নববাবুবিলাস
ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
| অঙ্কুর খণ্ড | |
| পল্লবখণ্ড | |
| কুসুম খণ্ড | |
| ফলখণ্ড |
ভূমিকা
নিশাকর নিকরনিৰ্ম্মল ধবল কোমলকমল মুক্তাফল নির্মলগঙ্গাজল তুলাসিতাশেষযশঃ প্রকাশীকৃতভূমণ্ডল বিবিধবিদ্যা যুত বুধগণ গুণিজন-গোব্রাহ্মণপ্রতিপালন বেদপুরাণাদিশ্রবণপরায়ণ বিবিধজনমনোরঞ্জন-বচনামৃতবিতরণান্তঃকরণ করুণাসাগরাপারসংসারসাগরত্রাণকারণ -মন্ত্রারায়ণনামোচ্চারণসংকীর্ত্তন বন্দনাদিপরায়ণস্থান মহাবিদ্যারাধনা-তৎপর নীলাম্বরপীতাম্বর রক্তাম্বরদিগম্বর শূলশেলাস্ত্রধারিধাম, রাম-নামাঙ্কিতকলেবর মনোহর তদন্বিতাম্বরধরাধান বেদবেদান্তাগমনিগম-ঘোরতর দুর্গতর্কাদিশাস্ত্রাধ্যাপনানিপুণজনস্থান, নানাদিদেশাগতা-নীতমুক্তাপ্রবালাদিবিবিধ বিচিত্রবসনভূষণাসনযানবাহনাদিবিশিষ্টবিশিষ্ট-কুলোদ্ভব শরণাগতপ্রতিপালকানেকবিশিষ্ট বিদ্যাযুতানেকাট্টালিকা-দীর্ঘিকাদিস্বামি যানবাহনাদিগামি মহামান্যমহাপুণ্যপ্রতাপান্বিত-দীনদয়াময়বাবুজনগণস্থান স্থাণুত্তমাঙ্গগামিনীপতিতপাবনীনিস্তারকারিণী-সুরধুনীপূর্ব্বপ্রতীর স্থিতনগরসারনগর কলিকাতানামকোত্তমোত্তমরাজধানী ধামবত্তি ও তন্নিকটস্থ চিতপুর খিদিরপুর, ভবানীপুরাদিস্থিত ও সুরতরঙ্গিণী সংসার পারপ্রণী পশ্চিমতীরবর্তী শালিকা, শিবপুর চুচুডা শ্রীরামপুরাদি পুরস্থ অনেক অনেক বাস্তবিক বাবু সন্দর্শনে মহাহৃষ্টচিত্ত হইয়া বাস্তবিক নববাবুজনোল্লাসজনন কাল্পনিকবাবুজনগুণবর্ণন নববাবু-বিলাসাভিধান গ্রন্থ করণে প্রবৃত্ত হইয়াছি এতদ্গ্রন্থে পূর্ব্বাপরার্থাব-লোকনাধিক রসিক বিচক্ষণ সুজন মহামান্য ধৈর্য্যগাম্ভীৰ্য্যাদিযুত প্রতাপান্বিত বাবুজনগণের নানাবিধ হাস্যপরিহাসাদি পূর্ব্বক সথসমূহ হইতে পারিবেক এতদভিপ্রায়ে অনেক২ আধুনিক কাল্পনিক নবীন২ বাবুজনগণের তাবদ্ধত্তান্ত প্রকাশ করিতেছি ইহাতে কাল্পনিক আধুনিক তাদৃশ বাবুমহাশয়েরা অবিবেচনাপুরঃসর রাগান্ধাধীন কটুকাটব্যাদি বচনভাষী হইয়া স্বস্বাহঙ্কারবোধক স্বপ্ন তাবদ্ব ত্তান্তপ্রকাশক নিন্দাসূচক বাঙ্মুখ অবশ্যই হইবেন, কিন্তু বিবেচনাপূর্ব্বক তাবদ্গ্রন্থার্থাবলোকনাধীন স্বস্ব রোষদোষ বিমোচন হইবেক কারণ নববাবুবিলাসনামৈক পুস্তক বিশিষ্ট শিষ্টানুষ্ঠিত বিধিত নিত্য নৈমিত্তিক দৈব পৈতৃক কাম্যাদি ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্মানুষ্ঠানবিবর্জিত স্বীয়ধৰ্ম্মচ্যুত অন্যধৰ্ম্মাশ্রিত পুরুষের বহুতর দোষ-শ্রুতিপুরঃসর বহুতর বেদ পুরাণাদিসম্মতপথগামী পুরুষের ছলক্রমে পুরুষার্থবোধিত প্রকাশ হইবেন ইতি ॥
অথ অঙ্কুর খণ্ড।
ধন্য ধন্য ধার্মিক ধর্মাবতার ধর্মপ্রবর্তক দুষ্টনিবারক সৎপ্রজাপালক সদ্বিবেচক ইংরাজ কোম্পানি বাহাদুর অধিক ধনী হওনের অনেক পন্থা করিয়াছেন এই কলিকাতা নামক মহানগর আধুনিক কাল্পনিক বাবু-দিগের পিতা কিম্বা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আসিয়া স্বর্ণকার বর্ণকার কর্মকার চৰ্ম্মকার চটকার পটকার মঠকার বেতনোপভুক হইয়া কিম্বা রাজের সাজের কাঠের খাটের ঘাটের মঠের ইটের সরদারি চৌকিদারী জুয়াচুরি পোদ্দারী করিয়া অথবা অগম্যাগমন মিথ্যাবচন পরকীয়রমণী-সংঘটনকামি ভাড়ামি রাস্তাবন্দ দাশ্য দৌত্য গীতবাদ্যতৎপর হইয়া কিম্বা পৌরোহিত্য ভিক্ষাপুত্র গুরুশিষ্য ভাবে কিঞ্চিৎ অর্থসঙ্গতি করিয়া। কোম্পানির কাগজ কিম্বা জমিদারি ক্রয়াধীন বহুতর দিবসাবসানে অধিকতর ধনাঢ্য হইয়াছেন ইহারা অখণ্ড দোর্দণ্ডপ্রতাপান্বিত অনবরত পণ্ডিতপরিসেবিত ক্রমাগত বিবিধবিত্তবিশিষ্ট বিদ্যাযুত শ্রীযুত বাবু জনগণ সন্নিধানে স্বস্ব নাম সম্বমাতিলাষী হইয়া প্রথমত পঞ্চম বর্ষবয়স্ক বালক বাবুদিগের শিক্ষাকারণ গুরুমহাশয় নিকটে নিযুক্ত করিয়া থাকেন।
অর্থকরী কিঞ্চিৎ বিদ্যোপার্জনে স্বজাতীয় ধৰ্ম্ম হলবাহনাদি কৰ্ম্মে নিন্দিত তত্ত্ব বোধ করিয়া অধিক ধনাশাধীন স্বধর্মচ্যুত হইয়া সংপ্রতি কৈবর্ত্তাদি নানা জাতীয় প্রায় অনেকেই গুরুমহাশয় অনেক স্থানে দৃষ্ট হইয়াছেন কচিদ্বা সময়দোষে দুঃস্থ কায়স্থজাতীয় মহাশয়েরা গুরু-মহাশয়ের কর্ম্ম করিতেছেন এবং আনাইপুর আদবপুর হয়েড়া হবুষপুর কৈয়োড় কামালপুর সানুই শিবপুর বেগুট জুগুট রাইপুর ছাঁদড় কাঁদড় বেলেপু সোমসোর সানামুই শোণপুর জাড়া ধিয়াড়া কলাছড়া দেয়ড়া সেয়ড়া নপাড়া ঢাকছাড়া ধোপাপাড়া আমড়া জামড়া জামপাঁ যৌগাঁ কুলীনগাঁ কাগাঁ নগাঁ নতুনগাঁ বনগাঁ বেলগাঁ রাইগ। ইত্যাদি গ্রামনিবাসী ব্রাহ্মণ ঠাকুর মহাশয়েরাও গুরুমহাশয়ের কর্ম করিয়া থাকেন কিন্তু সর্ব্বাপেক্ষা গুরুমহাশয় ব্রাহ্মণ ঠাকুর হইতে অধিক উপকার ইহারা ঐহিক পারত্রিক সুখদায়ক উত্তমোত্তম ব্রহ্মপ্রতিম শ্যামসুন্দর হলধর গোপীনাথ গোপালবিগ্রহাদির বিবিধ বিচিত্র বসন ভূষণ পরিধাপন সচন্দন নবীন তুলসীদল কুণ্ডমাদি স্থাপন করিয়া পূজাদি কৰ্ম্ম ও আরত্রিক কৰ্ম্ম নির্ব্বাহ করেন এবং নানাবিধ সুরসান্ন ব্যঞ্জন মিষ্টান্ন পরমান্নাদিপাচক হইয়া বাটীর তাবৎ পরিজনে প্রসাদপ্রদাতা হয়েন এবং প্রাতঃকালে ও বৈকালে গুরু মহাশয়ের কৰ্ম্ম সম্পন্ন করেন।
প্রথমতঃ তালপত্রস্থিত কণ্টকবিনিৰ্ম্মিত চতুস্ত্রিংশদক্ষরে মাসচতুষ্টয়ে মাসপঞ্চকে বা লেখন দ্বারা কাঁচাদি নিৰ্ম্মিত বিচিত্র বিচিত্র পাত্রস্থিত মসি প্রদানাধীন বাবুদিগের হস্ত বশ হইয়া থাকে তৎপরে মাসদ্বয় মাসত্রয়ম্বা ঐ বালক বাবুসকল রীতিবৈপরীত্যেন অক্ষর লিখিয়া থাকেন তদনন্তরে রীত্যনুসারে অক্ষর লিখিলে বানান আঙ্ক আস্ক ইত্যাদি শিক্ষা কারণ বাবুগণে বহু দিনে গুরুমহাশয়ের অনেক যত্নে শিক্ষা করেন পরে কৃষ্ণ রাম গোবিন্দ নারায়ণ বাসুদেব ইত্যাদি নাম লেখাইয়া থাকেন নামাভ্যাস হইলে যথাক্রমে অঙ্কাক্ষর প্রথমে কড়াকে গণ্ডাকে বুড়কে চৌউকে নামতা পর্যন্ত তৎ পরে কদলীপত্রে তেরিজ জমাখরচ জমাবন্দি প্রভৃতি এবং কড়ি যথা ত্রিবেণীতে তিরোধারা গঙ্গাভাগীরথীতে। পাটনি পাতিল খেয়া পার হইয়া যাইতে। ঋষি মুনি প্রতি বট দিলো জনে২। পার হইয়া গেল তারা স্বর্গ আরোহণে। পাটনি পাইল তঙ্কা দিয়ে গেল ঋষি। তিন লক্ষ ছত্রিশ হাজার নয় শত আশি। ইত্যাদি ফকিকা অর্থাৎ ফাঁকি ও সা তে ভবতুসুপ্রীতা ইত্যাদি শ্লোক শিক্ষা করান কিন্তু বাবু সকল আপন স্বেচ্ছাপূর্ব্বক শিক্ষা করেন ইহাতে শিক্ষাকার যদ্যপি বাবুদিগের শরীরে স্বল্প বেত্রাঘাতাদি করেন কিম্বা ভয়জনক বাক্য কহেন তবে কর্তামহাশয় রুষ্ট হইয়া কহেন শুন সরকার তুমি বাবুদিগের শরীরে কদাচ বেত্রাঘাতাদি করিবা না আর ভয়জনক উচ্চভাষাও কহিবা না যেরূপ ক্ষুদ্র লোকের সন্তানদিগকে মারিয়া থাক সদা অনুনয় বিনয় বাক্যেতে তুষ্ট রাখিয়া লেখাপড়া শিক্ষাইবা তুমি রাঢ়দেশী ব্রাহ্মণ কিছুই নীতিজ্ঞান নাই ভাগ্যবান্ লোকের সন্তানদিগকে বাবু বলিতে হয় সর্ব্বদা স্নেহবাক্যে তুষিতে হয় তবে তাহারা সুমেজাজে লেখাপড়া অভ্যাস করে নতুবা মারপীট করিলে মেজাজ খারাপ হয় শিক্ষককে কর্তা এইরূপ আজ্ঞা দিলেন শিক্ষাকার কহিলেন যে আজ্ঞা মহাশয় এক্ষণে তাহাই করিব বাবুগণে এই কথা শ্রবণে মহা আনন্দ মনে প্রায় ঘুড়ি বুল২ মনিয়া খেলাইতে রতি যদি কদাচিৎ স্বেচ্ছাপূর্ব্বক পাঠশালায় আসিয়া বৈসেন ইহাতে যেরূপ বাঙ্গালা বিদ্যোপার্জন হইয়াছে তাহা লেখাতে কেবল লিপিবাহুল্য মাত্র হয়।
বিদ্যাভ্যাসানন্তরে শিক্ষাকার বাবুদিগের নিজ সমিভ্যারে লইয়া কর্তা মহাশয়ের নিকটে উপস্থিত হইলেন আর কহিলেন মহাশয় আপন স্বেচ্ছা পূর্ব্বক নাম অঙ্কাদি জিজ্ঞাসা [করিয়া] বাবুদিগের বিদ্যার পরিচয় লউন কর্তা কহিলেন আপন২ নাম লেখ প্রথম বড়বাবু আপন নাম লিখিতেছেন উচ্চৈঃস্বরে শ্রীলেখ জলেখ গ লেখত লেখ দ লেখ ল লেখর লেখ ইহাই লিখিয়া পাঠ করিলেন শ্রীজগব্দুল্লভ তৎপরে মধ্যম বাবু ঐ প্রকার শ্রীরাদা বলদ অর্থাৎ শ্রী রাধা বল্লভ নাম হইল পরে ছোটবাবুকে কহিলেন তুমি আমার সহিত অন্তঃপুরে চল সেই স্থানে * যাইয়া গৃহিণীকে কহিলেন বাবুদিগের কিপ্রকার বিদ্যা হইয়াছে তাহা শুন তিনি কহিলেন আমি গবাক্ষর দ্বারা অর্থাৎ জানালা দিয়া সকল দেখিয়াছি ও শুনিয়াছি ছোট পুত্রকে কহিলেন লেখ দেখি আমি যে নাম কহিলাম ছোটবাবু কহিলেন গুরুমহাশয় আমাকে এ নাম লেখান নাই গৃহিণী কহিলেন তুমি কেন শিক্ষাইয়া দেও না সেই বাক্যানুরোধে শিক্ষাইতেছেন শ্রী লেখক লেখ এক দাঁড়ি ফেল খ লেখ গ তে সাবঘোড় ওকার দেও আর ম তে হ্রস্বউকার একটু নীচে টানিয়া দেও ইহা লেখাইয়া পাঠ করাইলেন শ্রীরত্বেশ্বরী কর্তা মহাশয় লিখিত নাম দর্শনে হৃষ্টচিত্ত হইয়া অঙ্ক জিজ্ঞাসা করিলেন একুইশ কড়ার কড়া নামে হাতে হইলো কত পাঁচ গণ্ডা ইত্যাদি পরিচয়ানন্তর শ্লোক যথা অবতু বো গিরিসুতা শশিভূতঃ প্রিয়তমা। বসতু মে হৃদি সদা ভগবতঃ পদযুগং অস্যার্থঃ। শশিভূৎ মহাদেবের উত্তমাঙ্গস্থিতা। তোমারদিগের রক্ষা করুন হিমালয়সুতা। মম হৃদি বাস করুন ভগবান্ আসি। প্রার্থনা আমার মনে এই ভালবাসি। এই শ্লোক গুরু-মহাশয় কিরূপ শিক্ষা করিয়াছেন তাহা প্রায় সকলেই জ্ঞাত আছেন তথাপি লিখি যথা অবু তবু গিরিসুত মায় বলে পড় পুত পড়িলে শুনিলে দুদিভাতি না পড়িলে ঠেঙ্গার গুঁতি শ্লোক শুনিবামাত্র কর্তা আহলাদ-সাগরে মগ্ন হইলেন।
ইতোমধ্যে অমাত্যবর্গরা কহিলেন বাবুরদিগের যেরূপ বুদ্ধি ও মেধা এরূপ প্রায় দৃষ্টচর নহে আমরা পাঠশালায় দেখিয়াছি অঙ্কের সঙ্কেত দেখাইবা মাত্র গ্রহণ করিয়া থাকেন এবং শ্রবণ মাত্রই শ্লোক অভ্যাস করেন ইহারা মহাশয়ের নাম সম্ভ্রম ও কুলোজ্জল করিবেন আর কহিলেন বাঙ্গালা' লেখাপড়া একপ্রকার হইয়াছে আর যদি কিছু অপেক্ষা থাকে তাহাও হইয়া উঠিবেক আপনারদিগের জাতি বিদ্যা আর এমনি এ বংশের গুণ আছে না পড়িলেও বিদ্যা হয় সংপ্রতি এই অবধি পারসী পড়ালে ভাল হয় কর্তা কহিলেন আমিও মনে মনে স্থির করিয়াছি যে এক বেলা বাঙ্গলা এক বেলা পারসী পড়াইলে ভাল হয় অমাত্যেরা কহিলেন উত্তম আজ্ঞা করিয়াছেন ইত্যাদি অনেক খোসামোদের কথা কহিতে লাগিলেন এই নিমিত্ত তাহারদিগেরও কিছু গুণবর্ণন করি যথা কিবা দিবা কিবা নিশি, কর্তার নিকটে বসি, অভাগা আছেন ছায়াপ্রায়। অপূর্ব্ব বসন পরি, নামমালা হাতে করি, গাল-গল্পে কেবল কাল যায়। রক্তযুত তত্ত্ব গুচ্ছ রঞ্জিত মালার পুচ্ছ নামের সম্পর্ক নাই তাতে। কেবল কর্তার হিত, করে থাকেন যথোচিত, তুষ্ট করেন মিষ্ট বচনেতে। মধুপান সদা করেন, কৌতুকে কাল হরেন, ধর্ম্মের নাহিক কিছু লেশ। লোকে করি আশা দান, কেবল লোকের অপমান, করি করেন অধর্ম্মের শেষ। যদি কোন বিজ্ঞতম, লোকের হয় সমাগম, আলাপন নাহি তার সাথে। যদি কোন কথা কয়, সে কথা না মনে লয়, মগ্ন কেবল কত বচনেতে। কেবল কর্তৃ-মনোনীত, হিতাহিত যথোচিত, বচনেতে কর্তাকে ভুলায়। কর্তা বলেন কাকে বক, হাঁ মহাশয় এই হক, এইরূপ তাবৎ কথায়। কর্তা যদি কোনমতে, লোকে কিছু বলেন দিতে, অমাত্য বলেন ভাল হবে। দিতে হয় দেওয়া যাবে, লোকে বলেন তুমি পাবে, তিন দিন বিলম্বে আসিবে। এইরূপ প্রবঞ্চনা, ধৰ্ম্মাধৰ্ম্ম বিবেচনা, মনে২ কিছুই করে না। পাপ পুণ্য সম ভাব, করি কিছু করে লাভ, পরকাল নাহিক ভাবনা। এরূপ গুণধাম অমাত্য সহিত পরামর্শ করিয়া কহিলেন ওহে ধরের পো, একজন মোছলমান মুনসী তত্ব করিয়া আনহ যে আজ্ঞা বলিয়া ধরের পো গমন করিলেন।।
বহু অন্বেষণ করিয়া যশোহরনিবাসী এক মুনসী সমিভ্যারে লইয়া আগমন করিলেন কর্তা কহেন শুন মুনসী আমার সন্তানদিগকে পারসী পড়াইবা এবং বহিদ্বারে থাকিবা যে দিবস বাবুরা কোন স্থানে নিমন্ত্রণে যানারূঢ় হইয়া গমন করিবেন সঙ্গে যাইবা মায় খোরাকি তিন তত্ত্বা পাইবা ইহা শুনিয়া যশোহরনিবাসী মুনসী প্রস্থান করিলেন তৎপরে নাটুর ফরীদপুর ঢাকা ছিলহট্ট কুমিল্লা বড়ন বরিশাল ইত্যাদি দেশী মুনসী প্রায় মাসেক দুই মাস গমনাগমন করিলেক কর্তা তাহার-দিগের জবাব দিলেন কহিলেন তোমারদিগের জবান দোরস্ত নহে অর্থাৎ বাক পরিষ্কার নহে কর্তাটীর কাছে কি কেহ পারসী কথা বা হিন্দী কথা কহিয়া খোসনাম পাইতে পারেন তিনি অনর্গল অনন্তর চট্টগ্রাম-নিবাসী অপূর্ব্ব মিষ্টভাষী এক উপযুক্ত মুনসী তিনি বোট আপিসের মাঝি ছিলেন, এক সার্টিফিকিট দেখাইলেন কর্তার যেরূপ বিদ্যা তাহা পূর্ব্বে লিখিয়াছি তাহাতেই সুবিদিত আছেন, কর্তা মহাশয় ঐ ইংরাজী লিখিত সার্টিফিকিট পাঠ করিয়া বলিলেন যে অনেক দিবসাবধি এ ব্যক্তি মুনসীগিরি কর্ম করিয়াছে তাহাতে লেখা আছে, যে এ ব্যক্তি মাঝি বড় ভাল মনুষ্য এক্ষণে বৃদ্ধ হইয়াছে এ প্রযুক্ত আমার কৰ্ম্ম হইতে ছাড়াইল, কর্তা জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি কত কাল এ সাহেবের নিকট চাকর ছিলে, মুনসী কহেন উহাতে লেখা আছে আপনি দেখিবার চান তো দেখুন; কর্তা কহিলেন হাঁ২ আছে বটে, কোন সাহেবের কর্ম করিতে, আজ্ঞা কর্তা, বালবর কোম্পানি, কোম্পানির মুনসী শুনিয়া মহা সন্তুষ্ট হইলেন পরে মাঝি পূর্ব্বলিখিত বেতনে সেই সকল কৰ্ম্ম স্বীকার করিলেন। পরদিবস বাবুদিগের পাঠ আরম্ভ হইল। অতিসুক্ষ্মবুদ্ধিপ্রযুক্ত দুই বৎসর মধ্যেই প্রায় করিমা সমাপ্তি করিলেন, গোলেস্তাঁ বোস্তাঁ আরম্ভ করিয়া ইংরাজী পড়িবার নিমিত্ত বাবুরা স্বয়ং চেষ্টক হইলেন বয়ঃক্রম প্রায় তের চৌদ্দ বৎসর হইয়াছে, ইংরাজী কাহার নিকটে পড়িবেন ইহার চেষ্টায় কখন আরাতুন পিৎরুস, ডিকরুস, কালস ইত্যাদি সাহেবের ইস্কুলে গমনাগমন করেন, কিন্তু বাবুদিগের কেহ ভালমতে বুঝাইতে পারেন না, ইহা শুনিয়া কর্তা কহিলেন তবে এক জন সাহেবলোক বাটীতে চাকর রাখিতে হইল, পরে ধরের পো অন্বেষণে চলিলেন ॥
কোন হিন্দুস্থানী বেশ্যা কিম্বা বাঙ্গালি বেশ্যা অথবা মেথরাণী-গর্ভজাত এক জন সাহেব আনিয়া বাবুদিগের পাঠ কারণ নিযুক্ত করিলেন। সাহেবের মেজের সজ্জা এবং খানা ও টাফিন খাওয়া দেখিয়া বাবুরদিগেরো প্রায় তদনুরূপ ব্যবহার হইল আর সাহেবের সহিত সর্ব্বদা কথোপকথন দ্বারা গাডামী, রাসকেল, বেরিগুড, হুট, ছোট, নানসেন্স, গোটে হেল এইরূপ কথকগুলিন কথা অভ্যাস করিয়া বাঙ্গালা 'কথায় মিশাইয়া কহিতে লাগিলেন এবং দুই একখান ইংরাজী চিঠি পাঠ করিতে পারেন এবং ইংরাজী ভাষাতে কোন লোক কিছু জিজ্ঞাসা করিলে ঐ সাহেবের মত শব্দ উচ্চারণপূর্ব্বক উত্তর করেন, যথা, তোমার "পিতার নাম কি, টোটারাম ডট্ট অর্থাৎ তোতারাম দত্ত, আর বাবু-সকল যেরূপ ইংরাজী পত্রাদি লিখিয়া থাকেন তাহা অন্য কাহার সাধ্য নাই যে পাঠ করেন বাবু বুঝিতে পারেন, এই প্রকার বিদ্যা প্রচার হওয়াতে খোসামুদের। কর্তার নিকটে কহেন বাবুদিগের লেখা বিজ্ঞ২ ইংরাজেও বুঝিতে পারেন না এ সকল আপন পুণ্য প্রকাশ, যেরূপ বিদ্যা হইয়া উঠিল অনুসন্ধান করিলে প্রায় এরূপ বিদ্যা ও বৃদ্ধি পাওয়া ভার, আশীর্ব্বাদ করি চিরজীবী হইয়া থাকুন, প্রাতবাক্য লেখক কহে এমত বিদ্বান্ সন্তান বাঁচা ভার। অমাত্যের বাক্যে কর্তার হৃপদ্ম প্রফুল্ল হইল পরে লেখাপড়া পরিত্যাগ হইল বিষয় কৰ্ম্ম করিবার বয়েস হইয়াছেন এক্ষণে সেই ধুমে পড়িলেন তাহার উদ্যোগ ইহার বিশেষ পল্লবখণ্ডে প্রকাশ হইবেক।
অথ পল্লবখণ্ড।।
বাবুসকল আপন২ পছন্দমত যান বাহন পরিচ্ছদ অর্থাৎ পোষাক প্রস্তুত করিতেছেন যথা পালকী পেয়াদা ছাতা পিনীস পানসী গাড়ি জামা-যোড়া চাপকান পাজামা, পাপেষ পাগড়ী আমামা, লাড়ুদার, মোড়াসা, চাকা বাকা ইত্যাদি বিবিধ প্রকার উত্তম২ পোষাক প্রস্তুত হইল আপন২ স্বেচ্ছামত পোষাক পরিধানপূর্ব্বক দরবার অর্থাৎ কুঠী যাইবেন কেহ গাড়িতে কেহ পালকীতে আরোহণ করিয়া গমন করিলেন প্রথমে টালা কোম্পানি টেলর কোম্পানি ইত্যাদি দুই তিন নীলাম ঘরে যাতায়াত করিয়া বড় আদালতে উপস্থিত হইলেন ছোট আদালতে যাইবার যো নাই কারণ জুতার ভয় পল্লিগ্রামস্থ বাবুগণের পানসীতে আরোহণ করিয়া বাকবাজারের ঘাটে পানসী রাখিয়া আর দক্ষিণ অঞ্চলের বাবুরা অপূর্ব্ব২ ছকড়াসকলে আরোহণ-পূর্ব্বক সদরদেয়ানী কোট আপিল প্রভৃতি আদালতে গমন করিয়া আদালতের রীতিজ্ঞ অর্থাৎ আইন খবরদার হয়েন বেলা দুই প্রহর দুই ঘণ্টান্তর তিন ঘণ্টা হইলেই বাটী যাইবার উদ্যোগ করেন যাইবার কালে চীনাবাজার বেড়াইয়া চলিলেন ঘরে গিয়া পোষাক পরিত্যাগ মিষ্টান্ন জলপান করিয়া বৈঠকখানায় চমৎকৃত হস্তপরিমিত উচ্চ গদির উপর বসিলেন কাহার দুই কাহার চারি পাশবালিশ আছে, পিতলবান্ধা কেহ বা রূপাবান্ধা, কেহ সোনাবান্ধা হুঁকাতে, কেহ গুড়গুড়িতে, কেহবা আলবোলাতে তামাক খাইতে আরম্ভ করিলেন, পানের বাটা থাকেন, মধ্যে মধ্যে বামহস্তে দুই একটা মসলা বদনে [দেন], নানাবিধ খোসামুদে তোষামুদে বরামুদে বহ্বলে রমণীমেলক গাওক বাদক নর্তক নর্তকী ভণ্ডপ্রতারক এয়ার উমেদওয়ার দালাল মহাজন নবীন বাবু-দিগের নাম শুনিয়া যাতায়াত করিতে লাগিলেন বাবুসকল দ্বিতীয় ইন্দ্রতুল্য হইয়া বসিয়াছেন কেহ কেহ বাবু কিবা ধীর কি গভীর কেহ বলে বাবুর কিবা পাণ্ডিত্য কি বক্তৃতার তাৎপর্য্য জ্ঞান হয় সাক্ষাতে সরস্বতী কেহ কেহ কিবা সুধারা কি রসিকতা এমত প্রায় সম্ভব হয় না কেহ যদি আদালতের কথা জিজ্ঞাসা করেন তাহাকে পরামর্শ দানে তুষ্ট করেন আর অনেককে তোমাদিগের চাকরি করিয়া দিব ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের বিচার শ্রবণে কখন২ আমোদিত হয়েন শাস্ত্রের যথার্থ তাৎপর্য্য ব্যাখ্যা করেন, ইহাতে পণ্ডিত মহাশয়েরা কহেন বাবু প্রাকৃত "নশুষ্য নহেন। ঐ সকল লোকের মধ্যে দুই একজন বাবুর অতি-প্রত্যাশাপন্ন হয়েন, তাহারা পুরাতন বিলক্ষণ জুয়াচোর হরেক রকম কথার ধারা ও ব্যবহার জ্ঞাত আছেন বিদ্যাভিন্ন যে কোন বিষয়ে বাবু তুষ্ট থাকেন এমত চেষ্টা সর্ব্বদাই করেন, যদি বাবুর মনস্থ বুঝিতে পারেন, তবে ছায়াপ্রায় সর্ব্বদা খোযামদি করিয়া মিষ্টবাক্যে বাবুকে তুষ্ট রাখেন, দেখিলেন বাবু আমার কথাব্যতিরেক কিছুই না করেন শেষে ক্রমে২ বাবুগিরির লক্ষণ বিলক্ষণ রূপে উপদেশ করেন শুন বাবু টাকা থাকিলেই বাবু হয় না ইহার সকল ধারা আছে আমি অনেক বাবুগিরি করিয়াছি এবং অনেক বাবুগিরি জারিজুরি করিয়াছি এবং অনেক বাবুর সহিত ফিরিয়াছি রাজা গুরুদাস রাজা ইন্দুনাথ রাজা লোকনাথ তনু বাবু রামহরি বাবু বেণীমাধব বাবু প্রভৃতি ইহাদিগের মজলিষ শিক্ষাইয়াছি এবং যেরূপে বাবুগিরি করিতে হয় তাহাও জানাইয়াছি এক্ষণে বৃদ্ধাবস্থা প্রাপ্ত, তথাপি দিবারাত্রি বাহিরেই থাকি বাটীর কোন এলাকা রাখি না, সে যাহা হউক, সংপ্রতি শ্রীশ্রীপ্রসাদে তোমার পবিত্র চরিত্র দেখিয়া বাঞ্ছা হয় যে তোমার নিকট থাকি আর তুমি যেরূপে উত্তম বাবু হও এমত শিক্ষা করাইলে আমার মনস্থ বটে, আপন সর্ব্বদা নিকটে থাকিয়া বাবুগিরি শিক্ষা করেন এইরূপে কথোপকথনানন্তর কিরূপে বাবুকে উপদেশ করিতেছেন তাহা শ্রবণ করুন উপদেশক কহিতেছেন বাবুজী বাবুর লক্ষণ শ্রবণ কর।
মনিয়া বুলবুল আখড়াই গান, খোষ পোষাকী যশমী দান, আড়িঘুড়ি কানন ভোজন, এই নবধা বাবুর লক্ষণ। অতএব তুমি যেরূপে এ লক্ষণান্ত হও তাহা বলি। প্রথম এক কথা, যে সকল ভট্টাচার্য্যেরা আসিয়া থাকে তাহাদিগের সহিত বড় আলাপ করিবা [না] তাহারা কেবল প্রতারক কতকগুলিন শ্লোক পড়ে তাহার ভাবার্থই বুঝা যায় না, বুঝাইতেই পারে কেবল সর্ব্বদাই টাকা দাও২ এই কথা বই আর কোন কথা নাই অধিকন্তু লজ্জা ভঙ্গ মাত্র আর যদি দুই তিন ব্যক্তি একত্র হয় তবে এমত বিরোধ উপস্থিত করে যে সে স্থানে থাকা ভার হয়, আর ঐ হতভাগ্যদিগের বাক্যে কর্ণ জ্বলে যায়। আমার পিতা যাবৎ বর্তমান ছিলেন তাবৎ ও পোড়ায় বিস্তর পুড়িয়াছি; যে দিবস তাহার শ্রীশ্রী প্রাপ্তি হইল সেই দিবসাবধি শ্রীশ্রী আমাকে সুস্থির করিয়াছেন। ভট্টাচার্য্যদিগের সহিত আলাপ পরিত্যাগ করিয়াছি। আমাকে উহারা যখন কহিলেক বাবু শ্রাদ্ধের কি করিবা। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম যে শ্রাদ্ধের ফল কি। কহিলেক তাহাতে পিতৃলোকের তৃপ্তি হয়; আমি কহিলাম সম্বন্ধো জীবনাবধি, জীবনাবধিই সম্পর্ক, এক্ষণে তাহার সহিত সম্পর্ক নাই, ইহাতে যদ্যপি শ্রাদ্ধ করিতে হয়, তবে তুমি না কর কেন। আর যে ব্যক্তি অপূর্ব্ব সুশীতল নির্মূল জলে স্নান তৎপান মিষ্টান্ন ভোজন বিচিত্র বসনভূষণ পরিধান যানবাহনাদ্যা-রোহণ বারাঙ্গনাদি সেবন করে, সেই ব্যক্তিরি তৃপ্তি হয় নতুবা এক ব্যক্তি ঐ কৰ্ম্ম করিলে অন্য ব্যক্তির সুখ না হয় কেন, এবং কোন কালেও শুনি নাই যে মরা গরুতে ঘাসজল খাইয়া থাকে। হা বিধাতার কি বিড়ম্বনা, তোমাদিগের কিছু বৃদ্ধি দিলেন না। কেবল চিরকাল পড়িয়ে মরিলে, শাস্ত্রের কি তাৎপর্য্য তাহা কিছুই জানিলে না। এ সকল কথার উত্তর কিছুই না দিতে পারিয়া কতকগুলি মিথ্যা পাচালমাত্র পাড়িলেক। শেষে কহিলেক বাবুজী আর কিছু কর না কর, কিন্তু পিণ্ডদানটা করা আবশ্যক। তাহাতে কহিলাম আমি অদ্য উত্তম বুদ্ধিমতী পরমধাম্মিকা বকনাপ্যারী প্রভৃতির নিকট যাইব। তাহারা যেরূপ বলিবে তাহাই করিব। মহাশয় তাহারা আমাকে যেরূপ পরামর্শ দিয়াছিল তাহা শ্রবণ কর; আমাকে কহিলেক তুমি এক কৰ্ম্ম কর, বিষ্ণুপুরে জনেক ব্রাহ্মণকে ফুরাইয়া দেও শ্রাদ্ধ দশ পিণ্ড ব্রাহ্মণভোজনাদি যত কৰ্ম্ম সেই করিবেক। আমি ঐ বিষ্ণুপুরে এক ব্রাহ্মণ আনিয়া ৫ টাকা তাবৎ কৰ্ম্ম ফুরাইয়া দিলাম, বশ নিশ্চিন্ত হইলাম কোন উৎপাত নাই, স্বচ্ছন্দে দিব্য ধুতি পরিয়া চাদর দোলাইয়া একলাই এক পাটা উড়াইয়া লপেটা পায়ে দিয়া মজা করিয়া বেড়াই। তথাচ ভট্টাচার্য্যগুলান ছাড়ে না। তবে এক দিবস বিচার করিতে বসিলাম, অনেক২ ব্যাকরণনবীশ ও স্মৃতিওয়ালা ভট্টাচার্য্য আসিয়াছিল। প্রথম এক কথা জিজ্ঞাসা করিলাম যে তোমরা শাস্ত্রের ফল দেখাইতে পার কিনা। তাহারা কহিলেক, না। আমি কহিলাম তবে তোমাদিগের শাস্ত্র কি প্রকারে মান্য হইতে পারে, যাহা আপন চক্ষে দর্শন করি তাহাই মানি। আর এক কথা কহিলাম যত ভট্টাচার্য্য আছে ইহারা সকলেই পাষণ্ড অর্থাৎ পাপী উহার-দিগের পাপের ভোগ প্রতিদিন এই স্থানে হইতে দেখেছ। কি শীত, কি গ্রীষ্ম কি বর্ষা তাবৎ কালেই প্রাতঃস্নান করিয়া থাকে এবং কম্পিত কলেবর পুরঃসর সর্ব্বাঙ্গে মৃত্তিকা লেপন করে, আর কম্পিত ওষ্ঠাধর হইয়া স্তব কবচ পড়ে, শীতকালে শিশিরাভিষিক্ত পুষ্পাদি আহরণ করিয়া বেলা আড়াই প্রহর তৃতীয় প্রহর পর্যন্ত পূজা করে আর সন্ধ্যাকালে সিদ্ধপক্ক আতপ তণ্ডুলের অন্ন আহার, ইহাতে হইয়াছে তাম্বুলবিবর্জিত, তাহাতে হাঁই উঠিলে মুখের দুর্গন্ধে কাহার সাধ্য যে সে স্থানে থাকে, সকলেই মনে২ করে এপাপ এস্থান হইতে গমন করিলেই বাঁচি। দেখ এ পাপের ভোগ বটে কিনা। আর এক কথা কহিলাম, স্মৃতিপুরাণ পড়িলেই পণ্ডিত হয় না, বুদ্ধি অপেক্ষা করে, শ্রীশ্রী বুদ্ধি দেন নাই, যদি তাহা থাকিত তবে এত ক্লেশ পাইতে না। তোমরা এক দিবস সন্ধ্যা পূজা বন্দনাদি না করিয়া দেখ দেখি, যাহা আহারাদি করিয়া থাক তাহা গলাধঃকরণ হয় কিনা, আর এক দিবস পিতৃলোকের শ্রাদ্ধ তর্পণ না করিয়া দেখ দেখি, তোমারদিগের ঘাড়ে তাহারা ভূত হইয়া চাপে কি না। এই দেখ আমি শ্রাদ্ধাদি কিছুই করিলাম না, ইহাতে আমার কি ক্ষতি হইয়াছে। এই কথা বলিবাতে ভট্টাচার্য্যেরা ক্রোধান্নিত হইয়া প্রস্থান করিল, পুনর্ব্বার আইল না। অতএব বাবুজি তোমাকে কহিতেছি অরসিক পণ্ডিতাভিমানী নির্বোধ ভট্টাচার্য্যেরা আগমন করিলে কদাচ [আসিতে] আজ্ঞা হয় বসিতে আজ্ঞা হয় এমত বাক্য কহিবা না, যদ্যপি কিঞ্চিৎ দিতে হয় তবে কহিবা সময়ানুসারে আসিবা এইরূপ মাসেক দুই মাস প্রতারণা করিয়া কিঞ্চিৎ দিবা ইহাতেও তাহাদের জ্বালায় থাকা ভার হইবেক। দ্বিতীয় উপদেশ। গাওনা বাজনা কিছু শিক্ষা কর যাহাতে সর্ব্বদা জিউ খুসি থাকিবেক এবং যত প্রধানা নবীনা গলিতা যবনী বারাঙ্গনা আছে ইহাদিগের বাটীতে মধ্যে মধ্যে যাতায়াত করিয়া ঐ বারাঙ্গনাদিগের সর্ব্বদা ধনাদি দ্বারা তুষ্ট রাখিবা, কিন্তু যবনী বারাঙ্গনা-দিগের বাই বলিয়া থাকে, তাহা সম্ভোগ করিবা, কারণ পলাও অর্থাৎ পেয়াজ ও রশুন যাহারা আহার করিয়া থাকে তাহারদিগের সহিত সম্ভোগে যত মজা পাইবা এমত কোন রাঁড়েই পাইবা না। যদি বল যবনী বেশ্যা গমন করিব ইহাতে পাপ হইবেক তাহা কদাচ মনে করিবা না। সুখজনক কৰ্ম্ম করিলে যদি পাপ হইবে তবে কি শ্রীশ্রী সুখসাধন ইন্দ্রিয়কে সজনক কৰ্ম্মে নিযুক্ত করিতেন। শ্রীশ্রী পরম দয়াল তিনি তাবৎ ইন্দ্রিয় সৃষ্টি করিয়া সকল ইন্দ্রিয়কেই সুখ নিমিত্ত আপন২ কৰ্ম্মে নিযুক্ত করিয়াছেন। দেখ হস্ত ইন্দ্রিয় দ্বারা আহার করিতেছে চক্ষুরিন্দ্রিয় দ্বারা দেখিতেছে তাহাতে লোক পরম সুখী হইতেছে ইহাতে কি পাপ হইয়া থাকে আর যাহাদিগের পূর্ব্বজন্মে অনেক তপস্যা থাকে, তাহারাই উত্তম স্ত্রী সম্ভোগ করে, অল্প তপস্তায় উত্তম স্ত্রী সম্ভোগ হয় না, যদি বেঙ্গা গমনে পাপ থাকিত তবে কি উর্ব্বশী, মেনকা, রামরস্তা, তিলোত্তমা প্রভৃতি বেশ্যার সৃষ্টি হইত। অতএব বাবু তোমাকে কহিতেছি তুমি সর্ব্বদা যবনী বারাঙ্গনা সম্ভোগ করিবা, ইহাতে যদ্যপিও পাপ হয় আমি তাহার নিশা করিব। দেখ আমার পিতা ৪।৫ লক্ষ টাকা রাখিয়া গিয়াছিলেন তাহা আমি কেবল বাই নাচ ও বাই সঙ্গে মজা করিয়া উড়ায়েছি। তৎপরে ঐ সকল রাজাদিগের নিকটে যখন যাহা পাইয়াছি তাহাও ঐ বাই ও বেশ্যারদিগকে অর্পণ করিয়াছি। এক্ষণে কড়াকপর্দক নাই, আর আমি অদ্যাপি আপন স্ত্রীর মুখ সন্দর্শন করি নাই ইহাতে আমার কি পাপ হইয়াছে। যদ্যপি বেশ্যাদি গমন ও বাই সম্ভোগে পাপ থাকিত তবে পাপে রোগ অবশ্যই হইত। যাহাদিগের শাস্ত্রের তাৎপর্য্য বোধ নাই এবস্তৃত ভট্টাচার্য্যরা কহিয়া থাকে ইহলোকে পাপপুণ্য করিলে পরলোকে ভূগিতে হয়, বাবুজি সে কথা মাত্র জানিবা; যদি বল লুচ্চ বলিয়া সকল লোকে নিন্দা করিবেক তবে তাহার কিছু বৃত্তান্ত শ্রবণ কর।
লোক যারে বলে লুচ্চ;
সে কেবল জানিবা কুচ্ছ,
লুচ্চ বিনা মজা জানে নাই।
মারে মণ্ডা আদা ছেনা,
সদা থাকে বাবুআনা,
সোনাদানা তুচ্ছ তার ঠাঁই।
মাতা পিতা দাদা ভাই,
কাহার তোয়াক্কা নাই,
দুঃখী [নাহি] হয় কার দুখে।
কেহ যদি কটু বলে,
সে কথা না গায়ে তোলে,
সর্ব্বদা সরল কথা মুখে।
বুদ্ধির নাহিক ওর,
নরমেতে করে জোর,
গরমে নরম তার কাছে।
যার সঙ্গে কোন ঠাঁই,
কোন কালে দেখা নাই,
যেন কত আলাপন আছে।
লুচ্চ হলে দাতা হয়,
কাহারো না করে ভয়,
কেবল প্রেমের বশ রয়।
যে জন পিরিতে রাখে,
তার প্রেমে বন্দী থাকে,
তার জন্য বহু দুখ পায়।
মড়ার মাথার চুল,
হাতেতে চড়ায় গুল;
ছাড়য়ে আপন কুলধৰ্ম্ম।
জালে যেমন বন্দী মীন,
সেইমত রাত্রি দিন,
প্রেমজালে বন্দী তার মর্ম্ম ॥
যেমন পঙ্কজ মাঝে,
বন্ধ থাকে অলিরাজে,
যদ্যপি মুদিত হয় পদ্ম।
তথাচ কমলদল,
ভ্রমরে না করে বল,
প্রেমেতে পদ্মের মাঝে বদ্ধ।
সদা মজা হাসিখুসি,
করে ফেরে দিবানিশি,
পরকাল নাহিক ভাবনা।
নাহি ভাবে পুণ্য পাপ,
শরীরে না দেয় তাপ,
শোক তাপ নাহিক যাতনা ॥
করে গিয়া বেশ্যাবাজি,
যদি বল কৰ্ম্ম পাজি,
মন শুচি হলে পাজি নয়।
যাহার যাহাতে রুচি,
সেই দ্রব্য তারে শুচি,
তার তাতে হয় সুখোদয়।
বেশ্যা যদি নীচ হয়,
নীচ হয়েও নীচ নয়,
উত্তম সমাজে হয় ধন্য।
দেখ কালিদাস নাম,
সুপণ্ডিত গুণধাম,
ছিলেন অতি মহারাজার মান্ত।
বেস্তার সংহতি,
করেছিলেন মহামতি,
সুবিদিত আছে সর্ব্বজনে।
ততোধিক কেবা আছে,
পণ্ডিত ধরণীমাঝে,
অদ্যাপি না সে পণ্ডিতে মানে।
দেখ এই ধরাতলে,
কবিকুলগুরু বলে,
খ্যাত আছে পণ্ডিত মহলে।
দেখ দেবরাজের কাছে,
উর্ব্বশী প্রভৃতি আছে,
তাহে তিনি মগ্ন কুতূহলে ॥
অন্য২ সুখের সৃষ্টি,
করি বিধি পরে মিষ্টি,
করিলেন সুখের সৃজন।
বেশ্যাকুচ বিমদ্দন,
যতনেতে আলিঙ্গন,
আর তার শ্রীমুখ চুম্বন।
বেশ্যার আলয়ে বসি,
এইরূপ দিবানিশি,
তুমি বাবু কর আচরণ।
ইহাতে অন্যথা কভু,
মনে না ভাবিবে বাবু,
হইবেক দুখ বিমোচন ॥
তৃতীয় উপদেশ। প্রতি রবিবারে বাগানে যাইবা মৎস্য ধরিবা সকের যাত্রা শুনিবা নামজাদা২ বেশ্যা ও বাই ইহারদিগের নিমন্ত্রণ করিয়া বাগানে আনাইবা বহুমূল্য বন্ধু হার হীরকাঙ্গুরীয়ক অর্থাৎ হীরার আংটি ইত্যাদি প্রদান করিয়া তুষ্ট করিবা আমি সঙ্গে থাকিব দেখিবা কি মজা হইবেক ইহার বিশেষ২ বিবরণ কুসুম খণ্ডে করিব।
চতুর্থ উপদেশ। যাঁহার চারি পরিপূর্ণ হইবেক তিনি হাপবাবু হইবেন। পয়ের বিবরণ পাশা পায়রা পরদার পোষাক। যাহার চারি প চারি খ, এই দুই পরিপূর্ণ হইবেক তিনি পুরা বাবু হইবেন। খয়ের বিবরণ খুসি খান-কী খানা খয়রাত। আর কেরাণি ও মুনসী ইহাদিগের জবাব দেও। যে বিদ্যা হইয়াছে তাহাতেই বশ আছে। মুনসীগিরি ও মহুরিগিরি কিম্বা কেরাণিগিরি ইহা কিছুই করিতে হইবেক না। ইহাদিগের যাহা দিয়া থাক তাহা দিয়া বৈঠকখানায় এক রাঁড় আনিয়া রাখ তাহা নিয়া বৈঠকখানায় থাকিবেন কেন মিছা কেতাব বহি ও পুথি লইয়া মেজাজ খারাপ করিবা, উহাতে কি সুখ হইবেক। আমার পিতা আমার নিমিত্ত কেরাণি ও মুনসি রাখিয়াছিলেন, আমি যদ্যপি তাহারদিগের নিকট এক দিবস বসিয়া থাকি কিম্বা তাহারদিগের সহিত আলাপ করিয়া থাকি তবে দিব্য বল তাহাই করিতে পারি। কোন শালা আপন নাম লিখিতে জানে, বাবুজি যদি লেখাপড়ায় ঘোর পড়িতাম তবে কি এত মজা করিতে পারিতাম। যাহারা লেখাপড়ায় ঘোর পড়িয়াছে ও স্মৃতি পুরাণাদি শাস্ত্র দেখিয়াছে তাহাকে তাবৎ সুখ হইতে শ্রীশ্রী বঞ্চিত করিয়াছেন। দেখ তাহারা অপূর্ব্ব স্বতপক মিঠাই মতিচুর জিলাপী পোলাও পানতুয়া প্রভৃতি ভোজন ও স্কুলনিতম্বিনী মধুর-ভাষিণী গজেন্দ্রগামিনী ঝটিতি চিত্তহারিণী কেশবিলাসিনী ক্ষীণকটি কঠোরকুচা বেশ্যাদি গমনে পাপ বোধ করিয়া কেবল সর্ব্বাঙ্গে মৃত্তিকা লেপন পুরঃসর সিদ্ধ পৰু ভোজনে অলৌকিক দেবপূজাদি করিয়া বৃথা কালক্ষেপণ করিতেছে। আর দেখ চিরকাল লেখাপড়া করিয়া মরিলেই বা কি হইবেক তাহাতে দ্বিভুজ ঘুচিয়া কি কেহ চতুর্ভুজ হইয়াছে।
বাবুজী চক্ষু মুদিয়া দেখ, কে কাহার। এই সকল বাটী ঘর দরজা ও টাকাকড়ি কে কোথায় থাকিবেক, মরিয়া গেলে কেবল দুই কাচামাত্র সঙ্গে দিয়া বিদায় করিবেক। অতএব বাবুজী এই সংসার মজার বাজার, যদি মজা করিতে পার তবে তাহাই থাকিবেক, মরিয়া গেলেও দশ এয়ার ও রাড় ইহারা নাম করিবেক, আর কহিবেক অমুক বড় মজাদার লোক ছিল। এই সকল কথা গুনিয়া বাবু কহিলেন যে লেখাপড়া না জানিলে ধন উপার্জন কি প্রকারে হইবেক, উত্তরে পূর্ব্বজন্মার্জিত। বিদ্যা পূর্ব্বজন্মার্জিতং ধনং, যে ব্যক্তি পূর্বজন্মে বিদ্যা ও ধন উপার্জন করিয়া থাকে সেই ব্যক্তি এই জন্মে ধন ও বিদ্যা অনায়াসেই প্রাপ্ত হয় নতুবা ইহজন্মের চেষ্টায় কি ধন ও বিদ্যা হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি নানাপ্রকার বিদ্যা উপার্জন করিয়াছে সে ব্যক্তিও নির্জন হইয়াছে আর যে ব্যক্তি কখন লেখাপড়ার নামগন্ধও করে নাই সে ব্যক্তিও ধন উপার্জন করিতেছে। দেখ অমুক নামক 'এক ব্রাহ্মণ কখন লেখাপড়া করে নাই, এক ব্যক্তির বাটীতে পাচক ব্রাহ্মণ অর্থাৎ রান্ধনি ব্রাহ্মণ হইয়াছিল। তৎপরে দালালির পন্থা ধরিয়া তালুক মুলুক করিয়া এয়ারদল লইয়া বসিয়া সর্ব্বদা জীউ খুসি করিতেছে, তাহার পুত্র ও ভ্রাতৃপুত্র ইহারা লেখাপড়া শিখিয়া দেশ-বিদেশে চাকরি করিয়া ফিরিতেছে। দেখ দেখি, ইহার সুখী কে। বাবু এই উপদেশ শ্রবণ করিয়া আপন পিতার তাবঘৃত্তান্ত স্মরণ করিলেন আর কহিলেন বা এয়ার খলিপা ত হক কথা কহিয়াছ, আমি অদ্যাবধি লেখাপড়া পরিত্যাগ করিয়া তোমার মতাবলম্বী হইলাম, ইহাতে যদি তোমার মনে সন্দেহ হয় তবে আমাকে দিব্য করাও, তুমি যখন যেরূপ করিবা তখন তাহাই করিব। খলিপা কহিলেন তোমাকে দিব্য করিতে হইবেক না, তুমি অতি সুবোধ ইহা জ্ঞাত হইয়া তোমাকে এরূপ উপদেশ করিলাম, নতুবা অপাত্র জানিলে এরূপ উপদেশ কি তোমাকে করাইতাম। বাবু খলিপার এইরূপ উপদেশ পাইয়া কিরূপ খুসির কর্ম করিতে আরম্ভ করিলেন তাহা শ্রবণ করুন ইতি।
অথ কুসুম খণ্ড॥
ফুলবাবু অর্থাৎ বাবু ফুল হইলেন। খলিপা সঙ্গে কখন বাগানে কখন নিজভবনে নানাজাতি প্রমোদিনী বিবিধ বিলাসিনী বারাঙ্গনা আনয়নপূর্ব্বক আপন [মন] খুসি করিতেছেন। খুসির তাবৎ বৃত্তান্ত বর্ণনে অক্ষম হইলাম, এক দিবসের কিঞ্চিৎ বর্ণনা করি; খলিপা কহিলেন, কল্য বাগানে সকল রকম মজা দেখাইব; কিন্তু পাঁচ শত টাকা অদ্য ব্যয় করিতে হইবেক। বাবু কহিলেন খলিপা অদ্য আমার হস্তে একটি টাকাও নাই, সংপ্রতি টাকার কি হইবেক। খলিপা কহিল বাবুজী আমি তোমার নিকটে যত দিবস থাকিব তত দিবস টাকার নিমিত্ত মজা ভঙ্গ হইবে না, কেবল তুমি আপন নাম সহি করিয়া দিবা। বাবু আহলাদসাগরে মগ্ন হইয়া তাহাই স্বীকার করিলেন, আর কহিলেন শীঘ্র টাকার সুযোগ অর্থাৎ ফিকির করহ। খলিপা কাপ্তেনি আফিসে খবর দিয়া তৎক্ষণাৎ দুই জন দালাল আনিয়া বাবুর নিকটে নিযুক্ত করিলেন, দালালেরা কহিলেক বাবুজী কত টাকা চাহি আজ্ঞা করুন, বাবু কহিলেন পাঁচ শত টাকা; দালালেরা একে হনুমান, তাহাতে যদি আজ্ঞা পান, তবে তৎক্ষণাৎ নক্ষত্রবেগে মহাজনের বাটীতে হয়েন ধাবমান, মহাজন ব্যাধের প্রায় ফাঁদ পাতিয়া আছেন, কে ফাঁদে পড়ে তাহাই সর্ব্বদা নিরীক্ষণ করিতেছেন, দালালেরা কহিলেক মহাশয় অভাগা অজা পাইয়াছি, পাঁচ শত টাকা চাহে, মহাজন কহিলেক তাহার নাম কি এবং পিতার বা কি নাম, বাটী কোথা, দালালেরা কহিলেন এক্ষণে ওসকল কথায় প্রয়োজন নাই, আপনকার জ্ঞানেও এমন শিকার পান নাই, ইহার নাম জগদ্ব্দুল্ল'ভবাবু, পিতার নাম রামগঙ্গা নাগ, হরেক রকম সওদাগরি আছে বেলেঘাটায় চুনের গোলা, জক্সনের ঘাটে থল্যার দোকান, খাতা-বাটীতে মুটের সরদারি প্রায় লক্ষ দুই লক্ষ টাকার সম্ভাবনা হইবেক। মহাজন আপন লিষ্টি বাহির করিলেক, তাহার ঐ লিষ্টিতে লেখা আছে যে কোন লোক ধনী অবিরোধী অজাতুল্য এবং সন্তানকে অধিক স্নেহ করে, ঐ লিষ্টির মধ্যে রামগঙ্গা নামও লেখা আছে আর দেখিলেক এ লোক কখন আদালত দেখে নাই এবং উকীল কৌনসলী কি কৰ্ম্ম করে তাহাও জ্ঞাত নহে, মহাজন আপন লিষ্টিতে এই সব অবগত হইয়া মহাতুষ্ট হইল; পরে দালালদিগকে কহিলেক পাঁচ শত টাকা দিব দুই হাজার টাকার খত সহি করাইতে হইবেক, তোমরা দালালি সেই স্থানে লইবা; যাও বাবুর সহিত রফা কর। বাবু বৈঠকখানায় খলিপাকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন অদ্য কি মজা হইবেক আর এফ একবার জিজ্ঞাসা করিতেছেন টাকা পাওয়া যাইবেক কি না। খলিপা কহে টাকার কারণ উদ্বেগ করিবা না, যাহারা এক কথায় টাকা না দেয় এমত লোকের সহিত ব্যবহার ও আলাপ করি না, বাবুকে এত২ টাকা দেওয়াইয়াছি, এই যত হুমরা চুমরা দেখিতে পাও এক্ষণে কেহ ঝকমারি দলের রাজা, কেহ পাখির দলের সদ্দার, সকের যাত্রানির্ব্বাহক ইহারা সকলেই আমার কাছে তালিম হইয়াছে, কোন বেটাকে আমি টাকা না দেওাইয়াছি, ইহারা কএদ হইয়াছে ইহাদিগের পিতার কাছে গমনাগমন করিয়া খালাস করিয়াছি। তোমাকে একেবারই কহিয়াছি আমি নিকটে থাকিতে কোন পেঁচ নাই, স্বচ্ছন্দে মজা কর, কেবল আমার কথাপ্রমাণে চলিবা। এমত [সময় সমুদয় দালালেরা আসিয়া কহিলেক বাবুজী টাকা স্থির করিয়াছি কত স্থানে ভ্রমণ করিলাম তাহা কি কহিব কেহ দিতে চাহে না তৎপরে এই সুর বাবুর নাম ভিউয়ের দিনে অর্থাৎ খতের মেয়াদ পূর্ণ হইলে টাকা না পাও আমরা দিব। বাবু কহিলেন তোমারদিগের সহিত সে মহাজনের কি প্রকার আলাপ। দালালেরা কহিলেক বাবুজী এ কৰ্ম্মে আমরা নূতন ব্রতী নহি আপনি জ্ঞাত নহেন আমরা এই কৰ্ম্ম করিতে২ প্রাচীন হইলাম, আমাদিগের বাটা ছিল কোড়াগাছি, তাহা কে না জানে, এই সুরবাবু সকলি জানেন ঞিহাকে কত টাকা দেওয়াইয়াছি এবং আমরাও ইহার স্থানে কত টাকা পাইয়াছি, যদি ইহার টাকা কিম্বা দুই চারিখান বাটা থাকিত তবে আজি আমারদিগের কি ভাবনা ছিল। সে যাহা হউক এক্ষণে আমারদিগের কি দালালি দিবেন, বাবু কহিলেন খলিপাজী যাহা দিতে কহিবেন তাহাই দিব। পরে খলিপা বাবুর সহিত পরামর্শ স্থির করিয়া কহিলেন তোমারা দুই জনে ৫০ টাকা পাইবা, দালালেরা এ কথা শুনিয়া কহিলেন মহাশয় একি কথা আপনি পাঁচ শত টাকা লইবেন আমাদিগকে পঞ্চাশটি টাকা দিবেন এমন কথা কখন শুনি নাই, যদি কোন লোক দুই শত টাকা লয় সেও পঞ্চাশ টাকা দেয় এইরূপ অনেক কথোপকথনের পর এক শত টাকায় রফা হইল, ইহাতে বাবু কিঞ্চিৎ বিরস হইলেন যে পাঁচ শত টাকার কমে এ কর্ম নির্ব্বাহ হইবেক না ইহার মধ্যে এক শত টাকা দালালদিগকে দিতে হইবেক ইহাই ভাবিছেন। গলিপা কহিলেক বাবুজী এক কথা আছে দালালি টাকা খতের উপর চড়াইয়া দেও, বাবু কহিলেক এ কথা ভাল আমি ইহা স্বীকৃত আছি। ইহা শুনিয়া দালালেরা তৎক্ষণাৎ মহাজনের নিকট গমন করিয়া দুই হাজার এক শত টাকার এক লোট লেখাইয়া আনিল বাবু সহি করিলেন টাকা খলিপা বুঝিয়া লইলেন, মহাজনের তরফ তিন লোক আসিয়া বাবুকে জিজ্ঞাসা করিলেন বাবুজী এই নোটের বেবাক টাকা পাইয়াছেন। বাবু কহিলেন হাঁ পাইয়াছি। পরে টাকা লইয়া খলিপা মজার নিমিত্তে দ্রব্যাদির আয়োজন করিছেন।
বিলাতি ছিপ সুতাদি মৎস্য ধরিবার তাম্বু তাকিয়া কনাৎ বিবিধ প্রকার বিছানা ছলিচা গালিচা আদি শোভাযুত আতরদান গোলাপ-পাশ রৌপ্যবিনির্মিত আলবোলা গুড়গুড়ি আদি হুকা পানদান গুল টীকা তামাকু ভেলসা অঙ্কুরি প্রধান দোকতা কড়া গাঁজা চরস সিদ্ধি আদি যত এলাচি লবঙ্গ পান মসলা শত শত খাদ্য মদ্যমাংস মণ্ডামিঠাই মতিচুর খাজাগজা সরভাজা অতি সুমধুর কাঁচাগোল্লা বাদামতক্তি আতা অনুপম, বঁদে মোহনভোগ মনোহরা অনুত্তম। জনায়ের রসকরা মুড়কি খাকড়ার অতি অনুপম মুক্তি ফরাসডাঙ্গার ধনেখালির খৈচুর শান্তিপুরের মোয়া, বর্তমানের ওলা, বীরভূমের নবাত মেওয়া। এইরূপ নানাবিধ দ্রব্য আয়োজন খলিপা করিলেন অতিতুষ্টতম মন।
তৎপরে ভৃত্যগণের নিরূপণ, খানসামা খেজমৎগার ফরাস হুকাবর্দার পাঙ্খাবর্দার ইহারদিগের ঐ সকল দ্রব্যাদির সহিত বাগানে পাঠাইলেন। অনন্তর [৩৫] খলিপা গায়েন গুণি জনকে দুই জন মোছাহেব-দিগকে বাগানে যাইতে নিমন্ত্রণ করিলেন। বাবু দুই চারি জন এয়ার সঙ্গে লইয়া অপূর্ব্ব চেরেট গাড়িতে আরোহণ করিয়া হাস্যবদনে হৃষ্টান্তঃকরণে বাগানে প্রস্থান করিলেন। তৎপরে পরমবেশা শ্বেতকেশা গলিতমাংসা গলিতযৌবনা ভগ্নদশনা রতিপণ্ডিতা বহুমানিতা মধুরভাষিণী নিবিড়নিতম্বিনী বারাঙ্গনাপ্রধানা বকনাপেয়ারি কোঁকড়াপেয়ারী দামড়া-গোপী ঝানঝাড়া রাধামণি ছাড়ুখাগি মণি জয়াবিবি প্রভৃতি আপন২ সহচারিণী অর্থাৎ ছুরী সঙ্গে লইয়া খলিপা সমভিব্যাহারে বাগানে আগমন করিলেন ॥
কিবা কেশছটা, নবমেঘ ঘটা; দেখিয়া চমরী, মনে লাজ ধরি। ভ্রূ কামধনু, রতিরূপ তনু, মৃগী দেখি হইল বিমুখী। গিধিনী জিনিয়ে, শ্রুতিযুগ দিয়ে, বিধি নির্মাইলে, বসিয়ে বিরলে, মুখশোভা জিত, হলো রাত্রিনাথ, বীণাবাদ্য জিনি, শ্রবে মঞ্জুধ্বনি, নাসিকা দেখিয়া, নিজ লাজধিয়া, তিলপুষ্প গেল, অতুর হইল, কিবা দন্তপাটী, রাঙ্গা ওষ্ঠ দুটি, উপমা কি দিব, কোথা কি পাইব, গলদেশ শোভা, বুঝিয়া লইবা, কি কহিব দ্যুতি, আমি মন্দমতি। কুচকান্তি হেরি, অতি দুঃখী করী, নিজগর্ব্ব হরি, গেল কুঞ্জে ফিরি, কটি ক্ষীণ দেখি, মৃগরাজ দুখি, নাভিকুণ্ডে অতি, মৃদু লোমপাঁতি, উরূদেশোপরি, কি নিতম্ব ভারি, 'গেল ঘোর বনে, বলে ধিক্ জীবনে। বুঝি পদ্ম বিধি, হলো এই অবধি, দেখিয়ে চালনা, যোগী কি ভুলে না। উরু আভা দেখি, করিশুও দুঃখি, রামরম্ভা আর, ধরে লাজভার, নাহি ভূমিতলে, ভুজতুল্য মিলে, উপমা কি হবে, ভাবি রাত্রিদিবে। মৃণালে তুলনা, নহে সম্ভাবনা, উপমা কি দিতে, পারি কণ্টকীতে। আহা মরি২, নখশোভা হেরি, বিধু লাজভরে, গেল খউপরে। ভাবি রাত্রি দিনে, বিধি এক মনে, এ কি নির্মাইলে, সবে তাপ দিলে। চলিল অবলা, পরে কাণবালা, আর কর্ণমূলে, ঢেড়ি ঝুমকা দোলে। বীরবৌলি দোলে, চলে কুতূহলে, আর পঞ্চনরী, হেমহার পরি। মণিমুক্তাযুতা, গলে হারলতা, উচ্চ কুচ ভূষিতে হাসিছে। মুদ্দক ভুজে, হেমবাজু সাজে, মৃদু যুগ্ম করে, পলা হেমপরে, হেম [ময়] বালা, নব চন্দ্রকলা, নব রত্নে ধরে, তম দূর করে। সুনিতম্ব মাঝে, হেমহার সাজে, আছে পাদোপরে, মলে কান্তি ধরে। কিবা ক্ষীণ কটি, তাহে সূক্ষ্ম শাটী, পরিছে রূপসী, দেখে লাজ বাসি, মৃদু হাস্য মুখে, যদি যোগী দেখে, পড়ে কামজালে, দূরে যোগ ফেলে।
অনন্তর ইহারদিগের ভক্তগণ এবং নর্তক কেশে পটো কৃষ্ণচন্দ্র ছুতার আর নানাবিধ নর্তকী তাহাদিগের নামে প্রয়োজনাভাব যেহেতু তাহাদিগের বসতিস্থান খালাসিটোলা আর যাহারা বিবাহাদি সময়ে রাস্তায় সর্ব্বাগ্রে তক্তারামায় আরোহণ করিয়া নৃত্য করে এমত নর্তকী প্রায় তিন চারি সম্প্রদায় আইল। তৎপরে সকলের আগমনান্তরে বাবু-জনসমাজপূজ্যা বারাঙ্গনাগণধন্যা বকনাপেয়ারী প্রভৃতির নিকটে নব-বাবু গললগ্নীকৃতবাসা হইয়া করপুটে কহিলেন আপনারা স্নান করুন। তৎপরে অন্য ভক্তগণ আসিয়া বাবুর আজ্ঞামত আতর মর্দ্দন করাইলেক, কাঁচাগোল্লা দিয়া মাথা ঘষাইয়া দিলেক, নিৰ্ম্মল পুষ্করিণীজলে স্নানকালে জলক্রীড়াছলে কুতূহলে ভক্তগণের বহু সমাদরে ভক্তগণেরা গোলাপ-জলে শরীর ধৌত করাইলেক সেই সময়ে খালপা এক গাঁটি বস্ত্র আনিয়া উপস্থিত করিলেন শান্তিপুর অম্বিকা বাদাগাছি ঢাকা চন্দ্রকোণা খাস-বাগান বরাহনগর প্রভৃতি নানা স্থানের শাটী শালপেড়ে কাঁকড়াপেড়ে লালপেড়ে নীলপেড়ে তাবিজপেড়ে বরানগুরে ডুরে ব্যক্তিবিশেষে২ প্রদান করিলেন। তৎপরে আনন্দকাননে অপূর্ব্বাসনে সর্ব্বজনে প্রফুল্ল বদনে বেশ্যা সন্নিধানে উপবিষ্ট হইলেন। সেই আসনে ভৃত্যগণেরা নানাবিধ সুখাদ্য মিষ্টান্ন মদ্য মাংস প্রভৃতি আনিয়া প্রস্তুত করিলেক, ইতোমধ্যে এক নির্বোধ পূর্ব্বদেশীয় বাঙ্গাল ব্রাহ্মণ কহিলেক যে ভোজনকালে পৃথক্ স্থান করিতে হইবেক, এমত সময়ে খলিপার কুলপুরোহিত শিরোমণি কহিলেন ওরে নরাধম মূর্খ শাস্ত্র জানিলে না এক্ষণে এ স্থানকে ভৈরবীচক্র বলা যায়, ভৈরবীচক্রে জাতিবিচার নাই, প্রমাণং যথা আগতা ভৈরবীচক্রে সর্ব্বে বর্ণা দ্বিজোত্তমাঃ। পীত্বা পীত্বা পুনঃ পীত্বা পুনঃ পততি ভূতলে। উত্থায় চ পুনঃ পীত্বা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে। মাতৃযোনিং পরিত্যজ্য বিহরেৎ সর্ব্বযোনিষু ইত্যাদি প্রমাণ শুনিয়া সকলে হৃষ্টচিত্ত হইল, হিন্দু মোছলমান বেশ্যা সাধারণ তাবতেই নির্মলান্তঃকরণে একাসনে বিবিধ মদ্য মাংস প্রভৃতি নানা দ্রব্য ভোজন করিলেন, তৎপরে নানাবিধ মসলাসম্বলিত তাম্বুল ভোজন অনন্তর নানা প্রকার তামাকের আয়োজন কড়া দোক্তা ভেলসা অম্বরি গাঁজা খায় কেহ চরস খায় কেহ বলে হায়২ কেহ নৃত্য করে কেহ তাড় মারে কেহ হাসিছে কেহ কান্দিছে কেহ খেলিছে কেহ দুলিছে কেহ পড়িছে কেহ বলে বড় মজা ওহে বাবু তুমি এয়ারের রাজা, কেহ বলে মেদরা বুঝি অল্প আসিয়া-ছিল হিজন বিবি বসাক বাবু এই দুই জনে সকলি খাইল, কেহ ঘরে ঢুকিল, কার্ক খুলিয়া সরাপ ছয়লাপ করিল, কেহ মৎস্য ধরে কেহ গুপ্তঘরে, কেহ মুজিয়াছে কালোয়াতের গানে, কেহ বেশ্যামুখচুম্বনে কেহ আলিঙ্গনে কেহ স্তনমর্দনে কেহ বলে তয়ফাওয়ালি কি মজা দিলি, এইরূপ খুসিতে স্বদেশী বিদেশী সকলেই নববাবুর মনোভিলাষ পূর্ণ করিলেন, এই প্রকার রাগরঙ্গে দিবারাত্রি গত হইল প্রভাতে তাবতে স্বস্থানে প্রস্থান করিল, এই রীত্যনুসারে কখন নিজাগারে কখন বেশ্যামন্দিরে বাবু মজা করিয়া বেড়ান, যানে কিম্বা বাহনে আরোহণ করিয়া কখন মাহেশের স্নানযাত্রা সন্দর্শনে যান কখন কুঠী গিয়া থাকেন কখন নিলামঘরে কখন চিনাবাজারে কখন আদালতের ঘরে কখন মেং ডেবিড হের সাহেবের দোকান ঘরে গমনাগমন করেন বাটী আসিয়া বৈঠকখানায় বসিয়া শাল ও কাপড় খরিদ করেন পাঁচ শত টাকায় শালযোড়া খরিদ করিয়া আড়াই শত টাকায় বিক্রয় করেন এবং নিলামে এক হাজার টাকায় গাড়ি ক্রয় করিয়া অন্য ব্যক্তিকে চারি শত টাকায় বিক্রয় করেন এইরূপে সওদাগরি কর্মেও তৎপর হইলেন অনেক টাকা হস্তে আইসে, কর্তা জিজ্ঞাসা করিলেন এই শালযোড়া কত টাকায় খরিদ করিয়াছ, বাবু কহিলেন অমুক সাহেব আমাকে এই শালযোড়া বকশিস দিয়াছে কিন্তু দিলবাগ শালওয়ালা দিয়াছে তাহা পশ্চাৎ বোধ হইবেক অনেকবার লাট ফেরাফিরি হইল দোকানদার মহাজনের পুঞ্জ২ টাকা দেনা হইলেন মহাজন লোকেও আর দেয় না দিলেও বা পায় না সর্ব্বদা তাহারা বাবুর নিকটে যাতায়াত করে তাহারদিগকে টালমাটাল করিয়া সারেন আর কহেন মাস কাবার হইলে আইস অমুক সাহেবের স্থানে এতো টাকা পাওনা আছে লোট দিয়াছে অমুক মাসে ডিউ অর্থাৎ মেয়াদ করিয়াছে, যদ্যপি এরূপ কথায় বাজারের লোক বিশ্বাস করে তথাপি রাঁড় ভাঁড় চাকর এয়ার ইহারদিগের ক্ষান্ত করা মুস্কিল হইল, কি করেন শেষে নিজ পত্নীর গাত্রের অলঙ্কারাদি অপহরণ করিবার মনঃস্থ করিয়া এক দিবস শয়নছলে বাটীর মধ্যে যাইবেন সংবাদ পাঠাইলেন, তিনি এই সংবাদ পাইয়া তৎক্ষণাৎ দাঁড়া গুয়া পান দিয়া পাঁচ এও লইয়া সুবচনি পূজা দিলেন কারণ নববধ্বাগমনের পর স্বামীর মুখ সন্দর্শন করেন নাই, রাত্রিতে বাটীর মধ্যে বাবু শয়নার্থ গমন করিলেন, তাহাকে অনেক বিনয়বাক্যেতে সন্তুষ্ট করিয়া দুই চারিখানি স্বর্ণগহনা তাহার স্থানে লইলেন, কহিলেন উত্তম করিয়া গড়াইয়া দিব, প্রভাতে বৈঠক-খানায় আসিয়া লোকদ্বারা বাজারে পাঠাইয়া বিক্রয় করিয়া আনাইলেন তাহাতে পাঁচ সাত রোজ খরচপত্র চলিল সম্মুখে পূজার ফরমাইস হইয়াছে এক ছড়া পাঁচনরী দিতে হইবেক আর ভাল বস্ত্রাদি তাহার কি হইবেক ইহা মনে করিয়া পুনর্ব্বার বাটীমধ্যে শয়নার্থ গমন করিলেন, হাস্যবদনে কহিলেন তোমার পাঁচনরীর গঠন ভাল নয় আমাকে দেও আমি সে সকল গহনা আর এই পাঁচনরী উত্তমরূপে তৈয়ার করাইয়া পূজার সময় দিব। তিনি কহিলেন আমি বুঝিয়াছি তোমার বড়ই টাকার দরকার হইয়াছে, কিন্তু সব দিতে পারি যদি তুমি সকলের সাক্ষাতে বল যে আমি অদ্য দুই মাসাবধি প্রতি দিন বাটীর মধ্যেই শয়ন করিতেছি। বাবু কহিলেন তাহার আটক কি এ কথা আমি সকলকেই সর্ব্বদা কহিব তুমি টাকা দেও। তিনি কহিলেন কল্য দুই প্রহর দুই ঘণ্টা রাত্রির পর টাকা পাইবা কিন্তু সন্ধ্যাকে আসিবা না ইহার অন্যথা হইলে টাকা পাইবা না আর যে কথা বলিয়াছি। প্রাতে গাত্রোত্থান করিয়া বাবু সকলের সাক্ষাতে কহিছেন যে আমি এক্ষণে দুই মাসাবধি প্রতিদিন বাটীর মধ্যেই শয়ন করিতেছি, যদি কেহ বলে বাবু কত্তা তোমায় ডাকিতেছেন [৪২] বাবু উত্তর [করেন] আমি প্রতিদিন বাটীর মধ্যেই শয়ন করিয়া থাকি রাত্রি দুই প্রহর দুই ঘণ্টা পর্যন্ত এই কথা বই আর কোন কথাই [নাই], তৎপরে শয়নাগারে শয়নার্থ গমন মাত্র সেই সাবিত্রী অঞ্জলি পুরিয়। বাবুর মনোভিলাষ পূর্ণ করিলেন। বাবু টাকা হস্তগত করিয়া তৎক্ষণেই শয়নাগার হইতে আপন বৈঠকখানায় আগমন করিলেন, পরে দুই তিন দিবস ঐ টাকায় মজা করিয়া বেড়াইলেন, শেষ হইল আর টাকার সুযোগ হয় না, কোন মতে কিছুই দেয় না, পূর্ব্বে যে সকল লওয়াজীমা জিনিষপত্র করিয়াছিলেন তাহাও বিক্রয় করিয়া এ খলিপার পরামর্শদ্বারা মজার কারণ ব্যয় করিলেন, [শেষে কহেন] যে এক্ষণে টাকার কি করিব অনেক লোটে ডিউ হইয়াছে তাহারা টাকার কারণ সর্ব্বদা তাগাদা করিতেছে এবং শালওয়ালা ও কাপড়ওয়ালা প্রভৃতি আর বাজারের মহাজন লোক ইহারা টাকা রাখে না করি কি উপায় কি। খলিপার উত্তর চিন্তা কি, যদি কেহ ওয়ারিণ করে জামিন দিবা, কেহ না হয় এক দিবসের মধ্যেই খালাস করিব, তুমি খাতির জমায় থাক, মজা লোটো। খলিপার এই কথায় বাবু সন্তুষ্ট হইয়া মজা লুটিয়া বেড়ান, কিঞ্চিৎ টাকা পাইলে না করেন এমত কৰ্ম্ম নাই কিন্তু রাত্রিযোগে যে স্থানে গমন করিয়া থাকেন সেই স্থানে আর সম্ভ্রম থাকে না। মজার কথার শেষ ফলখণ্ডে হইবেক
অথ ফলখণ্ড॥
ফলের কিঞ্চিৎ বর্ণন করি, বিচক্ষণ বাস্তবিক বাবু মহাশয়েরা মনোযোগপূর্ব্বক পাঠ বা শ্রবণ করিবেন। প্রথমে এক ফল এক মহাজন টাকার নিমিত্তে লোক পাঠাইলেক, বাবু কহিলেন লোট বদল করিয়া দিব। লোট বারম্বার ফেরাফেরি হইয়াছে অনেক টাকা পাওনা হইল, তাহারা সে কথা শুনিয়া ওয়ারিণ করিলেক। খলিপা কহিলেন, এ কি হয়, পেয়াদা লইয়া যায়। তিনি কহেন চিন্তা কি, যাও না কেন। তাহারা বাবুকে জেহেলখানায় লইয়া গমন করিল মোসাহেবলোক কে কোথায় পলাইল, সুর বাবু বাটী প্রস্থান করিলেন, পরে সন্ধ্যাকালে একজন লোক আসিয়া বাবুর পিতা কত্তা মহাশয়কে সংবাদ করিলেক মহাশয় আপনকার পুত্র বাবু জেহেলে কয়েদ হইয়াছেন সে স্থানে নিরাসন বসিয়াছেন অতএব বিছানা ও বালিশ পাঠাইলে ভাল হয়। কত্তা ঐ লোকের প্রমুখাৎ তাবদ্বিষয় অবগত হইলেন, পরে বাবুর সতী এই সকল বৃত্তান্ত অবগত হইয়া কিরূপ মনে২ খেদ করিতেছেন তাহা শ্রবণ করুন।
আমার সমান নারী, ত্রিজগতে নাহি হেরি, আমি নারী অতি অভাগিনী।
ধনে মানে কুলে শীলে, বর দেখি বিয়ে দিলে, সমাদরে জনক জননী ॥
বিবাহের পর 'আসি, শ্বশুরঘরেতে বসি, দিবানিশি থাকি একাকিনী।
নবীন যৌবন ভরে, চিরকাল কামজ্বরে, পুড়ে মরি দিবস রজনী ॥
যিনি মোর নিজপতি তাহার সহিত স্থিতি ক্ষণমাত্র হল কোন ছলে।
পরে বিধি বিগুণ হল, ওয়ারিণ করাইল, তারে লয়ে দিল গিয়ে জেলে ॥
শুনেছিলাম পতি মোর, হয়েছিলেন বাবু ঘোর, আমা বলে মাহি ছিল মনে।
তথাপি পতির সুখ শ্রবণান্তে যত দুখ, সুখ তবু হত কিছু শুনে
বিধি নিদারুণ হলে, তাহাও হরিয়ে নিলে, তব মনে কি আছে না জানি।
দিয়েছিলে পতি মোরে, তারে ঘোর বাবু করে আমায় করিলে বিরহিণী।
বিরহেতে নিরন্তর, তনু হল জর২ আর দুঃখ না সহিতে পারি।
কত দুঃখ সব আর, নারী হয়ে বারম্বার, তবে বাঁচি যদি প্রাণে মরি ॥
সতীর এইরূপ বিলাপে রাত্রি গত হইল। পরদিবস বাবুর পিতা কর্তা মহাশয় নোটের বেবাক টাকা ও খরচা দিয়া বাবুকে খালাস করিলেন, তৎপরে বাবু বাজারে যাহার২ দেনা ছিলেন তাহারাও বাবুর নামে নালিশ করিয়া কত্তার স্থানে বেবাক টাকা পাইলেক। বাবু বড় জেহেলে ও ছোট জেহেলে মাসেক দুই মাস কয়েদ ছিলেন, ইহার মধ্যে প্রিয়তমা বারবিলাসিনীর নিকট গমন করিতে পারেন নাই। খালাস হইয়া আসিবা মাত্র হৃষ্টচিত্ত হইয়া প্রিয়তমার নিকট গমন করিলেন।' সে কহিলেক আলাপ করা দূরে থাকুক আর তোমার মুখাবলোকন করিব না, তুমি মাসেক দুই মাস জেহেলে স্বচ্ছন্দে বসিয়া ছিলে, আমার এখানে কি প্রকারে চলে তাহার তত্ত্ব একবার করিলে না, অতএব আমি এমত লোকের মুখ দেখি না, কল্য যদি আমার দুই মাহার বেবাক টাকা আনিতে পার তবে ঘরে আসিতে দিব নতুবা জুতা মারিয়া দূর করিব, তুই যেমন বড়মানুষের বোটা এবং ভালমানুষ তাহা আমি জানিয়াছি আর জাঁকে কাজ নাই, তোর কাছে পাঁচ বৎসর অবধি আমার হাড়ির হাল হইল কেবল টাকা হাজার দুয়ের গহনা আর এই বাড়িটুকু ইহার দাম' বড় [জোর] চারি পাঁচ হাজার টাকা হইবেক তো হইতে এইমাত্র পাইয়াছি আর কোন কালে কিছু দিয়াছিস, দেখ দেখি অমুকের অমুক আপন স্ত্রীর গায়ের ও মায়ের অলঙ্কার আদি চুরি করিয়া আনিয়া দিয়াছে, তুমি আমায় কি দিয়াছ বল দেখি, আর দেখ অমুকের অমুক কি প্রকার তাহার বশে আছে আর তাহার আগামী এক বৎসরের খরচ তাহার বাটীতে আমানত রাখিয়া থাকে, তোর মনে দয়া নাই [যদি] দয়া থাকিত তবে এই দুই মাসের মধ্যে কোন লোকের দ্বারাতেও আমার তল্লাস ও খরচ পাঠাইতি। এই প্রকার ভর্ৎসনা করিয়া বিদায় করিয়া দিলেক, অন্য বাবুর সহিত গান বাজনা আরম্ভ করিলেক, পরদিবস ছোট আদালতে দুই মাসের মাহিয়ানার দুই শত টাকার দাবিতে নালিশ করিয়া বাবুকে কাঠারায় কয়েদ করাইলেক, পরে তাহার পিতা শ্রবণ করিয়া সে টাকাও দিয়া বাবুকে খালাস করিয়া আনিলেন। পরে বাবু স্থানা স্তরে গমন করিতে আরম্ভ করিলেন। যাহার দ্বারে গমন করেন সেই বলে বাপুরে তুমি অমুককে রাখিয়াছিলে কিন্তু তাহাকে টাকা দেও নাই সে তোমার নামে নালিশ করিয়া কয়েদ করিয়াছিল তোমার পিতা টাকা দিয়া তোমাকে খালাস করিয়াছিল, ইহাতে তোমাকে কে বিশ্বাস করিয়া আসিতে দিবেক। যত প্রধানা বারাঙ্গনা ছিল তাহারা সকলেই ঐ কথা শুনিয়াছে তাহাদিগের শিয়ালের ডাক অতএব এক দ্বারে অসম্ভ্রম হইলে সুতরাং অন্য দ্বারে অসম্ভ্রম হইতে পারে। বাবু প্রধানা বেশ্যারদিগের নিকট অসম্ভ্রান্ত হইয়া পরে বাঁশতলার গলি-নিবাসিনী পতিতপাবনকারিণী দোষরমণি এক বেশ্যা নিযুক্ত করিয়া রাখিলেন, তাহা হইতে ত্বরাতেই দুইটি বাঘের বাচ্চা লাভ হইল, তৎপরে তাহার সকলি অকু উপস্থিত হইলে শেষে হায় হায় একি দায় প্রাণ যায় দূর হ গুওটার মাছি ইহা বলিতে লাগিলেন, ঘরে বাহিরে আর মুখ দেখাইতে পারেন না, সালসা তোপচিনি মারকুলি প্রভৃতি খাইয়া আরাম হইলেন, তৎপরে তাহার পিতার পরলোক হইল মুখাগ্নি করিয়া বাটী আসিয়া কর্তা হইলেন সকল চাবি হস্তগত হইল জ্ঞাতিকুটুম্ব সকল কহে উহার জাতি গিয়াছে উহার বাটী যাওয়া হইবেক না ইহা শুনিয়া গললগ্নীকৃতবাসা হইয়া দ্বারে দ্বারে ভ্রমণ করিলেন শ্রাদ্ধের উপলক্ষে সমন্বয় হইল তৎপরে এক বাটী বানাইবার পরামর্শ করিলেন, রাজমিস্ত্রী আনিয়া বাটীর নক্সা দেখাইয়া ফুরান করিয়া দিলেন, পরে মাসেক দুই মাসের মধ্যে বাটী প্রস্তুত হইল যে বিষয় ছিল তাহা প্রায় বাটী বানাইতে খরচ হইয়া গেল, অবশিষ্ট কিঞ্চিৎ বিষয় থাকিল পাঁচটি কন্যা সন্তানের বিবাহ দিতে হইবেক এই সময়ে কহিলেন হা বিধাতা এক দিবস স্ত্রীসহিত বাস করিলাম না তথাপি আমার হলো যাতনা, পরে করে গেল সুখ আমার ভাগ্যে ছিল দুখ সে যাহা হউক কিন্তু বিবাহ না দিলে জাতিরক্ষা হয় না ক্রমে পাঁচ কন্যার বিবাহ দিলেন, ধনের শেষ হইল পরিবার প্রতিপালনার্থ দায়গ্রস্ত হইলেন শেষে বাটীর পাট্টা বন্ধক কর্জ সুদসমেত অনেক টাকা দেনা হইলেন, মহাজনে বাটী বিক্রয় করিয়া লইলেক আখেরে টালার বাগানে কোন ভাগ্যবানের অধিকারে বাস 'করিয়া কোনরূপে দিনপাত করেন এবং পরিবার প্রতিপালনে বহু ক্লেশাবনত হইয়া বাবুগিরি ও সংসারের উপরি বিরক্ত হইয়া খেদ করিছেন।
বহু শ্রমে পিতা করি ধন উপার্জন।
রেখেছিলেন প্রাণপণে আমারি কারণ।
আমার কপালগুণে বিদ্যা না হইল।
কুমন্ত্রী খলিপা কর্ণে কুমন্ত্রণা দিল ॥
আমার নাহিক হল হিতাহিত জ্ঞান।
খলিপা করিল আমায় অনেক বাখান।
আমি মূর্খ ভুলিলাম খলিপাবাখানে।
পর উপদেশ বাক্য শুনিলাম শ্রবণে ॥
মতি ছিল নিরন্তর কুকর্ম্মেতে আশা।
কুকর্ম করিয়া আমার এই দেখ দশা।
অন্নবস্ত্র অভাবে নিজ পরিবার।
শ্রীভ্রষ্ট হইল আর অস্থিচর্ম সার ॥
আমায় নিদারুণ বিধি আগে সুখ দিল।
পরে দুঃখসাগরে তরঙ্গে ভাসাইল।
এ দেহেতে দুঃখ আর সহিতে না পারি।
দিবানিশি রোদনেতে কেবল কাল হরি।
দুঃখে দুঃখে দিন দিন তনু হল ক্ষীণ।
উদরেতে অন্ন নাহি হয় প্রতিদিন।
পরিবারের দুঃখ দেখে প্রাণ ফেটে যায়।
না করিতে পারি তার কিছুই উপায়।
আহার চিন্তনে কেবল ভ্রমি দ্বারে দ্বারে।
বন্ধুবর্গে কেহ নাহি সমাদর করে।
নির্লজ্জ হইয়াছি আমি উদরের লাগি।
তণ্ডুলাদি প্রতিদিন আনি ভিক্ষা মাগি।
আর কি কহিব দুঃখ কহা নাহি যায়।
আমায় দেখিয়া লোক নয়ান ফিরায়।
করহ উদ্ধার বিধি এ ঘোর সঙ্কটে।
লয়ে যাও ত্বরা করি যমের নিকটে ॥
অথ জ্ঞান উপদেশ।
অনুগত দারা সুত,
পালনেতে যে বা রত,
তার দুঃখ কহিতে না পারি।
দিবানিশি শোকসিন্ধু,
দারা মৃত ভাই বন্ধু,
তরঙ্গেতে মন মগ্ন করি ॥
অবিরত শত২,
কুপথ কুকর্ম্মে রত,
ধৰ্ম্মকৰ্ম্ম হয়ে বিবর্জিত।
ধনাশা পূরিত চিত্ত,
বিষয় মদেতে মত্ত,
ভুলিয়া পরমতত্ত্ব হিত ॥
অনর্থ বিষয় চিন্তা,
বিশেষত মৃতকান্তা,
ধৰ্ম্ম অর্থ কামহন্তা বড়।
কান্তাসূত [সুখ] আশে,
করিতেছি বিষয় আশা দঢ়।
ভ্রমিতেছি দেশের,
বিষয়েতে জ্ঞানহত,
সদা লয়্যা দারাসুত,
নয়ন মুদিত করে আছে।
শমনভবন কবে,
গমন করিতে হবে,
কি হইবে নাহি ভাবে পিছে।
দারাসূত অনুগত,
আশয় বা কি আশ্রিত,
মরমেতে মৃতপ্রায় হয়।
শোকসিন্ধু সলিলেতে কি দিবস রজনীতে,
ভাবিতে২ তনু ক্ষয়।
বিষয় বাসনা বশে,
পরে আত্মভ্রান্তি দোষে,
আছে ভ্রান্ত হইয়া নিতান্ত।
বিষয় বাসনা দেখি,
বসুমতী হাস্যমুখী,
হাস্যমুখ হয়েছে কৃতান্ত ॥
যেমন জারজ মৃত,
ক্রোড়ে লয়্যা হরষিত,
স্বামী দেখি হাসে নিজনারী।
তেমতি বিষয়াবিষ্ট,
দেখিয়া পৃথিবী হৃষ্ট, আর যমদণ্ডধারি ধারী।
অতএব বিষয় ত্যজ,
শ্রীনন্দকুমার ভজ,
ভজিলে অতুল সুখ পাবে।
ঐহিক হইবে সুখী,
যমরাজে দিবে ফাঁকি,
পরকাল সুখেতে রহিবে।
