ইয়ুরোপে তিন বৎসর
রমেশচন্দ্র দত্ত
| প্রথম অধ্যায় | |
| দ্বিতীয় অধ্যায় | |
| তৃতীয় অধ্যায় | |
| চতুর্থ অধ্যায় | |
| পঞ্চম অধ্যায় | |
| ষষ্ঠ অধ্যায় | |
| সপ্তম অধ্যায় |
প্রথম অধ্যায়।
৩রা মার্চ প্রাতে ৮৷৷৹ ঘণ্টার সময় আমরা আপনাদিগকে ও কলিকাতা নগর পরিত্যাগ করিয়া গঙ্গানদী দিয়া ডায়মণ্ড হারবার (পোতাশ্রয়)-স্থিত মূলতান নামক মেল ষ্টীমার অভিমুখে যাত্রা করিলাম। আমরা স্বদেশের কুটীরাবলী, ক্ষেত্রচর, গ্রাম সমুদয়, এবং গঙ্গার উভয় তীরস্থ নারিকেল, তাল এবং সুন্দর নিবিড় বন সকলের নিকট বিদায় লইয়া যত বঙ্গসাগরাভিমুখে যাইতে লাগিলাম, গঙ্গার পরিসর ততই বৃদ্ধি হইতে লাগিল। দুই প্রহর দেড় ঘণ্টার সময় আমরা মূলতান পোতের নিকটে পৌঁছিলাম। বিকালে উক্ত পোত নঙ্গর উঠাইল এবং আমরা অনতিবিলম্বে গঙ্গাসাগর সঙ্গমে আসিয়া পৌঁছিলাম। পরদিন প্রাতে চার ঘণ্টার সময় জাহাজ পুনরায় নঙ্গর উঠাইয়া সমুদ্রাভিমুখে যাত্রা করিল। বেলা দশ ঘণ্টার সময়ে আমরা সুবিস্তৃত সাগরে উপস্থিত। গঙ্গার রক্তাক্ত বারি এবং ঈষৎ হরিদ্বর্ণ সমুদ্র-জলের মধ্যস্থিত রেখা আমরা পরিষ্কাররূপে দেখিতে পাইলাম; জলের হরিদ্বর্ণ ক্রমেই গাঢ়তর দেখাইতে লাগিল, এবং আমরা সাগর মধ্যে আসিয়া উহার নিবিড় নীল জল দেখিতে পাইলাম। এক্ষণে চতুর্দ্দিকে আর কিছুই দেখা যায় না; কেবল গভীর নীলবর্ণ সাগর ও গভীর নীলবর্ণ নভোমণ্ডল। এই দর্শন নূতন ও চমৎকার, বিশেষতঃ তারাময় নিদাঘ-রাত্রিকালে যখন অবিরল তরঙ্গমালা চতুর্দ্দিকে উঠিতে থাকে, যখন নির্মেঘ চন্দ্রালোকে শ্বেতবর্ণ ফেননিচয় ইতস্ততঃ উজ্জ্বলাকারে ক্ষণমাত্র বিরাজ করিয়া নীল জলে মিশাইয়া যায়, যখন উজ্জ্বল-কলেবর সমুদকীট সমুদয় নক্ষত্রমালার ন্যায় শুভ্র ফেণার উপর দর্শন দেয়, তখন যে উহা কি অপরূপ রূপ ধারণ করে, তাহ সমাকরূপে বর্ণন করা সুকঠিন।
৭ই মার্চ প্রত্যুষে আমরা জাহাজের উপর হইতে করোমেণ্ডেল উপকূলের বালুকাময় তট দেখিতে পাইলাম। ঐ কুলের নিকট দিয়া চারি পাঁচ ঘণ্টা আসার পর, প্রাতে দশ ঘণ্টার সময় মান্দ্রাজ নগরে উপনীত হইলাম। ভূমিতে অবতীর্ণ হইয়া মান্দ্রাজের দুর্গ, পিপেলস্ পার্ক, ও সুন্দর চিড়িয়াখানা সন্দর্শন করিলাম। মান্দ্রাজবাসিগণ বাঙ্গালিদিগের অপেক্ষ কৃষ্ণবর্ণ। তাহাদিগের মুখাকৃতি ও পরিচ্ছদ কলিকাতার খোট্টাদের সদৃশ। গুহ সমুদয় নীচ, অদ্ভুতগঠন এবং কুচিত্রিত অথবা কুসজ্জিত ও কলিকাতার খোট্টাগণের বাটীর ন্যায় বোধ হয়। প্রায় চারি ঘণ্টার পর, আমরা ষ্টীমারে প্রত্যাগত হইলাম। মান্দ্রাজ কলিকাতা অপেক্ষা উষ্ণ এবং বাসের পক্ষে অসুখজনক। আমরা গঙ্গানদীর মুখে ষে সকল সমুদ্রচর বিহঙ্গম দর্শন করিয়াছিলাম, তদ্রূপ পক্ষী মান্দ্রাজের নিকটে দৃষ্টিগোচর হইল। যৎকালে আমরা সাগরতরঙ্গে আন্দোলিত হইতেছিলাম, তৎকালে ঐ সকল পক্ষী সহস্র দলবদ্ধ হইয়া উত্তাল তরঙ্গের সহিত উঠিতে ও নামিতে লাগিল; বোধ হইল, যেন সাগরের নিবিড় নীলকলেবরে শুভ্র অলঙ্কাররাশি পরিশোভিত হইয়া রহিয়াছে।
১০ই মার্চ প্রাতে লঙ্কাদ্বীপের প্রস্তরময় উপকূল নয়নপথে পতিত হইল। যখন কেবল নির্জীব ও অচল পদার্থদ্বারা লোকে পরিবেষ্টিত থাকে, তখন সজীব ও সচল পদার্থমাত্রেই মনোহরণ করে। কি সমুদ্রচর বিহঙ্গ, কি উড্ডীন মৎস্য, কি গমনশীল ষ্টীমার, যাহা দেখা গেল তাহাই চিত্তাকর্ষণ ও মনোরঞ্জন করিতে লাগিল; এবং সে রমণীয়তা দূরদৃষ্ট ভূমিতল দেখিতে দেখিতে ক্রমেই বর্দ্ধিত হইতে লাগিল। আমি এই প্রথমে পর্ব্বত দর্শন করিলাম। সিংহলের দূরস্থ পর্ব্বত অতি মনোহর মেঘমালার ন্যায় বোধ হইল।
১১ই মার্চ প্রাতে প্রায় ৭ ঘণ্টার সময় আমরা গালে পৌছিলাম; এবং আহারাদি সমাপন করণানন্তর ধূমপোত হইতে নামিয়া একখানি ক্ষুদ্র তরিযোগে সিংহলে অবতরণ করলাম। ঐ স্থানটী এক অবিচ্ছিন্ন উপবন বোধ হইল। নারিকেল ও বাঁশ এবং নানাবিধ বৃক্ষ, সুন্দর ও সুগঠন পথের উপর লম্বিত রহিয়াছে, এবং সেই ছায়াময় তরুসমূহের ভিতর দিয়া সামান্য কিন্তু পরিষ্কার কুটার সকল শোভা পাইতেছে। এই স্থানকে স্বর্ণময় বর্ণনা করিয়া বাল্মীকি অত্যুক্তি দোষে দূষিত হইয়াছেন, এ কথা বলা সঙ্গত বোধ হয় না।
প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যেই আমরা ওয়াকালীতে উপস্থিত হইলাম। এ স্থানের এত অধিক সৌন্দর্য্য যে তাহা বর্ণনা করিতে বর্ণনাশক্তি পরাভব মানে। বহু দূরে ধূসরবর্ণ শৈলশ্রেণী আমাদিগের নয়ন-পথ অবরোধ করিল। এখান হইতে, এডামস্ পীক দেখা যায়। উহার কিয়দ্দূরে তরঙ্গমালার ন্যায় উচ্চ ও নীচ বৃক্ষশ্রেণী অবিচ্ছেদে বিরাজ করিতেছে, সন্নিকটে কতই ক্ষেত্র ও পরিষ্কার পথ আছে এবং ক্ষুদ্র নদী ও খাল সর্পের ন্যায় বক্রভাবে ক্ষেত্র দিয়া প্রবাহিত হইতেছে। বিদেশীয় লোক এখানে আসিলে দেশীয়গণ নানাবিধ সামগ্রী বিক্রয়ার্থ আনয়ন করে—যথা অঙ্গুরী, দারুচিনি ইত্যাদি। তাহারা ক্রেতাদিগকে ঠগাইবার বিস্তর চেষ্টা করে। আমি এক উদাহরণ দিতেছি—আমার এক বন্ধু একটা অঙ্গুরীয় ক্রয় করিয়াছিলেন এবং আমার যতদূর স্মরণ হয়, বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে এইরূপ কথোপকথন হইয়াছিল—
সিংহলী। মহাশয়, অঙ্গুরী চাই, অঙ্গুরী; লঙ্কার হীরা, সোণা, মহাশয়?
বন্ধু। না, আমরা চাহি না।
সিংহলী। লঙ্কার হীরা, মহাশয়, লন না মহাশয়; একবার হাতে দিয়া কেন দেখুন না মহাশয়?
বন্ধু। আচ্ছা, দাম কি?
সিংহলী। ত্রিশ টাকা।
বন্ধু। আমি লইব না।
সিংহলী। আচ্ছা আপনি কি দিবেন, বলুন না কত টাকা দিবেন, বলুন, মহাশয়?
বন্ধু। আমি লইব না।
সিংহলী। লন, মহাশয়, লন। কয় টাকা দিবেন? লঙ্কায় হীরা; বড় উত্তম; বলুন না মহাশয় কত টাকা দিবেন?
বন্ধু। আট আনা।
সিংহলী। আট আনা! আচ্ছা, লন মহাশয়।
ওয়াকালী পরিত্যাগ করিয়া আমরা দারুচিনির বাগানে গেলাম। সেই বাগান অতি সুন্দর, তথা হইতে আমরা একটা সিংহলদেশীয় মন্দির দেখিতে গেলাম, উহার পুরোহিত আমাদিগের নিকটে সমাগত হইল এবং যাবতীয় প্রতিমা ও দর্শনযোগ্য সমস্ত বিষয় আমাদিগকে দেখাইল। এখানে গৌতম মুনির অষ্টাদশ হস্ত উচ্চ এক প্রতিমুর্ত্তি সন্দর্শন করিলাম। সিংহলীরা বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বী। কি আশ্চর্য্য যে, উল্লিখিত পুরোহিত রামরাবণের বিষয় কিছুমাত্র অবগত নহে। ঐ মন্দির যে সমস্ত পাদপপুঞ্জে আচ্ছাদিত আছে, আমরা তাহার ছায়ায় প্রস্তরখণ্ডের উপর বসিয়া সুমিষ্ট নারিকেলের জল যে কি রুচিপূর্ব্বক পান করিলাম, তাহা আমি বর্ণন করিতে পারি না।
সন্ধ্যার সময় অতি সুখে হোটেলে আহার করিলাম, তথায় অন্যান্য খাদ্যসামগ্রীর সহিত আমাদিগের পূর্ব্ব-পরিচিত ইলিস মৎস্য পাওয়া গিয়াছিল। অনতিবিলম্বে আমরা বাষ্পপোতে আসিয়া উপনীত হইলাম।
মার্চ মাসের ১৯ দিবসে আমরা সোকোট্রা ও আফ্রিকার মধ্য দিয়া আসিলাম। প্রত্যূষে আফ্রিকার উচ্চ শৈলশ্রেণী নয়নগোচর হইল; বোধ হইল যে, উহা এক ক্রোশ মাত্র দূরে আছে, কিন্তু শুনিলাম যে, সে পর্ব্বত দশ ক্রোশ অন্তর ও প্রায় ৮০০০ ফিট্ উচ্চ। ২১এ প্রাতঃকালে এডেন নগরস্থ পর্ব্বত ও পাহাড় দৃষ্টিগোচর হইল। প্রাতে আহারাদি করিয়া উক্ত নগর দেখিতে গেলাম; দেখিলাম নগর অতি কদর্য্য, কেবল অনুর্ব্বরা দগ্ধ পাহাড় উহার চতুঃসীমা বেষ্টন করিয়া আছে, কোন প্রকার উদ্ভিজ্জের সহিত প্রায় সাক্ষাৎ হয় না। কেবল এখানে ওখানে দূর্ব্বাদল-মণ্ডিত কিম্বা একমাত্র বৃক্ষ-আচ্ছাদিত ভূমিখণ্ড দেখিয়া নয়নযুগল তৃপ্ত হয়। এই অনুর্ব্বরা পর্ব্বত হইতে কেমন করিয়া সেই বৃক্ষ রসাকর্ষণ করিয়া থাকে, তাহা আমার বৃদ্ধির অগোচর।
এই স্থানের অধিবাসিগণ কতক আরব ও কতক আফ্রিকা দেশস্থ; তাহারা কৃষ্ণবর্ণ ও কুগঠন; তাহাদিগের ধাতু এখানকার জলবায়ু ও মৃত্তিকার উপযোগী, বালক বালিকারাও উগ্ররশ্মি সূর্য্যের উত্তাপ ও তপ্ত বালুকাকে ভয় করে না; এমন কি কেহ কেহ প্রায় অর্দ্ধ ঘণ্টা পর্য্যন্ত আমাদিগের শকটের সঙ্গে সঙ্গে দৌড়িতে লাগিল এবং তাহাতে যে তাহাদের কিছুমাত্র কষ্ট বা শ্রম বোধ হইতেছে, তাহা বুঝিতে পারিলাম না। উহারা সন্তরণ বিদ্যায় বিলক্ষণ পটু, যখন আমরা স্টীমারের উপর ছিলাম, তখন কতিপয় বালক বালিকা সন্তরণ করিয়া জাহাজের চতুষ্পার্শ্বে পয়সা ভিক্ষা করিতে তাসিয়াছিল। সমুদ্রজলে মুদ্রাখণ্ড ফেলিয়া দিতে না দিতে তাহারা ডুব দিয়া উঠাইয়া আনে এবং আরও পাইবার প্রার্থনা করে। বস্তুতঃ তন্মধ্যে এক জন ডুব দিয়া জাহাজের এক পার্শ্ব হইতে অপর পার্শ্বে যাইতে চাহিয়াছিল; এবং আমার বোধ হয়, সে তাহা করিতে পারিত। তাহারা সমুদ্র-জল জন্তুর ন্যায় বহুক্ষণ পর্য্যন্ত ভাসিয়াছিল।
এডেন নগরের দুর্গ অতি দুষ্প্রবেশ, কেন না ঐ স্থান প্রস্তরময়। এখানকার জলাশয় দেখিবার যোগ্য বটে। এখানে জল এত দুষ্প্রাপ্য যে নিবাসিগণ একটা চতুর্দ্দিকে প্রাচীর কি পর্ব্বতদ্বারা বেষ্টিত স্থান রাখিয়া দেয়, বর্ষাকালে উহা জলে পরিপূর্ণ হইয়া থাকে এবং যাবতীয় লোক সমস্ত বৎসর তথা হইতে জল প্রাপ্ত হয়। এই জলাশয়ে যাইবার সুগঠন পথ, পথিমধ্যে বসিবার স্থান এবং পর্ব্বতে খোদিত সোপান প্রস্তুত আছে।
পর দিন প্রাতে এডেন পরিত্যাগ করিয়া অপরাহ্ণ প্রায় ৬ ঘণ্টার সময় বেবেলমেণ্ডেব প্রণালী দিয়া সমাগত হইলাম। এক দিকে আরবদেশীয় পাহাড়, অন্য দিকে পেরিম নামক ক্ষুদ্র দ্বীপ এবং তাহার পশ্চাতে আফ্রিকার উচ্চ পর্ব্বতশ্রেণী দৃষ্টিগোচর হইল।
লোহিত সমুদ্রের মধ্যে কোথাও বা ক্ষুদ্র পাহাড় সকল সরোষে নীরোপরি মস্তকোত্তোলন করিয়া রহিয়াছে, কোথাও বা জলমধ্যে লুকাইয়া আছে, এই উভয় কারণে লোহিত সমুদ্রে গমনাগমন এত বিপদজনক হইয়াছে।
২৭শে প্রাতে আমরা সুয়েজ উপসাগরে প্রবেশ করিলাম। আমাদিগের উভয় দিকেই ভূমি, সমুদ্রের জল যারপর নাই সুস্থির; উহার উপরিভাগ একখণ্ড প্রকাণ্ড কাচের ন্যায় বোধ হইল। আফ্রিকার পীতবর্ণ পাহাড় সকল দিবাকরের লোহিত কিরণ-জালে উজ্জ্বলিত এবং তাহার অতি পশ্চাতে ধুসরবর্ণ উচ্চতর শৈলশ্রেণী আমাদিগের নয়ন-পথ অবরোধ করিল। স্থানে স্থানে প্রস্তরময় দ্বীপচয় নয়নগোচর হইল। উহা নিরালয় ও অনুর্ব্বরা; একটাও বৃক্ষ কি লতাপল্লব দেখা যায় না। রাত্রি ১১ ঘণ্টার সময় আমরা সুয়েজে উপনীত হইলাম। রজনী অন্ধকারাবৃত, কিন্তু পোতাশ্রয়স্থিত জাহাজ ও ষ্টীমার হইতে বিনির্গত অসংখ্য দীপশিখা আমাদিগের নয়নানন্দদায়িনী হইল। আমরা সুয়েজের নিকট মূলতান ষ্টীমারকে ত্যাগ করিলাম। উক্ত জাহাজ অতীব সুন্দর, উহা দীর্ঘে ২৩২ হস্ত ও প্রস্থে ২৬ হস্ত। উহা জল হইতে ১২ হাত উচ্চ বটে, কিন্তু ঝড়ের সময় সমুদ্রের ঢেউ উহার উপর দিয়া চলিয়া যায়। আমরা অপর এক ষ্টিমারযোগে সুয়েজে পৌঁছিলাম এবং অপরাহ্ণে রেলগাড়িতে আলেকজাণ্ড্রিয়া নগর অভিমুখে চলিলাম। এ মিসরদেশীয় রেল শকট, সুতরাং তাহার সমুদয় বন্দোবস্ত গোলমাল; কেহই বলিতে পারিল না যে কখন গাড়ি ছাড়িবে। আমরা শকট মধ্যে সাধ্যানুসারে সহিষ্ণুতার সহিত কালযাপন করিতে লাগিলাম, গাড়ি আর ছাড়ে না। কখন ডং ডং করিয়া ঘণ্টা বাজে, কিন্তু সে শেষ ঘণ্টা নহে; কখন বংশীধ্বনি শুনা যায়, কখন বা গাড়ি একটু নড়িয়া চড়িয়া থাকে, কিন্তু তখনও ছাড়িবার সময় উপস্থিত হয় নাই। গাড়ির প্রহরীগণ সগর্ব্ব ও গম্ভীরভাবে ইতস্ততঃ যাতায়াত করিতেছে, গাড়ি এক স্থানেই রহিয়াছে, যেন পর্ব্বতের ন্যায় অচল। পরিশেষে প্রায় দেড় ঘণ্টার পর আমাদিগের দুঃখশান্তি করিতে গাড়ি চলিতে লাগিল, এবং আমরাও মহা কুতূহলে আলেকজাণ্ড্রিয়া নগর দর্শনে যাত্রা করিলাম।
প্রাতে আলেকজাণ্ড্রিয়া নগরের নিকট পৌঁছিয়া মাছিলা নাম্নী স্টিমারে উঠিলাম। কিন্তু উহা পরদিন প্রভাতের পূর্ব্বে যাইবে না শুনিয়া উল্লিখিত সৌন্দর্য্যশালী নগর সন্দর্শনে যাত্রা করিলাম। দেখিলাম পথ সকল প্রশস্ত, গৃহ সমুদায় বৃহৎ ও সুগঠন। আমরা শকটারোহণ পূর্ব্বক এক সুরম্য উদ্যান দিয়া পম্পীর স্তম্ভ দেখিতে গেলাম। উহার চতুর্দ্দিক অনাবৃত, মধ্যভাগে মর্ম্মর-প্রস্তর-বিনির্ম্মিত ৬৫ হস্ত উচ্চ সেই স্তম্ভ! উহা নির্ম্মল আকাশ স্বরূপ চিত্রপটে চিত্রিত এক গৌরবান্বিত ছবির ন্যায় বিরাজ করিতেছে। মিসরদেশীয় পৌত্তলিকতার সাক্ষ্য স্বরূপ দেবতাগণের প্রতিমূর্ত্তির কতই ভগ্নাবশেষ ঐ স্তম্ভের চতুষ্পার্শ্বে বিকীর্ণ রহিয়াছে এবং শত শত কি সহস্র সহস্র বৎসর পর্য্যন্ত তদবস্থায় পতিত আছে। যে দিকে নয়ন ফিরান যায়, সেই দিকেই কেবল ভগ্নাবশেষ ভিন্ন আর কিছুই দেখা যার না। যে জাতি একসময়ে সভ্য ও সৌভাগ্যশালী ছিল, তাহার গৌরবের পরিচয়-স্থান রাজপ্রাসাদ, মন্দির ও স্তম্ভ, রাজদরবার ও ধর্ম্মোৎসব প্রভৃতির চিহ্ন দর্শন করিয়া তৎসমুদায়ের নশ্বরত্ব মনে পড়; এবং জ্ঞান হয় যে, মনুষ্যের গৌরব রবমাত্র ও অহঙ্কার উন্মত্ততা ভিন্ন আর কিছুই নহে। যখন আমরা সেই স্থান ত্যাগ করিলাম, তখন প্রায় অন্ধকার হইয়াছে, এবং যত আমদিগের শকট চলিতে লাগিল, ততই ঐ স্তম্ভ উচ্চতর ও সন্ধ্যাকালীন ঈষৎ অন্ধকারাবৃত আকাশে খোদিত ছবির ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। এস্থান হইতে আমরা ক্লিওপেট্রার স্তম্ভ দেখিতে গেলাম। ইহাও মর্ম্মর-প্রস্তর-বিনির্ম্মিত, প্রায় ৫০ হস্ত উচ্চ, ও উহার অগ্রভাগ সূচাগ্রেরে ন্যায়। সন্ধ্যার সময় অতি সুখে পথে পথে ভ্রমণ করণানন্তর আমরা স্টীমারে আগত হইলাম; এ সময়ে মিসরদেশে বড় শীত, এমন কি পৌষ মাস মাসে কলিকাতায় যত শীত হইয়া থাকে, তদপেক্ষাও অধিক। মিসরের একভাগ শুদ্ধ বালুকাময় মরুভূমি, কিন্তু ডেল্টার ও নাইলনদীর তীরস্থ ভূমি, পৃথিবীর মধ্যে যত উর্ব্বরা ভুমি আছে, তাহাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। মীসরবাসীরা বলবান ও হৃষ্টপুষ্ট এবং গৌরবর্ণ। আলেকজাণ্ড্রিয়াতে কৃষ্ণবর্ণ ও কদাকার কাফ্রি, এবং আবিসিনিয়ান ও ইয়ুরোপীয়, বিশেষত ফরাসিদেশীয় বহুতর লোক বাস করে।
২রা এপ্রেল বেলা ১১৷৷৹ ঘণ্টার সময় আমরা মাল্টা দ্বীপে উপনীত হইলাম। আমার পক্ষে এই স্থানের দর্শন অভিনব পরিষ্কার প্রস্তরময় পথ, তাহার উভয় পার্শ্বে সুন্দর এবং সম নির্ম্মিত হর্ম্ম্যাবলী, বৃহৎ সুসজ্জিত দোকান এবং পথে ও বাজারে শুভ্রবদন হাজার হাজার লোকের সমাগম দেখিয়া শুনিয়া স্পষ্টই বোধ হয় যে, এ ইয়ুরোপদেশীয় নগর। এরূপ নগর আমি এই প্রথম দেখিলাম। আমরা শকটারোহণে একটা উদ্যানে গেলাম। পূর্ব্বে এই উদ্যান মাল্টার সুবিখ্যাত যোদ্ধা গণের নিবাসস্থান ছিল। ঘন, হরিদ্বর্ণ ও সুন্দর শ্রেণীবদ্ধ সাইপ্রেস বক্ষ বিরাজ করিতেছে, সুগঠন জলস্তম্ভ সমুদায় এখানে ওখানে বারি বর্ষণ করিতেছে, শীতল ছায়াময় এবং প্রস্তরনির্ম্মিত পথ এবং অগণনীয় লেবু ও কমলার বৃক্ষ দেখা বাইতেছে। কমলা বৃক্ষ হইতে সুপক্ব কতই কমলালেবু লম্বিত রহিয়াছে, দেখিলে নয়নের আনন্দ ও চিত্তের প্রফুল্লতা জন্মে। এখানে কমলালেবুকে রক্তকমলা কহে। উহার অভ্যন্তর সম্পূর্ণ বক্তবর্ণ। আমরা কতিপয় লেবু ভক্ষণ করিলাম, উহা কলিকাতার কমলা অপেক্ষা অধিক সুস্বাদু বোধ হইল। গবর্ণর সাহেবের প্রাসাদ দেখিবার উপযুক্ত বটে, তথায় একটি অপ্রশস্ত আগার মধ্যে মাল্টার অবিবাহিতা যোগিনীগণের কৃত সুশোভিত ও জীবিতের ন্যায় নানাবিধ ছবি সন্দর্শন করিলাম। ভূমণ্ডলের মধ্যে যেখানে যেরূপ বস্তু দেখিতে পাওয়া যায়, এমন কি গ্রীষ্মপ্রধান দেশজ তাল ও খর্জ্জুর বৃক্ষ ও কৃষ্ণবর্ণ মনুষ্য সকলই তন্মধ্যে চিত্রিত রহিয়াছে। ইংলণ্ডের রাজা চতুর্থ জর্জের এক প্রতিমূর্ত্তি আছে, তাহার পার্শ্বে দুইটা স্ত্রীলোকের ছবি, ইংলণ্ড ও মাল্টার সুরচিত প্রতিকৃতি। এই নারীদ্বয়ের অশ্বকেশর বিনির্ম্মিত তাজ ও হস্তে বর্শা আছে, ইহা দেখিতে অতি চমৎকার। আর মাল্টার সুবিখ্যাত বীরগণ, যাহারা দেশের দেশের স্বাধীনতারক্ষার্থে প্রাণদান করিয়াছেন, তাঁহাদিগের প্রতিমূর্ত্তিগুলি অপর এক গৃহে বিরাজিত আছে।
মাল্টা দ্বীপে সেণ্ট জনের যে একটা মন্দির আছে, উহার গঠন অতীব চমৎকার; এবং পরিশ্রম ও শিল্পকর্ম্মদ্বারা যে যে উৎকৃষ্ট বস্তু নির্ম্মিত হইতে পারে, তত্তাবতই তথায় আছে। গৃহের ভিতর গিয়া দেখি যে, উহার ছাদ অতি সুচারুরূপে চিত্রিত, চতুর্দ্দিকে ইটালীর প্রধান প্রধান শিল্পকার-গঠিত প্রতিমুর্ত্তি, এবং সম্মুখে স্বর্ণ ও রৌপ্য-খচিত সিংহাসনের ন্যায় জাজ্জ্বল্যমান একটা বেদি আছে, মেঝে শ্বেত প্রস্তরে নির্ম্মিত ও উহার নীচে মাল্টার বীরপুরুষগণের সমাধিস্থান। রোমান কেথলিক ধর্ম্মের বাহ্যাড়ম্বরই প্রধান অবলম্বন, বিবেচনাশক্তি তত অধিক নহে। সুগঠিত প্রতিমূর্ত্তি, সুরচিত চিত্র, শিল্পকার্য্যে নৈপুণ্য, এই সকল উপায় দ্বারাই তাহাদিগের মনে অনুতাপ, শ্রদ্ধা ও ভক্তির উদ্রেক হয়। অধিকন্তু ইটালীদেশীয়েরা অত্যন্ত ভাবুক এবং শিল্পবিদ্যায় ইয়ুরোপের অন্যান্য সকল জাতি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ; এবং তাহারা জাতীয় ধর্ম্ম রক্ষার নিমিত্তে মানসিক ভাব সঞ্চালন না করিয়া আর কোথায় করিবে। এই নিমিত্তেই ইটালীদেশীয় মন্দির সমুদায় চিত্র ও ভাস্কর কার্য্যে, সজ্জা, গাম্ভীর্য্য ও গৌরবে পৃথিবীর তাবৎ মন্দির অপেক্ষা উৎকৃষ্ট।
এই মন্দিরে দয়ার একটা প্রস্তরময় প্রতিমূর্ত্তি আছে, এক সীমন্তিনী যেন আপন শিশু সন্তানকে স্তনপান করাইতেছেন। আর আপন ক্রোড়স্থ সন্তানের মুখচন্দ্র অনিমিষনেত্রে নিরীক্ষণ করিয়া মাতার স্থির ও নিম্মলবদনে কি অনির্ব্বচনীয় সুশীলতা ও সুকুমার বাৎসল্যভাব প্রকাশ পাইতেছে। যতগুলি ছবি আছে, তন্মধ্যে মাইকেল এঞ্জিলো কর্ত্তৃক চিত্রিত খৃষ্টের জন্মস্থানের ছবি সর্ব্বোৎকৃষ্ট। ভূগর্ভস্থ এক গৃহে কএক জন সুপ্রসিদ্ধ লোকের সমাধিস্থান দেখিলাম। আরো দেখিলাম, চিরকুমারী যোগিনীগণ কোথাও বা প্রস্তর-গঠিত মূর্ত্তির নিকট, কোথাও বা চিত্রের নিকট উপবেশন করিয়া আপাদমস্তক কৃষ্ণবসনাবৃত হইয়া ও পুস্তক হস্তে লইয়া উপাসনায় নিবিষ্টা রহিয়াছে। অপরাহ্ণ ৩৷৷৹ ঘণ্টার সময় আমরা স্টীমারে প্রত্যাগত হইলাম এবং বেলা ৫টার সময় উহা মাল্টা দ্বীপ পরিত্যাগ করিল।
দাঁড়াইয়া জাহাজের বক্ষের উপর,
অনন্ত অর্ণব-বারি হেরি নিরন্তর।
সুদূরে ভূধর-খণ্ড নীলকান্তি ধরে,
আনন্দে সাগর-পক্ষী কলরব করে।
দেশ দেশান্তরে করি যদিও ভ্রমণ,
সতত হৃদয়ে জাগে স্বদেশ-ভবন!
হেরিয়াছি সিংহলের সুরভি কানন,
সুগন্ধেতে স্নিগ্ধ যথা বসন্ত পবন,
হেরিয়াছি এডেনের শৈলরাশি সার,
ঊর্ম্মিরাশি বৃথা বাহে করিছে প্রহার।
দেশ দেশান্তরে করি যদিও ভ্রমণ
সতত হৃদয়ে জাগে স্বদেশ-ভবন।
হেরিয়াছি পম্পীস্তম্ভ,—আকাশ ভেদিয়া
যুগ যুগান্তর হতে আছে দাঁড়াইয়া;
হেরিয়াছি মাল্টার মন্দির, কানন,
অনন্ত নিদ্রায় যথা সুপ্ত যোদ্ধাগণ;
দেশ দেশান্তরে করি যদিও ভ্রমণ
সতত হৃদয়ে জাগে স্বদেশ-ভবন!
যত দিন দেশে দেশে করিব ভ্রমণ
মাতৃভূমি! তব দুঃখে করিব রোদন।
হেরিয়া টেমস্ নদী কিম্বা দ্রুত রোন্
স্মরিব জাহ্ণবীকূল করিব রোদন।
দেশ দেশান্তরে করি যদিও ভ্রমণ
সতত হৃদয়ে জাগে স্বদেশ-ভবন!
সুন্দর বসন্ত।
সুন্দর বসন্ত এবে নব কান্তি ধরে
ক্ষেত্র, বৃক্ষ, পল্লবিনী, কিবা শোভা করে।
মাতৃভূমি! বসন্তেতে কিবা তব শোভা!
নিকুঞ্জ, কানন, পুষ্প, অতি মনোলোভা!
বৎসরের এই কাল অতীব সুন্দর
কোন্ ঋতু বসন্তের সম সুখকর!
বৃদ্ধের নয়ন পুনঃ প্রফুল্লিত হয়,
স্বপ্নসম বোধ হয় যৌবন সময়।
সুন্দর বসন্তকান্তি! শোভিল ধরায়
নিরানন্দ প্রবাসীর কি সুখ তাহায়!
মাতৃভূমি পরিহরি বিদেশে ভ্রমণ
অনন্ত সমুদ্র-বক্ষে করি পর্য্যটন।
চারি দিকে ঊর্ম্মিরাশি ভীষণ কল্লোলে
উল্লাসে প্রমত্ত যেন আস্ফালিয়া চলে।
প্রবল সাগর-বায়ু উচ্চরবে ধায়
প্রবাসীর কর্ণে যেন দুঃখ-গান গায়!
সুন্দর বসন্ত যথা জগতে পশিছে,
জীবন-বসন্ত মম যৌবনে উদিছে!
ঐ শোন! যশোদেবী ভৈরব নিস্বনে,
ডাকে মোরে, যুঝিবারে যশের কারণে।
সমর সময়ে কেন ভীরু চিন্তা করি,
দুরে যাক্ বিষণ্ণতা,—চিন্তা,—অশ্রুবারি।
নির্ভয়ে যুঝিব আমি যশের কারণ,
নাহি খেদ, হয় যদি শরীর পতন!
দূর হইতে জিব্রল্টার নগর ও পাহাড় নয়নগোচর হইল; বোধ হইল যেন, চিত্রপটে একটা সুন্দর আলেখ্য লিখিত হইয়াছে। এই নগরের আরব্য নাম জেবেল-আল্তারিক অর্থাৎ তারিকের পাহাড়—তারিক নামে এক মুসলমান সেনাপতি পূর্ব্বকালে স্পেন রাজ্য অধিকার করিয়াছিলেন। তাঁহারই নামে নগরের নাম হইয়াছে। তারিক যখন স্পেন রাজ্যে পদার্পণ করেন, তখন তাহার অনুচরেরা অপরিচিত পর্ব্বতময় স্থানে ও শতগুণ অধিক সেনাদলের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া অত্যন্ত ভীত হইয়াছিল; তাহাতে তারিক আপন সেনাগণকে কহিয়াছিলেন, “তোমরা কোথায় পলাইবে, সম্মুখে দেখ শত্রুগণ, পশ্চাতে ভীষণ সমুদ্র।” মুসলমানেরা আপনাদিগের ভীরুতা হেতু লজ্জিত হইয়া মহাবেগে শত্রুগণকে আক্রমণ করিয়া জয়লাভ করিল। তারিক যেখানে যত যুদ্ধ করিয়াছিলেন, তাহাতেই এই প্রকার সাহস প্রকাশ করিয়াছিলেন; এবং পরিশেষে তিনি স্পেনের প্রায় সকলাংশই স্বায়ত্ত করিয়াছিলেন।
জিব্রল্টারের পাহাড় ও দুর্গ দর্শনযোগ্য বটে। ঐ নগরের পথে পথে কিয়ৎক্ষণ ভ্রমণ করিয়া অপরাহ্ণ ৬ ঘণ্টার সময় আমরা স্টীমারে প্রত্যাবর্ত্তন করিলাম। পর দিন সেণ্টভিন্সেণ্ট অন্তরীপের নিকট দিয়া আসিলাম, তথায় অনেক বৃহদাকার পাহাড় এবং তাহার একটার উপর এক আলোক-স্তম্ভ আছে। রাত্রিকালে ফিনিষ্টর অন্তরীপ অতিক্রম করিয়া আসিলাম। ৯ই দিবসে ফ্রান্সের মধ্যে বেষ্ট্ নগরের নিকট উসাণ্ট অন্তরীপ জনগোচর হইল। এখানেও একটা সুগঠন আলোক-স্তম্ভ আছে। ১১ই দিবসে ওয়াইট দ্বীপের নিকট দিয়া গমন করিলাম। এই দ্বীপ দেখিতে অতি সুশ্রী, বোধ হয় যেন উহা এক বৃহৎ উপবন; উপবন বটে, কিন্তু মনুষ্যকৃত। ভারতবর্ষের ন্যায় এখানে বন, উচ্চ পল্লবময় বৃক্ষ, ঘন এবং সতেজ উদ্ভিদ দেখা যায় না। এখানে উৎকৃষ্ট উদ্যান, মনোহর হর্ম্ম্যশ্রেণী, হরিদ্বর্ণ ক্ষেত্র, সকল বস্তুই মনুষ্য-নিবাসের পরিচয় দেয়। ১১ই এপ্রেল পূর্ব্বাহ্ন ১১ ঘণ্টার সময় আমরা সৌদ্যম্টনে পৌঁছিলাম; এবং সন্ধ্যার সময় লণ্ডন নগরাভিমুখে যাত্রা করিলাম ও রাত্রিতে সেই সমগ্র পৃথিবীর রাজধানীতে উপস্থিত হইলাম।
পৃথিবীস্থ সর্ব্বত্রই জানা আছে যে, লণ্ডন অতি প্রকাণ্ড নগর। উহার নিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৪০ লক্ষ। গৃহ সমস্ত চারি পাঁচ তল, প্রথম তল প্রায়ই পথের তল অপেক্ষা নীচ। বাহিরের প্রাচীর সমুদয় ইষ্টকনির্ম্মিত ও গৃহের দেওয়াল সকল কাগজে মোড়া কাষ্ঠরচিত। লণ্ডনে অনেক প্রশস্ত উদ্যান আছে, উহা বিস্তৃত ও অবারিত-দ্বার। তথায় সুন্দর পথ, সুশোভন খাল, বৃক্ষ, উপবন, ও ফুলের চৌকা প্রভৃতি প্রমোদের দ্রব্য অনেক আছে। যখন অন্য কোন কায না থাকে, তখন কিয়ৎক্ষণ এই স্থানে ভ্রমণ করা আমোদজনক বোধ হয়। এতদ্ব্যতীত ছোট ছোট উদ্যান আছে, তাহা চতুর্দ্দিকে রেলের দ্বারা বেষ্টিত, মধ্যে নানাপ্রকার সুন্দর বৃক্ষ, পুষ্পের চারা ও পথ আছে। কিন্তু যাহারা উহার নিকটবাসী, তাহারাই উহার ভিতর যাইতে পারে। এই সমুদায়, লণ্ডন নগরের নিশ্বাস প্রশ্বাসের পথ বলিয়া পরিগণিত হয়, কারণ ইহারা না থাকিলে উক্ত নগর বাসের পক্ষে অস্বাস্থ্যজনক হইত। লণ্ডনের বাটী সকল পরস্পর অতি নিকট ও শ্রেণীবদ্ধ, এবং সকল ঘরই ক্ষুদ্র ও অপ্রশস্ত। বস্তুতঃ যাহা দেখা যায়, সকলই বোধ হয় যেন, কেবল শীত নিবারণের নিমিত্ত প্রস্তুত হইয়াছে। এখানে শীত অতি প্রবলপ্রতাপ এবং শুনিতে পাই যে, গ্রীষ্ম অতি অল্পায়ু। কিন্তু যখন গ্রীষ্মকাল সমাগত হয়, তখন তাহা নিবারণের কোন পন্থাই না থাকাতে এখানকার গ্রীষ্ম ঋতু অতি অসুখজনক। আকাশমণ্ডল অপরিষ্কার, দিবামান কুজ্ঝটিকাতে প্রায় অন্ধকারময়, এবং সর্ব্বদাই বৃষ্টিপাত হইয়া থাকে। কিন্তু অস্মদ্দেশে যেরূপ ধারাপাত হয়, এখানে সেরূপ নহে; কেবল বিরক্তিজনক গুঁড়ানি পড়িয়া থাকে। গ্রীষ্ম ব্যতীত অন্যকালে প্রায়ই সূর্য্যার মুখাবলোকন করিতে পাওয়া যায় না; উহা প্রায়ই কুজ্ঝটিকা বা মেঘান্তরালে লুক্কায়িত থাকে, কখন কখন স্বীয় রুগ্ন ও নিস্তেজ বদন বহির্গত করে। এখানে একটা প্রবাদ আছে যে, ফরাসিস্ দেশের কতকগুলি নিস্তেজ চন্দ্র লইয়া ইংলণ্ডের সূর্য্য সৃজিত হইয়াছে এবং তিন দিন মাত্র গ্রীষ্ম, ও একটা ঝড় হইয়া গেলে ইংলণ্ডে নিদাঘকালের অবসান হয়।
পুনশ্চ—এক্ষণে তাপমান যন্ত্রে ৫০ ডিগ্রি দেখিতেছি, উহা প্রায় কখনই ৮০ ডিগ্রির উপর উঠে না এবং অতি শীতের সময় পারদ যে ডিগ্রিতে গেলে জল জমিয়া যায়, তাহার ১০। ১২ ডিগ্রি নীচে আসিয়া পড়ে।
দ্বিতীয় অধ্যায়।
৯ই জুন দিবাভাগে লণ্ডন নগরের কিয়দ্দূরে সিডেনহেম প্রদেশের বিখ্যাত কাচের প্রাসাদ সন্দর্শন করিতে গিয়াছিলাম। উহা অতি বৃহৎ প্রকাণ্ড অট্টালিকা, পাতলা লৌহখণ্ডের গরাদিয়া দ্বারা সংযুক্ত চিক্কণ কাচখণ্ডে নির্ম্মিত। মধ্যদেশে একটা একাণ্ড খিলান ও তাহার উভয় পার্শ্বে দুইটা দালান আছে। সূর্য্যকিরণে যখন উহা ঝক্মক্ করিতে থাকে, তখন উহার দর্শন অতি চমৎকার। উক্ত প্রাসাদের বাহিরে সুন্দর উপবন, দুর্ব্বাদল আচ্ছাদিত ক্ষেত্র, প্রস্তরখণ্ড-বিনির্ম্মিত পদবী, ও জ্যামিতির আকারের ন্যায় অতি সুন্দররূপে নির্ম্মিত ফুলের চৌকা আছে। জলস্তম্ভ সমুদয় সূর্যকিরণে খেলা ও ঝক্মক্ করিতেছে, নরহস্ত-খাদিত সরসী-জলে পক্ষী সকল সন্তরণ করিতেছে, সুদর্শন বনমধ্যে শীতল ও নিভৃত পদবী সমস্ত বিরাজ করিতেছে, সুগঠন প্রস্তর-মূর্ত্তি সকল ইতস্ততঃ শোভা করিতেছে। ফলতঃ যে যে দ্রব্য কল্পনাশক্তি কি শিল্পবিদ্যা দ্বারা সৃজিত হইতে পারে, তৎসমুদয়ই এই স্থানের শোভা বৃদ্ধি করিতেছে। সতেজ লতা সমুদয় এই প্রাসাদের কাচময় প্রাচীরে উঠিয়াছে। অভ্যন্তরের যে দর্শন, তাহা আরো চমৎকার। উহার এক পার্শ্ব হইতে অপর পার্শ্ব পর্য্যন্ত একটা সুদীর্ঘ পথ আছে, শ্রেণীবদ্ধ প্রস্তুর-মূর্ত্তি তদুভয় দিকে রহিয়াছে, আর সতেজ লতা সমুদয় ছাদ হইতে নামিয়া নানা আকারে লৌহস্তম্ভ সকলে আশ্লিষ্ট হইয়া আছে, এবং সুন্দর জলস্তম্ভ সমস্ত ইতস্ততঃ বারিবর্ষণ করিতেছে, এবং নির্গত উজ্জ্বল জলরাশি অতিসুশোভন পাত্রে পতিত হইতেছে।
উহার মধ্যে যেখানে ছবি থাকে, তথায় বিক্রয়ার্থ নানাবিধ চিত্রপট ও প্রসিদ্ধ লোকের মূর্ত্তি সকল আছে। কিয়ৎক্ষণ সেই রমণীয় উপবনে ভ্রমণ করিয়া আমরা একখান নৌকা লইলাম, এবং নিবিড় অন্ধকার হওয়া পর্য্যন্ত আমরা সরোবরে নৌকা বাহিতে লাগিলাম। রাত্রি অধিক হইলে পুনরায় লণ্ডনে আসিয়া উপস্থিত হইলাম।
* * * * * *
নেপোলিয়ন বোনাপার্টি কহিয়াছিলেন যে, ইংরাজ জাতি কেবল দোকানদার। তিনি একথা বলিতেও পারিতেন যে, উহারা কেবল বিজ্ঞাপনদার। এদেশের লোক যে কি বিজ্ঞাপনপ্রিয়, তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না। যে স্থানে স্থলবিন্দু পায়, সেইখানে বিজ্ঞাপনপত্র সকল প্রদর্শিত হয়। রেলওয়ে ষ্টেশনে আর স্থান থাকে না, তথাপি লোকে সন্তুষ্ট নহে। তাহারা বেতন দিয়া লোক নিযুক্ত করে ও তাহার সম্মুখে ও পশ্চাতে বিজ্ঞাপনপত্র ঝুলাইয়া দিয়া নগর মধ্যে ভ্রমণ করিতে পাঠাইয়া দেয়। আহা! বাহকগণের কি সুখের চাকরী!!
* * * * * *
লণ্ডন নগরের পথে কতই চাতুরী ও প্রবঞ্চনার ব্যাপার দেখিতে পাওয়া যায়। একদা সন্ধ্যার সময়ে এক জন চীৎকার করিয়া কহিতেছে যে, পারিস নগর হইতে তারে এক ভয়ানক সংবাদ আসিয়াছে, সম্রাট নেপোলিয়ান দস্যুর হস্তে নিহত হইয়াছেন। আমরা ঐ সংবাদপত্র ক্রয় করিলাম; কিন্তু তাহাতে উক্ত সম্রাটের মৃত্যুর বিষয় কিছুই দেখিতে পাইলাম না। এইরূপে ইহারা অকর্মণ্য সংবাদপত্র ও মিথ্যা বাক্য বিক্রয় করিয়া বেড়াইতেছে। এই সমস্ত প্রবঞ্চনার কার্য্য দিবা দ্বিপ্রহরে হয় না, কুহাবৃত সায়ংকালে কখন কখন হইয়া থাকে।
* * * * * *
৮ই নবেম্বর প্রাতে শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিয়া দেখি, কি পথ, কি অট্টালিকা, কি উপবন, কি পাদপশ্রেণী, সকলই তুষারে আবৃত। বোধ হইল যেন, সকল পদার্থ রৌপ্যমণ্ডিত হইয়া রহিয়াছে। আমার পক্ষে ইহা এক অপূর্ব্বদর্শন সন্দেহ নাই।
* * * * * *
ইংলণ্ডের রাজকার্য্য সমাধার নিমিত্ত পার্লেমেণ্ট নামে এক সভা আছে। সেই সভার সভ্যেরা ৫।৭ বৎসর অন্তর বদল হয়। দেশের ভদ্রাভদ্র সকল লোক একত্রিত হইয়া, কাহাকে কাহাকে সভ্য করিলে দেশের হিত সাধন হইবে, এই বিবেচনা করিয়া ৫। ৭ বৎসর অন্তর এক একবার সভ্য নিরূপণ করে। এই সভ্য নির্ব্বাচনের নাম ইলেক্সন। বিগত পক্ষে অর্থাৎ নবেম্বর মাসের ৫ হইতে ২০ দিবস পর্য্যন্ত লণ্ডন নগরীতে ও সমগ্র বৃটিশ দ্বীপে পার্লেমেণ্টের সভ্য মনোনীত করণোপলক্ষে অতিশয় ঔৎসুক্য লক্ষিত হইয়াছিল, এবং সভ্য নির্ব্বাচনের দিনে লণ্ডন নগরে যে ব্যস্তসমস্ততা দেখিলাম তাহা অনির্ব্বচনীয় ও অবিশ্বাস্য। স্থানে স্থানে পথে পথে কতই ঘর নির্ম্মিত হইয়াছে; তথায় বহুলোক একত্রিত হইয়া আপন আপন মত প্রকাশ করিতেছে। পথে লোকারণ্য; সকলেই একত্রিত হইয়াছে—সকলেরই মুখে কেবল সেই সম্বন্ধীয় কথা। পার্লেমেণ্টের সভ্যপদপ্রার্থিগণ এখান হইতে ওখানে, এ ঘর হইতে ও ঘরে, অতিশয় চঞ্চলতা ও ব্যগ্রতা সহকারে যাতায়াত করিতেছে। ইলেক্সনের দিবস যত অবসান হইতে লাগিল, ততই সাধারণ লোকে, সন্ধ্যাকালে যাহা ঘটনা হইবে, তাহা অনুভব করিতে সমর্থ হইল; কেন না কোন্ প্রার্থীর জন্য কত লোকে সম্মত হইতেছে, তাহা প্রতি ঘণ্টায় শত শত সংবাদপত্রে প্রকাশিত হইয়া সাধারণের দুর্নিবার চিন্তা দূর করিতে লাগিল। পার্লেমেণ্টের সভ্যেরা ও দেশের সমস্ত লোক দুই দলে বিভক্ত। যাহারা দেশের পুরাতন রীতিনীতিতে আসক্ত, তাহাদিগকে কন্সরবেটিব্ বলে, ও যাহারা পরিবর্ত্তনে তৎপর তাহাদিগকে লিবরেল কহে। যদি কোন লিবরেল-প্রার্থীর অনুকূলে অধিকসংখ্যক মত দেওয়া সম্ভব বোধ হয়, তবে লিবরেল-প্রজাদিগের আহ্লাদ আমোদ এবং জাঁকের আর পরিসীমা থাকে না। যদি কোন কন্সরবেটিবের তদপেক্ষা অধিক মত পাওয়ার সম্ভাবনা প্রকাশ পায়, তবে কন্সরবেটিবেরা তাদৃশ আমোদিত ও উৎসাহিত হয়। ইংরাজমাত্রেই রাজ্যতন্ত্রে ও দেশের রাজকার্য্যে অত্যন্ত মনোযোগ দেন এবং যে,যে পরিমাণে কন্সরবেটিব বা লিবরেল, সে সেই পরিমাণে কন্সরবেটিব বা লিবারেলকে পার্লেমেণ্টে অধিষ্ঠিত করাইতে চাহে। বিলক্ষণ চিন্তা করিয়া দেখিলে এরূপ মনোযোগের এক অতি নিগূঢ় অর্থ আছে। এদেশের প্রত্যেক লোকেই আপনাকে জনসমাজের এক জন বলিয়া জ্ঞান করে, স্বজাতির অভিমানে অভিমান ও স্বদেশের সৌভাগ্যে স্বীয় সৌভাগ্য বোধ করে, এবং তন্নিবন্ধন কিসে স্বদেশের শ্রীবৃদ্ধি হয়, তৎপ্রতি একদৃষ্টে লক্ষ্য করিয়া থাকে। যদি এরূপ কোন আইন প্রচলিত হয়, যদ্দারা কোন সম্প্রদায়র মতে দেশের অনিষ্ট হইবার সম্ভাবনা, তবে সেই সম্প্রদায়ের ইংরাজেরা তাহা নিজের অমঙ্গলের ন্যায় জ্ঞান করে। দেশের অভ্যুদয়সাধন কিসে হইবে, তৎসম্বন্ধে সকল ইংরাজেই স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র মতাবলম্বন করে। এবং যদি কাহারও মতে কন্সরবেটিব কি লিবরলের দ্বারা সেই মনোভীষ্ট সাধিত হইবে বোধ হয়, তবে তিনি সেই পক্ষ অবলম্বন করেন। সুতরাং সকল ইংরাজই রাজনীতিজ্ঞ, এবং পার্লেমেণ্টে কিরূপ কার্য্য হয়, তৎপ্রতি একাগ্রচিত্তে মনোভিনিবেশ করিয়া থাকে। অতি সামান্য লোককেও জিজ্ঞাসা করিলে সেঠিক বলিয়া দিবে যে দেশীয় ঋণ কত; কাহার কর্ত্তক পার্লেমেটে কোন আইনের প্রস্তাব হইয়াছিল, এবং সংপ্রতি কোন্ আইনের কি কি দোষ গুণ আছে। ইংরাজেরা যখন স্বদেশের কোন প্রকার উৎকর্ষ সাধন করিতে ইচ্ছুক হয়, তখন তাহারা কতকগুলি লোক একত্র হইয়া সভা করে, বক্তৃতা করে, পুস্তক ছাপায়, সংবাদপত্র লেখে, এবং আপনাদিগের মতের পোষক পুস্তক সকল প্রকাশ করে। এবম্প্রকারে তাহারা সকল সম্প্রদায়ের লোককে স্বীয় মতাবলম্বী করিতে চেষ্টা করে। এই দলস্থ লোকেরা যদি বিলক্ষণ সবল হয়, তবে তাহারা পার্লেমেণ্টে আবেদন করে এবং যদি উক্ত সভার কোন সভ্য তাহাদিগের একমতাবলম্বী হয়েন, তবে তাঁহার দ্বারা তথায় নূতন ব্যবস্থার প্রস্তাব করায়। এরূপও ঘটিয়া থাকে যে, সেই প্রস্তাব প্রথম, দ্বিতীয় কি তৃতীয় বারেও অগ্রাহ্য হইয়া যায়; কিন্তু তাহাতে ভগ্নচিত্ত হওয়া দুরে থাকুক, তাহারা এরূপ সহিষ্ণুতা ও অধ্যবসায় সহকারে মনোথসিদ্ধি করিতে তৎপর থাকে যে, তাহা অনুভব করা অতীব দুঃসাধ্য। তাহাদিগের মনে এই বিশ্বাস যে, সাধারণের মতই স্বদেশের আইন, এবং যদি সাধারণ লোকে তাহাদিগের মতাবলম্বী হয় ও যত্ন প্রকাশ করে, তবে নিশ্চয়ই তাহাদিগের চেষ্টা ফলবতী হইবে। কিন্তু যদি তাহার বিপরীত ভাব লক্ষিত হয়, তবে তাহারা অগত্যা বিরত ও নিরস্ত হইয়া থাকে। এই প্রকারের সভা ইংলণ্ডদেশে যে কতই আছে, তহা গণনা করা দুঃসাধ্য, এবং তত্তাবতেই কীদৃশ সহিষ্ণুতা ও অধ্যবসায়ের সহিত কার্য্য করে, তাহা চিন্তা করিলে চমৎকৃত হইতে হয়। কখন এরূপও ঘটে যে, পূর্ব্ব পুরুষেরা যে কোন বিষয়ে লিপ্ত হইয়াছিল, কিন্তু চরিতার্থতা লাভ করিতে পারে নাই, পরপুরুষেরা সেই বিষয়ে মনোযোগ করে, ও লোকের মনোহরণ করিতে শিথিলপ্রযত্ন হয় না। ইংলণ্ডে প্রজার অভিমতই তাইন, এবং প্রজার মতদ্বারাই দেশ শাসিত হয়। মহারাণীর সাধ্য নাই, মহৎ লোকদিগের সাধ্য নাই যে, প্রজার মতের বিপরীত কার্য্য করেন। যদি পার্লেমেণ্টের সভ্যেরা বিরুদ্ধাচার করিতে চাহে, তবে আগামী ইলেক্শনের সময় প্রজাগণের মতাবলম্বী সভ্যদিগকে মনোনীত করিয়া বিপরীতাচারী সভ্য মুদয়কে দূরীভূত করিয়া দেয়। ইংলণ্ডীয় রাজতন্ত্রের এইরূপ অবস্থা, এবং এখানে প্রজাগণই দেশ শাসন করিয়া থাকে। অতএব বিচিত্র কি যে ধরাতলে তাহারা আমেরিকা ব্যতীত সর্ব্বদেশাপেক্ষা সমধিক পরিমাণে স্বাধীনতা-সুখ সম্ভোগ করে।
* * * * * *
অদ্য (২৫ শে ডিসেম্বর) সুখের বড়দিন ইংলণ্ডকে প্রমোদিত করিতে সমাগত হইয়াছে, এবং প্রাতে গিরিজাঘর হইতে নিঃসারিত উচ্চ ঘণ্টা-রব সর্ব্বত্রই প্রতিধ্বনিত হইতেছে। আমাদিগের দেশে পর্ব্বাহে যেরূপ হইয়া থাকে,এখানে তদ্রূপ হয় না। পথে লােক কি শব্দ মাত্র নাই, আপণ ও কার্য্যালয় সমুদয়ই বন্ধ, এবং চারিদিকে সকলই নিস্তব্ধ; কিন্তু যদি বড়দিনের প্রকৃত মূর্ত্তি সন্দর্শন করিতে ইচ্ছা করেন, তবে যদৃচ্ছা এক গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করুন, এবং তথায় কি হইতেছে তাহা দেখুন। তথায় পরিবারের সমস্ত লােকে একত্র হইয়া কত রঙ্গে আমােদ প্রমােদ করে।
* * * * * *
সে দিন বরফ পড়িয়াছিল। দেখিলাম কার্পাস তূলার ন্যায় সুন্দর তুষারবিন্দু ধীরে ধীরে ধরাতল-অভিমুখে পতিত হইতেছে। অল্পক্ষণ পরে তুষারবৃষ্টি ক্ষান্ত হইলে আমরা তুষারাবৃত পথে ভ্রমণ করিতে নির্গত হইলাম। আমাদিগের দেশে শীত ঋতু যে প্রকার, এখানে সে প্রকার নহে। সেখানে শীত কালে পরিষ্কারাকাশে সুর্য্যোদয় হয়, এখানে দুই কি তিন দিনের মধ্যে নভোমণ্ডলে নিস্তেজ পাণ্ডুবর্ণ ও ঘনাচ্ছাদিত একটি গােলাকার পদার্থ দেখিতে পাইলে সৌভাগ্য জ্ঞান করিতে হয়। সমস্ত দিনই কুজ্ঝটিকাময় ও অত্যন্ত শীতল, এবং আমাদিগের দেশের প্রচুর ধারাপাত পরিবর্ত্তে সকল দিন কেবল ছিপ্ছিপে গুঁড়ানি বৃষ্টিপাত হইয়া থাকে। যখন অসাধারণ শীতলতার প্রাদুর্ভাব হয়, তখন বারিবর্ষণ না হইয়া তুষারপাত হয়।
* * * * * *
অতঃপর আমরা বহুজনাকীর্ণ লণ্ডননগর পরিত্যাগ করিয়া এক পক্ষকাল সসেক্স প্রদেশে ইষ্টবোর্ণ ও হেষ্টিংস্ নামক সমুদ্রকুলস্থ নগরের দূর্ব্বাদলশোভিত ক্ষেত্রচয় দর্শন এবং পল্লীগ্রামের স্বাস্থ্যকর বায়ু সেবন করিতে মনস্থ করিলাম। ইংলণ্ড দেশীয় সমস্ত সমুদ্রকূলস্থ নগরে যাইবার নির্দ্দিষ্ট সময় আছে, সেই সেই সময়ে লণ্ডন এবং অন্যান্য নগর হইতে ভূরি ভূরি লোক তথায় সমাগত হয়। আর সেই সময় অতীত হইয়া গেলে, সেই সেই স্থান নিস্তব্ধ ও জনশূন্যপ্রায় হইয়া থাকে। ইষ্টবোর্ণ সর্ব্বকালেই নিস্তব্ধ, কিন্তু এক্ষণে অধিকতর নিস্তব্ধ, যেহেতু অদ্যাপি তথায় লোকের আসিবার সময় উপস্থিত হয় নাই। আপনাকে এই পত্র লিখিতে লিখিতে সুগভীর নীলোজ্জ্বল সাগরের শোভা-সন্দর্শন, সমুদ্রবারি-সম্পৃক্ত শীতল ও সুখকর বায়ু-সেবন, এবং অনিবার বীচিবাদন-শ্রবণসুখে মগ্ন রহিয়াছি। ফেনময় সাগরের জল উপলকীর্ণ বেলায় প্রতিঘাত হইয়া কখন পরাঙমুখ, কখন উচ্ছ্বসিত, কখন মগ্ন হইতেছে; সমুদ্রের সর্ব্বদাই পরিবর্ত্তন এবং সর্ব্বদাই একরূপ অবস্থা। বহুক্ষণ সমুদ্রের শুভ্র ফেনরাশি সন্দর্শন, কি উহার অবিরল সঙ্গীত-ধ্বনি শ্রবণ করিয়াও কেহ পরিতৃপ্তিলাভ করিতে পারে না; আমিও পারি নাই। গত কল্য ইষ্টবোর্ণের দুই ক্রোশ অন্তর বীচিহেড নামক স্থানে অমিরা সমুদ্রপথে গমন করিয়াছিলাম। সমস্ত পথই আমি দাঁড় বাহিয়াছিলাম; বীচিহেড-পর্ব্বত প্রায় ৫৭৫ ফিট্ উচ্চ। প্রখর রবিকরে সন্তাপিত হইয়া দুই ক্রোশ দাঁড় বাহিয়া যাওয়ার পর, তাহাতে আরোহণ করিতে বিলক্ষণ শ্রমানুভব করিয়াছিলাম। কিন্তু যখন তাহার শিখরে উঠিলাম, তখন চতুর্দ্দিকের শোভা সন্দর্শন করিয়া শ্রম সফল জ্ঞান করিলাম। বসন্তকালের নবদূর্ব্দাদল ও পাদপপুঞ্জ-মণ্ডিত ক্ষেত্রে ভ্রমণ, ইংলণ্ডের দক্ষিণপ্রদেশীয় শুভ্র পর্ব্বতে উত্থান, সন্ধ্যাকালে শৈলোপরিস্থ সমীরচালিত কল সকল সন্দর্শন, সরসীজলে ক্রীড়াসক্ত মরালবৃন্দের দর্শন, চাতক পক্ষীর সুমধুর সঙ্গীত শ্রবণ, উপলময় সাগরবেলায় সন্ধ্যাকালে ভ্রমণ এবং সমুদ-তরঙ্গমালার অবিরল ও মনোহর বাদ্য শ্রবণ—এই প্রকার মনোহর কার্য্যে আমরা এক্ষণে কাল হরণ করিতেছি।
ইষ্টবোর্ণের দুই ক্রোশ অন্তরে পেভিন্সি দুর্গের ভগ্নাবশেষ সংলক্ষিত হইল। উহার ছাদশূন্য ও লতামণ্ডিত কলেবর পুরাতন ঐতিহাসিক শোভায় পরিবেষ্টিত আছে, এবং যতকাল উহার শেষ প্রস্তরখণ্ড ধূলিসাৎ না হইবে, ততকাল সেই শোভা স্থায়ী হইবে। এয়ারি নামক সুবিখ্যাত অধ্যাপক বলেন যে, সীজার তাঁহার রোমীয় সৈন্য লইয়া এবং বিজেতা উইলিয়াম তাঁহার নর্ম্মাণ সেনা সমভিব্যাহারে প্রথমতঃ এই স্থানে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। আমরা উহার লতামণ্ডিত প্রাচীরে উঠিলাম, দূর্ব্বাচ্ছাদিত মেঝের উপর বেড়াইলাম, ভগ্ন বাতায়নতলে গেলাম, এবং অন্ধকারময় কারাগার সন্দর্শন করিলাম। যেখানে সেই অসভ্য সময়ে কতই বড় বড় লোক রুদ্ধ হইয়া ক্রমে কালকবলে কবলিত হইয়াছেন, এবং বোধ হয় কত বরাঙ্গনাও কারারুদ্ধ ছিলেন। যথায় কিরীটধারী কত মহোদয় আমোদ প্রমোণ করিয়াছিলেন, যথায় কুলীনপুত্রেরা এবং সম্মানিত সীমন্তিনীগণ লোকের আনন্দবর্দ্ধন করিয়াছিলেন, তথায় এক্ষণে তার কিছুই নাই; কেবল কতকগুলা কাকপক্ষী বাসা করিয়াছে, এবং উৎসধ্বনির পরিবর্ত্তে কেবল ‘কা’ ‘কা’ শব্দ প্রতিধ্বনিত হইতেছে, বোধ হয় যেন তাহার বিগত গৌরবকে চিতাশায়ী করিতে হরি সংকীর্ত্তন করিতেছে।
পেভেন্সি গ্রামে কতিপয় যৎসামান্য কুটীর, একটা গির্জা এবং একটা পান্থশালা আছে। আমরা যেমন সমুদ্রপথে পেভেন্সি গ্রামে গিয়াছিলাম, তেমনি আবার সমুদ্রপথে তথা হইতে প্রত্যাগত হইলাম; পথিমধ্যে মার্টিলো টাউয়ার্স সন্দর্শন করলাম। ১৮০৪ সালে যখন বোনাপার্টি ইংলণ্ড আক্রমণ করিতে কৃতসংকল্প হইয়াছিলেন, তৎকালে ইংরাজেরা কেণ্ট ও সসেক্স প্রদেশের দক্ষিণকূলে এই সমস্ত দুর্গ নির্মাণ করিয়াছিল।
আপনাকে শেষে যে পত্র লিখিয়াছি, তাহার পর হইতে আমরা রমণীয় ক্ষেত্রে বেড়াইতেছি, উত্তুঙ্গ শৈলে আরোহণ করিতেছি, এবং ভগ্ন দুর্গ সকল দেখিতেছি, কখন যদৃচ্ছা বেড়াইতেছি, কখন নৌকায় দাঁড় বাহিয়া যাইতেছি, কখন পল্লীগ্রামে দিনাতিপাত করিতেছি। সে দিন হর্ষ্টমন্সো দুর্গ দেখিতে গিয়াছিলাম। ইংলণ্ডের মধ্যে যত ভগ্ন দুর্গ আছে, তন্মধ্যে ইহা অতীব সুন্দর। মধ্যযুগের ইতিহাসে দুর্গ সমূহের যেরূপ অবস্থা বর্ণিত হইয়াছে, এখানে সেই প্রকারই দৃষ্টিগোচর হইল। সেই সেতু, সেই গড়, সেই মন্দির, সেই প্রহরীর স্থান, সেই ভয়ঙ্কর ভূগর্ভস্থ কারাগার, সেই সেই সমুদায়ই বিদ্যমান রহিয়াছে। আর লতাগুল্মাদি তদুপরি উঠিয়া উহাকে একান্ত মনোহর করিয়াছে।
সেণ্টলিনার্ড স্থানে কতকগুলা গিরিগুহা আছে; বোধ হয় তৎসমুদায় বাসের নিমিত্তে মৃত্তিকার ভিতর হইতে খোদিত হইয়াছিল; কিন্তু তথায় অধুনা আর কেহ বাস করে না। যে বৃদ্ধা স্ত্রী দুই হস্তে দুইটা বাতী লইয়া আমাদিগকে এই দর্শনযোগ্য স্থান দেখাইয়াছিল, তাহার পিতা এই সকল গুহা খোদিত করিয়াছিল। উক্ত স্ত্রীলোক বলিল যে, সে তাহার বাল্যাবধি যৌবনাবস্থা পর্য্যন্ত তথায় অবস্থিতি করিয়াছে।
* * * * * *
লণ্ডনে প্রত্যাগত হইয়া সে দিন মেডেম তুশোর দর্শনাগারে গিয়া কতকগুলি মোমের প্রতিমূর্ত্তি সন্দর্শন করিলাম, তাহা দেখিয়া অজ্ঞাত লোকমাত্রেই বোধ করিবে যে, তৎসমুদায় জাবিত স্ত্রী-পুরুষ—মোম নির্ম্মিত প্রতিমূর্ত্তি নহে। দর্শনকারীদিগের মধ্যে কোন কোন ব্যক্তিকে আমার কতবার মোমের প্রতিমূর্ত্তি জ্ঞান হইয়াছিল। তথায় প্রথম উইলিয়াম হইতে ইংলণ্ডের সমুদায় রাজার, বিখ্যাত গ্রন্থকার ও যাজকগণের প্রতিমূর্ত্তি আছে; যথা সেক্সপিয়ার, স্কট, নক্স্, ক্যাল্ভিন, স্কট্লণ্ডের রাজ্ঞী মেরী বলটেয়ার ইত্যাদি। তাহার এক স্থানে নেপোলিয়ন বোনাপার্টির ও তাহার চতুষ্পার্শ্বে তদীয় প্রসিদ্ধ সেনাধ্যক্ষগণের প্রতিমূর্ত্তি আছে।
* * * * * *
ইংলণ্ডের গৌরব-স্তম্ভ-স্বরূপ ওয়েষ্ট্মিনিষ্টর আবী নামক পুরাতন অট্টালিকা বিরাজ করিতেছে। তাহার অভ্যন্তরে ইংলণ্ডের সম্রাট্, যোদ্ধা, রাজনীতিজ্ঞ ও প্রাতঃস্মরণীয় কবিকুলের গোর-স্থান ও প্রস্তর-নির্ম্মিত প্রতিমূর্ত্তি দেখিয়া যে কি পর্য্যন্ত আনন্দিত হইলাম বলিতে পারি না। যিনিই ইংলণ্ডের ইতিহাস পাঠ করিয়াছেন বা ইংরাজী কাব্যরসে মুগ্ধ হইয়াছেন, তিনিই এই সকল দেখিয়া পরম প্রীতিলাভ করিবেন।
* * * * * *
গত রবিবারে নৌকাযোগে টুইকিন হেম নামক স্থানের নীচে দিয়া গেলাম। এই স্থান কবিবর পোপের বাসস্থান ছিল। এই খানে টেম্সনদী অতিশয় পরিষ্কার; লণ্ডনের নীচে যেরূপ, এখানে তদ্রূপ নহে। টেম্সের উভয় পার্শ্ব বসন্ত ঋতুর সমাগমে তৃণ বৃক্ষাদিদ্বারা পর রমণীয় শোভা ধারণ করিছে। ভারতবর্ষ অপেক্ষা ইংলণ্ডের শীতকাল অতি দীর্ঘ, প্রচণ্ড ও শ্রীহরণকারী। বৎসরের কয়েক মাস কেবলই বৃষ্টি, কুহা, বরফ তুষার, ও মলিন আকাশ দেখিতে পাওয়া যায়। বৃক্ষে পল্লব মাত্র থাকে না, এবং স্বভাবের মূর্ত্তি শ্রীহীন ও মৃতবৎ দেখায়। এইরূপ ভীষণ শীত ঋতু অন্তে বসন্ত যখন উজ্জ্বল আকাশ, উষ্ণকাল, নূতন পল্লব, মনোহর কুসুম, সুন্দর পক্ষী সঙ্গে লইয়া সমাগত হয়, তখন ইংলণ্ডের নিবাসিগণ আহ্লাদিত ও উল্লাসিত হয়। ভারতবর্ষে এই বসন্ত সময়ে উদ্ভিদের প্রাচুর্য্য হয়, সুকণ্ঠ ও সুরূপ নানাবিধ বিহঙ্গমগণ গান করিতে থাকে, আকাশমণ্ডল উজ্জ্বলাভা ধারণ করে; কিন্তু তদ্রূপ ঋতুপরিবর্ত্তনে ভারবর্ষে কিছুরই পরিবর্ত্তন বলিয়া প্রায় বােধ হয় না; যেহেতু তথায় শীতের প্রচণ্ডতা মাত্র নাই, সতত নির্ম্মল আকাশে সূর্য্যোদয় হয়, সকল বৃক্ষের পল্লব পড়িয়া যায় না, এবং নভােমণ্ডল প্রায় মেঘাবৃত হয় না।
এ সময়ে টেম্সনদীর উভয় তটই দূর্ব্বাদলে ও বৃক্ষাদিতে অপূর্ব্ব শােভা ধারণ করিয়াছে। আমরা হেম্প্টন-কোর্ট নামক প্রসিদ্ধ স্থানে আসিয়া পৌঁছিলাম। তথাকার রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরস্থ শয্যাগৃহ, সভাগৃহ এবং অনেক সু-চিত্রিত ছবি সন্দর্শন করিলাম। লণ্ডনে পৌঁছিতে রাত্রি অনেক হইয়া গেল।
* * * * * *
ইংলণ্ডের মধ্যে যাহারা বিলক্ষণ সুশিক্ষিত, তাহাদিগের চিন্তে খৃষ্টীয় ধর্ম্মের বন্ধন ক্রমেই শিথিল হইয়া আসিতেছে। বিচক্ষণ ও চিন্তাশীল ব্যক্তির মধ্যে অনেকেই খৃষ্টধর্ম্মাবলম্বী নহে। তাহাদিগের অবিশ্বাস দিন দিন নীচগামী হইতেছে বোধ হয়, এবং বিদ্বান যুবদল দেশের ধর্ম্মের প্রতি কিছু মাত্র আস্থা প্রকাশ করে না।
যাহাদিগের ঐ ধর্ম্মে বিশ্বাস আছে, তাহাদিগের মধ্যেও তদ্রূপ ভক্তি শ্রদ্ধা থাকিতে দেখা যায় না। তাহারা বাল্যবধি ঐ ধর্ম্মে বিশ্বাস করিতে শিক্ষিত হইয়াছে, ঐ ধর্ম্ম ধরাতলে প্রায় সর্ব্বত্রই প্রচলিত, এই জন্যই তাহারা বিশ্বাস করে। নচেৎ বিলক্ষণ বিবেচনা ও চিন্তাদ্বারা ঐ ধর্ম্মকে সত্য জ্ঞান করে নাই। পরিবারে উপরােধ করে, এই জন্যই অনেকে গর্জ্জায় যান, তথায় বক্তৃতা শুনিতে হয়, এই জন্য শ্রবণ করেন। গাঢ় ভক্তি অতি অল্পই দেখা যায়।
কিন্তু পল্লীগ্রামে এরূপ নহে। তথায় সে প্রকার বিদ্যার প্রচার নাই এবং অধিক পরিমাণে ধর্ম্মভীরুতা আছে। গ্রাম্য পুরোহিত একজন প্রধান ব্যক্তি এবং নিজাধিকারের মধ্যে তাঁহার মহা ক্ষমতা। তাঁহার পত্নী যদি ধর্ম্মপরায়ণা ও পরোপকারিণী হন, তবে সচরাচরই গ্রামস্থ লোকের বাটীতে যান এবং যাইয়া বহু পরামর্শ ও সদুপদেশ দেন। তিনি সর্ব্বত্রই আদৃতা। গ্রাম্য স্ত্রীলোক ও বালিকাগণ তাঁহাকে স্নেহের সহিত ভাল বাসে। তাহাদিগের অবকাশকালে তিনি প্রিয়সখী স্থানীয় হন, এবং আপদ বিপদের সময় তাঁহার বাক্য অনির্ব্বচনীয়া সান্ত্বনা বর্ষণ করে, কারণ তাঁহাকে সকলেই দেবতার ন্যায় ভক্তি শ্রদ্ধা করিয়া থাকে। গ্রাম্য লোকদিগের বাটীতে যাইয়া উপদেশ ও সচ্চরিত দ্বারা তাহাদিগকে কুপথ-গমনে বিরত করিয়া এবং দুঃখের সময় সান্ত্বনা-বারি সেচন করিয়া গ্রাম্য পুরোহিত ও তাঁহার প্রেয়সী উভয়ে যথাসাধ্য পরের উপকার করিয়া থাকেন।
তৃতীয় অধ্যায়।
গত ২১ শে জুলাই বেলা প্রায় ১০ টার সময় আমরা স্কট্লণ্ডে যাইবার মানসে লণ্ডননগর হইতে যাত্রা করিলাম। বহুদূর পর্য্যন্ত আসিয়াও দেখা গেল যে টেমস্নদী লণ্ডনের নীচে যেরূপ অপরিষ্কার ও জঘন্য, তথায়ও সেইরূপ। অগণ্য জাহাজ ও ধূমপােত ইতস্ততঃ যাতায়াত করিতেছে; উভয় পারে কতই কুঠী, কতই কার্য্যালয়, কতই বাণিজ্যালয় আছে; সর্ব্বদাই ধুম ও ধূলা উত্থিত হইতেছে; এবং তত্তাবতেই লণ্ডন নগরের সমধিক বাণিজ্য প্রাচুর্য্যের সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে। যাইতে যাইতে রূপান্তর দৃষ্টিগােচর হইল; ঐনদীর উভয় পারে সুবিস্তৃত পশুচারণ ও শস্যক্ষেত্র, তৃণাচ্ছাদিত ভূমি, সুন্দর তরুরাজি এবং হরিদ্বর্ণ তরঙ্গমালাকৃতি পর্ব্বত সমুদয় দেখা গেল। এবং তদুপরি গােমেষাদি যূথে যূথে সঞ্চরণ করিতেছে। কখন একটা দূরস্থ বৃহৎকায় কুঠী, কি বৃহদাকার হােটেল দেখা যাইতেছে, কখন বা শ্রেণীবদ্ধ রেলগাড়ী সমুদয় ঘর্ঘর শব্দে ধূমােদ্গীরণ করিতে করিতে নিঃশব্দ গ্রামের ও ক্ষেত্রের উপর দিয়া যাইতেছে। ক্রমে টেম্সনদীর জল স্বচ্ছ শ্যামলবণ বোধ হইতে লাগিল। এবং বেলা প্রায় দুই প্রহর বেলা প্রায় দুই প্রহর দুই ঘণ্টার পর, আমরা উক্ত নদী ছাড়িয়া জার্মাণ মহাসাগরে উপস্থিত হইলাম। রাত্রি ৯ ঘণ্টার সময় বহুজনাকীর্ণ ইয়ার্মথ নগর দেখিতে পাইলাম; তথা হইতে বিনির্গত শত শত আলোক নীল জলের উপরে খেলা করিতেছে, এবং দূরস্থিত ঐ নগরের মন্দির ও গির্জ্জার চূড়া সকল সন্ধ্যাকালীন ধুসরবর্ণ আকাশপটে সুচিত্রিত ছবির ন্যায় দেখাইতেছে। এক ঘণ্টার মধ্যেই আর কূল দেখা গেল না। প্রভাতে উঠিবামাত্র সাগর-তরঙ্গ-প্রপীড়িত ফ্রাম্ব্রো পর্ব্বত দৃষ্টিপথে পতিত হইল, অনতিবিলম্বেই আমরা স্বারবরো ও হইট্বি নামক দুই সুন্দর নগরের নীচে দিয়া আসিলাম। এতদুভয়ই সাগরকূলবর্ত্তী অতি উৎকৃষ্ট আরামের স্থান; এখানে প্রতি বৎসর ইংলণ্ডের নানাদিক হইতে শত শত লোক আসিয়া থাকে। ইয়র্কসিয়রের উপকূল শ্রেণীবদ্ধ পীতবর্ণ বালুকাময় শৈলরাজি দ্বারা নির্ম্মিত। অপরাহে স্কটলণ্ডের পর্বতময় উপকূল নয়নগোচর হইল। ফুত অফ্ ফোর্থ নামক সাগরশাখা দিয়া প্রবেশ করিবার সময় একটি সুন্দর অতি অদ্ভুতগঠন পর্ব্বত দৃষ্টিগোচর হয়, উহা সংখ্যাতীত জলচর পক্ষীর বাসস্থান। অতঃপর আমরা গ্রাণ্টন নগরে অবরোহণ করিয়া ২২শে জুলাই সন্ধ্যার সময় এডিনবর্গ নগরে উপনীত হইলাম।
এডিনবর্গ নগর স্কট্লণ্ডের রাজধানী। উহার বিস্তার লণ্ডন নগরীপেক্ষা কম,অধিবাসীর সংখ্যাও কম এবং বাণিজ্যও কম, তথাপি ঐ নগরের শোভা সমধিক মনোহারিণী। গৃহ সমুদয় অতি সুগঠিত। তাহার মধ্যে মধ্যে উচ্চ গিরি বিরাজ করিতেছে এবং অসংখ্য মন্দির-চূড়া ও পর্ব্বত-শেখর দ্বারা ঐ নগর অপূর্ব্ব শ্রীধারণ করিয়াছে। উহার একস্থানে সর্ ওয়াল্টর স্কটের স্মরণার্থে একটি স্তম্ভ নির্ম্মিত আছে। উহা ২০০ ফিট উচ্চ, কিন্তু সোপান-পরম্পরা দ্বারা উহার শিরে আরোহণ করা যায় না, কেবল ১৮০ ফিট পর্য্যন্ত উঠিতে পারা যায়। সেই পর্য্যন্ত উঠিলে পর সমুদায় নগরের শোভা দৃষ্টিগোচর হয়। ক্যাল্টন নামক পর্ব্বতের উপর নেল্সন, প্লেফায়ার, এবং ডিউগাণ্ট ইষ্টয়ার্টের স্মরণার্থ স্তম্ভ আছে। আর জাতীয়-মনুমেণ্ট নামক একটি স্তম্ভ প্রসিদ্ধ ওয়াটার্লুর যুদ্ধে হতজীবন বীরপুরুষগণের স্মরণার্থে নির্ম্মিত হইতেছিল, কিন্তু সম্পূর্ণ হয় নাই। এই পর্ব্বতের নিকট ডেবিড হিউমের স্মরণার্থ এক স্তম্ভ আছে। ক্যালটন গিরি ২২৪ ফিট, উচ্চ; উহার শৃঙ্গে উঠিলে চতুষ্পার্শ্বের অতিমনোহর দৃশ্য দর্শন-পথে পতিত হয়। উত্তরে ফৃত অফ ফোর্থ সাগরশাখার নীল জল এবং তাহার দক্ষিণতীরস্থ বহুজনাকীর্ণ গ্রাণ্টন, লিথ প্রভৃতি নগর; অপর পারে ফাইফ্সিয়রের দূরবর্ত্তী উচ্চ পর্ব্বতশ্রেণী। নীচে ও নিকটে নানা মন্দির-চূড়া ও উচ্চ অট্টালিকাশোভিত এডিনবর্গ নগর। দক্ষিণে পেণ্টলাণ্ড ও লেমারমুরের দূরস্থ নয়নপথরোধী পর্ব্বতশ্রেণী। ক্যালটন গিরির নিকটে রবার্ট বর্ন্সের স্মরণার্থ একটি সুন্দর অট্টালিকা আছে। উহার মধ্যে উক্ত কবিবরের জীবনসম্বন্ধীয় নানাবিধ বিচিত্র সামগ্রী আছে। উহার ভিত্তি সকল কবির স্বহস্ত লিখিত নানা পত্র দ্বারা মণ্ডিত। হস্তাক্ষর উত্তম নহে; পত্রগুলি অতি সরল ভাষায় লিখিত ও তাহার মধ্যে এক এক খান এরূপ পত্র আছে, যাহাতে প্রকৃত অকৃত্রিম কবিত্ব ও স্নেহ-রস পরিপূরিত আছে। বিশেষতঃ তন্মধ্যে ক্লারিণ্ডার উদ্দেশে যে একখানি পত্র লেখা আছে, তাহা পাঠ করিলে সহৃদয় পাঠকবর্গের নয়নযুগল অশ্রুজলে প্লাবিত হয়। এই ক্লারিণ্ডা উক্ত কবিবরের প্রেমাকাঙ্ক্ষিণী হইয়া নানা ক্লেশ পাইয়াছিলেন। তন্নিমিত্তে কবিবর একান্তমনে ঈশ্বর-সন্নিধানে ক্লারিণ্ডার বিরহাদি কাতরতার শান্তি হউক, এই প্রার্থনা সম্বলিত প্রগাঢ় ও অকপট স্নেহগর্ভ যে পত্র লিখিয়াছিলেন, আমরা তাহাও পাঠ করিলাম। অনন্তর কবিবরের পানপাত্র, মৃণ্ময় জলপাত্র, তরবারি, নস্যাধার, ত্রিপাদিকা প্রভৃতি কতই সামগ্রী দেখিলাম।
আমরা এখান হইতে হোলিরুড রাজপ্রাসাদ ও গির্জ্জাঘর এবং তদনন্তর এডিনবর্গনগরস্থ দুর্গ সন্দর্শন করিতে গেলাম। এই দুর্গ অতি পুরাতন এবং এক উচ্চ পর্ব্বতের উপরে নির্ম্মিত, তথায় উঠিবার এক পাশ দিয়া কেবল একটী পথ তাছে।
বারুদের আবিষ্ক্রিয়ার পূর্ব্বে এই দুর্গ অবশ্যই দুষ্প্রবেশ ছিল। ঐ দুর্গের মধ্যে স্কট্লণ্ডের রাজমুকুটাদি রক্ষিত হইতেছে।
এডিনবর্গের অধিবাসীর সংখ্যা ১৭৫০০০।
২৭শে প্রাতে আমরা এডিনবর্গ হইতে লিন্লিথ্গউ গ্রামাভিমুখে যাত্রা করিলাম। ঐ গ্রামে পর্ব্বত ও সুবিস্তৃত গোচারণভূমি বেষ্টিত কতিপয় গৃহ মাত্র আছে, তন্মধ্যে চতুর্থ কি পঞ্চম শতাব্দীর পূর্ব্বে বিনির্ম্মিত এক পুরাতন রাজবাটীর ভগ্নাবশেষ আছে। গ্রামে সেই একমাত্র দর্শনযোগ্য বস্তু ব্যতীত আর কিছুই নাই। ঐ প্রাসাদ অতি বৃহদাকার এবং সুগঠন এবং উহা যে সুরম্য স্থানে নির্ম্মিত, তাহাও ভাবিলে ইহা বিচিত্র বোধ হয় না যে, এককালে স্কট লণ্ডীয় নৃপতিগণের উহা অতিপ্রিয় বাসস্থান ছিল। ঐ অট্টালিকার নীচে একটা হ্রদ ও তাহার চতুষ্পার্শ্বে তৃণাচ্ছাদিত ক্ষেত্র, ও তরঙ্গাশ্রিত পাদপমণ্ডিত পর্ব্বতমালা এবং সুনীল সাগরশাখার দূরবর্ত্তী উচ্চ শৈলশ্রেণী বিরাজিত আছে। ঐ প্রাসাদের বৃহৎ বাতায়নতলে দণ্ডায়মান হইয়া সেই সুদৃশ্য ক্ষেত্রচয়, সেই হ্রদ ও সেই পর্ব্বত দেখিলাম। যে স্থান পুরাকালে প্রমেদোন্মত্ত নৃপতিগণের হাস্যরবে ও আনন্দিত সেনা-নিচয়ের আনন্দ কোলহলে প্রতিধ্বনিত হইয়াছিল, অধুনা সে স্থান নিস্তব্ধ ও নিভৃত হইয়া আছে। অতঃপর তথাকার বৃহদাকার সভামন্দির, ভোজনাগার ও পুরাতন গির্জার ভগ্নাবশেষ সন্দর্শন করিলাম। সেই সমস্ত ছাদশূন্য আগারের ভিতরে বেড়াইতে বেড়াইতে স্বপ্নবৎ মনে উদয় হয় যে, যে সমুদয় গতায়ু রাজা ও রাজমহিষীগণ ইতিপূর্ব্বে এই স্থানে অশেষ আমোদপ্রমোদে দিনপাত করিয়া গিয়াছেন, এক্ষণে তাঁহারা যেন ছায়ারূপে তথায় কখন ভ্রমণ করিতেছেন, কখন বা সচিন্তভাবে দণ্ডায়মান রহিয়াছেন।
রাজপ্রাসাদের চতুর্দ্দিকস্থ সেই সুন্দর হ্রদের নিকটে বহুক্ষণ ভ্রমণ ও তদনন্তর আহারাদি করিয়া আমরা তথা হইতে ষ্টরলিং নগরাভিমুখে যাত্রা করিলাম। আমরা যেখানে যে রূপেই কেন ভ্রমণ করি না, লিনলিথ্গো গ্রামের নিস্তব্ধতা, তত্রত্য গণ্ডগিরি, তৃণাচ্ছাদিত ক্ষেত্র, ভগ্নাবশিষ্ট রাজপ্রাসাদ, সুন্দর গির্জা ঘর কখনই বিস্মৃত হইতে পারিব না।
ষ্টরলিং নগর অতি ক্ষুদ্র, অধিবাসীর সংখ্যা ১২,০০০। বৈকালে আমরা ভ্রমণে বহির্গত হইলাম এবং অন্যমনস্ক হইয়া দেখিতে দেখিতে ও কথায় কথায় প্রায় ৫ ক্রোশ দূরে গিয়া পড়িলাম। ফোর্থ সাগরশাখার উপর এক অতি পুরাতন ও এক নূতন পোল আছে। ঐ শাখা লিনলিথ্গোর নীচে অতি পরিসর; ষ্টরলিং নগরের নীচে অতি সঙ্কীর্ণ। নদীর অপর পারে এক উচ্চ ও বন্ধুর গিরিশিখরে প্রসিদ্ধ উইলিয়ম ওয়ালেসের স্মরণার্থে এক অতি প্রকাণ্ড স্তম্ভ আছে। যে যোদ্ধাপতি স্কটলণ্ডের রক্ষাকর্ত্তা ও তাঁহার স্বাধীনতা সাধনে স্বীয় প্রাণদান করিয়াছিলেন, তাঁহার স্মরণ-স্তম্ভের নিমিত্ত উপযুক্ত স্থানই মনোনীত হইয়াছে। উহা বহুদূর হইতে দেখিতে পাওয়া যায়। ইহারই নীচে ষ্টরলিংএর ক্ষেত্রে ওয়ালেস্ প্রথমে জয়লাভ করিয়াছিলেন।
ষ্টরলিং দুর্গ এক উচ্চ ও দূরারোহ পর্ব্বতের উপর নির্ম্মিত। বন্দুক ও কামান সৃষ্টি হওয়ার পূর্ব্বা, উহা দুষ্প্রবেশ ছিল, সন্দেহ নাই। নীচে হইতে ঐ দুর্গ দেখিতে অতীব ভয়ঙ্কর। সেই উচ্চ ও বন্ধুর গিরি, যাহার শৃঙ্গোপরি ঐ দুর্গ শোভিত আছে এবং যাহার শৃঙ্গময় পার্শ্বদেশে বহুতর তরুবর শোভা পাইতেছে, সন্দর্শন করিলে নয়নযুগল তৃপ্তিলাভ করে। এক ঘণ্টার পর আমরা বনাক্বর্ণের ক্ষেত্রে উপস্থিত হইলাম। এই স্থানে স্কটলণ্ডীয়দিগের রণ-পতাকা উড্ডীন হইয়াছিল। প্রসিদ্ধ সেনাপতি রবার্ট ব্রুস্ এই প্রসিদ্ধ ক্ষেত্রে জয়লাভ ও ইংরাজদিগকে পরাস্ত করিয়া স্বদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করিয়াছিলেন।
মাসের ২৮ দিবসে আমরা ষ্টরলিং পরিত্যাগ করিয়া কালেণ্ডর নগরে উপস্থিত হইলাম। ঐ নগর উচ্চ এবং তুষারাবৃত পর্ব্বতের ক্রোড়স্থ। স্কটলণ্ড যে কীদৃশ পর্ব্বত ও জঙ্গলময় দেশ তাহার পরিচয় এখানেই প্রথমে পাওয়া যায়। ইহার কোন উচ্চ স্থানে দণ্ডায়মান হইয়া দেখিলে উচ্চ ও দুরারোহ পর্ব্বতশ্রেণী ব্যতীত আর কিছুই দেখিতে পাওয়া যায় না। কখন একটা ক্ষুদ্র গ্রাম কিম্বা তৃণাচ্ছাদিত ক্ষেত্র নয়নপথে পতিত হয় বটে, কিন্তু তাহার পর আবার অনন্ত পর্ব্বতমালা ও গগন-স্পর্শী শৈলশৃঙ্গ দেখা যায়। এই ভূমি কবিশিশুকে লালন পালন করিবার উপযুক্ত ধাত্রীস্বরূপ।
কালেণ্ডরের নিকটে একটা ভীম-নাদ জলপ্রপাত আছে। তাহা দেখিবার যোগ্য বস্তু বটে। মনে মনে চিন্তা করিয়া দেখুন যে, দুই পর্ব্বতশ্রেণীর মধ্যবর্ত্তী একটা গভীর সঙ্কীর্ণ পথে দণ্ডায়মান আছেন; দুই দিকের শৈল হইতে স্খলিত উপলখণ্ড ঐ বর্ত্মোপরি বিকীর্ণ আছে। পথে কেটী নাম্নী গিরিনদী ‘কুল কুল’ শব্দে ও চঞ্চলবেগে প্রবাহিত হইতেছে ও তাহার জল অতি উচ্চ দেশ হইতে নিম্নস্থ গভীর গহ্বরে নিপতিত হইতেছে। অনন্তর আমরা এক পর্ব্বত-শেখরে উঠিয়া অভ্রভেদী বেননেভিস পর্ব্বতশৃঙ্গ সন্দর্শন করিলাম উহা ২৮৮২ ফিট উচ্চ।
কালেণ্ডর হইতে ট্টোসাকে শকটযানে যাওয়া অতি আহ্লাদজনক। আমাদিগের গাড়ি গিরিনদী, হ্রদ ও উপতাকার নিকট দিয়া ধীরে ধীরে চলিতে লাগিল, দেখিলাম কেবল উচ্চ পর্ব্বতশ্রেণী ধূ ধূ করিতেছে। বোধ হইল যেন, দানবদল সেই দেশ রক্ষার্থ প্রহরীর ন্যায় দণ্ডায়মান রহিয়াছে।
অনন্তর আক্রে নামক হ্রদ ও ট্রোসাকে সন্নিধানে পঁহুছিলাম। এই স্থানের পর্ব্বত ও কতিপয় হ্রদ স্কটলণ্ডের মধ্যে যারপরনাই মনোহর এবং পথিবীতে যত রম্য স্থান আছে, তন্মধ্যে পরিগণনীয়। পর্ব্বতের উপরে পর্ব্বত এবং তদুপরি উচ্চশৃঙ্গে মন্দ সমরে দোদুল্যমান বৃক্ষ সমুদয় অদ্ভুত শ্রীধারণ করিয়াছে, তাহাতে আবার স্বচ্ছ স্রোতস্বতী ‘কুল কুল’ ধ্বনি করত পর্ব্বত হইতে ছায়াময় উপত্যকায় লম্ফ প্রদান পুরঃসর পতিত হইয়া সেই প্রদেশের শোভা সমধিক মনোহর করিয়াছে। আমরা প্রায় এক ঘণ্টা ট্রোসাক পর্ব্বতে ভ্রমণ করিলাম; বোধ হইতে লাগিল যেন প্রকাণ্ড প্রস্তররাশি আকাশে লম্বমান রহিয়াছে। তরু, লতা, গুল্ম ও বনপুষ্প যে কতই দেখিলাম, তাহার সংখ্যা করা দুঃসাধ্য।
এক ঘণ্টার মধ্যে আমরা কেটরীণ হ্রদের নিকটে উপস্থিত হইলাম এবং কি বিস্ময়কারিণী শোভা আমাদিগের নয়নপথে পতিত হইল। সেই শোভার যেরূপ চমৎকারিতা, বোধ হয় তাহার সদৃশ শোভা ভূমণ্ডলে অতি দুলর্ভ এবং তাহা অনুভব করাও নিতান্ত অসম্ভব। চতুর্দ্দিকে বন্ধুর উচ্চ গিরি হ্রদের তট হইতে গাত্রোত্থান করিয়াছে; হ্রদের অসংখ্য শাখা প্রশাখা নানাদিকে প্রবিষ্ট হইয়াছে। শত শত স্বচ্ছ গিরিনদী বেগে লম্ফদান ও নৃত্য করিতে করিতে শেখর হইতে শেখরান্তরে পতিত হইতেছে; বোধ হয় যেন হীরকরাশি এবং গলিত রৌপ্য ঝর্ঝর করিয়া পড়িতেছে ও হ্রদের স্থিরনীরে মিশাইয়া যাইতেছে। এখানে শব্দ মাত্র নাই। কি জল, কি স্থল, কি বৃক্ষ, কি পর্ব্বত, সকলেই নিস্তব্ধ; বোধ হয় যে ইন্দ্রজালের প্রভাবে সব নীরব হইয়া রহিয়াছে। প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে আমরা ঐ হ্রদের অপর পারে উপনীত হইলাম। তথায় একখান শকট আমাদিগের প্রতীক্ষায় ছিল, আমরা তাহাতে উঠিতে পর্ব্বতের উপর ও অধিত্যকার ভিতর দিয়া লামণ্ড হ্রদের নিকটে আসিলাম। এখানেও একটা সুন্দর জলপ্রপাত আছে। উহার ফেনময় জল অতি বেগে প্রায় ১৬ ফিট উচ্চ হইতে অধঃপতিত হইয়া ঐ হ্রদে পড়িতেছে। আমরা এক ধূমপোতে আরোহণ করিয়া কিয়ৎক্ষণের মধ্যে লামণ্ড হ্রদের অপর পারে পৌঁছিলাম। কেটরীন হ্রদের ন্যায় লামণ্ড হ্রদ দেখিতে সুন্দর বটে, কিন্তু ততদূর বিস্ময়কর নহে। তাহাতে সংখ্যাতীত সুদর্শন ও নানা প্রকার দ্বীপ আছে, যদ্বারা তাহার চিত্তগ্রাহিণী ও চমৎকারিণী শোভা সম্পাদিত হইয়াছে। তাহার তটস্থ ভূমি ঊর্ব্বরা এবং তাহার হৃদয়স্থ পীত ও হরিদ্বর্ণ দ্বীপচয় যার পর নাই সুন্দর।
অতঃপর রেলগাড়িতে আমরা তথা হইতে গ্লাসগো নগরে পৌঁছিলাম। ঐ নগর অতি বর্দ্ধিষ্ণু— অধিবাসীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লক্ষ।
বস্তুতঃ ঐ নগর স্কটলণ্ডের মধ্যে বাণিজ্য ব্যবসায়ের সর্ব্বপ্রধান স্থান, এবং উহাকে দেখিলেই বাণিজ্যের স্থান বলিয়া বোধ হয়। গ্লাসগো নগরের মধ্যে জর্জ স্কয়ার নামক স্থান অতি সুরম্য। ঐ স্থানের একদিকে রাণী ভিক্টোরিয়া ও অপর তাঁহার স্বামী আলবর্টের প্রতিমূর্ত্তি আছে, মধ্যস্থলের সর্-ওয়াল্টার স্কটের স্মরণার্থ এক স্তম্ভ নির্ম্মিত হইয়াছে। ২রা আগষ্ট প্রাতে সাত ঘণ্টার সময় এক অতি উত্তম ধূমপোতে উঠিয়া সাগরতীরস্থ ওবান নগরে উপস্থিত হইলাম। লণ্ডননগরের নীচে টেম্স নদ যেমন কদাকার, গ্লাসগোর নীচে ক্লাইড নদও তদ্রূপ। কিন্তু যাইতে যাইতে ক্লাইড নদের রূপান্তর লক্ষিত হইল। সে দিবস আকাশোপরি উজ্জ্বল প্রভাকর প্রভা বিতরণ করিতেছিল ও সমুদ্র-জল স্থিরভাবাপন্ন ছিল এবং আমাদিগের উভয় দিকের সুন্দর পর্ব্বত কখন দিবাকর-করে সমুজ্জ্বল, কখন বা তরু-ছায়াচ্ছিন্ন দৃষ্টিগোচর হইতেছিল। স্থানে স্থানে অতি প্রশস্ত তৃণাচ্ছাদিত ও শস্যপূর্ণ ক্ষেত্র-চয় ও উপত্যকার গৃহমণ্ডলী দেখা গিয়াছিল। ক্লাইড নদের শাখা দিয়া আমরা বহির্গত হইয়া উত্তরাভিমুখে এবং দক্ষিণে চলিলাম। বামে কান্টায়ের প্রায়োপদ্বীপ এবং দক্ষিণে স্কট্লণ্ড দেশ রহিল। ঐ প্রায়োপদ্বীপ পার হইয়া সমুদ্রে আসিয়া উপনীত হইলাম; তথায় একখান ধূমপোত ওবান নগরে লইয়া যাইবার অন্য আমাদিগের প্রতীক্ষায় ছিল। স্কট্লণ্ডের পশ্চিম কূল কিরূপ অনুর্ব্বর, বন্ধুর বিচ্ছিন্ন ও পর্ব্বত ময়, তাহা লিখিয়া কি জানাইব? যে দিকে নেত্রপাত করা যায়, সেই দিকেই সহস্র সহস্র সাগর-শাখা, অসংখ্য প্রস্তরময় দ্বীপ ও সহস্র তীর হইতে সমুত্থিত সুদীর্ঘ উচ্চ পর্ব্বতশ্রেণী নয়নপথে পতিত হয়। অপরাহ্ণে আমরা ওবান নগরে উপস্থিত হইলাম; ঐ নগর ক্ষুদ্র অথচ সুন্দর, এবং উহার পশ্চিমে উচ্চ গিরিশ্রেণী আছে,তন্নিমিত্তে সমুদ্র হইতেঐ নগর সন্দর্শন করিলে উহাকে অতি সুন্দর দেখায়। পরপ্রাতে আমরা এক ধূমপোতে উঠিয়া আইওনা ও ষ্টাফা দ্বীপ দেখিতে গেলাম। সকল পথেই উচ্চ ও বন্ধুর পর্ব্বতশ্রেণী দেখিতে দেখিতে চলিলাম, আরও দেখিলাম যে কাচোপম স্বচ্ছ নির্ঝর ঝর্ঝর্ করিয়া শৈল হইতে শৈলান্তরে পতিত হইতেছে। দূর হইতে বোধ হয় যেন সুচিক্কণ রৌপ্য তারের পুচ্ছ নির্ম্মল রবিকরে ঝল্মল্ ঝল্মল করিতেছে। অসংখ্য সাগরহংস সকল আমাদিগের ধূমপোতের পশ্চাতে আসিতে লাগিল এবং কখন তরঙ্গোপরে রঙ্গে সন্তরণ, কখন বা ক্ষণকাল জলমগ্ন থাকিয়া পুনর্ব্বার জলক্রীড়া করিতে লাগিল।
অনতিবিলম্বে আমরা আইওনা দ্বীপে উপস্থিত হইলাম; এস্থান খষ্টীয় ধর্ম্মের এক আদিম নিবাস বলিয়া প্রসিদ্ধ। কিন্তু যে পূতন পবিত্র দ্বীপ পূর্ব্বকালীন বাগী ধর্ম্মোপদেশকদিগের বক্তৃতায় প্রতিধ্বনিত হইয়াছিল ও যাহা নরপতি গণের মহা ধূমধাম সন্দর্শন করিয়াছিল, তাহা অধুনা কেবল ৫০০ শত নিঃস্ব অধিবাসীর বাসস্থান হইয়াছে।
অতঃপর আইওনা হইতে আমরা ষ্টাফা নামক বিজন ক্ষুদ্র দ্বীপ সন্দর্শন করিতে গেলাম, এখানে কতকগুলি অতি আশ্চর্য্যগঠন গিরিগহ্বর আছে; তন্মধ্যে ফিঙ্গলের গহ্বর সর্ব্বাপেক্ষা প্রকাণ্ড ও চমৎকার। উহার উপরে স্বাভাবিক পর্ব্বত খিলান দেখিলে এবং নীচে সমুদ্রের জলের অনবরত ভীষণ শব্দ শুনিলে বিস্ময়াপন্ন হইতে হয়। সে দিবস সাগর-নীর স্থিরভাবে থাকাতে আমরা একখান নৌকা করিয়া সেই গহ্বরের অভ্যন্তরে গিয়াছিলাম। গহ্বরের উভয় পার্শ্বের দেয়াল অসংখ্য বৃহদাকার স্বাভাবিক প্রস্তর-স্তম্ভ-নির্ম্মিত, আর .উহার বর্ণ নিবিড় শ্যামল হওয়াতে সেই গহ্বরের শোভা অতি ভয়ঙ্করী হইয়াছে। যতবার সমুদ্র-বারি সঘোষে গহ্বর মধ্যে প্রবিষ্ট হয়—তত বারই তথা হইতে দশ গুণ উচ্চ ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়।
৫ই আগষ্ট আমরা ওবান পরিত্যাগ পুরঃসর এক ধূমপোতে গ্লেন্কো নামক স্থান দর্শনমানসে গিয়াছিলাম; এই স্থানে তৃতীয় উইলিয়মের সময়ে এক অতি ভয়ঙ্কর নরহত্যাকাণ্ড হইয়াছিল। পর দিন তথা হইতে যাত্রা করিলাম ও বেন্নেবিশ নামক স্কট্লণ্ডের সর্বোচ্চ পর্ব্বতশেখর দর্শন করিয়া কালিডোনিয়ার খাল দিয়া ইনবার্ণেস নগরে যাত্রা করিলাম। কালিডোনিয়ার খাল দিয়া যাইতে যাইতে চতুর্দ্দিকের শোভা অন্ধকারময় তথচ রমণীয় দৃষ্ট হইল। আমাদিগের উভয় পাশ্বেই অবিচ্ছিন্ন শৈলশ্রেণী, তাহাতে আবার সে দিবস অতি অপরিস্কার হওয়াতে বোধ হইতে লাগিল যেন, দুই দিকের পর্ব্বতে সংলগ্ন এক শ্যামল চন্দ্রাতপ আমাদিগের মস্তকোপরি বিস্তৃত হইয়া আছে। কি অগ্রে, কি পশ্চাতে যে দিকে যত দূরে যাহা ছিল, সে সকলই তিমিরাবৃত। উপরে নবীন নীরদজাল, নীচে নীল জলরাশি ও দুই পারে অতি উচ্চ গিরিমালা ব্যতীত আর কিছুই নয়নপথে পতিত হইল না। সে শোভা ভয়প্রদ বটে, কিন্তু নিশ্চয়ই বলিতেছি যে, সে শোভার পরিবর্ত্তে কি সেই ঘনতর ঘনঘটার বিনিময়ে পৃথিবীর মধ্যে যেমনই কেন সুন্দর ও উৎকৃষ্ট স্থান হউক না, তাহা দেখিতে ইচ্ছা করি না। অনন্তর আমরা ফয়ার্শ স্থানের জলপ্রপাত দর্শন করিয়া ইনবার্ণেস্ নগরে পঁহুছিলাম।
ইনবার্ণেস নগর অতি ক্ষুদ্র; অধিবাসীর সংখ্যা প্রায় ১২,০০০। আমরা এই স্থানে দুই দিবস অতিপাত করিয়া ৯ই আগষ্ট প্রাতে এবার্ডিন নগরাভিমুখে যাত্রা করিলাম। এই নগর স্কট্লণ্ডের মধ্যে তৃতীয় এবং বস্তুতঃ অতি উত্তম স্থান। ইহাতে প্রায় ৮০,০০০ লোকের বাস। এখানকার সমস্ত গৃহ লোহিতপ্রস্তরনির্ম্মিত, তন্নিমিত্তে ইহার এক অদৃষ্টপূর্ব্ব সৌন্দর্য্য আছে এবং ইহার নিকটে উক্ত প্রকার প্রস্তরের বিস্তর পর্ব্বত দেখিতে পাওয়া যায়।
অনন্তর এবার্ডিন নগরে সুন্দর বাজার, পোতনির্ম্মাণের স্থান ও দর্শনোপযুক্ত আরো কয়েক বিষয় সন্দর্শন করিয়া উক্ত নগর পরিত্যাগ করিলাম, এবং প্রাতে দশ ঘণ্টার সময় এডিনবরো নগরে আসিয়া উপস্থিত হইলাম।
১৫ই সেপ্টেম্বরে আমরা ঐ নগর ত্যাগ করিয়া লিবন হ্রদে নিকটে গেলাম। ঐ হ্রদের মধ্যে একটা দুর্গ আছে। এই দুর্গে স্কটলণ্ডের প্রসিদ্ধ রাণী মেরী কিয়ৎকাল কারাবাসিনী হইয়াছিলেন। এই হ্রদের তীরে কিন্রস নামক এক গ্রাম আছে, আমরা ঐ গ্রাম হইতে নৌকাতে সেই দ্বীপে গেলাম। সেখানে উক্ত পুরাতন দুর্গের ভগ্নাবশেষ দেখিতে পাওয়া যায়। ঐ দ্বীপের আচ্ছাদন ও ভূষণ স্বরূপ সতেজ উদ্ভিদরাশি ভিতর দিয়া সেই দুর্গের উচ্চ চূড়া দূর হইতে দেখিয়ে পাইলাম। দ্বীপের নির্জ্জনতা বিস্ময়কর। এখানে জীব মাত্র নাই এবং সমুদ্রতরঙ্গের অবিশ্রান্ত গম্ভীর ধ্বনি ও নানা বিষ পাদপ-পত্রের মর্ম্মর শব্দ ব্যতীত আর কিছুই শুনিতে পাওয়া যায় না। পূর্ব্বে এই দুর্গ সুন্দর ছিল বোধ হয়। তাহার ভগ্নাবশেষের নিকট দিয়া যাইতে যাইতে কি উহার অনন্য নীরব গৃহের ভিতর বেড়াইতে বেড়াইতে সেই হতভাগিনী রাণীর কারাবাসের কথা অবশ্যই মনে পড়ে। আমরা সেই দিন এডিনবর্গ নগরে প্রত্যাবর্ত্তন করিয়া পরে ১৭ই সেপ্টেম্বরে তথা হইতে যাত্রা করিলাম।
বাষ্প-শকটে আরোহণ করিয়া অর্দ্ধ ঘণ্টার মধ্যে হথরণ্ডেন গ্রামে উপনীত হইলাম। সপ্তদশ খৃঃ শতাব্দীতে ড্রমণ্ড নামক যে কবি ছিলেন, এই তাঁহার প্রিয়তম বাসস্থান ছিল। আমরা তথাকার দুর্গ ও ভূগর্ভস্থ গর্ভ সন্দর্শন করিলাম। কথিত আছে যে, এইস্থানে রবার্ট ব্রুশ কিয়ৎকাল অবস্থিতি করিয়াছিলেন। এস্থান হইতে একটা অতি সংকীর্ণ ও গভীর পথ দিয়া আমরা রসলীনে উপস্থিত হইলাম। সেই পথের যে রূপ অপরূপ শোভা, তাহা বর্ণনা দ্বারা পরের হৃদয়ঙ্গম করা অতি কঠিন। উভয় পার্শ্বে প্রকাণ্ড শৈল সকল সরল ভাবে উথিত হইয়াছে, তন্মধ্যে গভীর সঙ্কীর্ণ পথ, উপরে গিরি-তরু অন্ধকার বিতরণ করিতেছে, এবং নীচে এস্কনাম্নী নদী তীরের ন্যায় দ্রুতবেগে প্রস্তরখণ্ডের মধ্য দিয়া কুল কুল ধ্বনি করতঃ সম্বাহিত হইতেছে। এই কান্তার হইতে বহির্গত হইয়া আমরা রসলীনে পৌছিলাম। তথায় একটা ভগ্ন দুর্গ ও পুরাতন গির্জা ঘর আছে। কথিত আছে যে, দ্বাদশ খৃঃ শতাব্দীতে এই ঘর নির্ম্মিত হইয়াছিল। উহার ভিত্তি ও ছাদ প্রস্তরনির্ম্মিত এবং ঐ ভিত্তিতে অতি সুচারুরূপে খোদিত নানা প্রকার মূর্ত্তি অদ্যাপি উত্তমাবস্থায় আছে, এবং একাল পর্য্যন্তও তথায় উপাসনা কার্য্য সম্পাদিত হইয়া থাকে।
রসলীন হইতে রেলগাড়ি যোগে আমরা মেলরোজ গ্রামে উপনীত হইলাম। স্কটের রচিত সুললিত একখানি কাব্য প্রকাশ হওয়া পর্য্যন্ত বিদেশীয় পর্য্যটকবগের এই নগর অতি প্রিয়তম দর্শনীয় স্থান হইয়াছে। তথাকার প্রসিদ্ধ অতি প্রকাণ্ড ভগ্ন মন্দির দেখিয়া চমৎকৃত হইলাম। উহার বাতায়ন সকল অতি উচ্চ, ভিত্তি লতামণ্ডিত, থাম ও খিলান সকল অতি উৎকৃষ্টরূপে খোদিত ও সুভূষিত। উহার চতুষ্পার্শস্থ, সমাধি স্থান অতি নির্জ্জন। শত শতাব্দী গত হইয়া গিয়াছে, নির্দ্দয় কাল কতই পীড়ন করিয়াছে, এবং নিষ্ঠুর সমরোৎসব উহাকে নষ্টশ্রী করিয়াছে বটে, কিন্তু তথাপি অদ্যাপিও যাহা আছে, তাহা দেখিলে দর্শকদল তাহার সমুচিত প্রশংসা করিয়া উঠিতে পারে না। উহার নির্ম্মাণের প্রস্তর অতীব কঠিন হওয়াতেই এতদিনে উহার ধার সকল চিক্কণ আছে এবং ভাস্করকর্ম্ম কিছু মাত্র বিলুপ্ত হয় নাই।
মেলরোজ গ্রামের নীচে প্রসিদ্ধ টুইড নদী, ঐ নদীর তট বস্তুতঃ অত্যন্ত সুন্দর। নিকটে শস্যপূর্ণ ক্ষেত্র, আয়ত গোচারণভূমি, তৃণাচ্ছাদিত শৈল, তদুপরি গোমেষাদি শয়ন করিয়া রহিয়াছে, ভুজঙ্গগতি নদী নিঃশব্দে প্রবাহিত হইতেছে, পরিষ্কার গৃহ সকল বনের মধ্য দিয়া অল্প অল্প দেখা দিতেছে, সমস্ত দিন পরিশ্রমের পর কৃষক একাকী ধীরে ধীরে গৃহাভিমুখে আগমন করিতেছে। মেলরোজের প্রায় দেড় ক্রোশ দূরে সর্ ওয়াল্টার স্কটের বাসস্থান; সেই স্থান সন্দর্শনার্থে গমন করিলাম। সেই সুন্দর ও প্রকাণ্ড অট্টালিকা টুইড নদীর উপর, তদীয় পাঠগৃহে অদ্যাপি তাঁহার ব্যবহৃত চৌকি ও টেবিল আছে, তাঁহার পুস্তকালয়ে বিশ হাজার পুস্তক আছে, এবং তৎসমুদয় অতি যত্নে রক্ষিত হইতেছে। সভাগারে তাঁহার ও তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র ও দুই কন্যার প্রতিকৃতি আছে। এখানে আর আর যে সমস্ত দ্রব্য আছে, তন্মধ্যে উপঢৌকন স্বরূপ নানা স্থান হইতে নানাপ্রকার যে সামগ্রীসমগ্র তিনি পাইয়াছিলেন, তাহাও দেখিলাম। তাঁহার অস্ত্রালয়ে যুগ যুগান্তরের ও দেশ দেশান্তরের, এমন কি পারস্য দেশীয় ও ভারতবর্ষীয় তরবারি পর্য্যন্ত নানাবিধ যুদ্ধাস্ত্র দেখিতে পাওয়া গেল।
অতঃপর ড্রাইবর্গে স্কটের সমাধি স্থান দেখিতে গেলাম। যাইবার সময় টুইড নদী পার হইতে হয়; ঐ নদীর সেখানে এরূপ প্রবল স্রোত যে, আমরা কি প্রকারে উহা পার হইব, তাহাই বিস্ময় ও উৎকণ্ঠার সহিত চিন্তা করিতেছিলাম; কিন্তু কি আশ্চর্য্য যে, একমাত্র কৌশলে আমরা সেই নদী স্বচ্ছন্দে পার হইলাম। সে কৌশল এই-নদীর উভয় তটে একটা লৌহরজ্জু নিবদ্ধ আছে এবং আর এক গাছ কঠিন রজ্জু দ্বারা পারাপারের নৌকা ঐ রজ্জুর সহিত বাঁধা আছে, সুতরাং ঐ নৌকা স্রোতে ভাসিয়া যাইতে পারে না। এবং উহাকে একভাবে রাখিয়া দিলে স্রোতের বেগে আপনই একপার হইতে অপর পারে গিয়া উপস্থিত হয়, একবারও দাঁড় কেলিতে হয় না। ড্রাইবর্গ নামক সমাধিস্থান যেরূপ পুরাতন ও পবিত্র বোধ হয়, তদ্রূপ স্থান আমি ইতিপূর্ব্বে দেখি নাই। ইহা দ্বাদশ শতাব্দীতে নির্ম্মিত হইয়াছিল। অধুনা সমাধি স্থান সমপুরাতন নানাপ্রকার লতা গুল্মদিতে আচ্ছাদিত হইয়াছে। এবং ইহারা উপযুক্ত প্রহরীর ন্যায় উহার গৌরব রক্ষা করিতেছে। ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত করিলে, এখানে একটা ভগ্ন খিলান, ওখানে একটা লতামণ্ডিত প্রাচীর, এবং কোথাও বা পতনোদ্যত মন্দির নয়নগোচর হয়। এই প্রকার একটা মন্দিরের নীচে সর্ ওয়াল্টার স্কটের মৃতদেহ সমাহিত আছে, এবং তাহার এক পার্শ্বে তদীয় প্রণয়িনী, অপর পার্শ্বে তাঁহার পুত্র এবং মধ্যে আড়ভাবে তাঁহার জামাতা মহানিদ্রায় নিদ্রিত আছে।
১৮ই তারিখ সন্ধ্যার সময় আমরা মেলবোজ পরিত্যাগ করিয়া কারলাইল নগর দর্শনে যাত্রা করিলেন। রেলগাড়িতে যাইতে যাইতে স্কট্লণ্ডের উর্ব্বরা ও শস্যাচ্ছাদিত নিম্নভূমির অদৃষ্টপূর্ব্ব নয়নরঞ্জিনী শোভা দর্শনপথে পতিত হইল। আমরা ইতিপূর্ব্বে কিয়ৎকালাবধি কেবলই উহার উচ্চ পর্ব্বতীয় প্রদেশ অনুর্ব্বর শৈল ও অতৃণাচ্ছাদিত ক্ষেত্রচয় সন্দর্শন করিয়া আসিতেছিলাম, সতরাং অধুনা এই শোভা অতীব মনোহারিণী বোধ হইতে লাগিল।
সন্ধ্যা ৮টার সময় আমরা কারলাইল নগরে উপনীত হইলাম। কারলাইল অতি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নগর; সকল গৃহই ইষ্টকনির্ম্মিত। ঐ স্থান ত্যাগ করিয়া কতিপয় ইংলণ্ডীয় হ্রদ দর্শনাকাঙ্ক্ষায় কেসুইক নগরে গেলাম। ইউরোপের মধ্যে সুইজারলণ্ড যেরূপ, ইংলণ্ডের মধ্যে কম্বরলণ্ড তদ্রূপ; ইহা কেবল পর্ব্বতের ও হ্রদের নিবাসস্থান। কেসুইক নগর পাহাড় পর্ব্বতে বেষ্টিত, ইহার শোভা কোন অংশেই স্কট্লণ্ডের উচ্চ প্রদেশের শোভা অপেক্ষা কম নহে। যে রজনীতে আমরা কেইক নগরে পঁহুছিলাম, সে রাত্রি যার পর নাই তমসাবৃত; অতি শীতল সমীরণ সন্ সন্ শব্দে সঞ্চালিত হইতেছে এবং যে দিকে নয়নপাত করা যায়, সেই দিকেই দূরস্থিত শ্যামজলধরবেষ্টিত গিরিশৃঙ্গ অল্প অল্প দৃষ্টিগোচর হয়, তাহাতে আবার দ্রুত বেগবতী ও বক্রগতি গৃটা নাম্নী নদী ভীষণ শব্দে আমাদিগের নিকটে প্রবাহিত হইতেছে। পর দিন প্রাতে আমরা ডারওয়েণ্ট-ওয়াটার হ্রদের পর পারস্থিত লডোর নামক বিখ্যাত জলপ্রপাত দর্শন মানসে নৌকা করিয়া যাত্রা করিলাম। এই জলপ্রপাত অতীব প্রশস্ত, ইহার জল অতি উচ্চ প্রদেশ হইতে বজ্রসদৃশ শব্দে নীচে পতিত হইতেছে, এবং প্রকাণ্ড প্রস্তরখণ্ড ইহার গতি অবরোধ করাতে তাহার সলিল ফেনিল ও অতি বেগবান হইয়াছে। অনন্তর আমরা ২০শে সেপ্টেম্বর দিবসে লণ্ডননগরে প্রত্যাবর্ত্তন করিলাম। উহা অতি অরমণীয়, উহার হাট বাজারে লোকারণ্য, উহার শকট সমুদয় বৃহৎ ও কুৎসিত, এবং উহ সহস্র সহস্র কার্য্যালয় ও বিলাসাবাসপূর্ণ হওয়াতেও তথায় আসিয়া অন্তঃকরণে এক অননুভূতপূর্ব্ব ভাবের উদয় হইল, সেভাব কেবল পূর্ব্ব-পরিচিত চির-বিরহিত বান্ধব সন্দর্শনে উপজিয়া থাকে।
চতুর্থ অধ্যায়।
সে দিন এমন ঘন কুজ ঝটিকাজালে লণ্ডন নগর আচ্ছন্ন হইয়াছিল যে, চারি হস্ত দূরস্থ কোন পদার্থই দেখিতে পাওয়া যায় নাই, এমন কি পথের এক ধার হইতে অন্য ধারে যাওয়া কঠিন হইয়াছিল। গৃহে প্রত্যাগমন কালে আমরা পথভ্রান্ত হইয়াছিলাম। কিয়ৎ হস্ত দূরস্থ আলোকও নয়নগোচর হয় না এবং কুহা ও তিমিরজাল জড়িত গ্যাসদীপের নিস্তেজ জ্যোতিঃ অতি নিকটবর্ত্তী হইলেই ক্রমশঃ নয়নগোচর হয়।
* * * * * *
বিগত ৫।৬ দিবস পর্য্যন্ত অতি প্রচণ্ড শীতের প্রাদুর্ভাব হইয়াছে, প্রায় প্রতিদিন বরফ পড়িতেছে, এবং পথ ঘাট গৃহ বৃক্ষাদি সমস্তই শ্বেতবর্ণ ধারণ করিয়াছে। সরসীর জল জমিয়া গিয়াছে ও তদুপরে কত লোকে যাতায়াত ও খেলা করিতেছে। মনে মনে ভাবিয়া দেখুন একটা অতি বৃহৎ জলাশয় বরফে জমিয়া দৃঢ় হইয়াছে ও শত শত লোক লোহার জুতা পরিয়া কখন সমান ভাবে কখন গোলাকারে কখন বা বক্র ভাবে বরফ কাটিয়া বেগে পরিভ্রমণ করিতেছে। তাহাদিগের গমনের বেগ ও কৌশল দেখিলে চমৎকৃত হইতে হয়। শুনিলাম কয়েক বৎসর পূর্ব্বে একটা সরোবরের জল এইরূপে জমিয়া গিয়াছিল ও তাহার উপর অনেক লোকে এই প্রকার খেলা করিতেছিল, অকস্মাৎ সেই বরফক্ষেত্র ভাঙ্গিয়া যাওয়াতে প্রায় তিন শত মনুষ্য জলমগ্ন হইয়া কালকবলে পতিত হইয়াছিল। তথাপি সকলে এই খেলায় এত আসক্ত যে, যে ব্যক্তি সেই দিবস ডুবিয়া মরিতে মরিতে অতি কষ্টে জীবন রক্ষা করিয়াছিল, সেই কহিয়াছিল যে, যদি দুর্ঘটনার পর দিন আবার জল জমিয়া যাইত, সে অবশ্যই আবার খেলা করিতে গমন করিত।
তুষারপাত দেখিতে অতি সুন্দর; সমস্ত নভোমণ্ডলে যেন রৌপ্যখণ্ড ভাসিয়া বেড়ায় ও ধীরে ধীরে ধরাভিমুখে পতিত হইতে থাকে।
* * * * * *
পূর্ব্বকালে ইংলণ্ডের লর্ডসম্প্রদায়ের (aristocracy) লোকেরা শান্তির সময় ব্যবস্থাপক ও যুদ্ধবিগ্রহের সময় সেনাধ্যক্ষ হইতেন। সে কালে কাযে কাযেই তাঁহারা সম্মান-ভাজন হইতেন; কিন্তু সে কাল আর নাই। তাঁহাদিগের ক্ষমতা ক্রমে হ্রাস প্রাপ্ত হইতেছে, তথাপি সাধারণ লোকে তাঁহাদিগকে পূর্ব্ববৎ সম্মান করিতে ত্রুটি করে না এবং মধ্যম শ্রেণীর লোকাপেক্ষা সামাজিক প্রভুতায় ও চিত্তৌৎকর্ষ বিষয়ে তাঁহারা অপকৃষ্ট হইয়া ও ইংলণ্ডের মধ্যে শ্রেষ্ঠবংশীয় বলিয়া আদৃত হইয়া আসিতেছেন। এই অপকৃষ্টতার কারণ দুষ্প্রাপ্য নহে। মধ্যবর্ত্তী লোকেরা এমত অবস্থায় জন্ম গ্রহণ করে যে, তাহাদের পরিশ্রমী ও যত্নশীল না হইলে চলে না। আপন আপন অবস্থা উন্নত করিতে ও যশখ্যাতি লাভ করিতে তাহাদিগকে পরিশ্রম করিতে হয়। তাহাদিগের অভ্যুদয়াকাঙ্ক্ষাও আছে এবং তাহারা যে অবস্থায় লালিত পালিত হয়, তাহা আলস্য ও ঔদাস্তের অবস্থা নহে। এদিকে উচ্চবংশীয় লোকেরা ধন মান লইয়া জন্ম গ্রহণ করেন, এবং তন্নিমিতেই নির্ব্বোধ লোকের পূজনীয় হয়েন। যেরূপ কর্ম্ম কার্য্য ও ভাবনা চিন্তা থাকিলে চিত্তের উৎকর্ষতা সম্পন্ন হইতে পারে, তাহা তাহাদের নাই; কেবল অর্থ ও অভিমান আছে। অতএব ইহা আশ্চর্য্যের বিষয় নহে যে, তাঁহারা ধনাধিক্য ও বিলাস-পারিপাট্য ব্যতীত আর সকল বিষয়েই মধ্যমশ্রেণীয় জনাপেক্ষা অনেক নিকৃষ্ট। উচ্চবংশীয়েরা বুঝিয়াছেন যে, তাঁহাদিগের প্রভুত্ব দিন দিন খর্ব্ব হইয়া আসিতেছে ও আর্য্য সভার আর পূর্ব্ববৎ ক্ষমতা নাই; কিন্তু তাহা জানিয়া কি করিবেন এবং যে সাধারণ উন্নতি ও স্বাধীনতা ইউরোপে দিন দিন বৃদ্ধি পাইয়া লোকের হিতসাধন করিতেছে, তাহার বিরুদ্ধাচরণ করিয়াই বা কি করিবেন? তাঁহারা অগত্যা বাহ্য সম্মানে সন্তুষ্ট হইতেছেন। ইংলণ্ডের সর্বোচ্চশ্রেণীর কথা এই পর্য্যন্ত বলিয়া সর্ব্বনিম্নশ্রেণীস্থ অর্থাৎ শ্রমোপজীবী লোকদিগের কথা কিছু বলিতেছি। আমি আপনাকে বারম্বার বলিয়াছি যে, এক জন বিদেশীয় লোক ইংলণ্ডে আসিলে সর্ব্বত্রেই স্বাধীনতা ও স্বাবলম্বনের ভাব জাজ্জ্বল্যমান দেখিয়া চমৎকৃত হয়। ইংলণ্ডীয় ভৃত্য ও শ্রমীদিগেরও সাতিশয় আত্মমর্য্যাদা ও স্বাধীনতা আছে, তন্নিমিত্তে প্রভু ভৃত্যের প্রতি এত সদ্ব্যবহার করিয়া থাকে যে, পূর্ব্বদেশে কেহ সেরূপ দেখে নাই ও শুনে নাই। এখানকার ভৃত্যগণ ভক্তি সহকারে উত্তমরূপে কার্য্য করিবে, কিন্তু তোষামোদ বা ন্যূনতা স্বীকার করিবে না; কারণ তোষামোদ তাহার চুক্তির মধ্যে নাই।
এই স্বাধীনতা তাহাদিগের অনেক সদ্গুণের প্রসূতি স্বরূপ হইয়াছে। কারণ অতি কঠিন দুষ্পালনীয় নিয়মবলীর কিঞ্চিন্মাত্র অন্যথচার হইলেই যদি দণ্ড প্রাপ্ত হইতে হয়, তবে লোকে শাস্তির ভয়ে অগত্যা মিথা বলিতে ও ওজর করিতে শিখে। মিথ্যা, চাতুরী ও ভীরুতা, পরাধীনতার সহচর; সত্য, সারল্য ও সাহস স্বাধীনতার সঙ্গী।
কিন্তু এই সমস্ত সদ্গুণ থাকাতেও ইংলণ্ডীয় নিম্ন-শ্রেণীস্থ লোকদিগের চরিত্র কতিপয় বিষম দোষে দূষিত। তাহাদিগের মব্যে সুরাপান ও কলত্র-পীড়ন অত্যন্ত প্রবল, তাহাদিগের স্বাধীনতা অনেক সময়ে উগ্রতায় পরিণত হয়, এবং অমিতব্যয়িতা জন্য তাহারা দরিদ্রতা-নিবন্ধন মহা ক্লেশ ভোগ করিয়া থাকে। ইংলণ্ডের মধ্যে ইহারাই কেবল অশিক্ষিত এবং স্ব স্ব অবস্থার শ্রীবৃদ্ধি সাধন করিতে অসমর্থ, তন্নিমিত্তে ইংলণ্ডীয় সকল শ্রেণীস্থ লোকদিগকে শিক্ষাদান করণোদ্দেশে নানা উপায় অবলম্বিত হইতেছে।
বিদ্যা ও বিষয়-বোধাভাবে এই সকল লোকদিগের মধ্যে যে যে দোষ জন্মিয়াছে, তন্মধ্যে অগ্র পশ্চাৎ না ভাবিয়া দারপরিগ্রহ করা এক অতি প্রধান দোষ। ইংলণ্ডে উচ্চ ও মধ্য শ্রেণীর লোকের আত্মাভিমান থাকাতে তাহারা স্ত্রী পরিবারের সমুচিত ভরণ-পোষণের উপায় অগ্রে না করিয়া উদ্বাহ-শৃঙ্খলে বদ্ধ হয় না। নীচ লোকের মধ্যে এ বুদ্ধি নাই, সুতরাং তাহার তন্নিমিত্তে বিষময় ফল ভোগ করে। লণ্ডন নগরের যে শ্রমী বহুপরিবার-বেষ্টিত, সে উচ্ছৃঙ্খলস্বভাবাপন্ন হইলে তাহার পৈশাচিক নিষ্ঠুরতা কোন্ পাষাণহৃদয়কে বিদীর্ণ না করে? তাহাদিগের বাসস্থলে প্রবেশ করিলে দেখা যায়, একটা ধূম-কলুষিত অপ্রশস্ত পথের পার্শ্বে একটি ক্ষুদ্র ঘরে এক পরিবারস্থ অনেক গুলি লোক একত্রিত হইয়া রহিয়াছে;—বৃদ্ধ মাতা পঞ্চদশবর্ষীয়া যুবতী কন্যা হইতে ক্রোড়স্থ শিশু-সন্তান পর্য্যন্ত লইয়া সেই অতি ক্ষুদ্র জঘন্য ঘরটিতে ঘেষাঘেষি করিয়া বসতি করিতেছে; কাচের ভগ্ন কবাট প্রচণ্ড শীতানিল নিবারণে অসমর্থ, অতি প্রয়োজনীয় আহার, অত্যাবশ্যক বস্ত্র, ও সুখসেব্য বহ্নি অভাবে তাহারা যে বিসদৃশ দুঃখভোগ করে, তাহা অস্মদ্দেশীয় নিতান্ত নিঃস্ব লোকের দ্বারের নিকটেও যাইতে পারে না। কিরূপে সেই বৃহৎ পরিবার প্রতিপালন করিবে, তাহা ভাবিয়া গৃহস্বামী দশ দিক শূন্যময় দেখে। এবং ক্রমাগত এইরূপ দরিদ্রতা নিবন্ধন কষ্টভোগ করিয়া তাহার হৃদয় পাষাণ সমান হইয়া উঠে ও সে আপন গৃহে সুখ না পাইয়া অন্যস্থানে সুখাম্বেষণে গমন করে। সে স্থান কোথায়? কেন, লণ্ডন নগরেতে সুরাপানের স্থানের অভাব নাই; সে স্থান গ্যাসের আলোকে সমুজ্জ্বল, তথায় উত্তম আসন আছে ও সুখসেব্য বহ্নি আছে। সেই খানে দীনদুঃখী মজুরগণ মদ্যপান করিতে আকৃষ্ট হয়, ও দৈনিক অল্প উপার্জ্জন হইতে চিন্তানিবারিণী সুরাপানে কিছু কিছু ব্যয় করে, এবং ক্রমে গৃহত্যাগী হইয়া প্রকৃত মাতাল হইয়া উঠে। তাহার পর কি করে? আহা! যে ভয়ঙ্কর কাণ্ড করে, তাহা বর্ণনা করাই দুঃসাধ্য; সুরাপান করিলে মনুষ্যের হৃদয়স্থ সমস্ত পৈশাচিক প্রবৃত্তি উত্তেজিত হয়। নিরন্না স্ত্রী ও ক্ষুধার্ত্ত সন্তানগণের হৃদয়-বিদীর্ণকারী হাহাকার শব্দে বিরক্ত ও জ্বালাতন হইয়া সুরাপানোন্মত্ত গৃহস্বামী বিষম নির্দ্দয়তা প্রকাশ করিতে আরম্ভ করে; এই সকল গৃহে মৃত্যু সতত অতিথি। কুপরিচ্ছদ ছোট ছোট বালকবৃন্দ ভাবি সাংসারিক সুখে জলাঞ্জলি দিয়া পথের ভিখারী হইয়া পথিকগণের নিকট দুই এক পয়সা, ভিক্ষা পাইয়া প্রদীপ্ত জঠরানল কথঞ্চিৎ নির্ব্বাণ করে।
যাহা বর্ণনা করিলাম, তাহা অত্যুক্তি জ্ঞান করিবেন না, তবে এই মাত্র বলা উচিত যে, লণ্ডনের সকল মজুরেরা এরূপ নহে। তাহাদিগের মধ্যে যাহারা অতি মন্দ, উল্লিখিত বিবরণে তাহাদিগকেই লক্ষ্য করা গিয়াছে।
পল্লীগ্রামস্থ শ্রমীগণের অবস্থা কিছু ভাল, তাহাদিগের মধ্যে সুরাপান যে নাই, এমন কথা বলা যায় না। তবে তাহা তত অধিক নহে, এবং নগরের লোক তাহাতে আসক্ত হইয়া যে পরিমাণে পরিবারের সুখ দুঃখ নিরপেক্ষ হয়, পল্লীগ্রামস্থ লোকের কোন ক্রমেই তদ্রূপ হইতে পারে না। তথাকার কোন ভবনে যদৃচ্ছাক্রমে প্রবেশ করিলে, যাহা দৃষ্টিগোচর হয়, তাহা লোচনানন্দদায়ক সন্দেহ নাই। দেখা যায়, মাতা সন্তানগণ লইয়া অবিসম্বাদে বাস করিতেছে, এবং দীনভাবাপন্ন হইলেও বালক বালিকাগণের আস্যদেশ স্বাস্থ্যজনিত সুরঙ্গে রঞ্জিত রহিয়াছে। তাহারা সচরাচর রুটি ও পনির এবং সপ্তাহ মধ্যে দুই কি তিন দিন মাত্র মাংস খাইতে পায়। ইংলণ্ডের কোন বোন স্থানে পল্লীগ্রামস্থ কৃষকপত্নীগণ একটা শূকরশাবক ক্রয় করিয়া তাহাকে যত্নে প্রতিপালন করে, এবং যখন সে বিলক্ষণ হৃষ্টপুষ্ট হয়, তখন তাহাকে বধ করিয়া তাহার মাংস সযত্নে রাখিয়া দেয়, এবং সময়ে সময়ে তাহা হইতে এক এক ক্ষুদ্র টুকরা কাটিয়া লয়; এই মতে একটা শূকরশাবক সমস্ত পরিবারকে বর্ষাবধি মাংস যোগাইয়া থাকে, এতদ্ভিন্ন তাহারা প্রায় অন্য মাংস ক্রয় করিতে পারে না। ইংলণ্ডের ভূস্বামীরা অস্মদ্দেশীয় ভূম্যধিকারীগণ অপেক্ষা সুশিক্ষিত ও ভাল লোক বলিয়া বিপৎকালে প্রজাগণ তাহাদিগের সাহায্য ও আনুকূল্য প্রার্থনা করে, এবং তাহাদিগের প্রার্থনা প্রায়ই নিষ্ফলা হয় না। প্রতি রবিবারে সুবেশ গ্রাম্য লোক ও তাহাদিগের বিকসিত-কুসুম-সদৃশ কন্যাগণকে ভূস্বামী সহ গির্জা ঘরে সমবেত হইতে দেখা যায়। তাহা দেখিলে তন্তঃকরণে বিশুদ্ধ সুখের সঞ্চার হইয়া থাকে।
* * * * * *
সে দিন অক্সফোর্ড ও কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণের বাইচ খেলা দেখিতে গিয়াছিলাম। যাঁহারা এরূপ বাইচ খেলা স্বচক্ষে দর্শন না করিয়াছেন,তাঁহারা অনুভব করিতে পারিবেন না যে, ইংলণ্ডের লোকেরা এই বাৎসরিক পর্ব্বে কি পরিমাণে আমোদ ও উৎসাহ প্রকাশ করে। এই কার্য্যোপলক্ষে টেম্স নদীর উভয় কূলে দৃষ্টিপথ পর্য্যন্ত কেবল মনুষ্যারণ্য ভিন্ন আর কিছুই দেখিতে পাওয়া যায় না। নৌকা সকল সঙ্কীর্ণ ও সুদীর্ঘ করিয়া নির্ম্মাণ করে—এবং তীরসদৃশ বেগে জলের উপর দিয়া তর্তর্ শব্দে যেন উড়িয়া যায়। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণ উপরি উপরি নয় বৎসর পরাজিত হইয়া এবার জয়লাভ করিয়াছে।
* * * * * *
এদেশে সাধারণের হিতকার্য্য যে, কত প্রকারে সম্পাদিত হয়, তাহা কিরূপে জানাইব? এক লণ্ডন নগর মধ্যে দরিদ্র-শালায় প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার লোক প্রতিপালিত হইতেছে। তদতিরিক্ত অগণ্য অনাথ-নিবাস ও চিকিৎসালয় আছে। ইংলণ্ড দেশ সর্ব্ব দেশ অপেক্ষা ধনশালী এবং তাহার বদান্যতাশক্তি ঈদৃশী যে, তুলনায় কেবল আমেরিকা তাহার সমতুল্য বলিলে বলা যায়।
* * * * * *
ইংলণ্ডের বদান্যতা ও বঙ্গদেশের বদান্যতা ভিন্ন প্রকার। ইংলণ্ডীয় সমাজে যে স্বাধীনতা আছে, বঙ্গসমাজে তাহা নাই। ইংলণ্ডে দানশক্তি পরিমিত ও নির্দ্দিষ্ট পথেই পরিচালিত হইয়া থাকে। বঙ্গদেশে পরোপকার গুণ অজস্র, ও দেশীয় বেগবতী নদীজলের ন্যায় সর্ব্বত্র প্লাবিত করে ও কোন প্রকার নিয়ম মানে না। ইংলণ্ডীয়েরা পর-দুঃখ দূর করিয়াই সন্তুষ্ট হয়। বাঙ্গালীরা দীন জনকে স্বজননির্বিশেষে যুগপৎ করুণা ও স্নেহ দিয়া সন্তুষ্ট করে। এক জন ইংরাজ স্বীয় দাতব্য দানাগারে প্রেরণ করিয়া নিশ্চিন্ত থাকে, বাঙ্গালীরা তদ্রূপ নয়। তাহাদিগের মধ্যে স্বধর্ম্মপরায়ণ ব্যক্তিগণ অতি দরিদ্র হইলেও ভিক্ষুককে মুষ্টিভিক্ষা দিতে কাতরতা অনুভব করে না, এবং অতি দূর জ্ঞাতি-কুটুম্বকেও নিজ ব্যয়ে ভরণপোষণ করিয়া থাকে। সমৃদ্ধিশালী ইংলণ্ডদেশে দারিদ্র্য নিবন্ধন যত দুঃখ ও ক্লেশ আছে, দরিদ্র বঙ্গদেশের অতি নীচ শ্রেণীর মধ্যেও তত দেখা যায় না; তাহার এক মাত্র কারণ বাঙ্গালী জাতির স্বাভাবিক দয়া ও বদান্যতা। বাঙ্গালীদিগের এরূপ স্বাবলম্বন শক্তি জন্মে নাই, যদ্দারা তাহারা প্রতিবাসীগণের সাহায্যনিরপেক্ষ হইয়া জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ করিতে সমর্থ; সুতরাং তাহারা সততই পরস্পর পরস্পরের উপকারার্থে কার্য্য করিতে বাধ্য হয়, এবং তন্নিমিত্তে সমাজবন্ধনী সুকুমার মনোবৃত্তি সমুদায় সমধিক উৎকর্ষিত হইয়া থাকে। ইংরাজেরা স্বাবলম্বী লোক, অন্যের কি হইবে তাহা দেখে না, এবং অন্যকৃত সাহায্যও চাহে না। অগত্যা সে স্বতন্ত্র হইয়া থাকে, এবং যদি তাহাদিগকে কেহ কিছু উপকার করে, তবে তাহারা সেই উপকার নিতান্ত অসম্ভাবিত জ্ঞানে কৃতজ্ঞতার সহিত স্বীকার করে।
* * * * * *
সম্পূর্ণ স্বাধীনতা এবং ভূয়সী দয়া ও পরোপকারিতা গুণ কি সম্মিলিত হইতে পারে না? আমার বোধ হয় যে, কোন জাতির স্বাধীনতাকে যথাবিহিতরূপে বিকশিত করিতে চাহিলে সামাজিক বৃত্তি সমুদায়কে কিয়ৎপরিমাণে জলাঞ্জলি দেওয়া প্রয়োজনীয়; কিন্তু এরূপ প্রয়োজন অতি শোচনীয়।
এখানে জারজ ও অনাথ-সন্তানগণের পালনার্থে একটি গৃহ আছে। আমি তথায় সর্ব্বদাই গিয়া থাকি। এই দুঃখী সন্তানগণ মাতাকর্ত্তৃক পরিত্যক্ত হওয়াতে তাহারা এখানে ভরণ পোষণ ও শিক্ষা প্রাপ্ত হয়; তাহার উদ্দেশ্য এই যে, ইহারা। বয়ঃপ্রাপ্ত ও শিক্ষিত হইয়া সৎপরিশ্রমের দ্বারা যথাকথঞ্চিৎরূপে স্বীয় জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ করিবে।
এই গৃহের সংলগ্ন একটা গির্জা ঘর আছে, তথায় অনাথ বালকবালিকারা প্রতি রবিবারে আসিয়া উপাসনা করে। তাহাদিগের তদ্দিবসীয় পরিস্কার পরিচ্ছদ দেখিলে ও চিক্কণ স্বরে ধর্ম্মবিষয়ক গান শুনিলে সাতিশয় আনন্দ অনুভূত হয়; এবং উপাসনান্তে তাহাদিগকে একত্রে সামান্যরূপ অন্নাহার করিতে দেখিলে অধিকতর আনন্দ জন্মে। এই বিষয়ে আমি একটা কবিতা লিখিয়াছি, তাহা আপনাকে পাঠাইতেছি।
সুন্দর পুতলী সম তোমরা সকলি।
কে দিল ত্বদীয় কণ্ঠে কোকিল কাকলী।
ধর্ম্মের সঙ্গীত গাও আধ আধ স্বরে।
স্বর্গের বালক যেন মর্ত্তের উপরে।
পাপে নহে কলুষিত শুদ্ধমতি যেই।
কিশোরের অন্তরের স্বতঃ ভাব এই।
আপনি উদয় হয় বাধা নাহি মানি।
পবিত্র অন্তর হতে যেন প্রতিধ্বনি।
সেইরূপে পাখিগণ সুমধুর স্বরে।
নিজ গূঢ় মনোভাব প্রকাশিত করে।
সেইরূপে রজনীতে কানন রসিয়া।
মনোসুখদুঃখ গায় নিকুঞ্জ মোহিয়া।
সুন্দর বালকগণ ত্বদীয় বদন।
বাসন্তী ফুলের কান্তি প্রিয়-দরশন।
যতবার দেখি আরো দেখিবারে চাই।
হেন মনোলোভা শোভা আর কোথা পাই।
কিশোরের অন্তরের ভাব যে সকল।
উজল করিছে মৃদু বদন কমল।
কখন সে মুখ-ছবি মলিন ছায়ায়।
কভু হাস্যে সমুজ্জ্বল তরুণার্কপ্রায়।
যদিচ কলঙ্ক তব জীবনে রহিবে।
সরমের জন্ম কথা হৃদয়ে জাগিবে।
যদিচ শৈশবে দুখ সমীরণ ক্রূর।
শুষ্কপ্রায় কোরেছিল জীবন-অঙ্কুর।
তথাপি দুখান্ত, জেনো হবে কিছু দিনে।
কৃপণের স্বপ্নাধিক পাইবে দ্রবিণে।
অন্বেয ধর্ম্মের কোষ সে ধনের তরে।
যাহা সে সমান ভাযে সবারে বিতরে।
তিমির বসন পরি রজনী আসিল।
দলে দলে বিহঙ্গম নীড়ে প্রবেশিল।
মেষ পালে শোভা পায় পর্ব্বত-শিখর।
পড়িছে সন্ধ্যায়, তথা, শিশিয় শীকর।
শব্দমাত্র নাহি আসে শ্রষণ-কুহরে।
নিদ্রাযোগে প্রাণিগণ শ্রম দূর করে।
অনন্তর দেখি এক সমাধির স্থল।
সন্ধ্যার তারক উদি করিল উজ্জ্বল।
নিকটস্থ তরু-তলে হেরি তার পর।
আলিঙ্গিত স্নেহভাবে ভগ্নী-সহোদর।
তরুণ অরুণ অতি সুন্দর যেমতি।
মৃদু ভাবে তারা দুটি সুন্দর তেমতি।
নবমবর্ষীয়া কন্যা হবে কি না হবে।
সম্যক জ্ঞানের দীপ্তি কভু না সম্ভবে
কনিষ্ঠ তাহার ভ্রাতা উজ্জ্বলবদন।
শিশু শশি সম অতি মূরতি মোহন।
সুধাংশু উদয় হলে নিকুঞ্জ কাননে।
কাঁদে যথা পরীকন্যা সকরুণ স্বনে।
সেই রূপ জ্ঞান হয় এই বালিকায়।
কিম্বা হবে দেবকন্যা উদিত ধরায়।
প্রহরীর সম রয় এ সমাধিস্থলে।
দীন-ভাব প্রকাশিছে নয়ন-কমলে।
তাহার আনন চারু করুণা-নিধান।
এ স্থানের যোগ্যা সেই, তার যোগ্য স্থান।
তরু অন্তরালে বালা দাঁড়াইয়া থাকি।
আকাশের দিকে চায় ফিরাইয়া আঁখি।
বাষ্পসমাকুল তার চারু নেত্রদ্বয়।
ভক্তিরসে প্রেমরসে বিগলিত হয়।
হোতেছে রজনী ক্রমে তিমির-আবৃত।
স্বনস্বনে শীত বায়ু হয় সঞ্চালিত।
চিত্র-পুত্তলিকা-প্রায় আছে দাঁড়াইয়া।
তমোময় আকাশের পানে নিরখিয়া।
দাঁড়ায়ে নিকটে আছে শিশু সুকুমায়।
স্নেহ আলিঙ্গনে বদ্ধ স্বীয় সোদরায়।
শিশু ভ্রাতা চাহে সদা ভগ্নী মুখ-পানে।
সে তোষে ভ্রাতার মন ভালবাসা দানে।
আহা এ জগতে আর এমন কি আছে,
তুলনায় তুল্য হয় এ ভাবের কাছে?
অনাথারে করিবারে প্রীতি-অর্ঘ্য দান।
প্রিয় ভগ্নী সম কেবা স্নেহের নিধান।
নিশির শিশির-সিক্ত প্রভাত কমল।
তদুপম সে শিশুর বদন উজ্জ্বল।
হেরে ভগিনীর মুখ সতৃষ্ণ নয়নে।
আরো ধীরে ধীরে যায়,তার অঙ্ক পানে।
সোদর সোদরা দোঁহে করয়ে ক্রন্দন।
উভে মিলি করে ঈশ্বরের আরাধন।
কেন কাঁদে নাহি জানে অজ্ঞান সোদর।
না জানে যে পিতা এবে ত্যক্ত কলেবর।
প্রেম ভরে করে বালা পুষ্প বরিষণ।
সমাধির স্থানোপরি করিয়া যতন।
প্রতি রাত্রি বন-পুষ্প করিয়া চয়ন।
সাজায় সমাধিস্থল করিয়া যতন।
মোছাইল সোদরের সজল নয়ন।
দোঁহে করে পরস্পর স্নেহ-আলিঙ্গন
পর ঘরে যায় ফিরে স্নেহার্দ্র অন্তর।
অন্ধকারে ঢাকে নিশা নিজ কলেবর।
একদা আমি অবৈতনিক সৈন্যদিগের যুদ্ধ-কৌশল দেখিবার মানসে ব্রাইটন নগরে গিয়াছিলাম। সেনাগণ দুই দলে বিভক্ত হইল। একদল সদ্যাগত আক্রমণকারী, অপর দল রক্ষকের ভাবাবলম্বন করিল। তিন ঘণ্টা পর্য্যন্ত তুমুল সংগ্রাম হইল, পরে আক্রকণকারীরা তাড়িত হইয়া ক্রমে সমুদ্র-তীর পর্য্যন্ত পশ্চাদ্ধাবিত হইল ও পরিশেষে পরাজয় স্বীকার করিল। এই কৃত্রিম যুদ্ধ-ব্যাপার প্রত্যক্ষ করিলে প্রকৃত যুদ্ধ কি প্রকারে হইয়া থাকে, তাহা বিলক্ষণ হৃদয়ঙ্গম হয়। এবং আমি এই সমস্ত বিগ্রহ ব্যাপার অত্যন্ত আহ্লাদের সহিত সন্দর্শন করিয়াছিলাম। ব্রাইটন সমুদ্রকূললর্ত্তী একটি অতি সুন্দর নগর, এবং তথাকার সমূদ্রকূলের নিকটস্থ অট্টালিকা সকল প্রাসাদের ন্যায় সুনির্ম্মিত। ইংলণ্ডীয় উপকূলস্থ সমস্ত নগরের মধ্যে ব্রাইটন নগর সর্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ ও সুরম্য স্থান এবং নির্দ্দিষ্ট সময়ে তথায় মহা লোকারণ্য হইয়া থাকে। এই সময়ে তথাকার জাঁকজমক শোভাসৌন্দর্য্য, আমোদপ্রমোদ, মধুর বাদ্যোদ্যম, সুশোভন শকটের ঘর্ঘর শব্দ ও অগণ্য বিলাসাবাস দেখিলে ও শুনিলে নবাগত ব্যক্তিমাত্রেরই এই প্রতীতি জন্মে যে, ইহাই সর্ব্বোত্তম রমণীয় স্থান ও ভোগ-বিলাসের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ নিকেতন। এমন কি নন্দনকানন বলিলেও বলা যায়।
* * * * * *
ব্রাইটন হইতে সমুদতীরস্থ অতি সুন্দর ওয়ারদিং নগরে এবং তথা হইতে আরণ্ডেল নগরে গেলাম, এবং তথাকার অত্যন্ত প্রাচীন দুর্গ সন্দর্শন করিলাম। প্রহরীস্তম্ভ হইতে চতুর্দ্দিকস্থ নানা স্থান নয়নগোচর হইল। তথা হইতে ওয়াইট নামক দ্বীপে উপস্থিত হইলাম। ইহা ইংলণ্ডের উপবন বলিয়া বর্ণিত হয়, কারণ তথায় উদ্ভিদগণ সতেজে জন্মে এবং পল্লীগ্রামস্থ সমস্ত শোভাই দেখিতে পাওয়া যায়। তথাকার অন্যান্য কতিপয় গ্রাম দেখিয়া লণ্ডন নগরে প্রত্যাবর্ত্তন করিলাম।
* * * * * *
জুন মাসের প্রথম দিবসে আমরা ডর্বি নগরস্থ ঘোড়াদৌড় দেখিতে গিয়াছিলাম। সামান্যতঃ যেরূপ ঘোড়াদৌড় হইয়া থাকে, ইহা তদপেক্ষা কিছুই ভাল নহে; কিন্তু লোকে তাহাতে যে কি পরিমাণে আমোদ ও ঔৎসুক্য প্রকাশ করিয়া থাকে, তাহা বর্ণনা করিলে বোধ হয় কেহই বিশ্বাস করিবে না। ইংলণ্ডের সকল লোকে ইহাকে এক মহোৎসব জ্ঞান করে এবং এমন কেহই নাই যে, তাহাতে যৎপরোনাস্তি উল্লাস প্রকাশ না করে। এই আমোদ দেখিতে যে কত লোক সমবেত হয়, তাহা গণনা করিতে শুভঙ্করের সাধ্য নাই; কিন্তু সকল লোকেই যে ঘোড়াদৌড় দর্শনাভিলাষে আসে, এমত নহে; একদিন আমোদ করাই বিস্তর লোকের উদ্দেশ্য। লণ্ডন ও ডর্বি নগরের মধ্যে রেলের গাড়ি প্রতি ঘণ্টায় যে কত বার গমনাগমন করে, তাহার ইয়ত্তা হওয়া কঠিন এবং ডর্বি নগরে যাইবার পথ নানাবিধ শকটে একরূপ রুদ্ধ হইয়া যায়। এ সময় ইংরাজেরা স্বাভাবিক মৌনভাব পরিহার করিয়া যার পর নাই আমোদ করিয়া থাকে, এবং তাহাদিগের সে সময়ের পরিষ্কার পরিচ্ছদ ও পুলক-প্রফুল্ল সহাস্য বদন সন্দর্শন করিলে দর্শকের হৃদয় আহ্লাদে পরিপূর্ণ হয়। ইতর আমোদেরও অভাব নাই। পুরুষেরা মুখস মুখে দেয়, কৃত্রিম নাসিকা প্রস্তুত করে, পথিকগণের প্রতি মটর ছুটায়, এবং বালকের নানা মূর্ত্তির সং সাজিয়া বেড়ায়। সে দিবস এবম্বিধ অমোদেই অতিবাহিত হইয়া যায়।
* * * * * *
ইংলণ্ডের পল্লীগ্রাম না দেখিয়া বিদেশীয়গণ যেন তদ্দেশ পরিত্যাগ না করেন। আয়র্লণ্ড যাইতে যাত্রা করিয়া পথমধ্যে আমি একজন জমিদারের সহিত তদীয় গ্রাম্য আবাসে কয়েক দিবস যাপন করিয়াছিলাম। এবম্বিধ স্থান নিতান্তই দর্শনোপযুক্ত। পরিষ্কার ও সুগঠন গৃহ, পরিসর বারাণ্ডা ও নিকটস্থ সুন্দর উপবন ও ক্ষেত্র, সুন্দর সরোবর ও সুশীতল ছায়াতম নিবিড় বিপিন, দুরশৈলমালাবেষ্টিত অবিচ্ছিন্ন দর্শন, পাদপাচ্ছাদিত পথ, ও হরিণ-যূথালঙ্কৃত বিস্তৃত ক্ষেত্র, সুরভি-বনকুসুম-শোভিত তরুরাজী, সুন্দর কুটার, সুগঠন গির্জা ঘর, এ সকল দেখিতে কেনা অভিলাষী হয়? কিন্তু কেবল ইহাও নহে; পল্লীগ্রামস্থ ইংরাজেরা ভিন্ন ও অভিনব প্রকৃতি অবলম্বন করে। লণ্ডন নগরের সমাজিক কঠিন নিয়মের নিগড় না থাকাতে তাহারা পল্লীগ্রামে স্বাধীন ও স্বেচ্ছানুরূপ ব্যবহার করে, ও পরের সঙ্গে উদার চিত্তে আমোদ প্রমোদ করে। জমীদারদিগকে দীনভাবাপন্ন গ্রামবাসিদিগের সহিত স্বাধীন, এমন কি সপ্রেমভাবে, মিলিত হইতে ও তাহাদিগের গৃহ, ভূমি ও বৎসরের ফলাফল প্রভৃতি নানাবিষয়িণী কথা স্নেহগর্ভ বচনে জিজ্ঞাসা করিতে এবং আপৎকালে ত্রাণার্থে করপ্রসারণ করিতে দেখিলে চিত্ত যথার্থই পুলকিত হয়। গ্রাম্য বালিকারা, ভূস্বামীর কলত্র ও কন্যাগণকে ভক্তিভাবে ভালবাসে এবং তাঁহারাও সদয়ভাবে তাহাদিগের সহিত কথাবার্ত্তা কহেন। অকপট ও সসম্ভ্রম ভক্তি দ্বারা সে আলাপ মধুর করে, এবং সময়ে সময়ে সেই আলাপ সোদরা-স্নেহে পরিণত হইয় উঠে।
এখানকার রবিবার নিতান্তই শান্তিপ্রদ। যে ব্যক্তির কণামাত্র বাৎসল্য গুণ আছে, প্রফুল্লানন ও সুবেশ গ্রাম্য স্ত্রীপুরুষদিগকে স্ব স্ব ক্ষুদ্র ভবন হইতেও বহির্গত হইতে গ্রাম্য গির্জাভিমুখে যাইতে দেখিলেও তাঁহার হৃদয়কেন্দ্র লোকপ্রিয়তা রসে প্লাবিত হয়। ভূস্বামীকে সপরিবার যাইতে দেখিলে গ্রামবাসিগণ সসম্ভ্রমে নমস্কার করে ও তাহাদিগের আর্য্যগণেরাও সস্মিতমুখে তাহা স্বীকার করিতে কৃপণতা করেন না। উপাসনার কার্য্য সম্পূর্ণ হইলে ভূস্বামীর ভবনে গ্রাম্য বালক-বালিকাদিগকে সমবেত হইতে এবং সেই দিবস এক উৎসব-দিনের ন্যায় অতিবাহিত হইতে দেখা যায়।
পঞ্চম অধ্যায়।
আমি আয়ার্লণ্ড দেশে যাওয়ার বিষয় সংক্ষেপে বলিতেছি। ১৫ই জুন দিবসে লণ্ডন হইতে বহির্গত হইয়া ও কিয়ৎকাল বার্কশিয়রে থাকিয়া আইরিস সাগর পার হইলাম, এবং ঐ মাসের ২১শে দিবসে আয়র্লণ্ডের রাজধানী ডব্লিন নগরে পেছিলাম। এই নগর অতি সুদৃশ্য, এখানে এক বিশ্ববিদ্যালয় ও সুন্দর উদ্যান আছে। লিফি নাম্নী নদী ইহার নীচে দিয়া প্রবাহিত হইতেছে। এই নদী অতি অপরিষ্কার। ডবলিনের অনতিদূরে কিংষ্টন নামক সমুদ্রতীরস্থ নগর ডবলিনবাসিদিগের আমোদ প্রমোদের স্থান; সমুদ্রকুলস্থিত নগরমাত্রেরই নানাবিষয়িণী চারুতা আছে। এখানে বৃদ্ধ ও রুগ্নগণ স্বাস্থ্যলাভ করিতে আইসে; এখানে ছাত্রবৃন্দ ও শ্রমোপজীবী লোক বিশ্রাম ও অবকাশের দিবস সুখে যাপন করিতে আইসে; এখানে যুবকযুবতীগণ ব্যস্তসমস্ত বহুজনাকীর্ণ নগরের কঠিন সামাজিক নিয়মাবলী পরিত্যাগ করিয়া আমোদ প্রমোদ করিতে আইসে।
অনন্তর আমরা রেলগাড়িযোগে জগদ্বিখ্যাত জায়ণ্টস্ কজ্ওয়ে দেখিতে গেলাম। শিলাময় ভূখণ্ড সমুদ্রমধ্যে প্রবেশ করিয়াছে। স্কট লণ্ডের ফিন গালের গহ্বর যে প্রকার প্রস্তরে নির্ম্মিত, এখানকার প্রস্তরের গঠন প্রায় তদ্রূপ। ইহার স্তম্ভ সকল তিন হইতে নয় কোণবিশিষ্ট, তার এমন সৌষ্ঠবান্বিত যে, দেখিলে বোধ হয় যেন বাটালি দ্বারা পরিষ্কৃত হইয়াছে। ভীষণনাদী আট্লাণ্টিক মহাসাগর এই সকল স্তম্ভকে তরঙ্গাস্ত্র দ্বারা প্রচণ্ড পরাক্রমে অবিরাম প্রহার করিতেছে, কিন্তু কিছুই করিতে পারে নাই। অদূরে অনেক গুলা গহ্বর আছে, কিন্তু তন্মধ্যে কোনটা ফিন গালের গহ্বর তুল্য সুন্দর নহে।
এস্থান হইতে প্রত্যাবর্ত্তন করিবার সময় ডনলুস্ নামক দুর্গ সন্দর্শন করিলাম, ইহা সাগর-প্রবিষ্ট প্রকাণ্ড গিরির উপর নির্ম্মিত। এই দুর্গের যেরূপ স্থিতি, তাহা দেখিলে ভয় হয়; সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ ইহার তিন দিকে চিরকাল প্রহার করিতেছে, তথাপি ইহার কিছুই হয় নাই। পূর্ব্বকালে চারিদিকেই সমুদ্র ছিল, কিন্তু এক দিক হইতে সমুদ্রবারি অপসারিত হইয়াছে।
না জানি পূর্ব্বকালে এই দুর্গের যৌবনাবস্থায় ইহা রাজা ও আর্য্য লোকদিগের কতই আমোদপ্রমোদের স্থান ছিল, এখানে কতই যুদ্ধবিগ্রহ ও রক্তপাত হইয়াছিল। অনন্তর পুরাবৃত্ত-প্রসিদ্ধ লণ্ডন্ ডবী নগরীতে আসিলাম; দেখিলাম তথায় ওয়াকারের স্মরণার্থ স্তম্ভ আছে, এই সাহসিক বীর পুরুষই এই নগরাবরোধের সময়ে তাহার পরিরক্ষণ সাধন করিয়াছিলেন ও অকুতোভয়ে ভগ্নচেতা অবরুদ্ধ ব্যক্তিদিগকে অভয় দান করতঃ তাহাদিগের আশু দুর্দ্দিনাবসানের ভবিষ্যদ্বাণী বলিয়াছিলেন; সেই দুঃসময় কিছু বিলম্বে অবসান হইয়াছিল এবং পরিশেষে সেই নগর রক্ষা পাইয়াছিল। আমর সেই স্তম্ভের উপর আরোহণ করিয়া ওয়াকারের প্রতিমৃর্ত্তি দেখিলাম, যেন তিনি হস্ত প্রসারণপূর্বক ক্ষুপিপাসা-পীড়িত লোকদিগকে সগর্ব্বে কহিতেছেন যে, তোমাদের দুঃখের দিন অপমান হইতেছে। এই স্থানে ভ্রমণ করিতে করিতে উল্লিখিত অনধিকৃত দুর্গের বর্ণনা যাহা মেকালি কর্ত্তৃক বর্ণিত হইয়া, তাহাই কেবল মনোমধ্যে জাগিতে লাগিল।
লণ্ডন্ডরি হইতে এনিস্কিলেন নগরে গেলাম। এই নগর আয়র্লণ্ডের অধিকাংশ নগরের ন্যায় অতি অপরিস্কার, কিন্তু ঐ নগর যে হ্রদের তটে আছে, তাহ অতি সুন্দর; তাহার নাম অরণ। ঐ হ্রদে অনেকক্ষণ নৌকায় বেড়াইয়া একটা ক্ষুদ্র দ্বীপে অবতীর্ণ হইলাম।
এনিস্কিলেন নগর ত্যাগ করিয়া আথলোন নগরে গেলাম। কবিবর ওলিবর গোল্ডস্মিথ বিরচিত সুললিত কাব্যে যে আবরণ গ্রামের উল্লেখ আছে, তাহাও পুলক সহকারে দর্শন করিলাম।
ইংলণ্ড, স্কট্লণ্ড ও আয়র্লণ্ড মধ্যে সানন নদ সর্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ। এই নদের উপর আথলোন নামক নগর। আমরা তথা হইতে বহুজনাকীর্ণ লিমারিক নগর দেখিয়া পরে সানন নদের জলপ্রপাত সন্দর্শন করিতে গেলাম। বস্তুতঃ ইহা প্রকৃত জলপ্রপাত নহে; এখানে সানন নদের গভীরতা অতি কম এবং ইহা অতি আয়ত ও প্রস্তরময় গর্ভের উপর দিয়া ভীষণ বেগে ও কল কল শব্দে প্রবাহিত হইতেছে। চতুর্দ্দিকে বসন্তলক্ষী বিরাজিত, পাদপপুঞ্জে নদীর জল ছায়াময়, এবং ঐ জলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ প্রতিফলিত হইয়াছে। নদীর জল যেখানে সুগভীর, সেখানে অতি পরিষ্কার ও স্থির, অন্য স্থানে তাহার বেগগামী বারি ভূরি প্রস্তরখণ্ড প্রতিঘাতে বিচ্ছিন্ন ও বহুল ফেনময় হইয়া প্রবাবিত হইতেছে।
লিমারিক হইতে আমরা কিলানির প্রকাণ্ড হ্রদ দেখিতে গেলাম। এই হ্রদ আয়ার্লণ্ডের ভূষণ স্বরূপ এবং স্কটলণ্ডের পরম সুন্দর হ্রদের তুল্য। কিয়ৎকাল শকটে ভ্রমণ করিয়া একটা অতি অরণ্যময় উপত্যকার ভিতর দিয়া অশ্বারোহণে ভ্রমণ করিলাম।
তথা হইতে বিনির্গত হইয়া আমরা হ্রদের নিকট আসিলাম এবং এক খানি নৌকা ভাড়া করিলাম। চতুর্দ্দিকে যাহা দেখিতে লাগিলাম, তাহা বর্ণনা করা কাহার সাধ্য! কেবল এই মাত্র বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, পর্ব্বত, নদী, দ্বীপ, সাগর শাখা, ভূশাখা নিবিড়ারণ্য একস্থানস্থ হইয়া স্থল বিশেষের যে দুশ্চিন্তনীয় সৌন্দর্য্য বিধান করিতে পারে,তৎসমুদায়ই এখানে বিদ্যমান আছে। এই সকল হ্রদের চতুঃসীমায় উচ্চ পর্ব্বত থাকাতে, সেখানে একটি উচ্চ কথা কহিলে তাহা প্রতিধ্বনিত হয়। আমাদিগের পথ-দর্শকের নিকট একটা রণশিঙ্গা ছিল, সে তাহা বাজাইল, এবং পরে তিনবার তাহার প্রতিশব্দ শ্রবণ-কুহরে প্রবিষ্ট হইল, ও কোন খানে প্রতিধ্বনি শিঙ্গার শব্দাপেক্ষা সমধিক উচ্চ জ্ঞান হইল।
আয়ার্লণ্ডের বিবরণ সমাপন করিবার পূর্ব্বে ইহাকে লোকে কেন হরিদ্বর্ণ বলে, তদ্বিষয়ে কিছু লিখিতেছি। রেলগাড়িযোগে মাঠের মধ্য দিয়া যাইবার সময় কি উত্তর, কি দক্ষিণ, কি পূর্ব্ব, কি পশ্চিম, যে দিকে নেত্রপাত করা যায়, সেই দিকেই নিবিড় শ্যামল ক্ষেত্রচয়, সেই দিকেই ঘন হরিদ্বর্ণ অটবী, সেই দিকেই দূর্ব্বাদলোপম নবোদ্ভূত উদ্ভিদরাশি নয়নকে রঞ্জন করে। অম্বেষণ করিয়া এবম্প্রকার শোভা ইংলণ্ডে দেখিতে পাওয়া যায় না।
আয়ার্লণ্ডদেশীয় দুঃখী লোকদিগের গোল আলু একমাত্র জীবনোপায়; এবং ইহারা প্রায় কখনই কোন প্রকার মাংসাহারের সুখ সম্ভোগ করিতে পায় না। এখানে যে অসীম গোল আলুর ক্ষেত্র সমস্ত আছে, তাহা দেখিলে চমৎকৃত হইতে হয়। এখানকার পল্লীগ্রামবাসী লোকেরা নিতান্তই দুঃখী। স্বামী স্ত্রী ও সন্তানগণ গণিতে অনেকগুলি; কি রৌদ্র, কি বৃষ্টি সকল সময়েই একত্রে ক্ষেত্রে কার্য্য করে ও রাত্রিতে একখান অতীব জঘন্য কুটীর মধ্যে শূকর ও হংসসহ শয়ন করিয়া থাকে। উর্ব্বর দেশের কৃষকগণ যে অত্যন্ত নিঃস্ব ও নিরন্ন, আয়ার্লণ্ড তাহার একমাত্র দৃষ্টান্ত স্থল নহে। আমি আয়ার্লণ্ড সম্বন্ধে একটা কবিতা লিখিয়াছি, তাহা আপনাকে প্রেরণ করিতেছি।
সুন্দর এরিন[১] তব উজ্জ্বল ভূধরে।
কতবার ভ্রমিয়াছি আনন্দ অন্তরে।
শুভ্রকান্তি কল্লোলিনী হ্রদের উপর।
বাহিয়াছি দ্রুতগামী তরি মনোহর।
কি সুন্দর উপত্যকা নদী-শোভাকর,
শৈশব-স্বপন সম মনোমুগ্ধকর।
হেরিয়াছি আভোকার সুনির্ম্মল জল।
আনন্দেতে বহিতেছে করি কল কল।
হেরিয়াছি জায়াণ্টের ভীম স্তম্ভ সার।
অনন্ত সমুদ্র যাহে করিছে প্রহার।
দন লুসের শৈল-দুর্গ কিবা ভয়ঙ্কর।
সাগর-তরঙ্গ পার্শ্বে বিকট শেখর।
ওয়াকারের বীর মূর্ত্তি যথায় শোভিছে।
অজেয় নগর যেন অদ্যাপি রক্ষিছে।
হেরিয়াছি শূন্য ক্ষেত্র তব ‘অবরণ’!
কে না কাঁদে স্মরি তব দুঃখ-বিবরণ?
শান্তভাবে হেরিয়াছি ভ্রমিয়াছি কত।
কিলাণীর হ্রদ যথা ভূধরে বেষ্টিত।
মনোহর দ্বীপ তব দেখি হীনদশা।
ভাবনা উদয় হয় মনেতে সহসা।
বিষাদে বিপদে তুমি মগ্ন হে যেমন।
বহুদূরে আছে এক প্রদেশ তেমন।
অনন্ত সাগর পারে ভারত প্রদেশ।
দরিদ্রা দুঃখিনী মাতা নাহি সুখ-লেশ।
উজ্জ্বল এরিন হায়! দ্বীপ মনোহর।
চির দুঃখে দগ্ধ হবে তব কলেবর?
পুরাতনী স্বাধীনতা গৌরব আলয়।
পুনঃ তব সুখ-রবি হবে না উদয়?
চারিদিকে বীচিমালা করে মহাধ্বনি।
শম্রকের জন্ম-ভূমি বীর-প্রসবিনী!
ত্বরিতে হইবে তব দুঃখরাশি ক্ষয়।
ত্বরিতে হইবে তব সৌভাগ্য-উদয়।
পুরাকালে ছিলা যথা হইবা তেমন।
শাস্ত্রের উজ্জল নিধি বিদ্যার ভবন।
বীর স্বাধীনতা গৌরব-আলয়।
প্রেমের নিবাস স্থান অনন্ত অক্ষয়।
আয়ার্লণ্ড হইতে প্রত্যাগমনের সময় বৃষ্টল নগরে রাজা রামমোহন রায়ের গোরস্থান দর্শন করিলাম। রাজার স্মরণার্থ সেই গোরের উপর ভারতবর্ষীয় প্রণালীতে একটী মন্দির নির্ম্মিত হইয়াছে। বৃষ্টল হইতে ওয়েল্স প্রদেশের অন্যান্য স্থান দেখিতে যাত্রা করিলাম। স্নোডন নামক ওয়েল্সের সর্বোচ্চ পর্ব্বতশৃঙ্গ দর্শন করিলাম, ঐ পর্ব্বত ৩৫৭১ ফিট্। তথা হইতে কার্ণার্ভর ও কনোয়ে নগরের পুরাতন ও ভগ্নাবশেষ দুর্গ সন্দর্শন করিয়া ১৪ই জুলাই লণ্ডন নগরে প্রত্যাগমন করিলাম।
ষষ্ঠ অধ্যায়।
যে ব্যক্তি ইংলণ্ডের সমাজ-বৃত্তান্ত নিগূঢ়রূপে অভ্যাস করিয়াছেন, তিনি জানিতে পারিয়াছেন যে, কোন্ কোন্ দলস্থ লোকেরা রাজনীতি সম্বন্ধে কি কি রূপ মতালম্বন করিয়া থাকে। সংক্ষেপে এই বলা যায় যে, সামাজিক পরিবর্ত্তনে যে যে সম্প্রদায়ের উপকার হইবার সম্ভাবনা; তাহাদের মধ্যে অধিকাংশ লোকই লিবারেল; ও যে যে সম্প্রদায়ের নিষ্ট হইবার সম্ভাবনা, তাহাদের মধ্যে অধিকাংশ লোকই কন্সার্ভেটিব।
১। ইংলণ্ডের কুলীনবর্গ।—লোকতন্ত্রপ্রিয়তার সময় উপস্থিত, এবং সমগ্র ইউরোপ একবাক্যে প্রজাগণের শাসনাধিকার স্বীকার ও কুলীনগণের ক্ষমতার নাস্তিত্ব প্রচার করিতেছে। কুলীনদিগের পূর্ব্বভোগ্য ক্ষমতা অনেক হ্রাস প্রাপ্ত হইয়াছে ও বর্ত্তমান কালের গতি আলোচনা করিয়া দেখিলে স্পষ্টই প্রতীতি হইবে যে, যে ক্ষমতা অদ্যাপি আছে তাহাও লোপ প্রাপ্ত হইবে। যখন কোনরূপ মানসিক বা সামাজিক পরিবর্ত্তন ও বিপ্লব ঘটে, তখন তাহা প্রজাবর্গের অনুকূলে ঘটিতে দেখা যায়, সুতরাং কুলীনবর্গের এই যত্ন যে, কোন প্রকার পরিবর্ত্তন না হইতে পায়। সুতরাং কুলীদিগের মধ্যে অধিকাংশই মনে মনে কনসার্ভেটিব অর্থাৎ পূর্ব্বাচার পরিরক্ষক। যাহারা বাহ্যে পরিবর্ত্তনপ্রিয়তা প্রদর্শন করেন, তাঁহাদিগের অন্তরে সে ভাবের অসদ্ভাব আছে।
২। ইংলণ্ডের ভূম্যধিকারী মধ্যাবস্থার লোক।—এই দলস্থ লোক অধিকাংশই সুশিক্ষিত ও উন্নত। কিন্তু তাহারা উন্নত হইলেও নগরের মধ্যাবস্থার লোকদিগের সমান হইতে পারে না। নগরীর লোকেরা তাহাদের অপেক্ষা প্রায়ই অধিক উৎকৃষ্ট, কুসংস্কার-হীন, কার্য্যকুশল ও পরিশ্রমী। তাহাদিগের বহুদর্শিতা, ঔৎসুক্য ও সাহস অধিক পরিমাণে আছে। গ্রাম্য ভূম্যধিকারী প্রায় সমস্ত বৎসর আপন পল্লীগ্রামস্থ আবাসের চতুঃসীমায় রুদ্ধ থাকে; অগত্যা মানসিক ও বৈষয়িক যে সমুদায় পরিবর্ত্তন হয়,সে তাহার অনুরাগী হয় না এবং কি আপনি কি আপনার প্রজাগণ সকলেই সুখচ্ছন্দে থাকাতে তাহার অন্তঃকরণে কোন্ ব্যবস্থার কিরূপ পরিবর্ত্তন ও সংশোধন হইলে দেশের কি পরিমাণে কল্যাণ হইবে, তাহা ধারণাই হয় না। তিনি গ্রাম্য গির্জা ঘর ও প্রজাগণের সুখসম্পত্তির প্রতি অঙ্গুলি নির্দ্দেশ করিয়া বলেন যে, বর্ত্তমান ব্যবস্থাবলীই এই সকল সুখের নিদান। চঞ্চল-চিত্ত ও উম্মত লোকেরাই সর্ব্ব বিষয় পরিবর্ত্তন ও নূতন নূতন ব্যবস্থা প্রচলিত করাইয়া দেশকে উৎসন্ন দিতেছে, ধর্ম্মের প্রচার করিতেছে ও সামাজিক বিপ্লব ঘটাইতেছে, এই বলিয়া তাহাদিগকে অভিশম্পাৎ করেন! এই নিমিত্ত গ্রাম্য ভূম্যধিকারীগণ অধিকাংশই কনসার্ভেটিব।
৩। নগরের মধ্যাবস্থার ভদ্রলোক।—এই সমস্ত লোকেরা অত্যন্ত বিদ্বান্ ও সভ্য এবং স্বদেশীয় কি ভদ্র কি অভদ্র নানাদলাক্রান্ত লোকের সহিত সর্ব্বদা আলাপ পরিচয় হওয়াতে তাহাদিগের বুদ্ধিবৃত্তির উৎকর্ষ জন্মে এবং এই সংসাররূপ কার্য্যালয়ে সেই বৃত্তি সতত নানাপ্রকারে পরিচালিত হইয়া সমধিক তীক্ষ্ণ হইয়া উঠে এবং তাঁহারা বুঝিতে পারিয়াছেন যে, তাঁহাদিগের ও দেশের উন্নতি সাধনের পরিবর্ত্তন একমাত্র উপায়। তাঁহারা অনুভব করিয়াছেন যে, পরিবর্ত্তন ব্যতীত ভবিষ্যতের অভ্যুদয়াশা নাই। এই নিমিত্ত নাগরিক ভদ্রবংশীয়েরা প্রায়ই লিবারেল অর্থাৎ পরিবর্ত্তনপ্রিয়।
৪। সওদাগর ও বণিক সম্প্রদায়।—ইংলণ্ডে অদ্যাপিও সৌভাগ্যশালী ও ধনাঢ্য সওদাগরের এবং নিঃস্ব ভাবাপন্ন ভদ্রকুলোদ্ভব লোকদিগের মধ্যে মর্য্যাদার প্রভেদ আছে, কিন্তু ইংলণ্ডের দিন দিন বর্দ্ধনশীল সভ্যতা এই সমস্ত অভিমানমূলক অকারণ প্রভেদ দূর করিতেছে এবং যত সামাজিক পরিবর্ত্তন হইতেছে, ততই সমভাব সংস্থাপিত হইতেছে। এই সমভাবের সৃষ্টি হওয়াতে ব্যবসায়ী লোকেরা পরমানন্দিত হইতেছে, এই নিমিত্ত তাহা পবিবর্ত্তনে অসম্মত নহে। সুতরাং ব্যবসায়ী লোকেরাও প্রায়ই লিবারেল।
৫। শ্রমোপজীবী সম্প্রদায়।—ইংলণ্ডের মধ্যে কেবল এই সম্প্রদায়ের লোক সংপূর্ণ অনভিজ্ঞ ও বিদ্যারসে নিতান্ত বঞ্চিত, সুতরাং তাহারা আপনাপন হিতাহিত বুঝিতে পারে না। কিন্তু যে দলভেদজন্য মর্য্যাদাভেদ হওয়াতে তাহারা সকলের নিম্নশ্রেণীস্থ হইয়াছে, তৎপ্রতি লক্ষ্য করিয়া তাহারা ক্ষুব্ধ ও ঈর্ষান্বিত হয়, এবং মনে মনে এই বিবচনা করে যে, সমভাব সংস্থাপিত করিতে হইলে কোন না কোন প্রকার পরিবর্ত্তনের প্রয়ােজন আছে। সুতরাং এই সংপ্রদায়ের লােক প্রায় সকলেই লিবারেল। এই কথা নগরীয় শ্রমােপজীবী লােকদিগের প্রতিই বর্ত্তে, গ্রামস্থ এতদবস্থার লােকের প্রতি খাটে না। কারণ তাহাদিগের প্রায় কোন প্রকার মত আছে বলিয়া বলা যায় না। অনেক সময়ে ভূস্বামীর বা গ্রাম্য প্রধান লােকের যাহা মত তাহাৱা সেই মতই অবলম্বন করে।
উপরে যাহা লিখিত হইল তাহা পাঠ করিয়া অপনি এই সিদ্ধান্ত করিবেন যে সর্ব্বশ্রেণীর লােক আপন অভীষ্ট বস্তুর প্রতি দৃষ্টি রাখিয়াই স্ব স্ব মত স্থির করে এবং আপনার অভিলষিত বিষয়ই সর্ব্বসাধাণের অভিলষিত বলিয়া দর্শাইতে প্রবৃত্ত হয়। যদি আপনি এই প্রকার সিদ্ধান্ত করিয়া থাকেন তবে আমার বক্তব্য এই যে, এরূপ আচরণ মনুষ্যের সভাবসিদ্ধ। যেমন সম্মুখীন নিকটস্থ প্রস্তরখণ্ড দূরস্থ শৈলাপেক্ষা উচ্চ জ্ঞান হয়, যেমন চিত্রপটে নিকটস্থ বস্তু দূরস্থিত বস্তু অপেক্ষা বৃহদাকার বােধ হয়, তদ্রূপ এই বিশাল সংসাররূপ চিত্রপটে আমাদিগের নিকটসম্পর্কীয় বস্তু সার্থপরতার চক্ষু দিয়া দেখিলে অতি গুরুতর বলিয়া উপলব্ধি হয়। আমরা নিজের অভীষ্ট ও প্রয়োজন বিলক্ষণ বুঝি; পরের ইষ্ট অন্বেষণ করিতে কে সম্যক্ চেষ্টা করিয়া থাকে?
* * * * * *
সে দিন আমরা লণ্ডন নগরের ‘টাউয়ার’ নামক প্রসিদ্ধ দুর্গ দেখিতে গিয়াছিলাম। এই দুর্গের ভিতর ইংলণ্ডের ইতিহাস সম্বন্ধীয় কত যে দ্রব্য দেখিলাম, তাহা বলিতে পারি না। যে যে স্থানে রাজাগণ ও বিখ্যাতনামা রাজপুরুষেরা কারারুদ্ধ ছিলেন, যে যে স্থানে নবীনা রাজমহিষী ও মহাবিদ্যাবুদ্ধিসম্পন্ন রাজনীতিজ্ঞ ও সেনাপতিদিগের শিরশ্ছেদন হইয়াছিল, যেখানে এক সমাধিস্থলে প্রতিদ্বন্দী যোদ্ধাগণ, মহাবল পরাক্রান্ত সম্রাটগণ ও জগদ্বিমোহিনী সুন্দরীগণ এক্ষণে চিরনিদ্রায় নিদ্রিত রহিয়াছেন, বিস্ময়োৎফুল্ল লোচনে আমরা সেই সকল স্থান দেখিতে লাগিলাম।
* * * * * *
ভারতবর্ষে মহিলাগণ বিদ্যাশিক্ষা করেন না বলিয়া সামাজিক অনেক অমঙ্গল ঘটিয়া থাকে। ইয়ুরোপে রমণীগণ যদিও যৎকিঞ্চিৎ বিদ্যাশিক্ষা করেন, তথাপি তাঁহারা আপন আপন উপজীবিকা লাভার্থে কোন ব্যবসায় কি কর্ম্মে নিযুক্ত হইতে পারেন না, হইলে সকলে হেয় জ্ঞান করে; সুতরাং তাঁহারাও পুরুষের অধীনতা স্বীকার করিয়া জীবন-যাপন করেন, ও এই অধীনতা হইতে সামাজিক অনেক অনিষ্ট উৎপন্ন হয়। পাছে জীবিকা নির্ব্বাহের কোন স্বতন্ত্র উপায় অবলম্বন করিলে জনসমাজে হাস্যাস্পদ হইতে হয়, সেই ভয়ে ইংলণ্ডীয় মহিলারা, হয় উদ্বাহ শৃঙ্খলে বদ্ধ হন, নয় চিরজীবন পিতামাতার গৃহে বাস করিয়া আলস্যে কালহরণ করেন। চিরদিন জুনকজননীর অধীনতা নানা-অসুখ-প্রসবিনী জানিয়া কাজে কাজেই যুবতীগণ বিবাহ করিতে ব্যাকুল হন। ইংলণ্ডীয় যুব পুরুষের আত্মমর্য্যাদা ও গৌরব পাছে ক্ষয় হয়, এই ভয়ে আপনার মানের উপযুক্তরূপ পরিবার-পালনের উপায় স্থির না করিয়া সহসা বিবাহ করিতে স্বীকার করেন না। যাঁহাদের প্রচুর সঙ্গতি আছে, তাঁহাদের মধ্যেও অনেকে উদ্বাহ-শৃঙ্খলে বদ্ধ হইতে ইচ্ছুক নহেন। কিন্তু যুবতীরা মনে মনে বিবাহ করিতে অত্যন্ত ব্যস্ত, নচেৎ তাঁহাদিগের সুখের প্রত্যাশা কোথায়? বিবাহের বাজারে যুবাপুরুষ তত মিলে না, কিন্তু যুবতী স্ত্রী এত অধিক পাওয়া যায় যে, তন্মধ্যে অনেকে অবিক্রেয় হইয়া ফিরিয়া যান। এখানকার যুবতীদিগের বিদ্যাশিক্ষা পুরুষের মনোহরণের উপায় শিখিবার নিমিত্ত, চিত্তোৎকর্ষ সাধন করিবার উদ্দেশ্য নহে। অঙ্ক কি বিজ্ঞান, দর্শন কি অন্যান্য দুরূহ শাস্ত্র যুবতীগণের পাঠ্য পুস্তকের মধ্যে নাই; কেবল কাব্য, ইতিহাস, আশুবোধ সাহিত্য ও উপন্যাস ও পুরাবৃত্ত, কিঞ্চিৎ ফরাশিশ্ ভাষা, সুলেখন ও নৃত্য, গীত, বাদ্য, অর্থাৎ যদ্দ্বারা তাঁহারা পুরুষের চিত্তাকর্ষণ করিতে পারবেন, তাহাই শিখিলে তাঁহাদিগের বিদাশিক্ষার পর্য্যবসান হইয়া থাকে। আমাদের দেশে পিতা মাতা যেমন কন্যার বিবাহের জন্য ব্যস্ত হন, ইংলণ্ডে যুবতীগণ আপন আপন বিবাহ জন্য সেইরূপ ব্যস্ত, অথচ মাতাও সাহায্য করতে ত্রুটি করেন না। সভামধ্যে যুবতী কন্যা স্বাধীনতা প্রকাশ করেন না, সর্ব্বজনমনোরঞ্জিনী ও চারুশীলা হন। কোন বিষয়ে স্বীয় মতামত দৃঢ়তার সহিত ব্যক্ত করেন না। স্নেহ কি প্রীতি ভিন্ন অপর ভাব অস্ফুটিত রাখেন, রাজনীতি সম্বন্ধে কোন স্থির ও স্বতন্ত্র মত অবলম্বন করেন না। সকল বিষয়েই আপনাদিগকে স্নেহশীল ও সুকুমার বলিয়া পরিচয় দেন, যথার্থ মনের ভাব কখনই প্রকাশ করেন না। এবম্বিধ কৌশল ও প্রতারণাদ্বারা সভ্য জাতির মধ্যে রমণীগণ পুরুষের মন আকর্ষণ করিতে ও বিবাহ সম্পাদন করিতে যত্ন করেন। এরূপ চতুরতা নিতান্ত গর্হিত না হইতেও পারে, কিন্তু ইহা দ্বারা যে মানব-প্রকৃতি অতি অশ্রদ্ধেয় হয়, তাহার কোন সন্দেহ নাই। আমাদিগের দেশে যে বিবাহ-প্রণালী প্রচলিত আছে, অনেকে তাহার নিন্দাবাদ করিয়া থাকেন। বস্তুতঃ যে প্রথার পরতন্ত্র হইয়া দশমবর্ষীয়া বালিকার স্কন্ধে দুর্ব্বহ চিন্তার ভার অর্পিত হয় এবং চতুর্দ্দশ বর্ষ বয়ঃক্রম কালে সে পর্ভবতী হইয়া আপন শরীর ও প্রসূত সন্তানের স্বাস্থ্য চিরকালের নিমিত্তে ভগ্ন করিয়া ফেলে, এমন প্রথা যে অতি গর্হিত ও দোষাবহ তাহা বলা বাহুল্য। কিন্তু ইংলণ্ডীয় যুবকগণ স্বেচ্ছামত দারপরিগ্রহ প্রথানুসারে স্বানুরূপ স্বভাবযুক্তা রমণী বাছিয়া লইতে পারেন, সুতরাং বিনা বিবাদবিসম্বাদে জীবনযাত্রা নির্ব্বাহের ও চিরকাল দাম্পত্যপ্রণয়ের সুখসম্ভোগের অমোঘ উপায় স্থির করিতে পারেন—যিনি একথা বলেন, তিনি হয় ইংরাজী কুসংস্কারাবিষ্ট, নয় নিজে প্রেম-সরোবরে নিমগ্ন। ফল কথা এই যে, অস্মদ্দেশীয় বালক যেরূপ ভাবী স্ত্রীর স্বভাব কিছুই জানিতে পারে না, ইংলণ্ডীয় যুবা পুরুষগণ শুভবিবাহের দিন পর্য্যন্ত ভাবী পত্নীর প্রকৃত স্বভাব প্রায়ই জানিতে পারে না।
এই সকল অনিষ্টের এক মাত্র মহৌষধি এই—তথাকার স্ত্রীলোকদিগকে স্বাধীনরূপে নিজ নিজ উপজীবিকার্থে সকল কার্য্য করিতে দেও, তাহাদিগকে বল যে তাহারা উদ্বাহ-শৃঙ্খলে বদ্ধ বা জনকজননীর গলগ্রহ না হইয়া স্বীয় ভরণপোষণের উপায় করিতে সমর্থ হইবে, তাহা হইলে তন্মধ্যে অনেকে বিবাহের ঔৎসুক্য ও উপর্য্যুক্ত সমস্ত বঞ্চনা ভাব ও কৌশলাদি এক কালে পরিত্যাগ পূরঃসর মানবমণ্ডলীর মর্য্যাদা রক্ষা করিতে অগ্রসর হইবে। তাহাদিগকে বল তাহারা স্বোপার্জ্জিত অর্থে স্ব স্ব ভরণপোষণ নির্ব্বাহ করিলে সমাজে অনাদৃত হইবে না, তাহা হইলে তাহারা আর বিবাহ করিতে ব্যগ্র হইবে না ও পরাধীনতা তাহাদিগের অনন্যগতি মনে করিবে না।
* * * * * *
সম্প্রতি ফ্রান্স ও প্রুশীয় দেশের মধ্যে যে ভয়ানক যুদ্ধ হইতেছে সে বিষয়ে আমি আপনাকে একটা কবিতা পাঠাইতেছি। বৎসরের শেষ দিন আমি উহা রচনা করিয়াছিলাম।
ধরায় ধরে না হর্ষ, আইল নূতন বর্ষ,
যেন এক বাল বিদ্যাধর।
চাঁচর চিকুর আর, স্মিতফুল্ল মুখ তার,
পরিচ্ছদ শরীরে সুন্দর।
ফুল-সাজি লয়ে করে, সবে ফুল দান করে,
আশীর্ব্বাদে কুশল মঙ্গল।
বাজিল আনন্দ বাঁশী, সবার বদনে হাসি,
উঠিল সুখের কোলাহল
সে বালকে সম্ভাবিতে, স্নেহে কর প্রসারিতে
সকল সমান ব্যগ্র চিত।
বালক আসি ধরায়, সুস্বরে বলে সবায়
থাক সুখে, কর পরহিত।
বৃথা তার আশীর্ব্বাদ, শুনি ঘোর আর্ত্তনাদ,
চৌদিকে জ্বলিছে যুদ্ধানল।
দুর্ভিক্ষ ভীষণাকার, দুঃখ, মৃত্যু, অনাহার,
সর্ব্বনাশা সমরের-দল
নাশিছে শস্যের ক্ষেত, নগর কত উচ্ছেদ
করিছে লোহিত নদী-জল।
রণ-ক্ষেত্রে নিপতিত মুমূর্ষুর দুষ্ফুরিত
রোদনে ভেদিত ভূমিতল।
সে করুণ আর্ত্তনাদ শুনে উপজে বিষাদ,
এ পাপ রণের পরিচয়;
হা বিধাতঃ কি তোমার, চির করুণা অপার
মাঝারে এমন কার্য্য হয়।
দেখ আলু থালু কেশে, বিধবা মলিন বেশে
অহর্নিশি করিছে রোদন।
আহার বিহনে আহা, অবিরাম করে হাহা
পিতৃহীন যত শিশুগণ।
অনুঢ়া যুবতী কাঁদে বিনিয়া বিষাদ ছাঁদে
সুখের ভবন সে অরণ্য।
শস্যক্ষেত্র শোভমান এবে সমাধির স্থান,
উপবন এক্ষণে উৎসন্ন।
মহাবীর্য্য যুবা কত সমরে হইল হত,
নিবাইতে দুরাশা অনল।
সভ্যতা বিদ্যার বল! কোথা শান্তি কৈ কুশল,
অমৃতে যে উঠিল গরল।
ক্ষান্ত হও অতঃপর, হেন কাজ লজ্জাকর,
কর না জর্ম্মাণ সুতগণ।
বিজয়ে হইয়া মত্ত, ভুলিয়া পরম তত্ত্ব,
পাপাচার কেন অনুক্ষণ?
হের হের স্বর্ণপুরী তাতে ক্রোধানল পূরি,
সর্ব্বথা করিলে ছারখার।
ওই দেখ হ’য়ে স্থির, জিতের নয়নে নীর,
শুন হে আর্ত্তের হাহাকার।
একবার ভাব মনে, তব ভাবী সুতগণে,
স্মরি এই ক্রূর ব্যবহার।
পিতৃ নাম উচ্চারিতে, লজ্জিত হইবে চিতে,
তুলিতে নারিবে শির আর।
সত্য, জানে সব লোক, জ্বালিতে রণপাবক
ফ্রান্স আগে হৈল অগ্রসর।
বাসাইল রণতূরী, রাখিতে সুবর্ণপুরী,
শেষে ভয়ে প্রসারিল কর।
নারি নিবারিতে অরি, শেষে তনুত্যাগ করি,
তার সুতগণ পড়ে রণে।
ক্রমে দেখ দেখ তার, কিবা সুন্দর আগার,
মাটী হয় নিবাসী বিহনে।
মরিল অযুত লোক, তাই ফ্রান্স পেয়ে শোক
ছটফটি কাঁদে নিশিদিন।
ঊর্দ্ধ করি দুটী করে, সদা ডাকে উচ্চৈঃস্বরে,
ঈশ্বর হরহে এ দুর্দ্দিন।
প্রুশীয় নির্দ্দয় যদি, সাধি বাদ এ অবধি,
এখনও বৈরাচার করে।
ফ্রান্সের সব ধন, করিতে চাহে হরণ,
ফরাশীশ না স’বে অন্তরে।
মরিবে দেশের লাগি, হবে শতদুখভাগী,
শুন ওই শুন ভেরী-রব।
সাজিল সমরে ঘোর, সাহসেতে করি জোর,
“মরি কিবা বাঁচি” রণে সব।
লভিবারে স্বাধীনতা, ত্যজিয়া কাপুরুষতা,
বীরদম্ভে চলে পৃথ্বী পর।
শোধিবে সব নিগ্রহ, করিবে ঘোর বিগ্রহ,
বিনাশিবে অরাতি নিকর।
* * * * * *
এ বৎসর শীত ঋতুর অসাধারণ প্রচণ্ডতা; তিন সপ্তাহ পর্য্যন্ত ধরাতল তুষারাবৃত রহিয়াছে। সর্ব্বত্রই জল জমিয়া গিয়াছে এবং বরফের উপর ছুটাছুটী সর্ব্বদাই হইতেছে। গৃহাভ্যন্তরে পাত্রস্থ বারি তুষারস্তরে আবৃত হইয়াছে, কখন কখন এমন অধিক বরফ পড়িতেছে যে, পথের উপর প্রায় ৯ অঙ্গুলি পরিমাণ বরফ জমিয়া গিয়াছে এবং মনুষ্যগণের ও শকটাদি গমনাগমনের অত্যন্ত কষ্ট হইয়াছে।
অনন্তর এই দীর্ঘ শীতকালের অবসান হইতে এবং বরফ গলিয়া যাইতে আরম্ভ হইল। দুই চারি দিন আমরা সুখসেব্য বায়ু সেবন করিলাম; কিন্তু আবার শীত উপস্থিত, বরফের উপর দৌড়াদৌড়ি পুনরায় আরম্ভ হইল এবং পথ সকল ঘন তুষারে আবৃত হইল। অদ্য আমি অতি সুখে নানা স্থানে ভ্রমণ করিলাম, এবং দৃঢ়ীভূত বরফরাশি অস্তাচল-চূড়াবলম্বী দিনপতির পীতবর্ণ কিরণে অপরূপ শোভা ধারণ করিয়াছে দেখিলাম।
এই দেশে আমি শীতকালে যেমন সুখ সম্ভোগ করি,তেমন অন্য সময়ে করি না। এক্ষণে প্রত্যুষে বহির্গত হইলে তুষারানিল তীক্ষ শরের ন্যায় চক্ষু কর্ণ নাসিকার ব্যথা জন্মাইয়া থাকে; তথাপি একবার চঞ্চলগমনে পথ ভ্রমণ করিয়া আসিলে শরীর যেরূপ সুস্থ ও বলিষ্ঠ জ্ঞান হয়, তদ্রূপ আর কোন কালেই হয় না। কিন্তু এই দুরন্ত সময়ে এখানকার দরিদ্র লোকের অবস্থা দেখিলে হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যায়। সহস্র লোক অতি জঘন্য গৃহে বাস করে, তাহার বাতায়ন দ্বার না থাকাতে শীতানিল নিবারণ করিতে পারে না, একটু কয়লা পায় না যদ্বারা বাসগৃহকে উত্তপ্ত করে, গাত্রে এমন বস্ত্র নাই যদ্বারা কথঞ্চিৎ শীত রক্ষা হয়, এবং কাহার কাহার এমন সংস্থান নাই যে পুষ্টিকর বস্তু আহার করে। এখানে শীতকালে অনেক লোক উপযুক্ত আহার ও বাসস্থান অভাবে পীড়াগ্রস্ত ও অকালে কালগ্রাসে পতিত হয়।
* * * * * *
আমার স্বদেশ প্রত্যাবর্ত্তনের দিন ক্রমেই নিকটবর্ত্তী হইতেছে। এক্ষণে স্বদেশের কথা আমার অন্তঃকরণে কতবারই উদয় হয় এবং কতই বা আমি সেই স্বদেশের বিষয় অনন্যমনা হইয়া চিন্তা করি, তাহা আপনি অনুভব করিতে পারেন না। এ বিষয়ে আমি একটী বন্ধুকে লক্ষ্য করিয়া সম্প্রতি একটা কবিতা লিখিয়াছি, তাহা প্রেরণ করিতেছি।
স্বদেশ কাহিনী এবে পড়ে কি হে মনে?
বহু দিন হ’ল হেথা এসেছি দুজনে।
কত সুখ দুঃখ কথা জাগরিত হয়,
নিশার স্বপন সম সহসা উদয়।
স্বদেশ নগর-পথে ভ্রমিতাম কত,
স্নান যবে তারা-জোতি রজনী বিগত;
নির্জন নগর-পথে ভ্রমেছি দুজনে।
কত ভাব,ভাবিতাম পড়ে কি হে মনে?
অস্তমিত রবি যবে, অবসান বেলা,
হেরিতাম জাহ্ববীর তরঙ্গের খেলা;
শুনিতাম তরঙ্গের সুললিত তান,
গাইতাম কখন বা আনন্দের গান॥
সন্ধ্যায় হেরেছি কত স্বদেশের শোভা,
ভ্রমিয়াছি গ্রাম্যবনে অতি মনোলোভা।
হাসিয়াছি হেরে স্বভাবের চারু বেশ।
কাঁদিয়াছি স্মরিয়া মানব দুঃখ কেশ॥
যাপন করেছি দিবা বিদ্যালোচনায়—
যাপন করেছি নিশি কত ভাবনায়;
জন্মভূমি-কথা সদা জাগরিত হয়,
নিশার স্বপন সম সহ উদয়॥
* * * *
মধ্যে যে শিল্পসামগ্রীর পরিদর্শন হইয়াছিল, সে দিবস আমরা তাহা সন্দর্শন করিতে গিয়াছিলাম। যাহা যাহা দেখিলাম, তন্মধ্যে পৃথিবীস্থ সমস্ত জাতীয় ও সকল স্থান হইতে সযত্ন-সংগৃহীত চিত্র-পটগুলি আমাদিগের চক্ষে তাল লাগিয়াছিল। ইংরাজী ছবিগুলি ইউরোপীয় অন্যান্য জাতির ছবি অপেক্ষা অনেক নিকৃষ্ট তাহার সন্দেহ নাই, এবং ইটালী, ফ্রান্স এবং বেলজিয়ম দেশীয় চিত্রকার্য্য সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।
উক্ত প্রদর্শনের অন্যান্য অংশও কম মনোহর নহে। তন্মধ্যে ভারতবর্ষজাত দ্রব্যসামগ্রীসমগ্র দর্শাইবার নিমিত্ত একটা স্থান নির্দিষ্ট ছিল, এবং তথায় গালিচা, পাটী, শাল, বহুমূল্য ও সুদৃশ্য বস্ত্র, তাস, কিংখাব, হস্তিদন্ত-নির্ম্মিত দ্রব্য এবং ভারতবর্ষীয় মহিলাগণের ব্যবহার্য্য স্বর্ণরৌপ্যাদিনির্মিত আভরণ সমুদায় প্রদর্শিত হইয়াছিল। ইংলণ্ড-মহিলাগণ অতি আশ্চর্য্যের সহিত সেই সকল গহনা দর্শন করিতেছিল, কোথায় কি পরা যায়, কিছুই বুঝিতে পারিতেছিল না। তথায় কি প্রণালীতে পটু বস্ত্র রচিত হয়, কুম্ভকারগণ কিরূপে মৃৎপাত্রাদি প্রস্তুত করে, কিরূপে দুলিচা গালিচা এবং অন্যান্য শ্রমজাত দ্রব্য প্রস্তুত হয়, তাহা দেখাইবার জন্য যে কত কার্যালয় সংস্থাপিত হইয়াছিল, তাহার ইয়ত্তা করা যায় না। আমরা ছয় ঘণ্টা বেড়াইয়াছিলাম, কিন্তু প্রদশিত তাবৎ দ্রব্য ভাল করিয়া দেখিয়া শেষ করিতে পারিলাম না।
ইংলণ্ড হইতে প্রত্যাগমন করিবার পূর্ব্বে তদ্দেদেশীয় অদ্বিতীয় কবি সেক্সপিয়ারের জন্ম-গৃহ ও বাসগৃহ সন্দর্শন করিলাম। এবং যে অনতিদূরবর্ত্তী ক্ষেত্র হইতে তিনি বালস্বভাবসুলভ ক্রীড়াসক্তি প্রযুক্ত হরিণ-শিশু চুরি করিয়াছিলেন, তাহাও প্রদর্শিত হইল। আভন নদীতীরে এক গির্জার অভ্যস্তরে এই মহাকবি চিরনিদ্রায় নিদ্রিত আছেন।
সন্ধ্যার সময় কেনিলওয়ার্থ নামক সুবিখ্যাত দুর্গ দর্শন করিয়া লণ্ডনে ফিরিয়া আসিলাম।
সপ্তম অধ্যায়।
গত আগষ্ট মাসের চতুর্দ্দশ দিবসে আমরা লণ্ডন নগর পরিত্যাগ করিয়া তৎপরদিনে অর্থাৎ জগৎবিখ্যাত নেপোলিয়ান বোনাপাটির জন্মদিনে ফ্রান্সের রাজধানী পারিস নগরে উপনীত হইলাম। পারিস অতি সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্য্যশালী নগর। এরূপ নগর আমি আর দেখি নাই। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এই যে বিগত যুদ্ধ ইহাকে ছিন্নভিন্ন ও হতশ্রী করিয়া ফেলিয়াছে। এবং ইহার ভূষণস্বরূপ বহু প্রাসাদ ও অট্টালিকার কেবল ভগ্নাবশেষ অধুনা দেখিতে পাওয়া যাইতেছে। যে সুরম্য উদ্যান, যে সুগঠন প্রস্তরময় মূর্ত্তি সকল সন্দর্শন করিয়া পর্যটকগণ পুলকিত ও চমৎকৃত হইত, তাহাদিগের বর্ত্তমান দশা দেখিলে অন্তঃকরণে অননুভূতপূর্ব্ব অনির্ব্বচনীয় ভাবের উদয় হয়। যদিও পারিস নগরের যার পর নাই দুর্দ্দশা ঘটিয়াছে, তথাপি তাহার যে সৌন্দর্য্য এখনও দেখিতে পাওয়া যায়, তাহাতে কে যুগপৎ হর্ষ-বিস্ময় প্রকাশ না করিয়া থাকিতে পারে? রাত্রিকালে এখনও দেখ সমস্ত পথ আলোকময়, সমস্ত রাজমার্গ লোকারণ্যময়, বোধ হইবে যেন এই নগর কেবল প্রমোদে ও উৎসবে উন্মত্তপ্রায় হইয়া আছে। প্রায় সকল পথই সুন্দর ও পরিষ্কৃত, দুই পার্শ্ব বৃক্ষশ্রেণীতে শোভিত এবং রাত্রিকাল আলোকে সমুজ্জ্বলিত। লুভর নামক প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া আমরা অতিসুন্দর চিত্রকর্ম্ম ও প্রস্তরমুর্তি সন্দর্শন করিলাম। সেই সমস্ত ছবির রূপলাবণ্য ও ভাবভঙ্গীর বিষয় আর বিশেষ করিয়া কি লিখিব, কেবল এই মাত্র লিখিতব্য যে, তৎসমুদায় স্বচক্ষে নিরীক্ষণ না করিলে কেবল বর্ণনা দ্বারা চিত্রকরের নৈপুণ্যের সম্যক পরিচয় দেওয়া অতীব কঠিন।
পারিসের মধ্যে একটা সিংহদ্বার আছে, তাহাকে আর্চ অব ট্রাইয়ম্ফ কহে; ইহা নেপোলিয়ন বোনাপার্টির দিগ্বিজয়-চিহ্ন স্বরূপ তদীয় আদেশক্রমে নির্ম্মিত হইয়াছিল। সৌভাগ্যক্রমে বিগত সংগ্রামে ইহার কোন অনিষ্ট হয় নাই। ইহার উপর বিস্তর উৎকৃষ্ট কারিকুরি ও নেপোলিয়ান যেখানে যেখানে জয়লাভ করিয়াছিলেন, তাহার নাম ও সংখ্যা উচ্চাক্ষরে লিখিত আছে। আমরা এই ঘরের উপরে উত্থান করিয়া সমস্ত পারিস নগর ও তন্নিম্নস্থ সীন নামক নদ সন্দর্শন করিলাম। আহা কি চমৎকার দর্শন! পারিস কি পরিচ্ছন্ন ও সুনির্ম্মিত নগর। সীন নদও অতি সুন্দর ও পরিষ্কার। লণ্ডনের নীচে টেম্স্ নদের ন্যায় অপরিষ্কার ও জঘন্য নহে। আমরা এক ষ্টীমারে আরোহণ করিয়া সীন নদ দিয়া প্রসিদ্ধ নতরদাম নামক গির্জা দেখিতে গেলাম। ইহাতে যে চমৎকার শিল্পনৈপুণ্য প্রদর্শিত হইয়াছে, তাহা বর্ণনাতীত। প্রকৃতই ফ্রান্সের মধ্যে ইহা সর্ব্বোত্তম গির্জা। রোগীদিগের আবাস নিমিত্ত আর একটী উত্তম অট্টালিকা আছে। নেপোলিয়ন বোনাপাটির মৃতদেহ সেণ্টহেলেনা দ্বীপ হইতে আনীত ও এই স্থানে সমাহিত হইয়াছে। এক মর্ম্মর-নির্ম্মিত গৃহে মর্ম্মর-নির্ম্মিত থাম ও মুর্ত্তির মধ্যে এবং এক প্রকাণ্ড গম্বুজের নীচে তাঁহার সমাধিমন্দির বিরাজিত আছে। এই গম্বুজের চাকচক্য বহু দূর হইতে দৃষ্টিগোচর হইয়া থাকে। এক কালে এই সমাধিমন্দিরের চতুষ্পার্শ্বে ১৯০ জয়-পতাকা উড্ডীন ছিল। কিন্তু এক্ষণে তৎসমুদয় স্থানান্তরিত হইয়াছে।
অনন্তর আমরা সাঁক্লু, নামক স্থানে গেলাম। ইহা ফ্রান্সের অধিপগণের অতিপ্রিয় বাসস্থান ছিল। তথায় যাইবার সময় ফ্রান্সের চতুর্দ্দিকস্থ প্রাচীর সন্দর্শন করিলাম। বিগত অবরোধ-সময়ে বর্ষিত গোলাগুলির আঘাতে ইহার শরীর ক্ষতবিক্ষত হইয়াছে দেখিলাম। সাঁক্লুর প্রাসাদ ভস্মীভূত হইয়াছে, কিন্তু তাহার চতুস্পার্শ্বস্থ সুন্দর উদ্যান ও পদবী সমস্ত পূর্ব্বাবস্থায় আছে। আমরা এই স্থানে দুই ঘণ্টা মাত্র অবস্থিতি করিয়া ভর্সেলস্ নগরাভিমুখে যাত্রা করিলাম।
ভর্সেলস-নগরস্থ অতি সমৃদ্ধ প্রাসাদ ফ্রান্সের অতি পরাক্রমশালী সম্রাট চতুর্দ্দশ লুইর অনুমত্যনুসারে নির্মিত হইয়াছিল। আমরা তাহার ভিতর গিয়া দেখিলাম যে, গৃহমাত্রই ছবি ও মূর্ত্তি দ্বারা উৎকৃষ্টরূপে সজ্জিত আছে ও তত্তাবৎই ফ্রান্সের গৌরব প্রকাশ করিতেছে। চিত্রকরের ভূলির কি মোহিনী শক্তি, কি ঐন্দ্রজালিক কৌশল! ভর্সেলসের উপবন সমুদায় অতি বিখ্যাত এবং লোকে বলে যে, তদ্রূপ আর পৃথিবীতে দেখিতে পাওয়া যায় না। তথায় পরিচ্ছন্ন পথ, ছায়াময় পদবী, কৃত্রিম জলস্তম্ভ, সুশোভন দীর্ঘিকা, নিকুঞ্জ কানন এবং নিভৃত আসন সমুদায়ই আছে। বোধ হয় যেন ক্রীড়াকুশল দেবদেবীগণের ইহা এক রমণীয় কেলি-কানন।
অনন্তর আমরা ভর্সেলস হইতে পারিস নগরে প্রত্যাগত হইয়া ১৮ ই আগষ্ট প্রাতে রাইন নদতীরস্থ কলোন নগরাভিমুখে যাত্রা করিলাম। এবং বেল্জিয়ম দেশের ভিতর দিয়া আসাতে দেখিলাম যে, ঐ দেশ পর্ব্বতময় এবং সুদর্শন। সন্ধ্যার সময় কলোন নগরে পঁহুছিলাম; এই স্থানে ওডিকলোন নামক সুগন্ধ জল প্রস্তুত হয় বলিয়াই এ গ্রাম এত বিখ্যাত। কিন্তু ইহার ন্যায় জঘন্য স্থান, অতি কম দেখিতে পাওয়া যায়। পরদিন প্রাতে মায়েন্সনগরে যাইবার নিমিত্ত ষ্টীমারে আরোহণ করিলাম। রাইন নদ অতি বৃহৎ এবং যে যে প্রদেশ দিয়া প্রবাহিত হইতেছে, তাহা দেখিলে যুগপৎ আমোদ ও বিস্ময়ের আবির্ভাব হয়। আমরা তাহার সৌন্দর্য্যের ভূয়সী প্রশংসা করিতে করিতে ধীরে ধীরে উজানে যাইতে লাগিলাম। ক্রমে রাইন নদ শৃঙ্খলবদ্ধ সুন্দর হ্রদ-সমুহের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল, উভয় পার্শ্বে দ্রাক্ষালতামণ্ডিত দুর্গ-শোভিত পর্ব্বতশ্রেণী শোভা পাইতেছে। সন্ধ্যার সময় বাডন-বাডন নগরে আসিলাম। এই স্থানটি অতি পরিপাটী, উদ্ভিদ্-শোভিত, শৈলবেষ্টিত এবং পর্ষটকদিগের পরম রমণীয়। এখানে কি প্রাতঃ, কি মধ্যাহ্ন, কি রাত্রি, সকল সময়েই প্রকাশ্যরূপে জুয়া খেলা হইয়া থাকে। রাত্রিতে ঐ খেলার গৃহ সকল আলোকে ঝক্মক্ করে এবং তথা হইতে সর্ব্বদাই স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার শব্দ নির্গত হইয়া থাকে। আমরা শুনিলাম যে, আগামী বৎসর হইতে এই মহানিষ্টকর ব্যসন রাজাজ্ঞা দ্বারা প্রতিষিদ্ধ হইবেক। অনন্তর বাডন-বাডন নগর পরিত্যাগ করিয়া সুইজর্লণ্ডদেশস্থ রাইন নদের প্রকাণ্ড জলপ্রপাত সন্দর্শন করিতে গেলাম। দেখিলাম ফেনময় প্রভূত জলরাশি শৃঙ্গ হইতে শৃঙ্গান্তরে নিপতিত ও শৈলরাশি ভেদ করিয়া অতিবেগে প্রবাহিত হইতেছে। সে শোভা সৌন্দর্যের পরিসীমা নাই; আর শুভ্র কুজ্ঝটিকার ন্যায় ফেনরাশিতে সূর্য্যরশ্মি পড়াতে এক উজ্জ্বল ইন্দ্রধনু এই প্রপাতের উপর সতত পরিশোভমান হইয়া আছে।
এই স্থান হইতে জুরিচ, তথা হইতে লুসরণ নগরে গেলাম। লুসরণ নগরের নিকটে একটা হ্রদ তাছে। তদ্রুপ সুন্দর হ্রদ, বোধ হয়, ইয়ুরোপের মধ্যে নাই। উহা রবিকরোউজ্জ্বল তুষার-শেখর উচ্চপর্ব্বত দ্বারা বেষ্টিত। রিগি পর্ব্বত ৬০০০ ফিট উচ্চ, আমরা রেলগাড়ীতে তদুপরি উঠিলাম। রেলগাড়ী দ্বারা পর্ব্বত আরোহণ করা অতি আশ্চর্য্য ব্যাপার সন্দেহ নাই। গাড়ী চালাইবার নতুন কৌশল দেখিলাম। এঞ্জিন পশ্চাতে থাকে এবং গাড়ীকে ঠেলিয়া তোলে, এবং এরূপ কৌশলে রেল পাতিত হইয়াছে যে, সেই গাড়ী স্থলিত হইয়া নিম্নদিকে আসিয়া পড়িতে পারে না। ঐ পর্ব্বতের শেখরদেশ হইতে চতুর্দ্দিকে নেত্রপাত করিলে আহ্লাদের আর পরিসীমা থাকে না; নীচে লুসরণ ও জুগ নামক দুই হ্রদের নীলোজ্জ্বল জলের সুস্থির ও অনুপমেয় শোভা এবং তত্তীরস্থ লুসরণ ও জুগ নামক নগরের রবিকিরণোদ্দীপ্ত গৃহাবলী দেখা যাইতেছে! ঐ হ্রদের নীল নীরে পাইল তুলিয়া ষ্টীমার যাইতেছে; বোধ হইতেছে যেন, মরাল সন্তরণ করিতেছে। দক্ষিণ ও পশ্চিমদিকের দর্শন এরূপ নহে। সেদিক কেবল কুজঝটিকাময় ও অভ্রভেদী পর্ব্বতমালায় বেষ্টিত, সে দিকে আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হয় না। যে শোভা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিলাম, তাহা অদৃষ্টপূর্ব্ব ও অচিন্তনীয়। সেই অখণ্ড, অনন্ত ও তরঙ্গ সদৃশ পর্ব্বতশ্রেণী সমুদয় সন্দর্শন করিলে এক অনাসাদিত ও অপূর্ব্ব আনন্দ অনুভব করা যায়। যে স্থল সুইজর্লণ্ডদেশীয় মাত্রেই শ্লাঘা ও আহলাদের সহিত সন্দর্শন করে অর্থাৎ যে স্থানে বিখ্যাত টেল, জেস্নার নামক শত্রুকে বিনাশ করিয়া স্বদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করিয়াছিল, উক্ত পর্ব্বতের চূড়া হইতে আমরা সেই স্থানও নয়নগোচর করিলাম।
অনন্তর আমরা উচ্চ পর্ব্বতের উপরিস্থ একটা হোটেলে গেলাম। এবং তথায় যাইবামাত্র এমন এক নিবিড় কুহায় সকল দিক আচ্ছন্ন করিল যে, ছয় হস্ত দূরস্থ কোন পদার্থই দেখা গেল না। অবিলম্বে শিলাবৃষ্টি আরম্ভ হইল, কিন্তু অধিক ক্ষণ থাকিল না; এবং অর্দ্ধ ঘণ্টার মধ্যেই পরিষ্কার আকাশে সুর্য অস্ত গেল।
লুসরণ হ্রদের একাংশের নাম ফ্লুলেন। লোকে বলে, “পৃথিবী মধ্যে না হউক, ইউরোপ মধ্যে ইহা এক পরমশোভনীয় স্থান।” সেহ স্থির হ্রদ এবং তদুভয়পার্শ্বস্থ পর্ব্বতশ্রেণীর শোভা চিত্রিত পটের ন্যায় বোধ হয়।
লুসরণ পরিত্যাগ করিয়া আমরা ষ্টীমার ও অশ্ব শকটে আরোহণ করিয়া দুই হ্রদের মধ্যস্থিত ইনটারলাকেন নামক নগরে উপনীত হইলাম। সন্ধ্যার সময় আমরা ইন্টরলাকেন নগরে উত্তীর্ণ হইলাম এবং বহুদূরবর্ত্তী জংফ্রা। গিরির তুষারাবৃত ও নির্ম্মল সুধাংশুকরোদ্দীপ্ত শেখর নয়ন-পথে পতিত হইল। অনন্তর প্রাতঃকালে হ্রদ ও পর্ব্বতমালাবেষ্টিত অতি মনোহর ইন্টরলাকেন নগর পরিত্যাগ করিয়া ষ্টীমারযোগে তুন নামক হ্রদ দিয়া অপরাহ্নে বরন নামক নগরে উপস্থিত হইলাম। এই নগর অতি সুশ্রী; ইহাতে একটা বৃহৎ গির্জা, সুগঠন সৌধমালা ও পরিস্কার পথ আছে। এখান হইতে অল্প্স্ পর্বতশ্রেণী দেখিতে পাওয়া যায়। তথা হইতে আমরা অতিসুন্দর জেনিবা হ্রদতীরস্থ লসেন নামক নগরে গেলাম। এই স্থানে সুবিখ্যাত পুরাবৃত্তলেখক গিবন স্বরচিত রোম দেশের ইতিহাস সম্পূর্ণ করিয়াছিলেন। তাঁহার বাসস্থলে “গিবন হোটেল” নামক একটা গৃহ নির্ম্মিত হইয়াছে।
যাইতে যাইতে আমরা সেই ভয়াবহ দুর্গের সমীপদেশে পঁহুছিলাম, যাহার নাম কেহ মুখে তানিতে চাহে না; তাহাকে শিলন দুর্গ কহে। তথাকার ভূগর্ভস্থ অতি ভীষণ গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলাম, এই স্থানে বীরবর বনিভার্ড শৃঙ্খলাবদ্ধ হইয়া ছয় বৎসরকাল অতীব দুঃখে যাপন করিয়াছিলেন। তিনি জেনিবা নগরের স্বাধীনতা রক্ষা করিতে অস্ত্র ধারণ করিয়াছিলেন বলিয়া এই বিষম দুর্দ্দশাগ্রস্ত হইয়াছিলেন। শিলন দুর্গে আর কয়েকটী ভয়ানক স্থান দেখিলাম। তন্মধ্যে উবলিএত্ যার-পর-নাই ভয়ঙ্কর। ইহা গাঢ় তিমিরাবৃত; ইহার দ্বারদেশ হইতে তিনটা সোপান দেখিতে পাওয়া যায়। বোধ হয় যেন তাহার নীচে আরও সোপান আছে, যদ্বারা অন্য এক ভূতলস্থ গৃহে যাইতে পারা যায়। কিন্তু বস্তুতঃ আর সোপান নাই। ভ্রান্তকারাবাসিগণ চতুর্থ সোপানে পদার্পণ করিতে গিয়া একেবারে ৫ হস্ত নীচে পড়িয়া যায়। আহা, মনুস্যগণ স্বজাতির নিষ্পীড়নার্থে কতই কৌশল করিয়া রাখিয়াছে।
শিলন হইতে ষ্টীমারযোগে জেনিবা নগরে আসিলাম। আসিতে আসিতে হ্রদের একদিকে কৃষ্ণবর্ণ জুরা পর্ব্বতশ্রেণী, অপর দিকে মহান্ আল্পস গিরি নেত্রগোচর হইল। জেনিবা নগর অতি পরিপাট্য ও জনাকীর্ণ, এই স্থানে রুসো ও সিস্মণ্ডি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন।
সুইজর্লণ্ডদেশে ভ্রমণ করিতে করিতে অতি নিম্নশ্রেণীস্থ লোকদিগের উত্তমাবস্থা দেখিয়া চমৎকৃত হইতে হয়। অতি সামান্য গ্রামে গেলেও সুন্দর ও সুবর্ণ কাষ্ঠ-নির্ম্মিত কুটীর সমুদায় ও তন্নিকটস্থ সুকর্ষিত শস্যক্ষেত্র নয়নগোচর হয়। অধিবাসী কৃষিগণ স্ব স্ব অবস্থাতে মহা সন্তুষ্ট, এবং স্বদেশের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত বলিয়া বোধ হয়। পরিচ্ছন্নতা গুণে, ধী-সম্পত্তিতে, ও শিষ্টাচারে সুইজর্লণ্ডের কৃষিগণ ইয়রোপীয় সমশ্রেণীস্থ লোকাপেক্ষা উত্তম এবং ইংলণ্ডদেশীয় কৃষকবৃন্দাপেক্ষা যে কত উৎকৃষ্ট, তাহা বলা যায় না। কৃষকপত্নীগণ আপন আপন কুটীরের বাহিরে উপবিষ্ট হইয়া বস্ত্রাদি সিলাই করে, তাহাদিগের সুস্থ ও সুবেশধারী সন্তানগণ উপবনসদৃশ ক্ষেত্রে দৌড়াদৌড়ি করিয়া বেড়ায়।
অনন্তর আমরা সেণ্ট গথার্ড নামক প্রসিদ্ধ পথ দিয়া ইতালীর মধ্যে প্রবেশ করিলাম। এই পথ দিয়া পূর্ব্বাকালে হানিবল ও ইদানী নেপোলিয়ান যুদ্ধযাত্রা করিয়াছিলেন! এই পথের পার্শ্বে ভয়ঙ্কর উচ্চ পর্ব্বত-চূড়া এবং অদুরে বেগবতী পার্ব্বতীয় নদী নৃত্য করত শৃঙ্গ হইতে শৃঙ্গান্তরে পতিত হইতেছে। যখন আমরা শকটযোগে ক্রমে আল্প্স্গিরির উপরে উঠিতে লাগিলাম, তখন অন্তঃকরণ যে কিরূপ প্রফুল হইতে লাগিল, তাহা আমি বর্ণনা করিতে অশক্ত। যদিও এখন গ্রীষ্মকাল, তথাপি এস্থান এমন শীতল যে, আমাদিগের গাত্র-বস্ত্রে শীত রক্ষা হইল না। পরিষ্কার আকাশে চন্দ্রোদয় হইয়াছিল এবং আল্প্স্ পর্বত অতি সুন্দর দেখাইতেছিল। ক্ষণকাল পরে আমরা বিখ্যাত সেণ্ট গথার্ডের উপরিস্থ হ্রদ ছাড়িয়া আসিলাম, এই হ্রদের কৃষ্ণবর্ণ জল নিকটস্থ চন্দ্রকিরণোচ্ছল পর্বতশৃঙ্গের সহিত তুলনায় বড়ই শোভাযুক্ত বোধ হইয়াছিল। পরদিন অপরাহ্বে আমরা কমে নগরে পঁহুছিলাম।
ইতালির মধ্যে একটা সুন্দর হ্রদের উপর এই নগর; দেখিতে অতি সুন্দর। বিকালে কমো নামক হ্রদে অতি সুখের সহিত স্নান ও তদনন্তর আহার করাতে পূর্ব্বদিনের সমস্ত পথক্লান্তি দূরীভূত হইল। এখান হইতে নির্গত হইয়া মিলান নগরে উপনীত হইলাম এবং তথাকার শেত-প্রস্তরনির্ম্মিত সুদর্শন গির্জা দেখিলাম। ইহার ভাস্বরের কার্য্য প্রভৃতি অতি বিস্ময়কর। কারিকরি দেখি বোধ হইল যে, এমন সর্ব্বঙ্গসৌষ্ঠব ও সুশ্রী গির্জা ইয়ুরোপের মধ্যে আর নাই।
এই নগরে একটা ছবি প্রদর্শনের স্থান আছে। লোকে বলে ইহা ইয়ুরোপের মধ্যে অদ্বিতীয়; কিন্তু আমরা পারিসে যেমন দেখিয়াছিলাম, তদপেক্ষা এই সমস্ত ছবি নিকৃষ্ট বোধ হইল। কারণ প্রায় সকল ছবিগুলি অতি পুরাতন এবং তন্নিমিত্ত বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে।
মিলান হইতে ভিনিস নগরে গেলাম। পূর্ব্বে যে এই নগর অতি ঐশ্বর্য্যশালী ছিল, নগর দেখিলেই তাহা স্পষ্ট বোধ হয়। তাহার গির্জা সমস্ত কি ছোট, কি বড়, দেখিতে অতি শোভাময়; এবং অট্টালিকা সকল রাজভবনের ন্যায়। নগরের বিশেষ শোভা এই যে, অন্য নগরে যে স্থানে রাস্তা পথ থাকে, এ নগরের সে স্থানে সমুদ্রজল জোয়ার ভাটা খেলিতেছে। বস্তুতঃ এই নগর সমুদ্রের উপর নির্ম্মিত, অট্টালিকা সকল সমুদ্র হইতে উথিত ও এক বাটী হইতে অন্য বাটীতে যাইতে হইলে নৌকাদ্বারা যাইতে হয়। এরূপ অভিনবদর্শন পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। বিশেষ ইহার পূর্ব্ববৃত্তান্ত স্মরণ করিলে ইহার আদর অনেক গুণে বৃদ্ধি হয়। ইহার এক্ষণে এইরূপ ভগ্নাবস্থা ও দুর্দ্দশা, কিন্তু পূর্ব্বকালে এই নগর ইয়ুরোপের মধ্যে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ বাণিজ্যস্থান ও প্রজাতন্ত্রের জন্মভুমিসরূপ ছিল।
তিন দিবস ভিনিস্ নগরে অবস্থান করিয়া তথাকার দর্শনযোগ্য সামগ্রী সমগ্র অর্থাৎ রাজপ্রাসাদ ও সভাগৃহ প্রভৃতি সন্দর্শন করিলাম। সভামন্দিরটী অতি বৃহৎ এবং উত্তম উত্তম ছবিদ্বারা সুশোভিত।
এখানে যে সকল ভয়ানক কারাগার আছে, তাহা সম্যক রূপে বর্ণনা করা সাধ্যাতীত।
এই স্থান ও কারাগারের নিকটে একটা বৃহৎ গির্জা ঘর আছে, তাহার বহির্ভাগে পিত্তলনির্ম্মিত কয়েকটা অশ্বমূর্ত্তি আছে। এই সমুদায় কন্ষ্ট্যাণ্টিন রোমনগর হইতে স্বকীয় রাজধানীতে লইয়া গিয়াছিলেন। কিন্তু তথা হইতে বিজেতা ভিনিনিয়ানগণ প্রত্যানয়ন করিয়াছিল; তথা হইতে আবার নেপোলিয়ন বোনাপাটি তৎসমুদয়কে পারিস নগরে আনিয়াছিলেন, পুনর্ব্বার তাহার ভিনিস নগরে ভাত হইয়াছে। এই গির্জা ব্যতীত অপর কয়েকটা গির্জা কাছে, তৎসমুদায়ই অতি সুদৃশ্য; এবং তাহাতে প্রসিদ্ধ ভাস্কর কানোবা প্রভৃতি কৃত বহুবিধ শিল্পকার্য্য দৃষ্টিগোচর হয়।
অনন্তর ২রা সেপ্টেম্বর দিবসে আমরা ভিনিস নগর পরিত্যাগ করিয়া রণ্ডিসি দিয়া বম্বে নগরাভিমুখে যাত্রা করিয়াছি। বোধ হয় যে, আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর দিবসে উক্ত নগরে পঁহুছিতে পারি।
