহার সন্দেহ নাই। বেগম নানা মতে নিষেধ করিলেন, নবাবের মৃত্যু উপস্থিত, তাহাতে কিছুই ফলোদয় হইল' না। বিধির লিখন কে খণ্ডাইতে পারে। তিনি স্ত্রীলোক কি করিতে পারেন, নিরুপায় হইয়া অদৃষ্টে নির্ভর করত তাঁহার পশ্চাতে২ সপরিবারে রোদন করিতে২ পর্ব্বত হইতে রাজমহলে আসিয়া উপরিত হইলেন। মাশুমখা যাইয়া দায়ুদের আগমন বার্ডা ওনরাও সিং- হকে কহিবামাত্র তিনিস্বীয় বশীভূত লোক দ্বারা দায়ুদকে ধৃত করিষা অৎক্ষণাৎ তাঁহার মস্তক ছেদন করত মৃণ্ড রণপতাকার অগ্রভাগে সংলগ্ন করিয়া দিলেন, এবং প্রতি নগরে জয় ঘোষণা প্রচার করাইলেন।
দায়ুদকে ঐরূপ দেপ্পিয়া সকল সঙ্গিলোক কে কোথায় পলায়ন করিল, বাদশাহের প্রেরিত রাজা তাহাদিগের অনুসন্ধান পাইলেন না। বেগম প্রথমতঃ বিষন্নবদনা খিদ্যমানা ও অতি কাতরা হইয়া চিত্রপুত্তলীর ন্যায় দণ্ডায়মানা ও শোকে বিহ্বলা হইয়া ধর।- তলে পড়িয়া। অশ্রুপূর্ণলোচনে হে নাথ ২ কি করি, কোথায় যাই, কি হইবে, এই প্রকারে উচ্চেঃস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন। সান্ত্বনা করে এমত কেহ কাছে নাই, বেগমের বিলাপে সকল লোক হায়২ করিতে লাগিল। ওমরাও সিংহের এমত কঠিনা- ন্তঃকরণও কোমল হইল, তিনিও রোদন করিলেন। বিক্রমাদিত্য কার্য্যান্তরে সে দিবস রাজমহলে আসিয়া- ছিলেন, তিনি তথায় উপস্থিত হইয়। অতি শোকাবৃত হইলেন, কোন উপায় নাই, কি করিতে পারেন, কেবল সিংহরাজের নিকট হইতে দায়ুদের শরীর ভিক্ষা লইয়া লোক দ্বারা কবর দেওয়াইলেন। ওমরাও সিংহ বাদশাহের আজ্ঞা মত বেগম ও আর২ স্ত্রীলোকদিগকে পিঞ্জরে বদ্ধ করিয়া দায়ুদের মুণ্ড সমেত প্রয়াগে বাদশাহের নিকট প্রেরণ করিলেন।
রাজা বিক্রমাদিত্য কএক মাসের মধ্যে তিন প্রদে- শের সমুদায় কাগচ পত্র বাদশাহের অধীন রাজা- দিগকে জ্ঞাত করাইয়া কর্ম্ম পরিত্যাগের মানসে তাঁহা- দিগকে নিবেদন করিলেন। আজ্ঞা হইলে আমি গৃহে গমন করি, খুড়। মহাশয় মহাশয়দিগের নিকটে থাকেন। দায়দ অতিপ্রিয় প্রভু ছিলেন, তাঁহার রাজ্যে অন্যের অধীনে কর্তৃত্ব করিয়া কর্ম করি এমত ইচ্ছা আমার নাই। মহাশয়েরা অনুগ্রহ পূর্ব্বক আমাকে যে রাজ্য দিয়াছেন তাহাই যথেষ্ট, আর আবশ্যক নাই। মহাশয়েরা যাবঞ্জ এই দেশে থাকিবেন, খুড়া মহাশয় কাননগো দপ্তরের কর্ম করেন এই আমার প্রার্থনা।
রাজারা বিক্রমাদিত্যের নিবেদন গ্রাহ্য করিয়। প্রয়াগ হইতে আজ্ঞাপত্র আনাইয়া দিলেন এবং সকলে হৃন্ট হইয়া তাঁহাকে যম্মোহরে পাঠাইলেন। রাজা বিক্রমাদিত্য গমন কালে গৌড়ে অবশিষ্ট যে কিছু বহুমূল্য প্রস্তরাদি ছিল সকল সঙ্গে লইয়া গেলেন। শুভক্ষণে স্বস্থানে উপস্থিত হইয়া ঘাটে বাদ্যধ্বনি করিতে আজ্ঞা করিলেন। সকল যন্ত্রিরা স্ব২ যন্ত্রে তালে মানে বাদ্য আরম্ভ করিল এবং সহচর সৈন্যগণ বন্কের শব্দে দেশস্থ সকলকে বধির করিল। ঐ সমস্ত ব্যাপারে প্রথমতঃ নগরবাসি লোকেরা চমকিত হইল, পরে তদন্ত জানিয়া মহাহর্ষে রাজবাটীতে সংবাদ প্রদান করিল। রাজা বসন্তরায় হর্ষে পুল কিত হইয়া মন্ত্রিগণ সহ নদীতটে উপস্থিত হইয়া বিক্রমাদিত্যকে চতুৰ্দ্দোলে আরোহণ করাইয়া পুরী মধ্যে লইয়া গেলেন। তথায় প্রবেশের সময়ে কুলব রা আসিয়া বিবিধ প্রকার মঙ্গলাচরণ করিল। রাজা বসন্তরায় দীন দরিদ্রদিগকে ধন বিতরণ করিতে ভৃত্য বর্গকে অনুমতি করিয়া, কহিয়াদিলেন দেখ, সকলে যেন তুষ্ট হইয়া যায়, আর কেহ পাইলাম না এই কথা না বলে। এই আজ্ঞা পাইবা মাত্র ভূত্যেরা ধন দান করিতে প্রবৃত্ত হইয়া এক দণ্ডের মধ্যে লক্ষ মুদ্রা বিতরণ করিল।
রাজা বিক্রমাদিত্য সকল দেবালয়ে যাগ যজ্ঞ পূজা ও প্রতিদিন দশ সহস্র ব্রাহ্মণ ভোজন ইত্যাদি মহা- মহোৎসবে যশোহরে বাস করিতে লাগিলেন। রাজা বসন্তরায় রাজকর্মের ও আর২ সকল কার্য্যের অধ্যক্ষ হইয়। থাকিলেন। মহারাজ বিক্রমাদিত্য ভ্রাতার অনুমতি ব্যতিরেকে কিছুই করেন না, বাদশাহের নিকট কর প্রেরণার্থ দিল্লীতে এক জন উকীল নিযুক্ত করিয়া পাঠাইলেন। রাজ। বসস্তরায় অতি শান্তমতি সুপ্রকৃতি, তাঁহার প্রজাদিগের প্রতি কোন অত্যাচার নাই, এই হেতু প্রজা সকল মহাসুখে কালযাপন করিতে লাগিল।
রাজা বসন্তরায় এক দিবস মহারাজ বিক্রমাদিত্যের সম্মুখে কৃতাঞ্জলি হইয়া নিবেদন করিলেন মহাশয় অবধান করুন, আমরা এ স্থানে সকল বিষয়েই সুখী আছি, কেবল এক দুঃখ এই যে আমাদিগের জ্ঞাতি কুটুম্ব কেহ এখানে নাই, অনুমতি হইলে বাকলা ও অন্যান্য স্থান হইতে স্বশ্রেণীয় কায়স্থগণকে সপরিবারে যশোহরে আনাইয়া বাস করাই, এবং তাঁহাদিগকে জীবিকার উপযুক্ত বৃত্তি প্রদান করি, তাহা হইলে এ স্থান এক বিশিষ্ট সমাজ হইবেক। মহারাজ বিক্রমা- দিত্য কহিলেন উত্তম প্রসঙ্গ করিয়াছ, ইহা অবশ্য কর্তব্য, তুমি এই কর্ম্মে প্রবৃত্ত হইয়া সচ্চরিত্র প্রিয়বাদি বিবেচক-লোকদিগকে স্থানে২ প্রেরণ করহ, তাঁহারা যাইয়া আমাদিগের স্বশ্রেণীয় লোকদিগকে সমাদর পূর্ব্বক আনয়ন করুন। তাঁহারা সপরিবারে এখানে আইলে তাঁহাদিগের প্রত্যেককে এক২ পুরী নির্মাণ করাইয়া দাও, আর এনত বৃত্তি প্রদান কর যাহাতে তাঁহাদিগের কোন ক্লেশ না থাকে, ইহাতে আমার অভিশয় আহলাদ জানিম্ব।
রাজা বসন্তরায়, স্বীয় জ্ঞাতি বঙ্গজ কায়স্থদিগকে আনয়ন করিতে বিশ্বস্ত লোকদিগকে পাঠাইলেন। তাঁহারা নানা স্থানে যাইয়া অনেক কায়স্তকে নৌকা- যোগে যশোহরে পাঠাইতে লাগিলেন। এখানে তাঁহারা উপস্থিত হইবামাত্র রাজা বসন্তরায় ব্রাহ্মণী- গণকে পাঠাইয়া তাঁহাদিগের স্ত্রীলোককে সমাদর পুর্ব্বক নৌকা হইতে উঠাইয়া অলঙ্কার বস্ত্রাদিতে সুশোভিতা করাইয়া রম্যস্থানে অবস্থিতি করিতে দিলেন, এবং সময়ে২ সেই২ কায়স্থদিগকে সঙ্গে লইয়া অধিকারের মধ্যে নানা স্থান দেখাইয়া আনেন, যিনিযে স্থান মনোনীত করেন তাঁহাকে সেই স্থানে বাস করাইয়া বহু ভূমি প্রদান করিতে লাগিলেন। এই মতে অনেক২ বঙ্গজকায়স্থ আপন২ দেশ পরিত্যাগ করিয়া যশোহরে আসিয়া বসতি করিলেন। এবং অনেক ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য কায়স্থ প্রভৃতিরা ভূমিবৃত্তি পাইয়া নিজ২ বাসস্থান ত্যাগ করিয়া তথায় আসিয়া বাস করিলেন। ঢাকা অবধি হালিশহর পর্য্যন্ত সকল স্থানে ব্রাহ্মণ কায়স্থ বৈদ্য প্রভৃতি নানা ভদ্রজাতির বাস হইল। মহারাজ বিক্রমাদিত্য সমাজপতি হইলেন। এমত সমাজ বঙ্গদেশে কখন ছিল না। ঐ সমাজস্থ বিজ্ঞ লোক সকলে রাজার নিকটে থাকিতেন, আর২ সকলে নিজ২ বাটীতে থাকিয়া নিরুদ্বেগে কাল যাপন করি- তেন।
মহারাজ প্রত্যেক গ্রামে বালকদিগের বিদ্যাভ্যাসের নিমিত্ত চতুষ্পাঠী ও পাঠশালা স্থাপন করিয়া উপযুক্ত অধ্যাপক ও শিক্ষক নিযুক্ত "করিয়াদিলেন। রাজার এইরূপ যত্নে সকল লোকেই প্রায় বিদ্বান্ হইয়া উঠিল। মহারাজ বিক্রমাদিত্য সকলকে পরিতুষ্ট রাখিয়া প্রতি- পালন করিতেন এবং মাসেই সকলকেই পরিবারের ভরণ পোষণার্থ উপযুক্ত মত কিঞ্চিৎ২ টাকা দিতেন। আর নিজ অধিকার,মধ্যে স্থানে২ দেবালয় সংস্থাপন করিয়া তাহার নিকটে অতিথি অভ্যাগতদিগের উত্তরণস্থান নির্দ্দিষ্ট করিয়া তথায় তাহাদিগকে ভোজ্য দ্রব্য প্রদানার্থ অধ্যক্ষ নিযুক্ত করিয়াছিলেন, পান্থ ব্যক্তিরা পথশ্রান্ত হইয়া তথায় উপস্থিত হইবামাত্র পাদো- দকাদি প্লাইয়া শ্রান্তি দূর করিত, পরে আহারাদি করিয়া পরম সুখে বিশ্রাম করিত।
মহারাজ বিক্রমাদিত্য রাজ্যমধ্যে এইরূপ সুশৃঙ্খলা স্থাপন করিয়া প্রজাপালন করিতে লাগিলেন, কিন্তু তাঁহার সন্তান না হওয়াতে, সকলেই ক্ষোভিত। রাজা প্রথমতঃ নানা প্রকার দৈব কৰ্ম্ম করিয়া পরিশেষে পুত্রেষ্টি যাগ আরম্ভ করিলেন, যজ্ঞ সমাপ্ত হইলে রাজ্জীর গর্বসঞ্চার হইল। ক্রমে২ নবম মাস অতীত হইয়া দশম মাস প্রবৃত্ত হইলে, রাজা জ্যোভিঃশাস্ত্রবিশারদগণকে আহ্বান করিয়া সময় নিরীক্ষণে সতর্ক রহিলেন। অনন্তর শুভক্ষণে কার্তিকেয়ের ন।ায় পরম রমণীয় এক কুমাব ভূমিষ্ঠ হইল। রাজা সন্তানমুখ সন্দর্শনে হৃষ্টচিত্ত হইয়া সকল যন্ত্রিকে স্ব২ যন্ত্রে নঙ্গল বাদ্য করিতে, এবং দীন দরিদ্রদিগকে যাহাতে তাহাদিগের পরিতোষ হয় এমত সামগ্রী প্রদান করিতে আদেশ করিলেন। পরে জ্যৌতিষিক পণ্ডিতদিগকে অনুমতি করিলেন যে আপনারা জ্যোতিগ্রন্থের মর্মামু- সারে কুমারের জন্মকালীন গ্রহগণের গতি দেখিয়া শুভাশুভ ফল বিশেষরূপে বিবেচনা করিয়া আমাকে শ্রবণ করাউন। পণ্ডিতেরা সকলে নানা গ্রন্থ লইয়া রাজকুমারের জন্মলগ্ন স্থির করত তদীয় ফল অবগত হইয়া রাজাকে কহিলেন, মহারাজ আপনকার পুত্র যে লগ্নে জন্মিয়াছেন তাহাতে তিনি তাবৎ বিষয়েই সুলক্ষণাক্রান্ত হইয়াছেন, কিন্তু, কেবল একটী কুলক্ষণ দেখিতেছি ইনি পিতৃদ্রোহী হইবেন, ইতা শুনিয়া মহারাজের হর্ষে বিষাদ হইল।
রাজা বিক্রমাদিত্য মহা সমারোহপূর্ব্বক নিয়মিত কালে পুত্রের অন্নপ্রাশন কৰ্ম্ম সমাপন করিয়া রাজা প্রতাপাদিত্য নাম রাখিলেন। মহারাজ ও রাজা বসন্তরায় কুমারের রূপ লাবণ্য দর্শনে অতিপ্রীত হইয়া তাঁহাকে প্রতিপালন করিতে লাগিলেন। রাজকুমার পঞ্চম বর্ষে বিদ্যারম্ভ করিয়া অতি অল্প দিনের মধ্যেই অষ্টাদশ বিদ্যায় সুপণ্ডিত হইলেন।
রাজা প্রতাপাদিত্য সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় ও মহা- যোগী ছিলেন। ইষ্ট দেবতা কালী সুপ্রসন্না হইয়া কন্যাতাবে তাঁহার গৃহে অবস্থিতি করিতেন; তাঁহার বিরুদ্ধ দশার সময়ে সেই দেবতাই প্রতিকূলা হইয়াছি- লেন। ইহার নিদর্শন তাঁহার রাজধানীর অনতিদূরে এক মন্দির অদ্যাপি আছে, তাহাতে প্রতিষ্ঠিতা দেবীর মুখ পশ্চিমদিকে এবং ঐ মন্দিরের প্রাঙ্গণ দক্ষিণে, রহি- য়াছে, তাহাতে সকলে অনুমান করেন যে দেবী প্রতা- পাদিত্যের প্রতি প্রতিকূলা হইয়া ঐরূপ পরাত্মখী হইয়াছেন।
মহারাজ রাজকুমারের বিবাহ দিয়া কিছুকাল পরম সুখে রাজ্য করিতে লাগিলেন। পরে কুমারের যৌবনাবস্থায় পরাক্রম দেখিয়া শঙ্কিত হওত মনে২ বিবে- চনা করিলেন যে আমাদিগের কুলে এক কুলাঙ্গার অসুর জন্মিয়াছে, ইহুা হইতেই কুলে কলঙ্ক হইবেক সন্দেহ নাই। ইহার প্রতীকারের কোন উপায় দেখি না, এই চিন্তায় সদত চিন্তিত থাকেন।
রাজা বিক্রমাদিত্য এক দিবস স্নান করিভেছেন এমত সময়ে একটা চিল বাণবিদ্ধ হইয়া আকাশ হইতে তাঁহার সম্ভ্রখে পতিত হইল। রাজা তাহার পতনকালে প্রথমতঃ চকিত হইয়া পশ্চাৎ অরগত হইলেন যে একটা বাণবিদ্ধ পক্ষী। পরে ভৃত্যদিগকে আদেশ করি- লেন ইহাকে কে তীর মারিয়াছে, ইহার অনুসন্ধান করহ। তাহারা অনুসন্ধান করিয়া রাজ-সমীপে আসিয়া নিবেদন করিল, মহারাজ এ পক্ষী রাজকুমার শিকার করিয়াছেন। ইহা শুনিয়া নৃপতি স্বীয় ভ্রাতা রাজা বসন্তরায়কে ডাকাইয়া দেখাইলেন যে এই পক্ষী তোমার ভ্রাতৃষ্পুত্র হত করিয়াছে। রাজা বন্তরায় তাহা দেখিয়া রাজকুমারের প্রশংসা করিতে লাগিলেন, যে প্রতাপাদিত্য সকল বিষয়ে পারদর্শী হইয়াছে, আমি তাহার সদৃশ সুশীল ও গুণজ্ঞ বালক আর দেখি নাই, এইরূপ ভ্রাতার প্রশংসায় মহারাজ তৎকালে কোন কথা কহিলেন না।
মহারাজ স্নান ক্রিয়া সমাপন করিয়া পূজাগৃহে গমন সময়ে ভ্রাভাকে সঙ্গে লইলেন এবং নিভৃত স্থানে পূজা- চ্ছলে বসিয়া তাঁহাকে কহিলেন যে আমার পুত্রকে তুমি কি জ্ঞান করহ? তাহাতে তিনি উত্তর করিলেন, মহারাজ লক্ষণে বোধ হয় যে রাজকুমার মহাবলপরা- ক্রান্ত এক বীর পুরুষ হইবেন। রাজা কহিলেন তাহা সত্য বটে, আমিও জানিতে পারিতেছি, কিন্তু তন্নিমিত্ত তাহাকে প্রশ্রয় দেওয়া ভাল নহে, রাজকুমার লগ্নদোষে পিতৃহন্তা হইবেক। এক্ষণে আমার শেষাবস্থা হইয়াছে, বোধ করি তাহা হইতেই আমার নাম লোপ হইবেক, আর তোমাকেও যে সে সংহার করিবেক ইহার সন্দেহ নাই। অতএব আমার কথা শুন, চিত্তে অবধারণ কর, কুমারকে বধ করিলেই সকলের আপদ যায়। এ কথায় অবহেলা করিও না, তাহার ক্রিয়াতে যথেষ্ট ক্লেশ ভোগ করিতে হইবেক।
রাজা বসন্তরায় মহারাজের এইরূপ নিষ্ঠুর কথা শুনি- য়া শোকে রোদন করিতে লাগিলেন। তাঁহার দুই চক্ষু হইতে অবিশ্রান্ত অশ্রুধারা ঝরিতে লাগিল। কিঞ্চিৎকাল পরে তিনি কুতাঞ্জলি হইয়া নিবেদন করি- লেন। মহারাজ কি আজ্ঞা করিতেছেন। প্রভাপা- দিত্য আপর্নকার কুমার, তাহাতে আবার শান্ত, দান্ত, পীর ও সুপণ্ডিত, তাহাকে নষ্ট করা কোন ক্রমেই হইতে পারে না। তাহার কোন অমঙ্গল হইলে আমি প্রাণত্যাগ করিব। রাজা বসন্তরায়ের ঈদৃশ কাতরো- ক্তিতে মহারাজ বিষন্ন হইয়া কহিলেন যে আমি বুঝি- লাম রাজকুমার তোমার অন্তক হইবেক, তুমি স্নেহ প্রযুক্ত দোষ গুণের কিছুই বিবেচনা করিলে না, পরে সকল জানিতে পারিবে, তোমার ভালর নিমিত্তেই এরূপ কহিলাম। ইহা কহিয়া অদৃষ্টে নির্ভর করত ধৈর্য্যাবলম্বন করিলেন। তাহাতেই রাজা বসন্তরায় রাজকুমা- রের মঙ্গল জানিয়া হৃষ্টচিত্ত হইলেন।
রাজা বিক্রমাদিত্য কএক বৎসর পরে এক দিবস রাজা বসন্তরায়কে নির্জ্জনে ডাকাইয়া কহিলেন ভাই! আমি যাহা কহি শুন, অবহেলা করিও না, তোমার প্রিয়োত্তম ভ্রাতুষ্পুত্র এক্ষণে যুবা হইল, তাহার সহিত কার্য্যোপলক্ষে তোমার কখন২ বাবতণ্ডা হয় দেখিতে পাই, আমি যাহা কহিয়াছিলাম দেখ তাহা মিলি- তেছে, এক্ষণে তাহাকে আর কিছু করিতে পারিবে না। যাহা হইবার তাহা হইয়াছে, কিন্তু প্রতাপাদিত্য নিকটে থাকিলে অতি-ত্বরায় বিপদ ঘটিবেক, অতএব তাহাকে দিল্লীতে কোন ছলে প্রেরণ করহ, দূরে থাকি- • লে কিছুকাল সুস্থির থাকিতে পারিবে। রাজা বসন্তরায় জ্যেষ্ঠের কথা পুনঃ অবহেলন করা অসঙ্গত বোধে অতিকষ্টে কুমারের দূরদেশ গমন স্বীকার করিলেন।
মহারাজ সভায় যাইয়া সকলের সমক্ষে আপন পুত্রকে আনয়ন করাইয়া কহিলেন যে, বৎস প্রতাপা- দিতা! তুমি এক্ষণে সকল কার্য্যে পারদর্শী হইয়াছ, বিশেষতঃ রাজকার্য্যে তোমার অতিশয় অভিনিবেশ দেখিতেছি, অভএব আমাদিগের মত হয় যে তুমি দিল্লীতে যাইয়া বাদসাহের নিকট সর্ব্বদা থাকহ। সে স্থানে আমাদিগের যে সকল উকীল আছে, তাহারা অতিশয় অপব্যয় করিতেছে। আমাদিগের বাহুল্যরূপে ব্যয় করণের সময় নহে। তোমার পিতৃব্য মহা- শয় বিদেশে যাইলে এখানকার সকল কৰ্ম্ম তোমা হইতে সুচারুরূপে নির্ব্বাহ হইতে পারে সন্দেহ নাই, কিন্তু তাঁহার বয়স্ অধিক হইয়াছে, এক্ষণে বিদেশ-যাত্রা কোন ক্রমে সম্ভবে না, আর তোমার এখানে থাকা উত্তম বটে, কিন্তু না থাকিলেও কোন ক্ষতি নাই। শুনা যাইতেছে যে সে স্থানে অনেক বিপক্ষ হইয়াছে। আপনারা এক জন তথায় না থাকা অনুচিত, অন্য লোকের প্রতি আমার বিশ্বাস জন্মে না। অতএব তুমি শুভক্ষণে যাত্র। করহ, কোনমতে কালবিলম্ব করিও না।
প্রতাপাদিত্য তৎক্ষণাৎ পিতৃ আজ্ঞায় সম্মত হইয়া মনেই বিবেচনা করিলেন যে এই প্রস্তাব কেবল পিতৃব্য মহাশয়ের শঠতাক্রমেই হইয়াছে, যাহাহউক ইহার প্রতিফল তাঁহাকে না দিলে মনের ক্ষোভ দূর হইবেক না। পর দিবস প্রাতে রাজা বসন্তরায় প্রধান২ জ্যোতিঃশাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদিগের সহিত বিবেচনা পূর্ব্বক যাত্রিক দিন স্থির করিয়া, নিকপিত দিবসে শুভলগ্নে রাজকুমারকে যাত্রা করাইয়া দিল্লীতে প্রেরণ করিলেন। তাঁহার সহিত অনুচর প্রভৃতি অনেক লোক গমন করিল। রাজা বসন্তরায় স্বয়ং পদ্মাবতী নদীর নিকট পর্যন্ত রাজকুমারের সহিত যাইয়া অতি শোকাতুর হইয়া প্রত্যাগমন করিলেন। প্রতাপাদিত্য চারি মাসে দিল্লীতে উপস্থিত হইলেন। উকীলেরা পুর্ব্বে রাজকুমারের আগমন বার্ত্তা পাইয়া এক উত্তম অট্টা- লিকা তাঁহার বাসের নিমিত্ত স্থির করিয়া রাখিয়াছিলেন রাজকুমার তাহাতে অবস্থিতি করিলেন। পরে নানা প্রকার উপঢৌকন প্রদান পূর্ব্বক বাদসাহের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তাঁহার নিকট প্রতিদিন যাতায়াত করি- তে লাগিলেন। এইরূপে কিছু দিন গত হইল। প্রতাপাদিত্য দিল্লীতে থাকিয়। মনে২ বিবেচনা করি- লেন যে রাজা বসন্তরায় শত্রুতা করিয়া আমাকে বিদেশে প্রেরণ করিয়াছেন। এই ভাবিয়া তিনি সর্ব্বদা অন্তরে রাগান্বিত হইয়া অনুক্ষণ কেবল বসন্তরায়ের প্রত্যপকারের কারণ অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। দিল্লীস্থ অপর সাধারণ সকলেরি সহিত তাঁহার বিশেষ আলাপ হইয়াছিল, কিন্তু বাদসাহের সমীপে সবিশেষ পরিচিত হয়েন নাই, কেবল নামমাত্র পরিচিত ছিলেন।
এক দিবস বাদসাহের বাটীতে অপূর্ব্ব সভা হয়, তাহাতে বিশিষ্ট সম্রান্ত সকল লোকের আগমন হইয়া- ছিল, বিশেষতঃ ধনী, মানী, রাজা, পণ্ডিত এবং সৎকবি প্রভৃতি সকলে তথায় উপস্থিত হইয়াছিলেন, রাজা , প্রতাপাদিত্যও ঐ সভায় গমন করেন। সকলে স্ব২ উপযুক্ত স্থানে উপবিষ্ট আছেন এমত সময়ে বাদসাহ তথায় উপস্থিত হইলেন। আকবর বাদসাহ অতি বিদ্বান্ ও সুকবি ছিলেন, 'তিনি সভায় আসিয়াই এক সমস্যা জিজ্ঞাসা করিলেন। কবি লোকেরা সকলে, এ কিরূপ সমস্যা, ইহার পূরণ কি প্রকারে করিব, এইরূপ চিন্তা করিতে লাগিলেন। কেহ২ পূরণ করিয়া বাদসাহকে শুনাইলেন, কিন্তু কিছুই তাঁহার মুনোগত হইল না। পরে প্রতাপাদিত্য সমস্য। পূরণ করিয়া সমীপস্ত হইয়া রীতিপূর্ব্বক সেলাম করিয়া বাদসাহকে নিবেদন করিলেন, দৈবক্রমে তাঁহার সমস্যা পূরণ বাদসাহের মনোনীত হইল। আকবর বাদসাহ তাঁহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া উজীরকে জিজ্ঞাসা করিলেন এ ব্যক্তিকে? উজীর সবিশেষ কহিয়া বাদসাহের সহিত রাজা প্রতাপাদি- ত্যের আলাপ করাইয়া দিলেন। এবং বাদসাহের আজ্ঞান্তসারে এক সুপরিচ্ছদ পারিতোষিক দিয়া তাঁহাকে সম্ভান্ত করিলেন।
প্রতাপাদিত্য বাদসাহের নিকট পরিচিত হইয়া মনে২ স্থির করিলেন যে কোন ক্রমে পিতার রাজ্য স্বনামে লেখাইয়া বাদসাহের আজ্ঞাপত্র লইয়া দেশে যাইতে পারিলে, মনোগত কার্য্য সিদ্ধ হইতে পারে, অভএব আমার ইহা অবশ্য কর্ত্তব্য। ইহা স্থির করিয়া, ভথায় যে প্রধান উকীল অনেক দিবসাবধি ছিলেন, তাঁহাকে স্বদেশে প্রেরণ করিলেন এবং বাদসাহের প্রাপ্য কর প্রেরণার্থে বাটীতে পুনঃ২ পত্র লিখিতে লাগিলেন। বাটী হইতে যে রাজস্ব আইসে তাহার এক কড়াও বাদসাঁহের ভাণ্ডারে দেন না, কোষাধ্যক্ষ রাজস্ব চাহিলে প্রতারণাপূর্ব্বক প্রবোধবাক্যে তাহাকে তুষ্ট করিয়া রাখেন, প্রভাপাদিত্যকে সকলে মান্য করেন, সুতরাং কেহই এ বিষয়ের কোন কথা বাদসাহকে জানান না। তিন বৎসর গত হইলে পর বঙ্গ দেশের রাজস্ব আদায় না হওনের কথা বাদসাহের কর্ণগোচর হইল।
রাজা প্রতাপাদিত্য বাদসাহের নিকট দরখাস্ত দ্বার। নিবেদন করিলেন যে মফঃসলে রাজা বসন্তরায় কর্তা, তিনি দুষ্টতা করিয়া কর প্রেরণ করেন না, আমি কি করিতে পারি। ইহাতে বাদসাহ রাগান্বিত হইয়। উজীরকে আদেশ করিলেন যে এক জন মনসফদার যাইয়া বিক্রমাদিত্যকে দূর করিয়া তৎপদে অন্য কোন ব্যক্তিকে নিযুক্ত করিয়া আইসে। ইহা শুনিয়া প্রতা- পাদিত্য বাদসাহের নিকট পুনর্ব্বার এক দরখাস্ত করি- লেম যে এ অধীনকে যদি ঐ রাজ্যের ভার সমর্পণ করেন, আর তাহার আজ্ঞাপত্র যদি এখানে দেন, তবে এ অধীন কোন লোকের নিকট ঋণ করিয়া তিন বৎস- রের কর এক কালে দিয়া দেশে গমন করে। বাদসাহ প্রতাপাদিত্যের দরখাৎস্ত সম্মত হইয়া তাঁহাকে সমস্ত যশোহর রাজ্যের ভার প্রদান পূর্ব্বক তাঁহার আজ্ঞাপত্র অর্পণ করিলেন। রাজা প্রতাপাদিত্য তদ্দণ্ডে তিন বৎসরের সঞ্চিত রাজস্ব বাদসাহের নিকট উপস্থিত করাতে তিনি অতিশয় ভুষ্ট হইয়া তাহা হইতে পাঁচ লক্ষ টাক। তাঁহাকে পারিভোষিক রূপে প্রত্যর্পণ করি- লেন, এবং নানাবিধ পরিচ্ছদ দিয়া সম্ভ্রান্ত করত যশো- হরে পাঠাইলেন।
রাজা প্রতাপাদিত্য তথায় উকীল নিযুক্ত করিয়া বাইশ হাজার সৈন্য সহ দিল্লী হইতে বহির্গত হইয়া ডঙ্কা ধ্বনি করিতে২ যশোহরে যাত্রা করিলেন। তিন চারি মাসে বঙ্গদেশে উপস্থিত হইয়া যশোহরের নিকট পঁহুছিয়া রাজকোষ অবরোধ করিলেন এবং পুরীমধ্যে না প্রবেশিয়া নগরান্তে স্থিতি করিয়া রহিলেন। পিতা, মাতা প্রভৃতি কোন গুরু জনের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন না। রাজা বিক্রমাদিত্য, পুত্র দিল্লী হইতে রাজ্যভার গ্রহণ করিয়া আসিয়াছে, শুনিয়া বসন্তরায় এবং কএক জন মন্ত্রিবরকে সঙ্গে লইয়া প্রতাপাদিত্যের নিকট গমন করিলেন। রাজা প্রতাপাদিত্য অবনতশির হইয়া যথাক্রমে পিতা পিতৃব্য ও মন্ত্রিদিগকে প্রণাম করিয়া উত্তম২ আসনে অতি সমাদর পূর্ব্বক বসাইলেন। অনন্তর রাজা বিক্রমাদিত্য বসন্তরায় ও প্রতাপাদিত্য তিন জন এক নিভৃত স্থানে যাইয়া একা- সনে উপবিষ্টু হইয়া পরস্পর বহুতর কথোপকথন করি- লেন। পরে বিক্রমাদিত্য জিজ্ঞাসা করিলেন বৎস কি কারণ আসিবামাত্র এতাদৃশ কুব্যবহার করিলে? আমরা তোমাকে বিদেশে পাঠাইয়া চাতকের মেঘ দর্শনের ন্যায় তোমার পথ নিরীক্ষণ করিয়া রহিয়াছি, তোমার আগমন বার্তা শ্রবণমাত্রেই হর্ষে শরীর পুলকিত হইয়াছিল, পরে অসদ্ব্যবহারে এমত ক্ষুব্ধ ছিলাম যে তাহা কহিতে অক্ষম, এক্ষণে তোমার মুখ সন্দর্শনে সাতি- শয় সন্তুষ্ট হইলাম। তোমার বিদেশ গমনাবধি বসন্তরায়ের দুঃখের পরিসীমা নাই, ইনি সর্ব্বদাই নিরানন্দ থাকেন, কোন কার্য্যে আমোদ করেন না, আর ইহার পূর্ব্বমত আহার নিদ্রা নাই, তোমার বিরহে ইনি নিতান্ত খিদ্যমান ছিলেন। আমি তোমাকে যত্নপূর্ব্বক প্রাঠা ইয়াছিলাম এজন্য অদ্যাপি ইনি আমার সহিত উত্তমরূপ আলাপ করেন না। বৎস এক্ষণে তোমার সবিশেষ বিবরণ আমাদিগকে অবগত করহ, ভবে সুস্থির হই।
রাজা প্রতাপাদিত্য পূর্ব্বে রাগান্ধ হইয়া ঐ রূপ ব্যবহার করিয়াছিলেন, এক্ষণে পিতা পিতৃব্যের মুখ দর্শনে রাগের বিচ্ছেদ হইয়া প্রেমের উদয় হইল। তাহাতে তিনি অতি কুণ্ঠিত হইয়া কিছু প্রত্যুত্তর না করিয়াই ক্রন্দন করিতে লাগিলেন, এবং পিতা ও পিতৃব্যের চরণে পতিত হইয়া কহিতে লাগিলেন পিতঃ আমি অতিকুকর্ম করিয়াছি, এক্ষণে তাহা কি প্রকারে নিবেদন করি।
রাজা বিক্রমাদিত্য ও রাজা বসন্তরায় প্রতাপাদিত্যকে ক্রোড়ে করিয়া অঙ্গে হস্তস্পর্শ করিতে২ কহিলেন বৎস তোমার লজ্জা বা ভয় কি, যাহা তুমি করিয়াছ তাহাই আমাদিগের সম্মত, আমরা তোমার দুর্জনতা গণনা করিব না।
এইরূপ সান্ত্বনাবাক্যে প্রতাপাদিত্য বাদসাহের আজ্ঞাপত্র পিতার হস্তে অর্পণ করিলেন। রাজা বসন্তরায় তাহা পাঠ করিয়া প্রতাপাদিত্যের মুখ চুম্বন করিয়া কহিলেন তুমি কি কারণে লজ্জিত হইতেছ, ইহাতো লজ্জার কৰ্ম্ম নহে। রাজলক্ষ্মী স্বভাবতঃ চঞ্চলা, চিরকাল এক জনের নিকট থাকেন না। দেখ মান্ধাতা, সগর, ভরত প্রভৃতি সকলে রজ্যেশ্বর হইয়া পৃথিবী • পালন করিয়াছিলেন, তাঁহারা এক্ষণে কে কোথায় আছেন। সন্তান রাজা হইবে এ অতি ভাগ্যের কথা, ইহাতে আমাদের কোন ক্ষোভ নাই, বরং আহলাদ আছে। তুমি আইস, রাজ্য করহ, আমরা রাজার পিতা পিতৃব্য হইয়া নিরুদ্বেগে পরমসুখে ইষ্ট দেবতার চিন্তা করত কাল যাপন করি। এই রূপ কহিয়া দুই জনে রাজা প্রতাপাদিত্যের দুই হাত ধরিয়া তাঁহাকে পুরীমধ্যে লইয়া গেলেন। পরে রাজা বসন্তরায় পূর্ব্ববৎ সমস্ত রাজকর্ম করিতে লাগিলেন। প্রতাপা- দিত্য কেৱল নামমাত্র রাজা হইয়া রহিলেন।
মহারাজ বিক্রমাদিত্য মনেই বিবেচনা করিলেন ষে পুত্র অতিদুৰ্জ্জন, কনিষ্ঠ ভ্রাতাও তদনুরূপ শিষ্ট এবং আমার শেষাবস্থা, এই সময় সকল বিষয়ের একটা নির্ধারণ করিয়া রাখিলেই ভাল হয়, নতুবা পরে কলহ হইয়া আত্মবিচ্ছেদ হইবার সম্ভাবনা, সুতরাং আমি থাকিতে থাকিতেই অংশের নিষ্পত্তি করিয়া দেওয়া উচিত। ইহা স্থির করিয়া এক দিন প্রতাপাদিত্যকে ডাকাইয়া কহিলেন বৎস! আমার শেষ দশা উপস্তিত, আমি তোমার পিতৃব্যের সন্তানদিগকে যেরূপ প্রতি- পালন করিয়া আসিতেছি আমি অবর্তমানে তোমার সেই রূপ প্রতিপালন করা আবশ্যক, অতএব জিজ্ঞাসা করি আমার পরে তুমি কি তাহাদিগকে স্ববশে রাখিতে পারিবে!
প্রতাপাদিত্য করপুটে নিবেদন করিলেন মহারাজ! আপনি থাকিয়া ইহার একট। নিষ্পত্তি করিয়া রাখুন, নতুবা পরে বিষম দুর্ঘটনা হইবে। মহারাজ রাজা বসন্তরায়কে সমুদায় বৃত্তান্ত সবিশেষ জ্ঞাত করাইয়া সকল বিষয়ে দশ আনা ছয় আনা বিভাগের কাগজ পত্র লেখাইয়া আপন নিকট রাখিলেন। ক্রমশঃ সকলের সন্তান সন্ততি রদ্ধি হইতে লাগিল, সুতরাং তাঁহারা বৃহৎ গোঠী হইলেন। এক দিন রাজা প্রতাপাদিত্য তাঁহার পিতাকে নিবেদন করিলেন পিতঃ আমার ইচ্ছা হয় আর একটী পুরী নির্মাণ করি, কারণ এ স্থানে কিছু কাল পরে বাসের অতি কষ্ট হইবেক, মহাশয়ের অনুমতি হইলে তাহাতে প্রবৃত্ত হই। মহা- রাজ আনন্দিত হইয়া কহিলেন ইহা সৎপরামর্শ বটে, কিন্তু তোমার খুড়া মহাশয়ের মতানুবর্তী হইয়া ভোমরা দুই জনে তাহার স্থান নিরূপণ করহ। যশোহরের দক্ষিণ পশ্চিম ভাগে ধূমঘাট নামক স্থান প্রতাপাদি- ত্যের মনোনীত হইল, তথায় তিনি হাট বাজার সমেত এক অপূর্ব্ব পুরী নির্মাণ করাইলেন। তাঁহার স্থাপিত অতিথিশালায় অদ্যাপি অতিথি-গণ আসিয়া অবস্থিতি করে। পুরী প্রস্তুত হওন কালে মহারাজ বিক্রমা- দিত্যের মৃত্যু হয়, তিনি পুত্রকে নূতন পুরীতে প্রবেশ করিতে কি রাজ্যে অভিষিক্ত হইতে দেখেন নাই। সঙ্গতি অনুসারে মহারাজের শ্রাদ্ধাদি ক্রিয়া সমাপন করিয়া, প্রতাপাদিত্য পিতৃব্যের নিকট জানাইলেন মহাশয়! এক্ষণে আমাকে সুভন বাচী গমনে অমুমতি করুন, আর আপনি তথায় যাইয়া এ দাসকে রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত'করুন। রাজা বসন্তরায় বিবেচনা করিলেন যে এক্ষণে দাদা মহাশয়ের কাল হইয়াছে, আর এ ব্যক্তি অভিশয় দুর্দান্ত, অতএব সম্প্রতি অন্তর হইয়া থাকা উচিত, ইহা বিবেচনা করিয়া কহিলেন বৎস! আমি এক্ষণে তাহার উদ্যোগ করি, তুমি কিছু দিন স্থির হও, ঐ বিষয়ে বিশেষ সমারোহ করিব এমত মানস আছে, কিরূপ কর্তব্য মন্ত্রিদিগের সহিত ইহার পরামর্শ করা যাউক।
রাজা বসন্তরায় আত্মীয়, বন্ধু বান্ধবদিগের সহিত পরামর্শ করিয়া স্থির করিলেন, যে প্রতাপাদিত্যকে রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করিতে কোটি টাকা ব্যয় করা কর্তব্য, ইহা ধার্য্য করিয়া, বৈশাখী পূর্ণিমায় গৃহ প্রবেশ ও রাজ্যাভিষেকের দিন নির্ণয় করত, তদনুসারে গৌড়ে এবং রাঢে প্রধান২ ব্যক্তি ও অধ্যাপকগণকে নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠাইলেন, আর বঙ্গের ব্রাহ্মণ, ক্ষন্দ্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র প্রভৃতি চণ্ডাল পর্য্যন্ত সকল লোককে নিমন্ত্রণ করিলেন। সকলের সম্বন্ধনা ও ভক্ষ্য দ্রব্য আয়োজন এবং অবস্থিতির স্থান নিরূপণ প্রভৃতি কর্ম্মের ভার স্বয়ং রাজা বসন্তরায় গ্রহণ করিলেন।
নিমন্ত্রিত ও অতিথি অভ্যাগত সকলেরই বাসা নূতন পুরীর মধ্যে হইল। তাঁহারা নিজ গৃহে যেরূপ থাকি- তেন সেইরূপ তথায় রহিলেন, বিদেশ নিমিত্ত কোন ব্যক্তির কিছুই ক্লেশ জন্মে নাই। বাসুদেব রায় প্রভৃতি আট জন সকল সামগ্রী আয়োজনের ভার লইয়া সহস্রং লোককে গ্রামেই প্রেরণ করিলেন। তাহারা সর্ব্বত্র যাইয়া নানা প্রকার সরু মোটা আতপ ও সিদ্ধ তণ্ডুল এবং মুগ, অরহর, মাষ, মসুরী, মটর ইত্যাদি বিবিধ কলাই এবং তৈল, ঘৃত, লবণ, মধু, গুড়, চিনি, মিচিরী, ও আর২ চর্ব্ব, চোষ্য, লেহ, পেয়, মিষ্টান্ন আনয়ন করিতে লাগিল। নিমন্ত্রিত জনগণের আগমনের পূর্ব্বেই, দেশস্থ সকল লোক দধি, দুগ্ধ, ক্ষীর, ছানা, নবনী যাহার যত হইত, সেই সকল প্রতিদিন রাজবাটীতে আনিয়া উপস্থিত করিত। তাহারা যেছ দ্রব্য আনয়ন করিত তাহার মূল্য তৎক্ষণাৎ পাইয়া ভুষ্ট হইয়া যাইত, কাহার কিছু পাওনা থাকিত না। সকল প্রজার প্রতি আদেশ ছিল, যাহার আম, জাম, কাঁটাল, নারিকেল যত হয় সকল আনিয়া দেয়, আর তৎক্ষণাৎ মূল্য লইয়া যায়। এইরূপ দ্রব্যসামগ্রীর আয়োজন হইতে লাগিল। কর্ম্মের ১০। ১২ দিন পূর্ব্বে রবাহুত, ভাট, ফকীর, কাঙ্গালি লোকেরা আসিয়া উপস্থিত হইল। পরে অন্যান্য লোকের সমাগম হইতে লাগিল। উপস্থিত হইবামাত্র পরিচারকেরা পাদোদক দিয়া তাহাদের শ্রান্তি দূর করিতে লাগিল, পরে তাঁহারা বাসায় যাইয়া স্নান পূজা ভোজন করিয়া উত্তম২ খট্টো- পরি ছগ্ধফেননিভ শয্যায় শয়ন করত হৃদা সদানন্দে থাকিলেন; স্ত্রী পুত্রদিগকে কাহারও স্মরণ হইল না। রাজা বসন্তরায় কর্ম্মের পূর্ব্ব দিন রাত্রিকালে প্রতা- পাদিত্যের অধিবাস ক্রিয়া আচারমত নির্ব্বাহ করিলেন।
রাত্রিশেষে যন্ত্রিগণ স্ব২ যন্ত্রে দ্বারে২ বাদ্য করিতে লাগিল, তাহাতেই সকল লোক রাত্রির অবসান জানিয়া গাত্রোথান পূর্ব্বক প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া সভায় উপস্থিত হইলেন। স্ব২ ক্রিয়ার অভিনয় দ্বারা নন্ত্রক নর্তকীগণ সভার একদেশে থাকিয়া সকলের মনোরঞ্জন করিতে লাগিল। তাবৎ লোকেই আনন্দ-সাগরে মগ্ন আছেন এমত সময়ে যশোহরপুরীর সমস্ত নারীগণ রত্নালঙ্কারে বিভূষিত হইয়া, কেহ বা পীতাম্বর কেহবা নীলাম্বর কেহ বা পট্ট বস্ত্র কেহ বা শুভ্র সুক্ষ্মবস্ত্র পরিধান করিয়া ধূমঘাটে আগমন করিল। সর্ব্বাগ্রে শুভক্ষণে রাজা রাণীর সহিত এক চতুৰ্দ্দোলে আরূঢ় হইয়া নূতন পুরী প্রবেশ করিলেন। পরে রাজবাতীর প্রাচীনেরা নবীনা ও বালিকাদিগকে সঙ্গে লইয়া পালকীতে গমন করিলেন।
রাষ্ট্রীরা পুরী প্রবেশ করিয়া দাসীদিগকে আদেশ করিলেন ষে তোমরা এক্ষণে দীন দরিদ্রদিগের নারী- গণকে উত্তমহ শঙ্খ শাটী বিতরণ করহ। তাহারা রাষ্ট্রীদিগের অনুমতি পাইয়া অবিরত দান করিতে লাগিল। এই রূপ মহা মহোৎসবে শুভ লগ্নে দ্বিজবরেরা রাজা প্রতাপাদিত্যকে অভিষেক করিয়া রত্নসিংহাসনে বসাইলেন, রাজ্ঞী মহিষী হইয়া তাঁহার বামে বসিলেন। পরিচারকেরা ছত্র ধারণ ও চামর ব্যজন করিতে লাগিল। ঠাকুর তর্ধ্বপঞ্চানন ভট্টাচার্য্য রাজার মস্তক মুকুটে ভূষিত করিয়। হস্তে রাজদণ্ড প্রদান করিবামাত্র, জয়২ ধ্বনিতে গগণমণ্ডল এককালে পরিপূর্ণ হইল। নৃপতিরা ক্রর্থে ক্রমে যৌতুক প্রদান পূর্ব্বক পরিচিত হইতে লাগিলেন, তদনন্তর আর২ প্রধান লোক সকলে যৌতুক প্রদানচ্ছলে রাজার সহিত আলাপ করিলেন। এইরূপ কুটুম্ব অন্তরঙ্গ বন্ধু বান্ধব সকলেই মঙ্গলাচরণ করিলেন। পরিশেষে প্রধান২ কৰ্ম্মচারী ও ভূত্যেরা করপুটে স্বহ নিরূপিত স্থানে দণ্ডা- য়মান হইলে, রাজা সকলকেই প্রণয়-সম্ভাষণে সন্তুষ্ট করিয়া, ব্রাহ্মণসভায় গমন পূর্ব্বক পণ্ডিতগণকে ও অন্যান্য ব্রাহ্মণদিগকে যথেষ্ট সমাদরে বাসায় পাঠা- ইলেন। পরে স্ব স্ব শ্রেণীয়দিগের সভায় যাইয়া পিতৃব্য-মহাশয়কে দণ্ডবৎ ভূমিতে পতিত হইয়া প্রণাম করিলেন। তিনি যুবরাজকে যৎপরোনাস্তি সমাদর করিলেন। অনন্তর রাজা প্রতাপাদিত্য বিনীতভাবে সকলের সহিত শিষ্টালাপ করিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন।
নারীগণ রাজাকে লইয়া রাণীর দক্ষিণে শিলায় দণ্ডায়মান করিয়া, দুই জনকে বরণ প্রভৃতি নারীব্যবহার্য্য মঙ্গলাচার করিয়া, গৃহের মধ্যে মনোহর আসনে বসাইলেন। পরে সমস্ত সীমন্তিনী একত্র হইয়া তাঁহা- দিগকে মঙ্গল আরুতি করিয়া যৌভুক দিতে লাগিলেন। রাজা ও মহিষী সকলকে যথাবিহিত প্রণামাদি করিয়া তাঁহাদিগের সম্মান রক্ষা করিলেন। রাজা বসন্তরায় রবাহুত প্রভৃতি সমস্ত অপর সাধারণ লোককে অতি যত্নপূর্ব্বক চর্ব্ব চোষ্য লেহ্য পেয় দ্রব্য ভোজন করাইয়। প্রত্যেককে এক বৎসরের ভরণ পোষণের উপযুক্ত অর্থ দিয়া বিদায় করিলেন। পরে যথেষ্ট সম্মান পূর্ব্বক ভূপতি এবং পণ্ডিত ও আর২ ব্রাহ্মণগণকে উপযুক্ত পন দিয়া বিদায় করিলেন। কায়স্থদিগের এক দিবস পংক্তিভোজন হইলে তাঁহারা পংক্তিভোজের পৃথক্ ব্রিদায় পাইয়া স্ব২ বাটী গমন করিলেন। সকলকে পরিতুষ্ট করিয়া বিদায় করণের পর এক মাস পর্য্যন্ত যশোহর নগরবাসি লোকেরা ধুমঘাটে অবদিতি করিলেন, পরে তাঁহারা য স্ব স্থানে গমন করেন। এইরূপ মহা সমারোহে রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্যাভি- যেক ক্রিয়া সম্পান্ন হয়।
প্রতাপাদিত্য রালা হইয়া বঙ্গভূমি অধিকার করত কিয়ৎ কান পরম মুখে ক্ষেপণ করেন, এক দিবস মনে২ বিবেচনা করিলেন, যে আমি এ দেশে একচ্ছত্রী রাজা হইব, কিন্তু খড়া মহাপয় বর্ত্তমান থাকিতে কি রূপে হইতে পারে, তাঁহার মৃত্যু হইলে তৎপুপ্রদিগকে রাজা- খ্রষ্ট করিয়া একাবিপত্য করিব, এক্ষণে কিছু কাল ধৈর্ঘ্য্য অবলম্বন করা কর্ত্তব্য। এই বিবেচনার পর স্তিনি ক্রমে২ ক্ষুদ্রহ গ্রামাধিপতিদিগকে ছিম্নভিন্ন কবত প্রদীপ্ত হইতে লাগিলেন।
রাজা স্থির করিলেন যে আমার ধনের যার কিছু মাত্র আকাঙ্ক্ষ। নাই, যাহা হইয়াছে ইহাই য"েস্ট, এক্ষণে কিছু সৈন্য সংগ্রহ করিয়া একাদশ ভূপস্থিকে আপন বর্ণীভূত কেন না. করি, ইহাতে আমি অপারক নহি।
তৎকালে বঙ্গ, বেহার, উড়িষ্যা ও সাশাম দেশের কিয়ৎ অংশ দ্বাদশ জন রাজার অধিকার ছিল। তাঁহা- দিগের মধ্যে রাজা প্রতাপাদিত্য অতি প্রতাপশালী হইয়া সকলকে অধীন করিয়া রাখেন। এমত জনশ্রুতি আছে যে যশোহরেশ্বরী দেবী সদয় হইয়া তাঁহাকে বর প্রদান করেন, তাহাতেই তাঁহার ঈদৃশ প্রাদুর্ভাব হয়. ঐ দেবীর মত্তি অদ্যাপি তথায় বিরাজমান আছেন।
সেই দেবীর আবির্ভাব হওনের কথা লোকপরম্পরায় শুনা যায়, যে রাজার প্রিয়তম বহির্ধাররক্ষক কমল খোজা নামক মহাবল পরাক্রমশালী এক ব্যক্তি তাঁহার সমক্ষে আগমন পূর্ব্বক কৃতাঞ্জলি হইয়া নিবেদন করিল, মহারাজ অবধান করুন, আমি দুই তিন দিবস দেখি- তেছি রাত্রি দুই প্রহরের সময় সকল লোক নিদ্রিত হইলে, ঐ জঙ্গলে প্রচণ্ড অনলের ন্যায় উদ্দীপ্ত একট। আলোক উদিত হয়। প্রথম দিবস অনুমান করিলান কোন রাখাল বনে আগুন দিয়া থাকিবে, তাহাই প্রজলিত হইয়াছে। পর দিন প্রত্যুষে অশ্বারোহণে তথায় যাইয়। দেখিলাম বন পূর্ব্ববৎই আছে বরং অধি- কতর সতেজ। আমি প্রত্যহ এইরূপ দেখিতেছি, মহারাজ আমার অসম্ভব কথায় অবহেল। করিবেন এতদ্ভয়ে নিবেদন করি নাই।
অদ্য সেই স্থানে এক আশ্চর্য্য কর্ম হইয়াছে। রাখালবালকের। ঐ মাঠে গরু ছাড়িয়া দিয়া প্রত্যহ ক্রীড়। কবে। ঐ স্থানে এক ডিপী আছে, তাহার উপর অদ্য পুষ্প দিয়া এক কালী নির্ম্মিত করত, ঐ বালকদিগের মধ্যে কেহ কর্ম্মকর্তা কেহ পুরোহিত কেহ ব ছাগ হইয়াছিল। এক জন এক গাছা হোগলা আনিয়া খড়ন করিয়া ছাগকপী বালককে বলিদান দিবার উদ্যোগ করিল, এবং তাহার গলদেশে ঐ খড়নদ্বারা প্রহার করিবামাত্র মেই বালকের মস্তক দেহ হইতে ভিন্ন হইয়া অন্য স্থানে পতিত হইল। তাহার গলদেশ হইতে রক্তপ্রবাহ নির্গত হইতে লাগিল, তাহা দেখিয়া সকল বালক ভয়ে পলায়ন করিল। পরে তাহার মাতা পিতা আমাকে জানাইল। তাহাতে আমি সেই সব্বল বালককে আনাইয়া জিজ্ঞাসা করাতে, তাহারা অবিকল সেইরূপ কহিল। মহারাজ! সেই শব তথায় পতিত আছে।
রাজ। খোজার কথা শ্রবণমাত্র বিন্মিত হইয়া সমস্ত" সভাস্ত সহ স্বং যানে তথায় গমন করিলেন এবং দেখি- লেন, সেই স্থানে বিবিধ প্রকার পুষ্প ও বালকদিগের রক্তমিশ্রিত খড় পতিত আছে। আর মৃত বালকের দেহে কোন বৈলক্ষণ্য জন্মে নাই, তাহার শরীর জীবিত শরীরের ন্যায় রহিয়াছে, স্ফীত কি পচিয়া দুর্গন্ধ কিছুই হয় নাই, কেবল গলা কাটামাত্র। অনন্তর রাখাল-বালকদিগের নিকট সবিশেষ সমুদয় রত্তান্ত জাত হইলেন। কিন্তু কিছুই নিশ্চয় করিতে না পারিয়া এক সিন্দুকে ঐ শব রাখিয়া তাহার চাবী আপনার কাছে রাখিলেন, এবং সকলকে কহিলেন ইহার বিচার কলা জাতে হইবে অদ্য তোমরা সকলে গমন কর।
সকলে স্ব২ স্থানে গমন করিলে, রাজা রাত্রিকালে বহিদ্বারে আসিয়া ঐ দ্বারপালের নিকট অবস্থিতি করি- লেন, পরে নিশীথ সময়ে দেখিলেন যে একটা জ্যোতিঃ গগণমণ্ডল হইতে ঐ বনে পতিত হইয়। ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাইয়া প্রলয়ানলের ন্যায় হইয়া উঠিল। সাহসিক রাজা খোজাকে সঙ্গে লইয়া তাহার তত্ত্বানুসন্ধানার্থ ঐ স্থানে অশ্বারোহণে গমন করিলেন।
খোজা রাজার পশ্চাৎ২ গমন করত ঐ তেজে অভি- দ্রুত হইয়া ঘোটক হইতে নিপতিত হইল। ঘোটক তথা হইতে প্লুতগতিতে দ্রুতবেগে পলায়ন করিল। রাজা অগ্রগামী ছিলেন, ঐ সকল ব্যাপার কিছুই জানিতে পারেন নাই, পরে তাঁহার ঘোটক আলোক-প্রভায় চেতনাশূন্য হইয়া ভুতলে পড়িল, কিন্তু তিনি তপাপি নির্ভয়ে জ্যোতিধ্যে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, যে শাহা ঐ বনের শূন্য স্থানে আছে। তন্মপ্যে দৃষ্টিপাত করিতে২ সন্দর্শন করিলেন যে সিংহাসনস্থ এক সুন্দরীর শরীর হইতে ঐ জ্যোতিঃ নির্গত হইতেছে।
কিঞ্চিৎ কাল পরে তিনিও মুচ্ছিত ও ধরাতলে পতিত হইয়া আকাশবাণী শুনিলেন-য প্রতীপাদিত্য! অবলো কন কর, আমি তোমার ইষ্ট দেবতা, সুপ্রসন্না হইয়। তোমাকে নিকটে রাখিয়াছি। এই ঢিপী খননে যাহা প্রাপ্ত হইবে তাহ। এই স্থানে স্থাপিত করিবে, তাহাতে আমি অধিষ্ঠান করিব। তোমার প্রজা রাখাল মরে নাই, সে তাহার মাতার ক্রোড়ে নিদ্রিত আছে। এ সমুদয় প্রদেশ তোমার হস্তগত হইবে। তুমি পিতৃ পিতামহ অপেক্ষ। ধনবান্ হইয়া পরম সুখে রাজ্য কর২। আমি কন্যাভাবে তোমার গৃহে অবস্থিতি করিলাম, যবেৎ তুমি আমাকে বিদায় না করিবে তাবৎ অন্য যাইব না। আনার এই আজ্ঞা মান্য করিও যে স্ত্রা- লোককে প্রহার কি দুঃখ কদাচ দিও না, তাহা হইলে তোমার বিপদ ঘটিবে।
রাজা চেতনা প্রাপ্ত হইয়া দেখিলেন ঘোরতর অন্ধকার, আপনি ধূলায় পড়িয়া আছেন; কোথায় ঘোটক আর কোথায় বা কমল খোজা, মুচ্ছাবস্থায় যেই কথা শুনিয়াছিলেন, তাহা স্বপ্নের ন্যায় কেবল স্মরণ হইতেছে। রাজা গাত্রোত্থান করিয়া খোজাকে অন্বেষণ করিতে করিতে দেখিলেন সে মুচ্ছিত হইয়া পতিত আছে। পরে তাহাকে প্রকৃতিস্থ করিয়া জিজ্ঞাসা করি- লেন, এখানে পড়িয়া আছ কেন! সে কহিল মহারাজ! আমি ইহার কিছুই জানি না, কেবল সেই তেজঃ দেখিতেছিলাম এই মাত্র স্মরণ হয়। রাজা কহিলেন ভাল, এক্ষণে আমার সহিত আইস, সিন্দুক কোথায় আছে দেখি গিয়া। দুই জনে তৎক্ষণাৎ সিন্কের নিকট যাইয়া দেখিলেন তাহা খোলা রহিয়াছে, মৃত বালক তাহার মধ্যে নাই। রাজা খোজাকে জিজ্ঞাসা করি- লেন তুমি সেই রাখালের বাটী কোথায় জান? সে উত্তর করিল হাঁ মহারাজ জানি তাহার পিতার গৃহ এই গড়ের অতি নিকট। রাজা ঐ খোজার সহিত শীঘ্র তাহার বাটীতে যাইয়া উপস্থিত হইলেন, এবং দেখি- লেন গৃহের দ্বার খোলা, কিন্তু সকলে নিদ্রিত আছে।
খোজ। উচ্চৈঃস্বরে ডাকিতে২ সেই বালকের পিতা জাগৃত হইয়া দেখিল মহারাজ দ্বারে দণ্ডায়মান আছেন। সে অতি ত্রস্ত হইয়া সবিনয়ে কহিতে লাগিল মহারাজ! আমার কি অপরাধ হইয়াছে! এ ঘোরতর নিশীথ সময়ে এ দুঃখির কুটীরদ্বারে মহাশয় স্বয়ং উপস্থিত কেন? রাজা কহিলেন কিছু ভয় নাই, তোমার সেই পুত্রটী কোথায়? রাজার এই কথা অবণ মাত্রে বালকের পিতা ক্রন্দন করিতে২ উত্তর করিল মহারাজ! আর কেন কাটা ঘায় লোণের ছিটা দেন, সে মহাশয়ের সিন্দুকের মধ্যে নিদ্রা যাইতেছে। রাজা কহিলেন একটা প্রদীপ জ্বালিয়া দেখ দেখি, বোধ হয় সে তোমার গৃহে শয়ন করিয়া আছে। সে তৎক্ষণাৎ দীপ প্রজ্বালন করিয়া দেখিল বালক স্বীয় জননীর ক্রোড়ে নিদ্রা যাইতেছে। রাজা ঐ বালক ও তাহার পিতাকে সেই সময়ে আপন ভবনে আনয়ন করিলেন।
রাজা প্রতাপাদিত্য পর দিন প্রাতঃকালে সভাস্থ হইয়। সৈই বালককে সমস্ত বিবরণ জিজ্ঞাসা করিলেন। সে, উত্তর করিল, মহারাজ! আামরা সকল রাখালে একত্র হইয়া বনের ফল পুষ্প আহরণ পূর্ব্বক কালীপূজ। আরম্ভ করি, তাহাতে আমি ছাগ নিরূপিত হই, অন্যেরা আমাকে বলি প্রদানার্থ স্নান করাইয়া শয়ন করায়। এই মাত্র জানি, পরে পিতা ডাকিলে মার ক্রোড হইতে উঠিয়া আসিলাম, আর কিছু জানি না। রাজ। তাহাকে বস্ত্র অলঙ্কারে ভূষিত করিয়া বিদায় করিলেন। এবং ভূত্যদিগকে আদেশ করিলেন যে তোমরা যাইয়া সেই ঢিপী খনন কর, আমি তথায় যাইতেছি। তাহারা আজ্ঞামাত্র সসজ্জ হইয়া সেই স্থান খনন করিতে লাগিল। এক প্রস্তরময়ী মূর্ত্তি গলদেশ পর্য্যন্ত প্রকা- শিতা হইলে, আকাশবাণী হইল, আর খনন করিও না। তৎশ্রবণে রাজা সকলকে খনান ক্ষান্ত করিয়া ঐ মুণ্ডের চতুৰ্দ্দিক বেষ্টিত এক মন্দির প্রস্তুত করিলেন। ঐ দেবী প্রথমে দক্ষিণমুখী ছিলেন, রাজার দুর্দ্দদশার সময়ে পশ্চিমমুখী হন। দিল্লীশ্বর আকবর বাদসাহের লো- কান্তর প্রাপ্তি হইলে, তৎপুত্র জাহাঙ্গীর শাহ বাদসাহ হয়েন। তৎকালে এই প্রথ। ছিল যে যখন যে দিল্লীতে বাদসাহ হইতেন তাঁহাকে হিন্দুস্থানের রাজারা এক২ পরম সুন্দরী কন্যা উপঢৌকন দিতেন। বাদসাহ যাহাকে মনোনীত করিতেন সেই খাশবেগম হইত; বাদসাহ তাহার সহিত সিংহাসনে আরোহণ করিয়া রাজ্য করিতেন।
জাহাঙ্গীরের সিংহাসন আরোহণ কালে হিন্দুয়ানের রাজারা তাঁহাকে এক২ কন্যা উপঢৌকন প্রদান করেন তাহার মধ্যে রাজ। প্রতাপাদিত্য কর্তৃক প্রদত্ত কন্যা ও চিতোরের রাজার দত্ত কন্যাকে বাদসাহ মনোনীত করেন। তাহাতে ঐ দুই কন্যার পরস্পর বিবাদ উপস্থিত হয়। চিতোরের রাজার কন্যা কহিলেন, আমি রাজার পোষ্যপন্ত্রী, আমার পিতা চিতোরের রাজা, তাঁহার তুল্য হিন্ডুস্থানে দাতা ও সম্ভ্রান্ত রাজা কে আছে? অতএব আমার সহিত বাদসাহের অভিষেক হইবেক। রাজা প্রতাপাদিত্যের পুত্রী কহিলেন আামার পিতা বঙ্গদেশের রাজা, তাঁহার তুল্য বিদ্যাবান্, দয়ালু, দাতা কোন রাজ। হিন্দুস্থানে কি অন্য কোন প্রদেশে জন্ম গ্রহণ করেন নাই। তাঁহার সুখ্যাতি আমি কি প্রকাশ করিব, তাহা ভূমণ্ডলে সকল লোকে সুবিদিত আছেন, অতএব আনিই খাশবেগম হইব।
বাদসাহ কাহাকে বেগম করিবেন ইহা স্থির করিতে না পারিয়া, সকল রাজার আচার, ব্যবহার, চরিত্র যে সবিশেষ অগত আছে, এমন এক ভাটকে আনয়ন করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, অহে ভট্ট! তুমি সকল রাজাকে জান, হিন্দুস্থানের মধ্যে কোন্ রাজা প্রধান আমাকে যথার্থ কহ।
ভাট করপুটে নিবেদন করিল মহাশয়! এই ব্রহ্মাণ্ড মধ্যে তিন রাজ। আছেন; স্বর্গে ইন্দ্র, পাতালে বাসুকি এবং পৃথিবীত ভূপতি সমূহের মধ্যে মহারাজ প্রতা- পাদিত্য। সকল নৃপতির দ্বারে আমার গমনাগমন আছে, চিতোরের রাজা আমাকে পাঁচ হাজার টাকা আর এক ঘোটক দিয়াছেন। ঘুমঘাটে একবার আমি রাজা প্রতাপাদিত্যের নিকট গিয়াছিলাম; তিন মাসের মধ্যে রাজার সহিত একবারও সাক্ষাৎ করিতে পারিলাম না, আমার সংবাদও রাজগোচর হয় না। এক দিবস রাজা মৃগয়ায় গমন করেন; তৎকালে আমি দূর দেশ হইতে তাঁহাকে আশীর্ব্বাদ করিলে, তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন আপনি কে! কোন্স্তান হইতে আসিয়াছেন! ইহাতে উত্তর করিলাম আমি হস্তিনাপুরের রাজতাট, মহাশয়কে আশীর্ব্বাদ করিতে আসিয়াছি। রাজা কহিলেন আমি প্রত্যাগমন করিয়। আপনাকে বিদায় করিব, এক্ষণে এই নগরে অবস্থিতি করুন্। আমি সবিনয়ে নিবেদন করিলাম, মহারাজ! আমি এ স্তানে আসিয়া চয় মাসের পর মহাশয়ের সাক্ষাৎ পাইলান, পরে আর সাক্ষাৎ হওন দুষ্কর হইবেক, ইহাতে আপনার যেরূপ অনুমতি হয়। রাজা কোষাধ্যক্ষকে আহ্বান করিয়া কহিলেন এই ভাটকে 'লক্ষ মুদ্রা, এক হস্তী, আর পাঁচ ঘোটক দিয়া বিদায় করহ। আমি তৎক্ষণাৎ এইরূপ দান প্রাপ্ত হইয়াছিলাম, তথায় কিছু কাল বিলম্ব করিলে কত অধিক পাইতাম তাহা স্থির কহিতে পারি না। তাঁহার ভুল্য রাজা হিন্দুয়ানে কি অন্য প্রদেশে কোন স্থানেই নাই।
তথায় শুনিয়াছি এক দিবস রাজা প্রতাপাদিত্য কল্পতরু হইয়াছিলেন, রাজা মহিধী সহ সিংহাসনে উপবিষ্ট হইয়া, যে যাহা যাচা করিতেছে, তাহাকে তাহাই প্রদান করিতেছেন। ইত্যবসরে মধ্যাহ্ন সময়ে এক ব্রাহ্মণ আসিয়া রাজার সাত্বিক দান কি ন। তৎপরী- ক্ষার্থ কহিলেন, মহারাজ আমি আর কিছুই প্রার্থনা করি না, কেবল এই মহিষী আনাকে প্রদান করুনু; ইহার রূপলাবণ্যে আমি মোহিত হইয়াছি।
রাজা তৎশ্রবণে ক্ষণনাত্র বিলম্ব না করিয়া কহিলেন, রাজি! অদ্য তোমাকে ব্রাহ্মণ-হৃস্তে সমর্পণ করিলাম, তুমি অকিঞ্চিৎকর সংসাব-সুখে বিষখী হইয়। ঐ ব্রাহ্মনের শুশ্রূষণপরা হইয়া থাকহ, অন্তে পরন সুখ লাভ করিতে পারিবে। মহিষী তৎক্ষণাৎ সিংহাসন হইতে গাত্রোধান করিয়া ব্রাহ্মণ-সনীপে দণ্ডায়মানা হইয়া কহিলেন, অদ্য প্রভৃতি আমি মহাশয়ের অপীনা হইলান, যশর ইচ্ছা আমাকে লইয়া চলুন। তনর্শনে সভাহ্ সকলে চকিত হইয়া উঠিলেন।
ব্রাহ্মণ রাজার দানে পরম পরিভূষ্ট হইয়। আশী- র্ব্বাদ পূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! মহিনীতে আমার প্রয়োজন নাই, আপনার সাহস পরীক্ষার্থ ঈদৃশ অসছব প্রাবনা করিয়াছিলাম, 'আপনি ইহাঁকে লইয়া পরম সুখে রাজ্য শাসন করত প্রজাদিগের হিতাহিত চিন্তা করুন্। রাজা কহিলেন আমি দত্তাপহারীকেন হইব? মহাশয় ইস্থাকে গ্রহণ করুন। পরে ব্রাহ্মণের আগ্রহে বাধিত হইয়া মহিষীর সমস্ত আভরণে ভূষিতা তদীয় এক হিরণ্ময়ী মূর্তি নির্মাণপূর্ব্বক ব্রাহ্মণকে প্রদান করিয়া রাজ্ঞীকে গ্রহণকরেন। নিরাকাঙ্ক্ষ ব্রাহ্মণও ঐ সমস্ত দ্রব্য সভান্তদিগকে বিতরণ করিয়া গমন করেন। অতএর মহা- শয়! তাঁহার সমান এজগতে আর কে আছে। বাদসাহ ভাট-মুখে এইরূপ রাজা প্রতাপাদিত্যের গুণ প্রশৎসা শুনিয়া তৎকর্তৃক প্রদত্ত। কন্যাকে খাশবেগম করিলেন।
রাজা প্রতাপাদিত্য বহুকালে প্রচুর সৈন্য ক্রমে২ -সঃগ্রহ করিয়া প্রথমতঃ সকল ভূম্যধিকারিকে রণে পরাভব করত বশীভূত করিবেন মানস করিলেন, কিন্তু মনেই বিবেচনা করিলেন, এক্ষণে খুড়া মহাশয় বর্ত্তমান আছেন, একচ্ছত্রী কিরূপে হই, তাহার কোনই সম্ভাবনা দেখি না, যাহাহউক, পরে বিবেচনা করা যাইবেক, এক্ষণে দিল্লী র প্রদান না করাই শ্রেয়ঃ। ইহা স্তির করিয়া পঞ্চবিংশতি সহস্র সৈন্যের অধিপতি কমল খোজাকে আহ্বান করিয়া আজ্ঞা করিলেন, তুমি তাবৎ সৈন্য সহ দুসজ্জ হও; আমি স্বয়ং সমরে গমন করিব।
কমল খোজ। আজ্ঞামাত্র সমর সাগরে সন্তরণার্থ সু- সজ্জিত হইল। রাজা স্বয়ং সেনাপতি হইয়া প্রথমে রাজমহল গমন করিলেন। তথাকার নবাবরণে পরা- জিত হইয়। ঢাকার কেল্লায় পলায়ন করত আত্মরক্ষা করিলেন। রাজা রাজমহল লুঠে দশ কোটি টাকা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। তিনি উত্তরোত্তর সকল স্থান জয় করিয়া পাটলীপুত্র অর্থাৎ পাটনা পর্য্যন্ত হস্তগত করি- লেন, এবং অধিকৃত দেশে নিরুদ্বেগে প্রভুত্ব ভোগ করত দিলীতে কর প্রেরণ রহিত করিয়াদিলেন। পরে কেদারনাথ রায় প্রভৃতি জমিদারদিগকে নিপাত করিয়া তাঁহাদিগের অধিকার সকল গ্রহণ করত সর্ব্বত্র স্বীয়২ লোকদিগকে নিযুক্ত করেন। তাহারা নিয়মিত কর আদায় করিতে লাগিল।
বাকলার জমিদার রামচন্দ্র রায় স্বদেশ পরিত্যাগ পূর্ব্বক দেশান্তরে পলায়ন করিয়াছিলেন, সুতরাং তাঁহার বিষয় অধিকার কালে কোন বিবাদ উপস্থিত হয় নাই, তাহা অনায়াসে রাজার হস্তগত হইয়াছিল। তিনি রাজা প্রতাপাদিত্যের জামাতা ছিলেন। রাজা তাঁহার প্রতি কোন অত্যাচার না করিয়া নিমন্ত্রণস্থলে তাঁহাকে নিজ বাটীতে আনাইলেন এবং এই অভিপ্রায়ে পুরীর মধ্যে রুদ্ধ করিয়া রাখিয়াদিলেন যে যখন ইচ্ছা কোন একটা কৌশলে তাঁহাকে সংহার করিবেন।
রাজা এক দিবস বিবেচনা করিয়া স্তির করিলেন যে জামাতাকে সংহার করিয়া তাঁহার রাজ্য লইলে সর্ব্বত্র অখ্যাতি হইবে, কিন্তু তাঁহাকে গোপনে সংহার করত তদীয় মৃত্যু সংবাদ সর্ব্বত্র প্রচার করিয়া রাজ্য লইলে আমার কোন অপযশঃ হইবেক না, অতএব ইহাই কর্ত্তব্য। এই অবধারণ করিয়া অনুচরদিগকে আজ্ঞা দিলেন যে কল্য প্রাতে রামচন্দ্র যখন অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইবেন, তখন তোমরা এক জন যে হউক তাঁহাকে সংহার করিবে।
এই কথা সকলে ক্রমশঃ পুরীর মধ্যে কাণাকাণি করাতে রাজকন্যা তাহা শুনিয়া হতজ্ঞান হইলেন, দিবা ভাগে স্বামিরু সহিত সাক্ষাৎ করিতে না পারিয়া, অতি- কষ্টে দিন কাটাইলেন, পরে নিশাযোগে অতি সঙ্গে।- পনে স্বামিকে সকল নিবেদন করিলেন। তিনি ঐ কথ। শ্রবণমাত্র প্রথমতঃ মুচ্ছিত হইয়া পড়িলেন, অনেক ক্ষণ পরে জ্ঞানেদ্রেক হইলে জিজ্ঞাসিলেন প্রিয়তমে! এক্ষণে এস্থান হইতে কি প্রকারে পলায়ন করিতে পারি? রাজকন্যা কহিলেন প্রাণনাথ! তাহার উপায় কিছু দেখি না, বুঝি বিধাতা আমার বৈধব্য দশা ঘটা- ইলেন, ইহা কহিয়া শিরে করাঘাত পূর্ব্বক রোদন করিতে লাগিলেন।
রামচন্দ্র পুরী হইতে পলায়নের কোন উপায় না দেখিয়া, পরিশেষে কহিলেন, তোমার ভ্রাতা উদয়া-' দিত্যের সহিত আমার যথেষ্ট প্রণয় আছে, তাঁহাকে কোন সুযোগে এ স্থানে আনিতে পারিলে যদি তিনি কিছু উপায় করিতে পারেন, তবেই রক্ষা, নতুবা আর জীবনের আশা নাই। রাজকন্যা তৎক্ষণাৎ ক্রন্দন সৎবরণ করিয়া স্বীয় ভ্রাতাকে সেই গৃহে অতি গোপনে আনয়ন করিলেন। রায় তাঁহাকে দেখিয়। গাত্রোথান পূর্ব্বক স্বীয় শয়নশয্যায় উপবেশন করাইলেন এবং সবিনয়ে সমস্ত বিবরণ নিবেদন করিলেন। রাজপুত্র কহিলেন ভাই! এক্ষণে অন্য কোন উপায় দেখি না, কেবল একমাত্র উপায় অদ্য উপস্থিত হইয়াছে, আপনি সেই অপকৃষ্ট কর্ম্মে প্রবৃত্ত হইতে পারিলে বোধ হয় এ সঙ্কট হইতে উদ্ধার পাইতে পারেন। রায় তাঁহার কথায় সানন্দ হইয়া কহিলেন, আমি যে বিপদস্ত হইয়াছি ইহাতে আপনি যা বলিবেন তাহাই করিব, আমা হইতে সকল কর্ম সম্পন্ন হইবে, যাহাতে আমার প্রাণ রক্ষা হয় আপনি তাহাতে সত্বর হউন!
রাজপুত্র কহিলেন অদ্য যশোহরের বাটীতে নৃত্য দর্শনের নিমন্ত্রণ আছে। আমি তথায় যাইব, ভাই আপনি মশাল-ধারির বেশ ধরিয়া আমার সহিত চলুন, পরে ঈশ্বর যা করুন। রায় প্রাণ রক্ষার্থে রাজকুমারের মতাবলম্বী হইয়। পালকীর অতি নিকটে২ মশাল ধরিয়া পুরী হইতে প্রস্থান করিলেন।
রাজা প্রতাপাদিত্য প্রভাতে জামাতার পলায়নবার্তা শুনিয়া, অনুসন্ধানে অবগত হইলেন যে রাজা বসন্তরায় নিমন্ত্রণচ্ছলে রামচন্দ্রকে বাহির করিয়া দিয়াছেন্ন। *রাজা রামচন্দ্রের প্রতি কৃপিত হইয়া কমল খোজাকে তদীয় রাজ্য হস্তগত করিতে প্রেরণ করিলেন। খোজা সবৈন্যে সজ্জমান হইয়া তৎকৰ্ম্ম নির্ব্বাহ করিয়া প্রত্যা- গমন করে।
এক্ষণে রাজা স্বয়ং বসন্তরায়ের দোষানুসন্ধান করিতে প্রবৃত্ত হইলেন, এইরূপে কিছু কাল গত হয়, পরে রাজা বসন্তরায়ের মন্ত্রিরা প্রতাপাদিত্যের দুষ্ট আচরণ অবগত হইয়া তাঁহাকে জ্ঞাত করিলেন, তিনি স্বয়ং অনুচরদিগকে সাবধান করিয়া দিয়া প্রাণনাশ শঙ্কায় গঙ্গাজল নামক অস্ত্র সর্ব্বক্ষণ ধারণ করেন। ঐ অস্ত্র হস্তে থাকিলে পঞ্চাশ জন বীর পুরুষে আক্রমণ করিয়াও কিছু করিতে পারে না। মহাবল পরাক্রান্ত রাজকুমার গোবিন্দরায় পিতার রক্ষার্থ স্থানে স্থানে ও দ্বারে দ্বারে সেনাগণ নিযুক্ত করিয়া স্বয়ং সতত সাবধান থাকেন। প্রতাপাদিত্য তাঁহাকে সংহারের কোন উপায় না পাইয়া এক প্রকার নিবৃত্ত হইয়া রহিলেন।
রাজা বসন্তরায়ের পিতার নাংবৎসরিক শ্রাদ্ধের দিন অবারিত দ্বার, সকলেই পুরীমধ্যে গমনাগমন করিতেছে, ঐ সুযোগে রাজা প্রতাপাদিত্য এক অস্ত্র সঙ্গোপনে লইয়া তথায় প্রবেশ করিলেন এবং দেখিলেন বসন্তরায় স্নান করিতে গিয়াছেন, তিনি তথায় অতিবেগে গমন করিলেন। ভত্যেরা বসন্তরায়কে কহিল, মহা- রাজ! রাজা প্রতাপাদিত্য অতি সত্তর হইয়া আপনকার নিকট আসিতেছেন। ভাহাতে তিনি উত্তর করিলেন, গঙ্গাজল আন। তাহারা তাঁহার বাক্যের প্রকৃত অথ বুঝিতে পারিল না, অতএব অস্ত্র না আনিয়া এক পাত্রে গঙ্গাজল আনিয়া উপস্থিত করিল। তাহা দেখিয়। রাজা বসন্তরায় বুঝিলেন আমার পরমায়ঃ এই পষ্যন্ত, আর রক্ষা নাই। ইতিমধ্যে রাজা প্রতাপাদিত্য অতি বেগে নিকটস্থ হইয়া তাঁহার শিরশ্ছেদন করিলেন। পুরীমধ্যে হাহাকার শব্দ উঠিল।
তৎপরে গোবিন্দ রায়কে উদ্দেশ করিয়া গমন করি- লেন। তিনি আপন ধনুতে গুণ দিয়া রাজা প্রতাপা- দিত্যকে লক্ষ করিয়া এক তীর নিঃক্ষেপ করেন, ঐ তীর তাঁহার শরীরে না লাগিয়া কেবল পাকড়ীটা উড়াইয়া লইয়া যায়, এবং তৎকর্তৃক নিক্ষিপ্ত দ্বিতীয় তীর তাঁহার কুণ্ডলে লাগিল, ইত্যবকাশে রাজা প্রতাপাদিতা আসিয়া গোবিন্দ রায়ের মস্তক ছেদন করিলেন। তাঁহার স্ত্রী গর্ভবতী ছিলেন, প্রতাপাদিত্য তাঁহাকেও কাটিলেন, পরে রাজা বসন্তরায়ের কাটা মুণ্ড লইয়া নিজ বাটীতে গমন করিলেন।
রাণী সহগামিনী হওনের বাসনায় পুরোহিতদ্বারা রাজা বসন্তরায়ের মুণ্ড আনয়ন করিয়া চিতারোহণের পূর্ব্বে রাজা প্রতাপাদিত্যকে অভিশাপ প্রদান করিলেন, "যে ব্যক্তি বিনা দোষে আমার স্বামিকে সংহার করিয়াছে তাহার স্ত্রী পুত্র সকলে অন্ত্যজগ্রস্ত হইবে," এই অভিশাপ দিয়া জ্বলৎ চিতায় প্রাণ পরিত্যাগ করিলেন। রাঘবরায় প্রভৃতি রাজা বসন্তরায়ের সাত পুত্র রাজা প্রতাপাদিত্যের প্রতিকূল ছিলেন, রাজা তাঁহাদিগকে কারারুদ্ধ রাখিয়া নিষ্কন্টকে রাজ্য শাসন করিতে লাগিলেন।
রূপবসু নামে এক ব্যক্তি, রাজা বসন্তরায়ের অতি আত্মীয় ছিলেন। তিনি রাজকুমারদিগের দুঃখে দুঃখিত হইয়া চিন্তা করিলেন কুমারেরা অতিশয় ক্লেশ পাইতেছেন, উদ্ধার করা কর্তব্য, কিন্তু উপায় কিছু দেখিতে পাই না, যাহা হউক, রাজার কোন বন্ধু হইতে অবশ্য ইহার প্রতীকার হইবে। এই অবধারণ করিয়া দক্ষিণ দেশীয় ইচ্ছাখাঁ মছন্দরীর নিকট যাইয়া আনুপূব্বীক তাবৎ বৃত্তান্ত কহিয়া ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। তিনি তাঁহার বিশেষতঃ রাজকুমারদিগের দুঃখে কাতর হইয়া কহিলেন, আমি তাঁহাদিগকে অবশ্যই উদ্ধার করিব। আপনি কোন মতেই উদ্বিগ্ন হইবেন না। এই কথা কহিতে২ ক্রোধে তাঁহার চক্ষুদ্বয় লোহিত-বর্ণ হইয়া উঠিল। পরে তিনি সেনাপতি বলবন্ত খোজাকে সুসজ্জ হইতে আদেশ করিলেন।
খোজা করপুটে নিম্বেদন করিল, মহারাজ! যুদ্ধে তাঁহার প্রতীকার করা দুষ্কর হইবে। আমি একাকী তাঁহার নিকট যাইয়া রাজকুমারদিগকে উদ্ধারের উপায় করি। ইহা কহিয়া কেবল একখান পেষক- বজ হস্তে লইয়া রাজা প্রতাপাদিত্যের নিকট গমন করিল। তাঁহার সমীপে উপর্ধিত হইয়া জানাইল যে, মহারাজের সহিত বিরলে কোন নিবেদন আছে। রাজা কিঞ্চিৎ কাল পরে খোজাকে নির্জ্জনে আনাইলেন। বলবস্ত তথায় উপস্থিত হইব্যমাত্ররাজার কটিদেশের বস্ত্র ধরিয়া পেষকবজ তাঁহার গলদেশে প্রদানপূর্ব্বক কহিল, রাজা বসন্তরায়ের তনয়দিগকে আমার প্রভুর নিকট এইক্ষণে প্রেরণ কর, নতুবা তোমাকে নষ্ট করি। রাজা নিরুপায় হইয়া ঈশ্বরের নামোচ্চারণ পূর্ব্বক শপথ করিয়া রাজকুমারদিগের মোচনের অঙ্গীকার করিলেন। তখন খোজ। রাজা প্রতাপাদিত্যের চরণে নিপতিত হইয়া তাঁহাকে স্তব করিতে লাগিল। রাজা তাহার এইরূপ সাহসে তুষ্ট হইয়া নৌকাযোগে রাজকুমারদিগকে মছন্দরীর নিকট প্রেরণ করিলেন।
রাজকুমারেরা তথায় কিছুকাল অবস্থিতি করিলেন। পরে ঐ অবশিষ্ট সাত কুমারের জ্যেষ্ঠ রাঘবরায় রাজা প্রতাপাদিত্যকে প্রতিফল প্রদানার্থ রূপবসুকে সমভি- ব্যাহারে লইয়া দিল্লী গমন করিলেন। তথায় যাইয়া উজীর-পুত্রের শিক্ষকের নিকট বিদ্যা অভ্যাস করিতে লাগিলেন। রূপবসু অভিকষ্টে তাঁহাকে প্রতিপালন করেন। এই রূপে অনেক দিন গত হয়।
এখানে রাজা প্রতাপাদিত্য রাঘবরায় প্রভৃতির গমনে খিদ্যমান হইয়া মনে মনে চিন্তা করিলেন, তাহাদি- গকে ইচ্ছাখ। মছন্দরী শঠতাপূর্ব্বক লইয়া গিয়াছে, অতএর তাহাকে নিপাত করিয়া তদীয় রাজ্য গ্রহণ করা উচিত, তাহা হইলে তাহাকে প্রতিফল দেওয়া হয়। এইরূপ স্থির করিয়া সৈন্যসহ হিজলী আক্রমণ করত অষ্টাদশ দিবস যুদ্ধের পর, তাঁহাকে সংহার করিয়া দেশ হস্তগত করিলেন।
সমস্ত বাঙ্গালা ও বেহার প্রদেশ, রাজা প্রতাপাদিত্যের অধিকারভূক্ত হইল। তিনি ঐ অধিকারে একছত্রী চক্রবর্ত্তী হইয়া দিল্লীর কর নিবারণ করেন এবং পাটনা অবধি স্থানে স্থানে সেনা স্থাপন করিয়া তাহাদিগকে কহিয়া দিলেন, যে দিল্লী হইতে নবাব কি সেনাপতি প্রভৃতি যে কেহ আইসে, তাহাকে আসিবার সময় নিবারণ করিবে না, কিন্তু সে দৌতলায় আসিয়া উপস্থিত হইলে, দুই দিক্ হইতে তাহাকে আক্রমণ করিয়া সংহার করিবে।
রাজা প্রতাপাদিত্য প্রজাদিগকে পুত্রসম প্রতিপালন পূর্ব্বক রাজ্যশাসন করেন। এক দিন তাঁহার এক সহচরী পলায়ন করিয়া কোন্ স্থানে গমন করে তাহার অনুসমান হয় নাই। পরে ঢৌকীতে ধৃতা হইলে রাজা দুন্দ্রিয়ার দণ্ডার্থ তাহার স্তনদ্বয় ছেদন্ম করিলেন। দাসী তাহার জ্বালায় অতিকাতরা হইয়া প্রাণত্যাগ কালে কহিল, 'মঃারাজ আপনি যশোহরেশ্বরী দেবীর আস্তা উল্লঙ্ঘন করত আমাকে অতিযন্ত্রণা দিয়া নষ্ট করিলেন। আপনকার আর বিস্তর কাল অপেক্ষা নাই; অচিরে কালগ্রাসে পতিত হইবেন। এই কথা কহিতে২ প্রাণ পরিত্যাগ করিল। তদবধি রাজা উত্তরোত্তর শ্রীভ্রক্ট হইতে লাগিলেন। সকলে কহিয়া থাকেন সহচরীকে ঐরূপে যন্ত্রণা দেওনের পর রাজা প্রতাপাদিত্যের কুষ্ঠব্যাপি হইয়াছিল।
রাঘবরায় দিল্লীতে থাকিয়া উজীরতনয়ের শিক্ষকের নিকট পারসীক বিদ্যা অভ্যাস করেন এবং তাঁহার কৰ্ম্ম কার্য্য করেন। তাহাতে তিনি রাঘবরায়ের প্রভি অতি- শয় সন্তুষ্ট ছিলেন, য়খন তিনি উজীরের পুত্রকে পড়া ইতে যাইতেন, রাঘবরায় তাঁহার সমভিব্যাহারে থাকি- তেন। এইরূপ যাতায়াত করিতে২ উজীরপুত্রের সহিত তাঁহার আলাপ পরিচয় হইল। পরে উজীরপুত্রের অনুমতিক্রমে তিনি তাঁহার সহিত একত্র পড়িতে লাগিলেন। এক দিবস রাঘবরায় উজীরের পুত্রকে আত্মবিবরণ নিবেদন করিলে, তিনি অতিদুঃখিত হইয়া ঐ সকল কথা স্বীয় পিতাকে বিদিত করিলেন। উজীর রাঘবরায়কে সঙ্গে লইয়া বাদসাহকে রাজা প্রতাপাদি- ত্যের দৌরাত্ম্য জানাইলেন এবং কাননগোরাও তৎকা- লে নিবেদন করিল, অনেক কাল অবধি রাজা প্রতাপা- দিত্য কর প্রেরণ করে না, তাহার হস্তে বাঙ্গালা ও বেহার রাজ্য আছে।
বাদসাহ দুই পক্ষের কথায় প্রতাপাদিত্যের প্রতি অতি ক্রুদ্ধ হইয়া আজ্ঞা করিলেন, যে এক জন আমীর যাইয়া তাহাকে দমন করে। সেই আজ্ঞানুসারে আবরাম খাঁ বাহাদুর প্রতাপাদিত্যকে আক্রমণ করিতে পাঁচ হাজার সৈন্য সহ বঙ্গদেশের প্রতি যাত্রা করিয়া চারি মাসে পাটনায় পঁহুছিলেন। তথায় রাজা প্রতাপাদি- ত্যের সেনাগণ সহ তাঁহার সাক্ষাৎ হইলে, তাহারা কহিল আমরা এ স্থানে যুদ্ধ করিতে আসি নাই, কোন বিপক্ষ দেশে প্রবেশ করিতে না পারে একারণ রক্ষার্থ আছি। তোমরা বাদসাহের লোক, বিপক্ষ নহ, স্বচ্ছন্দে গমন করহ, তোমাদিগকে নিবারণ করি এমত সাধ্যকি।
আবরাম খাঁ সমস্ত সৈন্য লইয়া বঙ্গদেশে প্রবেশ করিয়া যশোহরে যাত্রা করিলেন। পাটনাস্থ রাজসে- নাগণ গুপ্তভাবে তাঁহার পশ্চাৎ২ আসিতে লাগিল। তিনি মৌতলার গড়ের নিকট পহুছিবামাত্র, দুই দিক্ হইতে রাজসৈন্যেরা তাঁহাকে আক্রমণ করিয়া বথ করিল। তাঁহার সঙ্গি-সেনারা প্রাণভয়ে রাজ-সৈন্যের সহিত মিলিয়া গেল। এদিকে আবরাম খাঁর বিলখ দেখিয়া বাদসাহ আমীর হপ্ত হাজারিকে প্রেরণ করেন। •এইরূপে বাইশ জন আমীর বঙ্গদেশে আগমন করিয়া- ছিলেন, সকলেরই এক দশা হয়।
পরে রাজা মানসিংহ বঙ্গদেশে আগমন করেন। পাটনা অবধি রাজা প্রতাপাদিত্যের সেন্যেরা পূর্ব্ব আগত আমীরদিগের ন্যায় তাঁহাকে সমাদর করিতে লাগিল। তিনি রাজমহল ছাড়িয়। আসিতে২ দেখেন যে পশ্চাৎবর্তী সৈন্যগণ তাঁহার পশ্চাৎ২ আসিতেছে, তাহাতে কিঞ্চিৎ শঙ্কিত হইয়া যশোহর গমন পরিত্যাগ করত বর্দ্ধমানে অবস্থিতি করিলেন।
প্রতাপাদিত্য প্রধান২ লোক পাঠাইয়া ভাঁহাকে যশোহরে লইয়া গেলেন। তিনি' তথায় যাইয়া মেীতলার কোঠে বাসা করেন। পরে রাজা প্রভাপাদিত্য অসংখ্য অপরিমিত সামগ্রী তাঁহাকে উপঢৌকন দিয়া সাক্ষাৎ করেন এবং উপচঢাকন প্রাপ্ত এক সীমন্তিনীকে স্বীয় কন্যা প্রচার করিয়া রাজা মানসিংহের পুত্রকে বিবাহার্থ প্রদান করেন। তাহাতে মানসিংহের সহিত রাজার অন্তরঙ্গতা হইল, শত্রুতা থাকিল না।
কিছুদিন পরে রাজা মানসিংহ হিন্দুস্থানে যাইয়। কাশীক্ষেত্রে পরলোক প্রাপ্ত হয়েন। ঐ সমুদায় সমা- চার দিল্লীতে পঁহছিলে, উজীর স্বয়ং বাদসাহের তৃতী- য়াংশ সৈনাসহ রাজা প্রতাপাদিত্যের দমনার্থ বঙ্গদেশে যাত্রা করিলেন। তিনি বিপক্ষসৈন্য সংহার করিতে২ শালিকায় আসিয়া উপরিত হইলে, প্রতাপাদিত্যের প্রধান্ সেনাপতি তাঁহার সমুখীন হওত সাত দিন অনা- স্থারে অবিরত সংগ্রাম করিয়া শমনসদনে গমন করে।
রাজা প্রতাপাদিত্য সেনাপতির মৃত্যু শুনিয়া, কি করিবেন, কি হইবে, তাহার পরামর্শ করিতেছেন। এনত সময়ে যশোহরেশ্বরী দেবী তাঁহার মধ্য মা কন্যার রূপ ধারণ-করিয়। ক্রদন করিতে২ সেই স্থানে আসিয়া কহিলেন, "বাবা তবে আমি যাই"। রাজা ীয় যুবতী কন্যাকে সর্ধ সম.ক্ষ আসিতে দেখিয়া মহা ক্রোধে দূর২ বাক্যে তাঁহাকে বিদায় করিয়া দিলেন, এবং সকল সৈন্যকে যুদ্ধার্থ সুসজ হইতে আজ্ঞা প্রদান করিয়া অন্তঃপুরে গমন করিলেন। তথায় যাইয়া রাজ্জীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, য়োমরা কি সকলে পাগল হইয়াছ, অদ্য আমার কন্য। সভায় গমন করিয়াছিল কেন! রাজনহিষী উত্তর করিলেন, সে কি মহারাজ, আমার কোন কন্যাতো অন্তঃ র হইতে বাহিরে বায় নাই। তখন রাজা শিরে করাঘাত পুর্ব্বক কহিলেন সর্ব্বনাশ হইল, বুঝি তবে যশোহরেশ্বরী আমাকে পরিত্যাগ করিলেন। এই কথা কহিয়া ঠাকুরুণ বাটী যাইয়া দেখেন দক্ষিণমুখী দেবী পশ্চিমমুখী, হ২য়াছেন, ইহা দেখিয়া তাঁহাকে আর প্রণামও করিলেন না।
রাজা প্রতাপাদিত্য আপনার আসন্ন কাল জানিয়া সমরে নিরুৎসুক হওত স্বয়ং যাইয়া উজীরের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। উজীর তাঁহাকে সম্মানপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন তোমার এক্ষণে কি কর্ত্তব্য, যুদ্ধ করিবে কি বাদসাহের আজ্ঞার বশীভূত হইবে! রাজা উত্তর করিলেন আমি আর যুদ্ধ করিব না, আপনি দিল্লীশ্বরের আজ্ঞানুসারে আমাপ্রতি যাহা করিতে "হয় করুন্। উজীর তাঁহাকে পিঞ্জরে রুদ্ধ করিয়া পুরী লুঠ করিলেন।
উজীর ঐ লুণ্ঠনে এক শত কোটি নগদ টাকা, আর মণি মুক্তা প্রবালাদি বিবিধ বহুমূল্য রত্ন পাইলেন। তিনি আর২ স্ত্রীলোকদিগকে পিঞ্জরে বদ্ধ করিয়া।- ছিলেন। কিন্তু রাজা প্রভাপাদিত্যের স্ত্রী নাগজীর পুরীমধ্যে, কেহ প্রবেশ করিতে পারে নাই এবং তিনি বদ্ধও হয়েন নাই; লুঠের পূর্ব্বে রাঘবরায় যাইয়া ঐ পুরীর দ্বারে দাঁড়াইয়া রহিয়াছিলেন, এ কারণ তথায় কেহ যায় নাই। উজীর সকলকে লইয়া দিল্লী গমন করেন, পমিমধ্যে বারাণসীতে রাজা প্রতাপাদিত্যের লোকান্তর প্রাপ্তি হয়। আর২ সকলকে লইয়া দিল্লী- শ্বর আকবর বাদসাহের সমীপে উপস্থিত করেন।
বাদসাহ উজীরের অনুরোধে রাঘবরায়কে যশো- হরজিৎ উপাধি দিয়া রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজ্য সমর্পণ করিলেন। রাঘবরায় দিল্লীশ্বরের নিকট হইতে বিদায় হইয়া প্রথমে ইচ্ছাখা মছন্দরীর বাটীতে উপস্থিত হইলেন। তথা হইতে সকল ভ্রাতাদিগকে সমভিব্যাহারে লইয়া মহা সমারোহে যশোহরে আসিয়া দেখেন পুরী শ্মশান-ভূমি হইয়াছে। তদ্দর্শনে রাঘবরায়ের মনে ঔদাস্য জন্মিল।
তিনি সর্ব্বসমক্ষে স্বীয় অভিপ্রায় প্রকাশ করিয়া কহিলেন দেখ, এই রাজ্যের নিমিত্ত আমার পিতার শিরশ্ছেদন হইয়াছে এবং মহারাজ বিক্রমাদিত্যের সন্তানের প্রায় জাতি যায়। অতএব রাজ্যমদে মত্ত হওয়া • অতি নরাধমের কর্ম্ম, ইহাতে যে রত থাকে সে অতি অজ্ঞান। ইহা কহিয়া সকল রাজ্য বন্ধু বান্ধবদিগকে অংশ করিয়া দেন, স্বয়ং কেবল স্বীয় পরিবার ভরণ পোষণার্থ কএক খানি গ্রামমাত্র অধীনে রাখিয়া যশো- হরজিৎ নামধারী মাত্র রাজা হইয়া রহিলেন। তাঁহার সন্তান সন্ততি হয় নাই। রাজা বসন্তরায়ের তনয়েরা নিঃসন্তান ছিলেন। কেবল রাজা চন্দ্রনাথ রায়ের এক তনয় হইয়াছিল। তাঁহার সন্তানেরা পুত্র পৌত্রাদি ক্রমে বৃহৎ গোষ্ঠী হইয়া; অদ্যাবধি যশোহরে বাস করিতেছেন।
