গৌড়রাজমালা
রমাপ্রসাদ চন্দ
সংখ্যা বিভাগ
উপক্রমণিকা
বঙ্কিমচন্দ্র লিখিয়া গিয়াছেন, "গ্রীণল্যাণ্ডের ইতিহাস লিখিত হইয়াছে; মাওরি-জাতির ইতিহাসও আছে; কিন্তু যে দেশে গৌড়-তাম্রলিপ্তি সপ্তগ্রামাদি নগর ছিল, সে দেশের ইতিহাস নাই।” উপাদানের অভাবকে ইহার প্রকৃত কারণ বলিয়া স্বীকার করা যায় না; অনুসন্ধান চেষ্টার অভাবই প্রধান অভাব।
ইংরাজ-রাজপুরুষগণ ইহা অনুভব করিবামাত্র, অনুসন্ধান-কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। তাঁহাদিগের শত-বর্ষব্যাপী অনুসন্ধান-চেষ্টায় যাহা কিছু আবিস্তৃত হইয়াছে, তাহাতে অনুসন্ধানের প্রয়োজন তিরোহিত হয় নাই; উত্তরোত্তর বদ্ধিত হইয়া উঠিয়াছে।
যাহারা স্মরণাতীত পুরাকাল হইতে বংশানুক্রমে এ দেশে বাস করিতে গিয়া, নানাবিধ জয়-পরাজয়ের ভিতর দিয়া বর্তমান অবস্থায় উপনীত হইয়াছে তাহাদিগের সহিত দেশের ইতিহাসের সম্বন্ধ সর্ব্বাপেক্ষা অধিক। তাহারা তথ্যানুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইলেই, অনুসন্ধান-চেষ্টা প্রকৃত পথে পরিচালিত হইতে পারে। ইহা এখন সকলেই মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিতেছেন।
বিগত এক শত বৎসরের অনুসন্ধান-লব্ধ ঐতিহাসিক তথ্যের বিচার-কার্য্যে প্রবৃত্ত হইবামাত্র বুঝিতে পারা যায়, মুসলমান-শাসন প্রবর্তিত হইবার পূর্ব্বকালবর্তী বরেন্দ্র-মণ্ডলের ইতিহাসের মধ্যেই সমগ্র বঙ্গবাসীর ইতিহাসের মূল সূত্রের সন্ধান-লাভের আশা করা যাইতে পারে। বরেন্দ্র-ভূমি প্রাচীন ভূমি বলিয়া, -বরেন্দ্র-ভূমি "দেব-মাতৃক” বলিয়া, -[মহানন্দার পূর্ব্ব-তীর হইতে করতোয়ার পশ্চিম-তীর পর্যন্ত] নানাস্থানে এখনও অনেক রাজ-দুর্গের, অনেক রাজভবনের, অনেক দেব-মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে বহু বিস্ময়বিজড়িত ঐতিহাসিক তথ্য প্রচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে।
ডাক্তার বুকানন্ হামিল্টন্, জেনারেল (স্যর আলেক্সাণ্ডার) কনিংহাম, ওয়েষ্টমেকট্, রাভেন্সা, (স্যর উইলিয়ম) হন্টার, অধ্যাপক ব্ল্যান্ প্রভৃতি বহুসংখ্যক রাজকর্ম্মচারী বরেন্দ্রভূমির নানাস্থানে তথ্যানুসন্ধানের সূত্রপাত করিয়াছিলেন। তাঁহারাই বরেন্দ্র-তথ্যানুসন্ধানের প্রথম পথ-প্রদর্শক। কিন্তু অবসরের অভাবে, কেহই ধারাবাহিকরূপে দীর্ঘকাল অনুসন্ধান-কাৰ্য্য পরিচালিত করিতে পারেন নাই।
এই সকল কারণে, বাঙ্গালীর ইতিহাসের উপাদান-সঙ্কলনের আশায়,- বরেন্দ্রমণ্ডলে ধারাবাহিকরূপে তথ্যানুসন্ধানের আয়োজন করিবার অভিপ্রায়ে -লঘাপতিয়ার শয়ৎকুমার রায় বাচা র এ-এ, [১৯১০ খৃষ্টাব্দে) একটি "বরেন্দ্র-অনুসভান-সমিতি" গঠিত করিয়া তধ্যানুসঙ্কানে ব্যাপৃত হইয়াছেন। তাঁহার অকাতর অর্থবায়, অক্লান্ত অধ্যবসায় এবং প্রশংসনীয় ইতিহাসানুরাগ, অল্পকালের মধ্যেই, অনুসন্ধান-সমিতিকে সকলের নিকট সুপরিচিত করিয়া তুলিয়াছে।
অনুসন্ধান-ক্ষেত্র এবং অনুসন্ধানের অবসর অল্প হইলেও, অনুসন্ধানের নিতান্ত অল্প হয় নাই। প্রথম ফলই প্রধান ফল। দেশের লোকে দেশের ইতিহাসের উপাদান-সঙ্কলনে প্রবৃত্ত হইলে, কোন্ প্রণালীতে অনুসন্ধান-কাৰ্য্য পরিচালিত করিতে হইবে, প্রথম হইতেই তাহা সমাক্ প্রতিভাত হইয়াছে। আন্তরিক অনুরাগপূর্ণ সহৃদয়তার সঙ্গে, দেশের লোকের সহিত মিলিত হইয়া তাহাদিগের সাহায্য লাভ করিতে না পারিলে, অনুসন্ধান-চেষ্টায় সম্যক্ সফলকাম হইবার আশা নাই। ইহা প্রথম হইতেই পরিলক্ষিত হইয়াছে। দেশের অধিকাংশ লোক নিরক্ষর, অথচ তাহারাই পুরাকীর্তির প্রকৃত সন্ধানদাতা। সহৃদয়তার অভাব থাকিলে, তাহাদিগের নিকট হইতে সকল বিষয়ের সন্ধানলাভের সম্ভাবনা থাকে না। সহৃদয়তার অভাব না থাকিলে, তাহারাই স্বতঃ- প্রবৃত্ত হইয়া, নানা বিষয়ের সন্ধান প্রদান করে। অনুসন্ধান-সমিতি এইরূপেই অনেক অজ্ঞাতপূর্ব্ব অনুসন্ধান-ক্ষেত্রের সন্ধান-লাভে সমর্থ হইয়াছেন।
অনুসন্ধান-সমিতি এ পর্যান্ত যতদূর অনুসন্ধান-কার্য্য পরিচালিত করিতে সমর্থ হইয়াছেন, তাহাতেই অনেক বিবরণ সঙ্কলিত হইয়াছে। বাঙ্গালীর ইতিহাসে উল্লিখিত হইবার যোগ্য অনেক স্থান আবিষ্কৃত ও পরীক্ষিত হইয়াছে, অনেক চিত্র সঙ্কলিত হইয়াছে এবং অনেক পুরাকীত্তির নিদর্শনও সংগৃহীত হইয়াছে। এই সকল নিদর্শন তিন শ্রেণীতে বিভক্ত হইবার যোগ্য-(১) পুরাতন স্থাপত্যের নিদর্শন, (২) পুরাতন ভাস্কর্যোর নিদর্শন, (৩) পুরাতন জ্ঞানধর্ম-সভ্যতার নিদর্শন [অপ্রকাশিত ও অপরিজ্ঞাত হস্তলিখিত সংস্কৃত গ্রন্থ]।
অনুসন্ধান-লব্ধ এবং পূর্ব্বাবিষ্কৃত ঐতিহাসিক তথ্য একত্র সন্নিবিষ্ট করিয়া "গৌড়-বিবরণ” নামক [খণ্ডশঃ প্রকাশিতব্য] গ্রন্থ সংকলন করিবার প্রয়োজন অনুভূত হইবামাত্র, অনুসন্ধান-সমিতি তাহার ব্যবস্থা করিয়াছেন। ভিন্ন ভিন্ন বিষয় ভিন্ন ভিন্ন ভাগে আলোচিত হইবে বলিয়া, "গৌড়-বিবরণ” আট ভাগে বিভক্ত হইয়াছে। তাহা যথাক্রমে-রাজমালা, শিল্পকলা, বিবরণমালা, লেখমালা, গ্রন্থমালা, জাতিতত্ত্ব, শ্রীমূত্তিতত্ত্ব ও উপাসক-সম্প্রদায় নামে অভিহিত হইবে।
গৌড়-বিবরণের প্রথম ভাগের প্রথম খণ্ড [অনুসন্ধান-সমিতির সুযোগ্য সম্পাদক শ্রীযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দ বি-এ প্রণীত] "গৌড়রাজমালা” প্রকাশিত হইল। তাহার সম্পাদন-ভার আমার উপর ন্যন্ত করিয়া, অনুসন্ধান-সমিতি আমার প্রতি যৎপরোনান্তি সমাদর প্রদর্শন করিয়াছেন। ইহা আমার পক্ষে নিরতিশয় স্নাঘার বিষয় হইলেও, এই ভার যোগ্যতর হস্তে ন্যস্ত করিতে পারিলেই ভাল হইত।
মুসলমান-শাসন প্রতিঠিত হইবার পূর্ব্বে, গৌডমণ্ডলে সেনবংশীয় নরপালগণের বিজয়-রাজ্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। তৎপূর্ব্বে পালবংশীয় নরপালগণ এ দেশের শাসন-কার্য্যে ব্যাপৃত ছিলেন। এ কথা ইতিহাস-বিমুখ বাঙ্গালীর নিকটও একেবারে অপরিচিত হইয়া পড়ে নাই। ইহার সঙ্গে জনশ্রুতি অনেক অলৌকিক কাহিনা জড়িত করিয়া দিয়াছে; কল্পনালোলুপ লেখকবৃন্দ তাহাকে অনেক রচনা-মাধুর্য্যে পল্লবিত করিয়া তুলিয়াছেন। কিন্তু কোন্সময় হইতে কিরূপ ঘটনাচক্রে, পাল-নরপালগণের অভাদয় সাধিত হইয়াছিল;-কোন্ সময় হইতে, কিরূপ ঘটনাচক্রে তাঁহাদিগের রাজ্য সেন-বংশীয় নরপালগণের করতলগত হইয়া, আবার কালক্রমে হস্তচ্যুত হইয়া গিয়াছিল;-তাহার সহিত দেশের লোবেব কতদূর পর্যন্ত কিরূপ সম্পর্ক বর্তমান ছিল;-তাহা নানা তর্কবিতর্কে আচ্ছন্ন হইয়া পডিয়াছে। বাঙ্গালীর ইতিহাসের এই সকল অবশ্যজ্ঞাতব্য কথা [উপযুক্ত আলোচনা-প্রণালীর অভাবে] জনসাধারণের নিকট শ্রদ্ধালাভ করিতে পারে নাই। এরূপ অবস্থায়, অনুসন্ধান-লব্ধ যৎসামান্য বিবরণের উপর নির্ভর করিয়া,ধারাবাহিক ইতিহাস সঙ্কলন করা কিরূপ কঠিন ব্যাপার, তাহা স্মরণ করিয়াই, "গৌড়রাজমালা" অধ্যয়ন করিতে হইবে। এই গ্রন্থের প্রধান অবলম্বন 'লেখমালা', -তাহাতে পুরাতন তাম্রশাসনের এবং শিলালিপির পাঠ, বঙ্গানুবাদ এবং টীকা সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। আর এক শ্রেণীর উল্লেখযোগ্য অবলম্বন, ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশে আবিষ্কৃত তাম্রশাসনের এবং শিলালিপির পাঠ, পুরাতন পুস্তক-নিহিত ঐতিহাসিক জনশ্রুতি এবং পূর্ব্বাচার্যগণের ঐতিহাসিক গবেষণা। তাহা গ্রন্থমধ্যে যথা- স্থানে উল্লিখিত হইয়াছে। লেখক মহাশয় যেরূপ প্রমাণের উপর নির্ভর করিয়া যেরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন, তাহা স্বাধীনভাবে ব্যক্ত করিয়াছেন। তাহা সঙ্গত হইয়াছে কি না, পাঠক-সমাজ তাহার বিচার করিবেন।
ইতিহাসের উপাদান সঙ্কলিত না হইলে, ইতিহসি সঙ্কলিত হইতে পারে না-তাহা বহুব্যয়সাধ্য, বহুশ্রমসাধ্য; এ সকল কথা বঙ্গসাহিত্যে পুনঃ পুনঃ ] উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু ইহাকেই একমাত্র অন্তরায় বলিয়া নিশ্চিন্ত হইবার উপায় নাই। কিরূপ বিচার পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ করা কর্তব্য, তদ্বিষয়েও সংকীর্ণতার অভাব নাই। ন্যায়নিষ্ঠ বিচারপতির ন্যায় নিয়ত সত্যোদঘাটনের চেষ্টাই যে ইতিহাস-লেখকের প্রধান চেষ্টা, তাহা ভাল করিয়া আমাদিগের হৃদয়ঙ্গম হইয়াছে বলিয়া বোধ হয় না। কবি কহলণ 'রাজতরঙ্গিণীর' উপোদঘাতে লিখিয়া গিয়াছেন,-
শ্লাঘ্যঃ স এব গুণবান্ রাগদ্বেষ-বহিষ্কৃতা।
ভূতার্থ-কথনে যস্য স্থেয়স্যেব সরস্বতী ।।
আমাদিগের সাহিত্যে এই উপদেশ-বাক্য এখনও সম্যক্ মর্য্যাদা লাভ করিতে পারে নাই। এখনও আমাদিগের ব্যক্তিগত, জাতিগত বা সম্প্রদায়গত অনুরাগ-বিরাগ, আমাদিগকে পূর্ব্ব হইতেই অনেক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের অনুকূল বা প্রতিকুল করিয়া রাখিয়াছে। পালবংশের এবং সেনবংশের নরপালগণের শাসন-সময়ে দেশের অবস্থা কিরূপ দাঁড়াইয়াছিল, তাহা যেন তুচ্ছ কথা-তাঁহাদিগের জাতি কি ছিল, তাহাই এখনও আমাদিগের নিকট প্রধান আলোচ্য হইয়া রহিয়াছে! জনশ্রুতির দোহাই দিয়া, [এক শ্রেণীর গ্রন্থে]দেশের অবস্থা-সম্বন্ধে যে সকল আলোচনার সূত্রপাত হইতেছে, তাহাতে ঐতিহাসিক বিচার-প্রণালী মর্য্যাদা লাভ করিতেছে না। এই সকল কারণে, গৌড়রাজমালার লেখক মহাশয় ভিত্তিহীন জনশ্রুতির উপর নির্ভর করিবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন নাই বলিয়া, বাঙ্গালীর জনশ্রুতি-মূলক ইতিহাসের প্রধান পাত্র [আদিশ্বর। ঐতিহাসিক ব্যক্তিরূপে মর্য্যাদা লাভ করিতে পারেন নাই। এখনও তাম্রশাসনে বা শিলা-লিপিতে বা সমকালবর্তী গ্রন্থে আদিশ্বরের অসন্দিগ্ধ পরিচয় প্রকাশিত হয় নাই। সমসাময়িক গ্রন্থে বা লিপিতে উল্লিখিত ঐতিহাসিক পাত্রগণের প্রকৃত বিবরণ সঙ্কলনেও কিরূপ সতর্ক দৃষ্টিতে বিচার-কার্য্যে প্রবৃত্ত হইতে হইবে, সুযোগ্য লেখক মহাশয় "গৌড়াধিপ-শশাঙ্কের” প্রসঙ্গে তাহার যথেষ্ট পরিচয় প্রদান করিয়াছেন।
পক্ষান্তরে, “গৌড়রাজমালায়” দেখিতে পাওয়া যাইবে, পাল-নরপালগণের অভ্যুদয়-লাভের অব্যবহিত পূর্ব্বে সমগ্র দেশ বহুসংখ্যক খণ্ড-রাজ্যে বিভক্ত ছিল; সমগ্র দেশের উপর কাহারও কোন রূপ আধিপত্য বিদ্যমান ছিল না; বাহুবল প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল; সবলের কবলে দুর্ব্বলদল নিপীড়িত হইতেছিল; দেশ একেবারে 'অরাজক' হইয়া পড়িয়াছিল! সংস্কৃত-সাহিত্যে এরূপ অবস্থার নাম "মাৎস্য-ন্যায়”। তাহাকে বিদূরিত করিবার অভিপ্রায়ে, প্রজাপুঞ্জ গোপালদেবকে রাজা নির্বাচিত করিয়াছিল। তিনিই পাল-নরপালবংশের প্রথম ভূপাল,-ইতিহাসে "প্রথম গোপালদেব” নামে উল্লিখিত।
এ দেশের প্রজাপুঞ্জ, অরাজকতা দূর করিবার জন্য একবার একজনকে রাজা নির্ব্বাচিত করিয়া, প্রজাশক্তির বিধিদত্ত অমোঘ বলের পরিচয় প্রদান করিয়াছিল,-ইহা বাঙ্গালীর ইতিহাসের সর্ব্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। পৃথিবীর কোন্ কোন্ দেশে, কোন্ কোন্ সময়ে, প্রজাশক্তির এরূপ উন্মেষ লক্ষিত হইয়াছে, তাহার আলোচনার সময়ে, বাঙ্গালীর ইতিহাসের এই উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি স্মরণ করিবার যোগ্য।
বাঙ্গালী ইহার কথা একেবারে বিস্মৃত হইয়া গিয়াছে! লামা তারানাথের [তিব্বতীয় ভাষা-নিবদ্ধ] গ্রন্থে এতদ্বিষয়ক জনশ্রুতির উল্লেখ থাকিলেও এবং বঙ্গদেশে এই জনশ্রুতির আভাস লৌকিক উপকথায় গ্রথিত রহিলেও, তাহাকে কেত ঐতিহাসিক ঘটনা বলিয়া গ্রহণ করেন নাই। কিন্তু গোপালদেবের পুত্র ধৰ্ম্মপালদেবের [মালদহের অন্তর্গত খালিমপুরে আবিষ্কৃত] তাম্রশাসনে ইহা স্পষ্টাক্ষরে উল্লিখিত থাকায়, এই উল্লেখযোগ্য ঘটনা ইতিহাসের মর্যাদা লাভ করিয়াছে। এইরূপে, [প্রজাশক্তির সাহায্যে] 'যে সাম্রাজ্য সংস্থাপিত হইয়াছিল, তাহা সমগ্র উত্তরাপথে [আর্য্যাবর্ডে] প্রভুত্ব লাভ করিয়াছিল। তাহার কথা এখনও বঙ্গসাহিত্যে যথাযোগ্য ভাবে আলোচিত হয় নাই। এই গৌডীয় সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের কথাই "গৌডরাজমালার” প্রধান কথা। গৌড়-বিবরণের অন্যান্য ভাগে [শিল্পকলায়, বিবরণমালায়, লেখমালায়, গ্রন্থমালায়, জাতিতত্ত্বে, শ্রীমূর্তিতত্ত্বে এবং উপাসকসম্প্রদায়ে] যাহা সন্নিবিষ্ট হইয়াছে, তাহারও প্রধান কথা,-এই গৌড়ীয়সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের কথা। কারণ ইহার সকল কথাই বাঙ্গালীর কথা। একটি কারণে, এ সকল কথা বাঙালীর নিকট যথাযোগ্য সমাদর লাভ করিতে পারে নাই। পাল-নরপালগণের জন্মভূমি কোথায় ছিল, তাঁহারা কিরূপে গৌড়ীয় সাম্রাজ্যে অধিকার লাভ করিয়াছিলেন, তাহার আলোচনা করিতে গিয়া, অনেকেই সিদ্ধান্ত করিয়া গিয়াছেন,-তাঁহারা মগধবাসী, মগধের অধিপতি ছিলেন; এবং ক্রমে বঙ্গভূমিতে রাজ্য বিস্তৃত করিয়া "গৌড়ে- শ্বর” উপাধি লাভ করিয়াছিলেন;-বাঙ্গালীরা তাঁহাদিগের পদানত হইয়াই বাস করিত। ধর্মপালদেবের তাম্রশাসনে পাটলিপুত্রে, দেবপালদেবের তাম্রশাসনে মুদগিরিতে [মুঙ্গেরে] এবং নারায়ণপালদেবের তাম্রশাসনেও মৃগ্ধদগিরিতে "জয়স্কন্ধাবার” সংস্থাপিত থাকিবার প্রমাণ প্রাপ্ত হইয়া, [অনেকের ন্যায়] আমি নিজেও সিদ্ধান্ত করিয়াছিলাম, পঞ্চ-পাল-নরপাল বঙ্গভূমিতে বাস করিতেন না। বরেন্দ্রমণ্ডলে অনুসন্ধান-কার্য্যে ব্যাপৃত হইবামাত্র, সে সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে। বরেন্দ্রমণ্ডলে সংস্থাপিত গরুড়-স্তম্ভের দ্বিতীয় শ্লোকে, ধৰ্ম্ম [পাল] প্রথমে পূর্ব্বদিকের অধিপতি থাকিয়া পরে [মন্ত্রীবর গর্গের মন্ত্রণা-কৌশলে] "অখিল দিকের” অধিপতি হইবার উল্লেখ 'আছে। তারানাথের গ্রন্থেও, প্রথমে গৌড়, পরে মগধ, বিজিত হইবার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে। "রামচরিত"-কাব্যে বরেন্দ্রভূমিই পাল-নরপালগণের "জনকভূমি” বালয়া অভিহিত হইয়াছে। সুতরাং, পাল-নরপালগণ যে বাঙ্গালী ছিলেন, তাহাতে আর সংশয়-প্রকাশের উপায় নাই।
পাল-নরপালগণ যদি বাঙ্গালী হইবেন, তবে তাঁহাদিগের রাজধানী কোথায় বিলুপ্ত হইয়া গেল? বাঙ্গালা দেশের কোন্ নিভৃত নিকেতনে বাঙ্গালার নির্বাচিত বাঙ্গালী নরপাল [গোপালদেব] রাজমুকুট মস্তকে ধারণ করিয়া- ছিলেন? কোন্ ভূমিখণ্ডে বাঙ্গালা প্রজাপুঞ্জের হৃদয় এরূপ অচিঞ্চিতপূর্ব্ব প্রজাশক্তি-বিকাশের প্রশংসনীয় গৌরবে স্ফাত ও স্পন্দিত হইয়া উঠিয়াছিল? কেহ কেহ [গৃহে বসিয়াই] ইহার মীমাংসা করিতে গিয়া, মীমাংসা-সাধনের অন্য উপায় না দেখিয়া অনুদান-বলে সিদ্ধান্ত করিয়াছেন,-পাল-নরপালগণের রাজধানী এক স্থানে প্রতিষ্ঠিত ছিল না; তাঁহারা জয়স্কন্ধাবারেই বাস করিতে ভালবাসিতেন; যেখানে যখন জয়স্বন্ধাবার সংস্থাপিত হইত, সেখানেই একটি তৎকালোচিত রাজনগর গঠিত হইয়া উঠিত।
রাজার পক্ষে এরূপ "যাযাবর-বৃত্তি” কখন কখন আনন্দপ্রদ হইবার সম্ভাবনা থাকিলেও, রাজ্যের পক্ষে এরূপ ব্যবস্থা নিতান্ত অসম্ভব বলিয়াই প্রতিভাত হইবে। যে রাজবংশ 'আর্য্যাবর্তব্যাপী বিপুল সাম্রাজ্যের অধাশ্বর হইয়াছিল, কোনও স্থানেই তাহার স্থায়ী রাজধানী বর্তমান ছিল না,-এরূপ অনুমানের আশ্রয় গ্রহণ করিতে সাহসী না হইয়া, অনুসন্ধান-সমিতি, বরেন্দ্রমণ্ডলে অনুসন্ধান-কার্য্যে ব্যাপৃত হইয়া, বিবিধ রাজনগরের ধ্বংসাবশেষের সন্ধান লাভ করিয়াছেন। "বিবরণ-মালায়” তাহার বিবরণ এবং প্রমাণাবলী সন্নিবিষ্ট হইয়াছে।
এ পর্যন্ত পাল-রাজবংশের দ্বিতীয়, তৃতীয়, পঞ্চম, নবম, একাদশ, এবং সপ্তদশ নরপালের তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে। এই সকল প্রাচীন লিপির সাহায্যে বুঝিতে পারা যায়, প্রথম নরপালের সময়ে, সাম্রাজ্য-প্রতিষ্ঠার সূত্রপাত;-দ্বিতীয় এবং তৃতীয় নরপালের সময়ে তাহার প্রকৃত অভ্যুদয় চতুর্থ এবং পঞ্চম নরপালের সময় পর্যন্ত গৌড়মণ্ডলে পাল-নরপালগণের শাসনক্ষমতা অক্ষুণ্ণ প্রতাপে বর্তমান। এই অভ্যুদয়-যুগ বাঙ্গালীর ইতিহাসের গৌরব-যুগ! এই যুগে, বরেন্দ্রমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করিয়া [ধৰ্ম্মপালদেবের এবং দেবপালদেবের শাসন-সময়ে] ধীমান্ এবং তৎপুত্র বীতপাল গৌড়ীয় শিল্পে যে অনিন্দ্য-সুন্দর রচনা-প্রতিভা বিকশিত করিয়াছিলেন, তাহার বিবরণ "শিল্পকলায়” সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। তাহার সন্ধান-লাভে অসমর্থ হইয়া, লেখকগণ এই যুগের মগধের এবং উৎকলের শিল্প-নিদর্শনকে মগধের এবং উৎকলের প্রাদেশিক শিল্প-প্রতিভার নিদর্শন বলিয়াই ব্যাখ্যা করিয়া আসিতেছেন।
ইহার পরবর্তী যুগের [খৃষ্টীয় একাদশ এবং দ্বাদশ শতাব্দীর] বাঙ্গালীর ইতিহাসও 'তমসাচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে। অনুসন্ধান-সমিতি এই যুগের যে সকল বিবরণ সঙ্কলিত করিতে সমর্থ হইয়াছেন, তদনুসারে এই দুই শত বৎসরের মধ্যে পাঁচ বার ভাগা-বিবর্তনের পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে।
প্রথম ভাগে, একটি প্রবল বিপ্লবের অবসানে পাল-সাম্রাজ্যের পুনরাবির্ভাব। তাহার নায়ক প্রথম মহীপালদেব এবং ফলভোগী তদায় পুত্র নয়পাল এবং পৌত্র তৃতায় বিগ্রহপাল। তাঁহাদিগের কথাই একাদশ শতাব্দীর প্রধান কথা।
দ্বিতীয় ভাগে, একটি অচিঞ্চিতপূর্ব্ব আকস্মিক প্রজা-বিদ্রোহ, রাজহত্যা এবং কিয়ৎকালের জন্য এক কৈবর্ত-রাজবংশের অভ্যুদয় ও তিরোভাব। তৎকালের প্রধান পাত্রগণের নাম [অনীতিকারম্ভ-রত] দ্বিতীয় মহীপালদেব' তাঁহার নিধনকারী [প্রজা-বিদ্রোহের নায়ক] কৈবর্তপতি দিব্বোক, তদীয় ভ্রাতা রূদোক এবং রূদোকের পুত্র ভাম রাজা।
তৃতীয় ভাগে, কৈবর্ত-বিদ্রোহেব অবসানে, পাল-রাজগণের জনক-ভূমির [বরেন্দ্রের] উদ্ধারসাধনের পর, পাল-সাম্রাজ্যের পুনরভুদয় এবং অধঃপতন। এই সময়ের নরপালগণের নাম- শূরপাল, রামপাল, রামপালের পুত্র কুমারপাল, পৌত্র তৃতীয় গোপাল এবং কুমারপালের ভ্রাতা মদনপাল।
চতুর্থ ভাগে, সেন-রাজবংশের অভ্যুদয় এবং রাজ্য-বিস্তার; তাহার নায়কবিজয়সেন, বিজয়সেনের পুত্র বল্লালসেন, এবং পৌত্র লক্ষ্মণসেন।
পঞ্চম ভাগ শেষভাগ,-তাহাতে বাঙ্গালা দেশে মুসলমান-অধিকার প্রচলিত হইবার সূত্রপাত।
এই পাঁচ ভাগে বিভক্ত [খৃষ্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর] বাঙ্গালীর ইতিহাসের বিচিত্র ঘটনাবলী দেশের লোকে বিস্মৃত হইয়া গেলেও, বরেন্দ্রমণ্ডলে তাহার নানা স্মৃতিচিহ্ন বর্তমান আছে। সেই সকল স্মৃতিচিহ্ন ধরিয়া অনুসন্ধান-কার্য্যে প্রবৃত্ত না হইলে, এই দুই শত বৎসরের ইতিহাসের প্রকৃত মর্ম্ম হৃদয়ঙ্গম হইতে পারে না।
প্রথম ভাগে যে বিপুল বিপ্লবের কথা উল্লিখিত হইয়াছে, শতাধিক বৎসর পূর্ব্বে [১৮০৬ খৃষ্টাব্দে বরেন্দ্রমণ্ডলের অন্তর্গত দিনাজপুর জেলার আমগাছী গ্রামে] আবিষ্কৃত তৃতীয় বিগ্রহপালদেবের তাম্রশাসনের একটি শ্লোকে তাহা সূচিত থাকিতেও অক্ষর-বিলোপের অত্যাচারে, অনেক দিন পর্যন্ত তাহার সম্পূর্ণ পাঠ উদ্ধৃত হইতে পারে নাই। এই শ্লোকটি নবম নরপাল মহীপাল দেবের [বরেন্দ্রমণ্ডলের অন্তর্গত দিনাজপুর জেলার বাণগড়ে আবিষ্কৃত] তাত্রশাসনেও উৎকীর্ণ থাকায়, উত্তরকালে ইহার প্রকৃত পাঠ উদ্ধৃত হইয়াছিল। যথা,
"হত-সকলবিপত্তঃ সঙ্গরে বাহু-দর্পাৎ
অনধিকৃত-বিলুপ্তং রাজ্যমাসাদ্য পিত্রাম্ ॥
নিহিত-চরণপদ্মো ভূভৃতাং মুদ্ধিণ তম্মাৎ
অভবদবনিপালঃ শ্রীমহীপালদেবঃ ॥"
ইহাতে জানিতে পারা গিয়াছিল,-মহীপালদেবের পিতৃরাজ্য 'অনধিকারী' কর্তৃক বিলুপ্ত হইয়াছিল এবং তিনি তাহা পুনরায় বাহুবলে লাভ করিয়া- ছিলেন। কিন্তু সেই অনধিকারী কে-তাহা অপরিজ্ঞাত ছিল।
সেই অনধিকারীর নাম এখনও অপরিজ্ঞাত রহিয়া গিয়াছে। কিন্তু তিনি ৮৮৮ শকাব্দায় [৯৬৬ খৃষ্টাব্দে] বরেন্দ্রমণ্ডলে শিবমন্দির প্রতিষ্ঠিত করিয়া আপনাকে "কাম্বোজান্বয়জ গৌড়পতি” বলিয়া প্রস্তরস্তম্ভে যে শ্লোক উৎকীর্ণ করাইয়াছিলেন, সেই শ্লোক-সংযুক্ত প্রস্তর-স্তম্ভটি অদ্যাপি বরেন্দ্রমণ্ডলেই [দিনাজপুরাধিপতির উদ্যান মধ্যে] বর্তমান আছে। তাহার সহিত বাঙ্গালীর ইতিহাসের সম্বন্ধ কি, “গৌড়রাজমালায়” তাহা বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যাত হইয়াছে। এইরূপে বাঙ্গালীর ইতিহাসে-পালরাজবংশের অধিকারকালে কাম্বোজান্বয়জ [আগন্তুক] গৌড়পতির সন্ধান-লাভের পর, অনুসন্ধানসমিতির সুযোগ্য সম্পাদক মহাশয় সেই নবাবিষ্কৃত ঐতিহাসিক সমাচার একটি ইংরাজী প্রবন্ধে লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন। তাহা [স্বনামখ্যাত সুপণ্ডিত স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সরস্বতী মহাশয়ের কৃপায়] এসিয়াটিক্ সোসাইটীর পত্রিকায় এবং [একটি বাঙলা প্রবন্ধে] 'সাহিত্য' পত্রে মুদ্রিত হইয়াছে।
দ্বিতীয় ভাগে যে প্রজা-বিদ্রোহ উল্লিখিত হইয়াছে, তাহা পাল-রাজবংশের পঞ্চদশ নরপাল কুমারপালের প্রধান মন্ত্রী [কামরূপাধিপতি] বৈদ্যদেবের [কমৌলীতে আবিষ্কৃত] তাম্রশাসনের একটি শ্লোকে সূচিত হইয়াছিল। ভীমকে নিহত করিবার পর বরেন্দ্রীর [জনকভূর] পুনরুদ্ধার-সাধনের কথা এই শ্লোকে রামপালদেবের প্রধান কীর্তি-কথা বলিয়া উল্লিখিত থাকিতেও অধ্যাপক ভিনিস্, তাহার ব্যাখ্যাকালে, "জনকভূমিকে” মিথিলা বলিয়া ব্যাখ্যা করায়, বাঙ্গালীর ইতিহাসের এই উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি তমসাচ্ছন্ন হইয়া পড়িয়াছিল। বরেন্দ্রমণ্ডলে এখনও এই প্রজা-বিদ্রোহের নানা স্মৃতিচিহ্ন বর্তমান আছে। তাহার বিস্তৃত বিবরণ "বিবরণমালায়” সন্নিবিষ্ট হইয়াছে।
এক সময়ে এই প্রজা-বিদ্রোহের কথা বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে সুপরিচিত ছিল। শতবর্ষ পূর্ব্বেও বুকানন্ হামিলটন্ তদ্বিষয়ক জনশ্রুতির সন্ধানলাভ করিয়া- ছিলেন। সমকালবর্তী বরেন্দ্র-নিবাসী রাজকবি সন্ধ্যাকর-নন্দী, এই ঘটনা অবলম্বন করিয়া সংস্কৃত ভাষায় 'রামচরিত' নামক একখানি কাব্য রচনা করিয়াছিলেন। মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিতবর শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এম্-এ, মহাশয়ের প্রশংসনীয় উদ্যমে, তাহা নেপাল হইতে আনীত হইয়া [এসিয়াটিক্ সোসাইটির যত্নে] মুদ্রিত হইয়াছে। "গৌড়রাজমালায়” এই বিদ্রোহব্যাপারের আদ্যান্তের বিবরণ উল্লিখিত হইয়াছে। প্রজাপুঞ্জের নির্বাচনক্রমে যে রাজবংশ প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়া, প্রজাশক্তির সাহায্যে সমগ্র উত্তরাপথব্যাপী বিপুল সাম্রাজ্য সংস্থাপিত করিতে সমর্থ হইয়াছিল, যে রাজবংশের প্রবল পরাক্রমশালী নরপাল দেবপালদেবও, তদীয় মন্ত্রিবরের সম্মুখে সচকিতভাবে সিংহাসনে উপবেশন কবিতেন বলিয়া বরেন্দ্রমণ্ডলের গরুডস্তম্ভ-লিপিতে উল্লেখ প্রাপ্ত হওয়া যায়, সেই রাজবংশে জন্মগ্রহণ করিয়া দ্বিতীয় মহীপালদেব [অনীতি-পরায়ণ হইয়াই] প্রজা-বিদ্রোহ প্রধূমিত করিয়া তুলিয়াছিলেন; এবং তাহাতে স্বয়ং ভস্মীভূত হইয়া, বরেন্দ্রমণ্ডল হইতে পাল-রাজবংশের শাসনক্ষমতা ও কিয়ৎকালের জন্য ভস্মীভূত করিয়াছিলেন। বরেন্দ্রমণ্ডলে পুনরায় অধিকার লাভ করিতে, রামপালদেবকে বিপুল সমর-সজ্জার আয়োজন করিতে হইয়াছিল; বহু যুদ্ধে তিল তিল করিয়া বরেন্দ্রভূমিতে বিজয়-লাভ করিতে হইয়াছিল। ইহাতেই তৎকালের লোকনায়কগণের প্রবল শক্তির পরিচয় প্রকাশিত হইয়া রহিয়াছে। বরেন্দ্রমণ্ডলের এই ক্ষণস্থায়ী প্রজা- বিদ্রোহের একটি চিরস্থায়ী কীর্তি-স্তম্ভ এখনও সমৃন্নত শিরে সগৌরবে দণ্ডায়মান রহিয়াছে। তাহার কথা বাঙ্গালীর ইতিহাসে স্থানলাভ করিতে পারে নাই; বরেন্দ্রমণ্ডলের সহিত পরিচয়ের অভাবে, রামচরিত-কাব্য মুদ্রিত করিবার সময়ে সুপণ্ডিত শাস্ত্রী মহাশয়ের নিকটেও তাহা প্রতিভাত হইতে পারে নাই।
ভীমের নাম এখনও জনশ্রুতি হইতে বিলুপ্ত হয় নাই। তিনি রামপাল- দেবের আক্রমণ-বেগ প্রতিহত করিবার আশায়, বরেন্দ্রমণ্ডলের প্রান্তভাগের নানাস্থানে, যে সকল মৃৎপ্রাকার রচনা করাইয়াছিলেন, তাহা এখনও "ভীমের ডাইঙ্গ” এবং "ভীমের জাঙ্গাল" নামে কথিত হইতেছে। কিন্তু কল্পনা-লোলুপ জনসাধারণ তাহাকে মধ্যম পাণ্ডবের কীর্তিচিহ্ন বলিয়া বর্ণনা করিতেছে; কোন কোন আধুনিক ইতিহাস-লেখক তাহাকেই বরেন্দ্রভূমির অতি-প্রাচীনত্বের নিদর্শন বলিয়া ইতিহাস রচনা করিতেছেন!
॥ রামাবতী ॥ তৃতীয় ভাগের প্রধান কথা "রামাবতী"র কথা। প্রজা-বিদ্রোহের অবসানে, রামপালদেব এক নূতন নগর নির্মাণ করিয়াছিলেন। তাহাই পাল-রাজবংশের শেষ রাজধানী-"রামাবতী”। সন্ধ্যাকর নন্দী "রামচরিত” কাব্যে এই নগর-নির্মাণেরও বিস্তৃত বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। তাহা বরেন্দ্রভূমির শোভাবর্দ্ধন করিয়াছিল। যে ভূমি "অপুনর্ভবা” নামক মহাতীর্থে সুপবিত্র এবং “জাগদ্বল-মহাবিহারে" সুশোভিত, সেই বরেন্দ্র-ভূমিতেই "রামাবতী” নিৰ্ম্মিত হইয়াছিল। পণ্ডিতবর শাস্ত্রী মহাশয়, তৎপ্রতি লক্ষ্য না করিয়া তাহাকে পূর্ব্ববঙ্গের "রামপাল" বলিয়া [রামচরিত কাব্যের ভূকিায়] পার্শ্ব-টীকায় ইঙ্গিত করিয়াছেন। অনুসন্ধান-সমিতি রামাযতীর, জগছলমহাবিহারের এবং অপুনর্ভবা তীর্থের অনুসন্ধান করিয়া নানা ধ্বংসাবশেষ দর্শন করিয়া আসিয়াছেন। রামাবতীর নাম এখন বাঙ্গালীর নিকট সম্পূর্ণ অপরিচিত হইলেও অনেক দিন পর্যান্ত সুপরিচিত ছিল। "সেখ শুভোদয়া” নামক [মালদহের অন্তর্গত পাণ্ডুয়ার মিিজদে প্রাপ্ত] হস্ত-লিখিত সংস্কৃত গ্রন্থে "রামাবতীর” প্রথম উল্লেখ দেখিতে পাওয়া গিয়াছিল। সে অনেক দিনের কথা। তখন তাহার সহিত বাঙ্গালীর ইতিহাসের সম্পর্ক-বিচারে প্রবৃত্ত হইবার প্রবৃত্তি উপস্থিত হয় নাই। কিন্তু বরেন্দ্রমণ্ডলের অন্তর্গত দিনাজপুর জেলার মনহলি গ্রামে আবিষ্কৃত পালরাজবংশের সপ্তদশ নরপাল মদনপালদেবের তাম্রশাসনে "রামাবতী-পরিসরে” জয়স্কন্ধাবার প্রতিষ্ঠিত থাকিবার উল্লেখ দেখিয়া, প্রাচ্যবিদ্যা-মহার্ণব শ্রীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু মহাশয় [ বরেন্দ্রমণ্ডলে পদার্পণ না করিয়াও] তাহাকে দিনাজপুরের অন্তর্গত একটি স্থানের সহিত মিলাইয়া লইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। সে চেষ্টা সফল হয় নাই। কিন্তু তাহা প্রথম চেষ্টা বলিয়া উল্লিখিত হইবার,যোগ্য।
রামপাল প্রজা-বিদ্রোহের প্রকোপে জন্মভূমি হইতে তাড়িত হইবার পর, নানা ক্লেশে জন্মভূমির উদ্ধার সাধন করিয়া, যেরূপ অধ্যবসায়ের এবং কষ্ট- সহিষ্ণুতার পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন, তাহা স্মরণ করিয়া রাজকবি তাঁহাকে দ্বিতীয় রামচন্দ্র বলিয়া অভিহিত করিয়া গিয়াছেন। যাঁহার বাহুবলে এবং মন্ত্রণা-কৌশলে রামপাল বিজয়লাভ করিয়াছিলেন, তিনি রামপালের মাতুল এবং চির-মুহৃৎ অঙ্গাধিপতি মহনদেব। "সেখ শুভোদয়া” গ্রন্থে দেখিতে পাওয়া গিয়াছিল,-
"শাকে যুগ্মবেণুর গতে (?) কন্যাং গতে ভাস্করে
কৃষ্ণে বাক্তি-বাসরে যমতিথৌ যামদ্বয়ে বাসরে।
জাহুব্যাং জলমধ্যত স্থনশনৈ ধ্যা ত্বা পদং চক্রিণো
হা পালান্বয়-মৌলি-মণ্ডনমণিঃ শ্রীরামপালো মৃতঃ ।"
রামপাল ভাগীরথী-গর্ভে অনশনে তনুত্যাগ করিয়াছিলেন। এরূপ আত্মবিসর্জনের কারণ কি, "সেখ শুভোদয়া”-গ্রন্থে তাহার পরিচয়-লাভের উপায় ছিল না। রামচরিত কাব্যে সে পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে;-মহনদেবের মৃত্যু-সংবাদ শ্রবণ করিয়াই শোকার্ত রামপালদেব আত্ম-বিসর্জন করিয়া- ছিলেন। তাহার পর, কুমারপাল সিংহাসনে আরোহণ করিলে [বরেন্দ্রমণ্ডলে আরও কিয়ৎকাল পাল-রাজবংশের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকিলেও] "অনুত্তর-বঙ্গে” এবং কামরূপে বিদ্রোহ-বিকার প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল। কুমারপালের প্রধান মন্ত্রী বৈদ্যদেবের 'বাহুবলে তাহা দূরীভূত হইলেও, পালসাম্রাজ্য আর পূর্ব্ব প্রতাপে সঞ্জীবিত হইতে পারে নাই। কুমারপালের মৃত্যুর পরে, তদীয় শিশুপুত্র তৃতীয় গোপাল এবং [তাঁহার অকাল-মৃত্যুর পর] কুমারপালের ভ্রাতা মদনপাল সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন। সেই শেষ। তাহার পর আর বরেন্দ্রমণ্ডলে পাল-নরপালগণের প্রবল প্রতাপের পরিচয় প্রকাশিত হয় নাই।
চতুর্থ ভাগে সেন-রাজবংশের অভ্যুদয়। তাহা এই সকল কারণেই, সফল হইবার অবসর লাভ করিয়াছিল। সেন-রাজবংশ বাঙ্গালার শেষ হিন্দু- রাজবংশ হইলেও, কিরূপে সে রাজবংশ এ দেশে প্রতিষ্ঠা-লাভ করিয়াছিল, তাহা এখনও তমসাচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে। অন্ধকার ভেদ করিয়া ঐতিহাসিক তথ্যের আবিষ্কার সাধন করিবার উপযোগী অধিক প্রমাণ অদ্যাপি আবিষ্কৃত হয় নাই। জনশ্রুতি এই রাজবংশকে নানা কল্পনা-জল্পনার আধার করিয়া তুলিয়াছে। এই রাজবংশের অধঃপতন-কাহিনীর ন্যায় ইহার অভ্যুদয়কাহিনীও প্রহেলিকাপূর্ণ হইয়া রহিয়াছে। সম্প্রতি [কাটোয়ার নিকটবর্তী স্থানে] এই রাজবংশের দ্বিতীয় রাজা বল্লালসেনদেবের যে তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহাতে নানা সংশয় মুখরিত হইয়া উঠিয়াছে।
সেন-রাজবংশের প্রথম রাজা বিজয়সেনদেবের [ রাজসাহীর অন্তর্গত দেবপাড়ায় প্রাপ্ত] প্রদ্ব্যয়েশ্বর-মন্দিরলিপিতে দেখিতে পাওয়া যায়,-
"বংশে তষ্যামরস্ত্রী-বিততরতকলা-সাক্ষিণো দাক্ষিণাত্য
ক্ষৌণীন্দ্রৈ ব্বীরসেনপ্রভৃতিভিরভিতঃ কীত্তিমদ্ভির্বভূবে।
যচ্চারিত্রানুচিন্তা-পরিচয়শুচয়ঃ সৃক্তি-মাধ্বীকধারাঃ
পারাশর্য্যেণ বিশ্ব-শ্রবণপরিসর-প্রীণনায় প্রণীতাঃ ॥”
[পারাশর্য্য] ব্যাসদেব যাঁহাদিগের চরিত্র-বর্ণনায় বিশ্বনিবাসিগণকে প্রীতি প্রদান করিয়া গিয়াছেন, সেই চন্দ্রবংশীয় দাক্ষিণাত্য-ভূপতি বীরসেন প্রভৃতির বংশে সেনরাজগণ জন্মগ্রহণ করিবার এইরূপ প্রমাণ প্রাপ্ত হইয়াও, [মহাভারতোক্ত নলরাজার পিতা বীরসেনের কথা চিন্তা না করিয়া] কেহ কেহ বীরসেনকে আদিশ্বর বলিয়াই ব্যাখ্যা করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। বীরসেন-বংশধর বিজয়সেনদেবের পিতামহ সামন্তসেন যোদ্ধৃপুরুষ ছিলেন।
"দুর্ব্বত্তানা ময়মরিকুলাকীর্ণ-কর্ণাটলক্ষ্মী-
লুষ্ঠাকানাং কদন মতনোত্তাট্টগেকাঙ্গবীরঃ।
যম্মাদদ্যাপ্যবিহত-বসামাংসমেদঃ-সুভিক্ষাং
দৃষ্যৎ পৌর স্তজতি ন দিশাং দক্ষিণাং প্রেতভর্তা ॥"
তিনি "কর্ণাটলক্ষ্মী-লুণ্ঠনকারী-দুর্ব্বত্তগণের কদন” বিধান করিয়াছিলেন। পরবর্তী শ্লোকে দেখিতে পাওয়া যায়, তিনি গঙ্গাপুলিন-পরিসরের পুণ্যা- শ্রমনিচয়েই শেষ জীবন অতিবাহিত করিয়াছিলেন। বিজয়সেনের পৌত্র লক্ষ্মণসেনদেবের [ মাধাইনগরে প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে দেখিতে পাওয়া যায়, সেনরাজগণ কর্ণাটক্ষত্রিয়-বংশ অলঙ্কত করিয়াছিলেন। বিজয়সেনের পুত্র বল্লালসেনদেবের [কাটোয়ার নিকটে প্রাপ্ত ] তাম্রশাসনে দেখিতে পাওয়া যায়, রাজ্যলাভের পূর্ব্বে, বিজয়সেনের পিতৃ-পিতামহ রাঢ়দেশকে বিভূষিত করিয়াছিলেন।
গৌড়রাজমালার লেখক মহাশয় এই সকল প্রমাণের অবতারণা করিয়া, প্রাচীন লিপির "কর্ণাট"-রাজ্য কোথায় ছিল, তাহার পরিচয় প্রদানের জন্য [বিহ্বনদেবের বিক্রমাঙ্ক-চরিতের এবং কহলপের রাজতরঙ্গিণীর উপর নির্ভর করিয়া] কল্যাণের চালুক্য-রাজগণের রাজ্যকেই "কর্ণাট” বলিয়া গ্রহণ করিয়া- ছেন। "কর্ণাটেন্দু” বিক্রমাদিত্য কর্তৃক [১০৪০-১০৭১ খৃষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে] গৌড়-কামরূপ পরাভূত হইবার একটি কাহিনী "বিক্রমাঙ্কদেবচরিতে” উল্লিখিত আছে।
ইহাকে ঐতিহাসিক প্রমাণ বলিয়া গ্রহণ করিলে, ইহাকেই কর্ণাট-রাজের সহিত গৌড়-রাজের প্রথম সংঘর্ষ বলিয়া স্বীকার না করিয়া, ইহার পূর্ব্বেও, [গৌড়াধিপ প্রথম মহীপালদেবের শাসন-সময়ে] আর একটি সংঘর্ষ উপস্থিত হইয়াছিল বলিয়া অনুমান করা যাইতে পারে। সে সংঘর্ষে গৌড়াধিপ মহী- পালদেব বিজয়লাভ করিয়াছিলেন; তাঁহার বিজয়োৎসবকে চিরস্মরণীয় করি- বার জন্য "চণ্ডকৌশিক” নাটক রচিত ও অভিনীত হইয়াছিল। তাহার "প্রস্তাবনায়" দেখিতে পাওয়া যায়,-
"অলমতি বিস্তরেণ। আদিষ্টোইস্মি দুষ্টামাত্য-বুদ্ধিবাণ্ডরাংলঙ্ঘ্য-সিংহরং- হসা ভ্রভঙ্গলীলা সমুহৃতাশেষ-কণ্টকেন সমর-সাগরান্তভ্র'মস্তূজদণ্ড-মন্দরাকৃষ্ট লক্ষ্মী-স্বয়ংবর প্রণয়িনা শ্রীমহীপালদেবেন। যস্যেমাং পুরাবিদঃ প্রশস্তিগাথা- মুদাহরন্তি-
যঃ সংশ্রিত্য প্রকৃতিগহনামার্য্যচাণক্য-নীতিং
জিত্বা নন্দান্ কুসুমনগরং চন্দ্রগুপ্তৌ জিগায়।
কর্ণাটত্বং ধ্রুবমুপগতানদ্য তানেব হস্তুং
দোর্দপাঠ্যঃ স পুনরভবৎ শ্রীমহীপালদেবঃ ।"
নান্দীপাঠ সমাপ্ত হইবার পরেই সূত্রধার বলিতেছেন-থাক্ থাক্, আর [পূর্ব্বরঙ্গের] আত-বিস্তারের প্রয়োজন নাই। আমরা শ্রীমহীপালদেব-কর্তৃক নাট্যাভিনয়ার্থ আদিষ্ট হইয়াছি। তিনি দুষ্টামাত্যবর্গের বুদ্ধিজালে আবদ্ধ হইবার অযোগ্য অলংখ্য সিংহ-শক্তিসম্পন্ন বলিয়া, ভ্রভঙলীলায় অশেষ ক্ষুদ্র কণ্টক উদ্ধৃত করিয়া দিয়াছেন। সমর-সাগর হইতে তদীয় মন্দররূপী ভুজদণ্ডের আকর্ষণ-বলে বিজয়-লক্ষ্মী উত্থিত হইয়া তাঁহাকে স্বয়ংবর-প্রণয়ী করিয়াছে। পুরাবিদ্গণ তাঁহার সম্বন্ধে এই প্রশস্তি-গাথা উদ্ধত করিয়া খাকেন-
“যে চন্দ্রগুপ্ত স্বভাব-দুর্ব্বোধ আর্য্যচাণক্য-নীতির আশ্রয়গ্রহণ করিয়া, নন্দরাজগণকে পরাভূত ও কুসুমপুর অধিকৃত করিয়াছিলেন, সম্প্রতি নন্দগণ কর্ণাটত্বলাভ করিয়া পুনজ'ন্ম গ্রহণ করায়, তাঁহাদিগের নিধন সাধনের জন্য সেই চন্দ্রগুপ্ত আবার শ্রীমন্মহীপালদেবরূপে পুনর্জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন।"
মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এম্-এ, [রামচরিতের ভূমিকায়] ইহাকে মহীপাল কর্তৃক রাজেন্দ্র চোড়ের পরাভব-কাহিনী বলিয়া ব্যাখ্যা করিতে গিয়া, কর্ণাট-রাজ্যকে চোল-রাজ্যের একাংশরূপে গ্রহণ করিয়াছেন। শ্রীযুক্ত রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এম্-এ, তাহাকেই প্রমাণরূপে গ্রহণ করিয়া সেনরাজ-বংশের পূর্ব্বপুরুষগণকে রাজেন্দ্রচোড়ের সেনানায়ক বলিয়া সিদ্ধান্ত করিতে চাহিয়াছেন। চোলরাজকে কর্ণাটরাজ বলিয়া গ্রহণকরিবার উপযোগী বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দেখিতে না পাইয়া, গৌড়রাজমালা-লেখক কল্যাণের চালুক্য-রাজ্যকেই কর্ণাট-রাজ্য বলিয়া গ্রহণ করিতে বাধ্য হইয়াছেন। কর্ণাটশব্দের এরূপ অর্থে চণ্ডকৌশিকের প্রস্তাবনা পাঠ করিলে বলা যাইতে পারে- অনেকদিন হইতেই প্রাচ্যভারতের গৌড়ীয়সাম্রাজ্য করতলগত করিবার জন্য অনেকের হৃদয়ে উচ্চাভিলাষ প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল। অনেকেই গৌড়রাজ্য আক্রমণ করিয়াছিলেন এবং পরাভূত হইয়া স্বরাজ্যে প্রস্থান করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। কল্যাণের চাল্কক্যরাজগণের উচ্চাভিলাষের অভাব ছিল না; তাঁহারাও মহীপালদেবের সহিত একবার শক্তি পরীক্ষা করিয়াছিলেন। তাহার ফলে "কর্ণাটলক্ষ্মী” লুণ্ঠিত হইয়াছিল,-মহীপালের বিজয়োৎসবে নাট্যাভিনয় সম্পাদিত হইয়াছিল। সেনরাজবংশের পূর্ব্বপুরুষগণ এই সকল যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত থাকিয়া কালক্রমে [দক্ষিণরাঢ়ে কর্ণাটরাজের প্রভুত্ব সংস্থাপিত হইবার পর], বাঙ্গালী প্রজাপুঞ্জের নির্ব্বাচিত পাল-রাজবংশের প্রবল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল বরেন্দ্রমণ্ডলেও অধিকার বিস্তার করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন।
কিরূপে "দাক্ষিণাত্য-ক্ষৌণীন্দ্রবংশোত্তব” সেনরাজবংশ এদেশে প্রকৃত প্রস্তাবে অধিকার লাভ করিয়াছিল, তাহা এখনও নিঃসংশয়ে স্থিরীকৃত হইবার সময় উপস্থিত হয় নাই। এখনও সেই চেষ্টায়, লেখকবর্গ নানা প্রস্তাব উত্থাপিত করিয়া ঐতিহাসিক কারণ-পরম্পরার মর্ম্মোদঘাটনের আয়োজন করিতেছেন। এইরূপেই ঐতিহাসিক তথ্য আবিষ্কৃত হইয়া থাকে-যে সকল প্রস্তাব উত্থা- পিত হয়, তাহা অলীক বলিয়া প্রতিপাদিত হইলেও তাহার প্রয়োজন অস্বীকৃত হয় না। গৌড়রাজমালার লেখকও সেইরূপ প্রয়োজনেই ঐতিহাসিক তথ্যের সন্ধান-লাভের আশায়, এই সকল প্রস্তাবের অবতারণা করিয়াছেন বলিয়া ইহাকে সেইরূপ অর্থেই গ্রহণ করিতে হইবে। ইহাতে অনুসন্ধিৎসা প্রবল হইয়া প্রকৃত তথ্যের আবিষ্কার সাধন করিতে পারিলে, এরূপ প্রস্তাব উত্থাপিত করিবার উদ্দেশ্য সফলতা লাভ করিবে। এ দেশে আধিপত্য লাভ করিবার পূর্ব্বে সেনরাজগণ যে দেশে থাকুন না কেন, তাঁহারা আমাদিগের দেশের পুরাতন অধিবাসী ছিলেন না-তাঁহারা আগন্তুক তাঁহাদিগের গৌড়বিজয় গৌড়জনের পরাজয়, তাঁহাদিগের অভ্যুদয় গৌড়ীয় সাম্রাজ্যের অধঃপতনের প্রথম সোপান। সেখ শুভোদয়া-গ্রন্থে দেখিতে পাওয়া গিয়াছিল-রামপালদেব তনুত্যাগ করিলে মন্ত্রিবর্গ পরামর্শ করিয়া শিবোপাসক কাঠুরিয়া বিজয়সেনকে সিংহাসনে সংস্থাপিত করিয়াছিলেন। এ পর্য্যন্ত ইহার অনুকুল প্রমাণ আবিষ্কৃত হয় নাই। পাল-সাম্রাজ্যের অধঃপতন-সময়ে সেনরাজগণ যে কোম না কোন উপায়, পালরাজগণের শিথিল মুষ্টি হইতে রাজদণ্ড কাড়িয়া লইয়া গৌড়মণ্ডলে একটি আগত্তক রাজবংশের প্রতিষ্ঠাসাধনে সফলকাম হইয়াছিলেন, তদ্বিষয়ে সংশয় নাই। এ পর্য্যন্ত প্রাচীন লিপিতে যাহা কিছু প্রমাণ আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহাতে সেন-রাজ্য বাহুবলের রাজ্য বলিয়াই প্রকাশিত হইয়াছে; তাহা পাল-রাজ্যের ন্যায় প্রজাপুঞ্জের নির্ব্বাচন-প্রণালীতে গঠিত গৌড়ীয় সাম্রাজ্য বলিয়া কথিত হইতে পারে না।
এই সাম্রাজ্য পাল-সাম্রাজ্যের ন্যায় সকল উত্তরাপথে প্রাধান্য রক্ষা করিতে সমর্থ হয় নাই। রণ-পাণ্ডিত্যের অভাব না থাকিলেও-কাশীধামে, প্রয়াগধামে এবং পুরুষোত্তমক্ষেত্রে জয়স্তম্ভ সংস্থাপিত করিবার প্রমাণ-শ্লোকের অসদ্ভাব না থাকিলেও, সেন-রাজবংশের অধিকারভূক্ত প্রাচ্য-সাম্রাজ্য পতনোম্মুখ অবস্থায় পতিত হইয়াছিল এবং অল্পকালের মধ্যে [মুসলমানের সহিত প্রথম সংঘর্ষেই] পশ্চিমাঞ্চল পরিত্যাগ করিয়া পূর্ব্বাঞ্চলের আশ্রয় গ্রহণ করিতে বাধ্য হইয়াছিল।
কোন্ সময়ে, কাহার শাসনকালে, কিরূপ ঘটনাচক্রে, মুসলমান-শাসন প্রবর্তিত হইবার সূত্রপাত হইয়াছিল, তদ্বিষয়ে নানা তর্কবিতর্ক প্রচলিত হইয়াছে। গৌড়রাজমালা-লেখক তদ্বিষয়ে অনেক নূতন তর্ক উত্থাপিত করিয়াছেন। তাহা বিচারসহ হইয়াছে কিনা, ভবিষ্যতের তথ্যালোচনায় তাহা মীমাংসিত হইতে পারিবে। সুতরাং তাহাকে লেখক মহাশয়ের তথ্যানুসন্ধান-চেষ্টা- চক ব্যক্তি- গত মত বলিয়াই পাঠকগণ তাহার আলোচনা করিতে পারিবেন।
সেনরাজবংশের অভ্যুদয়লাভের মূল কারণ সহসা আবিষ্কৃত হইবার আশা না থাকিলেও, তাঁহাদিগের প্রথম রাজধানী কোথায় ছিল, তাহার আবিষ্কারসাধনের জন্যই অনুসন্ধান-সমিতি চেষ্টা করিয়াছিলেন। সে চেষ্টা সফল হইয়াছে। তাহাতে উৎসাহ লাভ করিবার পরেই অনুসন্ধান-সমিতি ক্রমে ক্রমে পাল রাজবংশের বিবিধ রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত করিবারও সুযোগ প্রাপ্ত হইয়াছেন।
অনেকদিন হইতে সেই-রাজবংশের এবং পাল-রাজবংশের ইতিহাসসংকলনের জন্য নানা চেষ্টা প্রবর্ত্তিত হইয়াছে। সে সকল চেষ্টা পুস্তকালয়ের সাহায্যে [গৃহে বসিয়া], ইতিহাস-সংকলনের চেষ্টা বলিয়া কথিত হইতে পারে। তাহাতেই নানা তর্কবিতর্ক বিপুলতা লাভ করিয়াছে। যে সকল স্থানে অনুসন্ধান-কার্য্যে অগ্রসর হইলে তর্কবিতর্ক নিরস্ত হইতে পারিত, তথায় অনু- সন্ধানে প্রবৃত্ত হইবার প্রয়োজন অনুভূত হইত না বলিয়া, পুরাতন লিপিতে উল্লিখিত অনেক ঐতিহাসিক তথ্য নানা পুস্তকে মুদ্রিত হইবার পরেও [ব্যাখ্যা- বিভ্রাটে], তাহার প্রকৃত মর্ম্ম অনুভূত হইতে পারে নাই। অনুসন্ধান-ক্ষেত্রে অগ্রসর হইবামাত্র, ইহার বিবিধ পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে এবং তাহা বিস্তৃতভাবে "লেখমালায়” আলোচিত হইয়াছে।
ধোয়ী কবির পবনদূত আবিষ্কৃত ও মুদ্রিত হইবার পর জানিতে পারা গিয়াছিল-বিজয়পুর নামক রাজধানীতে লক্ষ্মণসেনদেবের অভিষেক-ক্রিয়া সুসম্পন্ন হইয়াছিল। বল্লালসেন তাঁহার "দানসাগর” গ্রন্থে লিখিয়া গিয়াছেনতাঁহার পিতা বিজয়সেনদেব "বরেন্দ্রে” প্রাদুভূ'ত হইয়াছিলেন এবং তাঁহার শুরু অনিরুদ্ধ ভট্ট "শ্লাঘ্যে বরেন্দ্রীতলে” জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। এই সকল সমাচার অবগত হইয়াও অনেকে নবদ্বীপকেই "বিজয়পুর” বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন;-বরেন্দ্রের কোন্ নিভৃত প্রদেশে বিজয়সেনদেবের প্রাদুর্ভাবক্ষেত্র অগৌরবে লুকাইয়া রহিয়াছে, কেহ তাহার অনুসন্ধান করিবার চেষ্টা করেন নাই। রাজসাহী জেলার [গোদাগাড়ী থানার অন্তর্গত] দেবপাড়া গ্রামে সেন-রাজবংশের প্রথম শিলালিপি আবিষ্কৃত হইবার পরেও কেহ কখন তাহার প্রাপ্তি-স্থান পরিদর্শন করিবার প্রয়োজন অনুভব করেন নাই। অনু- সন্ধান-সমিতি এইস্থান হইতেই অনুসন্ধানকার্য্যের সূত্রপাত করিতে গিয়া বিজয়নগরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে নানা পুরাকীর্তির নিদর্শন সংগৃহীত করিতে সমর্থ হইয়াছেন। তাহার বিস্তৃত বিবরণ চিত্রাদিসহ 'বিবরণমালায়' সন্নিবিষ্ট হইয়াছে।
বিজয়সেনদেব বরেন্দ্রভূমির সকল স্থানে বা তাহার বাহিরে কোনও স্থানে, অধিকার বিস্তার করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন কি না, এখনও তাহার বিশ্বাসযোগ্য নিদর্শন আবিস্তৃত হয় নাই। এখন কেবল বরেন্দ্রভূমির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে, রাজসাহী জেলার [গোদাগাড়ী থানার অন্তর্গত]বিজয়নগর অঞ্চলেই বিজয়-রাজার নাম লোকমুখে শ্রবণ করা গিয়াছে; তাঁহার রাজবাটীর ধ্বংসা- বশেষের সন্ধানলাভ করা গিয়াছে; এবং তাঁহার স্মৃতি-বিজড়িত বহুসংখ্যক "বিতত তল্প” কেবল এই অঞ্চলেই দেখিতে পাওয়া গিয়াছে। কিন্তু তাঁহার পুত্র-পৌত্রের শ্রীবিক্রমপুর-সমাবাসিত-জয়স্কন্ধাবারের কথা এবং তাঁহার পৌত্রের শ্রীবিক্রমপুরের জয়স্কন্ধাবারে আশ্রয়গ্রহণ করিয়া [মুসলমানঅভিযানের প্রথম প্রকোপ প্রতিহত করিয়া] পূর্ব্ববঙ্গের স্বাতন্ত্র্যরক্ষার কথা, তাম্রশাসনে এবং মুসলমান-ইতিহাস-লেখকগণের গ্রন্থে উল্লিখিত আছে। তজ্জ্বন্য,বিক্রমপুর-অঞ্চলেও তথ্যানুসন্ধানের প্রয়োজন অনুভূত হইয়াছে। তথায়, [অনুসন্ধান-সমিতির উপদেশে ও উৎসাহে] শ্রীযুক্ত যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত মহাশয় অশেষ অধ্যবসায়-বলে অনেক পুরাকীত্তির নিদর্শন সংগৃহীত করিয়াছেন। বিবরণমালায়, শিল্পকলায় এবং গ্রন্থমালায় তাহার নানা পরিচয় সন্নিবিষ্ট হইয়াছে।
গৌড়রাজমালায় নরপালগণের শাসনকাল নির্ণয়ের জন্য অধিক আড়ম্বর প্রকাশিত হয় নাই। তাহা এখনও নানা তর্কবিতর্কে আচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে। তথাপি, যে সকল প্রমাণের আলোচনা করিলে নরপালগণের শাসনকালের আভাস প্রাপ্ত হইবার সম্ভাবনা আছে, তাহার কথা যথাস্থানে আলোচিত হইয়াছে। এই গ্রন্থ সঙ্কলিত হইবার সময়ে পাল-রাজবংশের শাসনকালবিজ্ঞাপক অনেক অপ্রকাশিত প্রাচীন লিপি কলিকাতার যাদুঘরে সংগৃহীত হইয়াছে। তাহার সাহায্যে, পাল-নরপালগণের শাসন-কালের সন-তারিখনির্ণয়ের নূতন উদ্যম প্রকাশিত হইতে পারিবে।
রাজা, রাজ্য, রাজধানী, যুদ্ধবিগ্রহ এবং জয়-পরাজয়,-ইহার সকল কথাই ইতিহাসের কথা। তথাপি কেবল এই সকল কথা লইয়াই ইতিহাস সঙ্কলিত হইতে পারে না। বাঙ্গালীর ইতিহাসের প্রধান কথা-বাঙ্গালী জনসাধারণের কথা। জনসাধারণের সকল কথার প্রধান কথা তাহাদিগের ধর্মবিশ্বাসের কথা। ভারতবর্ষের জনসাধারণের পক্ষে তাহাকে একমাত্র কথা বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না। কারণ, ধৰ্ম্মবিশ্বাসই অধিকাংশ কার্য্যের গতি-নিৰ্দ্শে করিয়াছে;-ধর্ম্মের জন্য দেবমূর্তি গঠিত হইয়াছে, দেবমূর্ত্তির জন্য বিচিত্র দেবালয় নির্ম্মিত হইয়াছে, দেবালয়ের প্রচলিত অর্চ্চনা-প্রণালীর জন্য উপচারসংগ্রহের প্রয়োজন অনুভূত হইয়াছে, দেব-লোকের প্রীতি-সম্পাদনের আশায় জলাশয় খানিত হইয়াছে, চিকিৎসালয় সংস্থাপিত হইয়াছে, পান্থশালা নির্ম্মিত হইয়াছে, বিবিধ বিদ্যালয়ে শাস্ত্রালোচনা প্রচলিত হইয়াছে, কৃষি-শিল্পবাণিজ্য-ব্যাপারে উপার্জিত অর্থ, গ্রাসাচ্ছাদনের প্রয়োজন সাধিত করিয়া দেব-কার্য্যেই উৎসর্গীকৃত হইয়াছে। ধৰ্ম্ম-বিশ্বাসের সঙ্গে যে সকল আচারব্যবহার জড়িত হইয়া পড়িয়াছে, তাহার সাহায্যে বাঙ্গালীর জাতিগত পরিচয় লাভ করিবার সম্ভাবনা আছে। কোন্ পুরাকাল হইতে কিরূপ ঘটনাক্রে, এ দেশের অধিবাসিবর্গ তাহাদিগের শিক্ষাদীক্ষার এবং আচার-ব্যবহারের প্রভাবে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হইয়াছে, তাহার কথাই প্রধান কথা। অনুসন্ধান-সমিতি তদ্বিষয়ে যে সকল অনুসন্ধান-কার্য্যের সূত্রপাত করিয়াছেন, "গৌড়ীয় উপাসক-সম্প্রদায়” নামক গ্রন্থাংশে তাহা আলোচিত হইবে। বঙ্গভূমি যে বহুযুগের বহুবিধ শিক্ষা-দীক্ষার মিলন-ভূমি, আপাত-প্রতীয়মান মত-পার্থক্যের সমন্বয়ভূমি,-অনন্যসাধারণ স্বাতন্ত্র্য্য-লিপ্সার কৌতূহলপূর্ণ সাধনভূমি-তাহার নানা পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে। এই ভূমিকে স্বতন্ত্র কেন্দ্র করিয়া ভারতীয় শিক্ষা-দীক্ষা ও সভ্যতা ভারতবর্ষের বাহিরেও নানা দিন্দেশে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িয়াছিল। এই সকল কারণে, বাঙ্গালীর ইতিহাসকে বঙ্গভূমির চতুঃসীমাভুক্ত সঙ্কীর্ণ ক্ষেত্রের ইতিহাস বলিয়া বিচ্ছিন্নভাবে অধ্যয়ন করিবার উপায় নাই। তাহা একদিকে যেমন বাঙ্গালীর ইতিহাস, অন্যদিকে সেইরূপ মানব-ইতিহাসেরও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় বলিয়া পরিচিত হইতে পারে। মানব-প্রতিভা, দেশ-কাল-পাত্রের প্রভাবে, কিয়ৎপরিমাণে বিভিন্ন পন্থায় অগ্রসর হইয়া, বিভিন্ন শ্রেণীর পরিণতি লাভের চেষ্টা করিলেও তাহার অভ্যন্তরে সমগ্রমানব-সমাজের অস্ফুট আকাঙ্ক্ষার পরিচয় প্রদান করে। বাঙ্গালীর ইতিহাসেও তাহার সন্ধানলাভের সম্ভাবনা আছে। সে ইতিহাস সন-তারিখের তালিকায় ভারাক্রান্ত না হইয়াও, অনেক জ্ঞাতব্য তথ্যের সন্ধান প্রদান করিতে পারিবে।
যাঁহারা এই অধমকে সারথ্যে বরণ করিয়া অকাতরে বরেন্দ্র-ভ্রমণের অশেষ ক্লেশ সহ্য করিয়াও, অকুষ্টিত-চিত্তে অনুসন্ধান-কার্য্যেব্যাপৃত রহিয়াছেন, তাঁহাদিগের অধ্যয়নানুরাগ, অধ্যবসায়, তথ্যাবিষ্কারে উৎসাহ বঙ্গসাহিত্যে সুপরিচিত। তাঁহারা দিঘাপতিয়ার রাজকুমার শরৎকুমার রায় বাহাদুর এম্-এ, এবং শ্রীযুক্ত রমাপ্রসাদ, চন্দ বি-এ। যাঁহারা এই অনুসন্ধান-কার্য্যে বিবিধ প্রকারে সাহচর্য্য করিয়া অনুসন্ধান-কার্য্যকে অগ্রসর হইবার সুযোগ প্রদান করিয়া আসিতেছেন, তাঁহাদিগের নাম শ্রীমান্ রাজেন্দ্রলাল আচার্য্য বি-এ, শ্রীযুক্ত যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, শ্রীযুক্ত অধ্যাপক গোলাম ইয়াজদানী এম্-এ, শ্রীমান্শ্রীরাম মৈত্র, শ্রীযুক্ত বৈদ্যনাথ সাম্যাল বি-এল, অধ্যাপক শ্রীশচন্দ্র শাস্ত্রী বি-এ, অধ্যাপক রাধাগোবিন্দ বসাক এম্-এ, শ্রীমান্ দেবেন্দ্রগতি রায়, শ্রীযুক্ত কালীপ্রসন্ন আচার্য্য বি-এল, পণ্ডিতবর শ্রীযুক্ত গিরীশচন্দ্র বেদান্ততীর্থ ও শ্রীযুক্ত সতীশচন্দ্র সিদ্ধান্তভূষণ এবং অনুসন্ধান-সমিতির স্নেহাস্পদ চিত্রকর শ্রীমান্ অনাথবন্ধু মৈত্রেয়।
যাঁহারা এই অনুসন্ধান-কার্য্যের পৃষ্ঠপোষক হইতে সম্মত হইয়াছেন; তাঁহাদিগের মধ্যে রাজসাহী বিভাগের মাননীয় কমিশনার সুপণ্ডিত এফ, জে, মোনাহেন মহোদয়ের নাম সর্ব্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। তিনি ক্লেশ স্বীকার করিয়া বিবিধ অনুসন্ধান-ক্ষেত্র স্বয়ং পরিদর্শন করিয়াছেন, সংগৃহীত পুরাকীর্ত্তির নিদর্শন-নিচয় পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছেন এবং গুরবমিশ্রের গরুড়-স্তম্ভের সংরক্ষণ চেষ্টার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করিয়া দিয়া সমগ্র বঙ্গদেশের ধন্যবাদের পাত্র হইয়াছেন। অন্য পৃষ্ঠপোষকগণের মধ্যে দিনাজপুরের মাননীয় মহারাজ গিরিজানাথ রায় বাহাদুর এবং দীঘাপতিয়ার মাননীয় রাজা প্রমদানাথ রায় বাহাদুর অনুসন্ধান-সমিতির অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতার পাত্র।
যাঁহারা অযাচিতভাবে অনুসন্ধান-সমিতিকে অভ্যর্থনা করিয়া আতিথ্যে, উপদেশে, অজ্ঞাত অনুসন্ধান-ক্ষেত্রের সন্ধান-প্রদানে, সাহায্যে, সদ্ব্যবহারে বিবিধ বিধানে উৎসাহ দান করিয়াছেন, তাঁহাদিগের মধ্যে নবদ্বীপাধিপতি মহারাজ ক্ষৌণীশচন্দ্র রায় বাহাদুর, দীঘাপতিয়ার চতুর্থ রাজকুমার শ্রীযুক্ত হেমেন্দ্রকুমার রায়, মহারাজকুমার শ্রীযুক্ত গোপাললাল রায় (রঙ্গপুর), বর্ধনকুটীর রাজকুমার শ্রীযুক্ত চন্দ্রকিশোর রায়, রায় বাহাদুর শ্রীযুক্ত রাধা- গোবিন্দ রায় সাহেব (দিনাজপুর), রায় বাহাদুর শ্রীযুক্ত কেদারপ্রসন্ন লাহিড়ী (কাশিমপুর-রাজসাহী), রায় বাহাদুর কুমুদিনীকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় (রাজসাহী), শ্রীযুক্তা মীনা কুমারী, শ্রীযুক্তা হেমলতা চৌধুরাণী, শ্রীযুক্ত ললিতমোহন মৈত্র, শ্রীযুক্ত রমাপ্রসাদ মল্লিক (রাজসাহী), শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্রচন্দ্র রায় চৌধুরী,শ্রীযুক্ত সুরেশচন্দ্র রায় চৌধুরী, শ্রীযুক্ত নারায়ণচন্দ্র রায় চৌধুরী, (মহাদেবপুর-রাজসাহী) শ্রীযুক্ত যোগেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (মনহলি- দিনাজপুর), শ্রীযুক্ত রাজেন্দ্রচন্দ্র সান্যাল (বালুরঘাট-দিনাজপুর), শ্রীযুক্ত ভুবনমোহন মৈত্র, শ্রীযুক্ত কিশোরীমোহন চৌধুরী, এম্-এ, বি-এল, শ্রীযুক্ত কালীচরণ সাহা,শ্রীযুক্ত হরিমোহন চৌধুরী, হাজি সেখ লালমহম্মদ (রাজসাহী), হাজি সেখ সিরাজদ্দীন (বগুড়া), শ্রীযুক্ত করুণাকুমার দত্ত-গুপ্ত, এম্-এ, বি-ই, শ্রীযুক্ত যোগীন্দ্রচন্দ্র চক্রবর্তী, এম্-এ, বি-এল, (দিনাজপুর), শ্রীযুক্ত নলিনীকান্ত অধিকারী, শ্রীযুক্ত চিন্তাহরণ মুখোপাধ্যায় (বালুরঘাটদিনাজপুর), শ্রীযুক্ত অমরেন্দ্রনাথ পাল-চৌধুরী (রাণাঘাট-নদীয়া) এবং শ্রীযুক্ত মহেন্দ্রকুমার সাহা-চৌধুরী, বি-এল, মহোদয়গণের নাম উল্লেখযোগ্য।
যাঁহারা সমিতির সদস্যগণের পরিচর্য্যার ভার গ্রহণ করিয়া, বিবিধ দুর্গম স্থানে অম্লানবদনে সেবাকার্য্যে ব্যাপৃত রহিয়াছেন, তাঁহাদিগের মধ্যে দয়ারামপুর-রাজবাটীর কর্ম্মচারী শ্রীযুক্ত প্রিয়নাথ সরকার, শ্রীযুক্ত পণ্ডিত কৃষ্ণলাল গোস্বামী, যোগেন্দ্রনাথ গোস্বামী, শ্রীযুক্ত দুর্গাকান্ত কারকুন, শ্রীযুক্ত সুরেশ্বর বিদ্যাবিনোদ, শ্রীযুক্ত শশিভূষণ বিশ্বাস ও শ্রীযুক্ত যামিনীকান্ত মুন্সীর নাম উল্লেখযোগ্য।
যিনি স্বয়ং নির্লিপ্ত থাকিয়া নানা প্রকারে অনুসন্ধান-সমিতিকে উত্তরোত্তর বিবিধ তথ্য-সঙ্কলনের সুযোগদান করিয়াও, আপন নাম লোক-সমাজের নিকট অপ্রকাশিত রাখিয়াছেন, অনুসন্ধান-সমিতির কল্যাণাকাঙ্ক্ষী সেই প্রিয়দর্শন দীঘাপতিয়ার রাজকুমার শ্রীযুক্ত বসন্তকুমার রায় এম-এ, বি-এল, মহোদয়ের নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন ও তাঁহার কল্যাণকামনা করিয়া এই সংক্ষিপ্ত উপক্রমণিকা সমাপ্তিলাভ করিল। ॥ শিবমস্ত ॥
শ্রীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
গঙ্গরিডি।
৩২৬ খৃষ্ট-পূর্ব্বাব্দে মেসিডনের অধীশ্বর দিগ্বিজয়ী সেকেন্দর যখন পঞ্চনদ অধিকার করিয়া বিপাশা-তীরে উপনীত হইয়াছিলেন তখন তাঁহার শিবিরে "প্রাসিই” এবং "গণ্ডরিডয়” নামক দুইটি রাজ্যের সংবাদ পঁহুছিয়াছিল। সেকেন্দরের ইতিবৃত্ত-লেখকগণ যে ভাবে এই দুইটি রাজ্যের বিবরণ লিখিয়া গিয়াছেন, তাহা হইতে "গণ্ডরিডয়” সম্বন্ধে বিশেষ কোন তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন।
ইহার কিছুকাল পরে, গ্রীকদূত মেগাস্থিনিস্ পাটলিপুত্র-নগরে মৌর্য্যসম্রাট্ চন্দ্রগুপ্তের সভায় আগমন করিয়াছিলেন। পাটলিপুত্র-নগর যে জনপদের রাজধানী ছিল, মেগাস্থিনিস্ তাহাকে "প্রাসিই” [প্রাচ্য]বলিয়া অভিহিত করিয়া, উহার পূর্ব্বদিকে "গঙ্গরিডি" নামক আর একটি স্বতন্ত্র রাজ্যের উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। গ্রীক লেখকগণের উল্লিখিত:"গণ্ডরিডয়” এবং "গঙ্গরিডি” অভিন্ন বলিয়াই অনুমিত হয়। মেগাস্থিনিসের লিখিত ভারতবর্ষের বিবরণ-সম্বলিত মূল "ইণ্ডিকা” গ্রন্থ এখন আর দেখিতে পাওয়া যায় না। পরবর্তী লেখকগণ তাহার যে সকল অংশ আপন আপন গ্রন্থে উদ্ধৃত করিয়া রাখিয়া গিয়াছেন, তাহাই আমাদের অবলম্বন। ডিওডোরস্ মেগাস্থিনিসের অনুসরণ করিয়া লিখিয়া গিয়াছেন, -গঙ্গানদী "গঙ্গরিডই দেশের পূর্বসীমা দিয়া প্রবাহিত হইয়া সাগরে পতিত হইয়াছে। গঙ্গরিডইনিবাসিগণের অসংখ্য বৃহদাকার রণ-হস্তী আছে। এই নিমিত্ত তাঁহাদের দেশ কখনও কোন বিদেশীয় রাজা কর্তৃক অধিকৃত হয় নাই; কারণ, অন্যান্য দেশের অধিবাসীরা গঙ্গরিডই-গণের অসংখ্য এবং দুর্জয় রণহস্তী-নিচয়কে ভয় করে।" বাঙ্গালার যে অংশ ভাগীরথীর পশ্চিমদিকে অবস্থিত তাহা এখন "রাঢ়” নামে অভিহিত। প্রাচীনকালে এই প্রদেশ "সূহ্ম” নামে পরিচিত ছিল। “রাঢ়” নামটিও প্রাচীন। "আচারাঙ্গ-সূত্র” নামক প্রাকৃত ভাষায় রচিত প্রাচীন জৈন-গ্রন্থে (১০৮৩) “লাঢ়” বা রাঢ়দেশ উল্লিখিত আছে। "গঙ্গরিডই"-রাজ্য যে রাঢ়দেশেই সীমবদ্ধ ছিল, এমন মনে হয় না। কারণ, কেবল রাঢ়দেশের অধিপতির পক্ষে পরাক্রান্ত মগধ-রাজের সহিত প্রতিযোগিতা করিয়া স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্ভব হইত না। বাঙ্গালার অপর দুইটি বিভাগ, -গুশু [ বরেন্দ্র] এবং বঙ্গ,-নিশ্চয়ই "গঙ্গরিডই"-রাজ্যের অন্তভূ'ত ছিল; এবং কলিঙ্গও এক সময়ে এই রাজ্যের সহিত সংলগ্ন ছিল। প্লিনি [ মেগাস্থিনিসের অনুসরণ করিয়া] লিখিয়া গিয়াছেন,-"গঙ্গানদীর শেষভাগ 'গঙ্গরিডি-কলিঙ্গি'-রাজ্যের ভিতর দিয়া প্রবাহিত হইয়াছে। এই রাজ্যের রাজধানী পর্থলিস্। ৬০,০০০ পদাতি, ১০০০ অশ্বারোহী এবং ৭০০ হস্তী সজ্জিত থাকিয়া, এই রাজ্যের অধিপতির দেহরক্ষা করিতেছে।"* আর একজন লেখক [সলিন্] মেগাস্থিনিসের এই অংশ স্বতন্ত্র আকারে উদ্ধৃত করিয়াছেন। যথা, “গঙ্গরিডিগণ দূরতম (প্রত্যন্ত) প্রদেশে বাস করে। তাহাদের রাজার সেনামধ্যে ১০০০ অশ্বারোহী, ৭০০ হস্তী এবং ৬০,০০০ পদাতি আছে।” প্লিনি কর্তৃক "গঙ্গরিডি” এবং "কলিঙ্গি” [কলিঙ্গ] একত্র উল্লিখিত দেখিয়া মনে হয়, কলিঙ্গ তখন গঙ্গরিডি-রাজ্যেরই অন্তর্ভূত ছিল। বর্তমান উড়িয়্যা এবং উড়িয়্যার দক্ষিণদিকে অবস্থিত গোদাবরী পর্যন্ত বিস্তৃত ভূভাগকে তখন কলিঙ্গ বলিত। পরবর্তীকালে যখন উড়িয়্যা ওড্র বা উৎকল নামে পরিচিত হইল এবং প্রাচীন কলিঙ্গের দক্ষিণভাগই কেবল কলিঙ্গ নামে অভিহিত হইতে লাগিল তখনও উৎকল "সকল কলিঙ্গে"র বা "ত্রিকলিঙ্গের" এক কলিঙ্গ বলিয়া গণ্য হইত।
মেগাস্থিনিসের সময় [মৌর্য্য চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে] "গঙ্গরিডি- কলিঙ্গি”র ন্যায় অন্ধ্ররাজ্যও স্বাধীন ছিল। চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বের শেষভাগে, বা তদীয় পুত্র বিন্দুসারের সময়ে, অন্ধ্রদেশে মৌর্য্য-প্রভাব বিস্তৃত হইয়াছিল। বিন্দুসারের পুত্র সম্রাট্ অশোক কলিঙ্গ জয় করিয়াছিলেন। অশোকের শিলাশাসনে [ ১৩শ অনুশাসনে] কলিঙ্গ-জয় সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে,-"দেব- গণের প্রিয় প্রিয়দর্শী রাজ্যাভিষিক্ত হইবার আট বৎসর পরে, কলিঙ্গদেশ জয় করিয়াছিলেন। সার্দ্ধ লক্ষ লোক দাসত্ব-পাশে বদ্ধ হইয়াছিল, লক্ষ লোক নিহত হইয়াছিল এবং বহু লক্ষ লোক মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছিল।” কলিঙ্গজয় উপলক্ষে হত্যাকাণ্ড এবং লোকক্ষয় দেখিয়া, অশোক এতদূর সন্তপ্ত হইয়াছিলেন যে,তিনি দিগ্বিজয়-বাসনা পরিত্যাগ করিয়া, ধৰ্ম্মপ্রচারে জীবন উৎসর্গ করিতে কৃতসংকল্প হইয়াছিলেন। যে রাজ্য জয় করিতে এত নরহত্যার প্রয়োজন হইয়াছিল, সেই রাজ্য যে কেবল কলিঙ্গ-দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল, এমন বোধ হয় না। মেগাস্থিনিসের উল্লিখিত যুক্ত "গঙ্গরিডি-কলিঙ্গি"-রাজ্যই সম্ভবতঃ অশোক কর্তৃক কলিঙ্গ নামে উল্লিখিত হইয়াছে। অশোকের শিলাশাসনসমূহে বাঙ্গালার কোন অংশেরই নামোল্লেখ না থাকিলেও, বাঙ্গালা যে অশোকের সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল, তাহার জনশ্রুতিমূলক প্রমাণের অভাব নাই। "অশোকাবদান” গ্রন্থে পুশু বর্দ্ধন-নগর অশোকের সাম্রাজ্যভুক্ত বলিয়া উল্লিখিত রহিয়াছে। পরিব্রাজক ইউয়ান্ চোয়াং বা হিউয়েন সিয়াং (৬১৯-৬৪৫ খৃষ্টাব্দে) লিখিয়া গিয়াছেন,- তিনি পুণ্ড বর্দ্ধন, সমতট, তাম্রলিপ্তি এবং কর্ণসুবর্ণ নামক বাঙ্গালার চারিটি প্রধান নগরের উপকণ্ঠেই অশোকরাজ-প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধস্তূপ দেখিতে পাইয়াছিলেন।
অশোকের মৃত্যুর অনতিকাল পরেই মৌর্য্য-সাম্রাজ্যের অধঃপতনের সূত্রপাত হইয়াছিল। খৃষ্টপূর্ব্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রারম্ভে, অন্ধ্র এবং কলিঙ্গ স্বাধীনতা অবলম্বন করিয়াছিল। "গঙ্গরিডি” হয়ত সেই সময়েই কলিঙ্গের দৃষ্টান্তের অনুসরণ করিয়া থাকিবে। খৃষ্টপূর্ব্ব প্রথম শতাব্দীর শেষার্দ্ধে বাঙ্গালীর রণ-পাণ্ডিত্যের খ্যাতি সুদূর রোম পর্যন্ত ব্যাপ্ত হইয়াছিল। মহাকবি ভাজিল্ [“জর্জিক্” কাব্যের তৃতীয় সর্গের সূচনায়] লিখিয়া গিয়াছেন, তিনি স্বকীয় জন্মস্থান মেন্টয়া নগরে ফিরিয়া গিয়া, মর্ম্মর-প্রস্তরের একটি মন্দির নির্মাণ করিবেন এবং সেই মন্দিরে রোম-সম্রাটের প্রতিমূত্তি স্থাপিত করিয়া, "মন্দিরের দ্বারফলকে সুবর্ণ এবং হস্তিদন্তের দ্বারা 'গঙ্গরিডিগণের যুদ্ধের দৃশ্য এবং সম্রাটের রাজচিহ্ন অঙ্কিত করিবেন।”* ভার্জিলের পক্ষে ভারতবর্ষের বিবরণ সংগ্রহ করিবার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। ভারতের রাজন্যবর্গ তৎকালে রোমে দূত প্রেরণ করিতেন এবং ভারতের সহিত রোমের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য-সম্বন্ধও বর্তমান ছিল। ভার্জিল্ "জর্জিকসের” প্রথম সর্গে লিখিয়াছেন, ভারতবর্ষ হইতে রোমে হস্তি-দন্তের আমদানী হইত।
তৎকালে 'বারগোসা' [ভৃগুকচ্ছ বা ভরোচ] এবং 'গঙ্গরিডির' প্রধান নগর 'গঙ্গে' ভারতের প্রধান বন্দর ছিল এবং এই দুইটি বন্দর হইতে ভারতের বহির্বাণিজ্য সম্পাদিত হইত। "পিরিপ্লাস্ ইরিথ্রি মেরি” নামক [খৃষ্টাব্দের প্রথম শতাব্দে রচিত] একখানি গ্রন্থে উল্লিখিত হইয়াছে,-"গঙ্গে"-বন্দর হইতে প্রবাল, উৎকৃষ্ট মল্লন বস্ত্র এবং অন্যান্য দ্রব্যের রপ্তানী হইত। খৃষ্টাব্দের দ্বিতীয় শতাব্দে প্রাদুভূত প্রসিদ্ধ ভৌগলিক টলেমি লিখিয়া গিয়াছেন, "গঙ্গার মোহানা-সমূহের সমীপবর্তী প্রদেশে গঙ্গরিডিগণ বাস করে। এই (রাজ্যের) রাজা 'গঙ্গে' নগরে বাস করেন।"+ টলেমি যে বাঙ্গালার ভৌগলিক বিবরণ অবগত ছিলেন, তাহা তাঁহার গ্রন্থোক্ত গঙ্গার মোহানা- সমূহের বিবরণ পাঠ করিলেই বুঝিতে পারা যায়। পূর্ব্ববর্তী পাশ্চাত্য লেখকগণ গঙ্গার একটির অধিক মোহানার পুরিচয় দিতে পারেন নাই। কিন্তু টলেমি গঙ্গার পাঁচটি মোহানার উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। টলেমি যে যুগের বিবরণ প্রদান করিয়া গিয়াছেন, সেই যুগে আর্য্যাবর্তে কুষাণ-সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। কুষাণ-প্রভাব যে মগধ পর্যন্ত বিস্তৃতিলাভ করিয়াছিল, তাহার কিছু কিছু প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে। সম্প্রতি বরেন্দ্রের অন্তর্গত বগুড়া জেলায় কুষাণ-সম্রাট্ বাসুদেবের (?) একটি স্ববর্ণ-মুদ্রা আবিষ্কৃত হইয়াছে।* কিন্তু এইরূপ সামান্য প্রমাণ অবলম্বনে কুষাণ-সাম্রাজ্যের সহিত বাঙ্গালার কিরূপ সম্বন্ধ ছিল, তাহা নিরূপণ করা সুকঠিন।
|| গুপ্ত-সাম্রাজ্য ||
খৃষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর বাঙ্গালার ইতিহাস একেবারে অন্ধকারাচ্ছন্ন। চতুর্থশতাব্দীর প্রারম্ভে [মৌর্য্য-সাম্রাজ্যের অধঃপতনের প্রায় পাঁচশত বৎসর পরে] মগধে আর একটি মহা-সাম্রাজ্য-প্রতিষ্ঠার আয়োজন হইয়াছিল। যিনি এই সাম্রাজ্যের ভিত্তি-স্থাপন করিয়াছিলেন, তাঁহার নামও চন্দ্রগুপ্ত। ৩২০ খৃষ্টাব্দের ২৬শে ফেব্রুয়ারী [এই চন্দ্রগুপ্তের অভিষেককাল] হইতে "গুপ্তাব্দ” নামক একটি অভিনব অব্দ-গণনার আরম্ভ হইয়াছিল বলিয়া সুধীগণ স্থির করিয়াছেন। চন্দ্রগুপ্তের পুত্র [লিচ্ছবি-রাজকুলের দৌহিত্র] সমুদ্রগুপ্ত স্বীয় ভুজবলে এই অভিনব সাম্রাজ্য গঠিত করিয়াছিলেন। প্রয়াগের অশোকস্তম্ভ-গাত্রে উৎকীর্ণ কবি-হরিষেণ বিরচিত প্রশস্তিতে সমুদ্রগুপ্তের দিগ্বিজয়-কাহিনী বর্ণিত রহিয়াছে। এই প্রশস্তিতে সমুদ্রগুপ্ত ["সমতটডবাক্-কামরূপ-নেপাল-কর্তৃপুরাদি-প্রত্যন্তনৃপতিভিঃ”] প্রত্যন্ত প্রদেশের নৃপতিগণ কর্তৃক ["সর্ব্বকর-দানাজ্ঞা-করণ-প্রণামাগমন-পরিতোষিত-প্রচণ্ডশাসনস্য”] সর্ব্বকরদান-আজ্ঞাকরণ, প্রণাম এবং আগমনের দ্বারা পরিতুষ্ট প্রচণ্ড শাসনকারী বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন। বাঙ্গলার কোন্ অংশ যে "ডবাক্” নামে উল্লিখিত হইয়াছে, তাহা স্থির করা কঠিন। কারণ, এ পর্য্যন্ত আর কোথাও "ডবাক্” নামটি দেখিতে পাওয়া যায় নাই। সমতট [বঙ্গ] এবং “ডবাক্” ব্যতীত বাঙ্গলার অপরাপর অংশ,-ণ্বণ্ড [বরেন্দ্র] এবং রাঢ়, -সম্ভবত খাস গুপ্ত-সাম্রাজ্যের অন্তভূ'ত হইয়াছিল।
আনুমানিক ৩৮০ খৃষ্টাব্দে [সম্রাট্ সমুদ্রগুপ্তের পরলোকান্তে] তদীয় পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত সাম্রাজ্যলাভ করিয়াছিলেন এবং ৪১৩ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সিংহাসনে অধিরূঢ় ছিলেন। দিল্লীর নিকটবর্তী [মিহরৌলী নামক স্থানে অবস্থিত] একটি লৌহ-স্তম্ভে "চন্দ্র” নামক একজন পরাক্রান্ত নৃপতির দিগ্বিজয়-কাহিনী উৎকীর্ণ রহিয়াছে। এই লিপিতে উক্ত হইয়াছে, এই নৃপতি "বঙ্গদেশে সমরে দলবদ্ধ বহুসংখ্যক শত্রুকে পরাভূত করিয়াছিলেন।" কেহ কেহ এই "চন্দ্র”কে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বলিয়া অনুমান করিয়াছেন। সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর, সম্ভবতঃ বঙ্গের বা সমতটের সামন্তগণ স্বাতন্ত্র্য অবলম্বন করিয়াছিলেন এবং সেই বিদ্রোহ-দমনের জন্ম্য সম্রাট্ বঙ্গদেশ আক্রমণ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত যখন আর্য্যাবর্তের সম্রাট্ তখন পরিব্রাজক ফা হিয়ান্ আৰ্যাবর্ত-ভ্রমণে ব্যাপৃত ছিলেন এবং ভ্রমণের শেয দুই বৎসর (৪১১-৪১২ খৃষ্টাব্দ) তাম্রলিপ্তি-বন্দরে বাস করিয়া বৌদ্ধ-গ্রন্থের প্রতিলিপি প্রস্তুত করণে এবং দেব-মূর্তির চিত্র সঙ্কলনে নিরত ছিলেন।
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর প্রথম কুমারগুপ্ত সাম্রাজ্যাভিষিক্ত হইয়া- ছিলেন। ১১৩ গুপ্ত-সম্বতে [৪৩২ খৃষ্টাব্দে। উৎকীর্ণ কুমারগুপ্তের সময়ের একখানি তাম্রশাসন রাজশাহী জেলার অন্তর্গত ধানাইদহ গ্রামে আবিষ্কৃত হইয়াছে।* কুমারগুপ্ত দীর্ঘকাল [৪১৩-৪৫৫ খৃষ্টাব্দ] সাম্রাজ্য পালন করিয়া পরলোক গমন করিলে, তদীয় পুত্র স্কন্দগুপ্ত পিতৃ-সিংহাসনে অধিরোহণ করিয়াছিলেন। ফরিদপুর জেলায় স্কন্দগুপ্তের মুদ্রা আবিষ্কৃত হইয়াছে এবং ঢাকা, ফরিদপুর এবং যশোহর জেলার কোন কোন স্থানে গুপ্ত-সম্রাটদিগের মুদ্রার ঢঙ্গের মুদ্রা দেখিতে পাওয়া গিয়াছে। স্কন্দগুপ্তের সময় হইতে মধ্য-এসিয়াবাসী হুণগণ আসিয়া উত্তরাপথ [আর্য্যাবর্ত] আক্রমণ করিতে আরম্ভ করিয়াছিল। সম্রাট্ স্কন্দগুপ্ত প্রথমবারের আক্রমণকারিগণকে পরাভূত করিয়া সাম্রাজ্য-রক্ষায় সমর্থ হইয়াছিলেন। স্কন্দগুপ্তের উত্তরাধি- কারিগণ তেমন যোগ্য লোক ছিলেন না। খৃষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দের শেষভাগে, হুণ-নায়ক তোরমাণশাহ আসিয়া সাম্রাজ্যের পশ্চিমার্দ্ধ অধিকার করিয়া লইয়াছিলেন।
ষ্ঠ শতাব্দের প্রারম্ভে যশোধর্ম্ম-বিষ্ণুবর্দ্ধন তোরমাণের পুত্র ণাধিপ মিহিরকুলকে পরাজিত করিয়া, পুনরায় সাম্রাজ্যের ঐক্য-স্থাপনে সমর্থ হইয়া- ছিলেন। মালবদেশের অন্তর্গত দসোর বা মন্দসোর-নগরের নিকট প্রাপ্ত [যশোধৰ্ম্ম-কর্তৃক স্থাপিত] দুইটি প্রস্তর-স্তম্ভে যে প্রশস্তি উৎকীর্ণ রহিয়াছে, তাহাতে উক্ত হইয়াছে-“গুপ্তনাথগণ” এবং "হূণাধিপগণ” যে সকল দেশ অধিকারে অসমর্থ হইয়াছিলেন, তিনি সেই সকল দেশও উপভোগ করিয়া- ছিলেন; এবং পূর্ব্বদিকে
"আলৌহিত্যোপকণ্ঠাত্তালবনগহনোপত্যকাদামহেন্দ্রাৎ"
“লৌহিত্য [ব্রহ্মপুত্র] নদের উপকণ্ঠ হইতে আরম্ভ করিয়া, গহন-তালবন আচ্ছাদিত মহেন্দ্র-গিরির উপত্যকা [কলিঙ্গ] পর্য্যন্ত” বিস্তৃত ভূভাগের সামন্তগণ তাঁহার চরণে প্রণত হইয়াছিল (৪-৬ শ্লোক)।† মন্দসোর হইতে সংগৃহীত [যশোধর্ম্মের শাসন-সময়ের] "মালবগণস্থিতি” হইতে গণিত অব্দের ৫৮৯ সালের আর একখানি শিলা-লিপিতে উক্ত হইয়াছ-
"প্রাচী নৃপান্ সুবৃহতশ বহুনুদীচঃ
সান্না যুধা চ বশগান্ প্রবিধায় যেন।
নামাপরং জগতি কান্তমদো দুরাপং
রাজাধিরাজ পরমেশ্বর ইত্যুদূঢ়ম্ ॥"
"যিনি [যশোধৰ্ম্ম] প্রবল পরাক্রান্ত প্রাচ্য এবং বহুসংখ্যক উদীচ্য-নৃপতি- গণকে সন্ধিসূত্রে এবং সংগ্রামে বশীভূত করিয়া, জগতে শ্রুতি-সুখকর এবং দুল্ল'ভ 'রাজাধিরাজ পরমেশ্বর' এই দ্বিতীয় নাম ধারণ করিয়াছেন।” পণ্ডিতগণ স্থির করিয়াছেন-'মালবগণস্থিতি' হইতে গণিত অব্দই 'বিক্রম-সম্বৎ' নামে পরিচয় লাভ করিয়াছে। সুতরাং এই প্রশস্তিতে প্রাচ্য-নৃপগণের উল্লেখ দেখিয়া বুঝিতে পারা যায়, ৫৮৯ মালব-বিক্রমাব্দের [৫৩৩ খৃষ্টাব্দের] পূর্ব্বেই যশোধৰ্ম্ম লৌহিত্যনদের উপকণ্ঠ হইতে মহেন্দ্র-গিরির উপত্যকা পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন।
গৌড়াধিপ-শশাঙ্ক
মহারাজাধিরাজ যশোধর্ম্মের পরলোক গমনের পর, কে যে উত্তরাপথের সার্ব্বভৌম নরপতি পদ লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন অথবা কেহ সমর্থ হইয়াছিলেন কিনা, তাহা বলা কঠিন। খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দের শেষার্দ্ধে, যে সকল নরপাল বিদ্যমান ছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে কেবল মৌখর বা মৌখরি-বংশীয় ঈশানবর্ম্মা এবং তদীয় পুত্র শৰ্ব্ববর্ম্মাকে “মহারাজাধিরাজ” উপাধিতে ভূষিত দেখিতে পাওয়া যায়।* মৌখর-বংশীয় "মহারাজাধিরাজগণের” প্রভাব বাঙ্গালাদেশ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করিয়াছিল কি না, বলা কঠিন। মগধের অপর গুপ্ত-বংশীয় কুমারগুপ্তের সহিত ঈশানবর্ম্মার যুদ্ধ চলিয়াছিল। ফরিদপুর জেলায় আবিস্তৃত চারিখানি তাম্রশাসনে যথাক্রমে ধৰ্ম্মাদিতা, গোপচন্দ্র এবং সমাচারদেব নামক তিনজন "মহারাজাধিরাজ” বা সম্রাটের পরিচয় পাওয়া গিরাছে। ষষ্ঠ শতাব্দের শেষভাগে স্থানীশ্বরের [থানেশ্বরের] অধিপতি প্রভাকর-বর্দ্ধন উত্তরাপথের পঞ্চম ভাগে স্বীয় প্রাধান্য স্থাপন এবং "মহারাজাধিরাজ” উপাধি গ্রহণ করিয়াছিলেন। ৬০৫ খৃষ্টাব্দে প্রভাকর-বর্দ্ধন সহসা কালগ্রাসে পতিত হইলে, উত্তরাপথের সার্বভৌম নৃপতির পদ লাভের জন্য ভীষণ সমরানল প্রজ্জ্বলিত হইয়াছিল। প্রভাকর-বর্দ্ধনের জামাতা মৌখরি গ্রহবৰ্ম্মা পাঞ্চালের রাজধানী কান্যকুজের সিংহাসনে অধিরূঢ় ছিলেন। প্রভাকর-বন্ধনের মৃত্যু-সংবাদ প্রচারিত হইবামাত্র মালব হইতে দেবগুপ্ত (?) সসৈন্য কান্যকুব্জাভিমুখে ধাবিত হইয়াছিলেন। মালবরাজ কান্যকুব্জে উপনীত হইয়া, যুদ্ধে গ্রহবৰ্ম্মাকে নিহত এবং রাজপুরী অধিকৃত করিয়া, তদীয় পত্নী স্থানীশ্বররাজ-দুহিতা রাজ্যশ্রীকে লৌহশৃঙ্খলাবদ্ধ-চরণে কারাগারে নিক্ষেপ করিয়া, স্থানীশ্বর অভিমুখে যাত্রা করিতেউদ্যত হইয়াছিলেন। এই দুঃসংবাদ পাইবামাত্র প্রভাকর-বর্দ্ধনের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজ্যবর্দ্ধন দশ সহস্র অশ্বারোহাঁ লইয়া মালব-রাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-যাত্রা করিয়া সহজেই মালব-সৈন্যের পরাভব সাধন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। কিন্তু এই বিজয়ের শ্রান্তি দূর হইতে না হইতে, ভগিনীর কারা-মোচনের পূর্ব্বেই তিনি প্রবলতর প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্মুখীন হইতে বাধ্য হইয়াছিলেন। এই অভিনব প্রতিদ্বন্দ্বী-"গৌড়াধিপ” শশাঙ্ক ।*
শশাঙ্কের পূর্ব্ব ইতিহাস সম্বন্ধে আমরা এতই অজ্ঞ যে তাঁহার এবং তাঁহার প্রতিষ্ঠিত গৌড়-রাজ্যের অভ্যুদয় নির্মেঘ-গগনে বিদ্যুৎ-প্রভার ন্যায় একেবারে আকস্মিক বলিয়া প্রতিভাত হয়। "হর্ষচরিত”-প্রণেতা বাণভট্ট শশাঙ্ককে "গৌড়াধিপ”, “গৌড়” এবং কখনও বা বিদ্বেষ-বশত "গৌড়াধম” এবং "গৌড়ভুজঙ্গ” বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। ইউয়ান্ চোয়াং "কর্ণসুবর্ণের রাজা” বলিয়া শশাঙ্কের পরিচয় প্রদান করিয়াছেন। সংস্কৃত অভিধানে "গৌড়” শব্দের পর্যায়ে “পুশু”, “বরেন্দ্রী” এবং "নীবৃৎ” উল্লিখিত রহিয়াছে। গৌড়েবা বরেন্দ্র-দেশে শশাঙ্কের সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হইয়াছিল বলিয়াই, বোধ হয়, তিনি "গৌড়াধিপ” উপাধি গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার রাজধানী "কর্ণসুবর্ণ” রাঢ়দেশে, [মুর্শিদাবাদ-নগরের ১২ মাইল ব্যবধানে] অবস্থিত ছিল বলিয়া স্থিরীকৃত হইয়াছে। যিনি কর্ণসুবর্ণ হইতে কান্যকুব্জ জয়ার্থ যাত্রা করিতে সাহসী হইয়াছিলেন, তিনি যে পূর্ব্বেই বঙ্গ অধিকার করিয়াছিলেন এবং মগধ ও মিথিলায় প্রাধান্য-স্থাপন করিয়াছিলেন, তাহা নিঃসন্দেহে অনুমান করা যাইতে পারে। সাহাবাদ জেলার অন্তর্গত রোটাস্-গড়ে প্রাপ্ত একটি পাষাণ-নিৰ্ম্মিত মুদ্রার ছাঁচে "মহাসামন্ত শশাঙ্কদেব” উৎকীর্ণ দেখিয়া কোন কোন পণ্ডিত মনে করেন, ইহা গৌড়াধিপ-শশাঙ্কের মুদ্রার ছাঁচ। এই অনুমান সত্য হইলে'মনে করিতে হইবে, শশাঙ্ক প্রথমে কোনও সার্ব্বভেমি নরপালের সামস্তশ্রেণী-ভুক্ত ছিলেন; এবং ষষ্ঠ শতাব্দের শেষভাগে, যে সুযোগ পশ্চিমদিকে স্থানীশ্বরের প্রভাকর-বর্দ্ধন এক অভিনব সাম্রাজ্যের ভিত্তি-স্থাপন করিয়াছিলেন, সেই সুযোগে, পূর্ব্বদিকে “লৌহিত্য-নদের উপকণ্ঠ হইতে গহনতালবনাচ্ছাদিত মহেন্দ্র-গিরির উপত্যকা” পর্য্যন্ত বিস্তৃত ভূভাগ বশীভূত করিয়া, তিনি গৌড়রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। গৌড়-মণ্ডল দীর্ঘকাল উত্তরাপথ-সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূ'ত থাকিলেও ইতিপূর্ব্বেই ভাষায় এবং সাহিত্যে “গৌড়জনে”র স্বাতন্ত্র্যপ্রিয়তা প্রকাশ পাইয়াছিল। প্রাচীন আলঙ্কারিক দণ্ডী [কাব্যাদর্শে] ভাষার মধ্যে "গৌড়ী” নামক স্বতন্ত্র প্রাকৃত-ভাষার, এবং কাব্যরচনায় "গৌড়ী-রীতি” নামক স্বতন্ত্র রচনা-রীতির উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। "গৌড়ী”-ভাষা এবং "গৌড়ী”-রীতি গৌড়-রাজ্যের অগ্রদূতরূপে গৃহীত হইতে পারে।
ঠিক কোন্ খানে যে গৌড়াধিপের সহিত রাজবর্দ্ধনের সংঘর্ষ উপস্থিত হইয়া- ছিল, বাণভট্ট তাহা স্পষ্টাক্ষরে লিখিয়া যান নাই। "হর্ষচরিতের” ষষ্ঠ উচ্ছ্বাসে বর্ণিত হইয়াছে, রাজ্যবর্দ্ধন স্থানীশ্বর হইতে যুদ্ধযাত্রা করিবার পর "বহুদিবস অতীত হইলে”, [অতিক্রান্তেষু বহুয় বাসরেষু] হর্ষ সংবাদ পাইলেন, “তাঁহার ভ্রাতা অক্লেশে মালবসৈন্যের পরাজয় সাধন করিতে সমর্থ হইলেও গৌড়াধিপ তাঁহাকে মিথ্যা লোভ দেখাইয়া, বিশ্বাস উৎপাদন করিয়া স্বভবনে (লইয়া গিয়া) অস্ত্রহীন অবস্থায় একাকী পাইয়া গোপনে নিহত করিয়াছেন।”* ইউয়ান্ চোয়াংএর গ্রন্থে এই বর্ণনার কিঞ্চিৎ বিকৃত প্রতিধ্বনি পরিরক্ষিত হইয়াছে। ইউয়ান্ চোয়াং লিখিয়াছেন, প্রভাকরবর্দ্ধনের মৃত্যুর পর "(হর্ষবর্দ্ধনের) জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাজ্যবর্ধন সিংহাসনে আরোহণ করিয়া সম্ভাবে রাজ্যশাসন করিতেছিলেন। এই সময় ভারতের পূর্ব্বাংশস্থিত কর্ণসুবর্ণের রাজা শশাঙ্ক অনেক সময় তাঁহার মন্ত্রিগণকে বলিতেন, 'যদি সীমান্ত-প্রদেশের রাজা ধাম্মিক হয়, তবে স্বরাজ্যের অকল্যাণ হয়।' এই কথা শুনিয়া, তাঁহারা রাজা রাজ্যবর্দ্ধনকে সাক্ষাৎ করিতে আহ্বান করিয়াহিলেন এবং তাঁহাকে নিহত করিয়াছিলেন।” +
বাণভট্ট-প্রদত্ত রাজ্যবর্দ্ধন-নিধনের এই সংক্ষিপ্ত বিবরণ সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য বলিয়া মনে হয় না। একজন প্রতিযোগী (মালবাধিপতি) যাঁহার ভগিনী- পতিকে নিহত করিয়া, ভগিনীকে শৃঙ্খলাবদ্ধ-চরণে কারাগারে নিক্ষেপ করিয়া- ছিল, সেই রাজ্যবর্দ্ধন যে মুখের কথায় ভুলিয়া, একাকী নিরস্ত্র আর একজন প্রতিযোগীর [গৌড়াধিপের] ভবনে যাইতে সম্মত হইয়াছিলেন, তাহা সম্ভব নহে। "হর্ষচরিত” পূর্ব্বাপর আলোচনা করিলে প্রকৃত ঘটনার কতক আভাস পাওয়া যায়। রাজ্যবর্দ্ধন যখন কান্যকুজাভিমুখে যাত্রা করেন তখন তাঁহার মাতুল-পুত্র ভণ্ডি অশ্বারোহী-সেনার অধিনায়করূপে তাঁহার অনুগমন করিয়া- ছিলেন। হর্ষ ভ্রাতৃ-বিয়োগের সংবাদ পাইবামাত্র, "পৃথিবী নির্গৌড়” করিবার জন্য সসৈন্য কিয়দ্দুর অগ্রসর হইলে, সংবাদ পাইলেন-রাজ্যবর্দ্ধনের বাহুবলে উপার্জিত মালব-রাজ্যের দ্রব্যাদি লইয়া ভণ্ডি আসিতেছেন।§ ভণ্ডির আনীত লুষ্ঠিত দ্রব্য মধ্যে বহুসংখ্যক হস্তী, দ্রুতগামী অশ্ব, নানাবিধ অলঙ্কার, ধনপূর্ণ কুম্ভ এবং নিগড়াবদ্ধ কয়েদীগণ ছিল। ভণ্ডি শিবিরে উপনীত হইলে, হর্ষ তাঁহাকে ভ্রাতৃ-মরণবৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করিলেন। ভণ্ডি যথাযথ সমুদায় বৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন। অনন্তর নরপতি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, 'রাজ্যশ্রীর সংবাদ কি?' (ভণ্ডি) পুনরায় বলিলেন, "দেব! আমি লোকের মুখে শুনিতে পাইয়াছি, রাজ্যবর্দ্ধন স্বর্গারোহণ করিলে এবং গুপ্ত নামক ব্যক্তি কর্তৃক কান্যকুব্জ অধিকৃত হইলে, রাজ্ঞী রাজ্যশ্রী কারাগার হইতে বহির্গত হইয়া, [সানুচরী] বিন্ধ্যারণ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন। তাঁহার অনুসন্ধানে অনেক লোক প্রেরিত হইয়াছে, কিন্তু কেহ এখনও প্রত্যাগত হয় নাই।” রাজ্যশ্রীর কারামুক্তি-কাহিনী অষ্টম উচ্ছ্বাসে আরও একটু বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। হর্ষ যখন বিন্ধ্যারণ্যে ভগিনীর সাক্ষাৎ লাভ করিলেন তখন "অনুচরিগণের নিকট হইতে ভগিনীর কারাবাস হইতে আরম্ভ করিয়া গৌড়াধিপের আক্রমণকালে গুপ্ত নামক কুলপুত্র-কর্তৃক কান্যকুষ্ণের কারাগার হইতে তাঁহার নিষ্কাশন, কারা-বহির্গত হইয়া রাজ্যবর্দ্ধনের মৃত্যু-সংবাদ শ্রবণ, শুনিয়া আহার ত্যাগ, অনাহারে বিন্ধ্যারণ্যে ভ্রমণক্লেশ এবং হতাশ হইয়া অগ্নি-প্রবেশের উদ্যোগ পর্য্যন্ত সমস্ত বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়াছিলেন।।"
এখানে স্পষ্টই দেখিতে পাওয়া যায়, রাজ্যবর্দ্ধন মালব-রাজকে পরাজিত করিয়া নিজকে নিরাপদ জ্ঞান করিয়া,যুদ্ধ-লব্ধ গজ, অশ্ব, দ্রব্যাদি এবং বন্দি- গণকে সেনাপতি ভণ্ডির সহিত স্থানীশ্বরে প্রেরণ করিয়াছিলেন এবং স্বয়ং ভগিনীর উদ্ধার-সাধনের জন্য কান্যকুব্জ যাত্রা করিয়াছিলেন। কান্যকুজের নিকটবর্তী হইয়াই, হয়ত, রাজ্যবর্দ্ধন সসৈন্য গৌড়াধিপ কর্তৃক স্বীয় পথ রুদ্ধ দেখিতে পাইয়াছিলেন। রাজ্যবর্দ্ধনের দশ সহস্র অশ্বারোহীর মধ্যে কতক মালবপতির সহিত যুদ্ধে নিহত হইয়াছিল এবং কতক লুষ্টিত দ্রব্য [রক্ষার্থ] ভণ্ডির সহিত প্রেরিত হইয়াছিল। সুতরাং রাজ্যবর্দ্ধনের সহিত তখন হয়ত ছয় সাত হাজারের অধিক অশ্বারোহী ছিল না। পক্ষান্তরে, গৌড়াধিপ ইহা অপেক্ষা অনেক অধিক সেনাবল না লইয়া,কান্যকুজের মত দূরদেশ-জয়ে যাত্রা করিতে সাহসী হন নাই। সুতরাং গৌড়াধিপের সম্মুখীন হইয়া যুদ্ধ করিয়া থাকিলে, রাজ্যবর্ধন হয় যুদ্ধক্ষেত্রে ধৃত হইয়াছিলেন বা আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন; আর না হয়, পরাজয় নিশ্চিত জানিয়া বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন। রাজ্যবর্দ্ধন মিথ্যা-প্রলোভনে মুগ্ধ হইয়া, স্বেচ্ছায় গৌড়াধিপের শিবিরে গমন করেন নাই, গত্যন্তর ছিল না বলিয়াই গিয়াছিলেন। হর্ষবর্দ্ধনের তাম্রশাসননিচয়ে রাজ্যবর্দ্ধনের মৃত্যুর যে বিবরণ প্রদত্ত হইয়াছে, তাহাও এই অনুমানের অনুকুলে সাক্ষ্য দিতেছে। যথা-
"রাজানো যুধি দুষ্ট-বাজিন ইব শ্রীদেবগুপ্তাদয়ঃ
কৃত্বা যেন কশাপ্রহার-বিমুখাঃ সর্ব্ব সমং সংযতাঃ।
উৎখায় দ্বিষতো বিজিত্য বসুধাস্কৃত্বা প্রজানাং প্রিয়ং
প্রাণানুজকিতবানরাতি-ভবনে সত্যানুরোধেন যঃ ।"
"যিনি কশাঘাতে সংযত দুষ্ট অশ্বের ন্যায় শ্রীদেবগুপ্তাদি সমস্ত রাজগণকে সমভাবে সংযত করিয়াছিলেন, যিনি শত্রুকুল নির্মূল করত বসুধা জয় করিয়া এবং প্রজাপুঞ্জের প্রিয়কার্য্য সাধন করিয়া সত্যরক্ষা করিতে গিয়া শত্রুভবনে প্রাণত্যাগ করিয়াছিলেন।"
প্রশস্তিকার "সত্যানুরোধে” কথাটি বলিয়া স্পষ্ট দেখাইয়াছেন, রাজ্যবর্তন স্বেচ্ছায় গৌড়াধিপের ভবনে গমন করেন নাই।
রাজ্যবর্দ্ধন নিহত হইলে কান্যকুব্জ নির্বিবাদেই গৌড়পতির হস্তগত হইয়া- ছিল। তিনি গুপ্ত নামক ব্যক্তির হস্তে কান্যকুজ-নগর রক্ষার ভার অর্পণ করিয়াছিলেন। গুপ্ত সম্ভবতঃ গৌড়াধিপের আদেশক্রমে রাজ্যশ্রীকে কারামুক্ত করিয়া, তাঁহাকে অনুচরীগণের সহিত যথাভিলষিত স্থানে গমন করিতে অনুমতি দিয়াছিলেন। রাজ্যশ্রীর কারামুক্তি শশাঙ্কের তৎকাল-দুর্ল'ভ সহৃদয়তার পরিচায়ক।
রাজ্যবর্দ্ধনকে নিহত করিলে সহজে উত্তরাপথে স্ত্রীয় প্রাধান্য স্থাপনে সমর্থ হইবেন, এই আশায় শশাঙ্ক শরণাগত রাজ্যবর্দ্ধন্ধনকে নিষ্ঠুরভাবে নিহত করিয়্যছিলেন। কিন্তু বিধাতা গৌড়াধিপের অদৃষ্টে সার্ব্বভৌমের পদলাভ লেখেন নাই। স্থানীশ্বরের শূন্য-সিংহাসনে তদীয় অনুজ হর্ষ আরোহণ করিলেন। হর্ষ ভণ্ডিকে গৌড়াধিপের গতিরোধার্থ নিয়োগ করিয়া স্বয়ং রাজ্যশ্রীর অনুসন্ধানের জন্য বিন্ধ্যারণ্যে প্রবেশ করিলেন। "হর্ষচরিতে” রাজ্যশ্রীর সহিত মিলন এবং তাঁহাকে লইয়া হর্ষের গঙ্গাতীরস্থিত শিবিরে প্রত্যাগমন পর্যন্ত বর্ণিত হইয়াছে। ইউয়ান্ চোয়াং লিখিয়াছেন, হর্ষ রাজপদে বৃত হইয়া মন্ত্রীগণকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন,-"যতদিন আমার ভ্রাতার শত্রুগণকে সমুচিত শাস্তি দিতে না পারিব এবং নিকটবর্তী রাজ্যসমূহ বশীভূত করিতে না পারিব, ততদিন এই দক্ষিণ হস্তদ্বারা আহার্য্য সামগ্রী তুলিয়া মুখে দিব না।” তাঁহার আদেশক্রমে স্থানীশ্বরে ৫০০০ হস্তী, ২০০০ অশ্বারোহী এবং ৫০০০০ পদাতি সংগৃহীত হইল। এই সেনা লইয়া হর্ষবর্দ্ধন গৌড়-সাম্রাজ্য আক্রমণ করিয়াছিলেন। ইউয়ান্ চোয়াং লিখিয়াছেন,-"(হর্ষবর্দ্ধন) পূর্ব্বদিকে অগ্রসর হইয়া, যে সকল রাজ্য তাঁহার অধীনতা স্বীকার করিতে অস্বীকৃত হইয়াছিল, সেই সকল রাজ্য আক্রমণ করিয়াছিলেন; এবং অবিরত যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকিয়া ছয় বৎসরের ধ্যে 'পঞ্চ-ভারতের' (Five Indias) সহিত যুদ্ধ করিয়াছিলেন। তৎপর স্বরাজ্যের পরিসর বিস্তৃত করিয়া সেনাবল বৃদ্ধি করিয়াছিলেন। ৬০০০০ হস্তী এবং ১০০০০০ অশ্বারোহী সংগৃহীত হইয়াছিল। তিনি অতঃপর আর অস্ত্রধারণ না করিয়া নির্বিরোধে ৩০ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন।"* ইউয়ান্ চোয়াংএর অন্যতম অনুবাদক টমাস্ ওয়াটার্স' লিখিয়াছেন, এই অংশে পাঠান্তর দৃষ্ট হয়। এক রূপ পাঠানুযায়ী অনুবাদ এস্থলে প্রদত্ত হইল। আর এক রূপ পাঠানুসারে অর্থ হয়, -হর্ষবর্দ্ধন ছয় বৎসর যুদ্ধ করিয়া, "পঞ্চ-ভারত' স্বীয় বশবর্তী করিয়া ছিলেন।" "পঞ্চ-ভারত” অর্থ যাহাই হউক, হর্ষবর্দ্ধন যে ছয় বৎসরকাল অবিরত যুদ্ধ করিয়াও গৌড়াধিপের বিশেষ ক্ষতি করিতে পারেন নাই, তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। কলিঙ্গের শৈলোদ্ভব-বংশীয় মহাসামন্ত মাধবরাজের ৩০০ চলিত গৌপ্তাব্দে [৬১৯ খৃষ্টাব্দে] সম্পাদিত তাম্রশাসনে "মহারাজাধিরাজ” শশাঙ্ক "চতুরুদধি-সলিল-বীচি-মেখলা-নিলীন-সদ্বীপ-গিরিপত্তনবর্তী-বসুন্ধরার” অধীশ্বর বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন।
ছয় বৎসর ব্যাপী যুদ্ধের পরও যে গৌড়াধিপ শশাঙ্ক শান্তিভোগে সমর্থ হইয়াছিলেন, এরূপ মনে হয় না। ইউয়ান্ চোয়াং লিখিয়াছেন, তিনি কুশীনগর প্রদেশ হইতে বৌদ্ধ-শ্রমণগণকে বিদূরিত করিয়া দিয়াছিলেন; পাটলিপুত্রের বুদ্ধ-পদচিহ্নবিশিষ্ট প্রস্তর ভাঙ্গিয়া ফেলিতে এবং তাহাতে বিফলকাম হইয়া গঙ্গাগর্ভে ডুবাইয়া দিতে যত্ন করিয়াছিলেন; বুদ্ধগয়ার বোধিবৃক্ষ উন্মুলিত এবং আশ্রমসমূহ ধ্বংস করিয়াছিলেন; বোধিবৃক্ষের নিকট একটি বিহারে প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধ-মূর্তি ধ্বংস করিয়া শিবমূর্তি স্থাপন করিতে আদেশ দিয়াছিলেন। শশাঙ্ক যে কর্মচারীর উপর শেষোক্ত ভার অর্পণ করিয়াছিলেন, তিনি বুদ্ধ-মূর্তিতে হস্তক্ষেপ করিতে সাহস না পাইয়া, মূর্তির সম্মুখে একটি প্রাচীর নির্মাণ করিয়া, উহাকে একেবারে ঢাকিয়া ফেলিয়া প্রাচীর গাত্রে শিব-মূর্তি অঙ্কিত করিয়া দিয়াছিলেন। ইউয়ান্ চোয়াং লিখিয়াছেন-এই ঘটনার পর শশাঙ্ক আতঙ্কে অভিভূত হইয়া পড়িয়াছিলেন। তাঁহার শরীরে বহুসংখ্যক ক্ষত প্রকাশ পাইয়াছিল এবং শরীরের মাংস পচিয়া পড়িতে আরম্ভ করিয়াছিল। এই রোগে কিছুদিন ক্লেশভোগ করিয়া অবশেষে গৌড়াধিপ মানবলীলা সম্বরণ করিয়াছিলেন।
ইউয়ান্ চোয়াং লিখিয়াছেন-বৌদ্ধধর্ম্মের বিলোপ-সাধনে কৃতসঙ্কল্প হইয়া, শশাঙ্ক কুশীনগর প্রদেশে, বুদ্ধগয়ায় এবং পাটলিপুত্রে এই ধ্বংসলীলার আরম্ভ করিয়াছিলেন। কিন্তু চীনদেশীয় শ্রমণের এই সিদ্ধান্ত মুক্তি-প্রমাণের সম্পূর্ণ বিরোধী। বৌদ্ধধর্ম্মের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে যে কিছু সাম্প্রদায়িক হিংসাদ্বেষ উৎপন্ন হইয়াছিল, তাহা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধৰ্ম্মযাজকগণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি দ্বন্দ্বসমাস-প্রকরণে (পাণিণি ২।৪।১২) যাহাদের মধ্যে বিরোধ চিরন্তন [শাশ্বতিক] এইরূপ প্রাণীবাচক শব্দের দৃষ্টান্ত মধ্যে “শ্রমণব্রাহ্মণম্” উল্লেখ করিয়াছেন। পুরাণে বৌদ্ধধর্ম্মের যে নিন্দা দৃষ্ট হয়, তাহা ব্রাহ্মণ-যাজকের অন্তনিহিত শ্রমণ-বিদ্বেষ-প্রসূত। ব্রাহ্মণ হউক আর অব্রাহ্মণই হউক, সাধারণ শৈব বা বৈষ্ণবের মনে সেরূপ বিদ্বেষ ছিল না। এই শ্রেণীর লোকেরা বুদ্ধ এবং বৌদ্ধধৰ্ম্মকেও কিরূপ শ্রদ্ধার চক্ষুতে দেখিতেন, তাহা ক্ষেমেন্দ্র-ব্যাসদাসকৃত "দশাবতার চরিতম্” কাব্যের "বুদ্ধাবতার” প্রসঙ্গে এবং জয়দেবের-
"নিন্দসি যজ্ঞবিধে রহহ! শ্রুতিজাতং
হৃদয়-দর্শিত-পশুঘাতং
কেশব ধৃত-বুদ্ধ শরীর
জয় জগদীশ হরে।"
গাথায় প্রকটিত হইয়াছে। শশাঙ্ক যে যুগে প্রাদুভূত হইয়াছিলেন, সেই যুগের শৈব এবং বৈষ্ণব নরপতিগণ বৌদ্ধ-দেবতা এবং বৌদ্ধ-ভিক্ষুকে রীতিমত ভক্তি করিতেন। সম্রাট্ স্কন্দগুপ্ত (৪৫৫-৪৬৬ খৃঃ অঃ) "পরম-ভাগবত” বা বৈষ্ণব ছিলেন। বসুবন্ধুর জীবনচরিতকার পরমার্থ লিখিয়া গিয়াছেন-তিনি বৌদ্ধশ্রমণগণের উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বলভীর মৈত্রক-বংশীয় "পরমভগবত” প্রথম ধ্রুবসেন ২১৬ বলভী সম্বতে (৫৩৬ খৃষ্টাব্দে) সম্পাদিত একখানি তাত্রশাসনের দ্বারা মাতাপিতার পুণ্য বৃদ্ধির এবং স্বকীয় ঐহিক ও পারত্রিক কল্যাণের জন্য ভাগিনেয়ী পরমোপাসিকা দুড়ুা-কর্তৃক বলভী-নগরে প্রতিষ্ঠিত একটি বিহারে স্থাপিত বুদ্ধগণের পুজোপহারের এবং ভিক্ষুসংঘের সেবার জন্য একটি গ্রাম দান করিয়াছিলেন।* শশাঙ্কের প্রতিদ্বন্দী হর্ষ স্বীয় তাম্রশাসনে আপনাকে "পরম মাহেশ্বর” বা শৈব বলিয়া উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন, অথচ ইউয়ান্ চোয়াং লিখিয়াছেন, হর্ষ বুদ্ধের এবং বৌদ্ধ-শ্রমণের একান্ত পক্ষপাতী ছিলেন। যে দেশে, যে যুগে শৈব বা বৈষ্ণব-সাধারণের মনে বৌদ্ধধৰ্ম্ম-বিদ্বেষ স্থানলাভ করিতে পারিত না, সেই দেশের, সেই যুগের, শশাঙ্কের ন্যায় একজন গৃহস্থ শৈবের পক্ষে বৌদ্ধধৰ্ম্ম-লোপের কল্পনা অসম্ভব।
দ্বিতীয় কারণ, ইউয়ান্ চোয়াং স্বয়ং লিখিয়া গিয়াছেন, তৎকালে পুণ্ডবন্ধন, কর্ণসুবর্ণ, সমতট এবং তাম্রলিপ্তি, বাঙ্গালার এই চারিটি 'প্রধান নগরে বহুসংখ্যক বৌদ্ধশ্রমণ এবং অনেক বৌদ্ধমঠ স্তূপ এবং বোধিসত্ত্ব-মন্দির বর্তমান ছিল। শশাঙ্ক এই সকল নগরের বৌদ্ধ-কীত্তিকলাপের ধ্বংস-সাধনের চেষ্টা করিয়াছিলেন বলিয়া ইউয়ান্ চোয়াং তাঁহার গ্রন্থে কোনও আভাস প্রদান করেন নাই। শ্রমণগণের নির্য্যাতন এবং বৌদ্ধ-মন্দিরাদির ধ্বংস সাধন করিয়া বৌদ্ধধর্ম্মের মূলোৎপাটনই যদি শশাঙ্কের উদ্দেশ্য তইত তবে তিনি বরেন্দ্র, রাঢ় এবং বঙ্গেই তাহার সূচনা করিতেন। বাঙ্গালার বৌদ্ধগণকে নির্বিরোধে স্বধৰ্ম্মানুষ্ঠান করিতে দিয়া,তিনি যখন মগধে ও মিথিলায় [কুশী- নগর প্রদেশে] বৌদ্ধ-দলনে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন তখন বুঝিতে হইবে-ইহার মূলে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছিল না,-স্বতন্ত্র কারণ বিদ্যমান ছিল। বুদ্ধগয়া এবং কুশীনগর বৌদ্ধগণের প্রধান তীর্থস্থান। এই দুই স্থানের বৌদ্ধ-শ্রমণগণ বৌদ্ধসম্প্রদায় মধ্যে নিশ্চয়ই অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। শশাঙ্ক এবং হর্ষবন্ধনের বিরোধ উপস্থিত হইলে, হর্ষ যখন মিথিলা এবং মগধ জয়ের চেষ্টা করিতে- ছিলেন তখন হয়ত বুদ্ধগয়া এবং কুশীনগরের শ্রমণগণ হর্ষবর্দ্ধনের অনুকুলে কৌনও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইয়াছিলেন এবং এই অপরাধের দণ্ড দিবার জন্য শশাঙ্ক তাঁহাদের নির্যাতনে এবং বোধি-বৃক্ষাদি ধ্বংসকরিয়া ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র বুদ্ধগয়ার মাহাত্ম্য-নাশে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। শশাঙ্ক জীবিত থাকিতে, হর্ষবন্ধন যে মগধে স্বীয় প্রভাব-বিস্তারে সমর্থ হয়েন নাই, ইউয়ান্ চোয়াং প্রদত্ত শশাঙ্কের মৃত্যু বিবরণই তাহার প্রধান প্রমাণ।
গৌড়াধিপ শশাঙ্কের পরলোক গমনের পর, সহজেই তদীয় সাম্রাজ্য হর্ষবর্দ্ধনের পদানত হইয়াছিল। ইউয়ান্ চোয়াং বাঙ্গালার বিভিন্ন প্রদেশের রাজধানী পুণ্ড বর্দ্ধন, সমতট, তাম্রলিপ্তি এবং কর্ণসুবর্ণের বিবরণে কোনও রাজার উল্লেখ করেন নাই। পুশু বন্ধন, সমতট এবং তাম্রলিপ্তির প্রাচীন রাজবংশ সম্ভবতঃ শশাঙ্ক কর্তৃক উন্মুলিত হইয়াছিল এবং কর্ণসুবর্ণে শশাঙ্কের উত্তরাধিকারী হর্ষবর্দ্ধন কর্তৃক সিংহাসনচ্যত হইয়াছিলেন। ৬৪৮ খৃষ্টাব্দে হর্ষবর্দ্ধনের মৃত্যুর পর, সপ্তম শতাব্দীর শেষার্দ্ধের বাঙ্গালার ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন। মগধের আদিত্যসেন (৬৭১ খৃষ্টাব্দে) "মহারাজাধিরাজ” উপাধি গ্রহণ করিয়া অশ্বমেধের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। বাঙ্গালায় তাঁহার আধিপত্য বিস্তার লাভ করিয়াছিল কিনা, বলা সুকঠিন। পরিব্রাজক ইৎসিং লিখিয়া গিয়াছেন, সপ্তম শতাব্দের শেষার্দ্ধে, সেঙ্গচি নামক একজন পরিব্রাজক চীনদেশ হইতে জলপথে সমতটে বা বঙ্গে আগমন করিয়াছিলেন। সেঙ্গচি রাজভট নামক একজন নিষ্ঠাবান্ বৌদ্ধ-নৃপতিকে সমতটের সিংহাসনে আসীন দেখিয়াছিলেন।*
খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাঙ্গালায় বড়ই দুর্দ্দিনের সূত্রপাত হইয়াছিল। উত্তরাপথের ইতিহাসে এই যুগ ঘোর পরিবর্তনের যুগ। হর্ষবর্দ্ধনের মৃত্যুর পর, উত্তরাপথে সার্ব্বভৌমতন্ত্র-শাসন বিলুপ্ত হইয়াছিল; কিন্তু তৎপরিবর্তে বিভিন্ন প্রদেশে স্থিতিশীল স্বতন্ত্র রাজতন্ত্র-শাসন প্রতিষ্ঠিত হইতে অনেক বিলম্ব ছিল। অবিরত রাজবিপ্লৰ এই যুগের প্রধান লক্ষণ। বাঙ্গালার ভাগ্যে এই বিপ্লব-জনিত ক্লেশের ভার অপেক্ষাকৃত গুরুতর হইয়া- ছিল। বিন্ধ্য-প্রদেশের অধীশ্বর দ্বিতীয় জয়বর্দ্ধনের [রঘোলিতে প্রাপ্ত] তাম্রশাসন হইতে জানা যায়,-"শৈলবংশতিলক” শ্রীবন্ধন নামক নরপতির সৌবর্তন নামক পুত্র ছিল। এই সৌবর্দ্ধনের আবার তিন পুত্র হইয়াছিল।
“তেষামূর্জিত-বৈরি বিদারণ-পটুং পৌণ্ডাধিপং স্মা-পতিং।
হত্বৈ কো বিষয়ং তমেব সকলং জগ্রাহ শৌর্য্যান্বিতঃ ॥”
“ইঁহাদিগের মধ্যে শৌর্য্য্যান্বিত একজন পরাক্রান্ত-শত্রু-বিদারণ-পটু পৌণ্ড্র- ধিপকে নিহত করিয়া সমস্ত (পৌণ্ড্র) দেশ অধিকার করিয়াছিলেন।"
এই পৌণ্ড্র-বিজেতার কনিষ্ঠ সহোদরের প্রপৌত্র দ্বিতীয় জয়বর্জন রখোলিতে প্রাপ্ত শাসনের সম্পাদন-কর্তা। এই তাম্রশাসনের প্রকাশক শ্রীযুক্ত হীরালাল, অক্ষরের আকৃতির হিসাবে ইহাকে খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগে স্থাপনকরিতে চাহেন। সুতরাং দ্বিতীয় জয়বর্দ্ধনের অনুল্লিখিতনামা প্রপিতামহের অনুল্লিখিত-নামা পৌণ্ড্রধিপহন্তা অগ্রজকে অষ্টম শতাব্দের প্রারম্ভে স্থাপন করা যাইতে পারে। এই পৌণ্ড্র জিৎ কোন্ দেশ হইতে আসিয়া পৌণ্ড্রদেশ আক্রমণ করিয়াছিলেন, তাঁহার বংশের নাম হইতে তাহার কথঞ্চিৎ আভাস পাওয়া যায়। গৌড়াধিপ শশাঙ্কের কলিঙ্গের মহাসামস্ত মাধবরাজ “শৈলোদ্ভব"-বংশীয় ছিলেন, তাহা পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। অন্যান্য তাম্রশাসন হইতে জানা যায়, সপ্তম শতাব্দে উড়িষ্যা ও কলিঙ্গ "শৈলোদ্ভব-বংশীয় রাজগণের করতলগত ছিল। অজ্ঞাতনামা "শৈলবংশীয়” পৌণ্ড্রজিৎ "শৌলোত্তব-বংশের” শাখান্তর হইতে সমৃম্ভূত বলিয়া অনুমান হয়। এই অভিনব পৌণ্ড্রধিপের নামের মত, ইহার পরিণাম সম্বন্ধেও আমরা কিছুই জানি না।
পৌণ্ড্রদেশ যখন “শৈলবংশীয়” আক্রমণকারীর পদানত, তখন যশোবৰ্ম্মা নামক একজন উচ্চাভিলাষী নরপাল কান্যকুজের সিংহাসন লাভ করিয়া, হর্ষবন্ধনের রাজধানীর পূর্ব্ব-গৌরব পুনরুজ্জীবিত করিতে যত্নবান্ হইয়াছিলেন। যশোবর্ম্মার দিগ্বিজয়-কাহিনী তদীয় সভাকবি বাক্কতিরাজ কর্তৃক "গউড়বহো” নামক প্রাকৃত ভাষায় রচিত কাব্যে বর্ণিত হইয়াছে।* চীনদেশের ইতিহাসে উল্লিখিত হইয়াছে, ৭৩১ খৃষ্টাব্দে যশোবৰ্ম্মা চীন সম্রাটের নিকট দূত প্রেরণ করিয়াছিলেন। ইহার পূর্ব্বেই সম্ভবতঃ যশোবর্ম্মার “গউড়বহো”-বর্ণিত দিগ্বিজয় সম্পন্ন হইয়াছিল।
বাক্তিরাজের কাব্যের "গউড়” বা গৌড়পতি এবং "মগহনাহ” বা মগধনাথ অভিন্ন ব্যক্তি অর্থাৎ তৎকালে মগধেশ্বর শশাঙ্ক-প্রবর্তিত উত্তরাপথের পূর্ব্বাংশের অধিপতি "গৌড়াধিপ”-উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। বস্তুতঃ সপ্তম শতাব্দের সূচনা হইতে [দ্বাদশ শতাব্দের অবসানে] তুরূষ্ক-বিজয় পর্যন্ত গৌড়মণ্ডলের আভ্যন্তরীণ অবস্থা যখন যেরূপই হউক, "গৌড়েশ্বর” বা "গৌড়া- ধিপ” উপাধিধারী নরপতির অভাব কখনও উপস্থিত হয় নাই। যশোবর্ম্মার প্রতিদ্বন্দ্বী "গৌড়পতি” সম্ভবতঃ আদিত্যসেনের প্রপৌত্র মহারাজাধিরাজ দ্বিতীয় জীবিত গুপ্ত। বাক্পতি লিখিয়াছেন, কান্যকুব্জ হইতে দিগ্বিজয়ার্থ বহির্গত হইয়া, যশোবৰ্ম্মা যখন বিন্ধ্য-পর্ব্বত অতিক্রম করিতেছিলেন তখন "তাঁহার ভয়ে, মদস্রাবী গজের ললাট-নিঃসৃত জলের দ্বারা সম্মুখ-দেশ মায়া- নির্ম্মিত নৈশ অন্ধকারের মত অন্ধকার করিয়া মগধ-নাথ পলায়ন করিলেন (৩৬৫ শ্লোক) ॥” কিন্তু মগধ-নাথের সামন্তগণ পলায়ন করিতে সম্মত হইলেন না; ফিরিয়া যুদ্ধার্থ প্রস্তুত হইলেন।
"পলায়নপর মগধ-নাথের (সামস্ত)-নৃপতিগণ প্রত্যাবর্তন করিয়া, উল্কা- নির্গত অগ্নিকণা-সমূহের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন (-৪১৪ শ্লোক) ।
"সেই যুদ্ধের আরম্ভে (যশোবর্ম্মার) শত্রু-সৈন্যের শোণিতের দ্বারা তাম্রবর্ণে রঞ্জিত মহীতল মেঘ হইতে পতিত বিদ্যুল্লতার ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল (৪১৫)।
"রাজা (যশোবর্ম্মা) পলায়ন-পর মগধ-নাথকে নিহত করিয়া, দারুচিনির সুগন্ধে পরিপূর্ণ সমুদ্রতীর-বনে গমন করিয়াছিলেন (৪১৭)।” মগধ-নাথ যেরূপ সমরানুরাগী সামন্তগণে পরিবেষ্টিত হইয়া, যশোবর্ম্মার সম্মুখীন হইতে সমর্থ হইয়াছিলেন, তাহাতে বোধ হয়, তাঁহার "গীড়াধিপ" উপাধি নিরর্থক ছিল না। কিন্তু বঙ্গপতি এই সামন্ত-চক্রের বহির্ভূত ছিলেন। বাক্কপতি "মগধ-নাথের” ন্যায় বঙ্গপতির নামের উল্লেখ করেন নাই। তিনি এইমাত্র লিখিয়াছেন, যশোবৰ্ম্মা মগধ-নাথকে নিহত করিয়া, সমুদ্রতীরস্থিত বঙ্গ-রাজ্যে উপনীত হইলে, অসংখ্য হস্তীর অধিনায়ক বঙ্গেশ্বর যুদ্ধে পরাজিত হইয়া, বিজেতার পদানত হইয়াছিলেন।
যশোবৰ্ম্মা বাহুবলে উত্তরাপথ-সাম্রাজ্য পুনঃ প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হইলেও, তাঁহার ভাগ্যে অধিকদিন সাম্রাজ্য-সম্ভোগ ঘটিয়া উঠে নাই। গৌড়-বঙ্গ-বিজয়ের অনতিকাল পরেই, [৭৩৬ খৃষ্টাব্দের পরে] কাশ্মীরের অধিপতি ললিতাদিত্যমুক্তাপীড় আসিয়া, তাঁহাকে কান্যকুজের সিংহাসন হইতে অপসারিত করিয়াছিলেন।* "রাজতরঙ্গিণী” এই ঘটনার চারিশত বৎসরের কিঞ্চিদধিক কাল পরে [১১৫০ খৃষ্টাব্দে] সম্পূর্ণ হইয়াছিল, এবং কহলণ সম্ভবতঃ জনশ্রুতি অবলম্বনেই ললিতাদিত্যের কান্যকুজ-বিজয়-কাহিনী সঙ্কলন করিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি যে ভাবে এই কাহিনীর বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন, তাহা পর্যালোচনা করিলে, ইহাকে ঐতিহাসিক ভিত্তিহীন বলিয়া উড়াইয়া দিতে সাহস হয় না। কহলণ লিখিয়াছেন, ললিতাদিত্য-মুক্তাপীড় "কবি বাকৃপতিরাজ-শ্রীভবভূতি-আদি-সেবিত” যশোবৰ্ম্মাকে বশীভূত করিয়া, কলিঙ্গ অভিমুখে যাত্রা করিলেন। তখন গৌড়মণ্ডল হইতে অসংখ্য হস্তী আসিয়া তাঁহার (সেনার) সহিত মিলিত হইল।"
॥ গৌড় ও কাশ্মীর ॥
গৌড়ের মহাসামন্ত যেন কান্যকুজ-বিজয়ী ললিতাদিত্যকে করস্বরূপ এই সকল হস্তী প্রদান করিলেন। কহলণ-বর্ণিত ললিতাদিত্যের দক্ষিণাপথবিজয়-কাহিনী কিয়ৎ পরিমাণে কল্পনা-প্রসূত বলিয়া মনে হইতে পারে। যশোবর্ম্মার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার গৌড়ীয় মহাসামস্তকেও সম্ভবতঃ ললিতাদিত্যের পদানত হইতে হইয়াছিল; এবং নবীন সম্রাটের মনস্তুষ্টির জন্য হস্তী উপঢৌকন দিতে হইয়াছিল। তাহার পরে বোধ হয়, ললিতাদিত্যের আজ্ঞানুসারে গৌড়পতিকে কাশ্মীরে যাইতে হইয়াছিল। ললিতাদিত্য স্বনির্ম্মিত পরিহাসপুর [বর্তমান পরসপুরীড়ার] নামক নগরে প্রতিষ্ঠিত "পরিহাস-কেশব” নামক নারায়ণ-মৃত্তিকে মধ্যস্থ-[ জামিন] রাখিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, তিনি গৌড়পতির গাত্রে হস্তক্ষেপ করিবেন না। তথাপি কোন কারণ বশতঃ ঘাতুক নিযুক্ত করিয়া, পরিহাসপুরের অনতিদূরস্থিত ত্রিগ্রাম নামক স্থানে গৌড়রাজের বধ সাধন করাইয়াছিলেন। এই সংবাদ যখন গৌড়ে পঁহুছিল তখন গৌড়পতির একদল ভৃত্য এই নৃশংসতার প্রতিশোধ লইবার জন্য, শারদাতীর্থ-দর্শনে যাইবার ভাণ করিয়া কাশ্মীর প্রবেশ করিলেন; এবং পরিহাস-কেশবের মন্দির অবরোধ করিলেন। পূজকগণ তখন মন্দিরের দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিলেন। গৌড়-যোদ্ধৃগণ প্রবল পরাক্রমের সহিত মন্দির আক্রমণ করিয়া, রামস্বামী নামক রজত-নির্ম্মিত আর একখানি নারায়ণ-মূর্ত্তি দেখিতে পাইলেন এবং পরিহাস-কেশব-ভ্রমে তাহা ভাঙ্গিয়া ধূলিসাৎ করিলেন। ইতিমধ্যে কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর হইতে সৈন্য আসিয়া, তাঁহাদিগকে বাধা দিতে প্রবৃত্ত হইল। গৌড়ীয়গণ যখন রামস্বামীর মূর্তি ভাঙ্গিতে বিব্রত তখন কাশ্মীর-সৈন্য তাঁহাদিগকে ঘিরিয়া ফেলিয়া পশ্চাৎদিক হইতে তাঁহাদিগের শিরশ্ছেদ করিতে লাগিলেন। কিন্তু সেদিকে দৃকপাৎ না করিয়া গৌড়ীয়গণ মূর্তি-ধ্বংসে নিবিষ্ট রহিলেন; এবং একে একে সকলেই শত্রুর তরবারির আঘাতে নিহত হইলেন। কহলণ লিখিয়াছেন, "দীর্ঘকালে লঙ্ঘনীয় গৌড় হইতে কাশ্মীরের পথের কথাই বা কি বলিব, এবং মৃত প্রভুর প্রতি ভক্তির কথাই বা কি বলিব? গৌড়গণ তখন যাহা সম্পাদন করিয়াছিলেন, বিধাতার পক্ষেও তাহা সম্পাদন করা অসাধ্য।...... অদ্যাপি রামস্বামীর মন্দির শূন্য দেখিতে পাওয়া যায়, এবং গৌড়-বীরগণের যশে পৃথিবী পরিপূর্ণ।"
প্রচলিত জনশ্রুতি অবলম্বনেই কহলণ এই বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়া থাকিবেন। সুতরাং ইহাকে অমূলক মনে করিবার কারণ নাই। কহলণ ললিতাদিত্যের অশেষ গুণগ্রামের এবং কীর্তি-কলাপের বর্ণনা করিয়াও, তাঁহার দুইটি মাত্র দুষ্কার্য্যের উল্লেখ করিয়াছেন। প্রথম দুষ্কার্য্য, সুরাপান-জনিত মত্ততা-বশে ললিতাদিত্য এক সময় প্রবরপুর (শ্রীনগর) দগ্ধ করিতে আদেশ দিয়াছিলেন। দ্বিতীয় দুষ্কার্য্য, গৌড়পতি-বধ। অমূলক হইলে অপ্রাকৃতের সম্পর্ক-বজ্জিত এই দুইটি ঘটনা, বিশেষতঃ বিদেশীর মাহাত্ম্য-সূচক গৌড়বধবৃত্তান্ত, চারিশত বৎসরকাল জনসাধারণের স্মৃতিপথারূঢ় থাকিত না। ললিতা- দিত্য বা তাঁহার সেনা যে এক সময় গৌড়-সীমান্তে অবস্থিত মগধ পর্য্যন্ত পঁহুছিয়াছিল, কহলণ দিগ্বিজয়-বিবরণে তাহার স্পষ্ট উল্লেখ না করিয়া থাকিলেও প্রসঙ্গান্তরে তাহার উল্লেখ করিয়াছেন। ললিতাদিত্যের মন্ত্রী চরুপ ললিতাদিত্যকে একস্থলে বলিতেছেন, “মগধদেশ হইতে যে বুদ্ধমূর্তি গজস্কন্ধে করিয়া আনা হইয়াছে, তাহা প্রদান করিয়া আমায় অনুগৃহীত করুন।"+ অবান্তর প্রসঙ্গে উল্লিখিত মগধ হইতে এই বুদ্ধমূর্তি আনয়ন-বিবরণ অবিশ্বাস করা যায় না; এইস্থানেই গৌড়পতির সহিত ললিতাদিত্যের সম্বন্ধ সূচিত হইয়াছে।
যশোবর্ম্মার সাম্রাজ্য ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে গৌড়ের সহিত কান্যকুজের সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হইয়া গিয়াছিল। সম্ভবতঃ এই সুযোগে, এবং গৌডাধিপ কাম্মীরে নিহত হইবার পর, ভগদত্ত বংশীয় হর্ষদেব, গৌড়মণ্ডলকে কেন্দ্র করিয়া এক বিস্তৃত রাজ্যের প্রতিষ্ঠা কবিয়াছিলেন। নেপালের রাজা জয়দেব-পরচক্রকামের ১৫৩ হর্ষ-সম্বতের [৭৫৮ খৃষ্টাব্দের] শিলালিপিতে এই হর্ষদেবের পরিচয় পাওয়া যায়। এই শিলালিপিতে উক্ত হইয়াছে, জয়দেব ভগদত্ত-বংশীয় "গৌড়োড্রাদিকলিঙ্গ-কোশল-পতি" হর্ষদেবের কন্যা রাজ্যমতীর পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন। বাণভট্টের "হর্ষচরিত” এবং আসাম প্রদেশে প্রাপ্ত তাম্রশাসন-নিচয় হইতে জানা যায়, প্রাচীন কামরূপের নৃপতিগণ নরক এবং ভগদত্তের বংশধর বলিয়া আত্মপরিচয় দিতেন। হর্ষদেব সম্ভবতঃ কামরূপের প্রাচীন রাজবংশ-সমুদ্ভব ছিলেন; এবং কামরূপ ত্যাগ করিয়া কামরূপের পূর্ব্ব-সীমান্ত করতোয়া নদী পার হইয়া গৌড়ে আসিয়া, যশোবর্ম্মার সাম্রাজ্যের অধঃপতনজনিত উত্তরাপথব্যাপী বিপ্লবের সময়, গৌড়, উৎকল, কলিঙ্গ এবং দক্ষিণ কোশল লইয়া, এক রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করিবার অবসর পাইয়াছিলেন।
রাজতরঙ্গিণীতে খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর চতুর্থপাদের আরম্ভে বাঙ্গালায় আর একটি অভিনব রাজবংশ-প্রতিষ্ঠার বিবরণ প্রদত্ত হইয়াছে। কহলণ লিখিয়াছেন, ললিতাদিত্যের পৌত্র জয়াপীড় কাশ্মীরের সিংহাসনে আরোহণ করিয়াই,* বৃহৎ একদল সেনা লইয়া পিতামহের ন্যায় দিগ্বিজয়ে বহির্গত হইয়াছিলেন। জয়াপীড কাশ্মীর হইতে সরিয়া গেলে, তদীয় শ্যালক জজ্জ বলপূর্ব্বক সিংহাসন অধিকার করিয়াছিলেন। তৎপর সৈন্যগণও জয়াপীড়কে পরিত্যাগ করিয়া ক্রমে ক্রমে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিয়াছিল। তখন তিনি সঙ্গী সামন্তরাজগণকে বিদায় দিয়া, অল্প কিছু সৈন্য লইয়া প্রয়াগ গমন করিয়া- ছিলেন; এবং তথা হইতে একাকী ছদ্মবেশে বহির্গত হইয়া ক্রমে পৌণ্ডবর্দ্ধননগরে উপনীত হইয়াছিলেন। পৌণ্ডবর্দ্ধন তখন “গৌড়রাজাশ্রিত” এবং জয়ন্ত-নামক সামন্ত নৃপতির রক্ষণাধীনে ছিল। জয়াপীড় "সৌরাজ্য" (সুশাসিত) এবং “পৌরবিভূতি”-ভূষিত পৌণ্ডু বন্ধনে এক নর্তকীর গৃহে আশ্রয় লইলেন; এবং একটি সিংহ-হত্যা করিয়া আত্ম-প্রকাশ করিতে বাধ্য হইলেন। তখন রাজা জয়ন্ত জয়াপীড়ের সহিত স্বীয় দুহিতা কল্যাণদেবীর বিবাহ দিলেন। "জয়াপীড় বিনা আয়োজনে গৌড়ের পাঁচজন নরপালকে পরাজিত করিয়া, শ্বশুরকে গৌড়াধীশের আসনে প্রতিষ্ঠাপিত করিয়া পরাক্রম প্রকাশ করিয়া- ছিলেন।" যতদিন না সমসাময়িক লিপিতে বা সাহিত্যে জয়ন্তের নামোল্লেখ দৃষ্ট হয়, ততদিন জয়ন্ত প্রকৃত ঐতিহাসিক ব্যক্তি কিম্বা জয়পীড়ের অজ্ঞাতবাসউপন্যাসের উপনায়ক মাত্র, তাহা বলা কঠিন।
ঢাকা জেলার রায়পুরা থানার অন্তর্গত আশরফপুর নামক গ্রামে প্রাপ্ত দুইখানি তাম্রশাসনে সম্ভবতঃ বঙ্গের এই যুগের রাজকীয় ইতিহাসের কিঞ্চিৎ আভাস প্রাপ্ত হওয়া যায়। এই দুইখানি তাম্রশাসনে এক অভিনব রাজবংশের পরিচয় পাওয়া যায়। সুগতে, তদীয় সংঘে, এবং তদীয় ধর্ম্মে দৃঢ়ভক্তিমান্ "সমগ্র পৃথিবী বিজেতা [ক্ষিতিরিয়মভিতোনির্জিতা]" শ্রীমৎ খড়েগাদ্যম এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা। খড়েগাদ্যমেরউত্তরাধিকারী [তদীয় পুত্র] "ক্ষিতিপতি” জাতখড়গ। জাতখড়গ সম্বন্ধে প্রশস্তিকার লিখিয়াছেন,-"বায়ু যেমন তৃণকে এবং করী যেমন অশ্ববৃন্দকে বিধ্বস্ত করে, তিনিও সেইরূপ স্বীয় শৌর্য্য্য-প্রভাব সমন্ত শত্রুকুল বিধ্বস্ত করিয়াহিলেন।” জাতখড়েগর পুত্র এবং উত্তরাধিকারী "অশেষক্ষিতিপাল-মৌলিমালা-মণিদ্যোতিত-পাদপীঠ," "নিজ্জিত শত্রু” শ্রীদেবখড়া। দ্বিতীয় তাম্রশাসনে দেবখড়েগর পুত্র রাজরাজের নাম উল্লিখিত হইয়াছে। এই রাজবংশ সম্বন্ধে ইহার অধিক আর কিছুই এযাবৎ জানা যায় নাই।
॥ গৌড়ে বৎসরাজ ॥
যশোবৰ্ম্মা কর্তৃক "গৌড়বধ” হইতে গৌড়মণ্ডলের অপরাপর অংশে ক্রমাগত রাষ্ট্রবিপ্লব চলিতে থাকিলেও, খড়গ-রাজগণের শাসনাধীনে বঙ্গ সম্ভবতঃ শান্তি- লাভ করিয়াছিল। কিন্তু ৭৮৪ খৃষ্টাব্দের পরে আর এক বহিঃশত্রু বাঙ্গালা আক্রমণ করিয়া, বঙ্গের শান্তিভঙ্গ করিয়াছিল এবং গৌড়ের বিপ্লবানল প্রবলতর করিয়া তুলিয়াছিল। বাঙ্গালার এই নবাগত অতিথি গুর্জ্জরের (বর্তমান রাজপুতনার) প্রতীহার-বংশীয় রাজা বৎসরাজ। জিনসেন প্রণীত জৈন-হরিবংশেব উপসংহারে উক্ত হইয়াছে-
"শাকেম্বব্দশতেযু সপ্তসু দিশং পঞ্চোত্তরেযুত্তরাং
পাতীংদ্রায়ুধনাম্নি কৃষ্ণনৃপজে শ্রীবল্লভে দক্ষিণাং।
পূর্বাং শ্রীমদবস্তিভূভূতি নৃপে বৎসরাজে পরাং
সৌর্যাণামধিমংডলং জয়যুতে বীরে বরাহেবতি।"
“৭০৫ শাক (৭৮৩-৭৮৪ খৃষ্টাব্দে) যখন ইন্দ্রায়ুধ নামক (রাজা) উত্তরদিক্ পালন করিতেছিলেন; কৃষ্ণরাজের পুত্র শ্রীবল্লভ (রাষ্ট্রকুটরাজ ধ্রুব) দক্ষিণদিক্ পালন করিতেছিলেন; যখন পূর্ব্বদিক্ শ্রীমান্ অবন্তিরাজের শাসনাধীনে, অপর (পশ্চিম) দিক্ বৎসরাজ (নামক) নৃপতির শাসনাধীনে; এবং সৌর্য্যগণের রাজ্য বীর জয়বরাহের শাসনাধীনে ছিল।"
এই পশ্চিম-দিক্াল বৎসরাজ অবন্তি (মালব)-রাজকে পরাজিত, এবং বাঙ্গালা আক্রমণ করিয়া, গৌড়পতি এবং বঙ্গপতি উভয়কেই পরাভূত করিয়া- ছিলেন; এবং উভয়ের রাজছত্র কাড়িয়া লইয়াছিলেন। কিন্তু যশোবর্ম্মার স্যায় বৎসরাজকেও শত্রুর তাড়নায়, অচিরকাল মধ্যেই গৌড়বঙ্গ-বিজয়-ফল সম্ভোগে বঞ্চিত হইতে হইয়াছিল। রাষ্ট্রকূট-রাজ ধ্রুব বৎসরাজকে নবজিত প্রদেশনিচয় ত্যাগ করিয়া, রাজপুতনার মরুভূমিতে আশ্রয় লইতে বাধ্য করিয়া- ছিলেন। ধ্রুব ৭৭৫ হইতে ৭৯৪ খৃষ্টাব্দের মধ্যে রাস্ট্রকূট-সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ধ্রুবের পুত্র এবং উত্তরাধিকারী তৃতীয় গোবিন্দ বৎসরাজকে দমন রাখিবার জন্য, অনুজ ইন্দ্ররাজকে লাটের [দক্ষিণ গুজরাতের] "মহাসামন্তা- ধিপতি” পদে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তৃতীয় গোবিন্দের ওয়ানি এবং রাধনপুরের তাম্রশাসনে বৎসরাজের গৌড়বঙ্গ-বিজয় এইরূপে সূচিত হইয়াছে,- “তিনি (ধ্রুব) অতুল-পরাক্রম সেনাবলের দ্বারা হেলায় গৌড়রাজ্য জয়-জনিত অহঙ্কারে মত্ত বৎসরাজকে অচিরাৎ দুর্গম মরুমধ্যে তাড়িত করিয়া, কেবল যে (তাঁহার) গৌড়জয়লব্ধ শরদিন্দু-ধবল ছত্রদ্বয়ই কাড়িয়া লইয়াছিলেন এমন নহে; তৎক্ষণাৎ তাঁহার দিগন্তব্যাপী যশও কাড়িয়া লইয়াছিলেন।"+ ইন্দ্ররাজের পুত্র কর্করাজের ৭৩৪ শকের (৮১২ খৃষ্টাব্দের) বরোদায় প্রাপ্ত তাম্রশাসনে এই ঘটনা আরও স্ফুটতর হইয়াছে। এই তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে,- "প্রভু (তৃতীয় গোবিন্দ) পরাজিত, মালবরাজকে রক্ষা করিবার জন্য তাঁহার (ক রাজের) এক হস্তকে, গৌড়েন্দ্র এবং বঙ্গপতিবিজেতা, দুরাশামত্ত গুর্জরপতির আক্রমণার্থ আগমন-পথের সুদৃঢ় অর্গলে পরিণত করিয়া, অপর হস্তকে রাজ্যফলস্বরূপ উপভোগ করেন।" এই "গুর্জুরপতি”ও অবশ্যই বৎসরাজ। কারণ, ধ্রুব কর্তৃক গুজরাত ও মালবে রাষ্ট্রকূট প্রাধান্য স্থাপিত হইলে, আর কোনও গুর্জরপতির পুনর্ব্বার গৌড়বঙ্গবিজয়ের অবসর পাইবার সম্ভাবনা ছিল না। ক রাজের এই তাম্রশাসন প্রমাণ করিতেছে, বৎসরাজ ৮১২ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত জীবিত ছিলেন।
॥ মাৎস্যন্যায়-গোপাল ॥
"শৈলবংশীয় গৌড়পতির অভ্যুদয় হইতে আরম্ভ করিয়া বৎসরাজের আক্রমণ পর্যন্ত পুনঃ পুনঃ বহিঃশত্রুর আক্রমণের এবং রাজবিপ্লবের ফলে, গৌড়-মণ্ডলের আভ্যন্তরীণ অবস্থা যে কিরূপ শোচনীয় হইয়া উঠিয়াছিল, তাহা সহজেই অনুমান করা যাইতে পারে। কার্যত দেশে রাজশাসন ছিল না। সুযোগ পাইয়া, সবল দুষ্টগণ অবশ্যই দুর্ব্বল প্রতিবেশীর উৎপীড়ন করিতে আরম্ভ করিয়াছিল। এই সময়ের গৌড়মণ্ডলের অবস্থা লক্ষ্য করিয়া, তারনাথ লিখিয়া গিয়াছেন-"উড়িয়্যা, বঙ্গ এবং প্রাচ্যদেশের আর পাঁচটি প্রদেশের বিভিন্ন অংশে প্রত্যেক ক্ষত্রিয়, প্রত্যেক ব্রাহ্মণ এবং প্রত্যেক বৈশ্য পার্শ্ববর্তী ভূভাগে আপন আপন প্রাধান্য স্থাপিত করিয়াছিলেন; কিন্তু সমগ্র দেশের কোনও রাজা ছিল না।"* সংস্কৃত ভাষায় এইরূপ অরাজক-অবস্থাকেই "মাংস্যন্যায়” কহে। এই "মাৎস্যন্যায়ের” ফলে গৌড়মণ্ডলে পালরাজগণের অভ্যুদয়।
"মাৎস্য-ন্যায় দূর করিবার অভিপ্রায়ে, জনসাধারণ [প্রকৃতিভিঃ] বপ্যটতনয় গোপালকে রাজলক্ষ্মীর করগ্রহণ করাইয়াছিলেন,"-গোপালের পুত্র ধৰ্ম্মপালের খালিমপুরে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে গোপালের রাজপদ-লাভের এইরূপ বিবরণ প্রদত্ত হইয়াছে। তারনাথও এই নির্বাচনের উল্লেখ করিয়াছেন; এবং গোপাল প্রথমে বাঙ্গালা দেশে রাজপদে নির্ব্বাচিত হইয়া পরে মগধ বশীভূত করিয়াছিলেন, এইরূপও লিখিয়া গিয়াছেন। গৌড়রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা শশাঙ্ক বাঙ্গালী ছিলেন; এবং তারনাথের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করিতে হইলে, মনে করিতে হয়-বাঙ্গালার জনসাধারণ কর্তৃকই [অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগে গোপালের নির্ব্বাচনসূত্রে] "মাৎস্য-ন্যায়” বিদূরিত এবং গৌড়রাষ্ট্র পুনরুজ্জীবিত হইয়াছিল। যদিও তারনাথ গোপালের নির্বাচনের আট শতাব্দেরও অধিককাল পরে [১৬০৮ খৃস্ট্রাব্দে] মগধের ইতিহাস সঙ্কলন করিয়া গিয়াছেন, তথাপি তাঁহার এই বিবরণ যে অমূলক নহে, সমসাময়িক লিপিতেও তাহার আভাস পাওয়া যায়। আমরা ধৰ্ম্মপালের প্রসঙ্গে দেখিতে পাইব, প্রতীহার-রাজ ভোজের সাগর-তালের শিলা- লিপিতে ধৰ্ম্মপালকে "বঙ্গপতি” এবং তাঁহার সেনাগণকে "বাঙ্গালী" [বঙ্গাণ] বলা হইয়াছে। বাঙ্গালাদেশকে পালরাজগণের আদি-নিবাস না ধরিয়া লইলে এইরূপ উল্লেথ নিরর্থক হয়।
খালিমপুরে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে গোপালের পিতামহ "সর্ব্ববিদ্যাবিদ” [সৰ্ব্ববিদ্যাবদাত] এবং তাঁহার পিতা বপ্যট "খণ্ডিতারাতি” (জিতশত্রু) এবং কীর্তিকলাপ দ্বারা সসাগরা-ধরা-মণ্ডনকারী বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন। ইহা হইতে অনুমান হয়, -বপ্যট সমৃদ্ধ এবং সমর-কুশল ছিলেন। গোপাল রাজপদে নির্ব্বাচিত হইয়াই, সম্ভবত গৌড়মণ্ডল একচ্ছত্র করিতে যত্নবান হইয়া ছিলেন; এবং গুর্জরপতি বৎসরাজ [৭৮৪ হইতে ৭৯৪ খৃষ্টােব্দর মধ্যে কোন এক সময়ে] যখন রাষ্ট্রকূট-রাজ ধ্রুব কর্তৃক রাজপুতনার মরুভূমিতে বিতাড়িত হইয়াছিলেন, তখন স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের অবসর লাভ করিয়াছিলেন। দেবপালের [মুঙ্গেরে প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে,-গোপাল সমুদ্র পর্যন্ত ধরণীমণ্ডল অধিকার করিয়াছিলেন; এবং তারনাথ লিখিয়াছেন,-গোপাল মগধ অধিকার করিয়াছিলেন। হয়ত মিথিলা বা তীরভৃক্তি [= ত্রিহুত ]-ও তাঁহার পদানত হইয়াছিল। তীরভুক্তি যে পাল-নরপালগণের অধিকারভুক্ত ছিল, নারায়ণপালের [ভাগলপুরে প্রাপ্ত] তাম্রশাসন তাহার সাক্ষ্যদান করিতেছে; অথচ কখন্ যে তীরভুক্তি অধিকৃত হইয়াছিল, তাহা কোনও তাম্রশাসনে উল্লিখিত হয় নাই। সুতরাং গোপালই তীরভুক্তি অধিকার করিয়া- ছিলেন, এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে।
॥ ধৰ্ম্মপাল ॥
গোপাল গৌড়মণ্ডল একচ্ছত্র করিয়া কালগ্রাসে পতিত হইলে তদীয় উত্তরা- ধিকারী ধর্মপাল পিতৃ-সিংহাসনে আরোহণ করিয়াই, গৌড়াধিপ শশাঙ্কের ন্যায় উত্তরাপথের সার্বভৌমের পদলাভের জন্য যত্নবান হইয়াছিলেন। শশাঙ্ক যেখানে ব্যর্থ-মনোরথ হইয়াছিলেন, ধৰ্ম্মপাল সেখানে কৃতকার্য্য হইলেন। ধৰ্ম্মপালের [খালিমপুরে প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে,-"তিনি [ধৰ্ম্ম- পাল] মনোহর ভ্রভঙ্গি-বিকাশে (ইঙ্গিতমাত্রে) ভোজ, মৎস্য, মদ্র, কুরু, যছ, যবন, অবন্তি, গন্ধার,কীর প্রভৃতি বিভিন্ন জনপদের নরপালগণকে প্রণতি- পরায়ণ চঞ্চলাবনত মস্তকে সাধু সাধু বলিয়া কীর্তন করাইতে করাইতে, হৃষ্টচিত্ত পঞ্চালবৃদ্ধ কর্তৃক মস্তকোপরি আত্মাভিষেকের স্বর্ণকলস উদ্ধৃত করাইয়া, কান্যকুজরাজকে রাজশ্রী প্রদান করিয়াছিলেন।" এই ঘটনাটি নারায়ণপালের [ ভাগলপুরে প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে আরও সহজ ভাষায় বর্ণিত হইয়াছে। যথা- "ইন্দ্ররাজ প্রভৃতি শত্রুগণকে পরাজিত করিয়া পরাক্রান্ত [ধর্মপাল] মহোদয়ের [কান্যকুজের] রাজশ্রী উপার্জন করিয়াছিলেন; এবং পুনরায় উহা প্রণত এবং প্রার্থী চক্রাযুধকে প্রদান করিয়াছিলেন।” পণ্ডিতগণ অনুমান করেন, -এই ইন্দ্ররাজই জৈন-হরিবংশে উল্লিখিত উত্তর-দিক্াল ইন্দ্রায়ুধ। গুর্জর এবং মালবের বহির্ভাগে অবস্থিত, গান্ধার [পেশোয়ার প্রদেশ] হইতে মিথিলার সীমান্ত পর্য্যন্ত বিস্তৃত সমস্ত উত্তবাপথ ইন্দ্রায়ুধের করতলগত ছিল। ধৰ্ম্মপাল ইন্দ্রায়ুধ এবং তাঁহার সামন্তগণকে পরাজিত করিয়া উত্তরাপথের সার্ব্বভৌমের সমুন্নত পদ লাভ করিয়াছিলেন। এত বৃহৎ সাম্রাজ্য স্বয়ং শাসন করিতে সমর্থ হইবেন না মনে করিয়া, তিনি আয়ুধ-রাজবংশীয় আর একজনকে [চক্রায়ুধকে] স্বকীয় মহাসামন্তরূপে কান্যকুজে প্রতিষ্ঠাপিত করিয়াছিলেন। তারনাথ পালরাজগণের যে বংশতালিকা প্রদান করিয়া গিয়াছেন, তাহা বহু প্রমাদপূর্ণ। তারনাথ ধৰ্ম্মপালকে গোপালের প্রপৌত্র, দেবপালের পৌত্র, এবং রসপালের পুত্র বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন; কিন্তু ধৰ্ম্মপালের সাম্রাজ্যের যে বিবরণ প্রদান করিয়া গিয়াছেন, তাহা অনেকাংশে তাম্রশাসনের প্রমাণের অনুযায়ী। তারনাথ লিখিয়াছেন, "ধৰ্ম্মপাল ৬৪ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন। তিনি কামরূপ, তিরহুতি, গৌড় প্রভৃতি অধিকার করিয়াছিলেন. অতএব তাঁহার রাজ্য পূর্ব্বদিকে সমুদ্র হইতে পশ্চিমে তিলি (দিল্লি?) পর্যন্ত এবং উত্তরে জলন্ধর হইতে দক্ষিণে বিন্ধাপর্ব্বত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাঁহার সময়ে রাজা চক্রায়ুধ পশ্চিমদিকে রাজত্ব করিতেন।”
কোন্ সময়ে যে ধৰ্ম্মপাল পিতৃ-সিংহাসন লাভ করিয়াছিলেন, এবং ইন্দ্রায়ুধকে পরাভূত করিয়া উত্তরাপথের সার্ব্বভৌম হইয়াছিলেন, তাহা নিরূপণ করা সুকঠিন। রাষ্ট্রকূট-রাজ অমোঘবর্ষের একখানি অপ্রকাশিত তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে, অমোঘবর্ষের পিতা তৃতীয় গোবিন্দ উত্তরাপথ আক্রমণ করিলে-
"স্বয়মেবোপনতৌ চ যস্য মহতস্তৌ ধৰ্ম্মচক্রায়ুধৌ ॥" +
"ধৰ্ম্ম [পাল] এবং চক্রায়ুধ এই উভয় নৃপতি স্বয়ং আসিয়া (গোবিন্দের নিকট) নতশির হইয়াছিলেন।” ধৰ্ম্মপাল প্রকৃত প্রস্তাবে তৃতীয় গোবিন্দের নিকট নতশির হইয়া থাকুন আর নাই থাকুন, এই পংক্তিটি প্রমাণ করিতেছে, রাষ্ট্রকুট-রাজ তৃতীয় গোবিন্দের মৃত্যুর পূর্ব্বে, ধর্ম্মপাল চক্রায়ুধকে কান্যকুজের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠাপিত করিয়াছিলেন। তৃতায় গোবিন্দ ৭৯৪ হইতে ৮১৩ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত এবং অমোঘবর্ষ ৮১৭ হইতে ৮৭৭ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত রাষ্ট্রকুটসিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তাহার বিশিষ্ট প্রমাণ আছে। অনেকে মনে করেন, ৮১৭ খৃষ্টাব্দের ২।৩ বৎসর পূর্ব্বে তৃতীয় গোবিন্দ পরলোকগমন করিয়া- ছিলেন এবং অমোঘবর্ষ পিতৃরাজ্য লাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু যাঁহার রাজত্ব সুদীর্ঘ ৬১ বংরকাল স্থায়ী হওয়ার বিশিষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান আছে, তাঁহার রাজ্যাভিষেককাল আরও পিছাইয়া ধরিয়া, ৬১ বৎসরেরও অধিককাল-ব্যাপী রাজত্ব কল্পনা অসঙ্গত। তৃতীয় গোবিন্দ ৮১৭ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত রাজত্ব করিয়া- ছিলেন, এরূপ ধরিয়া লইয়া, ইহার ২।১ বৎসর পূর্ব্বে [৮১৫ কি ৮১৬ খৃষ্টাব্দে] ধৰ্ম্মপাল ইন্দ্রায়ুধকে পরাভূত এবং চক্রায়ুধকে কান্যকুব্জের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠাপিত করিয়াছিলেন, এবং ঐ ঘটনার অব্যবহিত পূর্ব্বেই পিতৃ-সিংহাসন লাভ করিয়াছিলেন, এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে।
৮১৭ খৃষ্টাব্দের এত অল্পকাল পূর্ব্বে, ধৰ্ম্মপালের রাজ্যলাভ অনুমানের কারণ, ধর্মপালের পুত্র দেবপালের মুঙ্গেরে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে- ধৰ্ম্মপাল রাষ্ট্রকূট-তিলক শ্রীপরবলের দুহিতা রপ্পাদেবীর পাণি-গ্রহণ করিয়া- ছিলেন। মধ্যভারতের অন্তর্গত পথরি নামক করদ-রাজ্যের প্রধান নগর পথরিতে অবস্থিত একটি প্রস্তর-স্তম্ভ-গাত্রে উৎকীর্ণলিপি হইতে জানা যায়;- -রাষ্ট্রকুট পরবলের রাজত্বকালে [সম্বৎ ৯১৭ বা ৮৬১ খৃষ্টাব্দে] পরবলের প্রধান মন্ত্রী কর্তৃক এই স্তম্ভ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। এ পর্য্যন্ত এই স্তম্ভ-লিপিতে উক্ত পরবল ভিন্ন আর কোন রাষ্ট্রকূট-বংশীয় পরবলের পরিচয় পাওয়া যায় নাই। এই নিমিত্ত, কোন কোন পণ্ডিত মনে করেন, এই স্তম্ভ-লিপির পরবলই ধর্মপালের পত্নী রগ্গাদেবীর পিতা। এই অনুমানই সঙ্গত বলিয়া বোধ হয়। ধৰ্ম্মপাল দীর্ঘকাল সিংহাসনে আরূঢ় ছিলেন। খালিমপুরে প্রাপ্ত তাম্রশাসন তাঁহার "অভিবর্দ্ধমান বিজয়-রাজ্যের ৩২ সম্বতে” সম্পাদিত হইয়াছিল; এবং তারনাথ লিখিয়াছেন, ধৰ্ম্মপাল ৬৪ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন। ৮১৫ সালে রাজ্যের আরম্ভ ধরিলে, তারনাথের মতানুসারে, ৮৭৯ খৃষ্টাব্দে ধর্মপালের রাজত্বের অবসান মনে করিতে হয়। খালিমপুরের শাসনোক্ত ৩২ বৎসর এবং জনশ্রুতির ৬৪ বৎসরের মধ্যে ধর্মপাল অন্যূন ৫০ বৎসর বা ৮৬৫ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত রাজত্ব করিয়াছিলেন, এরূপ অনুমান করা অসঙ্গত নহে। পক্ষান্তরে, [৮৬১ খৃষ্টাব্দে] পথরির লিপি সম্পাদনকালে পরবল যে বার্দ্ধক্যে উপনীত হইয়া- ছিলেন, এরূপ মনে করিবার কারণ আছে। এই লিপিতে উক্ত হইয়াছে, রাষ্ট্রকুটবংশীয় জেজ্জ নামক নরপতির অগ্রজ অসংখ্য কর্ণাটসৈন্য পরাজিত করিয়া লাটাখ্য রাষ্ট্র অধিকার করিয়াছিলেন। জেজ্জের পুত্র কক্করাজ নাগাবলোক নামক নরপালকে পরাজিত এবং তাঁহার রাজ্য আক্রমণ করিয়া ধ্বস্তবিধ্বস্ত করিয়াছিলেন। পরবল এই কক্ক'রাজের পুত্র। ডাক্তার কিহর্ণ পথরি-স্তম্ভলিপ্রির ভূমিকায় লিখিয়া গিয়াছেন,-তিনি ভৃগুকচ্ছে ৮১৩ সম্বতে [৭৫৬ খৃষ্টাব্দে] শ্রীনাগাবলোকের বিজয়রাজ্যে জনৈক চাহমান মহাসামস্তাধিপতি-সম্পাদিত একখানি তাম্রশাসনের ফটোগ্রাফ প্রাপ্ত হইয়া- ছিলেন। এই তাম্রশাসন যদি প্রামাণ্য বলিয়া স্বীকৃত হয় এবং পথরি- স্তম্ভলিপির নাগাবলোক এবং এই শাসনোক্ত নাগাবলোক যদি একই ব্যক্তি হয়, তবে কন্ধরাজ এবং তদীয় পুত্র পরবলকে ৭৫৬ হইতে ৮৬১ খৃষ্টাব্দের মধ্যে স্থাপন করিতে হয়। আমাদের কাছে এখন যে কিছু প্রমাণ উপস্থিত, তাহার উপর নির্ভর করিয়া, ইহা ভিন্ন অন্য কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না; এবং নাগাবলোকের প্রতিদ্বন্দ্বী কক্করাজের পুত্র পরবল [৮৬১ খৃষ্টাব্দে] দীর্ঘকালব্যাপী রাজত্বের পর বার্দ্ধক্যে উপনীত হইয়াছিলেন, ইহাও স্বীকার করিতে হয়। সুতরাং পরবল এবং ধৰ্ম্মপাল প্রায় সমবয়স্ক ছিলেন এবং ধৰ্ম্মপাল কর্তৃক পরবলের কন্যার পাণিগ্রহণ অসম্ভব বোধ হয় না। ধৰ্ম্মপাল সম্ভবতঃ প্রৌঢ়াবস্থায় রন্নাদেবীর পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন। ধৰ্ম্মপাল ও রন্না- দেবীর পুত্র দেবপালও দীর্ঘকাল রাজত্ব করিয়াছিলেন। দেবপালদেবের [মুঙ্গেরে প্রাপ্ত] তাম্রশাসন তাঁহার রাজত্বের ৩৩ বৎসরে সম্পাদিত হইয়াছিল; এবং তারনাথ লিখিয়া গিয়াছেন, দেবপাল ৪৮ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন। যৌবনে রাজ্যলাভ না করিলে, দেবপালদেবের পক্ষে এত দীর্ঘকাল রাজ্যভোগ ঘটিয়া উঠিত না। ধর্মপালের মৃত্যুসময়ে দেবপালদেব যুবক ছিলেন, এই কথা স্বীকার করিলে, পরবলের প্রথম যৌবনে জাত দুহিতা রগ্নাদেবীকে ধৰ্ম্মপাল প্রৌঢ়বয়সে বিবাহ করিয়াছিলেন, ইহা অনুমান করা যাইতে পারে। রাষ্ট্রকুট পরবলের পক্ষে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া, ধর্মপালের ন্যায় পরাক্রমশালী নৃপতির আশ্রয় গ্রহণ করিবার বিশেষ প্রয়োজন ছিল। রাষ্ট্রকুট-মহাসামন্তাধিপতি কর্তরাজ সুবর্ণবর্ষের [বরোদায় প্রাপ্ত] ৭৩৪ শকাব্দের [৮১২ খৃষ্টাব্দের] তাম্রশাসন হইতে জানা যায়, -রাষ্ট্রকূট-রাজ তৃতীয় গোবিন্দ, ক 'রাজের পিতা ইন্দ্ররাজকে “লাট”-মণ্ডলের শাসনকর্তা নিযুক্ত করিয়াছিলেন। সুতরাং এই নিমিতই হয়ত রাষ্ট্রকুট-পরবলকে লাট (গুজরাত) ত্যাগ করিয়া পথরি-প্রদেশে সরিয়া আসিতে হইয়াছিল। গুর্জ্জরের উচ্চাভিলাষী প্রতীহার-রাজগণ এখানে হয়ত পরবলকে উৎপাত করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। সুতরাং প্রতীহাররাজের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ধৰ্ম্মপালের আশ্রয় গ্রহণ ভিন্ন, পরবলের আত্মরক্ষার উপায়ান্তর ছিল না। সম্ভবতঃ এই সূত্রেই পরবল রন্নাদেবীকে ধৰ্ম্মপালের হস্তে সম্প্রদান করিয়াছিলেন।
॥ ধৰ্ম্মপাল ও নাগভট্ট ॥
ধৰ্ম্মপাল পিতৃ-সিংহাসনে আরোহণ করিবার পূর্ব্বেই, গুর্জরের অধীশ্বর বৎসরাজ পরলোক গমন করিয়াছিলেন; এবং তদীয় পুত্র দ্বিতীয় নাগভট্ট [নাগভট] গুর্জর সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন। যোধপুর-রাজ্যের অন্তর্গত বুচকলা নামক স্থানে প্রাপ্ত ৮৭২ সম্বতের [৮১৫ খৃষ্টাব্দের] একখানি শিলালিপিতে * "মহারাজাধিরাজ পরমেশ্বর শ্রীবৎসরাজদেব-পাদানুধ্যাত পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ পরমেশ্বর শ্রীনাগভট্টদেবের প্রবর্দ্ধমান-রাজ্যের” উল্লেখ দৃষ্ট হয়। নাগভট্ট পিতৃরাজ্যের ন্যায় উত্তরাধিকারিসূত্রে পিতার উচ্চাভিলাষও লাভ করিয়াছিলেন। সুতরাং ধর্মপাল ও নাগভট্টের মধ্যে সংঘর্ষ উপস্থিত হইতে বিলম্ব হইল না। পাল-রাজগণের তাম্রশাসনে পালপ্রতীহার-যুদ্ধের কোনও বিবরণ পরিরক্ষিত হয় নাই। নাগভট্টের পৌত্র মিহিরভোজের [গোয়ালিয়রে প্রাপ্ত] শিলালিপিতে নাগভট্টের কীত্তিকলাপের এইরূপ পরিচয় পাওয়া যায়-
"আদ্যঃ পুমান্ পুনরপি স্ফুটকীর্তিরম্মা-
জ্জাতস্ এর কিল নাগভটস্তদাখ্যঃ।
যত্রান্ধ্র-সৈন্ধব-বিদর্ভ-কলিঙ্গ-ভূপৈঃ
কৌমার-ধামনি পতঙ্গ-সমৈরপাতি ॥
ত্রয্যাস্পদস্য সুকৃতস্য সমৃদ্ধিমিচ্ছু-
র্যঃ ক্ষত্রধাম-বিধিবদ্ধ-বলি-প্রবন্ধঃ।
জিত্বা পরাশ্রয়কৃত-স্ফুটনীচভাবং
চক্রায়ুধং বিনয়নম্র-বপূর্বরাজৎ।
দুর্ব্বার-বৈরি (?)বরবারণ-বাজিবার
যাণৌঘ-সংঘটন-ঘোর-ঘনান্ধকারং
নির্জিত্য বঙ্গপতিমাবিরভূদ্বিবস্বা-
নুদ্যন্নিব ত্রিজগদেক-বিকাসকো যঃ।
আনর্ত-মালব-কিরাত তুরূষ্ক-বৎস
মৎস্যাদিরাজ-গিরিদুর্গ-হঠাপহারৈঃ।
যস্যাত্ম-বৈভবমতীন্দ্রিয়মাকুমার
মাবিব্বভূব ভুবি বিশ্বজনীন-বৃত্তেঃ ॥” (৮-১১ শ্লোক)
"আদিপুরুষ (বিষ্ণু) পুনরায় বৎসরাজ হইতে জন্মগ্রহণ করিয়া, বিখ্যাতকীত্তি এবং গজসেনাবিশিষ্ট হইয়াছিলেন বলিয়া সেই [নাগভট] নামধারী হইয়াছিলেন। (তাঁহার) কৌমার-কালের প্রজ্বলিত প্রতাপবহ্নিতে অন্ধ্র, সৈন্ধব, বিদর্ভ এবং কলিঙ্গের ভূপতিগণ পতঙ্গের মত পতিত হইয়াছিলেন।
“বেদোক্ত পুণ্যকর্ম্মের সমৃদ্ধি ইচ্ছা করিয়া, তিনি ক্ষত্রিয়ের নিয়মানুসারে করধার্য্য করিয়াছিলেন। পরাধীনতা যাঁহার নীচভাব প্রকাশ করিয়াছিল, সেই চক্রায়ুধকে পরাজিত করিয়াও, তিনি বিনয়াবনতদেহে বিরাজ করিতেন ।
"দুৰ্জ্জয় শত্রুর (বঙ্গপতির স্বকীয়) শ্রেষ্ঠ গজ, অশ্ব, রথসমূহের একত্র সমাবেশে গাঢ় মেঘের ন্যায় অন্ধকাররূপে প্রতীয়মান বঙ্গপতিকে পরাজিত করিয়া,তিনি ত্রিলোকের একমাত্র আলোকদাতা উদীয়মান সূর্য্যের ন্যায় আবির্ভূত হইয়াছিলেন।
"বিশ্ববাসিগণের হিতে রত তাঁহার অসাধারণ [অতীন্দ্রিয়] পরাক্রম [আত্মবৈভব] আনর্ত, মালব, তুরূষ্ক, বৎস, মৎস্য প্রভৃতি দেশের রাজগণের গিরিছর্গ বলপূর্ব্বক অধিকার দ্বারা শৈশবকাল হইতে [আকুমারং] পৃথিবীতে প্রকাশ প্রাপ্ত হইয়াছিল।"
এই পরাশ্রিত চক্রায়ুধ যে ধৰ্ম্মপাল কর্তৃক কান্যকুজের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত চক্রায়ুধ এবং এই "বঙ্গপতি” যে স্বয়ং ধৰ্ম্মপাল, এ বিষয়ে কোন সংশয়ই উপস্থিত হইতে পারে না। ধৰ্ম্মপাল এবং তাঁহার অনুগত কান্যকুজেশ্বরের সহিত নিশ্চয়ই প্রতীহার-রাজ নাগভট্টের বিরোধ উপস্থিত হইয়াছিল; এবং পাল-রাজগণের তাম্রশাসনে যখন ধৰ্ম্মপাল কর্তৃক নাগভট্টের পরাজয়ের উল্লেখ নাই, পক্ষান্তরে প্রতীহার-রাজগণের প্রশস্তিতে নাগভট্ট কর্তৃক চক্রায়ুধ এবং ধৰ্ম্মপাল উভয়েরই পরাজয়ের উল্লেখ আছে তখন প্রতীহার-রাজগণের প্রশস্তিকারের কথায় অবিশ্বাস করা যায় না। কিন্তু যাঁহারা বলেন, নাগভট্টই চক্রায়ুধকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া স্বয়ং কান্যকুজের সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন, তাঁহাদের সিদ্ধান্তের অনুকূল প্রমাণ গোয়ালিয়রের প্রশস্তিতে দেখিতে পাওয়া যায় না। এখানে চক্রায়ুধ সম্বন্ধে "জিত্বা” বা “জয় করিয়া”, এই মাত্রই বলা হইয়াছে, তাঁহার পদচ্যুতির কোনও আভাস পাওয়া যায় না। প্রশস্তিকার নাগভট্ট কর্তৃক আনর্ত, মালব, তুরূষ্ক, বৎস, মৎস্যাদি রাজ্যের গিরিদুর্গ-অধিকারের উল্লেখ করিয়াছেন, কিন্তু কান্যকুজ অধিকারের উল্লেখ করেন নাই। এই সকল কারণে অনুমান হয়, নাগভট্ট কান্যকুব্জ অধিকার করিয়াছিলেন না, মৎস্য প্রভৃতি কান্যকুব্জ-রাজের অনুগত রাজ্যনিচয় আক্রমণ করায়, তাঁহার সহিত "বঙ্গপতির” এবং চক্রায়ুধের যুদ্ধ উপস্থিতহইয়াছিল, এবং সেই যুদ্ধে তিনি জয়লাভ করিয়াছিলেন।
॥ ধৰ্ম্মপাল ও মিহিরভোজ ॥
নাগভট্টের পুত্র এবং উত্তরাধিকারী রামভদ্র কান্যকুব্জ অধিকার করিয়া- ছিলেন, এরূপ উল্লেখও গোয়ালিয়রের প্রশস্তিতে দেখিতে পাওয়া যায় না। রামভদ্রের সহিত কান্যকুজের অধিরাজ "বঙ্গপতি”র সংঘর্ষেরও উল্লেখ নাই। কিন্তু রামভদ্রের পুত্র মিহির-ভোজ সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে--
"যস্য বৈরি-বৃহদ্বঙ্গান্দহতঃ কোপ-বহ্নিনা।
প্রতাপাদর্ণসাং রাশীন্াতুর্ব্বৈতৃ্যমাবভেী ॥” (২১ শ্লোক)
"কোপাগ্নির দ্বারা পরাক্রান্ত শত্রু বঙ্গগণকে দহনকারী এবং প্রতাপের দ্বারা সাগরের জলরাশি পানকারী তাঁহার তৃষ্ণাভাব শোভা পাইয়াছিল।"
ধর্মপালের সহিত প্রতীহার-রাজ ভোজের যে সমর উপস্থিত হইয়াছিল, সৌরাষ্ট্রের মহাসামন্ত দ্বিতীয় অবনীবর্ম্মার ৯৫৬ সম্বতের [৮৯৯ খৃষ্টাব্দের] তাম্রশাসনের একটি শ্লোকে তাহার পরিচয় পাওয়া যায়। মহাসামন্ত দ্বিতীয় অবনীবৰ্ম্মা, ভোজদেবের পাদানুধ্যাত মহেন্দ্রপালদেবের, সৌরাষ্ট্রের মহাসামন্ত ছিলেন। ৫৭৪ বলভী সম্বতের [৮৯৩ খৃষ্টাব্দের] একখানি তাম্রশাসন হইতে জানা যায়,-দ্বিতীয় অবনীবর্ম্মার পিতা বলবৰ্ম্মাও ভোজদেব-পাদানুধ্যাত মহেন্দ্রায়ুধের (মহেন্দ্রপালের) মহাসামন্ত ছিলেন। ইহাতে অনুমান হয়, -বলবর্ম্মার পিতামহও প্রতীহার-রাজগণের সামন্ত-শ্রেণীভুক্ত ছিলেন। প্রথমোক্ত তাম্রশাসনে বলবর্ম্মার পিতামহ সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে-
"অজনি ততোহপি শ্রীমান্ বাহুকধবলো মহানুভাবো যঃ।
ধৰ্ম্মমবন্নপি নিত্যং রণোদ্যতো নিনশাদ ধৰ্ম্মং ॥" (৮ শ্লোক)
"তৎপর মহানুভাব শ্রীমান্ বাহুকধবল জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। যিনি নিত্য ধৰ্ম্মপালন করিলেও রণোদ্যত হইয়া ধৰ্ম্মকে ধ্বংস করিয়াছিলেন।”
এই তাম্রশাসনখানিতে অনেক ভুল আছে। এস্থলে ডঃ কিল্হর্ণের সংশোধিত পাঠই উদ্ধৃত হইল। কিলহর্ণ মনে করেন, বাহুকধবল মিহিরভোজের সামন্ত ছিলেন এবং এই ধৰ্ম্ম, বঙ্গ-পতি ধৰ্ম্মপাল। গোয়ালিয়র প্রশস্তিতে মিহির-ভোজ কর্তৃক কান্যকুঞ্জ-অধিকারের উল্লেখ নাই; কিন্তু তাঁহার (যোধপুর-রাজ্যের অন্তর্গত দৌলতপুরায় প্রাপ্ত) ৯০০ বিক্রম সম্বতের (৮৪৩ খৃষ্টাব্দের) তাম্রশাসন মহোদয়ে বা কান্যকুব্জে সম্পাদিত বলিয় উল্লিখিত হইয়াছে। সুতরাং গোয়ালিয়র প্রশস্তি-রচনার পরে এবং দৌলতপুরার তাত্রশাসন সম্পাদনের (৮৪৩ খৃষ্টাব্দের) পূর্ব্বে কোন সময়ে ভোজ কর্তৃ'ক কান্যকুব্জ অধিকৃত হইয়াছিল। যে যুদ্ধে ধৰ্ম্মপালকে পরাজিত করিয়া ভোজ কান্যকুব্জ-অধিকারের পথ প্রশস্ত করিয়াছিলেন, সেই যুদ্ধেই সম্ভবত মহাসামন্ত বাহুকধবল উপস্থিত ছিলেন।
হর্ষবর্দ্ধনের রাজধানী [কান্স্যকুব্জ] অধিকারে সমর্থ হইলেও, প্রতীহার-রাজ মিহির-ভোজ হর্ষবর্দ্ধনের ন্যায় "সকলোত্তরাপথেশ্বর” হইতে সমর্থ হইয়াছিলেন না। উত্তরাপথের পূর্ব্বভাগে অবস্থিত গৌড়-রাজ্যে ভোজ কখনও হস্তক্ষেপ করিতে সাহসী হইয়াছিলেন, এরূপ কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। মধ্য-ভারতে রাষ্ট্রকূট-পরবল, গৌড়াধিপ ধৰ্ম্মপালের আশ্রয়ে, স্বাতন্ত্রা রক্ষা করিতে পারিয়া- ছিলেন। পশ্চিমভাগে লাটপ্রদেশ [বর্তমান গুজরাত] মান্যখেটের রাষ্ট্রকূটরাজের "মহাসামন্তাধিপতির” অধিকৃত ছিল। লাটের রাষ্ট্রকূটমহাসামন্তাধিপতি দ্বিতীয় ধ্রুবরাজের [৮৬৭ খৃষ্টাব্দের] একখানি শিলালিপি হইতে জানিতে পারাযায়, -ধ্রুবরাজ যুদ্ধে মিহিরভোজকে পরাজিত করিয়া- ছিলেন। সুতরাং ধর্মপাল ও মিহির-ভোজ এই উভয় প্রতিদ্বন্দ্বীর কাহারও আশা সম্পূর্ণরূপে ফলবতী হইয়াছিল না। কিন্তু ধৰ্ম্মপালের সুদীর্ঘ রাজত্বকালে গৌড়-মণ্ডলে সুখশান্তি বিরাজমান ছিল। খালিমপুরে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে, "গ্রামোপকণ্ঠে বিচরণশীল গোপালকগণের মুখে, প্রতি গৃহের চত্বরে ক্রীড়াশীল শিশুগণের মুখে, প্রতি বাজারে মানাধ্যক্ষগণের মুখে এবং প্রতি প্রমোদগৃহে পিঞ্জরাবদ্ধ শুকপক্ষিগণের মুখে নিজের প্রশংসাগীতি শ্রবণ করিয়া, ধৰ্ম্মপাল সর্ব্বদা লজ্জাবনত মুখ ফিরাইয়া থাকিতেন।” এই শ্লোকটি স্তাবকোক্তি বলিয়া উপেক্ষিত হইতে পারে না। কারণ, আর কোনও প্রশস্তিতে রাজার সম্বন্ধে বিভিন্ন শ্রেণীর প্রজার অভিমত এরূপ ভাবে উল্লিখিত হইতে দেখা যায় না; এবং বিশেষ কারণ ব্যতীত এরূপ বিশেষোক্তি ধৰ্ম্মপালের প্রশস্তিতে স্থান পাইয়াছে বলিয়া মনে হয় না। প্রজাপুঞ্জ যাঁহার পিতাকে রাজলক্ষ্মীর পাণিগ্রহণ করাইয়াছিলেন, সেই ধৰ্ম্মপাল যে প্রজারঞ্জনে যত্নবান্ হইবেন এবং তাঁহার যে প্রতিভা এক সময় তাঁহাকে উত্তরাপথের সার্ব্বভৌমপদলাভে সমর্থ করিয়াছিল, সেই প্রতিভাবলে তিনি যে প্রজারঞ্জনে সফল মনোরথ হইবেন, ইহাতে,আর আশ্চর্য্যের বিষয় কি?
॥ দেবপাল ॥
ধৰ্ম্মপালের পুত্র এবং উত্তরাধিকারী দেবপালদেবও পিতা পিতামহের ন্যায় পরাক্রমশালী ছিলেন। ধৰ্ম্মপাল যে পদলাভ করিয়াও রক্ষা করিতে পারেন নাই, দেবপালের পক্ষে উত্তরাপথের সেই সার্ব্বভৌমের পদলাভ আর সম্ভবপর ছিল না; কিন্তু তিনি স্বীয় প্রতিভায় এবং গৌড়জনের বাহুবলে উত্তরাপথ এবং দক্ষিণাপথ এই উভয় খণ্ডের নৃপতি-সমাজে শ্রেষ্ঠতালাভে সমর্থ হইয়া- ছিলেন। দেবপালের আদেশানুসারে তদীয় কনিষ্ঠ ভ্রাতা জয়পাল, উৎকলে এবং কামরূপে গৌড়েশ্বরের আধিপত্য বিস্তৃত করিয়াছিলেন। নারায়ণপালের [ভাগলপুরে প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে, জয়পাল ভ্রাতা দেবপালের আজ্ঞায় দিগ্বিজয়ার্থ বহির্গত হইলে, উৎকলপতি দূর হইতে নাম শুনিয়াই ভয়বিহ্বলচিত্তে স্বীয় রাজধানী ত্যাগ করিয়াছিলেন; এবং বন্ধুপরিবেষ্টিত প্রাগজ্যোতিষপতি তাঁহার আজ্ঞা শিরোধার্য্য করিয়া, যুদ্ধ হইতে বিরত হইয়া শান্তিলাভ করিয়াছিলেন।"* ভগদত্তবংশীয় প্রলম্বের প্রপৌত্র জয়মাল-বীরবাহু সম্ভবত এই সময়ে প্রাগজ্যোতিষের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। প্রাগজ্যোতিষপতি পরাক্রান্ত গৌড়াধিপের নিকট ন্যূনতাস্বীকার করিয়া মৈত্রী স্থাপন করিতে বাধ্য হইয়া থাকিবেন। কিন্তু যিনি জয়পালের নাম শুনিয়াই রাজধানী ছাড়িয়া পলায়ন করিয়াছিলেন, সেই উৎকলপতি যে কে, তাহা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। খৃষ্টীয় নবম, দশম এবং একাদশ শতাব্দের অর্থাৎ কলিঙ্গের গঙ্গ- বংশীয় রাজা অনন্তবৰ্ম্মা চোড়গঙ্গ (১০৭৮-১১৪২ খৃঃ অঃ) কর্তৃক উড়িষ্যা- বিজয়ের পূর্ব্ব পর্যন্ত উড়িষ্যার ইতিহাস অন্ধকারাচ্ছন্ন। কলিঙ্গের সঙ্গে উড়িষ্যা সপ্তম শতাব্দে যেমন গৌড়াধিপ শশাঙ্কের এবং অষ্টম শতাব্দে গৌড়া- ধিপ হর্ষের পদানত হইয়াছিল, জয়পাল কর্তৃক উড়িষ্যার আক্রমণের কাল হইতে উৎকলপতিগণও সম্ভবত সেইরূপ পাল-রাজগণের পদানত থাকিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।
॥ দেবপালের দিগ্বিজয় ॥
গৌড়াধিপ দেবপালের সেনানায়কের পক্ষে প্রাগজ্যোতিষপতিকে বা উৎকলপতিকে পরাভূত করা খুব সহজ হইয়াছিল সন্দেহ নাই। কিন্তু পিতার বিলুপ্ত সাম্রাজ্যের উদ্ধার সাধনে প্রয়াসী হইয়া, দেবপালকে ভারতের প্রধান প্রধান নরপালগণের সহিত যে বিরোধে লিপ্ত হইতে হইয়াছিল, তাহাতেই তাঁহার শক্তির প্রকৃত পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। ধৰ্ম্মপালের মন্ত্রী (গর্গের পুত্র) দর্ভপাণি দেবপালের প্রথম মন্ত্রী ছিলেন। দর্ভপাণির প্রপৌত্র গুরবমিশ্রপ্রতিষ্ঠিত হরগৌরীর (বাদলের) স্তম্ভে দর্ভপাণি সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে-"তাঁহার নীতিকৌশলে শ্রীদেবপাল-নৃপ হস্তীর মদজলসিক্ত শিলাসংহতিপূর্ণ নৰ্ম্মদার জনক বিন্ধ্যপর্ব্বত হইতে আরম্ভ করিয়া মহেশ-ললাট-শোভিত ইন্দুকিরণে উদ্ভাসিত হিমাচল পর্য্যন্ত এবং সূর্য্যের উদয়ান্তকালে অরুণরাগরঞ্জিত জলরাশির আধার পূর্ব্ব সমুদ্র এবং পশ্চিম সমৃদ্রের মধ্যবর্তী সমগ্র ভূভাগ করপ্রদ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন (৫)।” সকল উত্তরাপথ দেবপাল করদ করিয়াছিলেন, একথা সত্য না হইতেও পারে; কিন্তু তিনি রাজ্যলাভ করিয়াই, উত্তরাপথের নরপতিগণের সহিত যে যুদ্ধে ব্যাপৃত হইয়াছিলেন এবং সেই যুদ্ধে লাভবান্ না হউন, বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত যে হয়েন নাই, একথা অকাতরে অনুমান করা যায়। দর্ভপাণির পর তাঁহার পৌত্র কেদারমিশ্র দেবপালের মন্ত্রিপদ লাভ করিয়া- ছিলেন। তখনও দেবপালের সহিত অন্যান্য প্রধান প্রধান নৃপতিগণের যুদ্ধ চলিয়াছিল। হরগৌরীর স্তম্ভে কেদারমিশ্র-সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে-"তাঁহার পরামর্শমতে গৌড়েশ্বর উৎকলকুল উন্মুলিত করিয়া হৃণ-গর্ব্ব হরণ করিয়া, দ্রবিড়রাজ এবং গুর্জররাজের দর্প খর্ব্ব করিয়া দীর্ঘকাল সাগরাম্বরা বসুন্ধরা সম্ভোগ করিয়াছিলেন (১৩)।” এই দ্রবিড়রাজ অবশ্য মান্যখেটের রাষ্ট্রকুটরাজ দ্বিতীয় কৃষ্ণ (আনুমানিক ৮৭৭-৮১৩ খৃষ্টাব্দ) এবং গুর্জর-নাথ গুর্জরের প্রতীহার বংশীয় মিহির-ভোজ, যিনি তৎকালে কান্যকুজের সিংহাসনে অধিরূঢ় ছিলেন। রাষ্ট্রকূট-রাজ তৃতীয় কৃষ্ণের কর্হাদে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে দেবপাল ও দ্বিতীয় কৃষ্ণের বিরোধের পরিণামের অন্যরূপ বিবরণ প্রদত্ত হইয়াছে। এই শাসনের পঞ্চদশ শ্লোকে দ্বিতীয় কৃষ্ণ সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে,* "প্রথম অমোঘবর্ষের, গুর্জরের ভয় উৎপাদনকারী, লাটের ঐশ্বর্য্যজনিত বৃথা-গর্ব-হরণকারী, গৌড়গণের বিনয়ব্রতের শিক্ষাগুরু, সাগরতীরবাসিগণের নিদ্রাহরণকারী, দ্বারস্থ অঙ্গ, কলিঙ্গ, গাঙ্গ এবং মগধগণকে আজ্ঞাবহনকারী, সত্যবাদী, দীর্ঘকাল ভুবনপালনকারী শ্রীকৃষ্ণরাজ নামক পুত্র জন্মগ্রহণ করিয়াছিল (১৫)।"
উভয় পক্ষের প্রশস্তিকার যেখানে সমস্বরে বিজয় ঘোষণা করে, সেখানে সত্য-উদ্ধার সুকঠিন। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে দেবপাল ও দ্বিতীয় কৃষ্ণরাজের বিরোধের পরিণামের কিঞ্চিৎ আভাস তৃতীয় পক্ষের প্রশস্তিতেও দেখিতে পাওয়া যায়। ত্রিপুরির (জবলপুরের নিকটবর্তী তেবারের) কলচুরি রাজ কর্ণের [১০৪২ খৃষ্টাব্দের, বারাণসীতে প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে কলচুরি-রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কোক্কল্ল সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে-
ভোজে বল্লভরাজে শ্রীহর্ষে চিত্রকূট ভূপালে।
শঙ্করগণে চ রাজনি যস্যাসীদভয়দঃ পাণিঃ ॥” (৬ শ্লোক)
"যাঁহার ভুজ ভোজকে, বল্লভরাজকে, চিত্রকুটপতি শ্রীহর্ষকে এবং রাজা শঙ্করগণকে অভয়দান করিয়াছিল।"
বিস্হরিতে প্রাপ্ত শিলালিপিতে কোক্কল্প সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে-
জিত্বা কৃৎস্নং যেন পৃথ্বীমপূর্ব্বন্ধীত্রিস্তম্ভ-দ্বন্মদুমারোপ্যতে স্ম।
কৌম্ভোওব্যান্দিশ্যসৌ কৃষ্ণরাজঃ কৌবের্যাঞ্চশ্রীনিধিভোর্জদেবঃ ॥" (১৭ শ্লোকঃ)
“যিনি সমস্ত পৃথিবী জয় করিয়া, দুইটি অপূর্ব্ব কীত্তিস্তম্ভ স্থাপন করিয়া- ছিলেন,-দক্ষিণদিকে প্রসিদ্ধ কৃষ্ণরাজ এবং উত্তরদিকে শ্রীনিধি ভোজদেব।”
দ্বিতীয় কৃষ্ণরাজ কৃষ্ণবল্লভ নামেও পরিচিত ছিলেন। সুতরাং কোক্কল্পের নিকট অভয়প্রাপ্ত বল্লভরাজ, এবং তাঁহার দ্বারা দক্ষিণদিকে প্রতিষ্ঠিত কৃষ্ণরাজ একই ব্যক্তি, কোক্কল্লের জামাতা দ্বিতীয় কৃষ্ণরাজ। ভোজদেব অবশ্যই গুর্জর- প্রতীহার মিহির-ভোজ; চিত্রকূটপতি শ্রীহর্ষ জেজাকভুক্তির চন্দেল্ল বংশীয় রাজা শ্রীহর্ষ।+ এখনজিজ্ঞাস্য, কোন্ শত্রুর হস্ত হইতে কোক্কল্ল এই সকল প্রবল পরাক্রান্ত নরপালগণকে রক্ষা করিয়াছিলেন? তৎকালে গৌড়েশ্বর দেবপাল ভিন্ন রাষ্ট্রকুট-রাজ বা কান্যকুব্জ রাজের সহিত প্রতিযোগিতা করিতে সমর্থ আর কোন নরপালের পরিচয় এ পর্য্যন্ত পাওয়া যায় নাই। সুতরাং আমরা সিদ্ধান্ত করিতে বাধ্য, প্রতীহার-রাজ মিহির-ভোজ, কলচুরি-রাজ কোক্কল্ল, রাষ্ট্রকুট-রাজ দ্বিতীয় কৃষ্ণ, এবং চন্দেল্ল-রাজ শ্রীহর্ষ, আত্মরক্ষার জন্য সম্মিলিত হইয়া, বিজিগীয় দেবপালের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। এইরূপ প্রবল বাধা না পাইলে, হয়ত দেবপাল উত্তরাপথের সার্ব্বভৌমের পদ-লাভে সমর্থ হইতেন।
দেবপাল যে কলচুরি বা চেদিরাজ্য অতিক্রম করিয়া, মধ্যভারতের পশ্চিমাংশ আক্রমণে কৃতকার্য্য হইয়াছিলেন, "হৃণ-গর্ব্ব-হরণ” প্রসঙ্গই তাহার প্রমাণ। ষষ্ঠ শতাব্দের প্রথমার্দ্ধে যশোধৰ্ম্ম কর্তৃক পরাজিত হৃণ-রাজ মিহিরকুলের মৃত্যুর পর, হুণ-রাজ্যের অস্তিত্বের কোন চিহ্ন পাওয়া যায় না; কিন্তু উত্তরাপথের স্থানে স্থানে, বিশেষত মধ্যভারতে, দীর্ঘকাল পর্যন্ত ণ-প্রভাব অক্ষুন্ন ছিল, এরূপ যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। "হর্ষচরিতে” থানেশ্বরের অধিপতি প্রভাকরবর্দ্ধন "হূণহরিণের সিংহ” বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন; এবং [৬০৫ খৃষ্টাব্দে] তাঁহার মৃত্যুর পূর্ব্বে, তিনি জ্যেষ্ঠপুত্র রাজ্যবর্দ্ধনকে " ণ-হত্যার জন্য উত্তরাপথে প্রেরণ করিয়াছিলেন," এরূপ উল্লেখ আছে। মিহির-ভোজের পুত্র কান্যকুজরাজ মহেন্দ্রপালের সৌরাষ্ট্রের মহাসামন্ত দ্বিতীয় অবনিবৰ্ম্মা- যোগের, উনায় প্রাপ্ত ৯৫৬ বিক্রম সম্বতের (৮৯৯ খৃষ্টাব্দের)তাম্রশাসনে, তাঁহার পিতা বলবৰ্ম্মা সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে,-তিনি জজ্জপাদি নৃপতিগণকে নিহত করিয়া, "ভুবন হুণবংশহীন করিয়াছিলেন।" দেবপালের পরবর্তী যুগে, খৃষ্টীয় দশম শতাব্দে, ণগণ মালবে উদীয়মান পরমার-রাজবংশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। পদ্মগুপ্তের "নবসাহসাঙ্ক চরিত”* এবং পরমার রাজগণের প্রশস্তি১ হইতে জানা যায়,-পরমার-রাজ দ্বিতীয় শিয়ক, তদীয় পুত্র উৎপল-মুঞ্জরাজ (৯৭৪-৯৯৪ খৃঃ অঃ) এবং সিন্ধুরাজ যথাক্রমে হৃণরাজগণের সহিত যুদ্ধে ব্যাপৃত ছিলেন। দেবপাল সম্ভবত মালবের হুণগণের গর্ব্ব খর্ব্ব করিয়াছিলেন।
গৌড়েশ্বর দেবপালের প্রতীহার, চান্দেল্ল, কলচুরি, এবং রাষ্ট্রকূট-রাজের সহিত বিরোধ, গৌড়গণের সকলোত্তরাপথের একাধিপত্য লাভের তৃতীয় চেষ্টা। শশাঙ্ক এবং ধৰ্ম্মপাল এ ক্ষেত্রে যতদূর কৃতকাৰ্য্য হইয়াছিলেন, ঘটনা- ক্রমে দেবপাল ততদূর কৃতকার্য্য হইতে (কান্যকুজ পর্যন্ত পঁহুছিতে) না পারিলেও, পরাক্রমে তিনি শশাঙ্ক এবং ধৰ্ম্মপালের তুল্য আসন, এবং সমসাময়িক নরপালগণের মধ্যে সর্ব্বোচ্চ আসন, পাইবার যোগ্য। দেবপালের [মুঙ্গেরে প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে প্রশস্তিকার যে লিখিয়াছেন,-"একদিকে হিমাচল, অপরদিকে শ্রীরামচন্দ্রের কীত্তিচিহ্ন সেতুবন্ধ, একদিকে বরুণালয় (সমূদ্র), অপরদিকে লক্ষ্মীর জন্মনিকেতন (অপর সমুদ্র) এই চতুঃসীমাবচ্ছিন্ন ভূমণ্ডল সেই রাজা নিঃসপত্নভাবে উপভোগ করিতেছেন,”-একথা কবিকল্পিত হইলেও, ইহার অভ্যন্তরে গৌড়াধিপ এবং গৌড়জনের অন্তর্নিহিত,উচ্চাভি- লাষের ছায়া প্রচ্ছন্ন রহিয়াছে; এবং দেবপাল এই অভিলাষপূরণে সমর্থ না হইলেও, উহার উদ্যোগ করিতে গিয়া, তিনি যে তৎকালীন ভারতীয় নরপতি- সমাজে বাহুবলে স্বীয় শ্রেষ্ঠতা প্রতিপাদনে সমর্থ হইয়াছিলেন, তাহা স্বীকার না করিয়া পারা যায় না।
দশম শতাব্দীর প্রারম্ভে, দেবপালের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে, গৌড়রাজ্যের উন্নতির যুগের অবসান হইয়াছিল। প্রায় একই সময়ে, [৯০৭ হইতে ৯১৪ খৃষ্টাব্দের মধ্যে,] মিহির-ভোজের পুত্র এবং উত্তরাধিকারী মহেন্দ্রপালের মৃত্যুতে, প্রতিযোগী কান্যকুজ-রাজ্যেরও অধঃপতনের সূচনা হইয়াছিল। এই দুইটি পরাক্রান্ত রাজ্যের অধঃপতনের সূচনা হইতেই, উত্তরাপথের অধঃপতনের সূত্রপাত। মুইজ্বদ্দীন মহম্মদ ঘোরী কর্তৃক উত্তরাপথ বিজিত হইবার তখনও প্রায় তিনশত বৎসর বাকী ছিল। কিন্তু উত্তরাপথের এই তিনশত বৎসরের ইতিহাস তুরূষ্ক-বিজেতার সাদর অভ্যর্থনার উদ্যোগের সুদীর্ঘ কাহিনীমাত্র।
॥ প্রথম বিগ্রহপাল ॥
দেবপালের মৃত্যুর পর, বিগ্রহপাল গৌড়-রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন। হরগৌরীর [বাদল] স্তম্ভে বিগ্রহপাল শূরপাল নামে উল্লিখিত হইয়াছেন। নারায়ণপালের [ভাঁগলপুরে প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে বিগ্রহপাল "অজাতশত্রু”, "শত্রুগণের গুরুতর বিষাদ”, এবং "সুহৃজ্জনের আজীবনস্থায়ী সম্পদ”-বিধানকারী বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন। ভাগলপুরের তাম্রশাসনে যে প্রশস্তিকার ধৰ্ম্মপাল কর্তৃক কান্যকুজ-বিজয় এবং দেবপালের আদেশে জয়পাল কর্তৃক কামরূপ ও উৎকল বিজয় বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন, বিগ্রহপালের সম্বন্ধে তেমন কিছু বলিবার থাকিলে তিনি যে তাহা না বলিয়া ছাড়িতেন, এরূপ বোধ হয় না। বিগ্রহপাল, ধৰ্ম্মপাল এবং দেবপালের প্রতিভা এবং উচ্চাভিলাষ উভয়েই বঞ্চিত ছিলেন। তিনি হৈহয় বা কলচুরি রাজকুমারী লজ্জাদেবীর পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন। তৎকালে কলচুরি-রাজ কোক্কল্প এবং তাঁহার পুত্রগণ এতই পরাক্রান্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন যে প্রতিবেশী নৃপতিগণ তাঁহাদের সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করিতে পারিলে, আপনাদিগকে কৃতার্থ মনে করিতেন। রাষ্ট্রকূট-রাজ দ্বি তীয় কৃষ্ণ কোক্কল্পের দুহিতার পাণি- গ্রহণ করিয়াছিলেন, এ কথা পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। দ্বিতীয় কৃষ্ণের পুত্র জগত্তঙ্গ কোক্কল্পের দুই পৌত্রীর, এবং জগত্তঙ্গের পুত্র রাষ্ট্রকূট-রাজ তৃতীয় ইন্দ্র কোক্কল্লেল্পর প্রপৌত্রীর পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন। বিগ্রহপালের মহিষী লজ্জাদেবী সম্ভবতঃ কোক্কল্লের পুত্রী বা পৌত্রী ছিলেন। গোরখপুর জেলার অন্তর্গত কন্থল নামক স্থানে প্রাপ্ত কলচুরি-রাজ সোঢ়দেবের ১১৩৬ বিক্রম-সম্বতের (১০৭৯ খৃষ্টাব্দের) একখানি তাম্রশাসনে মিথিলা বা ত্রিহুতের উত্তরদিকে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বতন্ত্র কলচুরি বা হৈহয়-রাজবংশের পরিচয় পাওয়া যায়। এই তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে, সোঢ়দেত্রের উর্দ্ধতন ষষ্ঠ পুরুষ (অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহ) গুণাম্বোধিদেব বা গুণসাগর সংগ্রামে গৌড়-লক্ষ্মী অপহরণ করিয়াছিলেন ("আহ্নতা গৌড়লক্ষ্মী”)। গৌড়াধিপ বিগ্রহপালের সহিতই সম্ভবত গুণাম্বোধিদেবের যুদ্ধ হইয়াছিল। গৌড়েশ্বরী লজ্জদেবী এই গুণাম্বোধিদেবের কন্যাও হইতে পারেন।
বিগ্রহপালের মৃত্যুর পর, মহারাণী লজ্জার গর্ভজাত নারায়ণপাল পিতৃ- সিংহাসন লাভ করিয়াছিলেন। কেদারমিশ্রের পুত্র, হরগৌরীর গরুড়স্তম্ভপ্রতিষ্ঠাতা গুরবমিশ্র, নারায়ণপালের মন্ত্রী ছিলেন। এই স্তম্ভলিপির একটি শ্লোকে (১৯) নারায়ণপাল "বিজিগীয়” বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন। নারায়ণপালের রাজত্বের সপ্তদশ বৎসরে ভাগলপুরেয় তাম্রশাসন সম্পাদিত হইয়াছিল। এই শাসনের আটটি শ্লোকে নারায়ণপালের ন্যায়নিষ্ঠা, দানশীলতা, এবং সাধু চরিত্রের ভূয়সী প্রশংসা করা হইয়াছে; কিন্তু তিনি বিজিগীষু হইয়া, কোন্ দেশ আক্রমণ বা জয় করিয়াছিলেন, তাহার কোন উল্লেখ নাই।
নারায়ণপালের পুত্র রাজ্যপালও শান্তিপ্রিয় ছিলেন। মহীপালের দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত বাণনগরে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে, -রাজ্যপাল "জলধিমূল-গভীরগর্ভ” জলাশয় এবং "কুল-পর্ব্বততুল্য কক্ষবিশিষ্ট দেবালয়" নিৰ্ম্মাণ করিয়া কীর্তিলাভ করিয়াছিলেন। রাজ্যপাল রাষ্ট্রকুটতুঙ্গের কন্যা ভাগ্যদেবীর পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন। এই "তুঙ্গ” সম্ভবত দ্বিতীয় কৃষ্ণের পুত্র জগজুঙ্গ। রাজ্যপাল এবং ভাগ্যদেবীর পুত্র দ্বিতীয় গোপাল, পিতার পরলোক গমনের পর, সিংহাসনে আরোহণ করিয়া, "চিরতরে” "অবনীর একমাত্র ভর্তা”, ছিলেন বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন।
বিগ্রহপাল এবং তাঁহার পুত্র, পৌত্র, এবং প্রপৌত্র যখন যথাক্রমে গৌড়মণ্ডলে শাসনদণ্ড পরিচালন করিতেছিলেন, তখন জেজাকভুক্তির (বর্তমান বুন্দেলখণ্ডের) চন্দেল্ল-রাজগণ পরাক্রমে গৌড়েশ্বর এবং কান্যকুজেশ্বর, উত্তরা- পথের এই উভয় দিক্ালকে, অতিক্রম করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। প্রতীহার-রাজ মহেন্দ্রপালের পুত্র মহীপাল বা ক্ষিতিপালকে (?) এবং ক্ষিতি- পালের উত্তরাধিকারী দেবপালকে, আত্মরক্ষার জন্য, চন্দেল্ল-রাজগণের সহিত মৈত্রী স্থাপন করিতে হইয়াছিল। চন্দেল্ল-রাজ যশোবর্ম্মার ১০১১ সম্বতে (৯৫৪ খৃষ্টাব্দে) উৎকীর্ণ খাজুরাহের একখানি শিলালিপি হইতে জানা যায়, -যশোবর্ম্মার পিতা হর্ষদেবের সহায়তায়, সিংহাসনচ্যুত ক্ষিতিপাল, কান্যকুব্জসিংহাসন-পুনরুদ্ধারে সমর্থ হইয়াছিলেন। এই ক্ষিতিপাল বা মহীপাল রাষ্ট্রকূট-রাজ তৃতীয় ইন্দ্র কর্তৃ'ক কান্যকুব্জ হইতে তাড়িত হইয়াছিলেন। মহীপালের উত্তরাধিকারী কান্যকুব্জপতি দেবপাল চন্দেল্ল-রাজ যশোবর্ম্মাকে বৈকুণ্ঠ-মূর্তি উপহার প্রদান করিয়াছিলেন। যদি এই চন্দেল্প-রাজের (যশোবর্ম্মার) প্রশস্তিকারের বাক্যে আস্থা-স্থাপন করিতে হয়, তবে স্বীকার করিতেহইবে, তিনি গৌড়পতিকেও ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিয়াছিলেন। কারণ, এই শিলালিপির একটি (২৩) শ্লোকে যশোবৰ্ম্মা "গৌড়ক্রীড়ালতাসি", [ক্রীড়ার লতার ন্যায় গৌড়গণকে ছেদনক্ষম অসি] এবং "শিথিলিত-মিথিল" [মৈথিলগণের বলক্ষয়কারী] বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন।
কালের কঠোর শাসনে কিছুরই স্থিতিশীল হইবার সাধ্য নাই। হয় উর্দ্ধগতি উন্নতি, আর না হয় নিশ্চলভাবে থাকিতে গেলে, কালস্রোতের খরবেগে অধোগতি। দেবপালের মৃত্যুর পর, অর্দ্ধশতাব্দী কাল গৌড়রাজ্য উন্নতিহীন নিশ্চল অবস্থায় ছিল। কিন্তু তখন হইতেই, ভিতরে ভিতরে, অধঃপাতের সূত্রপাত হইতেছিল। দ্বিতীয় গোপালের পুত্র এবং উত্তরাধিকারী দ্বিতীয় বিগ্রহপালের ভাগ্যে অখণ্ড গৌড়-রাজ্য সম্ভোগ ঘটিয়া উঠিয়াছিল না। দ্বিতীয় বিগ্রহপালের পুত্র এবং উত্তরাধিকারী মহীপালের বাণনগরে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে, "(দ্বিতীয় বিগ্রহপাল) হইতে শ্রীমহীপালদেব নামক অবনীপাল জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি বাহুবলে যুদ্ধে সকল বিপক্ষ নিপাতিত করিয়া, অনধিকারী কর্তৃক বিলুপ্ত পিতৃরাজ্যের উদ্ধার সাধন করিয়া, ভূপালগণের মস্তকে চরণপদ্ম স্থাপন করিয়াছিলেন।” এখানে স্পষ্টই বলা হইয়াছে-গৌড়রাজ্যের কতকাংশ দ্বিতীয় বিগ্রহপালের হস্তচ্যুত হইয়াছিল। নিরর্থক হইলে, এরূপ অগৌরবকর কথা কদাচ তাঁহার পুত্রের তাম্রশাসনে স্থানলাভ করিত না। এখন জিজ্ঞাস্য, কাহার দ্বারা দ্বিতীয় বিগ্রহপাল রাজ্যভ্রষ্ট হইয়াছিলেন?
॥ কাম্বোজান্বয়-গৌড়পতি ॥
যে স্থানে মহীপালের তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে, দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত সেই বাণগড় বা বাণনগরের বিশাল ভগ্নস্তূপ হইতে সংগৃহীত এবং দিনাজপুর রাজবাড়ীর উদ্যানে পরিরক্ষিত একটি প্রস্তরস্তম্ভের পাদদেশে উৎকীর্ণ রহিয়াছে-
الا দুর্ব্বারারি-বরূথিনী-প্রমথনে দানে চ বিদ্যাধরৈঃ
সানন্দং দিবি
২। যস্য মার্গণ-গুণ-গ্রামগ্রহো গীয়তে।
কাম্বোজান্বয়জেন গৌড়পতি-
না তেনেন্দুমৌলেরয়ং
প্রাসাদো নিরমায়ি কুঞ্জরঘটা-বর্ষেণ ভূ-ভূষণঃ ॥
"আনন্দে বিদ্যাধরগণ স্বর্গলোকে যাঁহার দুর্দ্দদমনীয় শত্রুসৈন্য-দমনে দক্ষতা এবং দানকালে যাচকের গুণগ্রাহিতার বিষয় গান করিতেছেন, কাম্বোজান্বয়জ সেই গৌড়পতি কুঁঞ্জরঘটা (৮৮৮)বর্ষে ইন্দুমৌলির (শিবের) এই পৃথিবীর ভূষণ মন্দির নির্মাণ করাইয়াছিলেন।"
এই শ্লোকটিতে যে ঐতিহাসিক তথ্য নিবন্ধ রহিয়াছে, তাহার আলোচনার পূর্ব্বে,সংক্ষেপে এই শ্লোকের ব্যাখ্যার ইতিহাস বলা আবশ্যক। দিনাজপুরের তখনকার কালেক্টর ওয়েষ্টমেকট্ এই শ্লোকের পাঠোদ্ধারকরিয়া, রাজেন্দ্রলাল মিত্র-কৃত অনুবাদ সহ, ১৮৭২ খৃষ্টাব্দের “ইণ্ডিয়ান্ অ্যান্টিকোয়েরি” পত্রে ইহা প্রকাশিত করিয়াছিলেন।* ওয়েষ্টমেকটের প্রবন্ধের সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তার ভাণ্ডারকর-কৃত একটি প্রতিবাদও প্রকাশিত হইয়াছিল। রাজেন্দ্রলাল এই প্রতিবাদের উত্তর প্রদান করিয়াছিলেন;। এবং ভাণ্ডারকর তাহারও প্রত্যুত্তর প্রকাশিত করিয়াছিলেন।: ১২৮৮ বঙ্গাব্দের "বান্ধব”-পত্রে এক জন লেখক, পুনরায় রাজেন্দ্রলালের ব্যাখ্যার প্রতিবাদ করিয়াছিলেন।§ ইহার পর, এই লিপির কথা পণ্ডিতগণ একেবারে ভুলিয়া গিয়াছিলেন। কিল্লহর্ণ "এপিগ্রাফিয়া ইণ্ডিকা” পত্রের পঞ্চম খণ্ডের পরিশিষ্টে উত্তরাপথের (Northern India) প্রাচীন লিপিসমূহের যে তালিকা প্রদান করিয়া গিয়াছেন, তাহাতে এই লিপির নাম গন্ধ-নাই। বাঙ্গালার প্রত্নতত্ত্বানুসন্ধান-বিভাগের ভূতপূর্ব্ব অধ্যক্ষ ডাক্তার ব্লক ১৯০০-১ খৃষ্টাব্দের রিপোর্টে অতি সংক্ষেপে এই লিপির উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু তিনি ভ্রমক্রমে "গৌড়পতি"কে "সীদপতি” পাঠ করায়, তাঁহার ব্যাখ্যা ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে ।
রাজেন্দ্রলাল ও ভাণ্ডারকরের মধ্যে যে যে বিষয়ে মতভেদ উপস্থিত হইয়াছিল, তন্মধ্যে “কুঞ্জরঘটাবর্ষেণ” পদের কথাই উল্লেখযোগ্য। "কুঞ্জর” অর্থে ৮ এবং "কুঞ্জরঘটা” অর্থে ৮৮৮। "কুঞ্জরঘটাবর্ষেণ” পদে [পাণিনির ২।৩/৬ সূত্র অনুসারে] ক্রিয়া-পরিসমাপ্তি-অর্থে কালবাচক শব্দের উত্তর তৃতীয়া বিভক্তি হইয়াছে। "কুঞ্জরঘটাবর্ষেণ” পদের ইহাই সহজ অর্থ। ৮৮৮কে শকাব্দ ধরিলে, ৯৬৫-৯৬৬ খৃষ্টাব্দ পাওয়া যায়। এই লিপির অক্ষরের বিচার করিলে, এবং লিপির প্রাপ্তি স্থানের বা বরেন্দ্রভূমির পূর্ব্বাপর ইতিহাসের আলোচনা করিলেও, ৮৮৮ শকাব্দ, [৯৬৬ খৃষ্টাব্দই] "কাম্বোজান্বয়জ গৌড়পতি”র আবির্ভাব-কাল বলিয়া প্রতীয়মান হয়।
বরেন্দ্রভূমিতে এপর্য্যন্ত যে সকল প্রাচীন লিপি পাওয়া গিয়াছে, তন্মধ্যে খালিমপুরে প্রাপ্ত ধৰ্ম্মপালের তাম্রশাসনের এবং তথাকথিত বাদল-স্তম্ভে উৎকীর্ণ নারায়ণপালের মন্ত্রী গুরবমিশ্রের প্রশস্তির। অক্ষরের সহিত এই লিপির অক্ষরের তুলনা করিলে, বাদল-স্তম্ভ লিপির অক্ষরের সহিত ইহার অক্ষরের যথেষ্ট সাদৃশ্য লক্ষিত হয়। পক্ষান্তরে, খালিমপুরের তাম্রশাসনের অক্ষরের সহিত এতদ্বভয় লিপির অক্ষরের অনেক প্রভেদ। খালিমপুরের তাম্রশাসনের অক্ষরের মধ্যে ম, প, ও স-এর মাথায় ফাঁক আছে। এই লক্ষণটি প্রাচীনতর কালের লিপির প, ম ও স-তেও লক্ষিত হয়। কিন্তু বাদলস্তম্ভলিপির প,ম স এর মত, দিনাজপুর-স্তম্ভলিপির প, ম ও স-এর মাথা মাত্রায় ঢাকা। খালিমপুর-শাসনের অক্ষরের আর একটি লক্ষণ,-ম-এর নীচের দিকের বাম কোণে পুঁটুলি বা বৃত্ত দেখা যায় না; পুঁটুলির স্থানে উপরমুখী একটি টান আছে। কিল্হর্ণ লিখিয়াছেন,-"দেবপালের সময়ের ঘোষরাবার বৌদ্ধ-লিপিতে কয়েকটিমাত্র ম-এ পুঁটুলি দেখা যায়, কিন্তু বাদল স্তম্ভলিপির ও ভাগলপুরে প্রাপ্ত নারায়ণপালের তাম্রশাসনের সমস্ত ম-ই পুঁটুলি -বিশিষ্ট।" সুতরাং নারায়ণপালের সময়ের লিপির অক্ষরের অনুরূপ অক্ষরবিশিস্ট দিনাজপুরের স্তম্ভলিপিকে দশম শতাব্দীর পূর্ব্বে স্থাপিত করা যাইতে পারে না।
বাদল-স্তম্ভলিপির ন্যায় এই লিপির আর একটি লক্ষণ এই যে, 'রেফ' সব্বত্রই অক্ষরের মাথার উপর দেওয়া হইয়াছে। প্রথম পংক্তির র্ব্ব, ২য় পংক্তির র্গর্গ, এবং ৩য় পংক্তির র্ষ-এররেফ মাত্রার উপরেই দৃষ্ট হয়। খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দের লিপির মধ্যে দুইখানি লিপি-বাণনগরে প্রাপ্ত প্রথম মহীপালের তাম্রশাসন এবং আমগাছিতে প্রাপ্ত মহীপালের পৌত্র তৃতীয় বিগ্রহপালের তাম্রশাসন, দিনাজপুর জেলাতেই আবিষ্কৃত হইয়াছে। এই লিপিদ্বয়ের 'রেফের ব্যবহার সম্বন্ধে কিল্হর্ণ লিখিয়াছেন, -অনেকস্থলে " রেফ মাত্রার উপরে দেওয়া হয় নাই; যে অক্ষরের সহিত "রেফ যুক্ত হইবে, সেই অক্ষরের বাম দিকে মাত্রার সমসূত্রে একটি ক্ষুদ্র রেখামাত্র টানা হইয়াছে।* মহীপালের পুত্র নয়পালের সময়ের (১৫শ বর্ষের) গয়ার কৃষ্ণদ্বারকা-মন্দিরের শিলালিপিতেও মাত্রার উপর' রেফ দৃষ্ট হয় না। সুতরাং রেফ দেওয়ার হিসাবে দেখিতে গেলে, এই লিপিকে মহীপালের দিনাজপুরে প্রাপ্ত তাম্রশাসনেরও পূর্ব্বে [দশম শতাব্দীতেই] স্থাপিত করিতেহয়।
"কাম্বোজান্বয়জ” অর্থে "কাম্বোজ” দেশীয় বা জাতীয় লোকের বংশসভৃত। ফরাসী পণ্ডিত ফুসে লিখিয়াছেন,-নেপালে প্রচলিত কিম্বদন্তী অনুসারে, তিব্বত-দেশেরই নামান্তর "কাম্বোজ দেশ”। সুতরাং "কাম্বোজান্বয়জ গৌড়পতি” তিব্বত বা তৎপার্শ্ববর্তী কোনও প্রদেশ হইতে আসিয়া, বরেন্দ্র জয় করিয়া, বরেন্দ্রী বা বরেন্দ্রের নামান্তর গৌড়ের নামানুসারে, গৌড়পতি উপাধি গ্রহণ করিয়াছিলেন, এই রূপই মনে করিতে হয়। ৯৬৬ খৃষ্টাব্দে "কাম্বোজান্বয়জ” গৌড়পতি শিবমন্দির নির্মাণ করিয়া- ছিলেন। ইহার কয়েক বৎসর পূর্ব্বেই হয়ত তিনি হিমালয় প্রদেশ হইতে বহির্গত হইয়া, বরেন্দ্র অধিকার করিয়াছিলেন। দ্বিতীয় বিগ্রহপাল যে "অনধিকৃত” বা অনধিকারী কর্তৃক রাজ্যচ্যুত হইয়াছিলেন, "কাম্বোজান্নয়জ গৌড়পতিই" সেই "অনধিকৃত”।
"কাম্বোজ-বংশজ গৌড়পতি” গৌড়-রাজ্যের কোন্ কোন্ অংশ অধিকার করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, তাহা বলা কঠিন। বরেন্দ্রদেশ তাঁহার পদানত হইয়াছিল, এরূপ নিঃসন্দেহে মনে করা যাইতে পারে। কারণ, বরেন্দ্রের কেন্দ্রস্থলেই-বাণনগরে,-তাঁহার কীত্তিচিহ্ন পাওয়া গিয়াছে; এবং বরেন্দ্রদেশের অনেক স্থানে যে কতক পরিমাণে তিব্বতীয় বা মোঙ্গলীয় আকারের কোচ, পলিয়া, রাজবংশী প্রভৃতি জাতি দেখা যায়, ইহারা তিব্বতীয় বা ভুটিয়া আক্রমণকারিগণের অর্থাৎ কাম্বোজ-বংশজ গৌড়পতির অনুচরগণের বংশধর বলিয়াই মনে হয়। এরূপ অনুমান করিবার কারণ, কাম্বোজ-বংশজ গৌড়পতির সঙ্গে ভিন্ন বহুসংখ্যক মোঙ্গলীয় ঔপনিবেশিকের বরেন্দ্রে, অর্থাৎ করতোয়ার পশ্চিমতীরবর্তী ভূভাগে, প্রবেশের আর কোন অবসর দেখিতে পাওয়া যায় না। করতোয়ার পূর্ব্বদিব্বাসী, কামরূপী ব্রাহ্মণগণের যজমান, কোচ এবং রাজবংশিগণের সহিত বরেন্দ্রবাসী, বর্ণব্রাহ্মণের যজমান, কোচ, পলিয়া, এবং রাজবংশিগণের কোনরূপ সম্বন্ধের পরিচয় পাওয়া যায় না।
বরেন্দ্র যখন "কাম্বোজ-বংশজ গৌড়পতির” করতলগত, এবং বিজিত দ্বিতীয় বিগ্রহপাল যখন গৌড়রাষ্ট্রের কোনও নিভৃত কোণে, [মগধে বা মিথিলায়,] লুক্কায়িত ছিলেন, তখন চন্দেল্ল-রাজ যশোবর্ম্মার উত্তরাধিকারী ধঙ্গদেব অঙ্গ ও রাঢ় আক্রমণ করিয়াছিলেন। খজুরাহোতে প্রাপ্ত ১০০২ খৃষ্টাব্দের একখানি শিলালিপিতে ধঙ্গ সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে,-"তুমি কে? কাঞ্চীরাজপত্নী! তুমি কে? অন্ধ্রাধিপস্ত্রী! তুমি কে? রাঢ়ারাজ-পত্নী! তুমি কে? অঙ্গরাজ-পত্নী!' সমর-জয়ী রাজার (ধঙ্গের) কারাগারে সজলনয়না শত্রুপত্নীগণের মধ্যে এইরূপ কথোপকথন হইয়াছিল।"*
এই শ্লোকে কি পরিমাণে ঐতিহাসিক তথ্য নিহিত আছে, -ধঙ্গ প্রকৃত প্রস্তাবে রাঢ় এবং অঙ্গের মহাসামস্তদ্বয়কে পরাজিত করিয়া, উভয়ের পত্নীগণকে বন্দিনী করিয়া লইয়া যাইতে সমর্থ হইয়াছিলেন কিনা,-কেবল এক পক্ষের প্রশস্তিকারের কথা শুনিয়া, তাহা বলা কঠিন। কিন্তু তৎকালে গৌড়রাজ্যের অংশ বিশেষের সহিত জেজাভুক্তির যে ঘনিষ্ট সম্বন্ধ ছিল, অন্যত্রও তাহার কিছু কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। চন্দেল্প-রাজগণের যে দুইখানি শিলালিপি হইতে প্রমাণ উদ্ধত হইয়াছে, এই দুইখানিরই লেখক গৌড় বা বাঙ্গালী। প্রথম খানি "সংস্কৃতভাষাবিদ গৌড়কায়স্থ [করণিক] জগ্ধের দ্বারা” লিখিত; দ্বিতীয় লিপির লেখক,-গৌড়কায়স্থ জয়পাল।
পালরাজ্যের কেন্দ্র বরেন্দ্র যখন কাম্বোজ-বংশজ গৌড়পতির পদানত, এবং রাঢ় ও অঙ্গ চন্দেল্ল-রাজ ধঙ্গ কর্তৃক আক্রান্ত, তখন প্রতিযোগী রাষ্ট্রকূট-রাজ্যের এবং প্রতীহার-রাজোর অবস্থা আরও শোচনীয় হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। ৯৭৩ খৃষ্টাব্দে চালুক্য-বংশীয় তৈলপ, শেষ রাষ্ট্রকৃট-নৃপতি দ্বিতীয় কক্ক'রাজকে পরাভূত করিয়া, দক্ষিণাপথে চালুক্য-প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। প্রতীহার-বংশেরও অধঃপতনের আর বড় বিলম্ব ছিল না। কচ্ছপঘাতবংশীয় বজ্রদামন কান্যকুজের প্রতীহার-রাজকে পরাভূত করিয়া, গোপাদ্রি বা গোয়ালিয়র অধিকার করিয়াছিলেন। এতদ্ব্যতীত আরও দুইটি অভিনব প্রতিদ্বন্দ্বী-পরমার-রাজ বাক্তি-মুঞ্জরাজের (১৭৪, ৯৭৯ খৃঃ অঃ) বাহুবলে উন্নীত মালবরাজ্য এবং অনহীলপাটকের চৌলুক্যবংশীয় মূলরাজ-(৯৭৪-৯৯৫ খৃঃ অঃ) প্রতিষ্ঠিত গুজরাত-রাজ্য অভ্যুদিত হইয়া উত্তরাপথকে অধিকতর বিশৃঙ্খল এবং দুর্ব্বল করিয়া তুলিয়াছিল। কিন্তু এই সময়ে, আনুমানিক ৯৮০ খৃষ্টাব্দে, দ্বিতীয় বিগ্রহপালের পুত্র মহীপাল পিতৃ-সিংহাসনে আরুঢ় হইয়া পুনরায় গৌড়রাষ্ট্রের ঐক্যসাধনে এবং পাল-রাজ্যকে আরও প্রায় সার্দ্ধ শতাব্দীর পরমায়ু প্রদানে সমর্থ হইয়াছিলেন।
"অনধিকারী কর্তৃক বিলুপ্ত পিতৃরাজ্য” বা কাম্বোজ-জাতীয় বিজেতার অধিকৃত বরেন্দ্রের উদ্ধার-সাধন মহীপালের প্রথম, এবং [বাণনগরে প্রাপ্ত তাম্রশাসন-মতে], প্রধান কীত্তি। ধৰ্ম্মপাল এবং দেবপালের ন্যায় মহীপালও দীর্ঘকাল গৌড়-সিংহাসনে অধিরূঢ় ছিলেন। তারনাথ লিখিয়া গিয়াছেন, -মহীপাল ৫২ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন। একখানি পিত্তলের মূর্তিতে কানিংহাম মহীপালের রাজত্বের ৪৮ বর্ষের উল্লেখ দেখিয়াছেন।* এই দীর্ঘ রাজত্বকালে, বিদেশীয় আক্রমণকারীর হস্ত হইতে রাজ্যরক্ষার জন্য 'পুনরায় মহীপালকে অস্ত্রধারণ করিতে হইয়াছিল।
॥ রাজেন্দ্রচোলের অভিযান ॥
চোলরাজ প্রথম রাজেন্দ্রচোলের তিরুমলয়-পাহাড়ে উৎকীর্ণ তামিল ভাষার লিপিতে উক্ত হইয়াছে- "পরকেশরীবৰ্ম্মা বা শ্রীরাজেন্দ্র-চোলদেবের (রাজত্বের) ত্রয়োদশ বৎসরে -যিনি......তাঁহার মহান্ সমরপটু সেনাদ্বারা (নিম্নোক্ত দেশ সকল) অধিকার করিয়াছেন-দুর্গম ওডড-বিষয়, (যাহা তিনি) প্রবল যুদ্ধে (পদানত করিয়াছিলেন); মনোরম কোশল-নাড়ু, যেখানে ব্রাহ্মণগণ মিলিত হইয়াছিল; মধুকর-নিকর-পরিপূর্ণ-উদ্যানবিশিষ্ট তন্দবুত্তি, ভীষণ যুদ্ধে ধৰ্ম্মপালকে নিহত করিয়া তিনি যে দেশ অধিকার করিয়াছিলেন; সকলদিকে প্রসিদ্ধ তক্কণলাড়ম্, সবেগে রণশূরকে আক্রমণ করিয়া তিনি যে দেশ অধিকার করিয়াছিলেন; বঙ্গালদেশ, যেখানে ঝড়বৃষ্টির কখনও বিরাম নাই, এবং গজ-পৃষ্ঠ হইতে নামিয়া যেখান হইতে গোবিন্দচন্দ্র পলায়ন করিয়াছিলেন; কর্ণভূষণ, চৰ্ম্মপাছকা এবং বলয়-বিভূষিত মহীপালকে ভীষণ সমরক্ষেত্র হইতে পলায়ন করিতে বাধ্য করিয়া, যিনি তাঁহার অদ্ভুত বলশালী করিসমূহ এবং রত্নোপমা রমণীগণকে হস্তগত করিয়াছিলেন; সাগরের ন্যায় রত্নসম্পন্ন উত্তিরলাড়ম্; বালুকাময় তীর্থধৌতকারিণী গঙ্গা।"
প্রথম রাজেন্দ্র-চোলদেব ১০১২ খৃষ্টাব্দে চোল-সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন, এবং তিরুমলয় পর্ব্বতের লিপি তাঁহার রাজত্বের ত্রয়োদশ বৎসরে [১০২৪ খৃষ্টাব্দে] উৎকীর্ণ হইয়াছিল। প্রথম রাজেন্দ্র-চোলের রাজত্বের নবম বর্ষে সম্পাদিত মেলপাড়ির চোলেশ্বর-মন্দিরের লিপিতে বিজিত দেশসমূহের যে তালিকা প্রদত্ত হইয়াছে, তন্মধ্যে ওদ্ভ-বিষয়াদির নাম নাই। সুতরাং অনুমান করিতে হইবে, প্রথম রাজেন্দ্র-চোল তাঁহার রাজত্বের নবম ও ত্রয়োদশ বৎসরের [১০২০ হইতে ১০২৪ খৃষ্টাব্দের] মধ্যে ওড্ড-বিষয়, কোশল-নাডু, বঙ্গাল-দেশ প্রভৃতি আক্রমণ করিয়াছিলেন। সারনাথের শিলালিপি হইতে জানা যায়, গৌডাধিপ মহীপাল ১০৮৩ সম্বতে [১০২৬ খৃষ্টাব্দে] জীবিত ছিলেন। সুতরাং প্রথম রাজেন্দ্র-চোল "ওড্ড বিষয়” বা উড়িষ্যা, “তক্কণলাড়ম্” বা দক্ষিণরাঢ় * এবং "বঙ্গাল-দেশ” বা বঙ্গ আক্রমণ করিতে গিয়া, যে মহীপালের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, সেই মহীপাল অবশ্যই পালবংশীয় গৌড়াধিপ মহীপাল। প্রথম রাজেন্দ্র-চোল প্রকৃত প্রস্তাবে মহীপালকে পরাভূত করিয়া, তাঁহার হস্তী এবং রমণীগণকে হস্তগত করিতে পারিয়াছিলেন কিনা শুধু এক পক্ষের কথা শুনিয়া, তাহা নিঃসংশয়ে বলা যায় না। কিন্তু তিরুমলয়ের লিপিতে যে ভাবে প্রথম রাজেন্দ্র-চোলের দিগ্বিজয়বৃত্তান্ত বর্ণিত হইয়াছে, তাহা পাঠে মনে হয়, তিনি গৌড়রাজ্যের দক্ষিণাংশ আক্রমণ করিয়াছিলেন। তারনাথ লিখিয়া গিয়াছেন,-উড়িষ্যার রাজা মহীপালকে করপ্রদান করিতেন। চোলরাজ সম্ভবত উড়িষ্যা, বঙ্গ, এবং রাঢ়ের সামন্তগণকে পরাভূত করিয়াছিলেন; মহীপালের সহিত সম্মুখযুদ্ধের পরেই হউক, বা পূর্ব্বেই হউক, আর অধিকদূর অগ্রসর হওয়া যুক্তিযুক্ত বিবেচনা না করিয়া, স্বরাজ্যে ফিরিয়া গিয়াছিলেন। দিগ্বিজয়ী চোলরাজ গৌড়রাজ্যের কোন অংশ স্থায়ীভাবে অধিকার করিয়াছিলেন, এরূপ প্রমাণ পাওয়া যায় না।
মহীপাল যে উপায়েই চোলরাজের আক্রমণ হইতে গৌড়রাজ্যের উদ্ধারসাধন করিয়া থাকুন, তিনি যে সমরানুরাগী শশাঙ্ক, ধৰ্ম্মপাল এবং দেবপালের ন্যায় উচ্চাভিলাষী ছিলেন না, শান্তিই ভালবাসিতেন, এরূপ মনে করিবার যথেষ্ট কারণ আছে। মহীপালের গৌড়-সিংহাসনলাভের অনতিকাল পরেই, উত্তরাপথের সর্ব্বনাশের-মুসলমান-ধৰ্ম্মাবলম্বী তুরূষ্কগণকর্তৃক উত্তরাপথ বিজয়ের-সূত্রপাত হইয়াছিল। তুরূষ্ক-আক্রমণকারিগণের গৌড়রাষ্ট্রের সীমায় পদার্পণ করিবার তখনও প্রায় দুই শতাব্দ বিলম্ব থাকিলেও, তুরূষ্কগণ কর্তৃক পরিণামে গৌড়বিজয়-রহস্য উদ্ঘাটনার্থ, এই দুই শতাব্দের গৌড়রাষ্ট্রের ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে উত্তরাপথে তুরূষ্ক-প্রভাব-বিস্তারের ইতিবৃত্তও সংক্ষেপে আলোচনা করা বাঞ্ছনীয়।
॥ মহীপালের কীত্তিকলাপ ॥
খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দের আরম্ভে (৭১১ খৃষ্টাব্দে) খালিফ-আল ওয়ালিদের সেনানী মহম্মদ কাশিমের নেতৃত্বাধীনে মুসলমানধর্ম্মী আরবগণ সিন্ধু এবং মূলতান অধিকার করিলেও, আরবপ্রাধান্যের যুগে, মুসলমান-প্রভাব সিন্ধু ও মূলতানের বাহিরে বিস্তারলাভ করিতে পারিয়াছিল না। সেই যুগে পরাক্রান্ত সাহিরাজ্যের নৃপতিগণ উত্তরাপথের উত্তরপশ্চিম-সীমান্ত রক্ষা করিতেছিলেন। পাঞ্জাব ও আফগানিস্থানের পূর্ব্বভাগ সাহিরাজ্যের অন্তর্ভূ'ক্ত ছিল। সাহিরাজ্য প্রথমে কুষাণ-সম্রাট কনিষ্কের বংশধরগণের পদানত ছিল। সুতরাং সাহিরাজগণ জাতিতে তুরূষ্ক এবং সম্ভবত বৌদ্ধধৰ্ম্মাবলম্বী হইলেও, কার্যত হিন্দুসমাজভুক্ত হইয়া গিয়াছিলেন; এবং মুসলমান-আক্রমণ হইতে আত্মরক্ষার জন্য উত্তরাপথের রাজন্যবর্গের সাহায্যই প্রার্থনা করিতেন।* নবম শতাব্দীর মধ্যভাগে কুষাণ-বংশীয় শেষ সাহি-রাজ কতোরমানের ব্রাহ্মণ-মন্ত্রী "লল্লিয়” বা "কালার", প্রভুকে পদচ্যুত করিয়া, সাহি-সিংহাসন অধিকার করিয়াছিলেন। কাবুল কুষাণ-বংশীয় সাহি-রাজগণের রাজধানী ছিল। লল্লিয়-সাহি সিন্ধুনদের পশ্চিমতীরবর্তী উদ্ভাণ্ডপুরে (উন্দ) স্বীয় রাজধানী স্থাপিত করিয়াছিলেন। ২৫৬ হিজরি [৮৬৮-৯ খ্রষ্টাব্দে]সিস্থানের অধিপতি ইয়াকুব লয়স আফগানিস্থানের অন্তর্গত গজনী-প্রদেশ অধিকার করিয়াছিলেন, এবং কাবুল পর্য্যন্ত অগ্রসর হইয়াছিলেন। ইহার কিয়ৎকাল পরে, তুর্কিস্থানের সামানী-বংশীয় অধিপতি ইসাইল কর্তৃক গজনী সামানী-রাজ্যভুক্ত হইয়াছিল। খৃষ্টীয় দশম শতাব্দের তৃতীয় পাদে, সামাসী-রাজের একজন প্রভাবশালী সেনা-নায়ক, আলব-তিগীন, প্রভুর ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হইয়া, গজনীতে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। আলব-তিগীনের সরুক্-তিগীন নামক একজন তুরুষ্ক ক্রীতদাস ছিল। প্রভুর মৃত্যুর কয়েক বৎসর পরে, ৯৭৭ খৃষ্টাব্দে, সবুক্-তিগীন গজনীর গদিতে আরোহণ করিয়াছিলেন। ইহার দশ বৎসর পরে, [৯৮৭ খৃষ্টাব্দে] সবুক্-তিগীন উত্তরাপথের সিংহদ্বার [সাহি-রাজ্য] অধিকারে বদ্ধপরিকর হইয়া, উহা আক্রমণ করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। সাহি-জয়পাল তখন উদ্ভাণ্ডপুরের সিংহাসনে আসীন ছিলেন। সবুক-তিগীন আরব্ধ সাহিরাজ্য-ধ্বংসসাধনব্রত অসম্পূর্ণ রাখিয়া, ৯৯৯ খৃষ্টাব্দে কালগ্রাসে পতিত হইলে, তদীয় উত্তরাধিকারী মামুদ, প্রবলতর পরাক্রম সহকারে, সাহি-রাজ্য আক্রমণ করিতে লাগিলেন। কাশ্মীর, কান্যকুজ, কালঞ্জর (জেজাকভুক্তি) এবং উত্তরাপথের অন্যান্য রাজ্যের রাজন্যবর্গ প্রাণপণে বিপন্ন সাহি-রাজের সহায়তা করিয়াছিলেন। মামুদের গতিরোধ করিতে গিয়া, সাহি জয়পাল, তদীয় পুত্র সাহি আনন্দপাল, পৌত্র সাহি ত্রিলোচনপাল, একে একে প্রাণপাত করিয়াছিলেন। সাহি-রাজ্য সম্পূর্ণরূপে অধিকার করিয়াও, কিন্তু মামুদের উচ্চাভিলাষের তৃপ্তি হইয়াছিল না। তিনি তখন উত্তরাপথের পবিত্র তীর্থক্ষেত্রের এবং সমৃদ্ধ নগরনিচয়ের লুণ্ঠনে এবং ধ্বংস-সাধনে ব্রতী হইয়াছিলেন। থানেশ্বর, মথুরা, কান্যকুজ, গোয়ালিয়র, কালঞ্জর, সোমনাথ ক্রমে মামুদের ধনলোভ এবং পৌত্তলিকতা- বিদ্বেষ-বিহ্নতে আহুতি রূপে প্রদত্ত হইয়াছিল। এই ঘোর দুদ্দিনে, উত্তরা- পথের পূর্বার্দ্ধেরঅধিপতি গৌড়াধিপ মহীপাল কি করিতেছিলেন?
মামুদের আক্রমণ সম্বন্ধে গৌড়াধিপ মহীপালের ঔদাসীন্যের আলোচনা করিলে মনে হয়,কলিঙ্গজয়ের পর, মৌর্য্য-অশোকের ন্যায়, [কাম্বোজান্বয়জ গৌড়পতির কবল হইতে] বরেন্দ্র উদ্ধার করিয়া, মহীপালেরও বৈরাগ্য উপস্থিত হইয়াছিল; এবং অশোকের ন্যায় মহীপালও যুদ্ধ বিগ্রহ পরিত্যাগ করিয়া, পরহিতকর এবং পারত্রিক কল্যাণকর কর্ম্মানুষ্ঠানে জীবন উৎসর্গ করিতে কৃতসঙ্কল্প হইয়াছিলেন। রাঢ়দেশে (মুর্শিদাবাদ জেলায়) "সাগরদীঘি", এবং বরেন্দ্রে (দিনাজপুর জেলায়) "মহীপালদীঘি”, অদ্যাপি মহীপালের পরহিত-নিষ্ঠার পরিচয় দিতেছে। তিনটি সুবৃহৎ নগরের ভগ্নাবশেষবগুড়াজেলার অন্তর্গত "মহীপুর”, দিনাজপুর জেলার "মহীসন্তোষ”, এবং মুর্শিদাবাদ জেলার "মহীপাল”-মহীপালের নামের সহিত জড়িত রহিয়াছে। ১০৮৩ সম্বতের (১০২৬ খৃষ্টাব্দের) সারনাথে প্রাপ্ত একখানি শিলালিপিতে.উক্ত হইয়াছে,-গৌড়াধিপ মহীপাল বারাণসীধামে, স্থিরপাল এবং বসত্তপালের দ্বারা, ঈশান (শিব) ও চিত্রঘন্টার (দুর্গার) মন্দিরাদি [কীত্তিরত্নশতানি] প্রতিষ্ঠিত করাইয়াছিলেন; মৃগদাবের (সারনাথের) "ধৰ্ম্মরাজিকা” বা অশোকস্তূপ এবং অশোকের স্তম্ভোপরস্থিত "সাঙ্গ-ধৰ্ম্মচক্রের" জীর্ণসংস্কার করাইয়াছিলেন; এবং অভিনব "শৈলগন্ধকূটী” নির্মাণ করাইয়াছিলেন।
সারনাথের লিপিতে বারাণসীধামে মহীপালের কীত্তিকলাপের যে তালিকা প্রদত্ত হইয়াছে, তাহা পাঠে স্বতঃই মনে হয়,-বারাণসী তখন গৌড়রাষ্ট্রের অন্তর্ভু'ক্ত ছিল। খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দে, গাহড়বাল-রাজগণের আমলে, বারাণসী কান্ঠ্যকুজ-রাজ্যের অন্তনিবিষ্ট দেখিতে পাওয়া যায়; কিন্তু একাদশ শতাব্দে, বারাণসী কান্যকুজের প্রতীহার-রাজগণের অধিকারভুক্ত থাকার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। একাদশ শতাব্দের প্রথম পাদে, কান্যকুজ-রাজ রাজ্যপাল, সুলতান মামুদের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া, যখন ঘোর বিপন্ন এবং স্বীয় রাজধানী-রক্ষণে অসমর্থ, তখন বারাণসী তাঁহার রক্ষণাধীনে থাকিলে, গৌড়াধিপ যে তথায় শত শত কীর্তিরত্ন-প্রতিষ্ঠায় সাহসী হইতেন, এরূপ মনে হয় না। বারাণসী তখন গোঁড়রাষ্ট্রভুক্ত এবং গৌড়সেনা- রক্ষিত ছিল; এবং মহীপাল বারাণসী-রক্ষার সুব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছিলেন বলিয়াই, হয়ত এই মহাতীর্থ সুলতান মামুদের আক্রমণ হইতে অব্যাহতি পাইয়াছিল।*
বারাণসীধামকে কীর্ত্তিরত্বে সজ্জিত করিতে গিয়া, মহীপাল এমনই তন্ময় হইয়া পড়িয়াছিলেন যে, আর্য্যাবর্তের অপরার্দ্ধের তীর্থক্ষেত্রের কীর্তিরত্বের কি দশা হইতেছিল, সে দিকে দৃত্পাত করিবারও তাঁহার অবসর ছিল না। সারনাথের লিপি-সম্পাদনের ঠিক পূর্ব্ব বৎসর [১০২৫ খ্রষ্টাব্দে] মামুদ সোমনাথের প্রসিদ্ধ মন্দির ধ্বংস করিয়াছিলেন, এবং কয়েক বৎসর পূর্ব্বে, [১০১৮ খৃষ্টাব্দে] মথুরা এবং কান্যকুজের মন্দিরনিচয় ভূমিসাৎ করিয়া, সুবর্ণ এবং রজতনিৰ্ম্মিত দেবমূর্তির্ত্তসমূহ আত্মসাৎ করিয়াছিলেন। সাহি- রাজ্যের পতনে, বা কান্যকুব্জ এবং কালঞ্জর রাজ্যের বিপদে না হউক, মথুরার ন্যায় তীর্থক্ষেত্রের দেবমূর্তি এবং দেবমন্দির নিচয়ের দুর্দ্দদশায়, ধৰ্ম্মপ্রাণ মহীপালের হৃদয় দ্রবীভূত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তিনি স্বীয় রাজ্যের বহির্ভূ'ত তীর্থক্ষেত্র সম্বন্ধে একান্ত উদাসীন ছিলেন। সুলতান মামুদের অভিযাননিচয় সম্বন্ধে গৌড়াধিপ মহীপালের এই প্রকার ঔদাসীন্য উত্তরাপথের সর্ব্বনাশের অন্যতম কারণ। যদি মহীপাল গৌড়রাষ্ট্রের সেনাবল লইয়া সাহি-জয়পাল, আনন্দপাল, বা ত্রিলোচনপালের সাহায্যার্থে অগ্রসর হইতেন, তবে হয়ত ভারতবর্ষের ইতিহাস স্বতন্ত্র আকার ধারণ করিত।
॥ নয়পাল ॥
মহীপালের পুত্র এবং উত্তরাধিকারী নয়পাল, [তৃতীয় বিগ্রহপালের তাম্রশাসনে], "সকলদিকে প্রতাপ-বিস্তারকারী” এবং "লোকানুরাগভাজন” বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন। নয়পাল যখন গৌড়-সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন, তখন সকল দিকে না হউক, পশ্চিম দিকে প্রতাপ-বিস্তারের বিশেষ সুযোগ উপস্থিত হইয়াছিল। কোন কোন মুসলমান ইতিহাস-লেখক লিখিয়াছেন,-মামুদ যখন কান্যকুব্জ আক্রমণ করিয়াছিলেন, তখন কান্যকুব্জ-রাজ [রাজ্যপাল] তাঁহার অধীনতা স্বীকার করিয়াছিলেন বলিয়া, চন্দেল্ল-রাজ গণ্ড তাঁহাকে নিহত করিয়াছিলেন।* কচ্ছপঘাত-বংশীয় বিক্রমসিংহের [দুবকুণ্ডে প্রাপ্ত] ১১৪৫ বিক্রম-সংবতের [১০৮৮ খ্রস্টাব্দের] শিলালিপিতে উক্ত হইয়াছে, বিক্রমসিংহের প্রপিতামহ অর্জু'ন, বিদ্যাধরের আদেশে [কার্যনিরতঃ ], রাজ্যপাল নামক নরপালকে নিহত করিয়াছিলেন। এই বিদ্যাধর চন্দেল্ল-রাজ গণ্ডের পুত্র এবং উত্তরাধিকারী বিদ্যাধর, এবং এই রাজ্যপাল কান্যকুজের প্রতীহারবংশীয় রাজা রাজ্যপাল বলিয়া অনুমান হয়। মহোবায় প্রাপ্ত চন্দেল্ল-বংশের একখানি শিলালিপিতে সম্ভবত বিদ্যাধর সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে, তিনি কান্যকুব্জ-রাজের বিনাশবিধান করিয়াছিলেন, [বিহিত-কন্যাকুজ-ভূপালভঙ্গম্]।** রাজ্যপালের হস্তা গশুই হউন বা বিদ্যাধরই হউন, রাজ্যপালের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই কাৰ্যতঃ প্রতীহারবংশের সৌভাগ্য-সূর্য্য অস্তমিত হইয়াছিল। রাজ্যপালের পরে, ত্রিলোচনপাল এবং তৎপর সম্ভবত যশঃপাল কান্যকুজের সিংহাসন লাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহারা প্রতীহার-বংশের লুপ্ত-গৌরব পুনরুজ্জীবিত করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন বলিয়া মনে হয় না। সুতরাং নয়পালের পশ্চিমদিকে রাজ্যবিস্তারের বিশেষ সুযোগ ছিল। কিন্তু নয়পালও, মহীপাল এবং পালবংশের ইতিহাসের এইস্থিতিশীল যুগের অন্যান্য নরপালগণের ন্যায়, "মহোদয়শ্রী”- উপার্জ্জন-অভিলাষ-বজ্জিত ছিলেন।
পিতার ন্যায় নয়পালও বহিঃশত্রুর আক্রমণ হইতে উদ্ধার করিয়া, গৌড়রাজ্য অখণ্ড রাখিয়া যাইতে সমর্থ হ ইয়াছিলেন। "তারিখ-ই-বাইহাকী” নামক পারস্য ভাষায় রচিত ইতিহাসে উল্লিখিত হইয়াছে, মামুদের পুত্র মাসুদ যখন গজনীর অধীশ্বর, তখন [১০৩৩ খৃষ্টাব্দে] লাহোরের শাসনকর্তা আহম্মদ নিয়ালতিগীন্ বারাণসী-নগর আক্রমণ করিয়াছিলেন। উক্ত "তারিখ"-প্রণেতা লিখিয়াছেন-*
"(নিয়ালতিগীন্ সসৈন্য) গঙ্গাপার হইয়া, বাম তীর দিয়া চলিয়া গিয়া, হঠাৎ বণারস নামক সহরে উপনীত হইলেন। (এই সহর) গঙ্গ-প্রদেশের অন্তর্ভু'ক্ত ছিল। এই সহর (পূর্ব্বে) কখনও মুসলমান সেনা কর্তৃক আক্রান্ত হয় নাই। সহরটি ২ ফরঙ্গ (৬০০০ গজ) দীর্ঘ এবং ২ ফরূসঙ্গ প্রশস্ত। (এখানে) জল যথেষ্ট ছিল। মুসলমান লস্কর প্রাতঃকালে (পহুছিয়া) দ্বিতীয় নমাজের (মধ্যাহ্নের) পরে, আর অধিক কাল তথায় তিষ্ঠিতে 'পারিয়াছিল না; কারণ বিপদের (আশঙ্কা) ছিল। (এই সময় মধ্যে) কাপড়ের বাজার, সুগন্ধিদ্রব্যের বাজার, এবং মণিমুক্তার বাজার-এই তিনটি বাজার ব্যতীত, আর কোন স্থান লুণ্ঠন করিতে পারা গিয়াছিল না। কিন্তু সৈন্যগণ খুব লাভবান হইয়াছিল। সকলেই সোণা, রূপা, আতর, এবং মণিমুক্তা প্রাপ্ত হইয়াছিল এবং অভিলাষ পূর্ণ করিয়া ফিরিয়া আসিয়াছিল।"
"তারিখ-ই-বাইহাকি”-প্রণেতা আবুল ফজল, সুলতান মাসুদ এবং আহম্মদ নিয়ালতিগীনের সমসাময়িক লোক, এবং নিয়ালতিগীনের অভিযান সম্বন্ধে খাঁটি খবর সংগ্রহের তাঁহার বেশ সুবিধা ছিল। তাঁহার প্রদত্ত বিবরণ হইতে স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়, ১০৩৩ খৃষ্টাব্দেও বারাণসী পূর্ব্ববৎ সুরক্ষিত ছিল। কিন্তু সুলতান মামুদের মৃত্যুর পর, বারাণসীর প্রহরিগণ কিছু অসতর্ক হইয়া পড়িয়াছিলেন। তাই নিয়ালতিগীন বজনীযোগে চলিয়া আসিয়া, হঠাৎ প্রাতঃকালে উপস্থিত হইয়া, ছয় ঘণ্টা কাল মধ্যে তিনটি বাজার লুণ্ঠনের অবসর পাইয়াছিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে নগর-রক্ষিগণ খবর পাইয়া প্রস্তুত হইয়াছিলেন। সুতরাং, নিয়ালতিগীন পলায়ন করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। ১০৩৩ খৃষ্টাব্দে নিয়ালতিগীনের আক্রমণ হইতে যাঁহারা বারণসীর উদ্ধারসাধন করিয়াছিলেন, তাঁহার নয়পালের আদেশানুবর্তী গৌড়-সেনা, নিঃসন্দেহে এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে।
তিব্বতীয় ভাষায় রচিত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের (অতীশের) জীবনচরিতে, নয়পালের আমলে, "কর্ণ”-রাজ্যের রাজা কর্তৃক মগধ-আক্রমণের বিবরণ পাওয়া যায়।* নয়পাল দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানকে বিক্রমশীলা-বিহারের অধ্যক্ষ নিযুক্ত করিয়াছিলেন। প্রথম যুদ্ধে গৌড়সেনা "কর্ণ”-রাজের সেনা কর্তৃক পরাজিত হইয়াছিল, এবং শত্রুগণ রাজধানী পর্য্যন্ত অগ্রসর হইয়াছিল। কিন্তু পরে নয়পালই জয়লাভ করিয়াছিলেন। অবশেষে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের যত্নে, উভয় পক্ষে মৈত্রী স্থাপিত হইয়াছিল। দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জীবন-চরিতকার বুস্তন তাঁহার নিজের শিষ্য ছিলেন। সুতরাং বুস্তনের প্রদত্ত মগধ-আক্রমণবিবরণ অবিশ্বাস করা যায় ন।। কিন্তু কোন্ রাজ্যকে যে বুস্তন "কর্ণ" নামে উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন, তাহার নিরূপণ করা কঠিন। "কর্ণ”-শব্দ যদি রাজ্যের নাম রূপে গ্রহণ না করিয়া, রাজার নাম বলিয়া মনে করা যায়, তবে এই সমস্যা পূরণ করা যাইতে পারে। চেদির কলচুরি-রাজ গাঙ্গেয়দেবের পুত্র কর্ণ নয়পালের জীবদ্দশায়, [১০৩৭ হইতে ১০৪২ খৃষ্টাব্দ মধ্যে, পিতৃ- সিংহাসন লাভ করিয়াছিলেন। কর্ণের পৌত্রবধূ অম্লনাদেবীর [ভেরঘাটে প্রাপ্ত] শিলালিপিতে উক্ত হইয়াছে, কর্ণের ভয়ে "কলিঙ্গের সহিত বঙ্গ কম্পমান ছিল।” অহলনাদেবীর পুত্র জয়সিংহদেবের [কর্ণবলে প্রাপ্ত] শিলালিপিতে সূচিত হইয়াছে-গৌড়াধিপ গর্ব্ব ত্যাগ করিয়া কর্ণের আজ্ঞাবহন করিতেন। কর্ণ চিরজীবন প্রতিবেশী রাজন্যবর্গের সহিত বিরোধ রত ছিলেন। সুতরাং নয়পালের সময়ে মগধ-আক্রমণ তাঁহার পক্ষে অসম্ভব নহে; এবং সেই আক্রমণের পরিণাম সম্বন্ধে বুস্তন যাহা লিখিয়াছেন, তাহাই হয়ত ঠিক।
বহিঃশত্রুর আক্রমণ সত্ত্বেও, গৌড়াধিপ নয়পাল গৌড়-রাষ্ট্রের মান-মর্য্যাদা- রক্ষায় সমর্থ হইয়াছিলেন। রাজত্বের পঞ্চদশ বর্ষে উৎকীর্ণ, গয়ার কৃষ্ণদ্বারকা-মন্দিরের শিলালিপিতে, তিনি "সমস্ত-ভূমণ্ডল-রাজ্যভার”-বহনকারী বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন।
॥ তৃতীয় বিগ্রহপাল ॥
নয়পালের পুত্র এবং উত্তরাধিকারী তৃতীয় বিগ্রহপাল, তাঁহার রাজত্বের দ্বাদশ কি ত্রয়োদশ বৎসরে উৎকীর্ণ [আমগাছিতে প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে, "শত্রুকুল-কালরুদ্র” এবং "বিষ্ণু অপেক্ষাও অধিক সংগ্রাম-চতুর" বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন। সন্ধ্যাকর নন্দীর "রামচরিতে” তৃতীয় বিগ্রহপালের সংগ্রাম-চতুরতার কথঞ্চিৎ পরিচয় পাওয়া যায়। সন্ধ্যাকর নন্দী লিখিয়াছেন (১/৯):-"বিগ্রহপাল দাহলাধিপতি [কলচুরি] কর্ণকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়াছিলেন, কিন্তু তাঁহাকে উচ্ছ্বলিত করিয়াছিলেন না: তাঁহার দুহিতা যৌবনশ্রীর পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন।” বিবাদপ্রিয় কর্ণই, সম্ভবত নয়পালের মৃত্যুর পর, আবার গৌড়-রাজ্য আক্রমণ করিতে আসিয়া, পরাভূত হইয়া কন্যাদান করিয়া, গৌড়াধিপের প্রীতি অর্জন করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।
কিন্তু তৃতীয় বিগ্রহপালের আমলেই, আর এক বহিঃশত্রু আসিয়া, পালবংশের অধঃপতনের বীজ বপন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। এই অভিনব শত্রু, কল্যাণের * চালুক্যরাজ আহবমল্ল প্রথম সোমেশ্বরের (রাজত্ব ১০৪০- ১০৭১ খৃষ্টাব্দের মধ্যে) দ্বিতীয় পুত্র, বিক্রমাদিত্য। কুমার বিক্রমাদিত্য, পিতার আদেশক্রমে দিগ্বিজয়ে বহির্গত হইয়া, গৌড় এবং কামরূপ আক্রমণ করিয়াছিলেন। বিহলন "বিক্রমাঙ্কদেব-চরিতে” (৩।৭৪) এই দিগ্বিজয়প্রসঙ্গে লিখিয়া গিয়াছেন:-
গায়ন্তি স্ম গৃহীত-গৌড়-বিজয়-স্তস্বেরমস্যাহবে
তস্যোন্সলিত-কামরূপ-নৃপতি-প্রাজ।-প্রতাপশ্রিয়ঃ।
ভানু-স্যন্দন-চক্রঘোষ-ভূষিত-প্রত্যুষনিদ্রারসাঃ
পূর্বাদ্রেঃ কটকেযু সিদ্ধবনিতাঃ প্রালেয়শুদ্ধং যশঃ ॥"+
"সূর্য্যের রথচক্রের শব্দে প্রত্যুষে নিদ্রাভঙ্গ হইলে, সিদ্ধ-বনিতাগণ পূর্ব্বাদ্রির কটিদেশে, যুদ্ধে গৌড়েরবিজয়হস্তী-গ্রহণকারী এবং কামরূপাধিপতির বিপুল-প্রতাপ-উন্মুলনকারী কুমার বিক্রমাদিত্যের তুষারশুভ্র যশ গান করিয়াছিল।"
কুমার বিক্রমাদিত্য, উত্তরকালে যখন "ত্রিভুবনমল্ল পর্মাড়িদেব” উপাধি গ্রহণ করিয়া,কল্যাণের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, (১০৭৭-১১২৫ খৃষ্টাব্দ) তখন বিহ্বলন কাশ্মীর হইতে আসিয়া,তাঁহার সভার "বিদ্যাপতির" বা প্রধান পণ্ডিতের পদলাভ করিয়াছিলেন। বিদ্যাপতি বিহ্বলনের এই গৌড়-কামরূপবিজয়-কাহিনী অক্ষরে অক্ষরে সত্য না হইলেও, একেবারে অমূলক নহে। বিহ্বলন "বিক্রমাদেব-চরিতে” (১৮।১০২) স্বীয় প্রভুকে "কর্ণাটেন্দু” বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন; এবং কহলণ "রাজতরঙ্গিণীতে” (৭।৯৩৬) বিহ্বলনের যে বিবরণ প্রদান করিয়াছেন, তাহাতে "পর্মাড়ি-ভূপতি” বা বিক্রমাদিত্যকে "কর্ণাট” বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। সুতরাং কর্ণাট বলিতে তৎকালে যে কল্যাণের চালুক্যগণের রাজ্য বুঝাইত, এ বিষয়ে আর সংশয় নাই। গৌড়ের সেন-রাজগণের শিলালিপিতে এবং তাম্রশাসনে দেখিতে পাওয়া যায়,-এক সময়ে গৌড়-রাজ্যের একাংশের [রাঢ়ের] সহিত কর্ণাট-রাজ্যের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল। সেনবংশের প্রথম নরপতি বিজয়সেনের দেবপাড়া-প্রশস্তিতে উক্ত হইয়াছে, বিজয়সেনের পিতামহ সামন্তসেন "একাঙ্গ (এক প্রকার) সেনা লইয়া, অরিকুলাকীর্ণ-কর্ণাটলক্ষ্মী-সৃণ্ঠনকারি দুবৃত্ত'গণকে বিনষ্ট করিয়াছিলেন” (৮ শ্লোক); এবং শেষ বয়সে, গঙ্গাতীরবর্তী পুণ্যাশ্রমনিচয়ে বিচরণ করিয়াছিলেন (৯ শ্লোক)। আবার বিজয়সেনের পুত্র বল্লালসেনের [কাটোয়ায় প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে,-"চন্দ্রবংশে অনেক রাজপুত্র জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন;. তাঁহারা সদাচারপালন-খ্যাতিগর্ব্বে রাঢ়দেশকে অননুভূতপূর্ব্ব প্রভাবে বিভূষিত করিয়াছিলেন (৩ শ্লোক)।” এই রাজপুত্রগণের বংশে "শত্রু-সেনা-সাগরের প্রলয়-তপন সামন্তসেন জন্মগ্রহণ করিয়া- ছিলেন (৪ শ্লোক)।” এই উভয় বিবরণে আপাতত বিরোধ দেখা যায়। প্রথম লিপি অনুসারে মনে হয়, সামন্তসেন শেষ বয়সে কর্ণাট ত্যাগ করিয়া, তীর্থভ্রমণ উপলক্ষে, বাঙ্গালায় আসিয়াছিলেন। দ্বিতীয় লিপিতে দেখা যায়, তাঁহার পূর্ব্বপুরুষেরা রাঢ়-নিবাসী ছিলেন। অথচ এই দুইটি লিপি প্রায় একই সময়ে রচিত। এইরূপ তুল্যকালীন লিপিতে এত বিরোধ-কল্পনা অসম্ভব। কিন্তু যদি অনুমান করা যায়, রাঢ়দেশ কর্ণাট-রাজের পদানত ছিল, এবং কর্ণাট-রাজ কর্তৃক রাঢ়-শাসনার্থ নিয়োজিত, [লক্ষ্মণসেনের মাধাইনগরতাম্রশাসনে কথিত] “কর্ণাটক্ষত্রিয়”-বংশজাত রাজপুত্রগণের বংশে সামস্তসেন জন্মগ্রহণ করিয়া রাঢ়দেশেই কর্ণাটরাজের শত্রুগণের সহিত যুদ্ধে রত ছিলেন, 'তাহা হইলে এই বিরোধের ভঞ্জন হয়। বিহলন-বিবৃত চালুক্য-রাজকুমার বিক্রমাদিত্য কর্তৃক গৌড়াধিপের এবং [হয়ত গৌড়াধিপের সাহায্যার্থ আগত] কামরূপাধিপের পরাজয়-বৃত্তান্ত এই অনুমানের অনুকূল প্রমাণরূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে। চন্দেল্ল-রাজ কীত্তিবর্ম্মার (রাজত্ব ১০৪৯-১১০০ খৃষ্টাব্দ) আশ্রিত “প্রবোধ-চন্দ্রোদয়”-রচয়িতা কৃষ্ণমিশ্র যাহাকে "গৌড়ং রাষ্ট্রমনুত্তমং নিরুপমা তত্রাপি রাড়া” বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন, কুমার বিক্রমাদিত্য গৌড়া- ধিপকে পরাজিত করিয়া, সেই রাঢ়দেশ গৌড়-রাষ্ট্র হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া- ছিলেন। নবজিত রাঢ়-শাসনার্থ কর্ণাট-রাজ যে রাজপুত বা ক্ষত্রিয় সেনা- নায়ককে নিয়োগ করিয়াছিলেন, সামন্তসেন তাঁহারই বংশধর। সামন্তসেন একাদশ শতাব্দের চতুর্থপাদে বিদ্যমান ছিলেন, একথা স্বীকার করিলেই, এই অনুমানকে প্রমাণরূপে গ্রহণের আর আপত্তি থাকে না। সামন্তসেন যে একাদশ শতাব্দের শেষপাদেই প্রাদুভূ'ত হইয়াছিলেন, তাহা সেন-রাজগণের কালনির্ণয়প্রসঙ্গে প্রদর্শিত হইবে।
।। রামপাল ।।
মহাপাল, শ্বরপাল, এবং রামপাল; এই তিন পুত্র বর্তমান রাখিয়া, তৃতীয় বিগ্রহপাল পরলোক গমন করিয়াছিলেন। "রামচরিত”-কাব্যে তৃতীয় বিগ্রহপালের পুত্রের এবং পৌত্রগণের রাজত্বের ইতিহাস বর্ণিত হইয়াছে।* "রামচরিত”-রচয়িতা সন্ধ্যাকর নন্দী বরেন্দ্রী-মণ্ডলে "শ্রীপৌণ্ড বর্দ্ধনপুরপ্রতিবদ্ধ" ব্রাহ্মণবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার পিতা প্রজাপতি নন্দী পাল-নরপালের "সান্ধি [বিগ্রহিক] বা সন্ধি এবং যুদ্ধ বিষয়ের উপদেষ্টা ছিলেন। সন্ধ্যাকর "রামচরিতের" উপসংহারে (৪৪৮) প্রার্থনা করিয়াছেন, [ রামপালের দ্বিতীয় পুত্র] রাজা মদন [পাল] "চিরায় রাজ্যং কুরুতাং"। সুতরাং "রামচরিত” তুল্যকালীন কবির রচিত ঐতিহাসিক কাব্য। সন্ধ্যাকর নন্দী "কবি-প্রশস্তিতে" এই কাব্য সম্বন্ধে লিখিয়াছেন-
"অবদানম্ রঘুপরিবৃঢ়-গৌড়াধিপ-রামদেবয়ো রেতৎ।
কলিযুগ-রামায়ণমিহ কবিরপি কলিকাল-বাল্মীকিঃ ॥১১৷৷”
“রঘুপতি রামের এবং গৌড়াধিপ রাম [পালের] এই চরিত কলিযুগের রামায়ণ, এবং [এই কাব্যের] কবিও কলিকালের বাল্মীকি।”
"রামচরিতের” প্রথম পরিচ্ছেদের সমস্ত শ্লোকের (১-৫০) এবং দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের ১-৩৫ শ্লোকের টীকা আছে; কিন্তু অবশিষ্ট অংশের টীকা পাওয়া যায় নাই। কবি মূল শ্লোকে ঐতিহাসিক ঘটনার এরূপ সামান্য আভাস দিয়াছেন যে, টীকা ব্যতীত তাহা বুঝা কঠিন। "রামচরিত হইতে ইতিহাসের উপাদান আহরণে টীকাই আমাদের প্রধান আশ্রয়। সুতরাং যে অংশের টীকা নাই, সেই অংশের ঐতিহাসিক তাৎপর্য্য-গ্রহণ দুঃসাধ্য।
"রামচরিতে” বর্ণিত হইয়াছে-(তৃতীয়) বিগ্রহপাল পরলোক গমন করিলে, (দ্বিতীয়) মহীপাল সিংহাসন লাভ করিয়া, দুষ্কার্য্যরত [অনীতিকারম্ভত] হইয়াছিলেন, এবং কনিষ্ঠ শূরপালকে এবং রামপালকে লৌহ-নিগড়ে নিবদ্ধ করিয়া, কারাগারে নিক্ষেপ করিয়াছিলেন। তখন কৈবর্তজাতীয় দিব্য বা দিব্বোক, যুদ্ধে মহীপালকে নিহত করিয়া, "জনকভূ” বা পালরাজগণের জন্ম-ভূমি বরেন্দ্র অধিকার করিয়াছিলেন (১।২৯, ৩১-৩৯), এবং দিব্বোকের অনুজ রূদোকের পুত্র ভীম বরেন্দ্রীর রাজপদে অধিরূঢ় হইয়াছিলেন (১।৪০)। বরেন্দ্রী ত্যাগ করিয়া, গৌড়-রাজ্যের অন্যান্য প্রদেশের সামন্তগণকে একত্রিত করিবার জন্য, রামপাল রাঢ়-অঙ্গ-মগধাদি প্রদেশ পর্য্যটনে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন; এবং বরেন্দ্রীর অবস্থা পর্য্যবেক্ষণের জন্য, মহাপ্রতীহার শিবরাজকে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ক্রমে সামন্ত-চক্র রামপালের সহিত মিলিত হইয়াছিল। মগধের অন্তর্গত পীঠির রাজা দেবরক্ষিতের পরাভবকারী [ রামপালের মাতুল] রাষ্ট্রকুট-বংশীয় মথন বা মহন সামন্তগণের অগ্রণী ছিলেন। মহনের পুত্র কাহ্নরদেব এবং সুবর্ণদেব, এবং তাঁহার ভ্রাতুষ্পুত্র শিবরাজ, তাঁহার সমভিব্যাহারে ছিলেন (২।৮)। "রামপালচরিতের” টীকাকার সামন্তগণের মধ্যে এই সকলের নামোল্লেখ করিয়াছেন; (২।৫)- কান্যকুজ-রাজের সেনা-পরাভবকারী পীঠিপতি (মগধাধিপ) ভীমযশা, দক্ষিণদেশের রাজা বীরগুণ, উৎকলেশ কর্ণকেশরীর সেনাধ্বংসকারী দণ্ডভুক্তি- ভূপতি জয়সিংহ,দেবগ্রামপতি বিক্রমরাজ, অপর-মন্দারপতি সমস্ত-আরণ্যসামস্তচক্র-চূড়ামণি লক্ষ্মীশ্বর,শূরপাল, তৈলকম্প-পতি রুদ্রশেখর, উচ্ছাল-পতি ময়গলসিংহ,ডেক্করীয়-রাজ প্রতাপসিংহ, কযঙ্গলপতি নরসিংহাজ্জু'ন, সঙ্কটগ্রামীয় চণ্ডাজ্জ্ব'ন, নিদ্রাবলীর বিজয়রাজ, কৌশাস্বীপতি দ্বোরপবন্ধন এবং পদুবন্ব-পতি সোম।
এই মহাবাহিনী লইয়া, রামপাল নৌকায় গঙ্গাপার হইয়াছিলেন। পালরাজের সেনার সহিত কৈবর্ত-রাজের সেনার ভীষণ যুদ্ধ উপস্থিত হইয়াছিল। অবশেষে করিপৃষ্ঠে অবস্থিত ভীম বন্দী হইয়াছিলেন (২।১২-২০)। এই উপলক্ষে সন্ধ্যাকর এক পক্ষে সাগর এবং অপর পক্ষে ভীমের চরিত্রের বর্ণনা করিয়াছেন। শ্লেষের অনুরোধেই হউক, আর সত্যের অনুরোধেই হউক, ভীমের চিত্র উজ্জ্বল বর্ণে অঙ্কিত হইয়াছে। সাগরের ন্যায় ভীমও "লক্ষ্মী এবং সরস্বতী উভয়ের আবাস” বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন। ভীমকে নৃপতি রূপে প্রাপ্ত হইয়া, "বিশ্ব অতিশয় সম্পৎ লাভ করিয়াছিল,” এবং "সজ্জ্বনগণ অযাচিত দান লাভ করিয়াছিল। ভবানীর সহিত ভবানীপতি অধৰ্ম্মত্যাগী রাজা ভীমের উপাস্য দেবতা ছিলেন (২।২১-২৭)।
।। কৈবর্ত-বিদ্রোহ ।।
সন্ধ্যাকর নন্দী-বর্ণিত এই প্রজা-বিদ্রোহের কিছু কিছু আভাস তৎকালের তাম্রশাসনে এবং শিলালিপিতেও পাওয়া যায়। কামরূপের রাজা বৈদ্যদেবের তাম্রশাসনে রামপাল সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে (৪ শ্লোক):-
"যুদ্ধ-সাগর লঙ্ঘন করিয়া, ভামরূপ রাবণ বধ করিয়া, জনকভূ উদ্ধার করিয়া, রামপাল ত্রিজগতে দাশরথি রামের ন্যায় যশ বিস্তার করিয়াছিলেন।"
“রামপালচরিতের” টীকাকারের মতানুসারে, "জনকভূ” বরেন্দ্রী-অর্থে গ্রহণ করিলে, এই শ্লোকেও কৈবর্ত-বিদ্রোহের প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯০৮ সালের মার্চ ,মাসে সারনাথের ভগ্নস্তূপের একাংশ খননকালে আবিষ্কৃত একখানি শিলালিপিতে * "রামপালচরিতে” উল্লিখিত কয়েক জন পাত্রের এবং কোন কোন ঘটনার উল্লেখ দৃষ্ট হয়। কান্যকুজের গহড়বাল-রাজ গোবিন্দচন্দ্রের অন্যতমা মহিষী কুমারদেবী কর্তৃক একটি বৌদ্ধবিহারপ্রতিষ্ঠা-উপলক্ষে এই শিলালিপি উৎকীর্ণ হইয়াছিল। ইহাতে বর্ণিত হইয়াছে, -"পীঠিকা"র বা "পীঠি"র দেবরক্ষিত নামক এক জন রাজা ছিলেন।
“গৌড়েদ্বৈতভটঃ-সকাণ্ড-পটিকঃ ক্ষত্রৈক-চূড়ামণিঃ
প্রখ্যাতো মহণাঙ্গপঃক্ষিতিভুজাম্মান্যো ভবন্মাতুলঃ।
তং জিত্বা মুধি দেবরক্ষিতমধাৎ শ্রীরামপালস্য যো
লক্ষ্মীং নির্জিত-বৈরি-রোধনতয়া দেদীপ্যমানোদয়াম্।"
“গৌড়ে অদ্বিতীয় যোদ্ধা, ধনুর্দ্ধর (?), ক্ষত্রকুলের একমাত্র চূড়ামণি, নরপালগণের সম্মানাই মাতুল, মহন নামক অঙ্গপতি ছিলেন। তিনি দেবরক্ষিতকে পরাজিত করিয়া, শত্রুর বাধা বিদূরিত হওয়ায়, অধিকতর উজ্জ্বল শ্রীরামপালের রাজলক্ষ্মী অক্ষুন্ন রাখিয়াছিলেন।"
"রামপালচরিতে” [২।৮ শ্লোকের টীকায়] রামপালের মাতুল মহন কর্তৃক পীঠীপতি দেবরক্ষিতের পরাজয় উল্লিখিত হইয়াছে। কুমারদেবীর এই শিলালিপির সাহায্যে রামপালের রাজত্বের সময় নিরূপণ করা যাইতে পারে। এই লিপিতে উক্ত হইয়াছে,-মহনদেব শঙ্করদেবী নায়ী দুহিতাকে পীঠীপতির করে অর্পণ করিয়াছিলেন। কুমারদেবী এই শঙ্করদেবীর কন্যা, এবং গোবিন্দচন্দ্রের মহিষী। কুমারদেবী এবং গোবিন্দচন্দ্রের বংশাবলী পাশাপাশি রাখিলে দেখা যায়,-
অর্থাৎ মহনদেব গাহড়বাল-রাজ চন্দ্রদেবের সমকালবর্তী ছিলেন। মহনদেব এবং রামপাল, সম্পর্কে মামা-ভাগিনেয় হইলেও উভয়ে সম্ভবত সমবয়সী ছিলেন। "রামপালচরিতে" উক্ত হইয়াছে (৪।৮-১০ শ্লোক), মহনদেব (মথন) পরলোক গমন করিয়াছেন, শুনিয়া, "মুদিগরিতে” (মুঙ্গেরে) অবস্থিত রামপাল গঙ্গাগর্ভে প্রবেশ করত তনৃত্যাগ করিয়াছিলেন। সুতরাং রামপাল কান্যকুজ-রাজ চন্দ্রদেবের সমসাময়িক, এবং একাদশ শতাব্দের শেষপাদ পর্যন্ত গৌড়-রাজ্যের রাজপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে।
"রামপালচরিতের” যে অংশে ভীমের বন্ধনের পরবর্তী ঘটনা সকল বর্ণিত হইয়াছে, তাহার টীকা নাই। মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের মতানুসারে, ভীম ধৃত হইলে, তদীয় সুহৃৎ হরি, ছত্রভঙ্গ বিদ্রোহী সেনা পুনঃ সম্মিলিত করিয়া, যুদ্ধার্থ অগ্রসর হইয়াছিলেন। ভীষণ যুদ্ধের পর, হরি ধৃত এবং নিহত হইয়াছিলেন। ভীমও সম্ভবত নিহত হইয়াছিলেন। এই রূপে বিদ্রোহানল নির্ব্বাপিত হইলে, পালবংশের জন্মভূমি [জনকভূ] আবার পাল-নরপালের হস্তগত হইয়াছিল।
বিদ্রোহ দমন করিয়া, রামপাল “রামাবতী" নামক এক নূতন নগর নির্মাণ করিয়া, বরেন্দ্রভূমির শোভাবর্দ্ধন করিাছিলেন। তিনি এক দিকে যেমন অভিনব নগর-নির্মাণে রত ছিলেন, আর এক দিকে তেমনি নষ্টপ্রায় গৌড়রাজশক্তির পুনরুজ্জীবন-সাধনে যত্নবান হইয়াছিলেন। সন্ধ্যাকর লিখিয়াছেন, -পূর্ব্বদিকের এক জন নরপতি, পরিত্রাণ পাইবার জন্য, রামপালকে বরবারণ, নিজের রথ এবং বৰ্ম্ম উপহার প্রদান করিয়াছিলেন। যথা-
"স্বপরিত্রাণ-নিমিত্তং পত্যা যঃ প্রান্দিশীয়েন।
বর-বারণেন চ নিজ-ব্যন্দন-দানেন বর্মণারাধে ॥"৩1৪৪
বরেন্দ্রবাসী সন্ধ্যাকর যাঁহাকে "প্রান্দিশীয়” বলিয়াছেন, তিনি সম্ভবত বাঙ্গালার পূর্ব্ব সীমান্তের কোন পার্ব্বত্য-প্রদেশের নৃপতি। রামপাল কামরূপ জয় করিয়া, গৌড়রাষ্ট্রভুক্ত করিয়াছিলেন ["বিগ্রহনির্জিতকামরূপভৃৎ" ]। এই কামরূপ-জয় যে সন্ধ্যাকর নন্দীর কল্পনা-প্রসূত নহে, কুমারপালের প্রসঙ্গে আমরা তাহা দেখিতে পাইব। রামপাল উৎকলে এবং কলিঙ্গেও স্বীয় প্রাধান্য-স্থাপনের চেষ্টা করিয়াছিলেন। সন্ধ্যাকর নন্দী লিখিয়াছেন-
"ভবভূষণ-সন্ততিভুবমনুজগ্রাহ জিতমুৎকলত্রং যঃ।
জগদবতিম্ম সমস্তং কলিঙ্গতস্তান্ নিশাচরান্ নি ন্ ॥" ৩।৪৫ ॥
"ভবভূষণ (চন্দ্রের) সন্ততির রাজ্য উৎকল জয় করিয়া, তৎপ্রতি যিনি অনুগ্রহ করিয়াছিলেন, এবং চৌরগণকে নিহত করিয়া, কলিঙ্গ হইতে আরম্ভ করিয়া সমস্ত জগৎ প্রতিপালন করিয়াছিলেন।"
রামপাল যখন গৌড়ের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত, তখন গঙ্গ-বংশীয় অনন্তবৰ্ম্মা- চোড়গঙ্গ [রাজত্ব ১০৭৮-১১৪২ খৃষ্টাব্দ] কলিঙ্গের রাজা ছিলেন, এবং তিনিই উৎকল অধিকার করিয়াছিলেন। গঙ্গ-বংশীয় নৃপতিগণ চন্দ্রবংশোদ্ভব বলিয়া পরিচিত ছিলেন। সুতরাং এ স্থলে সন্ধ্যাকর নন্দী চোড়-গঙ্গকে স্মরণ করিয়াই, উৎকলকে "ভবভূষণ-সস্তুতিভূ” বলিয়াছেন+ কিন্তু রামপাল কর্তৃক চোড়-গঙ্গের এই পরাজয়-কাহিনী কতদূর সত্য, তাহা নির্ণয় করা কঠিন। গঙ্গ-বংশীয় নৃপতিগণের মধ্যে চোড়-গঙ্গ সর্ব্বাপেক্ষা পরাক্রান্ত ছিলেন। গঙ্গ-বংশীয় নৃপতিগণের তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে,-চোড়-গঙ্গ গঙ্গার তীর পর্য্যন্ত স্বীয় আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন, এবং গঙ্গাতীরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রে "মন্দারাধিপতিকে” পরাজিত এবং আহত করিয়াছিলেন। এই সূত্রেই হয়ত কলিঙ্গ-পতির সহিত গৌড়-পতির সংঘর্ষ উপস্থিত হইয়াছিল, এবং কলিঙ্গ-পতিকে প্রতিদ্বন্দ্বীর অনুগ্রহ প্রার্থনা করিতে হইয়াছিল। চোড়গঙ্গের অতি দীর্ঘকালব্যাপী রাজত্বের প্রথম ভাগে, তাঁহাকে রামপালের সম্মুখীন হইতে হইয়াছিল। সেই সময়, গৌড়াধিপের নিকট মস্তক অবনত করা অসম্ভব নহে; এবং রামপালের মৃত্যুর পর, হয়ত চোড়-গঙ্গ প্রবলতর হইয়াছিলেন। সন্ধ্যাকর নন্দী যে সত্যের অপলাপ করেন নাই, কুমারদেবীর সারনাথের শিলালিপি এবং বৈদ্যদেবের তাম্রশাসন তাহার সাক্ষ্যদান করিতেছে। সুতরাং বর্ণিত রামপালের কলিঙ্গ-জয়-কাহিনী অমূলক বলিয়া উপেক্ষিত হইতে পারে না। রাঢ়ও অবশ্য রামপাল কর্ণাট-রাজের কবল হইতে উদ্ধার করিয়াছিলেন। দেবপাড়ার শিলালিপি-অনুসারে, সামন্তসেন যে সকল কর্ণাটলক্ষ্মী-লুণ্ঠনকারী দুর্বৃত্তগণকে বিনষ্ট করিয়াছিলেন, তাহারা গৌড়াধিপেরই সেনা। সামন্তসেন এই সকল "দুবৃত্তগণকে” বিনাশ করিয়াও, রাঢ়ে কর্ণাট-রাজ্যের আধিপত্য অটুট রাখিতে না পারিয়া, হয়ত শেষ বয়সে বানপ্রস্থ অবলম্বন করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।
বরেন্দ্রভূমির বিদ্রোহানল নির্ব্বাণ করিয়া, এবং কামরূপ ও কলিঙ্গে আধিপত্য বিস্তার করিয়া, রামপাল যে গৌড়রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন, সেই অভিনব গৌড়রাষ্ট্রের সহিত রামপালের পূর্ব্বপুরুষগণের শাসিত গৌড়রাষ্ট্রের অনেক প্রভেদ ছিল। প্রজাসাধারণের নির্বাচিত গৌড়াধিপ গোপালের গৌড়রাষ্ট্র, প্রজার প্রীতির এবং প্রজাশক্তির সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু হতভাগ্য দ্বিতীয় মহীপালের "অনীতিকারম্ভের” ফলে, এবং দিব্বোক-নিয়ন্ত্রিত বিদ্রোহানলে, সেই ভিত্তি ভস্মীভূত হইয়া গিয়াছিল। রামপালের পক্ষে, গৌড়রাজ্যের বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পুনরায় একত্রিত করিয়া; উহার পুনর্গঠন সম্ভব হইলেও, সেই দেহে প্রাণপ্রতিষ্ঠা,সেই ভগ্ন অট্টালিকার বহিরঙ্গের সংস্কার সম্ভব হইলেও, -উহার নষ্টভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা, অসম্ভব হইয়াছিল। সুতরাং রামপালের মৃত্যুর পরই, আবার রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশে, বিদ্রোহ উপস্থিত হইল। কিন্তু রামপালের জ্যেষ্ঠ পুত্র "গৌড়েশ্বর" কুমারপালের, এবং তাঁহার প্রধান-সচিব এবং সেনাপতি, বৈদ্যদেবের বাহুবলে, গৌড়রাষ্ট্রের পতন আরও কিছু কালের জন্য স্থগিত রহিল। বৈদ্যদেবের [কমৌলিতে প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে বৈদ্যদেব কর্তৃক [অনুত্তর বঙ্গে] দক্ষিণবঙ্গে, নৌ-যুদ্ধে জয়লাভ-প্রসঙ্গে, পুনরায় বিদ্রোহ সুচিত হইয়াছে (১১ শ্লোক)। এই সময়ে কামরূপের সামন্ত-নরপতিও বিদ্রোহাচরণ করিয়াছিলেন। বৈদ্যদেবের তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে-
"পূর্ব্বদিগ্বিভাগে বহুমান-প্রাপ্ত তিম্্যদেব-নৃপতির বিদ্রোহ-বিকার শ্রবণ করিয়া, গৌড়েশ্বর তাঁহার রাজ্যে এইরূপ [গুণগ্রাম-সমন্বিত] বিপুল কীর্তিসম্পন্ন বৈদ্যদেবকে নরেশ্বর-পদে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। সাক্ষাৎ মার্তণ্ডবিক্রম বিজয়শীল সেই বৈদ্যদেব [আপন] তেজস্বী প্রভুর আজ্ঞাকে মাল্যদানের ন্যায় মস্তকে ধারণ করিয়া, কতিপয় দিবসের দ্রুত-রণযাত্রার [অবসানে] নিজ ভুজবলে সেই অবনিপতিকে যুদ্ধে পরাভূত করিবার পর, [তদীয় রাজ্যে] মহীপতি হইয়াছিলেন (১৩-১৪ শ্লোক)।"
॥ মদনপাল ॥
কুমারপালের মৃত্যুর পর তদীয় পুত্র [তৃতীয়] গোপাল গৌড়সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন। মদনপালের তাম্রশাসন (১৭ শ্লোক) পাঠে অনুমান হয়,-তৃতীয় গোপাল যখন রাজ্যভার প্রাপ্ত হন, তখনও তিনি শৈশবের সীমা অতিক্রম করেন নাই। সন্ধ্যাকর নন্দী লিখিয়াছেন-
"অপি শত্রুঘ্নোপায়াদ্গাপালঃ স্বর্জগাম তৎসূনুঃ।"
"তাঁহার [কুমারপালের] পুত্র গোপাল শত্রুষ্মোপায়-হেতু স্বর্গ গমন করিয়াছিলেন।”
"শত্রুঘ্নোপায়ের” [শত্রুহননকারীর উপায়ের] উল্লেখ দেখিয়া মনে হয়, তৃতীয় গোপাল, যুদ্ধে বা ঘাতুকের হস্তে নিহত হইয়াছিলেন। তাঁহার মৃত্যুর পর, রামপালের [মদনদেবীর গর্ভজাত] পুত্র মদনপাল সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন। মদনপালের রাজ্যের অষ্টম বৎসরে সম্পাদিত [মনহলিতে প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে, প্রশস্তিকার (১৮ শ্লোক) তাঁহার শৌর্য্যবীর্য্যের কোন পরিচয় দেন নাই। ইহাতে অনুমান হয়, মদনপাল তাঁহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা কুমারপালের বা পিতা রামপালের ন্যায় সমরকুশল ছিলেন না। রাজা দুর্ব্বল হইলে, পতনোম্মুখ রাজ্যের যে অবস্থা হয়, মদনপালের সময় গৌড়রাষ্ট্রেরও তাহাই ঘটিয়াছিল। গৌড়রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশ গৌড়পতির হস্তচ্যুত হইতে আরম্ভ হইয়াছিল। কমৌলীতে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে বৈদ্যদেবকে "মহারাজা- ধিরাজ-পরমেশ্বর-পরমভট্টারক” উপাধিতে ভূষিত দেখিয়া মনে হয়, বৈদ্যদেব কামরূপে স্বাতন্ত্র্য অবলম্বন করিয়াছিলেন।
বৈদ্যদেবের তাম্রশাসনের একটি শ্লোকের সাহায্যে, কুমারপালের এবং মদনপালের কাল নিরূপিত হইতে পারে। এই তাম্রশাসনের ২৮ শ্লোকে উক্ত হইয়াছে,-"মহারাজ বৈদ্যদেব বৈশাখে বিয়ুবৎ-সংক্রান্তিতে একাদশী তিথিতে” ভূমিদান করিয়াছিলেন। শ্রীযুত আর্থার ভিনিস্ দেখাইয়াছেন, [১০৬০ হইতে ১১৬১ খৃষ্টাব্দের মধ্যে] ১০৭৭, ১০৯৬, ১১২৩, ১১৪২ এবং ১১৬১ খৃষ্টাব্দে একাদশী তিথিতে, এবং ১১১৫ এবং ১১৩৪ খৃষ্টাব্দে দ্বাদশী তিথিতে মেষসংক্রান্তি হইয়াছিল।* এই সকল সালের মধ্যে, কোনও সালে বৈদ্যদেবের তাম্রশাসন উৎকীর্ণ হইয়াছিল। যে যুক্তি-পরম্পরা অবলম্বন করিয়া, ভিনিস্ সাল (১১৪২ খৃঃ-অঃ) নির্ব্বাচন করিয়াছেন, তাহা আর এখন গ্রাহ্য হইতে পারে না। কারণ, কুমরদেবীর সারনাথের শিলালিপি প্রতিপাদন করিতেছে -রামপাল খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দের শেষপাদে গৌড়-সিংহাসনে আসীন ছিলেন। সুতরাং, রামপালের উত্তরাধিকারী কুমারপালের রাজত্ব দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে স্থাপন করিতে হইবে। কুমারপাল যে দীর্ঘজীবী হইয়াছিলেন, বা দীর্ঘকাল রাজত্ব করিয়াছিলেন, এরূপ বোধ হয় না। কারণ, তাঁহার মৃত্যুকালে, তাঁহার উত্তরাধিকারী তৃতীয় গোপাল শৈশবের সাঁমা অতিক্রম করিয়াছিলেন না। সুতরাং ১১১৫ খৃষ্টাব্দে বৈদ্যদেবের তাম্রশাসন সম্পাদিত হইয়াছিল, এরূপ মনে করাই সঙ্গত। এই তাম্রশাসন "সং ৪" বা বৈদ্যদেবের কামরূপে রাজত্বের চতুর্থ বৎসরে সম্পাদিত হইয়াছিল। কুমারপাল বৈদ্যদেবকে হয়ত ১১১২ খৃষ্টাব্দে কামরূপের রাজপদে নিযুক্ত করিয়াছিলেন, এবং কুমারপালের মৃত্যুর এবং তৃতীয় গোপালের হত্যার পরে, [আনুমানিক ১১১৪ খৃষ্টাব্দে] মদনপাল সিংহাসন লাভ করিয়াছিলেন। কুমারপালের পরই বৈদ্যদেব স্বাধীনতা অবলম্বন করিয়া থাকিবেন।
বৈদ্যদেবের তাম্রশাসন ১১৪২ খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত বলিয়া মনে করিবার আরও একটি কারণ ভিনিস্ কর্তৃক সূচিত হইয়াছে। তিনি লিখিয়াছেন,-এই লিপির "অক্ষরের সহিত বিজয়সেনের দেবপাড়া-লিপির অক্ষরের সাদৃশ্য আছে; কিন্তু (বিজয়সেনের লিপির অক্ষরের অপেক্ষা এই লিপির অক্ষরের) বর্তমান বঙ্গাক্ষরের সহিত সাদৃশ্য আরও অধিক।" বিজয়সেনের লিপির অক্ষরের সহিত বৈদ্যদেবের তাম্রশাসনের অক্ষর মিলাইলে, কথাটা ঠিক বলিয়া মনে হয় না।** দেবপাড়ার শিলালিপির ত, ন, ম, র এবং স বর্তমান বঙ্গাক্ষরের অনুরূপ; কিন্তু বৈদ্যদেবের তাম্রশাসনের ত, ন, ম, র এবং স পুরাতন চঙ্গের। সুতরাং অক্ষরের হিসাবে, বৈদ্যদেবের তাম্রশাসনকে দেব- পাড়ার শিলালিপির কিছুকাল পূর্ব্বে স্থাপন না করিয়া উপায় নাই। খৃষ্টীয় দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দে, বর্তমান বঙ্গাক্ষরের উদ্ভবকালে, যে লিপিতে আধুনিক বঙ্গাক্ষরের সংখ্যা যত বেশী লক্ষিত হয়, সেই লিপিকে তত আধুনিক মনে করাই সঙ্গত।
লক্ষ্মীসরাইয়ের নিকটবর্তী জয়নগর গ্রামে প্রাপ্ত একখানি শিলাখণ্ডে “ষে ধর্মা" ইত্যাদি বৌদ্ধমন্ত্র এবং “শ্রীমন্ মদনপালদেব-রাজ্যে সম্বৎ ১৯ আশ্বিন ৩০” উৎকীর্ণ রহিয়াছে।। মদনপালের রাজ্যের ১৯ সম্বতের বা ১১৩১ খৃষ্টাব্দের পূর্ব্বেই, সম্ভবত বর্ম্মণ-বংশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে, বঙ্গ স্বাতন্ত্র্য অবলম্বন করিয়াছিল, এবং সামন্তসেনের পৌত্র বিজয়সেন গৌড়রাষ্ট্রের কেন্দ্র বরেন্দ্রমণ্ডলে সেনরাজ্যের ভিত্তিস্থাপনের উদ্যোগ করিতেছিলেন।
॥ গোবিন্দপাল ॥
মগধে আবিষ্কৃত শিলালিপিতে মহেন্দ্রপাল এবং গোবিন্দপাল নামক আরও দুই জন পাল-নরপালের পরিচয় পাওয়া যায়। শিলালিপিতে এবং তাম্রশাসনে প্রত্যেক পাল-নরপালের নামের অন্তে, 'দেব'-শব্দ দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু যে দুইখানি শিলালিপিতে মহেন্দ্রপালের নাম উল্লিখিত হইয়াছে, তাহার কোন খানিতেই মহেন্দ্রপালকে "মহেন্দ্রপালদেব” বলা হয় নাই। ইহাতে মনে হয়, মহেন্দ্রপাল পাল-নরপালগণের বংশ-সম্ভত এবং তাঁহাদের স্থলবর্তী নাও হইতে পারেন। কিন্তু গোবিন্দপালের যে পরিচয় পাওয়া যায়, তাহা হইতে অনুমান হয়, তিনি পাল-রাজগণের বংশোদ্ভব এবং পালবংশের শেষ নৃপতি। নেপাল হইতে সংগৃহীত এবং লণ্ডনের রয়াল এসিয়াটিক্ সোসাইটীর পুস্তকালয়ে রক্ষিত একখানি হস্তলিখিত "অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞা- পারমিতা” গ্রন্থের সমাপ্তি-বাক্যের পরে লিখিত আছে,-"পরমেশ্বর-পরমভট্টারক-পরমসৌগত মহারাজাধিরাজ-শ্রীমদেগাবিন্দপালবিজয়-রাজ্য-সম্বৎ ৪।" এই পুস্তকের লেখায় ব্যবহৃত অক্ষরের মধ্যে ত, ন, ম এবং র দেবপাড়ার শিলালিপির ত, ন, ম এবং র-এর মত বর্তমান বঙ্গাক্ষরের চঙ্গের। গয়ার একখানি শিলালিপি হইতে গোবিন্দপালের রাজ্যের অবসানকাল নিরূপণ করা যায়। এই শিলালিপির সম্পাদন-কাল সম্বন্ধে উল্লিখিত হইয়াছে,-"সম্বৎ ১২৩২ বিকারি-সম্বৎসরে শ্রীগোবিন্দপালদেব-গতরাজ্যে চতুৰ্দ্দশ-সম্বৎসরে গয়ায়াং ॥”* ১২৩২ বিক্রম-সম্বৎ বা ১১৭৫ খৃষ্টাব্দের চতুৰ্দ্দশ বৎসর পূর্ব্বে, অর্থাৎ ১১৬১ খৃষ্টাব্দে, গোবিন্দপালের রাজত্বের অবসান হইয়াছিল। গোবিন্দপাল বা তাঁহার পূর্ব্ববর্তী নৃপতি হয়ত বিজয়সেন কর্তৃক বরেন্দ্র হইতে তাড়িত হইয়া, মগধে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। ১২০২ বিক্রম-সম্বতে [১১৪৬ খৃষ্টাব্দে] কান্যকুজেশ্বর গোবিন্দচন্দ্র মগধ আক্রমণ করিয়াছিলেন। কারণ, গোবিন্দচন্দ্রের এই সালের একখানি তাম্রশাসনো উল্লিখিত হইয়াছে, উহা মুদ্গগিরি বা মুঙ্গেরে সম্পাদিত হইয়াছিল। নেপাল হইতে সংগৃহীত এবং কেম্বি জ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুস্তকালয়ে রক্ষিত একখানি হস্ত-লিখিত পুস্তকের উপসংহারে লিখিত আছে,-"পরমেশ্বরেত্যাদি রাজাবলী পূর্ব্ববং শ্রীমদ্গোবিন্দপাল-দেবানাং বিনষ্টরাজ্যে অষ্টত্রিংশৎ সম্বৎসরেভিলিখ্যমানো।" এ স্থলে বিনষ্ট-রাজ্যের উল্লেখ দেখিয়া অনুমান হয়, কোনও শত্রুকর্তৃক গোবিন্দপাল রাজ্যচ্যুত হইয়াছিলেন। গোবিন্দপালের রাজ্য-নষ্টকারী সম্ভবত বিজয়সেনের পুত্র বল্লালসেন। গোবিন্দপালের রাজ্যনাশের ১৪ এবং ৩৮ বৎসর পরেও, তাঁহার বিনষ্ট বা গতরাজ্যের হিসাবে, সাল-গণনার প্রচলন দেখিয়া মনে হয়, যিনি গোবিন্দপালের রাজ্য নষ্ট করিয়াছিলেন, তিনি সেই স্থলে স্বীয় আধিপত্য সুদৃঢ়রূপে প্রতিষ্ঠিত করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন না। তিনি ভাঙ্গিতে পারিয়াছিলেন বটে, কিন্তু নূতন করিয়া গড়িবার অবসর পাইয়া- ছিলেন না। এই জন্ম্যই বিজেতার বিজয়-রাজ্যের সম্বৎসর প্রচলিত হইয়াছিল না; বিজিত গোবিন্দপালের বিনষ্ট রাজ্যের সম্বৎসরই প্রচলিত ছিল।
যে দুইটি স্বতন্ত্র রাজবংশ অভ্যুদিত হইয়া, পাল-রাজবংশ উন্মুলিত করিয়াছিল, তন্মধ্যে বঙ্গের বর্ম্মা-বংশ পূর্ব্বতন এবং প্রথম উল্লেখযোগ্য। বৰ্ম্মা- বংশের ইতিবৃত্ত-সঙ্কলনকারীর প্রধান অবলম্বন হরিবর্মার তাম্রশাসন, এবং হরিবর্মার ও তাঁহার পুত্রের মন্ত্রী ভট্ট-ভবদেব-বালবলভীভুজঙ্গের ভুবনেশ্বরের প্রশস্তি। হরিবর্ম্মার তাম্রশাসনের পশ্চাদাগের অস্পষ্ট প্রতিকৃতি এবং তাহার একটি আনুমানিক পাঠ মাত্রই প্রকাশিত হইয়াছে।§ এই অংশ হইতে জানিতে পারা যায়-"বিক্রমপুর-সমাবাসিত শ্রীমজ্জয়স্কন্ধাবার হইতে মহারাজা- ধিরাজ-জ্যোতিবর্ম্ম-পাদানুধ্যাত-পরমবৈষ্ণব-পরমেশ্বর-পরমভট্টারক-মহারাজা- ধিরাজ-শ্রীহরিবর্ম্মদেব” ভূমিদান করিতেছেন। ভট্ট-ভবদেব-বালবলভী ভুজঙ্গের প্রশস্তিতে উক্ত হইয়াছে,-সাবর্ণমুনির বংশধর শ্রোত্রিয়গণ যে সকল গ্রামে বাস করিতেন, তন্মধ্যে রাড়া বা রাঢ়দেশের অলঙ্কার সিদ্ধলগ্রাম সর্ব্বাগ্রগণ্য। এই গ্রামের একটি সমুন্নত বংশে (প্রথম) ভবদেব জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি গৌড়নৃপ হইতে হস্তিনীভিট্ট নামক গ্রাম প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। এই ভবদেবের পুত্র রথাঙ্গ। রথাঙ্গের পুত্র অত্যঙ্গ। অত্যঙ্গের পুত্র স্ফুরিত-বুধ। স্ফুরিত-বুধের পুত্র আদিদেব। আদিদেব বঙ্গরাজের মহামন্ত্রী-মহাপাত্র-সন্ধিবিগ্রহী ছিলেন। আদিদেবের পুত্র গোবর্দ্ধন। গোবর্দ্ধন জনৈক বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণের দুহিতার [সাঙ্গোকার] পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন। গোবর্দ্ধন এবং সাঙ্গোকার পুত্র ভবদেব-বালবলভীভুজঙ্গ দীর্ঘকাল হরিবর্ম্মদেবের মন্ত্রী ছিলেন, এবং পরে হরিবর্ম্মদেবের পুত্রেরও মন্ত্রিপদারূঢ় ছিলেন। এই দ্বিতীয় ভবদেব রাঢ়দেশে একটি জলাশয় খনন করাইয়াছিলেন; এবং ভুবনেশ্বরে মন্দির নির্মাণ করাইয়া, সেই মন্দিরে নারায়ণ, অনন্ত এবং নৃসিংহমূর্তি স্থাপিত করিয়াছিলেন।
॥ আদিশূর ॥
এই প্রশস্তি যে কেবল বর্ম্ম-রাজবংশের এবং দ্বাদশ শতাব্দীর রাঢ়-বঙ্গের একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশের ঐতিহাসিক ক্ষেত্রে আলোক দান করে এমন নহে, ইহা বাঙ্গালার ইতিহাসের আরও একটি গুরুতর প্রশ্নের মীমাংসার সহায়তা করে। এই গুরুতর প্রশ্ন,- আদিশূর ঐতিহাসিক ব্যক্তি কি না? আদিশ্বর নামক যে প্রকৃত একজন রাজা ছিলেন, এ বিষয়ে কেহ কখনও সন্দেহ করেন নাই। আদিশ্বর কখন্ কোন্ স্থানে রাজত্ব করিয়া গিয়াছেন, এই কথা লইয়াই বহু দিন বাদানুবাদ চলিতেছে। কিন্তু ভট্ট-ভবদেবের ভুবনেশ্বরের প্রশন্তি পাঠ করিলে, আদিশূরের অস্তিত্ব সম্বন্ধেই সন্দেহ উপস্থিত হয় “গৌড়রাজমালায়” আদিশূর স্থান পাইতে পারেন কি না, এ স্থলে একথার মীমাংসার যত্ন করা কর্তব্য। সুতরাং, প্রক্রমভঙ্গ হইলেও, এখানে সেই প্রশ্নের বিচারের পর, বর্ম্ম-বংশের ইতিহাস আলোচিত হইবে।
কুলপঞ্জিকা বা ঐ শ্রেণীর গ্রন্থ ভিন্ন, আর কোথাও আদিশূরের পরিচয় পাওয়া যায় না। এখন যে সকল কুলপঞ্জিকা দেখা যায়, তাহা আদিশূরের আনুমানিক আবির্ভাব-কালের অনেক পরে রচিত। পরবর্তী কালের রচনা হইতে ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ করিতে হইলে, বিশেষ সাবধানতা আবশ্যক। যে পরবর্তী কালের গ্রন্থে তুল্যকালীন গ্রন্থোক্ত প্রমাণ উদ্ধৃত থাকে, তাহাই কেবল ইতিহাসের উপাদানের ভাণ্ডাররূপে গৃহীত হইতে পারে। কুলগ্রন্থনিচয়ে উল্লিখিত আদিশূর রাজার বিবরণ যে সেরূপ প্রমাণ অবলম্বনে সঙ্কলিত, তাহা এযাবং কেহই প্রতিপাদন করিতে পারেন নাই। কারণ, আদিশূরের সময়ের কোন চিহ্নই এখনও পাওয়া যায় নাই। অনেকে বলিতে পারেন, কুলপঞ্জিকার আদিশূর রাজার বিবরণ প্রত্যক্ষ প্রমাণমূলক না হইলেও, জনশ্রুতিমূলক, এবং জনশ্রুতির যদি ইতিহাসে স্থানলাভ করিবার অধিকার থাকে, তবে আদিশূর রাজার বিবরণ ইতিহাসে স্থান পাইবে না কেন? জনশ্রুতিমাত্রই যে প্রামাণ্য এবং ঐতিহাসিকের নিকট আদরণীয়, এমন নহে। যে জনশ্রুতি প্রবল এবং প্রত্যক্ষ-প্রমাণের অবিরোধী, তাহাই ঐতিহাসিকের বিবেচ্য, এবং যে প্রবল জনশ্রুতি প্রত্যক্ষ প্রমাণের অনুকূল, তাহাই ইতিহাসে স্থান লাভের যোগ্য।
এখন আদিশূর সম্বন্ধীয় জনশ্রুতির পরীক্ষা করিয়া দেখা যাউক্, উহার ঐতিহাসিকতা কত দূর। রাঢ়ীয় কুলজ্ঞগণের মধ্যে প্রচলিত আদিশূর সম্বন্ধীয় জনশ্রুতি নিম্নোক্ত শ্লোকটিতে বিনিবদ্ধ আছে-
"আসীৎ পুরা মহারাজ আদিশূর প্রতাপবান্।
আনীতবান্ দ্বিজান্ পঞ্চ পঞ্চগোত্র-সমুদ্ভবান্ ॥"*
এখানে পাওয়া গেল,-আদিশূর ছিলেন (আসীৎ)। বারেন্দ্র কুলজ্ঞগণের গ্রন্থে আরও কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। তাঁহারা আদিশূরের এবং বল্লালসেনের সম্বন্ধ নিরূপণ করিয়াছেন। যথা-
"জাতো বল্লালসেনো গুণী-গণিতস্তস্য দৌহিত্র-বংশে।"
"আদিশূর রাজা পঞ্চগোত্রে পঞ্চব্রাহ্মণ আনয়ন করিলেন [পঞ্চব্রাহ্মণের পরিচয়] এহি পঞ্চগোত্রে পঞ্চব্রাহ্মণ সংস্থাপন করিয়া আদিশূর রাজার সর্গারোহণ ॥ তদন্তে কিছুকালান্তর তত দহিত্র কুলেত উদ্ভব হইলেন বল্লালসেন [বল্লালসেন কর্তৃক কুলমর্য্যাদা স্থাপন এবং রাঢ়ী ও বারেন্দ্রবিভাগ] ইত্যবকাশে অন্যান্য দেশীয় রাজাসকল ব্রাহ্মণহীন দেশ বিবেচনা করিয়া বল্লালসেনের নিকট ব্রাহ্মণ যাচিঞা করিয়া কহিলেন সুনহে বল্লালসেন তোমার মাতামহ কুলোদ্ভব আদিশূর পঞ্চগোত্রে পঞ্চব্রাহ্মণ আনয়ন করিয়া গৌড়মণ্ডল পবিত্র করিয়াছেন। আমরা যবনাক্রান্ত দেশে বাস করি আমারদিগের দেশে কিঞ্চিৎ ব্রাহ্মণ প্রেরণ করিয়া আমাদিগের দেশ পবিত্র করি।”*
আদিশূর সম্বন্ধে যে সকল জনশ্রুতি প্রচলিত আছে, তন্মধ্যে এইটিই সর্ব্বাপেক্ষা প্রবল। কুলজ্ঞগণের মুখ্য উদ্দেশ্য ইতিহাস-সঙ্কলন নহে, বংশাবলী- রক্ষা। বংশাবলী অনুসারে হিসাব করিলে, আদিশ্বরের যে সময় নির্ধারিত হয়, তাহার সহিত এই জনশ্রুতির সামঞ্জস্য করা যাইতে পারে। "গৌড়ে ব্রাহ্মণ”- কার বারেন্দ্র-ব্রাহ্মণগণ সম্বন্ধে লিখিয়াছেন,।-শাণ্ডিল্য-গোত্রীয় বর্তমান ব্যক্তির পুরুষ সংখ্যা ভট্টনারায়ণ হইতে ৩৬।৩৭ এবং ৩৮ পুরুষ, কাশ্যপগোত্রে ৩১।৩২।৩৩া৩৪ পুরুষ, ভরদ্বাজগোত্রে ৩৫ হইতে ৩৯ পুরুষ, কিন্তু বাৎস্যগোত্রে ২৫ হইতে ২৮ পুরুষ দৃষ্ট হয়।” রাঢ়ীয় সমাজে ৩৫ হইতে উর্দ্ধতন পর্যায়ের লোক বিরল। বাৎস্যগোত্র ছাড়িয়া দিলে, বর্তমান কালকে আদিশূর-আনীত ব্রাহ্মণগণের কাল হইতে গড়পড়তায় ৩৪।৩৫ পুরুষের কাল বলা যাইতে পারে। প্রতি পুরুষে ২৫ বৎসর ধরিয়া লইলে, আদিশূর ৮৫০ বৎসর পূর্ব্বে [১০৬০ খৃষ্টাব্দে] বর্তমান ছিলেন, এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে। এই অনুমান, "বেদবাণাঙ্ক-শাকেতু গোঁড়ে বিপ্রাঃ সমাগতাঃ” [৯৫৪ শাকে বা ১০৩২ খৃষ্টাব্দে গৌড়ে ব্রাহ্মণগণ আগমন করিয়াছিলেন। এই কিম্বদন্তীর বিরোধী নহে এবং তৃতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বকালে কর্ণাট-রাজকুমার বিক্রমাদিত্যের সহিত বল্লালসেনের পূর্ব্বপুরুষের গৌড়ে আগমনকালের সহিত ঠিকঠাক মিলিয়া যায়। প্রথম রাজেন্দ্রচোলের তিরুমলয়-লিপিতে দক্ষিণরাঢ়ের অধিপতি রণশূরের পরিচয় পাওয়া গিয়াছে। আদিশূরকে রণশূরের পুত্র বা পৌত্র ধরিয়া লইলে, কোন গোলই থাকে না।
॥ ভট্ট ভবদেব ॥
ভুবনেশ্বরের প্রশস্তিতে উল্লিখিত ভট্টভবদেবের বংশ-বৃত্তান্তের সহিত আদিশুর কর্তৃক ব্রাহ্মণানয়ন-বৃত্তান্তের সামঞ্জস্য অসম্ভব। ভবদেব সাবর্ণ-গোত্রীয়, তাঁহার পূর্ব্বপুরুষগণ সিদ্ধলগ্রামবাসী, এবং তাঁহার জননী বন্দ্যঘটী-বংশীয়া ছিলেন। সুতরাং ভবদেব যে রাঢ়িশ্রেণীর ব্রাহ্মণ ছিলেন, তদ্বিষয়ে আর সংশয় হইতে পারে না। প্রশস্তির রচয়িতা, ভবদেবের সুহৃদ বাচস্পতি, যে ইদানীন্তনকালের ঘটকগণের অপেক্ষা ভবদেেবের পূর্ব্বপুরুষগণসম্বন্ধে অনেক অধিক খবর রাখিতেন, এ কথা অস্বীকার করা যায় না। প্রশস্তিতে ভবদেব-বালবলভীভুজঙ্গকে ধরিয়া, সাত পুরুষের বিবরণ আছে। প্রশস্তিতে উল্লিখিত প্রথম ভবদেব খৃষ্টীয় দশম শতাব্দের শেষপাদে বর্তমান ছিলেন, এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে; এবং এই প্রথম ভবদের যে গৌড়নৃপ হইতে হস্তিনীভিট্টগ্রাম প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, তিনি সম্ভবত প্রথম মহীপাল। বাচস্পতি যে ভাবে প্রশস্তির সুচনায় সিদ্ধলগ্রামবাসী সাবর্ণগোত্রীয় ব্রাহ্মণগণের প্রসঙ্গের অবতারণা করিয়াছেন, তাহাতে মনে হয়, যেন স্মরণাতীত কাল হইতে সাবর্ণগোত্রীয় শ্রোত্রিয়েরা তথায় বাস করিতেছিলেন। এখন যেমন সাবর্ণগোত্রীয় রাঢ়ীয়-বারেন্দ্র ব্রাহ্মণমাত্রই আদিশূর-আনীত বেদগর্ভ বা পরাশর হইতে বংশপরিচয় দিয়া থাকেন, তখন এই প্রবাদ প্রচলিত থাকিলে, বাচস্পতি বোধ হয় প্রিয়-সুহৃদের প্রশস্তিতে তাহার উল্লেখ করিতে বিস্মৃত হইতেন না। ভবদেবের ভুবনেশ্বরের প্রশস্তিতে আদিশূর কর্তৃক সাবর্ণগোত্রীয় ব্রাহ্মণ আনয়নের প্রতিকূল প্রমাণ দেখিয়া, আদিশূর-বৃত্তান্তের ঐতিহাসিকতা সম্বন্ধে ঘোর সংশয় উপস্থিত হয়। যত দিন না কোনও তাম্রশাসন বা শিলালিপি দ্বারা এই সংশয় অপসারিত হয়, ততদিন পরস্পরবিরোধী কুলশাস্ত্রের প্রমাণ অবলম্বনে, আদিশূরের ইতিহাস-উদ্ধারের যত্ন বিড়ম্বনামাত্র।
ভবদের-বালবলভীভুজঙ্গের অতিবৃদ্ধ-বৃদ্ধ-প্রপিতামহ প্রথম ভবদেবের সময়ে, রাঢ় গৌড়রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত এবং গৌড়-নৃপের পদানত ছিল, এবং প্রথম ভবদেব গৌড়-নৃপের প্রসাদে হস্তিনীভিট্টগ্রাম লাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু ভবদেবের পিতামহ আদিদেবের সময়ে, রাঢ়ে-বঙ্গে "বঙ্গরাজের” প্রাধান্য স্থাপিত হইয়াছিল, এবং আদিদেব তাঁহার সন্ধিবিগ্রহী ছিলেন। ভট্ট গুরবের এবং বৈদ্যদেবের বংশবৃত্তান্ত হইতে জানা যায়, তৎকালে মন্ত্রিপদ বংশানুগত ছিল। আদিদেব যে বঙ্গ-রাজের সন্ধিবিগ্রহী ছিলেন, তিনি সম্ভবত হরিবর্ম্মদেবের পিতা (?) জ্যোতিবৰ্ম্মা। জ্যোতিবৰ্ম্মা হয়ত গৌড়েশ্বর কুমারপালের সময়ে, দক্ষিণ বঙ্গে স্বাতন্ত্র্য অবলম্বনে যত্নবান্ হইয়াছিলেন, এবং তাঁহার দমনার্থ প্রেরিত বৈদ্যদেব কর্তৃক নৌ-যুদ্ধে পরাভূত হইয়াছিলেন। কুমারপালের মৃত্যুর পর, জ্যোতিবর্মার অভিলাষপূরণের আর কোন বাধা ছিল না। আদিদেবের পুত্র গোবর্দ্ধন যুদ্ধক্ষেত্রে [বীরস্থলীয়ু] বাহুবলে রাজ্য বিস্তার করিয়াছিলেন [বর্দ্ধয়ন্ বসুমতীং; ] বলিয়া কথিত হইয়াছেন; কিন্তু তিনি কখন মন্ত্রিপদ লাভ করিয়াছিলেন, এরূপ কোন প্রমাণ নাই। গোবর্দ্ধন হয়ত জ্যোতিবৰ্ম্মা বা হরিবর্ম্মার একজন সেনানায়ক ছিলেন, এবং পিতার জীবদ্দশায় পরলোক গমন করায়, মন্ত্রিপদে উন্নীত হইবার অবসর পাইয়াছিলেন না। সুতরাং আদিদেবের মৃত্যুর পর ভট্টভবদেব বালবলভী- ভূজঙ্গ হরিবর্ম্মার মন্ত্রিপদ লাভ করিয়াছিলেন; এবং হরিবর্ম্মার মৃত্যুর পর, তাঁহার অনুল্লিখিতনামা পুত্রের এবং উত্তরাধিকারীর সময়েও, সেই পদেই অধিষ্ঠিত ছিলেন। প্রশস্তিকার বাচস্পতি ১৮টি শ্লোকে ভবদেব বালবলভী- ভুজঙ্গের গুণগ্রামের এবং কৗর্তিকলাপের বর্ণন করিয়াছেন; তিনি কি কি গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন, তাহারও পরিচয় দিয়াছেন কিন্তু ভবদেবের বাহুবলে এবং নীতিকৌশলে তাঁহার প্রভুর রাজ্য কতটা উন্নতি এবং বিস্তৃতি লাভ করিয়াছিল, এই সুদীর্ঘ প্রশস্তিমধ্যে তাহার কোনও উল্লেখ নাই। ইহাতে অনুমান হয়, সেনবংশের অভ্যুদয়ের পর, ভবদেব স্বীয় প্রভুকে সেনবংশীয় গৌড়াধিপের অধীনতা স্বীকারে উপদেশ দিয়া, স্বয়ং অগস্ত্যবৎ বৌদ্ধাম্ভোনিধি-গণ্ডুষকরণে, পাষণ্ড-তার্কিক-দলনে, এবং স্মৃতি, জ্যোতিষ, এবং মীমাংসা-শাস্ত্রের চর্চ্চায়, মনোনিবেশ করিয়াছিলেন।
॥ বিজয়সেন ॥
বর্ম্মবংশের অভ্যুদয় এবং মদনপালের দুর্ব্বলতা নিবন্ধন গৌড়রাষ্ট্র যখন বিশৃঙ্খল হইয়া পড়িয়াছিল, তখন সামন্তসেনের পৌত্র [হেমন্তসেন ও রাজ্ঞী যশোদেবীর পুত্র] বিজয়সেন বরেন্দ্রভূমিতে একটি স্বতন্ত্র রাজ্যের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। হেমন্তসেন একজন বড যোদ্ধা ছিলেন। কিন্তু তিনি বাহুবলে গৌড়রাজ্যের কোন অংশ করতলগত করিতে পারিয়াছিলেন কি না, তাহা বলা যায় না। হেমন্তসেনের পুত্র বিজয়সেন, রাঢ়ে এবং বঙ্গে, বর্ম্ম-রাজের সহিত প্রতিযোগিতা করিতে অসমর্থ হইয়াই, সম্ভবত দ্বীয় অভিলাষ চরিতার্থ করিবার জন্য, বরেন্দ্র-অভিমুখে ধাবিত হইয়াছিলেন। অথবা হেমস্তসেনই হয়ত বরেন্দ্রে আশ্রয় লইয়াছিলেন, এবং পরে সুযোগ পাইয়া, বিজয়সেন তথায় স্বতন্ত্র রাজ্য-স্থাপনে ব্রতী হইয়াছিলেন। বল্লালসেন "দানসাগরের" ভূমিকায় লিখিয়া গিয়াছেন-
"তদনু বিজয়সেনঃ প্রাদুরাসীৎ বরেন্দ্রে”
"(হেমন্তসেনের) পর বিজয়সেন বরেন্দ্রে প্রাদুভূ'ত হইয়াছিলেন।"
বিজয়সেনের অভ্যুদয়কাল সম্বন্ধে পণ্ডিতগণের মধ্যে অনেক মতভেদ আছে। কিল্হর্ণের অনুসরণ করিয়া সামন্তসেনকে খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দীর চতুর্থ পাদে, হেমন্তসেনকে দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথম পাদে, এবং বিজয়সেনকে দ্বিতীয় পাদে [আনুমানিক ১১২৫-১১৫০ খৃষ্টাব্দে] স্থাপিত করা যাইতে পারে। এ পর্য্যন্ত আর কোন লেখক এই মত গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া জানি না, এবং কিল্হর্ণও তাঁহার মতের অনুকূল মুক্তিগুলি বিস্তৃতভাবে উল্লেখ করিয়া যাইতে পারেন নাই।
প্রধানতঃ দুইটি প্রমাণ-বলে, খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দের চতুর্থপাদ বিজয়সেনের অভ্যুদয়কাল বলিয়া নিরূপিত হইয়াছে। বিজয়সেনের দেবপাড়া প্রশস্তিতে (২১ শ্লোক) উক্ত হইয়াছে, তিনি "নান্য” নামক নৃপতিকে কারারুদ্ধ করিয়াছিলেন। নেপালের রাজা জয়প্রতাপমল্লের কাটামৃণ্ডুতে প্রাপ্ত ১৬৪৯ খৃষ্টাব্দের [৭৬৯ নেপালী-সম্বতের]শিলালিপিতে উল্লিখিত মিথিলার এবং নেপালের "কার্ণাটক"-বংশীয় রাজগণের বংশ-তালিকায় এক "নান্যদেব" উক্ত বংশের আদিপুরুষরূপে উল্লিখিত হইয়াছেন।* জন্মণির প্রাচ্যবিদ্যানুশীলনসমিতির পুস্তকালয়ে রক্ষিত একখানি পুঁথিতে নান্যদেব [১০১৯ শকে ১০৯৭ খৃষ্টাব্দে] বর্তমান ছিলেন বলিয়া প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রত্নবিদ্গণ দেবপাড়া প্রশস্তির "নান্য” এবং কর্ণাটক-বংশের আদিপুরুষ "নান্যদেব"কে অভিন্ন মনে করিয়া থাকেন। এই মত গ্রহণ করিলেও, একাদশ শতাব্দের শের পাদে বিজয়সেনের রাজত্বকাল নিরূপণ অনাবশ্যক; পরন্তু নান্যদেব দ্বাদশ শতাব্দের দ্বিতীয় পাদ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন; এবং সেই সময়ে, বিজয়সেনের সহিত তাঁহার বিরোধ উপস্থিত হইয়াছিল, এরূপ মনে করিবার যথেষ্ট কারণ আছে। কর্ণাটক-বংশীয় নৃপতিগণের বংশ-তালিকা-অনুসারে নেপাল-বিজয়ী হরিসিংহ নান্যদেব হইতে অধস্তন সপ্তম পুরুষ। হরিসিংহের মন্ত্রী চণ্ডেশ্বর ঠকুরের সংগৃহীত "বিবাদ-রত্নাকরের” মঙ্গলাচরণ হইতে জানা যায়, হরিসিংহ ১২৩৯ শকাব্দে [১৩১৭ খৃষ্টাব্দে] জীবিত ছিলেন। সুতরাং, প্রতি পুরুষ গড়ে ২৫ বৎসর হিসাবে, হরিসিংহের উর্দ্ধতন সপ্তম পুরুষ নান্যদেব, মোটামুটী ১১৫০ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত জীবিত ছিলেন, এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে। গৌড়রাষ্ট্রের সেই অধঃপতনের সময়, কর্ণাটক্ষত্রিয়-বংশোদ্ভব বিজয়সেন বরেন্দ্রে যে কার্য্য-সাধনে উদ্যোগী হইয়াছিলেন, অপর একজন কর্ণাট-ক্ষত্রিয়, নান্যদেব, পূর্ব্বাবধিই মিথিলায় সেই কার্য্যেই ব্রতী হইয়াছিলেন। সুতরাং নূতন ব্রতী বিজয়সেনের সহিত পুরাতন ব্রতী নান্যদেবের সংঘর্ষ স্বাভাবিক।
দ্বিতীয় প্রমাণ লক্ষ্মণ-সম্বৎ। কিলহর্ণ স্থির করিয়াছেন,-১১১৯ খৃষ্টাব্দের অক্টাবর মাস হইতে এই সম্বতের গণনা আরম্ভ হইয়াছিল; এবং তিনি দেবপাড়া-প্রশস্তির ভূমিকায় মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছিলেন যে, লক্ষ্মণসেনের রাজত্বের আরম্ভ হইতে এই সম্বৎ-গণনার আরম্ভ হয়। আবুল ফজলের "আকবর-নামা”-রচনার সময়েও, লক্ষ্মণ-সম্বতের উৎপত্তি সম্বন্ধে এইরূপ কিম্বদন্তী প্রচলিত ছিল। সুতরাং লক্ষ্মণসেনের পিতামহ বিজয়সেন অবশ্য একাদশ শতাব্দের শেষপাদে রাজত্ব করিয়াছিলেন। কিন্তু বল্লালসেন-রচিত দানসাগর-নামক নিবন্ধে উল্লিখিত হইয়াছে-॥
"নিখিল-চক্রতিলক-শ্রীমদ্বল্লালসেনেন পূর্ণে
শশি-নব-দশমিতে শক-বর্ষে দানসাগরো রচিতঃ।”
অর্থাৎ ১০৯১ শকাব্দ (১১৬৯ খৃষ্টাব্দ) পূর্ণ হইলে, বল্লালসেন "দানসাগর” রচনা করিয়াছিলেন।
ডাক্তার ভাণ্ডারকার বোম্বাই-প্রদেশে সংগৃহীত বল্লালসেন-রচিত "অদ্ভুত সাগরের” যে বিবরণ প্রকাশ করিয়াছেন, তাহাতে উল্লিখিত হইয়াছে,- বল্লালসেন 'শাকে খ-নব-খেন্ব্দে” [১০৯০ শকাব্দে = ১১৬৮ খৃষ্টাব্দে] "অদ্ভুত সাগর” আরম্ভ করিয়াছিলেন।* বোধ হয় এই নিমিত্ত কিহর্ণ পূর্ব্ব মত পরিত্যাগ করিয়া, লক্ষ্মণসেনের রাজত্ব খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দের শেষ পাদে এবং বল্লালসেনের রাজত্ব তৃতীয় পাদে নির্দ্দেশ করিয়া গিয়াছেন।+ শ্রীযুত মনোমোহন চক্রবর্তী মহাশয় অদ্ভুত সাগর হইতে বল্লালসেনের রাজ্যাভিষেকের কালও আবিষ্কৃত করিয়াছেন।: অদ্ভুতসাগরের, "সপ্তর্ষীনামদ্ভুতানি”- প্রকরণে লিখিত আছে, -"ভুজ-বসু-দশ মিতে (১০৮১) শকে শ্রীমদ্বল্লাসেনরাজ্যাদৌ” ইত্যাদি। ইহাতে ১০৮১ শক (১১৫৯ খৃষ্টাব্দ) বল্লালসেনের রাজত্বের প্রথম বৎসর রূপে নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে।
॥ দানসাগরের রচনাকাল ॥
শ্রীযুত রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় "দানসাগরের” এবং "অদ্ভুত সাগরের” রচনা কাল-বিজ্ঞাপক শ্লোক প্রামাণ্য রূপে গৃহীত হইতে পারে না বলিয়া মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন। তাঁহার এরূপ মনে করিবার প্রথম কারণ, -"দানসাগরের” এবং "অদ্ভুতসাগরের” যে সকল পুঁথিতে কাল-বিজ্ঞাপক শ্লোক আছে, তাহা অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালে লিপিবদ্ধ হইয়াছে; এবং উহা ছাড়া, এই গ্রন্থের আরও কয়েকখানি প্রতিলিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহাতে এই সকল শ্লোক নাই। সুতরাং, উভয় গ্রন্থের কাল-বিজ্ঞাপক শ্লোক পরবর্তী কালে প্রক্ষিপ্ত হওয়া সম্ভব।
আর এক হিসাবে দেখিতে গেলে, ঠিক বিপরীত সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে হয়। "দানসাগর” স্মৃতি-নিবন্ধ, এবং "অদ্ভূত সাগর” জ্যোতিষের নিবন্ধ। যাঁহারা স্মৃতি বা জ্যোতিষ শাস্ত্রের অনুশীলন করিতেন, তাঁহারাই এই সকল পুস্তকের প্রতিলিপি প্রস্তুত করিতেন বা করাইতেন। স্মৃতি, জ্যোতিষ প্রভৃতি শাস্ত্রের অনুশীলনকারিগণ, গ্রন্থকারের জীবনী সম্বন্ধে বা গ্রন্থের রচনাকাল সম্বন্ধে, চিরকালই উদাসীন। সুতরাং, কোন কোন লিপিকর, অনাবশ্যক বোধে, আদর্শ পুস্তকের কাল-বিজ্ঞাপক বচন পরিত্যাগ করিয়া থাকিতে পারেন। সেই জন্ম্য সকল পুস্তকে এই বচন দৃষ্ট হয় না।
এসিয়াটিক্ সোসাইটির পুস্তকালয়ে যে "অদ্ভুত সাগরের” পুঁথি আছে, তাহার মঙ্গলাচরণের সহিত ভাণ্ডারকার-বণিত পুথির মঙ্গলাচরণের তুলনা করিলে, এইরূপ সিদ্ধান্তই যুক্তিযুক্ত বিবেচিত হয়। বোম্বাইএর পুথির মঙ্গলাচরণের প্রথম নয়টি শ্লোকে, সেনরাজ-বংশ, গ্রন্থকার বল্লালসেন, এবং তাঁহার সহযোগী শ্রীনিবাস প্রশংশিত হইয়াছেন। এসিয়াটিক্ সোসাইটির পুঁথিতে, এই নয়টি শ্লোকের পাঁচটি মাত্র দৃষ্ট হয়; ২, ৩, ৪ এবং ৬ নং শ্লোক একেবারে পরিত্যক্ত হইয়াছে। বোম্বাইএর পুস্তকে এই নয়টি শ্লোকের পরে, সাতটি শ্লোকে, যে যে মূল গ্রন্থ হইতে "অদ্ভুত সাগরের” বচন-প্রমাণ উদ্ধৃত হইয়াছে, তাহাদের তালিকা প্রদত্ত হইয়াছে; এবং তৎপরে আর দ্বাদশটি শ্লোকে গ্রন্থের আলোচ্য বিষয় সংক্ষেপে উক্ত হইয়াছে। এইরূপ তালিকা এবং বিষয়-সূচী অনেক নিবন্ধেই দৃষ্ট হয়। কিন্তু এসিয়াটিক্ সোসাইটির পুঁথির ভূমিকায় এই ১৯টি শ্লোকের একটিও স্থানলাভ করে নাই। এই সকল শ্লোকেও কি তবে প্রক্ষিপ্ত? বিষয়-সূচীর পর, বোম্ব।ইএর পুঁথিতে নিম্নোক্ত শ্লোক তিনটি আছে-
"শাকে খ-নব-খেংদ্বব্দে আরেভেদ্ভূতসাগরং।
গৌড়েন্দ্র-কুংঞ্জরালান-স্তংভবাহুর্মহীপতিঃ ॥ ১॥
গ্রংন্থেস্মিনসমাপ্ত এব তনয়ং আম্রাজ্যরক্ষা-মহা-
দীক্ষাপর্বণি দীক্ষণান্নিজকৃতের্নিষ্পত্তিমভ্যর্থ সঃ।
নানাদান-চিতাংবু-সংচলনতঃ সূৰ্য্যাত্মজা-সংগমং
গঙ্গায়াং বিরচয্য নির্জরপুরং ভাৰ্যানুযাতো গতঃ ॥ ২॥
শ্রীমল্লক্ষণসেন-ভূপতিরতিল্লাঘ্যো যদুদ্যোগতো
নিষ্পন্নোদ্ভূতসাগরঃ কৃতি রসৌ বল্লাল-ভূমীভুজঃ।
খাতঃ কেবলমন্ত্রবঃ (?) সগরজ-স্তোমস্য তৎ পুরণ
প্রাবাণ্যেন ভগীরথ স্ত ভুবনেষদ্যাপি বিদ্যোততে ॥ ৩॥
মর্মানুবাদ-রাজা বল্লালসেন ১০৯০ শাকে "অদ্ভুতসাগরের” আরম্ভ করিয়াছিলেন (১)। তিনি এই গ্রন্থ অসমাপ্ত রাখিয়া, এবং তনয়ের উপর সমাপ্ত করিবার ভার অর্পণ করিয়া স্বর্গারোহণ করিয়াছিলেন (২)। লক্ষ্মণসেনের উদ্যোগে "অদ্ভুতসাগর” সমাপ্ত হইয়াছিল (৩)।
এই তিনটি শ্লোক একসূত্রে গ্রথিত। ইহার একটি ফেলিয়া, আর একটি রাখিবার উপায় নাই। কিন্তু এসিয়াটিক্ সোসাইটির পুথিতে তাহাই করা হইয়াছে। প্রথম দুটি পরিত্যক্ত এবং তৃতীয়টি মাত্র লিপিবদ্ধ হইয়াছে। এ অবস্থায়, 'শাকে খ-নব খেংদ্বব্দে” ইত্যাদি শ্লোকটিকে প্রক্ষিপ্ত বলা যায় না। রাখালবাবুর দ্বিতায় যুক্তি, -বোধগয়ার দুইখানি শিলালিপির উপসংহারে আছে-
"শ্রীমল্লখুণসেনস্যাতীতরাজ্যে সং ৫১ ভাদ্র দিনে ২৯"
"শ্রীমল্লক্ষ্মণসেন-দেবপাদানা-মতীতবাজ্যে সং ৭৪ বৈশাখা-বদি ১২ গুরৌ ॥'
"শ্রীমল্লক্ষ্মণসেনস্যাতীতরাজ্যে সং ৫১"-ইহার অর্থ লক্ষ্মণসেনের রাজ্য লুপ্ত হওয়ার পর হইতে গণিত ৫১ সম্বতে, অথবা লক্ষ্মণসেনের রাজ্যলাভ হইতে গণিত ৫১ সম্বতে, অথচ লক্ষ্মণসেনের রাজ্য লোপের পরে। কিল্হর্ণ এক সময় শেষোক্ত অর্থ গ্রহণ করিয়া, সং ৫১= ১১২০ + ৫১ = ১২৭১ খৃষ্টাব্দ ধরিয়াছিলেন। রাখালবাবু এই অর্থ ই বজায় রাখিতে যত্ন করিয়াছেন। এখানে শব্দার্থ লইয়া কাট্যাং কুট্যাং না করিয়া, এই মাত্র বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, এই দুইখানি বোধগয়ার লিপির অক্ষরের, [বিশেষতঃ প এবং দএর] সহিত গয়ার ১২৩২ সম্বতের (১:৭৫ খৃষ্টাব্দের) গোবিন্দপালদেবের গতরাজ্যের চতুৰ্দ্দশ সম্বৎসরের শিলা-লিপির, অথবা বিশ্বরূপসেনের তাম্রশাসনেরা প এবং দ অক্ষরের তুলনা করিলে দেখিতে পাওয়া যায়,- ১২৩২ সম্বতের গয়ার লিপির এবং বিশ্বরূপসেনের তাম্রশাসনের প এবং দ পুরাতন নাগরীর ঢঙ্গের; পক্ষান্তরে, আলোচ্য বোধগয়ার লিপিদ্বয়ের প এবং দ বর্তমান বাঙ্গলা প এবং দ এর মত। ঠিক এই প্রকারের প এবং দ চট্টগ্রামে প্রাপ্ত ১১৬৫ শকাব্দের [১২৪৩ খৃষ্টাব্দের] তাম্রশাসনে § দেখিতে পাওয়া যায়। দ্বাদশ শতাব্দের শেষ ভাগে গৌড়-মণ্ডলে পুরাতন নাগরী চঙ্গের প এবং দ-ই যে প্রচলিত ছিল, বল্লভদেবের "শকে নগ-নভো-রুদ্রৈঃ সংখ্যাতে” অর্থাৎ ১১০৭ শকের (১১৮৪-৮৫ খৃষ্টাব্দের) আসামের তাম্রশাসন তাহার সাক্ষ্যদান করিতেছে।। সুতরাং "শ্রীমল্লক্ষ্মণসেনষ্যাতীতরাজ্যে সং ৫১” ১১৭১ খৃষ্টাব্দরূপে গ্রহণ না করিয়া, আনুমানিক ১২০০ খৃষ্টাব্দে লক্ষ্মণসেনের মৃত্যু ধরিয়া,] ১২৫১ খৃষ্টাব্দ বলিয়া গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত। এই সিদ্ধান্তের এক আপত্তি আছে। লক্ষ্মণসেনের "অতীতরাজ্য" হইতে কোন সম্বৎ প্রচলিত হইবার প্রমাণ নাই। উত্তরে বলা যাইতে পারে-গোবিন্দপালদেবের "গতরাজ্য” বা "বিনষ্টরাজ্য” হইতেও কোন সম্বৎ প্রচলিত নাই। পক্ষান্তরে গোবিন্দপালদেবের রাজ্যলাভ হইতেও কোন সম্বৎ প্রচলিত হওয়ার প্রমাণ নাই। "গতরাজ্যে" "অতীতরাজ্যে” বা "বিনষ্টরাজ্যে” প্রভৃতিবিশেষণ-পদের এইরূপ অর্থ প্রতিভাত হয়-গোবিন্দপালদেবের রাজ্যলোপের পরে, মগধে অরাজকতা উপস্থিত হইয়াছিল; লক্ষ্মণ-সেনের রাজ্যলোপের পরেও মগধে অরাজকতা উপস্থিত হইয়াছিল। তখন মগধে কেহ "প্রবর্দ্ধমান-বিজয়রাজ্য” প্রতিষ্ঠিত করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন না; অথবা যিনি মগধ করায়ত্ত করিয়াছিলেন, মগধবাসিগণ তাঁহাকে তখনও অধিপতি বলিয়া স্বীকার করিতে প্রস্তুত ছিলেন না। এই নিমিত্ত "গতরাজ্যের” বা "অতীত রাজ্যের” সম্বৎ-গণনা প্রচলিত হইয়া থাকিবে। এই সম্পর্কে আর একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হইতে পারে,-লক্ষ্মণসম্বতের সূচনা এবং প্রচলন হইল কবে হইতে? পুত্র বিশ্বরূপসেনের সময়ে লক্ষ্মণ-সম্বৎ প্রচলিত ছিল না। বিশ্বরূপসেনের (কেশবসেনের?) ইদিলপুরের তাম্রশাসনের সম্পাদন-কাল "সং ৩ জ্যৈষ্ঠ দিনে-" এবং মদনপাড়ে প্রাপ্ত তাম্রশাসনের সম্পাদন-কাল, সং ১৪ আশ্বিনদিনে ১॥” পাল এবং সেনরাজগণের সময় গৌড়-মণ্ডলে শকাব্দ বা বিক্রম-সম্বৎ প্রচার লাভ করিয়াছিল না, নৃপতিগণের বিজয়-রাজ্যের সম্বৎসরই প্রচলিত ছিল। পাল এবং সেনবংশের রাজ্য-নষ্টের পর, কিছুদিন "বিনষ্টরাজ্যের” বা "অতীতরাজ্যের” সম্বৎ ব্যবহৃত হইয়াছিল। তাহার পরে, প্রচলিত অব্দের অভাব পুরণের জন্য, "লক্ষ্মণাব্দ” উদ্ভাবিত হইয়া থাকিবে।
॥ বিজয়সেন ॥
লক্ষণাব্দের মূল যাহাই হউক, আমরা কুমারদেবীর সারনাথ-লিপিতে, রামপালচরিতে, বৈদ্যদেবের এবং মদনপালের তাম্রশাসনে, বরেন্দ্রদেশের যে ইতিহাস প্রাপ্ত হই, তাহার উপর নির্ভর করিতে গেলে, দ্বাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় পাদের পূর্ব্বে বিজয়সেন কর্তৃক বরেন্দ্রে স্বাধান রাজ্যের প্রতিষ্ঠা একেবারে অসম্ভব বোধ হয়। বিজয়সেন যখন বরেন্দ্রে স্বাধীনতা অবলম্বনে উদ্যত হইয়াছিলেন, তখন প্রথমেই অবশ্য তাঁহার সহিত গৌড়পতি পাল-নরপালের সংঘর্ষ উপস্থিত হইয়াছিল। দেবপাড়ার প্রশস্তিতে উক্ত হইয়াছে,-বিজয়সেন "গৌড়েন্দ্রকে সবলে আক্রমণ” করিয়াছিলেন (২০ শ্লোক)। সম্ভবত এই আক্রমণের ফলেই "গৌড়েন্দ্র” বরেন্দ্র ত্যাগ করিয়া, মগধে আশ্রয় গ্রহণ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। তৎপর প্রতিবেশী নৃপতিমাত্রই হয়ত তাঁহার প্রতিকূলতাচরণে উদ্যত হইয়াছিলেন। কাৰ্যত না হউক, নামতঃ কামরূপরাজ এবং কলিঙ্গ-রাজ, গৌড়েশ্বরের অনুগত ছিলেন। গৌড়েন্দ্রকে বরেন্দ্র হইতে বিতাড়িত হইতে দেখিয়া, হয়ত তাঁহারা বিদ্রোহী বিজয়সেনকে আক্রমণ করিয়াছিলেন। প্রশস্তিকার উমাপতিধর লিখিয়াছেন-বিজয়সেন "কামরূপভূপকে দমন করিয়াছিলেন, এবং কলিঙ্গ [রাজকে] পরাজিত করিয়া- ছিলেন (২০)।” মিথিলাপতি নান্যদেব বিজয়সেনকে আক্রমণ করিতে আসিয়া, ধৃত এবং কারারুদ্ধ হইয়াছিলেন। উমাপতিধর লিখিয়াছেন,-বিজয়সেন নান্য বাতীত রাঘব, বর্দ্ধন, এবং বীর নামক আরও তিনজন নৃপতিকে কারারুদ্ধ করিয়াছিলেন (২১ শ্লোক)। গৌড়রাষ্ট্রের পশ্চিমাংশ ["পাশ্চাত্য-চক্র] জয় করিবার জন্য, তিনি যে "নৌবিতান” প্রেরণ করিয়াছিলেন, তাহা অধিকদূর অগ্রসর হইতে পারিয়াছিল বলিয়া বোধ হয় না (২২ শ্লোক)। দক্ষিণ দিকে, বঙ্গে এবং রাঢ়ে, বর্ম্মরাজ কর্তৃক বিজয়সেনের গতি রুদ্ধ হইয়াছিল। কিন্তু বরেন্দ্রে বিজয়সেনের আধিপত্য বদ্ধমূল হইয়াছিল, এবং সেখানে তিনি অনেক লোকহিতকর কার্য্যের অনুষ্ঠানের অবসর পাইয়াছিলেন। উমাপতিধর লিখিয়া গিয়াছেন,-বিজয়সেন অনেক "উত্তঙ্গ দেবমন্দির” এবং "বিস্তীর্ণ (বিতত) তল্প" প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। বিজয়সেন-প্রতিষ্ঠিত প্রদ্ব্যুয়েশ্বরমন্দিরের ভগ্নাবশেষ এবং তাঁহার রাজধানী-[জনশ্রুতির "বিজয়রাজার বাড়ী” ]-বিজয়নগর বরেন্দ্রভূমির দক্ষিণ-পশ্চিম কোনে অবস্থিত! উমাপতিধর-বিরচিত বিজয়সেনের প্রশস্তি-সম্বলিত শিলা-ফলক বরেন্দ্রের অন্তর্গত দেবপাড়ায় আবিষ্কৃত হইয়াছিল।
॥ বল্লালসেন ॥
বিজয়সেনের পুত্র এবং উত্তরাধিকারী [বল্লালসেন] পিতৃ-সিংহাসনে আরোহণ করিয়া, সমগ্র গৌড়রাষ্ট্র করায়ত্ত করিতে যত্নবান হইয়াছিলেন। বিজয়সেন পালবংশজ "গৌড়েন্দ্র”কে আক্রমণ করিয়াই ক্ষান্ত হইয়াছিলেন। বল্লালসেন, স্বীয় অভীষ্ট সাধনের জন্য, পাল-রাজবংশ উন্মুলিত করিতে কৃতসঙ্কল্প হইয়াছিলেন। ১১৬১ খ্রীষ্টাব্দে গোবিন্দপালদেব সম্ভবত বল্লালসেন কর্তৃকই রাজ্যভ্রষ্ট হইয়াছিলেন। বর্ম্মরাজকে পদচ্যুত বা পদানত করিয়া, নল্লালসেন বঙ্গে এবং রাঢ়ে স্বীয় আধিপত্য বিস্তৃত কবিয়াছিলেন। রাজত্বের "বং ১১ বৈশাখদিনে ১৬" সম্পাদিত, [কাটোয়ার নিকটে প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে তাঁহার বঙ্গ এবং রাঢ় অধিকারের পরিচয় পাওয়া যায়। এই তাম্রশাসন "শ্রীবিক্রমপুর-সমাবাসিত শ্রীমজ্জয়স্কন্ধাবারে” সম্পাদিত হইয়াছিল, এবং এতদ্বারা “শ্রীবর্দ্ধমান-ভুক্তান্তঃপাতী উত্তররাড়া-মণ্ডলের” ভূমি দান করা হইয়াছিল। বল্লালসেন সম্ভবত কলিঙ্গ-রাজ্যও আক্রমণ করিয়াছিলেন। রক্ষ্মণসেনের মাধাইনগরে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে-লক্ষ্মণসেন "কলিঙ্গ-রমণীগণের সহিত কৌমার-কেলি করিয়াছিলেন।” ইহার অর্থ এই, -লক্ষ্মণসেন যখন যুবরাজ, তখন পিতার সহিত অথবা পিতার আদেশানুসারে, কলিঙ্গ আক্রমণ করিয়াছিলেন।
১১৫৯ খ্রীষ্টাব্দে বল্লালসেনের রাজ্যলাভ ধরিলে, "সং ১১" [কাটোয়ার তাম্রশাসনের সম্পাদনকাল] ১১৬৯ খৃষ্টাব্দে নির্দ্ধারিত হইতে পারে। এই বৎসর বল্লালসেন "দানসাগর” সঙ্কলিত করিয়াছিলেন, এবং ইহার পূর্ব্ব বৎসর, "অদ্ভুতসাগরের” সঙ্কলন আরম্ভ করিয়া, তাহা সমাপ্ত না হইতেই, স্বর্গারোহণ করিয়াছিলেন। ইহাতে অনুমান হয়,-"দানসাগর” সঙ্কলিত হওয়ার [১১৬৯ খৃষ্টাব্দের] পরে, বল্লালসেন বড় অধিক দিন জীবিত ছিলেন না। "দানসাগরের” মঙ্গলাচরণে তিনি আপনাকে "গৌড়েশ্বর” বলিয়াছেন। পরবর্তী-কালের গৌড়রাষ্ট্রের ইতিহাস আলোচনা করিলে প্রতীয়মান হয়,- বল্লালসেন গৌড়রাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিহীন করিতে সমর্থ হইলেও, দ্বাদশ কি ত্রয়োদশ বর্ষস্থায়ী রাজত্বকালে,-বিস্তীর্ণ গৌড়-মণ্ডলের বিভিন্ন অংশ সম্পূর্ণরূপে করায়ত্ত করিবার-গৌড়রাষ্ট্র পুনরায় সুগঠিত এবং এককেন্দ্রীভূত করিবারঅবসর পাইয়াছিলেন না।
॥ লক্ষ্মণসেন ॥
বল্লালসেন যে গৌড়রাষ্ট্র-পুনর্গঠনব্রত অসমাপ্ত অবস্থায় রাখিয়া, পরলোক গমন করিয়াছিলেন, তাঁহার পুত্র লক্ষ্মণসেন তাহা সমাপ্ত করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন না। লক্ষ্মণসেনের এই অক্ষমতাই গৌড়ের সর্ব্বনাশের কারণ। লক্ষ্মণসেন পিতৃপিতামহের আরব্ধ কার্য্য সুসম্পন্ন করিতে যত্নের ত্রুটি করেন নাই; কিন্তু দেশ-কাল-পাত্র কিছুই সে মহদনুষ্ঠানের উপযোাগী ছিল না। লক্ষ্মণসেনের, ধৰ্ম্মপাল-মহীপাল-রামপালের তুল্য প্রতিভা ছিল না। প্রজাপুঞ্জের নির্ব্বাচিত [বহুকাল গৌড়সিংহাসনের অধিকারী] গোপালের বংশধরগণকে গৌড়জন যেরূপ ভক্তি-নেত্রে দেখিতেন, বিদেশাগত পালরাজকুল-উন্মুলনকারী বিজয়সেনের এবং বল্লালসেনের উত্তরাধিকারী লক্ষ্মণসেন সেরূপ ভক্তি লাভ করিতে পারিয়াছিলেন না। সেকাল আর একালে প্রভেদও অনেক ছিল। বরেন্দ্রের বিদ্রোহে গৌড়ের প্রজাশক্তি এবং রাজশক্তি এই উভয়ের মধ্যে যে ভেদ উপস্থিত হইয়াছিল, কর্ণাটাগত সেনবংশের অভুদেয়ে, তাহ। আরও বৃদ্ধি পাইয়াছিল; এবং "মাংস্য-ন্যায়” নিবারণের, অথবা "অনীতিকারম্ভের" প্রতীকারের অধিকার বিস্মৃত হইয়া গৌড়জন কালস্রোতে গা ঢালিয়া দিয়াছিলেন। মহম্মদ-ই-বতিয়ারের অভ্যুদয় গৌড়ের সর্ব্বনাশের মৃল বা সর্ব্বনাশের ফল বলিয়া কথিত হইতে পারে না; বিজয়সেনের অভ্যুদয়ই গৌডের সর্ব্বনাশের প্রকৃত মূল বা ফল বলিয়া কথিত হইতে পারে।
গৌড়াধিপ লক্ষ্মণসেনও অবশ্যই কলিঙ্গ-পতি এবং কামরূপ-পতিকে বশীভূত রাখিতে যত্ন করিয়াছিলেন; এবং ১১৪২ খৃষ্টাব্দে গোবিন্দচন্দ্রের আক্রমণ-মূলে কান্যকুজেশ্বরের মগধের উপর যে দাবী জন্মিয়াছিল, তাহার নিকাশ করিবার জন্য, কান্যকুজেশ্বরের সহিতও যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। মাধাইনগরে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে লক্ষ্মণসেন "বিক্রম-বশীকৃত-কামরূপঃ” বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন। লক্ষ্মণসেনের সময়, গৌড়-সেনা যে কামরূপ আক্রমণ করিয়াছিল, তৎসম্পর্কে অপর পক্ষও সাক্ষ্যদান করিতেছে। আসামে প্রাপ্ত কুমার বল্লভদেবের ১১০৭ শক-সম্বতের [১১৮৪-৮৫ খৃষ্টাব্দের] তাম্রশাসন হইতে জানা যায়, বল্লভদেবের পিতামহ রায়ারিদেব-ত্রৈলোকাসিংহের সময়, গৌড়সেনা কামরূপ আক্রমণ করিয়াছিল। এই শাসনে উক্ত হইয়াছে- "ভাস্কর-বংশীয় নৃপ-শিরোমণি রায়ারিদেব বঙ্গের মহাকায় করি-নিচয়ের উপস্থিতি-নিবন্ধন-ভয়াবহ সমরোৎসবে শত্রুগণকে অস্ত্র চালনা পরিত্যাগ করিতে বাধ্য করিয়াছিলেন (৫ শ্লোক)।” রায়ারিদেব গৌড়-সেনা পরাজিত করিয়াছিলেন, এ কথা এখানে স্পষ্ট বলা হয় নাই। সুতরাং মাধাইনগরতাম্রশাসনে উক্ত-"বিক্রম-বশীকৃতকামরূপঃ”-নিরর্থক না হইতেও পারে।
লক্ষ্মণসেনের এবং বিশ্বরূপসেনের প্রশস্তিকার, লক্ষ্মণসেন কর্তৃ'ক কাশি- রাজের (কান্যকুজ-রাজের) এবং কলিঙ্গ-রাজেরও পরাজয়ের উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। মাধাইনগরের তাম্রশাসনে ক্ষোদিত রহিয়াছে,-"তিনি সমরক্ষেত্রে কাশি-রাজকে পরাজিত করিয়াছিলেন।" বিশ্বরূপসেনের তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে,-দক্ষিণসাগরের তীরে, পুরুষোত্তম-ক্ষেত্রে-অসি, বরণা, এবং গঙ্গাসঙ্গমে বিশ্বেশ্বরের কাশীধামে-ত্রিবেণী-সঙ্গমে প্রয়াগধামে- লক্ষ্মণসেন উচ্চ যজ্ঞ-যুপের সহিত সমর-জয়স্তম্ভ-মালা স্থাপিত করিয়াছিলেন (১২ শ্লোক)। লক্ষ্মণসেন যখন গৌড়াধিপ, তখন কান্যকুজের সিংহাসনে গাহড়বাল-রাজ জয়চ্চন্দ্র, এবং কলিঙ্গের সিংহাসনে দ্বিতীয় রাজরাজ, এবং তৎপরে দ্বিতীয় অনঙ্গভীম, সমাসীন ছিলেন। ইঁহারা কেহই গৌড়াধিপের তুল্য পরাক্রমশালী ছিলেন না। সুতরাং ইঁহাদিগের সহিত যুদ্ধে গৌড়াধিপের জয়লাভ অসম্ভব নহে। কিন্তু লক্ষ্মণসেন গৌড়-রাষ্ট্রের বহিঃশত্রু দমনে সমর্থ হইয়া থাকিলেও, প্রজাপুঞ্জের সহযোগিতার অভাবে, আভ্যন্তরীণ ঐক্যসাধনে, এবং বিভিন্ন অংশের রক্ষার সুব্যবস্থা করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন না। সেই জন্যই মহম্মদ-ই-বখতিয়ার অবাধে মগধ এবং বরেন্দ্র অধিকার করিতে পারিয়াছিলেন।
।। হিন্দুস্থানে তুরূষ্ক ।।
তুরূষ্কগণের গৌড়বিজয়-রহস্য বুঝিতে হইলে, তুরূষ্ক-চরিত্র এবং তাহাদিগের উত্তরাপথের অপরাপর অংশের বিজয়-বৃত্তান্ত সংক্ষেপে আলোচনা করা প্রয়োজন। আরবগণ উত্তরাপথের সিংহদ্বারোদঘাটনে সমর্থ হইয়াছিলেন না। যাঁহারা সেই দুরূহ কার্য্য সম্পাদন করিয়াছিলেন, তাঁহারা [সবুকৃতিগিন, মামুদ, এবং তাঁহাদের অনুচরগণ] তুরূষ্ক-জাতীয়। মধ্যএসিয়ার মরুময় মালভূমি তুরূষ্কগণের আদি-নিবাস; নিয়ত পালিত পশুপাল লইয়া, গোচারণক্ষেত্রের অনুসন্ধান করাই ইহাদিগের বৃত্তি ছিল। আদিবাস-ভূমির জলবায়ু এবং চিরঅভ্যাস মধ্য-এসিয়ার অধিবাসিগণকে কঠোরক্ষম, চঞ্চল এবং অগ্রগমনশীল করিয়া তুলিয়াছিল। চিরচাঞ্চল্য এবং অগ্রগমনশীলতা মধ্য-এসিয়ার অধিবাসিগণের জাতীয় চরিত্রের উল্লেখযোগ্য লক্ষণ। এই জাতীয় চরিত্রের বলে বলীয়ান ইউচিগণ, আদি-নিবাসস্থান হইতে বহির্গত হইয়া, [খৃষ্ট-পূর্ব্ব প্রথম শতাব্দে] কুষাণসাত্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন; হুণগণ খৃষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দে পূর্ব্ব-ইউরোপ এবং দক্ষিণ-এসিয়া ধ্বস্তবিধ্বস্ত করিয়াছিলেন: খৃষ্টীয় নবম হইতে পঞ্চদশ শতাব্দ পর্যন্ত তুরূষ্কগণ এবং [তাঁহাদের জ্ঞাতি] মোগলগণ, অবিরলধারে দলে দলে আসিয়া, ক্রমে আরব-সাম্রাজ্য, রোম-সাম্রাজ্য, চীন-সাম্রাজ্য এবং আরও অনেক প্রাচীন রাজ্য এবং প্রাচীন সভ্যতা বিনষ্ট করিয়াছিলেন। কি এসিয়ায়, কি ইউরোপে, সুসভ্য স্থির-নিবাস কৃষিজীবী জনগণ কখনও মরুভূমির কঠোরকর্মী চঞ্চল সন্তানগণের আক্রমণবেগের গতিরোধ করিতে পারে নাই। খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দের সূচনা হইতে, যাহাদিগের আক্রমণ-প্রবাহ উত্তরাপথে প্রধাবিত হইয়া, ক্রমে হিন্দু-স্বাধীনতা বিলুপ্ত এবং হিন্দু-সভ্যতা ধ্বংস করিতে উদ্যত হইয়াছিল, তাহারা তুরূষ্ক-জাতীয়। মুসলমানধৰ্ম্মাবলম্বী হইলেও, জাতীয় চরিত্রের প্রেরণাই তাহাদিগকে ভারত-আক্রমণে ব্রতী করিয়াছিল; এবং আদি-নিবাসভূমির কঠোর শিক্ষা তাহাদিগকে শস্য-শ্যামলা ভারতমাতার আদরে লালিত পালিত সন্তানগণের পক্ষে দুর্জ্জেয় করিয়া তুলিয়াছিল। উত্তরাপথের একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দের রাজনীতিক অবস্থা-ঐক্যবিধানক্ষম সার্ব্বভৌম-নৃপতির অভাব, এবং অন্তদ্রোহ, আক্রমণকারিগণের পথের প্রকৃত বাধা অন্তর্হিত করিয়া রাখিয়াছিল।
গজনীর সুলতান মামুদের মৃত্যুর অনতিকাল পরেই, সেঙ্গুকিয়া-তুরূঙ্কগণ, মধ্য-এসিয়া হইতে বিনির্গত হইয়া, মামুদের সাম্রাজ্যের পশ্চিমাংশ কাড়িয়া লইয়া, গজনী-রাজ্যের তুরূষ্কগণকে হীনবল এবং তুরূষ্ক-প্রবাহের প্রস্রবণ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া রাখিয়াছিল। কিন্তু তথাপি তাহারা পাঞ্জাবের পূর্ব্বদিকে অগ্রসর হইবার চেষ্টা কখনও পরিত্যাগ করেন নাই। সুলতান মসুদের সময়, আহম্মদ নিয়াল্ডতগীন্ কর্তৃক বারাণসী-আক্রমণ পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। মসুদের উত্তরাধিকারী সুলতান ইব্রাহিম (১০৪৮-১০৯৯ খৃষ্টাব্দ) সেক্- সম্রাট্-মালিক শাহের তনয়ার সহিত স্বীয় তনয়ের বিবাহ দিয়া,রাজ্যের পশ্চিম প্রান্ত সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হইয়া, পুনঃ পুনঃ হিন্দুস্থান আক্রমণ করিয়া, অনেকগুলি স্থান এবং দুর্গ হস্তগত করিয়াছিলেন। আলাউদ্দিন মসুদের সময় (১০৯৯-১১১৬ খৃষ্টাব্দ), "তুঘাতিগিন্ হিন্দুস্থানে [বিধর্ম্মিগণের সহিত] ধৰ্ম্ম-যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবার জন্য, গঙ্গা পার হইয়াছিলেন; এবং এমন একস্থান পর্য্যন্ত গিয়াছিলেন, যেখানে সুলতান মামুদ ভিন্ন, আর কেহ কখনও সসৈন্যে উপনীত হইতে পারেন নাই।”+ সুলতান বহরাম শাহ (১১১৮-১১৫৮ খৃষ্টাব্দ), সেক-সুলতান সঞ্জয়ের প্রসাদে গজনীর সিংহাসন লাভ করিয়াছিলেন, এবং তাঁহার সময়ে ঘোরের অধিপতি আলাউদ্দীন একবার গজনীনগর ভস্মসাৎ করিয়াছিলেন। তিনিও হিন্দুস্থানে ধৰ্ম্ম-যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন বলিয়া উল্লিখিত আছে।
সুলতান মামুদের মৃত্যুর পরে, একাদশ শতাব্দে, পাঞ্জাব এবং গৌড়রাজ্যের মধ্যবর্তী ভূভাগের শাসন-ভার যাঁহাদিগের হস্তে ন্যস্ত ছিল, তাঁহাদিগের গজনী-রাজ্যবাসী তুরূষ্কগণের আক্রমণ-বেগ সহ্য করিবার শক্তি ছিল কিনা সন্দেহ। কিন্তু দ্বাদশ শতাব্দে এক দিকে গজনীরাজ্য যেমন নিতান্ত শোচনীয় অবস্থায় পতিত হইয়াছিল, অপর দিকে শাকন্তরীর (আজমীরের) চৌহান-রাজগণ এবং কান্যকুজের গাহড়বাল-রাজগণ তেমনি পবাক্রান্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন। এই সময় যদি চৌহান এবং গাহড়বাল মিলিত হইতে পারিতেন, তবে বোধ হয় অনায়াসে উত্তরাপথের সিংহদ্বার শত্রুশূন্য করিতে পারিতেন। কিন্তু, একশত বৎসবের মধ্যে কখনও ইহারা স স্মলিত হইয়া শত্রুর সম্মুখীন হইবার অবসর পাইয়াছিলেন না; অবশেষে মুইজুদ্দীন মহম্মদ ঘোরী আসিয়া, একে একে উভয় রাজ্য ধ্বংস করিয়াছিলেন। দুর্ব্বল গজনবী-তুরূষ্কগণও গাহড়বাল এবং চৌহান-রাজগণকে বিশ্রাম দিয়াছিলেন না: বহরাম শাহ সম্ভবত বারাণসা পর্য্যন্ত অগ্রসর হইয়াছিলেন। কুমারদেবীর সারনাথের শিলালিপিতে উক্ত হইয়াছে-গাহড়বাল-রাজ গোবিন্দচন্দ্র (+১১১৪-১৯৫৪+খৃষ্টাব্দ) মহাদেব কর্তৃক “দুষ্ট তুরূষ্কসৈন্যের হস্ত হইতে বারাণসী রক্ষা করিবার জন্য” [বারাণসীং..... দুষ্ট-তুরূষ্ক-সুভটাদবিতুং] নিযুক্ত হইয়াছিলেন। তুরূষ্ক-সৈন্যের হস্ত হইতে গোবিন্দচন্দ্র যে বারাণসীর উদ্ধার-সাধন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, সে বিষয়ে আর সন্দেহ নাই। কিন্তু বারাণসী রক্ষা করিয়াই, তাঁহার তৃপ্ত হওয়া উচিত ছিল কি?
চৌহান-রাজ বাসলদেব, এবং গোবিন্দচন্দ্রের পুত্র গাহড়বাল-রাজ বিজয়চন্দ্রকেও, গজনবী-তুরূষ্কগণের আক্রমণ-বেগ সহ্য করিতে হইয়াছিল; ১২২০ সম্বতের [১১০- খৃষ্টাব্দের] দিল্লা-শিবালিক স্তম্ভ-লিপিতে হইয়াছে- চৌহান-রাজ বাসলদেব "আর্য্যাবর্তং যথার্থং পুনরপি কৃতবান্ ম্লেচ্ছ-চিচ্ছেদনাভিঃ।”
"ম্লেচ্ছ নাশ করিয়া, আর্য্যাবর্তের নাম পুনরায় যথার্থ করিয়াছিলেন।" প্রশস্তিকার হয়ত এখানে চৌহানরাজ্য-অর্থে "আর্য্যাবর্ত” শব্দের ব্যবহার করিয়াছেন। কারণ, বীসলদেব বা অন্য কোন হিন্দু-নরপতি কখনও পাঞ্জাব আক্রমণ করিয়াছিলেন, গজনবী সুলতানগণের ইতিহাসে এরূপ আভাস পাওয়া যায় না। ১২২৪ সম্বতের [১১৬৮ খৃষ্টাব্দের] গাহড়বাল-রাজ বিজয়চদ্রেরকমৌলীতে প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে তিনি
"ভুবন-দলন-হেলাহর্য্য হম্মীর-নারী- নয়নজলদ-ধারা-ধৌত-ভূলোক-তাপঃ
"হেলায় ভুবনদক্ষম হম্মীরের নারীগণের নয়ন-জলধারা দ্বাবা ভূলোকের তাপ-ধৌতকারী” বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন। "হম্মীর” এ স্থলে আমীর বা গজনবী-সুলতান অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। চৌহান বীসলদেব এবৎ গাহড়বাল বিজয়চন্দ্রের সময়ের গজনবী-সুলতান খুস শাহ, গজনী হইতে তাড়িত হইয়া আসিয়া, লাহোরে আশ্রয় গ্রহণ কবিয়াছিলেন। কিন্তু এরূপ দুরবস্থায় পতিত হইয়াও, তিনি তুরূষ্কের স্বভাবগত অগ্রগমনশীলতা ত্যাগ করিতে পারিয়াছিলেন না; সম্ভবত চৌহান এবং গাহডবাল, এই উভয় বাজ্যই, একবার একবার আক্রমণ কবিয়াছিলেন। তুরূষ্ক-যোদ্ধৃগণ এযাবৎ গাহড়বালবাজা জয় কবিতে অসমর্থ হইলেও, তুরূষ্ক-উপনিবেশিকগণ রাজ্যের নানা স্থানে প্রবেশ লাভ করিয়াছিল। গাহডবাল-রাজ চন্দ্রদেবের, মদনচন্দ্রের, গাবিন্দচন্দ্রের এবং বিজয়চন্দ্রের অনেক তাম্রশাসনে "তুরূষ্ক-দণ্ড" নামক বাজকরের উল্লেখ দৃষ্ট হয়। "তুরূষ্ক-দণ্ড” নাম হইতে বুঝিতে পারা যায়,- তুরূষ্ক-প্রজাগণকে এই বিশেষ কর প্রদান করিতে হইত।
১১৬৮ কি ১১৬৯ খৃষ্টাব্দে, শেষ গজনবী-সুলতান খুসরু-মালিক, লাহোরের সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন; ১১৭০ খৃষ্টাব্দে গাহডবাল জয়চ্চন্দ্র কান্যকুজের সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন; ১১৭০ হইতে ১১৮২ খৃষ্টাব্দের মধ্যে কোন সময়ে, চৌহান দ্বিতীয় পৃথ্বিরাজ আজমীরের সিংহাসনে অভিষিক্ত হইয়াছিলেন; এবং ১১৭৩ খৃস্ট্রাব্দে সুলতান ঘিয়াসুদ্দীন ঘোরী গজনীনগর অধিকার করিয়া, অনুজ মইজুদ্দীন মহম্মদ ঘোরীকে সুলতান মামুদের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। মহম্মদ-ঘোরী পরাজয়েও পরাঙ্মুখ না হইয়া,কেমন করিয়া একে একে এই সকল প্রতিদ্বন্দ্বীকে বিনাশ করিয়া হিন্দুস্থানে আধিপত্য স্থাপন করিয়াছিলেন, তাহার বর্ণন এখানে নিষ্প্রয়োজন। লাহোরের সুলতান, দিল্লী ও আজমীরের চৌহানরাজ এবং কনোজের গাহড়বালরাজ [সমবেতভাবে না হউক] স্বতন্ত্রভাবে আক্রমণকারীর গতিরোধার্থ যথেষ্ট চেষ্টা করিয়াছিলেন। ইহাদিগের দমনার্থ মহম্মদ ঘোরীকে পুনঃ পুনঃ গজনী ত্যাগ করিয়া হিদুস্থানে আসিতে হইয়াছিল। কিন্তু শশাঙ্ক, ধৰ্ম্মপাল, দেবপাল এবং মহীপালের গৌড়রাষ্ট্র [একরূপ নিব্বিবাদে] মহম্মদ ঘোরীর একজন দাসানুদাসকে রাজপদে বরণ করিয়াছিল।
।। মহম্মদ-ই-বখতিয়ার ।।
মহম্মদ-ই-বতিয়ার নামক খ ব। খিলজি বংশীয় একজন তুরূষ্ক, মুইজুদ্দীন মহম্মদের সেনাশ্রেণীতে কর্ম্মের অনুসন্ধানে, গজনী গমন করিয়া- ছিলেন। মহম্মদের চেহারা পছন্দসহি না হওয়ায়, সেনাসংগ্রহ-বিভাগের প্রধান কৰ্ম্মচারী তাঁহাকে একটি অল্প বেতনের কর্ম্ম দিতে চাহিয়াছিলেন। মহম্মদ-ই-বখতিয়ার প্রস্তাবিত কৰ্ম্ম গ্রহণ না করিয়া হিন্দুস্থানে-দিল্লীতে গমন করিলেন। মহম্মদ-ঘোরীর প্রতিনিধি কুতবুদ্দীন তখন দিল্লীতে অবস্থান করিতেছিলেন। দিল্লীতেও মহম্মদের আকৃতি তাঁহার মনোমত পদপ্রাপ্তির অন্তরায় হইয়া দাঁড়াইল। হতাশ হইয়া, মহম্মদ অযোধ্যায় গিয়া,মালিক হুসামুদ্দীন আগুল্লবকের শরণাগত হইলেন। হুসামুদ্দীন মহম্মদের ক্ষিপ্রকারিতার এবং সাহসের পরিচয় পাইয়া, তাঁহাকে "ভগবত” এবং "ভিউলি” নামক দুইটি পরগণা জায়গীর দান করিয়াছিলেন। মহম্মদ-ইবতিয়ারের জায়গীর দক্ষিণ বিহার বা মগধের পশ্চিম সীমা কর্মনাশা নদীর পশ্চিমে, চুনারগাড়ের নিকটে অৱস্থিত ছিল। এখান হইতে মহম্মদ মাঝে মাঝে মগধে (বিহারে) প্রবেশ করিয়া, গ্রাম লুটপাট আরম্ভ করিলেন; এবং লুষ্টিত অর্থের দ্বারা ক্রমশঃ যুদ্ধের অশ্ব, অস্ত্রশস্ত্র, এবং সেনা সংগ্রহ করিতে লাগিলেন। তাঁহার বীরত্বের খ্যাতি চারিদিকে ব্যাপ্ত হইলে, হিন্দুস্থানের যত খলজ ব। খিলজি-বংশীয় তুরূষ্ক ছিল, তাহারা আসিয়া তাঁহার সহিত মিলিত হইল। সুলতান কুতবুদ্দীন মহম্মদ-ই বখতিয়ারের সুখ্যাতি শুনিয়া, তাঁহাকে খিলাত পাঠাইয়া দিলেন। প্রোৎসাহিত হইয়া, মহম্মদ পুনঃ পুনঃ "বিলায়ৎ "বিহার” আক্রমণ করিয়া, অনেক স্থান লুণ্ঠন করিতে লাগিলেন। "এক সাল” এইরূপ আক্রমণ ও লুণ্ঠন চলিল।
।। বিহার-বিজয় ।।
অবশেষে মহম্মদ বিহার দুর্গ অধিকার করিতে মনস্থ করিলেন। এই "কিল্প-বিহার” পাটনা জেলার অন্তর্গত বর্তমান বিহার মহকুমার প্রধান নগর বিহার বলিয়া অনুমিত হয়। মহম্মদ-ই-বখ,তিয়ার কর্তৃক "বিহার-দুর্গ", এবং তৎপর বৎসর, “নোদিয়া” অধিকারের সময় লইয়া, পণ্ডিতগণের মধ্যে মতভেদ আছে। রেভার্টির মতে, মহম্মদ-ই-বখতিয়ার ১১৯৩ খৃষ্টাব্দে বিহার-দুর্গ অধিকার করিয়াছিলেন।* ব্লক্যান এই ঘটনা ১১৯৭ কি ১১৯৮ খৃষ্টাব্দে স্থাপন করিতে চাহেন। ব্লক্যানের অনুমানই সমীচীনতর বোধ হয়। "বিহর" এবং "নোদিয়া" অধিকারের বিবরণ সম্বন্ধে আমাদের প্রধান অবলম্বন-মিন্হাজ্বদ্দীনের তবকাত-ই-নাসিরি” নামক পার্য ভাষায় রচিত ইতিহাস গ্রন্থ।
১১৯৩ খৃষ্টাব্দে, কৃতবুদ্দীন কর্তৃক দিল্লী অধিকারের বৎসরে, মিনহাজুদ্দীন জন্ম গ্রহণ করিয়ছিলেন; এবং সুলতান ইয়াল্ডমিসের এবং তাঁহার বংশধরগণের রাজত্বকালে, প্রথমে গোয়ালিয়রের এবং পরে দিল্লীর প্রধান কাজির পদে নিযুক্ত ছিলেন। ১২৪২ খৃষ্টাব্দে প্রধান কাজির পদ ত্যাগ করিয়া, মিনহাজুদ্দীন বাঙ্গলায় আসিয়াছিলেন; এবং এখানে দুই বৎসরকাল অবস্থান করিয়া, দিল্লী ফিরিয়া গিয়াছিলেন। এই সুযোগেই, মিনহাজ বিহার এবং বাঙ্গালার তৎকালীন ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ করিয়াছিলেন। "বিহার” এবং "নোদিয়া” অধিকারের ৪৫ বৎসর পরে, বিবরণ-সঙ্কলনে ব্রতী হইয়া, মিন্হাজ্বদ্দীন বৃদ্ধ সৈনিক এবং "বিশ্বস্ত লোকের” মুখে যাহা শুনিয়াছিলেন, তাহাই লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। মিন্হাজুদ্দীন যখন "তবকাত” রচনায় প্রবৃত্ত, তখন অবশ্যই পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকগণের প্রবর্তিত প্রমাণ-পরীক্ষা-রীতি কাহারও জানা ছিল না, এবং তৎকালের জনসাধারণের ন্যায় মিন্হাজেরও অতিপ্রাকৃত এবং আজগুবি কথায় বিশ্বাস স্থাপনের প্রবৃত্তি যথেষ্ট ছিল। উপরস্তু স্বধর্ম্মে অনুরাগ এবং পৌত্তলিকতায় অশ্রদ্ধা, মিনহাজের ন্যায় লেখকগণকে স্বজাতির একান্ত পক্ষপাতী করিয়া রাখিয়াছিল। সুতরাং মিন্থহাজ-বর্ণিত "বিহার” এবং "নোদিয়া"-অধিকারের বিবরণ বিশেষ বিচার পূর্ব্বক গ্রহণ করা কর্তব্য।
"বিশ্বাসী লোকের" এবং ঐ ঘটনায় লিপ্ত একজন বৃদ্ধ সৈনিকের মুখের কথা শুনিয়া, মিন্হাজ্বদ্দীন বিহার-কিল্পা অধিকারের বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। মহম্মদ-ই-বতিয়ার যখন "বিহার” আক্রমণ করেন, তখন তাঁহার অনুচরগণের মধ্যে নিজামুদ্দীন এবং সমসামুদ্দীন এই দুই ভ্রাতা ছিল। ১২৪৩ খৃষ্টাব্দে মিন্হাজুদ্দীন যখন "লখনাবতী” নগরে অবস্থান করিতেছিলেন, তখন সমসামুদ্দীনের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইয়াছিল, এবং সমসামুদ্দীনের মুখে যেরূপ শুনিয়াছিলেন, তিনি তাহাই লিখিয়া গিয়াছেন। বিহার-অধিকার-প্রসঙ্গের সূচনায় মিন্হাজুদ্দীন লিখিয়াছেন,-"বিশ্বাসী লোকেরা এইরূপ বলিয়াছেন যে, মহম্মদ-ই-বতিয়ার, দুই শত বৰ্ম্মাচ্ছাদিত গাত্র অশ্বারোহী লইয়া, বিহারদুর্গের দ্বারদেশে উপনীত হইয়াছিলেন; এবং হঠাৎ ঐ স্থান আক্রমণ করিয়াছিলেন।” পরে সমসামুদ্দীনের উল্লেখ করিয়া লিখিয়াছেন,-আক্রমণকারিগণ দুর্গের দ্বারে উপস্থিত হইলে, "মহম্মদ-ই বতিয়ার সাহসে ভর করিয়া, দ্বারের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন। তাঁহারা কিল্লা অধিকার করিয়াছিলেন, এবং বিস্তর দ্রব্য লুষ্ঠিত করিয়াছিলেন। ঐ স্থানের অধিকাংশ অধিবাসী ব্রাহ্মণ ছিলেন, এবং ইহাঁদের সকলেরই মস্তক মুণ্ডিত ছিল। তাঁহারা সকলেই নিহত হইয়াছিলেন। ঐ স্থানে অনেকগুলি পুস্তক ছিল। যখন এই সকল পুস্তক মুসলমানগণের নয়নগোচব হইল, তখন উহাদের মর্ম্ম বুঝাইবার জন্য তাঁহারা কতকগুলি হিন্দুকে ডাকিয়া পাঠাইলেন; কিন্তু সমস্ত হিন্দুই নিহত হইয়াছিল। যখন তাঁহারা [প্রকৃত কথ।] জানিতে পারিলেন, তখন দেখা গেল-"তামাম হিসার (দুর্গ) ও সহব একটা বিদ্যালয়, এবং হিন্দী ভাষায় বিদ্যালয়কে (মাদ্রাসাকে) 'বিহার' বলে।"*
এস্থলে দেখিতে পাওয়া যায়,-মিন্হাজুদ্দান "কিল্লা বিহার” অধিকারের প্রকৃত বিবরণ জানিতে যথেষ্ট শ্রম স্বীকার করিয়াছিলেন, এবং তাঁহার বিবরণ সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য। কিন্তু তিনি যে শ্রেণীর লোকের নিকট হইতে বিবরণ সংগ্রহ করিয়াছিলেন, তাহাদের পর্যবেক্ষণ-শক্তি যে কত দুর্ব্বল, তাহার দুইটি প্রমাণ পাওয়া গেল। তাহারা একটি বৌদ্ধ-বিদ্যালয়কে "কিল্লা" বলিয়া ভ্রম করিতে সমর্থ হইয়াছিল; এবং অনুসন্ধান করিয়াও, তাহারা ঠিক করিয়া উঠিতে পারে নাই রে-মুণ্ডিত-মস্তক বিহারবাসীরা ব্রাহ্মণ নহে, বৌদ্ধ শ্রমণ।
মহম্মদ-ই-বখতিয়ার "কিল্লা-বিহার” লুণ্ঠন করিয়া, বহু ধন লাভ করিয়াছিলেন। যে বৌদ্ধ-বিহার আক্রমণকারিগণের কিল্লা এবং সহর বলিয়া প্রতিভাত হইয়াছিল, তাহাতে যে বহু কালের বহু ভক্ত-জনের প্রদত্ত বহু অর্থ সঞ্চিত থাকিবে, ইহাতে আশ্চর্য্যের বিষয় কি? মহম্মদ-ই-বখতিয়ার এই লুষ্ঠীত দ্রব্য লইয়া, সয়ং দিল্লীতে কুতবৃদ্দীন আইবকের নিকট উপস্থিত: ইয়া- ছিলেন। কুতবুদ্দীন তাঁহাকে বহু সন্মান করিয়াছিলেন। মিনগাজ লিখিয়াছেন,-মহম্মদ-ই বথতিয়ার দিল্লী হইতে ফিরিয়া আসিয়া, "হার জয় করিয়াছিলেন [বিহার ফতে করুদ]।" এই "বিহার ফতের” কথাটা অতি সাবধানে গ্রহণ করিতে হইবে। "বিহার” বলিতে এখন আমরা যাহা বুঝি, মিন্হাজ্বদ্দান সে অর্থে বিহার-শব্দের ব্যবহার করেন নাই। তিনি সুলতান ইয়াতিমিসের রাজত্বের বিবরণের শেষে, বিজিত প্রদেয়-সমূহের যে তালিকা দিয়াছেন, তাহাতে "বিহার” এবং "তিরহুত” স্বতন্ত্র উল্লিখিত হইয়াছে। মিন্হাজের "বিহার" দক্ষিণ বা সাহাবাদ, বিহার, পাটনা, গয়া, মুঙ্গের, এবং ভাগলপুর জেলা। মহম্মদ-ই-বতিয়ার তিরহুত জয় করা দূরে থাকুক, কোন দিন উহার কোন অংশ আক্রমণও কারয়াছিলেন না। যাঁহার শৈথিল্যে বা দুর্ব্বলতায়, দক্ষিণ-বিহার মহম্মদ-ই-বতয়ারের ন্যায় সামান্য জায়গারদার কর্তক পুনঃ পুনঃ সাক্রান্ত লুষ্ঠিত এবং অবাধে বিজিত হইতে পারিয়াছিল, সেই "গৌড়েশ্বরের” রাজধানাতে "বিহার ফতের” কাহিনী ঘোর আতঙ্ক উপস্থিত করিয়া, নির্বিরোধে বরেন্দ্র এবং রাঢ়দেশ অধিকারের পথ পরিস্কার করিয়া থাকিবে।
মহম্মদ-ই-বখতিয়ারের অভ্যুদয়-কালে, যিনি উত্তরাপথের পূর্ব্বাংণের প্রধান নরপাল বা "গৌড়েশ্বর” মিন্নহাজের ভাষায় "হিন্দের রায়গণের পুরুষানুক্রমিক খালিফাস্থানীয়”] ছিলেন, মিন্নহাজ্বদ্দীন তাঁহাকে "রায় লক্ষ্মমনিয়া" এবং তাঁহার "দার-উল্-মুল্ক” বা রাজধানীকে "সহর নোদিয়া" নামে উল্লেখ বরিয়াছেন। মিন্নহাজ "রায় পিথোরার" [চৌহান-রাজ পৃথ্বী- রাজের] এবং "রায় জয়চাঁদেব” [গাহড়বাল-রাজ জয়চ্চন্দ্রের] নামোল্লেখ মাত্র করিয়াছেন, কিন্তু "রায় লঙ্মনিয়ার" জীবনচরিত লিপিবদ্ধ করিতেও যত্ন পাইয়াছেন; তাঁহার শাসনরীতির সুখ্যাতি করিয়াছেন; দানশীলতার জন্য তাঁহাকে "সুলতান করিম কুতবুদ্দীন হাতেমুজ্জমান” বা সেই যুগের হাতেম কুতবুদ্দানের সহিত তুলনা করিয়াছেন; এবং উপসংহারে পৌত্তলিক-বিদ্বেষ বিস্মৃত হইয়া আশীর্ব্বাদ করিয়াছেন;-"আল্লা [নরকে] তাঁহার শান্তির লাঘব করুন।"* এই "রায় লখমনিয়া” কে, তদ্বিষয়ে পণ্ডিত-সমাজে বিস্তর মতভেদ আছে। মিনহাজুদ্দীনের "রায় লক্ষ্মমনিয়া” গৌড়াধিপ লক্ষ্মণসেনের নামের অপভ্রংশ বলিয়াই বোধ হয়। মিন্হাজ্বদ্দীন লমিয়ার যে জীবনী লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, তাহা তিনি "বিশ্বাসী লোকের" উক্তি (সেফাৎ-রোয়াৎ) বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। জনশ্রুতির বাহক এই সকল "বিশ্বাসী লোক” যাঁহাকে ভক্তির চক্ষে দেখেন, তাঁহার জীবনীকে অনেক অলৌকিক ঘটনায় সাজাইতে ভাল বাসেন। মিন্হাজ্বদ্দীন-লিখিত লক্ষ্মণসেনের জন্মবৃত্তান্ত, জন্মমাত্র রাজ্যাভিষেক, এবং সুদীর্ঘ-রাজ্যশাসন-কাহিনী "বিশ্বাসী লোকের" কল্পনা বলিয়াই মনে হয়। তবে মহম্মদ-ই-বখতিয়ারের "নোদীয়া" আক্রমণের সময় লক্ষ্মণসেন ঠিক অশীতিবর্ষীয় না হউন, বার্দ্ধক্যে পদার্পণ করিয়াছিলেন, এ কথা বিশ্বাস করা যাইতে পারে।
।। লক্ষ্মণাবতী ও নোদিয়া ॥
তাহার পর জিজ্ঞাস্য-"সহর নোদিয়হ" কোন্ খানে ছিল? আবুল্ ফজল্ মিনহাজের "নোদিয়হকে” "নদীয়া” বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন, এবং বাঙ্গলায় সংস্কৃত-চর্চ্চার গুরুস্থান নবদ্বীপই যে লখমনিয়ার "নদীয়া” তাহার আভাস দিয়াছেন। আবুল্ ফজলের মতই এখন সর্ব্বত্র সমাদর লাভ করিয়াছে। কিন্তু আবুল্ ফজলের সময়েও, সকলে “নোদিয়হ”কে "নদীয়া” বলিয়া মনে করিত না। "মুস্তখাব-উৎ-তওয়ারিখ”-গ্রন্থে আবদুল কাদির বেদৌনি মিন্হাজের "নোদিয়হ"কে "নোদীয়া বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। সংস্কৃত সাহিত্যে লক্ষ্মণসেনের দুইটি স্বতন্ত্র রাজধানী, 'বিজয়পুর' এবং 'লক্ষ্মণাবতীর' উল্লেখ পাওয়া যায়। "পবনদূতে” ধোয়ী কবি সুহ্ম বা রাঢ়দেশের বর্ণনা করিয়া এবং
"ভাগীরথ্যাস্তপনতনয়া যত্র নিৰ্যাতি দেবী (৩৩)
সেই মুক্তবেণী (ত্রিবেণীর) উল্লেখ করিয়া,
"স্কন্ধাবারং বিজয়পুরমিত্যুন্নতাং রাজধানী” (৩৬)
বর্ণন করিয়াছেন। "প্রবন্ধচিন্তামণি”-গ্রন্থে মেরুতুঙ্গ আচার্য্য লিখিয়াছেন -"গৌড়দেশে লক্ষ্মণাবতী নগরে-লক্ষ্মণসেন নামক রাজা দীর্ঘকাল রাজত্ব করিয়াছিলেন।” মিন্হাজ লিখিয়াছেন,ও "মহম্মদ-ই-বতিয়ার ঐ (রায় লখমনিয়ার) মুলুক সকল (মমল্কৎ) দখল (জবত) করিয়া সহর নোদিয়হকে “খরাব” করিলেন, এবং যে মৌজা [এখন] লখ ণাবর্তী, তাহার উপর রাজধানী (দার-উল্-মুল্ক) স্থাপন করিলেন।” এখানে দেখা যায়মহম্মদ-ই-বখতিয়ার যেন লখণাবতী নির্মাণ করিয়াছিলেন। “লখাবতী” লক্ষ্মণাবতীর অপভ্রংশ। মহম্মদ-ই-বখতিয়ার যে ইচ্ছাপূর্ব্বক ঐ স্থানের নাম "লক্ষ্মণাবতী” রাখিয়াছিলেন, এমন সম্ভব নহে। ঐ স্থানের নাম আগেই "লক্ষ্মণাবতী” ছিল, এবং উহাই লক্ষ্মণসেনের অন্যতম রাজধানী ছিল। সেনরাজগণের কীত্তিচিহ্ন সেখান হইতে এখনও লুপ্ত হয় নাই। কিম্বদন্তী অনুসারে, লখাবতা বা গৌড়ের ধ্বংসাবশেষের সমীপবর্তী বিশাল সাগরদীঘি লক্ষ্মণসেন খোদাইয়াছিলেন; এবং সাগরদীঘির অনতিদূর স্থিত একটি প্রাচীন দুর্গের ভগ্নাবশেষ এখনও "বল্লালগড়” নামে কথিত হইয়া আসিতেছে। লক্ষ্মণসেনের অপর রাজধানী "বিজয়পুর” মিন্হাজুদ্দীন কর্তৃক নোদিয়াহ” নামে অভিহিত হইয়া থাকিতে পারে। "পবনদূতের” প্রকাশক প্রবীণ প্রত্নতত্ত্ববিদ শ্রীযুত মনোমোহন চক্রবর্তী "নোদিয়াহ” এবং "নদীয়া” অভিন্ন মনে করিয়া, নদীয়াই বিজয়পুর এইরূপ মত প্রকাশ করিয়াছেন। কিন্তু রাজসাহী জেলার রামপুর বোয়ালিয়া সহরের ১০ মাইল পশ্চিমে অবস্থিত [ জনশ্রুতি অনুসারে] কুমার রাজার রাজধানী "কুমারপুরের” নিকটবর্তী বিজয় রাজার রাজবাড়ীর ভগ্নাবশেষপূর্ণ "বিজয়নগর"ই পবনদূতের 'বিজয়পুর' বলিয়া বোধ হয়। বিজয়সেনের নামানুসারে যে বিজয়রের নামকরণ হইয়াছিল, এ বিষয়ে সংশয় নাই, এবং 'বিজয়নগরে' ও জনশ্রুতি অনুসারে এক বিজয় রাজা ছিল। দানসাগর-মতে বিজয়সেনের প্রাদুর্ভাব-স্থানে [বরেন্দ্রেই] "বিজয়নগর” অবস্থিত, এবং ইহার ৭ মাইল ব্যবধানে বিজয়সেনের শিলালিপির প্রাপ্তিস্থান "দেবপাড়া” অবস্থিত। দেবপাড়ার 'পদুমসহর' নামক তল্ল বিজয়সেনের প্রতিষ্ঠিত প্রদ্ব্যুয়েশ্বরের স্মৃতি এখনও জাগ্রত রাখিয়াছে, এবং "পদুমসহরের” তীরে একটি বৃহৎ দেবমন্দিরের ভগ্নাবশেষ এখনও বিদ্যমান আছে। সুতরাং বিজয়নগরকে বিজয়পুর বলিয়া গ্রহণ করাই সমীচীন বোধ হয়। বিজয়নগর লক্ষ্মণাবতীর ভগ্নাবশেষ হইতে ৪৫ মাইল ব্যবধানে অবস্থিত; নদীয়া ১১০ মাইল ব্যবধানে অবস্থিত। মিনহাজের বর্ণনানুসারে 'লখনাবতী' হইতে 'নোদিয়া' খুব বেশী দূরে অবস্থিত ছিল বলিয়া বোধ হয় না, এবং এই নিমিত্ত বিজয়নগরকেই "নোদিয়াহ” বলিতে প্রবৃত্তি হয়।
মহম্মদ-ই-বখতিয়ার, কর্তৃক "কিল্লা-বিহার” অধিকারের বিবরণ সঙ্কলনে ব্রতী হইয়া মিনহাজুদ্দীন যেমন সেই ব্যাপারে স্বয়ং লিপ্ত এক জন বৃদ্ধ সৈনিকের সাক্ষ্য গ্রহণে সমর্থ হইয়াছিলেন, "নোদিয়াহ"-অধিকার সম্বন্ধে তেমন কোন সাক্ষাৎ দ্রষ্টার মুখের কথা শুনিয়াছিলেন বলিয়া উল্লেখ করিয়া যান নাই। "নোদিয়াহ"-অধিকার-ব্যাপারে তাঁহার একমাত্র অবলম্বন "বিশ্বাসযোগ্য লোকের” উক্তি। এই সকল "বিশ্বাসযোগ্য লোকেরা", অর্থাৎ ১২৪২-১২৪৩ খৃষ্টাব্দের লখনাবতীর তুরুষ্ক রাজপুরুষগণ, মিন্হাজকে মহম্মদ-ই-বখতিয়ারের এবং তাঁহার অনুচরগণের কার্য্যকলাপ সম্বন্ধে সম্ভবত খাঁটি খবরই দিতে পারিয়াছিলেন; কিন্তু মহম্মদ-ই-বখতিয়ারেব "নোদিয়াহ” প্রবেশের পূর্ব্বে এবং তাঁহার পরোক্ষে নোদিয়ায় যে সকল ঘটনা ঘটিয়াছিল, তৎসম্বন্ধে ই হাদের প্রদত্ত বিবরণ তত নির্ভরযোগ্য বিবেচিত হইতে' পারে না। সুতরাং মিনহাজ্বদ্দীনের বর্ণিত মহম্মদ-ইবখতিয়ার কর্তৃক অধিকারের পূর্ব্বের নোদিয়া-বিবরণ বিশেষ বিচার পূর্ব্বক গ্রহণ করা কর্তব্য; এবং যুক্তিবিরুদ্ধ অংশ অমূলক গুজব বলিয়া উপেক্ষণীয়। মিন্হাজ লিখিয়াছেন, "যখন মহম্মদ-ই-বতিয়ার কর্তৃক "বিহার ফতে" হওয়ার সংবাদ রায় লখমনিয়ার রাজ্যের "আত্রাফে” পহুছিল, তখন এক দল জ্যোতিষী ব্রাহ্মণ-রাজমন্ত্রী রাজার নিকটে গিয়া নিবেদন করিল যে, পুরাকালের ব্রাহ্মণগণের পুস্তকে লেখা আছে যে, এই দেশ তুরুষ্কগণের হস্তগত হইবে; এবং এই শাস্ত্রীয় ভবিষ্যৎবাণী সফল হইবার সময়ও আসিয়াছে। সুতরাং সকলেরই এ দেশ হইতে পলায়ন করা উচিত। শাস্ত্রে লেখা ছিল, আজানুলম্বিতবাহু একজন তুরূষ্ক দেশ অধিকার করিবে। মহম্মদ-ই-বখতিয়ার আজানুলম্বিতবাহু কি না, দেখিয়া আসিবার জন্য রাজা বিশ্বাসী চর পাঠাইলেন; চরেরা আসিয়া বলিল, মহম্মদ বতিয়ার যথার্থই আজানু- লম্বিতবাহু। যখন এই সংবাদ নোদিয়ায় প্রচারিত হইল, তখম "ঐ মৌজার” ব্রাহ্মণগণ এবং সাহাগণ (ব্যবসায়ীগণ) সঙ্কনতে, বঙ্গে, এবং কামরূপে (কামরূদে) চলিয়া গেল। কিন্তু রাজ্য ছাড়িয়া যাওয়া রায় নখমনিয়ার পছন্দ "মাফিক" হইল না। সুতরাং মিনহাজের মতে, যাঁহার খান্দানকে (বংশকে) হিন্দের "রাইয়ান্” বা রাজগণ "বুজ্বর্গ” মনে করিত, এবং হিন্দের খলিফা বলিয়া স্বীকার করিত, এবং যাঁহার ফরজন্দান্ [বংশধরগণ] "তবকত-ই-নাসারি” রচনার সময় [১২৬০ খৃষ্টাব্দ] পর্যন্ত বঙ্গের শাসনকর্তা ছিল, সেই রায় লখমনিয়া একটি বৎসর জনশূন্য নদীয়ায় পড়িয়া রহিলেন!
"দোয়ম সাল (পরের বৎসর) মহম্মদ-ই বতিয়ার লঙ্কর প্রস্তুত করিয়া, বিহার হইতে ধাবিত হইলেন; এবং সহসা নদীয়া সহরের নিকট এমন ভাবে উপস্থিত হইলেন যে, ১৮ জনের বেশী সওয়ার (অশ্বারোহী) তাঁহার সঙ্গে ছিল না, এবং "দিগর লস্কর” পশ্চাতে আসিতেছিল। যখন মহম্মদ-ইবতিয়ার সহরের দরজায় পহুছিলেন, কাহাকেও আঘাত করিলেন না, ধীর, স্থির ভাবে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। কেহ মনে করিল না, ইনি- মহম্মদ-ই-বখতিয়ার; লোকে অনুমান করিল হয়ত একদল সওদাগর বিক্রয় করিবার জন্য ঘোড়া আনিয়াছে। যখন রায় লখমনিয়ার বাড়ীর (সরাই) দরজায় পর্তুছিলেন, তখন তলোয়ার খুলিয়া হিন্দুদিগকে আক্রমণ করিতে আরম্ভ করিলেন।
“তখন রায় লখমনিয়া আহারে উপবিষ্ট হইয়াছিলেন। তাঁহার নিকট সঠিক খবর পহু"ছিবার পূর্ব্বেই, মহম্ম-ই-বখতিয়ার বাড়ীর ভিতর ঢুকিয়া পড়িয়াছিলেন। তখন বৃদ্ধ রায় নগ্নপদে বাড়ীর পশ্চাদ্ভাগ দিয়া বহির হইয়া, সঙ্কনাতে ও বঙ্গে প্রস্থান করিলেন। তখায় অল্পকাল পরেই তাঁহার রাজত্বের পরিসমাপ্তি হইয়াছিল।
লক্ষ্মণসেনের কাপুরুষতায় বাঙ্গালা তুরূষ্কের পদানত হইল, ইদানীং অনেকেই এ কথা বলিয়া থাকেন। কিন্তু মিন্হাজ্বদ্দীন যাহা লিখিয়া গিয়াছেন, তাহার প্রতি অক্ষরও যদি সত্য হয়, তাহা হইলে লঙ্মনিয়াকে বা লক্ষ্মণসেনকে "কাপুরুষ” না বলিয়া, বীরাগ্রগণ্য বলিয়া পূজা করাই সঙ্গত। শাস্ত্রের দোহাই দিয়া,সকলে নোদিয়া ছাড়িয়া সুদূর কামরূপে ও বঙ্গে পলায়ন করিলেন, কিন্তু বৃদ্ধ বীর লক্ষ্মমনিয়া নোদিয়া ছাড়িয়া এক পদও নড়িলেন না, একটি জনশূন্য রক্ষিশূন্য রাজধানীতে একটি বৎসর শত্রুর প্রতীক্ষায় রহিলেন। যখন শত্রু আসিল, তখন যে অপাত্রের হস্তে নগরদ্বাররক্ষার ভার অর্পিত হইয়াছিল, তাহারা তুরূষ্ক সওয়ারগণকে ঘোড়ার সওদাগর ভ্রমে বাধা দিল না। সতত শত্রুর প্রতীক্ষাকারী নগরদ্বার-রক্ষকগণ সশস্ত্র অশ্বারোহীদিগকে ঘোড়ার সওদাগর ভ্রমে নগর প্রবেশ করিতে দেয়, মিন্হাজ্বদ্দীন ভিন্ন আর কোন ঐতিহাসিক এরূপ অদ্ভুত ঘটনা বর্ণনার অবসর পাইয়াছেন বলিয়া মনে হয় না। যখন রাজভবনে প্রবেশ করিয়া, মহম্মদই-বখতিয়ার হত্যাকাণ্ড আরম্ভ করিয়াছিলেন, তখন খবর পাইয়া, যদি রক্ষকহীন অশীতিবর্ষের রাজা সরিয়া যাওয়া সঙ্গত মনে করিয়া থাকেন, তবে তাঁহাকে কাপুরুষ বলা যায় না।
তথাপি লক্ষণসেনের "নোদিয়া” হইতে পলায়ন-কাহিনী প্রকৃত ঘটনা বলিয়া স্বীকার করা যায় না;-তাহা অজ্ঞ লোকের পরিকল্পিত উপকথা মাত্র। বিশ্বরূপ এবং কেশব নামক লক্ষ্মণসেনের অন্যূন দুইটি পুত্র ছিল; তিনি যাঁহাকে বাল্যে রাজপণ্ডিত-পদ যৌবনে প্রধান মন্ত্রি-পদ, এবং যৌবনান্তে যৌবনশেষযোগ্য ধর্মাধিকারির পদ প্রদান করিয়াছিলেন, হলায়ুধের ন্যায় এরূপ হাতেগড়া অমাত্য ছিল; এবং তিনি যাঁহাদিগকে লইয়া কাশী হইতে কামরূপ পর্যন্ত যুদ্ধযাত্রা করিয়াছিলেন, এরূপ সৈন্যসামস্তও ছিল। মিনহাজ লখমনিয়াকে যেরূপ প্রজারঞ্জনকারী এবং দানশীল রাজা বলিয়া বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন, তাহাতে মনে হয়, তিনি অনেকের ভক্তিও আকর্ষণ করিয়াছিলেন। সুতরাং, এরূপ নৃপতিকে বার্দ্ধক্যে সকলে দল বাঁধিয়া শত্রুর দ্বারা পদদলিত হইবার জন্য "নোদিয়ায়" ফেলিয়া আসিবে, এবং এক বৎসর পর্য্যন্ত তাঁহার কোন খোঁজ খবর লইবে না, ইহা বিশ্বাসযোগ্য নহে। অনুমান হয়-যখন "ব্রাহ্মণগণ” এবং "ব্যবসায়িগণ” নোদিয়া ত্যাগ করিয়াছিলেন "নোদিয়ার” অধীশ্বরও তখন রাজধানী ত্যাগ করিয়া বঙ্গে আশ্রয় লইয়াছিলেন। মহম্মদ-ই-বতিয়ার কর্তৃক এরূপ নিব্বিবাদে পশ্চিমবরেন্দ্র অধিকারের প্রকৃত'কারণ এই যে,- যখন মহম্মদ-ই-বতিয়ার কর্তৃক মগধ আক্রমণের সংবাদ বিজয়পুরে পহুছিয়াছিল, তখনই হয়ত ভয়াতুর মন্ত্রিবর্গের উপদেশে লক্ষ্মণসেন (পূর্ব্ব) বঙ্গে আশ্রয় গ্রহণ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন; এবং তাহার অনতিকাল পরে [তুরূষ্ক নায়কের "দোয়ম সালে”, নোদিয়া-আক্রমণের পূর্ব্বে] পরলোক গমন করিয়া থাকিবেন। লক্ষ্মণসেনের বংশধরগণের যে দুইখানি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহার একখনিতে লক্ষ্মণসেন-পাদানুধ্যাত বিশ্বরূপসেনের নাম উৎকীর্ণ রহিয়াছে; এবং আর একখানিতে অপর একটি নাম বিলুপ্ত করিয়া, লক্ষ্মণসেন-পাদানুধ্যাত কেশবসেনের নাম উৎকীর্ণ রহিয়াছে। ইহাতে মনে হয়-লক্ষ্মসেনের অভাবে, সিংহাসন লইয়া পুত্রগণের মধ্যে বিরোধ উপস্থিত হইয়াছিল। লক্ষ্মণসেনের পরলোকগমনের অব্যবহিত পরে,-এই ভ্রাতৃবিরোধ-বহ্নি প্রধূমিত হইবার সযয়ে,-মহম্মদ-ই-বতিয়ার পশ্চিম বরেন্দ্র অধিকার করিবার অবসর পাইয়া থাকিবেন।
