প্রাচীন বই - এক জায়গায় পুরোনো বাংলা বইপত্র | নব বিবি বিলাস

নব বিবি বিলাস

ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়


শ্রীশ্রীহরিঃ।- শরণঃ।-
অঙ্কুর খণ্ড
পল্লবখণ্ড
কুসুম খণ্ড
ফলখণ্ড

ভূমিকা

যদ্যপি নববাবুবিলাসে নববাবুদিগের স্বভাব সুপ্রকাশ আছে, কিন্তু সে গ্রন্থের ফলখণ্ডে লিখিত ফলের প্রধান মূল বাবুদিগের বিবি, সেই বিবিরূপ প্রধান মূলের অঙ্কুরাবধি শেষ ফল তাহাতে সবিশেষ ব্যক্ত হয় নাই; এ নিমিত্তে তৎপ্রকাশে প্রয়াসপূর্ব্বক নব বিবি বিলাস নামক এই গ্রন্থ রচনা করিলাম এ গ্রন্থের মূল দেখিলেই সে মূলের আমূল পর্যন্ত বোধ হইবেক, এবং নববাবুদিগের ন্যায় নববিবিরাও শেষাবস্থায় কীদৃশাবস্থা প্রাপ্তা হয়েন তাহা অনায়াসে প্রকাশ পাইবেক বিশেষতঃ যাঁহারা সুবোধ অথচ রসিক বাবু তাঁহারা কাহারো কাবু না হইয়া নববাবু ও নববিবি উভয়েরি নষ্ট চরিত্র দেখিয়া আপন২ চরিত্র পবিত্র করিতে পারিবেন যেহেতুক বিচক্ষণ লোক অন্যের দোষ বিলক্ষণ রূপে সমীক্ষণ পূর্ব্বক আপন দোষ পরিহার করিয়া সাবধান হয়েন। শাস্ত্রে কথিত আছে, সর্ব্বত্র ত্রিবিধালোকা উত্তমাধম মধ্যমাঃ। সুতরাং নর নারী উভয় জাতির মধ্যে তিন প্রকার আছে ইহা অবশ্য স্বীকার করা যায় কিন্তু কাল সহকারে উত্তম ও মধ্যম অপেক্ষা অধম ভাগেরি শ্রীবৃদ্ধি, তন্মধ্যে পুরুষাধমের অধমা প্রবৃত্তি এবং দুর্বৃত্তি ও স্বকীয় সত্ত্বে পরকীয় নিমিত্তে লালসা জন্য যে অপকীর্ত্তি তাহার কারণ ও উদাহরণ সমাসে ঐ নববাবুবিলাসে কথিত আছে যে নববাবুরা প্রায় অনেকেই রাত্রে আপন২ ভবন পরিত্যাগ পূর্ব্বক বেশ্বাসদন গমন করিয়া বাস করেন; অতএব যে পুরুষ পরস্ত্রীতে অথবা সামান্তাতে প্রশান্ত হইয়া নিতান্ত আসক্ত, সে ব্যক্তি স্বস্ত্রীর রক্ষণাবেক্ষণে প্রায়ই অশক্ত যেহেতুক প্রতিদিন রাত্রিযোগে যোগের ও ভোগের অভিলাষে অন্ত্য-বাসে প্রবাস করিলে তাঁহার স্ববাসের সাধ্বীও অসাব্বী হয়। তখন তাহাকে সাধ্য সাধনা করিলেও কাহার সাধ্য যে অবাধ্যাকে বাধ্যা করিয়া রাখে; কারণ ভর্তার ভার ভরণপোষণ, সুতরাং কেবল পোষণে পোষ মানে না যেহেতুক যে সকল বাবু সৰ্ব্বদা বেশ্যাবাসে বাস করেন, তাঁহারা কদাচিৎ কখন নিজ ভবনে ভ্রমক্রমে উপস্থিত হইলে প্রায়ই বৈঠকখানায় আটক হইয়া দশজন চেটক ও যোটক ইয়ারলোক লইয়া গাঁজা চরস খান এবং সরস সুরস পান ও তান মান গান ইত্যাদিতেই মত্ত হয়েন অথচ অন্তঃপুরে তাহার কামিনী আপন নিত্য সুখদায়ক প্রেমবিলাসক অন্য কোন নায়ক লইয়া সেই প্রতিনিধির দ্বারা বাবু গুণনিধির ভার লাঘব করেন; যেহেতু কেবল পোষণেরি ভার তাঁহার প্রতি, অন্য ভার অন্যের প্রতি, কিন্তু অধিকন্তু চমৎকার এই যে প্রাতে ঐ কামিনী স্বামী বাবুর পোষার মত গোসা না করিয়া অম্লানবদনে সংসারের কৰ্ম্ম কার্য্যে ধৈর্য্যতা দেখান; ফলিতার্থ অন্তরের ভাব অনেক অন্তর যেহেতুক যাবৎ না সূর্যাস্ত হয় তাবৎ তাহার অন্তঃকরণ কি পর্যন্ত ব্যাকুল তাহার কুল লিখনাতিরিক্ত, কেবল যে সকল বাবু অন্য স্ত্রীতে আসক্তিপ্রযুক্ত কুলহারা হইয়াছেন তাঁহারাই ঐ ব্যাকুলের কুল জানিতে শক্ত, কারণ প্রেমী ব্যতিরেকে প্রেম জানে না; এবং অস্ত্রে আঘাতী ব্যক্তি ভিন্ন্য অন্যের অস্ত্রাঘাতের জ্বালা বুঝে না, অতএব সেই সকল বাবুরাই বিশেষ জানিবেন, যে তাঁহারা পরস্ত্রীর সহিত প্রণয় করিলে তাঁহারদিগের মন যেমন ব্যাকুল হয়, স্ত্রীলোকের-দিগেরও অন্তঃকরণ পর পুরুষের সহিত প্রসক্তি হইলে অবশ্যই তদনুরূপ হয়। বিশেষতঃ স্ত্রীলোকেরা কেবল নামেই অবলা; কিন্তু কাম বলে পুরুষাপেক্ষা অতি সবলা; যথা আহারো দ্বিগুণঃ স্ত্রীণাং বুদ্ধিস্তাসাং চতুর্গুণা। ষড়গুণো ব্যবসায়শ কামশ্চাষ্টগুণঃ স্মৃতঃ। সুতরাং ঐরূপ কামুকী কামিনীর অন্য পুরুষের সহিত প্রীতি হইলে সে প্রণয় কিছু দিন গোপনে রয় পরে স্বগৃহে অন্য২ স্ত্রীলোকেতে গুপ্তকথা ব্যক্ত হয়, তৎপরে সেই গৃহের পুরুষেরাও শুনিয়া মৃদুভাব ত্যাগ [করিয়া] পারুষ ভাব প্রকাশ করে, তৎকালীন জানা যায় ও কানাকানিতে বাবুর কান খাড়া হয়, অবশেষ স্বামী বাবু তাঁহার স্বকীয়া কামিনীকে প্রহার করেন; এবং যাহার সহিত ধরা পড়ে সে যদি দাসের মধ্যে কেহ হয় তবে তাহাকে এমত প্রহার করেন যে তৎক্ষণাৎ সে ধরায় পড়ে, একান্ত যদি উঠে তখনি ছুটে, কিম্বা সে ব্যক্তি যদ্যপি বাবুর স্নেহাবিষ্ট স্বসম্পর্কীয় কেহ হয়েন তবে তাঁহাকে গৃহ হইতে দূরীকরণ করিতে পারেন না, কিন্তু তাঁহার প্রতি বাবু জাতক্রোধ হইয়া তৎকালীন মনে মনে বিবেচনা করেন যে দূর হউক আর পারি না বরং স্ত্রীকেই উহার পিত্রালয়ে পাঠাইয়া দিই, অবশেষে বাবু স্বালয় হইতে আলয়২ শ্বশুরালয়ে প্রেরণ করেন, সেখানে কামিনী আপন মনের আবেশ অশেষ বিশেষে শেষ করিয়া পুনরায় আপন স্বামীর বাসে আইসেন। কেহবা পিত্রালয়ে থাকিয়া ত্রিকুলের মান সমাধান করিয়া দরওয়ান সঙ্গে অনঙ্গ প্রসঙ্গে প্রতিদিন যামিনী সাঙ্গ করেন, কেহবা সেই স্থান হইতে স্থানান্তর প্রস্থানের পথ দেখেন, কিন্তু গুপ্তকথা একবার ব্যক্ত হইয়াছে, তখন তাহাকে তাহার শাশুড়ী, ননদ, কিম্বা পিত্রালয়ে তাহার ভাই ভগিনী ইত্যাদি সকলেই ঐ কথার গঞ্জনা দেয়, বিশেষত কোন সময়ে কাহারো সহিত কলহ হইলে গুপ্তকথা উচ্চৈঃস্বরে ব্যক্ত করে এবং তাহার স্বামী বাবুও তখন প্রিয়াকে প্রিয়বাক্য কহেন না, বরং লজ্জায় পড়িয়া তাড়না করেন; অনন্তর এ কথা ক্রমে পাড়ায় প্রকাশ পাইলে যে সকল বাবুরা কুলবধূসম্ভোগে অধিক সুখভোগ বোধ করেন তাঁহারা চেষ্টা পাইতে থাকেন। কোন বাবু আপন আশার সুসারহেতু ঐ কামিনীর নিকট দূতী প্রেরণ করেন, সেই দূতী কামিনীকে যেরূপ রস দেখাইয়া বশ করে তাহা দূতীবিলাস গ্রন্থেই নির্যাস মতে প্রকাশ হইয়াছে, পুনরায় তাহা লিখন অপ্রয়োজন; সেইরূপ কথোপকথনে দূতী কুল-বধূগণে ভুলাইয়া ভয় দেখাইয়া কুলে জলাঞ্জলি দেওয়াইয়া কুলের বাহির করে, এমতে কোন২ কামিনী স্বামীর জালায় জ্বলিতাঙ্গ হইয়া কেহবা শাশুড়ী ননদের নিষ্ঠুর কথায় ক্ষতবিক্ষতা হইয়া, কেহবা স্বভাবের দোষে প্রীতে পড়িয়া, কেহবা অন্য কোন বিষয়ের আশয়ে সংসারে ত্যক্ত বিরক্ত হইয়া, কেহবা সুখেচ্ছায় নির্ভর করিয়া-অর্থাৎ বেশ্যারা বড় সুখী, ইহারা স্বয়ং সংসারের কোন কৰ্ম্ম কাৰ্য্য করে না, স্বচ্ছন্দ পরমানন্দে পুরুষের ন্যায় ইচ্ছামত আহার বিহার পূর্ব্বক যথেচ্ছাচার করিতে পারে, এবং বাবুগণেও ধনদানে সকল ধনীকে বশী করেন; এবং তাঁহার স্বয়ং প্রেমাধিনী হয়েন এই ক্ষণিক কাল্পনিক সুখে সুখ জ্ঞান করিয়া কুলে কালি দিয়া কুলের বাহির হয়েন, অবশেষে অকূল পাথারে পড়িয়া দুকুল হারান অতএব তাঁহারদিগের শেষাবস্থায় কি দুরবস্থা হয় তাহার বৃত্তান্তসকল বিবিরূপ বৃক্ষ বর্ণনে ব্যক্ত করিতেছি; ভরসা যে ইহা শ্রবণে কুলবধূগণে পূর্ব্বোক্ত কোন কারণে কুলের বাহির না হয়েন, যেহেতু অকুলে কেবল আকুল হইতে হয়।

স্ত্রীলোক স্বভাবতো বিজ্ঞান বলে অবলা, তাহাতে কুলবালা আরো ভোলা; অর্থাৎ অনায়াসে ভুলান যায় এমতে যদ্যপি কোন কামিনী ব্যভিচারিণী হইয়া সুপ্রকাশ রূপে বেশ্যা হয়েন, তবে রূপবতী হইলে যে পর্যন্ত যৌবন থাকে সে পর্যন্ত তিনি কপট লম্পটের নিকট চটক দেখাইয়া আদরণীয়া হয়েন, কিন্তু যেমন২ যৌবনের হ্রাসতা হইতে থাকে তদনুযায়ি আদরের হ্রাসতা হয়; যে ব্যক্তি অত্যন্ত সমাদর করিত সে তখন নিতান্ত অনাদর করে, অনুগত বিগত হয়, এবং নানাবস্থান্তরে শেষাবস্থায় অত্যন্ত দুরবস্থা ঘটে; যথা অগ্রে বেশ্যা পরে দাসী মধ্যে ভবতি কুট্টিনী। সর্ব্বশেষে সর্ব্বনাশে সারম্ভবতি টুক্কনী। এবং বৃদ্ধা বেশ্যা তপস্বিনী, ইহাও পূর্ব্বাপর জনশ্রুতি আছে; সুতরাং কুলটার মধ্যে কেহবা যৌবনাবস্থা থাকিতে২ আপন শেষ দশার আশা করিয়া কুমারী অর্থাৎ ছুক্তির ক্রয় করিয়া আপনি আপন মনে আপনাকে তাহার মাতৃরূপে কল্পনা করিয়া কল্পিত কন্যাকে আপন কন্যার ন্যায় প্রতিপালন করেন, এবং তাহার নাম পরিবর্তন পূর্ব্বক পুনশ্চ নামকরণ করিয়া থাকেন, অর্থাৎ তাহার স্বরূপ মাতা পিতা যদ্যপি তাহার নাম কুড়নি, তিনকড়ি, পাঁচী, পাঁচকড়ি ইত্যাদি রাখিয়া থাকে; তৎপরিবর্তে রাজকুমার প্রাণকুমার গোলাব, পেয়ার ইত্যাদি নাম রাখেন। এতাবতা সেই বিবিরূপ মূলের মূল বিবরণ অঙ্কুর ও পল্লব, ও কুসুম ও ফল এই খণ্ড চতুষ্টয়ে বর্ণন করিয়া নব বিবিরদিগের রীতি নীতি এবং যে অবস্থায় যে গতি হয় অবিকল সেই সকল সংগ্রহ করিলাম, ইহা বাস্তবিক বাবুজনের হাস্য পরিহাসস্যের নিমিত্ত রহস্যস্বরূপ হইবেক এবং ইহা শ্রবণে কুলবধূজনের মনে বেশ্যাদিগের দুরবস্থায় দুঃখ সম্ভাবনায় লজ্জা ও ভয় উভয় জন্মিয়া জ্ঞানোদয় হইতে পারিবেক কিমলং বিস্তরেণ।।


অথ অঙ্কুর খণ্ড। অর্থাৎ বিবিরূপ বৃক্ষের অঙ্কুর।।

পরাৎপরের পরম পদার্থ পরমার্থ পথ প্রায় পারমার্থিকেরা পবিত্র লোচনে দেখিতে পান, কিন্তু অপরাপর প্রাকৃত লোক দুষ্ট লোকের সহবাসে সে পথের আলোক হারাইয়া নিতান্ত ভ্রান্ত ও অশান্ত স্বান্ত হইয়া অধৈর্য্য দোষে কদর্য্য পরদার চৌর্য্যাদি বৃত্তিতেই বীর্য্য প্রকাশ করেন এবং সেইরূপ প্রাকৃতা প্রকৃতি স্বামী সম্বন্ধ নির্বন্ধে অন্ধ হইয়া পিতৃ মাতৃ স্বামীর মায়া দয়া পরিত্যাগ পূর্ব্বক স্বয়ং মায়াবী হইয়া মায়ার জাল কাটিয়া প্রেমের জাল পাতিয়া মুগবৎ আগন্তুক কামুক পুরুষকে ধরিতে উপক্রম করেন, ক্রমে২ তাহাতে কাম ব্যাধির পরাক্রম বৃদ্ধি হওয়াতে ব্যাধের তুল্য আড্ডা গাড়িয়া বসেন অর্থাৎ গৃহ হইতে বহির্গমন পূর্ব্বক কোন নগরস্থা বয়স্থা বেশ্যার বশ্যা হইয়া তাহারি দাস্যাদি কৰ্ম্মে কুমারী অর্থাৎ ছুরী রূপে নিযুক্তা হয়েন এবং সেই সুযোগে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন, তখন আপন গর্ভধারিণীকে বিশ্বতা হইয়া ঐ বয়স্থাকেই মাতৃসম্বোধন করেন এবং পতিকে ভুলিয়া উপপতিকেই পতি বলেন। এতাবতা কি দোষে গৃহস্থের কন্যা গ্রহপ্রযুক্ত গৃহ হইতে বাহির হয় তাহার বৃত্তান্ত প্রথমতো লেখা যাইতেছে।

প্রথমতো নবযুবতী কামিনীর সহিত দূতীরূপা নাপিতিনীর সাক্ষাৎ ॥

স্ত্রীলোকের কৌমারাবস্থায় পিতা রক্ষক ও যৌবনকালে স্বামী রক্ষক এবং বার্দ্ধক্যে পুত্র রক্ষক অতএব স্ত্রীজাতির স্বাধীনতা কোনকালেই অপ্রসিদ্ধ এমতে যে কাল পর্যন্ত পিত্রালয়ে কুমারী বাস করেন তৎকালে পিতার রক্ষণাবেক্ষণে শুক্লপক্ষের শশীর ন্যায় বন্ধিতা হয়েন এবং কৌমারাবস্থায় ইন্দ্রিয় দোষ সম্ভাবনায় অসম্ভাবনা প্রযুক্ত নির্দোষে নির্মূল সুশীতল ধবল গঙ্গাজলের ন্যায় পবিত্র চরিত্রে কালযাপন করেন পরন্তু যৌবনোপক্রমে ক্রমে ক্রমে মদন রাজার রাজ্যরূপ নারীশরীরে যৌবন দূত প্রবিষ্ট হইয়া অশান্ত দুর্দান্ত রাজার আগমন সংবাদ সংঘোষণ করাতে যুবতীর মনোরূপ প্রজাশাসনাভয়ে অধৈর্য্য হয়, পরে ঐ মহাপ্রতাপী রাজা যুবতী নগরীতে প্রবল দল বল সমভিব্যাহারে আক্রমণ করাতে বড়ই উৎপাৎ ঘটে তখন যুবতী ক্ষণমাত্রে সুস্থির হইয়া থাকিতে পারেন না সর্ব্বদা পতির নিকট রাজার উৎপাত জন্য বেদনা বেদ করেন, কিন্তু পতি যদি পুরুষার্থযুক্ত পুরুষ হয়েন তবে তৎক্ষণাৎ অনঙ্গ রাজার সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হইয়া নারী নগরীকে স্বচ্ছন্দে পরমানন্দে রাখেন কিন্তু কাপুরুষ পতি যাহারদিগের লক্ষণ বিলক্ষণরূপে নববাবু বিলাসে উল্লেখিত আছে তাঁহারা আপন২ পত্নীর দুঃখে কটাক্ষপাত না করিয়া অন্য কোন অসতীর দুঃখের দুঃখী সুখের সুখী হইয়া কুল-কামিনীর সঙ্গ প্রসঙ্গেও থাকেন না সুতরাং ক্রমে২ মদন রাজারি পরাক্রম বৃদ্ধি হইতে থাকে অনন্তর যখন চন্দ্রবদনা কন্যার যৌবন ষোড়শকলা পূর্ণ হওয়াতে ষোড়শী পূর্ণযৌবনবতী হয় তখন গগনস্থ চন্দ্রের যেরূপ রাহু গ্রহণের শঙ্কা তদ্রূপ ঐ গৃহস্থ চন্দ্রবদনার কুসঙ্গিনী চণ্ডালিনী দূতীর আতঙ্কা হয় অর্থাৎ যৌবনাগতে ঐ বিধুমুখীর রূপের সৌন্দর্য্য ও মনের অধৈর্য্য দেখিয়া কদর্য্য বৃত্তিজীবিনী কুটনী যাহার-দিগের লক্ষণসকল অবিকল দূতীবিলাসে প্রকাশ আছে তাহারাই গ্রহণ দ্বারা গ্রহণ করিতে উপস্থিতা হয় তন্মধ্যে বিশেষতো নাপিতিনী যিনি সহজেই ধূর্তা জাতির কামিনী এবং গত যৌবনাবস্থায় যোটকতা ব্যবসায় স্বাভাবিক চাতুর্য্যতায় যুবতীর যৌবন ধন লুটাইবার নিমিত্ত গৃহস্থের গৃহরূপ দুর্গে প্রবিষ্ট হওনের জন্য কামাম ছলে কামান ধরিয়াছেন তিনি সুযোগ পাইয়া প্রবেশ করিয়া নব যুবতীর মনোভেদ জন্মাইয়া সংসারের প্রতি কি প্রকারে বিচ্ছেদ জন্মান তাহার বৃত্তান্ত পশ্চাৎ লেখা যাইতেছে ।

অথ নবযুবতীর প্রতি নাপিতিনীর কুমন্ত্রণা দান।

প্রথমতঃ প্রবৃত্তি দিলেন যে বাছা তোমার এ যৌবন ধন কাহার নিমিত্তে যক্ষের ন্যায় রক্ষা করিয়া আছ আহা এমন শ্রীফল কি কাকে ভোগ করিতে পারে। তোমার যে স্বামী সে তোমার নয় কিন্তু পরকামী, সর্ব্বদা গাঞ্জা চরসেই সরস এ রসে অতিবিরস অতএব সে অরসিক কি ভ্রমরের যোগ্য কমলের মধু ভোগ করিবেক। মরি২ কি বিধাতার চাতুরী দেখ সে জন আপনার প্রফুল্ল ফুল দেখিতে চক্ষু থাকিতেও অন্ধ, কেবল পর ফুলের গন্ধ পাইয়া নানা স্থানে ভ্রমণ করে, তুমি যে এমন হীরে তুমি কি মেয়ের শৃঙ্গেতে ভগ্ন হইবে, তোমার গুণেতে এই বিগুণ দেখিয়া আমার দ্বিগুণ দুঃখ হইতেছে। তাহার কপালে আগুন কেননা আকৃতি কিম্ভুতকিমাকার এবং প্রকৃতিও সেই প্রকার তথাপি সে যদি তোমারি হইত তবে ঔষধ গেলার ন্যায় চক্ষু মুদ্রিত করিয়াও ভোগ করিতে, কিন্তু বরঞ্চ বনের ঔষধও আপনার, কিন্তু এ ঘরের রোগ পর হইয়াছে কেননা কি নিশি কি দিন ঐ লম্পট শঠ অন্যের নিকটেই থাকে, কখনো ভ্রমক্রমেও তোমাকে মনে করে না, তথাপি তুমি যে পরম সতী তাহাকেই ধ্যান করিয়া আছ তোমার এ সতীপনা কেবল যন্ত্রণা মাত্র কারণ সে কেবল বেশ্যার বশ হইয়া সেই রসকেই সরস করিয়া মানিয়াছে অথচ তুমি সেই পুরুষকে পরশ ভাবিয়া স্পর্শ কর ইহা ভাল মানুষের কর্ম নয়। তুমি সোণার লতা হইয়া যে কঠিন লোহার তাড়নায় দিন২ ক্ষীণ হইতেছ, আহা মিথ্যা এ ছার ভাতারের পোড়ায় কেন পুড়িতেছ, আমার মন্ত্রণা শুন যে এ যন্ত্রণায় পার পাইবে।

অথ উপদেশিনীর মন্ত্রণাদান।।

ত্রিপদী। কি করেছ হায় হায়, এ দেখি বিষম দায়, তোমার সরল প্রাণ সঁপিয়াছ কারে। সেজন সুজন নয়, হৃদয় পাষাণময়, কেমনে কোমল হৃদে রাখিয়াছ তারে। বিধি নিদারুণ তায়, কারে ছেড়ে কারে চায়, কুটজে ভ্রমর ধায় ত্যজি কমলিনী। তেমতি তোমার পতি, ত্যজিয়া আপন সতী, সতত কামনা করে পরের কামিনী। আমরা তোমারে গণি, রমণীর শিরোমণি, তোমার এরূপ গুণ কে বুঝিবে বল। কপালের গুণে ধনী, পেয়েছ যে গুণমণি, অন্য জনে প্রয়োজন সে করে কেবল। পদে২ তব মান, বিনিময়ে অপমান, মান যাবে নিয়া মান মানীর নিকট। অতএব বলি শুন, কি কহিব পুনঃপুনঃ, ত্যজ শীঘ্র এই শঠ নিপট লম্পট। নতুবা বিষম খেদ, সদা হবে মর্মভেদ, সতীত্ব রাখিয়া মাত্র দুঃখ হবে সার। তোমার এ রূপ২, যদি দেখে ভুলে ভূপ, অসারে পড়িয়া সার হইল অসার। নানা রস তুমি ধর, রসিকের সঙ্গ কর, সার্থক হইবে তবে তোমার যৌবন। রূপে গুণে মনোহর, রসিক নাগর বর, মন মত মিলাইব চাহিবে যেমন। ভাবিয়া কলঙ্ক ভয়, যে নারী কুলেতে রয়, তার ভাগ্যে কোথা হয় এসুখ সম্পদ। অতএব ত্যজ কুল, কুল যে দুঃখের মূল, আকুল সতত করে ঘটায় বিপদ।।

অনন্তর ঐ যুবতীর আদৌ বয়সের তারুণ্য জন্য দীপশিখার ন্যায় মন চঞ্চল হইল, তাহাতে নাপিতিনীর মন্ত্রণারূপ বাতাস পাইবা মাত্র কুলপ্রদীপ নির্ব্বাণ হইল, তখন কৌলিক ধর্মপথে অন্ধকার দেখিয়া একেবারে কুলের পথ হারাইয়া কুলটাৰত্মে প্রবর্ত্ত হওনে মনস্থ করিয়া নাপিতিনীকে কহিতেছেন, ওগো নাপিতিনী মাসি তোমাকে বড় ভালবাসি তুমি আমার হিতৈষী সকলি জান অধিক কি কহিব কিন্তু এতকাল আমার দুঃখের দুঃখী সুখের সুখী কাহাকেও পাই নাই এবং তোমাকে বলিব২ করিয়াও কিছু বলিতে পারি নাই, এখন বুঝিলাম আমার কপাল ফিরিয়াছে অতএব লজ্জার মাথা খাইয়া আমার মর্ম্মের ব্যথা ও মনের কথা প্রকাশ করিয়া কহিতেছি, মন দিয়া শুন ।

অথ নব যুবতীর মনদুঃখ প্রকাশ।

পয়ার। মনের মরম কথা প্রকাশিতে নারি। কত পাপ ছিল তাই হইয়াছি নারী। একি দায় হায়২ কি বলিব সই। আমি যাই অতিদুঃখী তাই এত সই। অন্যে এ ব্যথার কথা কে বুঝিতে পারে। সেই পারে যে গিয়াছে প্রেমসিন্ধু পারে। তুমি প্রেম প্রবীণা তোমার কৰ্ম্ম বোঝা। অন্য জনে একথা কেবল হয় বোঝা। পড়েছি করম দোষে আমি যার করে। সেজন দুর্জন অতি কি জানি কি করে। চরসে সরস সদা গাঁজা আর ভাঙ্গে। বুঝ দেখি এ প্রণয় থাকে কি বা ভাঙ্গে। কে আছে সংসারে সথি অবলা বলদ। পতি যিনি হন তিনি কেবল বলদ। অকৃতি আমার পতি নাহি কোন বল। তাহার দাসীত্ব করে কি হইবে বল। সদা থাকে অন্য মনে আমারে না ভাবে। বরঞ্চ শত্রুতা ভাল ধিক্ এমন ভাবে। চল্লিশ সেরেতে হয় পরিপূর্ণ মণ। সেই পরিমাণে নাথে সঁপেছিহু মন। কিন্তু না পাইঙ্গ তার মনের একলা। ফাঁকি দিয়ে আমারে সে দেখাইল কলাঃ নাহি দেয় সুখ কিম্বা দেয় রূপা সোণা। বেঁচে আছে পতি ইহা কানে মাত্র শোনা। রাত্রি হলে বসে গণি আকাশের তারা। না দেখি তাহারে চক্ষে ক্ষরে গেল তারা। নিশি দিন দুনয়নে বহিতেছে বারি। পতির আশয়ে অশ্রু কতই নিবারি। পর নারী নিয়া থাকে পতি যে বালিশ। আমি কি থাকিব সই লইয়া বালিশ। না হইল কোন সুখ জনমিয়া ধরা। আমি কি পড়েছি সই চোরদায়ে ধরা। সহে না সরল প্রাণে মদনের তীর। জুড়াইতে দগ্ধ তনু যাব সিন্ধুতীর। কিন্তু ভাবি যে জালায় এই প্রাণ জ্বলে। এ জ্বালা কি যাবে সই ঝাঁপ দিলে জলে। জলেতে জগৎ স্নিগ্ধ নাম যে জীবন। সে জীবনে প্রাণসখি না রহে জীবন। কুলে থেকে কত আর দুঃখে কাল হরি। শুনিলে আমার কথা লোকে বলে হরি। যৌবনমদেতে মন প্রমত্ত বারণ। কুল লজ্জা কত তায় করিবে বারণ। প্রতিজ্ঞা করেছি তাই উপপতি করি। তবে শান্ত হবে এ অশান্ত মন করি। তোমারে পাইয়া লাভহৈল লক্ষ লক্ষ। বুঝিলাম অতঃপর সিদ্ধ হবে লক্ষ্য।

অথ নাপিতিনীর সাহস প্রদান।

কথা। নাপিতিনী কুলকামিনীর দুঃখ শুনিয়া মনে২ চিন্তা করিল যে ভাল শীকার পাইয়াছি, ইহাকে যদি মিষ্ট কথায় তুষ্ট ও রসের আলাপে বশ করিতে পারি তবে এই আমার বৃদ্ধ বয়সে ধনোপার্জনের বিশেষ উপায় হয় কেননা লোকের কৃতী পুত্র পাইলে যে ভাল হয় তন্ত্রপ কুটনীর অবলা ভোলা কুলবালা পাইলে ভাল বোধ হয়। অনন্তর ঐ যুবতীর রূপের চটকে লম্পট বাবুদিগকে আটক করিবার নিমিত্ত আপন ফটকে লইয়া যাইতে মনস্থ করিয়া কুলকামিনীকে সংগোপনে কানে২ কহিতেছে, বাছা তুমি আপন মনের কথা আমাকে কহিলে এখন আমার প্রাণের প্রাণ হইলে, দেখ দেখি এই বুড়ি হইতে তোমার কত সুখ হয় তাহা ক্রমে২ জানিতে পারিবে, এই যত হুমরা চুমা বাবু ইহারা সকলেই আমার কাবু, তোমাকে এমন একজন ফুল বাবুর কাছে লইয়া যাইব যে তুমি এক্কালে রাজরাণী হইয়া বসিবে। এবং তাহার নাম শুনিলে তোমার স্বামী ভয়ে কিছুই করিতে পারিবে না। যেমন সিংহে শিকার করিলে শৃগাল জুলজুল চাহিয়া দেখে তেমনি রাজভোগ্যা তুমি রাজার ভোগে আইলে অজার কি সাধ্য যে তোমার ছায়া মাড়ায়।

অনন্তর এই সকল প্রবোধ বচনে কুলকামিনী কুলভয়ে নির্ভয় হইয়া নাপিতিনীকে জিজ্ঞাসিতেছেন, বল দেখি মাসী সেজন কেমন সুজন ও তাহার কেমন মন ও কত ধন আর তাহার প্রেমবিলাসিনী কোন জন আছে কি না। নাপিতিনী উত্তর করিতেছে।

ত্রিপদী। নগরে নাগর যত, তার মধ্যে মনোমত, মনমথ আছে একজন। যদি হয় প্রয়োজন, আনিব সে প্রিয়জন, মিলাইব রতনে রতন।। রূপেতে রতির পতি, গমনেতে হংসগতি, রমণেতে মাতঙ্গ সমান। চুম্বনে কপোত সম, কথায় কোকিল ভ্রম, অনায়াসে হরে লয় প্রাণ।। মুখেতে মধুর হাস, পদ্ম যেন সুপ্রকাশ, আহা মরি কেমন সুন্দর। গানেতে গলায় মন, পশু হয় অচেতন, কি কহিব কেমন কিন্নর।। সব গুণে সুনিপুণ, না দেখি এমন [পুনঃ], পুরুষ পরশমণি তুল্য। যদি তুমি হবে ধনি, তবে বলি শুন ধনি, পরশ সে পরশ অমূল্য।। ধনেতে কুবের কল্প, অথবা বিটপ কল্প, পৃথিবীতে সৃজিল, ঈশ্বর। মন যেন গঙ্গাজল, নিরমল সুশীতল, গাম্ভীর্য্য যেমন রত্নাকর।। পুরুষের মধ্যে নিধি, তাহারে গড়িল বিধি, নারীমধ্যে তুমি তার যোগ্যা। প্রেমীসঙ্গে প্রেম কর, সদা সুখে কাল হর, রাণী হয়ে হও রাজভোগ্যা ॥ বাবুমধ্যে সেই রাজা, আর যত বাবু অজা, অজা সঙ্গে মজা কোথা হয়। মজিলে তাহার সঙ্গে, থাকিবে পরম রঙ্গে, অপাঙ্গে অনঙ্গে হবে জয় ॥

অনন্তর ঐ নাগরী নাগরের এ প্রকারে সৌন্দর্য্যতার সমাচার পাইবা মাত্র তাহার মনোরূপ নৌকা আহলাদসাগরে টলমল করিতে লাগিল, তখন বিবেচনা করিলেন যে এই নাপিতিনী মাসী আমার নিতান্ত হিতৈষী, এ উত্তম পরামর্শ দিয়াছে, অতএব মিথ্যা কেন আর ঘরে থাকিয়া পরের গঞ্জনা ও যন্ত্রণা ভোগ করি, এ পাপ সংসার হইতে বাহির হইলেই প্রাণে বাঁচি, তখন আপন বশে থাকিব এবং স্বচ্ছন্দে মনের আনন্দে পছন্দমত নাগর লইয়া কাল যাপন করিতে পারিব, এইরূপ বিবেচনায় কুলকামিনী কুলে হইতে পলাইবার পন্থায় নাপিতিনীকে বলিতেছেন, শুন গো নাপিতিনী মাসী আমি এক্ষণেই তোমার সঙ্গে যাইতে প্রস্তুত আছি, আর এ পিঞ্জরের পাখী হইয়া থাকিতে পারি না, দেখ স্বামীর এই দশা, তাহাতে আবার যদি গোপনে এদিক ওদিক কোন দিক চাই তখনি ঘরে পরে গুরুজনের গঞ্জনায় প্রাণ বাঁচে না। বাটীর রসুয়্যা ব্রাহ্মণ, কিম্বা জলতোলা ভারী, অথবা কুটুম্ব লোকজন কাহারো সঙ্গে কালে ভদ্রে পিত্তরক্ষার নিমিত্ত আলাপ করিলে অভাগা মাগিগুলা কতই কয়; এত কি প্রাণে সয়; যেমন পাপিষ্ঠ ভাতার তেমনি তার ভাত আর খাইব না; এবং গুরুজনেও যে প্রকার ভৎসনা করে তেমনি তাহাদিগকেও আক্কেল দিব; এ পাপ সংসারে আর কাষ নাই, আমার এই শরীরে কতই সবে, এখন বল দেখি কোন সময় কি প্রকারে কোথায় লইয়ে যাইবে। নাপিতিনী কহিতেছে শুভকৰ্ম্মে বিলম্ব নাই; যে কৰ্ম্ম করিবে তাহাতে সকল সময়ই প্রশস্ত কিন্তু ব্যস্ত হইলে কি জানি কেহ টের পাইয়া মাঝপথে বিপদ ঘটায়, তবে একে আর হইবেক; অতএব তুমি সংসারের নিত্যকার কার্য কৰ্ম্ম করিয়া শুইয়া থাকিবা, আমি চারিদণ্ড রাত্রি থাকিতে বাহিরে সাড়া দিব। সেই সাড়া শুনিয়া তুমি বাহিরে আইলেই শত্রুর চক্ষে ধুলা দিয়া তোমাকে সঙ্গে লইয়া চলিয়া যাইব, যদি কেহ রাত্রি থাকিতে উঠে তোমাকে কোন কথা জিজ্ঞাসা করে, তবে তুমি কোন সাড়া দিও না, একান্ত আঁটাআঁটি করিলে পেটের সাড়া জানাইবা ॥

অথ নব যুবতীর নাপিতিনীর সহিত বহির্গমন।।

অতঃপর নাপিতিনীর উপদেশ উপদিষ্টা সন্তুষ্টা কামিনী গৃহকৰ্ম্ম করিয়া নিয়মিত সময়ে শয়নাগারে শয়ন করিয়া রহিলেন। নিদ্রা সকলি মিথ্যা, মনে২ এই ভাবিতেছেন যে কতক্ষণে পায়ের শিকলী কাটিয়া বাহির হইব; পরে নিরূপিত সময়ে নিদ্দিষ্ট স্থানে কুলকামিনী নাপিতিনীর শব্দ পাইবা মাত্র গাত্রোত্থান করিয়া সে স্থান হইতে প্রস্থান করিয়া নাপিতিনীর গৃহে আসিয়া রহিলেন। এখানে পরদিবস প্রাতে স্বামী বাবু ঘরে বাহিরে অনেক অন্বেষণে ও ইতস্তত ভ্রমণ করিয়া দেখিলেন, শেষে কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া আত্মীয় অন্তরঙ্গ সকলের গৃহে তত্ত্ব করিলেন তথাপি কিছু অনুসন্ধান না পাইয়া চিত্ত-পুত্তলীর ন্যায় অবাক হইয়া রহিলেন, ঘরে পরে সকলে তাহাকে গঞ্জনা দিতে লাগিল। যে তখনি বলিয়াছিলাম, বাপু তুমি যেমন সতী সাবিত্রীর মুখাবলোকন কর না, তেমনি তোমার মুখে কালি চুন পড়িবেক, এখন কেমন; তুমি যে হাড়ি ডোম শুড়ি চণ্ডাল মুছলমান ফিরিঙ্গী ইংরাজ ফরাসীয় নানা জাতির সহিত বিহার করিয়া মজা করিয়াছ, এখন দেখ দেখি তোমার জাতি কে মারে, এইরূপে ঘরে পরে গুপ্তকথা ব্যক্ত হইয়া বাবু একঘর মানুষ হইলেন, অর্থাৎ তদবধি একঘর‍্যা হইয়া রহিলেন ॥*॥

অথ নাপিতিনীর বাটীতে নব যুবতীর কালযাপন।।

এখানে নাপিতিনীর ঘরে কুলকামিনী আসিয়া লুকোচুরি খেলায় প্রবর্তা হইলেন অর্থাৎ যোগেযাগে যোগযাগ করিতে লাগিলেন এবং যাহার বৃত্তান্ত শুনিয়া এত উল্লাসিতা হইয়া কুলে হইতে বাহির হইয়াছেন তাহার আকাঙ্ক্ষায় নাপিতিনীকে জিজ্ঞাসিতেছেন, কহ দেখি মাসী, এখন তাহার সহিত মিলনের কি উপায় হইবেক, আর একাকিনী বিরহিণী হইয়া থাকিয়া প্রাণে দুঃখ দিতে পারি না, অতএব শীঘ্র তাহার সহিত যাহাতে মিলন হয় তাহার উপায় কর। নাপিতিনী কহিতেছে, বাছা তৃষ্ণা আগে দৌড়ে কি জল আগে দৌড়ে, তুমি এত ব্যস্ত কেন হও? কিছু দিন গেলে তোমার সম্ভ্রম বাহির হইলে কত কত বাবু আসিয়া আপনা হইতে কাবু হইবেক, তবে তোমার প্রাণের বড় জ্বালা হইয়া থাকে তাহাতে থাকিতে না পার এজন্য আমি ইহার উপায় অদ্যই করিতেছি, তোমার উপযাচক হওনের কোন প্রয়োজন নাই, কিঞ্চিৎ কাল স্থির হইয়া থাক। ইহা বলিয়া নাপিতিনী গৃহ হইতে বাহির হইল। নাপিতিনী এ ব্যবসায় অতিশয় নিপুণা এবং অনেক কালাবধি এ কৰ্ম্ম করিয়া আসিতেছে, এ কেবল নূতন ব্রতী নহে। তাহাতে অনেকের নিকট পসার হইয়াছে, তন্মধ্যে অধিক কাবু একজন বাবুর নিকট গিয়া কুলকামিনীর সংবাদ জানাইতেছেন ॥*॥*॥

অথ নব যুবতীর পরিচয়।

নাপিতিনী এক পল্লীগ্রামস্থ কায়স্থ কপট লম্পট বাবুর নিকট স্বয়ং গিয়া কহিতেছেন, বাবু, তোমার জন্যে আমি এক ভাল মানুষের ঘরে সিন্ধ দিয়াছি। বাবু হাস্যবদনে নাপিতিনীকে জিজ্ঞাসিলেন, সে কি প্রকার? নাপিতিনী কহিতেছে, তুমি যেমন রসিক তেমনি এক রসিকা নব যুবতী কুলবালা তোমার জন্যে বাহির করিয়া আনিয়াছি। ইহার রূপ গুণের কথা কি কহিব, না দেখিলে জানিতে পারিবে না, সহরে সহরে কি বেড়াও, যত সহরের মজা সকলি তাহার শরীরে দেখিতে পাইবে ॥*॥

পয়ার। সুখের প্রয়াসে তুমি রসিক নাগর। বৃথা কর পর্যটন নগর নগর। কুলকামিনীর অঙ্গে কর নিরীক্ষণ। সকল সুখের স্থান হবে নিরূপণ।। বারেক যে দেখে মুখ সুধাবাদ তার। না দেখে সে মুখ সুধা বাদ পুনর্ব্বার।। এ মুখে সুধার বাদ নহে বাদ মাত্র। সুধা না থাকিলে কি জুড়ায় দেখে গাত্র। ভালে ভাল চন্দননগর শোভা পায়। চুঁচুড়ার সং দেখ চুলের চূড়ায়। সিতীর বাগানে বাবু যাও নিতি২। কপাল জুড়িয়া আছে দেখ সেই সিঁতী। ভুরুষুট পরগণা ভুরুতে নির্যাস। তার গুণ কি কহিব ভারতে প্রকাশ। কানপুর শুনেছ কেবল মাত্র কানে। স্বচক্ষে দেখহ বাবু যুবতীর স্থানে। শোনা আছে দানাপুর দেখা নাহি তায়। সোণাদানাপুর পাবে নারীর গলায়। নগরের মধ্যে এক কলিকাতা সার। প্রতি পথে কত শত মজার বাজার। কিন্তু দেখ অঙ্গনার অঙ্গ সহকার। বুকে দুই কলি কাতা অতি চমৎকার। এ কলিকাতায় সবে দেয় রাজকর। সেই স্থানে রাজাকেও দিতে হয় কর।। কটি অভরণ ছলে দেখ কাঞ্চিপুর। চন্দ্রকোণা চন্দ্রহারে দেখিবে প্রচুর।। অপূর্ব্ব নগর দেখ যার নাম ঢাকা। শিল্পবিদ্যা সেইখানে কত আঁকা বাঁকা।। কি দেখেছ রসরাজ এ কোন নগর। রমণীর অঙ্গে আছে ত্রিকোণ নগর। তাহাতে গমনছলে সুখচর হয়। তাহার সমান এই সুখচর নয়। সে অঙ্গে দেখিতে পাবে যে সুখ সাগর। তা দেখিলে তুচ্ছ হবে এ সুখসাগর। কিন্তু নারী ইচ্ছা পুর দেখা বড় শক্ত। ইচ্ছাপুর সদা থাকে তাহাতে অব্যক্ত। অমৃতসরের সৃষ্টি সে অমৃতস্বরে। রণজিত পঞ্চশর তাহে বাস করে। মানসিংহ অধিকার যুবতীর মানে। পরাজয় নাহি নারী জয়পুর স্থানে। বন উপবন তুমি কি দেখিবে আর। গোপনে সুন্দরবন দেখ চমৎকার। যদি বল ব্যাঘ্রভয় এ সুন্দর বনে। তথায় ব্যন্ত্রের ভয় হয় কোন স্থানে। বিধাতার সৃষ্টিতে নাহিক ব্যত্যয়। অনঙ্গের অঙ্গ তাহে ব্যাঘ্র তুল্য হয়। সহ্য নয় অতিশয় কামড় তাহার। ফিকিরী শিকিরী ভিন্ন বাঁচে সাধ্য কার।

অনন্তর কুলকামিনীর সৌন্দর্য্য শ্রবণে অধৈর্য্য মনে ফুলবাবু ফুল হইয়া নাপিতিনীর সহিত তৎক্ষণাৎ যাইতে উদ্যত হইলেন। তাহাতে ধূর্তজাতীয় কামিনী নাপিতিনী ধূর্ততা করিয়া কহিল যে, বাবু, গোপনের কর্ম্ম রাত্রেই ভাল, দিনের বেলা এ খেলা উচিত হয় না, যদি কেহ তোমাকে দেখে তবে নিন্দা করিবেক এবং আমারো গৃহস্থের ঘর, তুমি যাইয়া কি দিনে ডাকাতি করিবে? বাবু উত্তর করিলেন যে, তুমি যাহা কহ ইহা সত্য বটে, কিন্তু একজন দিনের বেলা সিঁদ দিতেছিল, তাহা দেখিয়া আর একজন জিজ্ঞাসিল যে, তুমি কি রাত্রি অনুমানে দিনে সিঁদ দিতেছ? তাহাতে সে উত্তর করিল যে গরজ ভারী; অতএ আমারো সেইরূপ ভারী গরজ উপস্থিত, এখন ইহার কি বিহিত তা বল। পরে নাপিতিনী অনেক বুঝাইয়া স্তোক দিয়া বিদায় হইল, কিন্তু সে বিদায়ে বাবুর বড়ই দায় হইল, কোন মতে স্থির হইতে পারিলেন না। কতক্ষণে সন্ধ্যা হয় এই ভাবনায় সন্ধ্যা না হইতে সন্ধ্যার বন্দনা করিতে লাগিলেন। অনন্তর যেমন সূর্যদেব অস্তাচল গমনোন্মুখ হইলেন তৎক্ষণাৎ বাবু উঠিয়া ছুট দিলেন। নাপিতিনীর ঘর পাবলিক আফিসের ন্যায় খ্যাত, বিশেষতঃ নববাবুসকল সেই আফিসে নিত্য২ কৰ্ম্ম-স্থানজ্ঞানে কর্ম করিতে যান, ইহাতে সে স্থান ফুলবাবুর পক্ষে কোন মতেই অপরিচিত স্থান নহে, সুতরাং দ্রুতগতি দ্বারা তথায় যাইয়া উপস্থিত হইলেন; তখন নাপিতিনী বাবুর নিকট উপযুক্ত নজর লইয়া নজরানজরী করিতে দিল। তাহাতে যুবা বাবু ও যুবতী কামিনী উভয়ে কটাক্ষবাণ সন্ধান করিলেন, ক্রমে পরস্পরের রাগ বৃদ্ধি হইবাতে সকল অস্ত্রশস্ত্র বাহির হইল এবং উভয়ে ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ করিলেন। অবশেষে এক পক্ষের ধ্বজা ভঙ্গ হইবামাত্র ধনির জয় ধনির জয় এই কথা নাপিতিনী দূর হইতে কহিতে লাগিল। ইহাতে ধনির জয়ধ্বনি ছলে উভয়েরি সম্মান রক্ষা হয় বটে, কিন্তু রসিক বোদ্ধা সকল বিশেষ বিবেচনায় নাপিতিনীর জয় নিশ্চয় করিবেন, কারণ প্রথমেই যে নজর ব্যতীত নজর করিতে দেয় নাই। এইরূপে কএক দিবস ফুলবাবু ফুলের মধুপানে মধুকরের ন্যায় গমনাগমন করেন, শেষ একদিন যটপদ শঠতাপূর্ব্বক মনে চিন্তা করিলেন যে যদি এই পদ্মিনীকে আপন বশে কোন বাগানে রাখিতে পারি, তবে অনায়াসে আমার সেই আনন্দকাননেই দিবারাত্র আহারবিহার হইতে পারে। এই বিবেচনায় এ কথার আলোচনা যখন যুবতীর সহিত হইল, তখন বাহির হইতে নাপিতিনী শুনিতে পাইয়া মনে২ ভাবিতে লাগিলা যে আমি আপনার লাভের জন্য এত যত্ন করিয়া গৃহস্থের গৃহে সিঁদ দিয়া কামিনীরত্ব আনিলাম, এক্ষণে আবার চোরের উপর বাটপাড়ের ভয় উপস্থিত। পাছে ভোলা মেয়ের খোলা মন উহার প্রতি পড়ে তবে ত আমার হাতে খোলা হইবেক। এই আশঙ্কায় - স্বাভাবিক চাতুর্য্যতায় নাপিতিনী বাবুকে কহিল যে, শুন বাবু, আমার ঘর তোমারি, যাহা ইচ্ছা যায় এইখানে কর, বরং দিনে আসিতে চাহ আইসহ, তাহাতে পরামাণিকের ভয় নাই। তুমিই আমার সাত রাজার ধন পুরা মাণিক। আর দেখ বাবু, এ সকল কৰ্ম্ম গোপনেই ভাল, প্রকাশে অনেক দোষ; কি জানি, জানাজানি হইলে ভালমানুষের মেয়ের কথা আবার যদি লোকে টের পায়, তবে অনেক ফেরফার হইয়া শেষ তোমারো মন্দ আমারো মন্দ, অবশেষে একটা বিষম দ্বন্দ্ব উপস্থিত হইবেক। এই কথা শুনিয়া বাবুর মনে সন্দেহ হইল এবং কুলবালা ভোলা বড়ই ভয় পাইল। সুতরাং সেই নিমিত্তে বাবু নাপিতিনীর বাটীতেই দিবারাত্রে যখন তখন গমনাগমন করেন এবং পাছে সুখের ব্যাঘাত হয় এই জন্য নাপিতিনীকে সন্তুষ্ট রাখিবার জন্য যেদিন যাহা চাহে তাহাই দেন। এইমতে এদিকে ক্রমে২ পাপের ভরা পরিপূর্ণ হইল, ওদিকেও ধর্ম্মের চর সন্ধান পাইল, অর্থাৎ একদিন ফুলবাবু অনঙ্গ-সঙ্গপ্রসঙ্গ পরম রঙ্গে রসতরঙ্গে অঙ্গ ভাসাইয়া কি মজা এই কথা বারম্বার চীৎকার ধ্বনিতে কহিতেছেন, ইত্যবসরে পুলিসের তরফ একজন চৌকিদারে পাড়ার লোকের মুখে শুনিতে পাইল যে নাপিতিনীর বাটীতে অনেক কুলবালা আসিয়া রহিয়াছে। ইহা স্বনয়নে দেখিয়া চৌকিদার থানার জমাদারের নিকট সমাচার কহিল। জমাদার তৎক্ষণাৎ নাপিতিনীর বাটীতে স্বয়ং উপস্থিত হইয়া দেখিলেক যে নাপিতিনীর ঘরের ভিতরে কোন ভালমানুষের কুলের কুলবালা লইয়া একজন কুলপ্রদীপ নববাবু মজা করিতেছেন, ইহাতে জমাদার তৎক্ষণাৎ ওই নাপিতিনীকে ও নব যুবতীকে এবং নব বাবুকে ধৃত করিয়া থানায় আনিয়া পুলিসে চালান করিল। পরে এই বিষয় বিচার কালীন বিচারকর্তা ধৰ্ম্মসংস্থাপনহেতু যুবা ও যুবতী উভয়কেই ধমকাইয়া ধুমধাম করিলেন এবং সে দিবস বাবুকে ও নব যুবতীকে ফটকে আটক রাখিলেন। এখানে নব যুবতীর স্বামী বাবু এই সম্বাদ পাইয়া পরদিবস পুলিসের কাছারীতে স্বয়ং উপস্থিত হইলেন। তখন বিচারহেতু বিচারকর্তা বাবুকে ও কুলকামিনীকে নিজ সম্মুখে দণ্ডায়মান করিয়া প্রথমতো বাবুকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, তুমি জান যে এ স্ত্রীলোক এক ব্যক্তির বিবাহিতা স্ত্রী, তবে তুমি ইহার সহিত কেন এ প্রকার আসক্তি করহ। বাবু উত্তর করিলেন যে, আমি এ স্ত্রীলোককে কখন দেখি নাই এবং জানি না, আমার সহিত ইহার কোন কালেই আলাপ নাই। অমুক নাপিতিনী ইহাকে সঙ্ঘটন করিয়া দিয়াছে, আমি কাহারো বিবাহিতা স্ত্রী জানিলে ইহার নিকট কদাচ আসিতাম না। পরে বিচারকর্তা এ কথা শুনিয়া বাবুকে কিছু না কহিয়া নাপিতিনীকে সমন দিয়া তলব করিলেন, সেই সমন নাপিতিনীর পক্ষে শমন হইল অর্থাৎ বিচারকের বিচারে নাপিতিনী প্রধান দণ্ডী হইবাতে শ্রীঘরে গমন করিতে হইল; উক্ত আছে যে লোভেই পাপ পাপেই মৃত্যু। অনন্তর বিচারকর্তা কুলকামিনীকে শাসনভয় দেখাইয়া কহিলেন যে, তুমি কি নিমিত্তে কুল ত্যাগ করিয়া কুলটা হইবা? এ কৰ্ম্মে ক্ষান্ত হও, আপন স্বামীকে লইয়া স্বচ্ছন্দে কালযাপন করহ। ইত্যবসরে কুলবধূর স্বামী বাবুও বিচারকর্তার সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া কুলবধূকে অনেক সাধ্য-সাধনা করিলেন, কিন্তু কুলবধূ কোন মতেই সেমতে মত করিলেন না। বিচারকের নিকট বিস্তারমতে পূর্ব্ব বৃত্তান্ত প্রকাশ করিয়া কহাতে বিচারক ক্ষান্ত হইয়া রহিলেন। সুতরাং তদবধি কুলকামিনী নাম লেখাইয়া নব বিবি নাম লব্ধ হইলেন, সবিশেষ পল্লবখণ্ডে প্রকাশ পাইবেক ইতি।।


অথ পল্লবখণ্ড ॥ অর্থাৎ বিবিরূপ বৃক্ষের পল্লব।

অনন্তর পূর্ব্বোক্ত নব বিবি নগরস্থা বয়স্থা এক বেশ্যার নিকটে আশ্রয় লইলেন এবং তাহাকে মাতৃরূপে সম্বোধন করিলেন। ঐ বেশ্যা কন্যাকে পাইয়া স্নেহবাক্যে অমৃতাভিষিক্ত করিয়া কহিলেন, বাছা, তুমি আমার সাত রাজার ধন, আমার পেটের সন্তান হইতেও তোমাকে অধিক ভালবাসি, আমরা আর কত দিন বাঁচিব তুমি চিরদিন সুখ ভোগ কর তাহাই দেখিয়া তোমার আলাইবালাই লইয়া মরি এই আমার বাঞ্ছা, আমি মরিলে এই ধুনদৌলত সকলি তোমার। এবম্প্রকার মিষ্ট বচনে বিবিরূপ অঙ্কুরসেচনে সযত্ব হইল। মাগী বড়ই ঘাঘী, স্নেহ সকলি মিথ্যা, সুদ্ধ ধনলোভী, এমতে ধনোপার্জনার্থে প্রথমত সেই কন্যাকে নব বিবিরূপে প্রকাশ করিবার প্রয়াসে তাহার নিজ প্রেমে মোহিত পূর্ব্বের আলাপিত যে২ নগরবাসী ও পল্লীগ্রাম-নিবাসী বাবুদিগের সহিত সম্প্রীতি ছিল বিবিকে তৎসহ স্বর্গস্থা করিয়া ঐ বাবুরদিগের সহিত যে প্রকার তিনি স্বয়ং হাবভাব কটাক্ষ করিতেন বিবিকেও তদ্রূপ শিক্ষাপড়া দিতে লাগিলেন। এইরূপে পল্লীগ্রামের গ্রাম্য দোষ কিঞ্চিৎ দূর হইয়া যখন নাগরিক গুণে নাগরীর গুণবার্তা হওনের উপক্রম হইল তখন এক দিবস ঐ প্রাচীনা বেশ্যা আপন পুরাতন বাবুগণকে কহিলেন যে, তোমরা দয়া করিয়া আমার এই নব বিবিকে কিছু গাওনা বাজনার তালিম দেও। প্রাচীন আলাপিত বাবুরা প্রাচীন লোচ্চা, প্রায় অনেকে গোঁপ কামায়, গোরগাফি জুতা পায়, টুটি২ মালা গলায়, ঝুমুরের গীত গায়, বেহালা বাজায়, টাক মাথায়, পাশা খেলায়, পাখী পড়ায়, গুড়ে মোণ্ডা খায়; তন্মধ্যে জনেক তাহার নাম আডিজী। তিনি কহিলেন যে, তার আটক কি বিবি? আমরা সকলেই প্রস্তুত আছি, নব বিবিকে যে প্রকারে গাওনা বাজনা শিখাইতে কহিবে সেই প্রকারে শিক্ষা দিব। এই যে পোদ্দার মহাশয় ইনি সকল রকম গাওনা জানেন অর্থাৎ ঝুমুরের গীত, যাত্রার গীত, রাম-প্রসাদী পদ, নিধু টপ্পা ও মিত্রজার খেমটা পর্যন্ত গাইতে পারেন। পোদ্দার মহাশয় পূর্ব্বে পরমানন্দ যাত্রাওয়ালার দলের বাসুদেব সাজিতেন, ইহাতেই সকল প্রকার গাওনা শিখিয়াছেন; আর ওই সেঠজী বেহালা বাজাইয়া থাকেন, এবং আমি নিজে নাচিতে পারি, কারণ আমি হরুর দলে নাচিয়াছিলাম। বিবির মাতা এই কথা শুনিবা মাত্র কহিলেন, তবে তুমি প্রথমত নাচ শিক্ষা করহ। তিনি উত্তর করিলেন যে, চুলি ঢোল না বাজাইলে আমি নাচিতে পারি না। পরে পোদ্দার মহাশয়কে কহিলেন, ভাল, তুমি আমার নব বিবিকে গান শিখায়ো দেখি। পোদ্দার মহাশয় উত্তর করিলেন যে দোয়ার না হইলে গান করা গোঁয়ারের কর্ম। অনন্তর এই সকল বাক্কৌশল দেখিয়া বিবির মাতা কহিলেন, আচ্ছা, তোমরা তো সকলেই ঘরের লোক, তোমারদিগের নিকট যখন মনে করিবেক তখনি শিখিতে পারিবেক, কিন্তু একজন ওস্তাদ নিযুক্ত না করিলে নব বিবির প্রকৃত রূপের গান শিক্ষা হইবেক না, অতএব আডিজী তুমি একজন বাঙ্গালী ওস্তাদ অন্বেষণ করহ, অল্প টাকা লয় এবং লোকটা জনটা ডেকেডুকে আনে ও রহিয়া বসিয়া টাকা লয়, আর ফায়ফরমাইস খাটে, এবং বাইআনা গাহনাও জানে। আডডিজী কহিলেন, তার আটক কি, কল্যই অন্বেষণ করিব।

অথ ওস্তাদজীর অন্বেষণের বৃত্তান্ত।।

আড্ডিজীর সহিত বিবির মাতার বহুদিনের আলাপ এবং প্রণয়ও আছে, সেই অনুরোধে কলিকাতার বাজারে২ এবং গলি২ ওস্তাদের অন্বেষণ করিতে লাগিলেন, যথা-কলুটোলা, খালাসিটোলা, আহিরী-টোলা, বেনেটোলা, দরজিটোলা, ডোমটোলা; আমড়াতলা, পঞ্চাননতলা, নেবুতলা, গেঁড়াতলা, বটতলা, বাদামতলা, চাঁপাতলা, বাঁশতলা, মনসা-তলা, ষষ্ঠীতলা, তালতলা, মাণিকতলা, ঝাঁঝরিতলা, বৃজীতলা; দরমাহাটা, নাপিতেহাটা; হাড়কাটার গলি, বাঁশতলার গলি, হাঁসপুকুরের গলি, চুনাগলি, পাঁচিধোপানীর গলি; যোড়াবাগান, চোরবাগান, রাম-বাগান, কৃষ্ণবাগান, সেটের বাগান, বালাখানার বাগান, হালসীর বাগান, মেহিদীবাগান, হাতীবাগান; চড়কডাঙ্গা, নারিকেলডাঙ্গা, কবরডাঙ্গা, পটলডাঙ্গা, ডিঙ্গেভাঙ্গা; মলঙ্গা, কলীঙ্গা; সাটিবাজার, জানবাজার, বড়বাজার, মেছোবাজার, শোভাবাজার, বাগবাজার; চিৎপুর, ভবানী-পুর, খিদিরপুর পর্যন্ত অন্বেষণ করাতে এবং সকল বাঙ্গালা সংবাদপত্রে সমাচার দেওয়াতে প্রচার হইল যে অমুক বিবির জন্য একজন ওস্তাদের আবশ্যক হইয়াছে। ইহাতে যাহারা সঙ্গীতবিদ্যায় ব্যবসায়ী এবং ওস্তাদ-রূপে বিখ্যাত, যথা সদ্দ, মন্দ, হন্নু, কলু, গম্বু, কম্মু; হোসেনী, সোভানী, রহমানী, রমজানী; চাঁদ খাঁ, সুরজ খাঁ, ফিরোজ খাঁ, উজীর খাঁ, তুজীর খাঁ, করিম খাঁ, রহিম খাঁ, আলিবক্স, মোরাদাবক্স; গোলাম আলী, রসল এলাহার ফুতে। এ ফুঙ্গীর ফুতে তারিয়া লয়ো দিয়া রাঙ্গা পাও; তারিণী বিটি মায়ো মায়ো। বিবিসকলে এই এক কলিতেই চারি কলির সুখ পাইলেন। তদনন্তর টপ্পা শুনিবার বাঞ্ছায় কহিলেন যে যদি তুমি বাইয়ানা গাহনা জান তবে তাহারও একটা গীত গান কর। ওস্তাদ এই আজ্ঞা প্রাপ্ত হইয়া কহিলেক, তবে এয়োগা টপ্পা গাই হুন্‌ক্যান, যথা-পোলাতুর্কা দুইস নারে। অল্দী পাখির বাচা তোরে দরিয়া দিমুরে। বিবিসকল ওস্তাদদের এই ওস্তাদী দেখিয়া গুণব্যাখ্যা করিয়া কহিলেন যে, সকল বিদ্যা এককালেই প্রকাশ করিয়ো না, এক্ষণে ক্ষান্ত হয়ো, তোমার সমস্ত গান শুনিতে দিনমণি অস্ত হইবেন। অন্য২ গাইয়া ব্যস্তসমস্ত, উহারদিগেরায়ো শুনিতে হইবেক। ওস্তাদ উত্তর করিলেন, তার ঠ্যাক কি, যাহারে হুনবার চান হুন্‌ক্যান ॥*॥

অথ দ্বিতীয় ব্যক্তির পরিচয়।

তদনন্তর এক ব্যক্তি চক্ষু টেরা মাথা নেড়া লোম কটা দাঁত চটা কোতা গরদন ফোতা ভারী কোপীধারী আনরপুরী বিবিদিগকে গর্দভের ন্যায় মৃদুস্বরে কহিলেন, সালাম গো বিবি, বাঙ্গালের গান তো শুনলা। এখন আমারে যে তোমার লোক লয়ে আয়েছে তার কি করবা কর; গান শোনবা তো শোনো। বিবির মাতা এই কথা শুনিয়া কহিলেন, বাক্যেতেই বিদ্যার প্রকাশ পাইয়াছে, তথাপি খেদ রাখায় কি ফল, শুনাই উচিত। ইহা বলিয়া পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার নাম কি, নিবাস কোথায় এবং কেমন গান জান? ওস্তাদ কহিলেন, আমার চাচার নাম দিলমামুদ, আমার নাম জরীপ, আমার ঘর আনরপুরিতি, আমি বাইয়ানা গাহনা জানি, পীরির গীত জানি, সখীসম্বাদ বিরহ খেঁড় জানি, একটা শোনবা? বিবির মাতা কহিলেন, প্রথম বাইয়ানা গীত গায়ো। ওস্তাদ আরম্ভ করিলেন, যথা-রামজানের চাঁদ অঠবে কবে। আমি ভাব্যা পাইনা দিসারে, যত দেশের মোগল পাঠান সবাই ফিরে আলো, অভাগার চাঁদ কেন আগাশে নারলোরে রামজানের চাঁদ অঠকে কবে। ওস্তাদ ইহা উচ্চৈঃস্বরে গান করত নৃত্য করিতে লাগিলেন, পুনরায় পীরির গীত আরম্ভ করিলেন, যথা-দায়োয়ানগাজী ফকীর। কেরামতে দুনিয়াতে করিলে জাহীর। সত্যপীর মত্যপীর ছোঁড়া কাঁথা গায়। ওপারেতে সত্যপীর পলাইয়া যায়। সুবুদ্ধি গোয়ালার মায়্যা কুবুদ্ধি ঘটিল। হাঁড়ির ভিতর দুগ্ধ রাখি পীরিরী ভাঁড়ালো। ওস্তাদজী পীরির গীতেই বাইঅঙ্গ সাঙ্গ করিয়া কবিঅঙ্গের ভারি অঙ্গ অঙ্গভঙ্গ দেখাইয়া আরম্ভ করিবামাত্র বিবি আতঙ্কে হিমাঙ্গ হইয়া কহিলেন, তোমার আর শ্রম করিবার আবশ্যক নাই, আমরা ইহাতে যথেষ্ট তুষ্ট হইলাম।

অথ তৃতীয় ব্যক্তির পরিচয়।

তৎপরে আড্ডিজী আনীত গাইয়ার মধ্যে একজন পশ্চিমদেশীয় চন্দ্রকোণানিবাসী নিপট লম্পট কপট ব্রাহ্মণ, কৃষ্ণবর্ণ, স্বর্ণ মাদুলী ধারণ, গোপ কামানো, থরকাটা চুল, হাতে বাজু কানে ফুল। মোটা পৈতে, নাকে তিলক। পূর্ব্বে ছিলেন যাত্রার বালক। মিশী দাঁতে ঘষা মাথা, গোট কোমরে হাতে বেয়ালা। ধৃতি পরা কাছা কসা। ব্রাহ্মণেতে যেন চাষা। গাত্রোত্থান করিয়া কহিলেন, একবার আমার গান শুনরে য্যান। বিবির মাতা তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার নাম কি, ঘর কোথায়? গায়ক উত্তর করিলেন, আমার নাম রামলোচন, আমার বাকুল চন্দ্রকোণাকে, এখানে চোরবাগানে বাসা। বিবির মাতা পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি রকমের গায়োনা জান? গায়ক কহিলেন, বাইঅঙ্গ ও যাত্রাঅঙ্গ ও টপ্পাঅঙ্গ গান জানি। বিবির মাতা মনে করিলেন, ক্ষতি নাই, এ ব্রাহ্মণ যদ্যপি বাইয়ানা গাহনা জানে তবে বড়ই ভাল কেননা এব্যক্তি গায়ক ও পাচক দুই কর্মই করিতে পারিবেক। ইহা বিবেচনাপূর্ব্বক বিবির মাতা গায়ককে কহিলেন, আচ্ছা ঠাকুর, একটা বাইয়ানা গাও। ইহা শুনিয়া পাচক ব্রাহ্মণ পেচক স্বরে গানেতে প্রবর্ত হইলেন, যথা-গলকি বসেছে দকানকে। শালির কিসের দকান কে জানে। ডের কড়ার মেশী দাঁতে দিয়া শালি দাঁত রেখেচে যতনকে। দ্বিতীয় গীত-দিনের বেলা ঘুম কেন এত। তুমি রাত হলে জাগো কত। তৃতীয় গীত-প্রাণ থাকিতে ছেড়ে দিব নাই আসিবে কবে বলে যাও। এবং কত মণি পড়ে আছে [২৮] চিন্তামণির নাচদোয়ারে ইত্যাদি বাইয়ানা ও যাত্রার গীত গান করিয়া ঝুমুর আরম্ভ করিলেন, যথা-সাধের পুম্ব হয়েছে পকুর গাবা। আবার জেলে ছাঁড়া জাল নামাইয়া করে দিলে জবজবা। ইত্যাদি গায়ক এই গীতে মোহিত করিয়া কহিলেক, আর কিসকে গাবো? বিবির মাতা কহিলেন, তোমার গান যা হউক আমার পছন্দ হইল, কিন্তু তোমাকে আমারদিগের আরো এক কর্ম করিতে হইবেক; তুমি এক্ষণে গায়ক রূপে চাকর হইলে কিন্তু তোমাকে পাচকের কর্মও করিতে হইবেক। গায়ক ইহা শুনিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেক, হা বিধাতা হইহ যন্ত্রণা জ্ঞান করিয়া মন্ত্রণাপূর্ব্বক গায়োনা শিখিলাম কিন্তু সে হাতা বেড়ি ছাড়িয়াও ছাড়ে না একি বিপাক যে পাক পাক পায় না। গায়ক একথা স্বদেশীয় রবে কহিয়া গৌরবে গমন করিলেন।

অথ চতুর্থ ব্যক্তির পরিচয়।

অনন্তর এক ব্যক্তি দক্ষিণদেশীয় গৌড় বেহারা, কালামুখ কুৎসিত চেহারা ভেড়ার স্বর উড়েমেড়া তিলকেতে নাকবেড়া গামছা কাঁধে চুরুট কানে; লেখনী আর বাঁশি হাতে, বিবির সম্মুখে দণ্ডায়মান হইবাতে আড্ডিজী বিবির মাতাকে কহিতেছেন যে এ ব্যক্তি উত্তম গায়ক, ইহার নাম মুকুন্দ পটনায়ক আমার সহিত অনেক দিনের আলাপ। বিবির মাতা জিজ্ঞাসা করিলেন, কি প্রকারে আলাপ। তাহাতে আড় ডিঙ্গী কহিতেছেন, এ ব্যক্তি পূর্ব্বে ঠিকা বেহারার কর্ম করিতেন, পরে মেং হিজিলবি ও গোলাবি, তামসন, জকসন, হাডসন, য়োয়াটসন, উইলসন, লেনজী, রেমজী, সিক্সপিয়ের, ডেমপিয়ের, সিডন, গার্ডন, ডজবেল, কেম্পবেল, ইস্ট্রাটেল, লেল্লি এনলি হ্যার, ক্যর, হন্টর, চেষ্টর, কম্পটন, মেকনাটন, রিকিট; ইত্যাদি সাহেব লোকের বাটীতে সরদারি কৰ্ম্ম করিয়াছে, সর্ব্বশেষে কিঞ্চিৎ দ্রব্য চৌর্য্যকরণহেতু লাকেট সাহেবের বেত খাইয়া সরদারি কর্ম পরিত্যাগ করিয়াছেন। আমি যৎকালীন মেং তামসন সওদাগরের হৌসে মেট সরকারি কর্ম করিতাম, সেই পর্য্যন্ত আমার সহিত ইহার আলাপ আছে। বিবির মাতা কহিলেন, সাহেব-লোকের বাটীতে সরদারি করিয়াছে, তাহাতে গান বাজানার সম্পর্ক কি? এই কথা গায়ক শুনিয়া কহিতেছেন, বিবি মাউমা মু সরদারী কাম আগেরে করিথেলা অখন গান শিখিচ মু সত্য কৌচি গোটা গীত গাই মিতো বুঝিবো। বিবির মাতা কহিলেন, তোমার ঘর কোথায় এবং তুমি কি প্রকার গান জান? গায়ক কহিতেছেন, মুঘর সেঁউতী জাজপুর, মু ভারতী দাসরো ঠাঁই গান শিখিচি, মথুরাজীব, চৌপদী, রসকদমী; এই তিন রকম গান শিকিচি, মকো তুমি রাখিবো তোমারো সক্কল কাজকাম করিব, কিবল নুঙ্গা ধুইবো না. আর দিয়া ধরিবে না। বিবির মাতা কহিলেন, ভাল সে পশ্চাতের কর্ম, সংপ্রতি এক আধটা গীত গাও শুনি। গায়ক এই আজ্ঞা প্রাপ্তে গানারম্ভ করিলেন, যথা (মথুরাজীব) কহোন্তি কৃষ্ণচন্দ্র রাধাকাপাসো কনসো ডগরো আসি গোপী প্রবেশা। কালী মথুরা জীব মু শোনগো সখী। করিব নাই চিন্তু মুকো না দেখি।। (চৌপদী)-কহোন্তী শ্রীকৃষ্ণ আগে। কথা শোনগো বাবু অভিসারাগে খণ্ডিতে২ পঁজর হর। রকতী খাইথিবী সোয়ন শ্রীকাড।। ঠিক কৌচি মু মজিব বিশ্বাস। ছাঁদে ভানলা রাধাকৃষ্ণ দাসো। (রসকদলী)-কাঁনে ভাবিচো রাণী। বিদেশ জাউঘী পুনি ।। কিনি দিমী রঙ্গ মোটা। উরু থিব ফের কানী। গায়কের এই কএক গান, তাহাতে মধ্যে মধ্যে বাঁশীর তান শুনিয়া বিবি অমৃতা-সিক্তা হইয়া পুনশ্চ জিজ্ঞাসা করিলেন যে, তুমি বাইয়ানা কি জান তাহা শুনাও। তদনন্তর গায়ক মুকুন্দ পটনায়ক পরিচায়ক এত গীত গাইলেন, যথা-কড়া কানুকুহুক জাঁডে জাঁড্যাকী চাহিলা দেশন্তী তেঁডে। পরে বিবির মাতা গায়কসকলের সকল বিদ্যার পরিচয় পাইয়া আড্ডিজীকে কহিলেন যে তুমি যে কএক ওস্তাদ আনিয়াছ ইহারা সকলেই স্ব২ প্রধান আর বিদ্যায় সমান, কেহ কম নহে, অতএব ইহারদিগের বিদায় করিয়া দেহ। এক্ষণে অনাহুত রবাহুত যাহারা আসিয়াছে তাহারদিগের পরিচয় লই।*।

অথ অনাহুত বরাহুত গায়কের প্রসঙ্গ।।

অনাহুত বরাহুত গায়কেরদিগকে মিবির মাতা কহিতেছেন, তোমার-দিগের সকলকে এই স্থানের লোক দেখিতেছি কি২ প্রকার গাওনা জান, গায়কগণে উত্তর করিলেক আমরা সকল প্রকার গায়োনা জানি, তুমি মাহিয়ানা কত দিবা তাহা শুনিয়া গানের বৃত্তান্ত কহিব। বিবির মাতা কহিলেন, মাসে আড়াই টাকা মাহিয়ানা দিব, বিবিকে বাইয়ানা গান আর নাচ শিক্ষাইবা এবং সময়ানুসারে লোকটা জনটা ডেকে ডুকে আনিতে হইবেক আর বাজার হাট কখন২ করিতে হইবেক। গায়কেরা ইহা শ্রবণে শ্রবণে হাত দিয়া স্বস্ব স্থানে প্রস্থান করিলেক, কিন্তু কানার বেটা তালকানা মহা ঠেটা, মনে২ বিবেচনা করিলেক যে আমার যেমন হাঁড়ি তেমনি কড়ি, কিছু দিন টেকে যাইতে পারিলে বিবির মায়ের সহিত বিশেষ সম্প্রীতি হইলে আহারের সুখ তো আছেই সময়ানুসারে বিহারও হইবেক, আর যদি ছুঁড়ি পটে তবে বড়ই ভাল, এ আড়াই টাকা তো বেশীর ভাগ। ইহা স্থির করিয়া কহিলেক, আচ্ছা বিবি, তোমাকে [৩১] আমি তালিম দিব। বিবির মাতা কহিলেক, তুমি কিরূপ গান জান একবার শুনিতে বাসনা করি। ওস্তাদ কহিলেক, তার আটক কি। অনন্তর ওস্তাদ গানারম্ভ করিলেন, যথা-মরি রে লোকের গঞ্জনায়। আমার পিরিতি হইল বিষম দায় এবং শুধু আঁখির মিলনে প্রাণ আর বাঁচে কেমনে ইত্যাদি দুই চারি টপ্পা গাইবাতে বিবির মাতার অত্যন্ত পছন্দ হইল। গায়কের সহিত মাহিয়ানা স্থির করিয়া এবং আর২ কৰ্ম্ম কার্য্যের বৃত্তান্ত তাহাকে কহিয়া চাকর রাখিলেন।

অথ গায়কের স্বভাব বৃত্তান্ত।

হাপকাষ্ট গায়ক বেটা, অতি ঠেটা, বাক্যে জেঠা, কৰ্ম্মে খোঁটা; বুদ্ধি মোটা, টিকি কাটা, গোঁপ ছাঁটা, কথা ঝুটা, নজর ছোটা, পাতড়া চাটা, সর্ব্বদা গীত গানে বেশ্যাভবনে অগম্য গমনে অপেয় পাপে মূর্তিমন্ত এক অধৰ্ম্ম, নীচ কৰ্ম্ম তাহার স্বধর্ম, চুরি জুয়াচুরি পরদারী ভাঁড়ামী ঠকামী বদনামী কোটনামীতে অদ্বিতীয়, কিন্তু আপন বিষয় ভোলে না, তত্ত্বকথা ছাড়ে না। কেবল অর্থ উপার্জনার্থে যে সকল নববাবু সন্নিধানে গতায়াত করে সে স্থানে বাবুদিগের একাসনে মদ্যপানে মত্ত হইয়া নৃত্যগীতের দ্বারা কিম্বা বাবু যাহা আজ্ঞা করেন তদনুযায়ী কৰ্ম্ম আচরণ করিয়া, জল উঁচু নীচু বলিয়া বাবুদিগের সন্তোষ জন্মাইয়া স্বকীয়োদর পরিতোষ করে। ফলিতার্থ বাবুকে মজার মৌজে গাঁজার ধূম সহকারে নব বিবিরূপ কলের জাহাজে কলে কৌশলে চড়াইয়া অকূল সমুদ্রে মগ্ন করিয়া আপনি অনর্থের ভাগী না হইয়া অর্থ লইয়া প্রস্থান করে। গায়কের স্বভাব আর কত লিখিব। যে সকল গায়ক নিকটে গান করিয়াছেন তাঁহারাই জানেন, অনন্তর ঐ গায়ক প্রতিদিন [৩২] প্রত্যুষে গাত্রোত্থান করিয়া আর২ দুই এক স্থানে যথা২ এরূপ অপরূ সংগীত বিদ্যা উপদেশ জন্য বেতন খায়েন। অগ্রে তাঁহার দিগের মনোরক্ষা করিয়া নব বিবির বাটীতে উপস্থিত হইলেন। তৎকালীন বিবির মাতা তাঁহার জনেক প্রিয়তম গোপসঙ্গে গোপনে গোসেবায় নিযুক্ত ছিলেন, এ প্রযুক্ত গায়ককে তদনুপযুক্ত সমাদর করিতে অক্ষম হইয়া উচ্চৈঃস্বরে বিবির নামোল্লেখ করিয়া কহিলেন, বিবি, তোমার ওস্তাদ আসিয়াছেন, ইহাকে ঘরের ভিতর লইয়া যাহ, তামাক দেয়াও, আমি পশ্চাৎ যাইতেছি। বিবি ওস্তাদকে ঘরের ভিতর লইয়া গিয়া ভৃত্যকে ওরে বলিয়া ডাকিয়া তামাকু দিতে কহিলেন। আপনি ওস্তাদের সম্মুখে বসিলেন। ক্ষণেক কাল পরে বিবির মাতা সেই স্থানে আসিয়া-গায়ককে কহিলেন, ওস্তাদজী, সুরু কর। ওস্তাদজী সহাস্য বদনে সন্তোষ মনে বিবিকে কহিতেছেন, এসো তো বাবা এখন তোমার সঙ্গে বোঝাপড়া। এ কথার তাৎপর্য্য সেই ওস্তাদেই জানেন, অন্যের সাধ্য নাই যে তাঁহার বাক্যের অর্থ বুঝিতে সমর্থ হয়েন। সে যাহা হউক, ওস্তাদ এই অপ্রকার ইঙ্গিত দ্বারা স্বকীয় মানস জানাইয়া বিবিকে কহিলেন, তুমি অগ্রে তাল দিতে শিখহ। ইহা বলিয়া ওস্তাদ বিবির দক্ষিণ হস্ত স্বহস্তে ধরিয়া বিবির জানুপরে তাল দেওয়াইতেছেন। যথা-ধীন ধীনতা, তিন তিনতা। এইরূপ তালিম দিয়া কহিলেক যে, আমি অদ্য বিদায় হই, তোমাকে যে তাল শিখাইলাম তুমি সর্ব্বদা এইরূপ তাল দিবা এবং তালে২ নাচিবা। ইহা মাত্র কহিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলেক।।

অথ বিবির নৃত্যগীতের ব্যুৎপত্তির বৃত্তান্ত।

ওস্তাদজী প্রত্যহ আগমনপূর্ব্বক এইরূপ অপরূপ তালিম দেন এবং আপন স্বীকার মত সকল কৰ্ম্ম কাৰ্য্য নির্ব্বাহ করেন, তাহাতে কোনমতে ত্রুটি হয় না; কিন্তু ওস্তাদ নিজে তালকানা, তাহার নিজের ভাদ্র মাসের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নাই। তাহাতে বিবির এমনি মেধা যে বৎসরাবধি তাল ধরিলেন তথাপি তালের তিলও হইল না। ওস্তাদ নিত্য২ শিক্ষা করাইতে আইসেন, কিন্তু যে পর্যন্ত ওস্তাদজী বিবির সাক্ষাতে থাকেন তদবধি তিনি যাহা শিক্ষা করান তাহা বিবির স্মরণ থাকে। ওস্তাদজী বিদায় হইলেই মহা দায় উপস্থিত হইয়া স্মরণে ব্যতিক্রম জন্মে অর্থাৎ ধীন ধীনতা বারত্রয় না কহিয়া সেই তালের বেতাল করিয়া তালবেতালের মত নৃত্য করেন। তাহার শোভা কি লিখিব। কিবা চমৎকার নৃত্য যে খঞ্জনকে গঞ্জন দিয়া ছাতারের মান বাড়াইয়া সকলের মনোরঞ্জন করিতে লাগিলেন।

অথ নব বিবির নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে গমনের অনুমতি।

অতঃপর বিবির মাতা বিবিকে চালাক করিবার নিমিত্তে অন্য স্থানে নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে প্রেরণ করিবার মনস্থ করিয়া বিবিকে কহিলেন যে, বিবিয়ার মন্দিরে রাস দেখিবার নিমন্ত্রণ হইয়াছে, তোমাকে নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে যাইতে হইবেক, অতএব তুমি যাও তোমার সহি আড্ডিজী যাউন। বিবি ইহা শুনিয়া উত্তর করিলেন যে, আমি যাইতে পারিব না। ইহাতে বিবির মাতা ক্রোধান্বিতা হইয়া কহিলেন, ওমা সে কিগো? এত বড় ধাড়ী মেয়ে আজও লোকের বাড়ি যাইতে শিখিলে না? দেখ দেখি গঙ্গাভঙ্গদিগের গঙ্গা একরত্তি বেলা অবধি লোকজনের কাছে যায় তাহাতে উহার ভাল হইয়াছে, দশজন বাবুগণেও উহাকে তারিপ করে। তুই সর্ব্বনাশী কোন কর্মের নহিস। দশজন লোকের নিকট এলে গেলে বাবুজনে তোমার গান বাজানা শুনিলে তবে তো তোমাকে চাহিত করিবেক এবং তোমার নামও প্রকাশ হইবেক। যদি নাম লেখাইয়া নাম প্রকাশ না হয় তবে তাহার জীবনে ধিক্ যেহেতু ব্যলিক তন্ত্রে লিখিয়াছে, স্বনাম্নশ্চ স্ত্রীয়োধন্যা মাতৃনাম্নশ মধ্যমাঃ। অধমা শ্ছুকরী নাম্ন: কুলরতাশ্চাধমাধমাঃ। বিশেষতঃ সেই স্ত্রীলোক স্বনামা যাহারদিগের নাম করিলে অনায়াসে বাবুগণে জানিতে পারেন এ কথার ভাব বুঝিলে অপূর্বব জ্ঞান হইবেক; মধ্যমা মাতৃনামে যাহারা খ্যাত তাহারদিগেরও বাবুরা জানেন; কিন্তু কুলবধূসকলকে কোন বাবু জানেন না, এ কারণ তাহারা অধমের অধম, অতএব যাহাতে তোমাকে সকলে জানিতে পারে তাহা তুমি অবশ্য২ করিবা।।

নববিবি এই সকল প্রবোধবাক্য শুনিয়া কহিলেন, আচ্ছা নিমন্ত্রণ রাখিতে আমি যাইব, কিন্তু ঢাকাই ধুতি ও জরির জুতা না হইলে আমি যাইব না। বিবির মাতা ইহা শুনিয়া কহিলেন, তার আটক কি? পরে তাঁহার নিকট পূর্ব্বের প্রিয়তমের মধ্যে একজন ঢাকাই মহাজন একখান ঢাকাই ধুতি দিয়াছিল তাহাই বিবিকে বাহির করিয়া দিলেন, আঠারো আনা দিয়া এক জোড়া ঝুটা জরির জুতা আনাইয়া দিলেন, অনন্তর রাত্রিযোগে বিবিকে ঢাকাই ধুতি ঢাকা দিয়া আড্ডিজীর সমভিব্যাহারে নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে পাঠাইয়া দিলেন। আড্ডিজী নববিবিকে সঙ্গে লইয়া বিবিয়ার বাটীতে উপস্থিত হইলেন ॥

অথ নিমন্ত্রণ রক্ষার বৃত্তান্ত।

আড্ডিজী নববিবিকে সঙ্গে লইয়া আর২ দুই চারি স্থানে নিমন্ত্রণ রক্ষা করিয়া শেষে বিবিগণাগ্রগণ্যা মহামান্যা বিবিয়া নাম্নী বিবির বাটীতে উপস্থিত হইলেন। প্রথমে দালানে ঠাকুর প্রণাম করাইয়া বিবিয়ার ঘরে বিবিকে লইয়া গেলেন। সেস্থানে সকল প্রাচীন লোচ্চা বান্ধানো, কেহ লোচ্চারা বসিয়া মহাশয়েরা কাহারো গোঁপ ও চুলে কলপ, কাহারো দন্ত চসমা ব্যতিরেকে দেখিতে পায়েন না এইরূপ প্রাচীন২ বালকের ন্যায় ক্রীড়া করিতেছিলেন। ইতোমধ্যে আড্ডিজী নবীন বিবিকে লইয়া বিবিয়ার ঘরে গিয়া দর্শন দিলেন। বিবিয়া নব বিবির হাত ধরিয়া ঘরের ভিতর লইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তোর মা কেন আইসে নাই। এই কথা শুনিয়া আড ডিজী তৎক্ষণাৎ উত্তর করিলেন যে আজ কৃষ্ণবাবু আসিয়াছেন, একারণ তিনি স্বয়ং আসিতে পারেন নাই এবং আমিও ঠাঁইনাড়া হইয়াছি। পরে বিবিয়া নব বিবিকে জলপান করাইয়া মজলিসের ঘরে বসাইয়া পান তামাক খাওয়াইতে লাগিলেন।

অথ বিবিয়ার ঘরে প্রাচীন লোচ্চারদিগের নিকট নব বিবির নৃত্যগীতের পরিচয় ।।

প্রাচীন লোচ্চা বাবুরা যাহারা সেস্থানে ছিলেন তাঁহারা নব বিবিকে সকলেই কহিলেন, বিবি, আমরা শুনিয়াছি যে তুমি নাচগান শিখিয়াছ অতএব আমারদিগের সাক্ষাতে একবার তোমার নাচগানের পরীক্ষা দেও। বিবি এই কথা শুনিয়া সলজ্জা হইয়া পেটের ব্যথার ওজর করিলেন। তথাপি বাবুগণে কহিলেন, অদ্য পরবের দিন, তোমাকে একবার নাচিতে হইবেক। বিবি অনেক সাধ্যসাধনায় স্বীকার পাইলেন। তৎক্ষণাৎ জনেক বাবু বিবির হাত ধরিয়া উঠাইলেন এবং জনেক বার ঢোল লইয়া বাজাইতে আরম্ভ করিলেন। নব বিবি তাক তাক থেতাং শুনিয়া তাক হইয়া রহিলেন। পরে অনেক নাক মলার পর এবং আড্ডিজীর বহুতর ফোঁস ফাঁস নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া নাচিতে প্রবর্তা হইলেন। পূর্ব্বে আপন ঘরে যে প্রকার ধিন২ ধেই২ নাচিতেন সেই প্রকার নাচিতে লাগিলেন। নৃত্য দেখিয়া হাসিতে২ কে কাহার গাত্রে পড়ে তাহার ঠিকানা নাই। কেহ বলে, সাবাস বিবি কিবা নৃত্য করিলে। কেহ বলে, তোমার ধন্যা মাতা যে এমন কন্যাকে উদরে স্থান দিয়াছিল। কেহ বলে, এমন বিবি বাঁচা ভার। বিবি ইহারদিগের হাস্য পরিহাস্য দেখিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া লজ্জায় ম্লানমুখী বিনয়ে বিদায় হইলেন।।

অথ নব বিবির প্রতি বিবির মাতার ভর্ৎসনা।

আড্ডিজী নব বিবিকে তাঁহার বাটীতে আনিয়া তাঁহার মাতার নিকট বিবিয়ার বাটীর নিমন্ত্রণ রক্ষার বৃত্তান্ত এবং বিবির নৃত্যগীতের বিবরণ সবিশেষ ব্যক্ত করিলেন। বিবির মাতা এ সমস্ত সমাচার শুনিয়া ত্যক্ত হইয়া তর্জন গর্জন করিয়া বিবিকে প্রহার করিতে উদ্যত হইলেন। আড়ডিজী হাঁ হাঁ করিয়া হাত ধরিয়া কহিলেন যে বিবির কি অপরাধ? ওস্তাদজী যে প্রকার উপদেশ দিয়াছেন বিবিও সেই প্রকার নৃত্যগীত শিখিয়াছেন, অতএব ইহাতে বিবির কোন অপরাধ নাই। বিবির মাতা এই কথা শুনিয়া কহিলেন, এমন ওস্তাদের মুখে ছাই। তুমি একজন হিন্দুস্থানী ওস্তাদ অন্বেষণ করিয়া আন, বাইয়ানা গাওনা জানে এবং আমার যে নিয়মিত আছে তাহাই লইয়া বিবিকে গাওনা শিক্ষা করায়। আড্ডিজী কহিলেন, আমি কল্য হিন্দুস্থানী ওস্তাদ আনিব, তুমি বাঙ্গালী ওস্তাদকে অদ্যই বিদায় কর।

অথ হিন্দুস্থানী ওস্তাদের অন্বেষণ ॥

গদ্য ছন্দ। পর দিবস আড্ড ডিজী প্রাতঃকালে উঠিয়া সকল কৰ্ম্ম কার্য্য পরিত্যাগ করিয়া হিন্দুস্থানী ওস্তাদের অনুসন্ধান করত পথিমধ্যে আড্ডিজীর আলাপিত এক ব্যক্তি তামাকুওয়ালা, তাহার নাম কেতাবদ্দি চাচা, তাহার সহিত সাক্ষাৎ হইবাতে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, এ অঞ্চলে কোন হিন্দুস্থানী গায়ক আছে কি না। কেতাবদ্দি চাচা কহিলেন, মাণিকতলানিবাসী মিয়া টিল্লু নামে একজন মোছলমান, আলাবদ্দি টিকেওয়ালার ফুফেরা ভাই, তিনি তক্তারওয়ার বাইলোকের পিকদান বরদারী কৰ্ম্ম করেন আর মুরগির ডিম্বের কারবারও আছে, তাহাকেই কখন২ গান গাইতে শুনিয়াছি। আড়ডিজী পরম উপকার স্বীকার পূর্ব্বক কেতাবন্দি চাচার দ্বারা মিয়া টিল্লুর বাসস্থান এবং তাহার মুর্তির সন্ধান লইয়া তদুপলক্ষে মিয়া টিল্লুর সমুখে উপস্থিত হইয়া কহিলেন, কেতাবদ্দি চাচার প্রমুখাৎ তোমার নেহাৎ খোসনা শুনিলাম, অতএব আমি প্রার্থনা করি যে তুমি মেহরবানগী করিয়া আমার সঙ্গে একবার ফলানা জায়গার ফলানী বিবির বাটীতে আইসহ বিবি নৃত্যগীত শিখিবার নিমিত্তে ব্যস্ত হইয়া হিন্দুস্থানী গাইয়া হিন্দুস্থানী গাইয়া এই মাত্র শব্দ করিতেছেন অতএব তোমার নিকট আইলাম এক্ষণে তোমার যেমন মরজি। মিয়া টিল্লু কহিলেন, এ বিনতির আবশ্যক নাই, আমি নিজে গরজি আমার মরজি কি, এইক্ষণেই চল। ইহা কহিয়া মিয়া টিল্লু আপন পরিচ্ছদ অর্থাৎ পোষাক পরিধান পূর্ব্বক আড্ডিজীর সমভিব্যাহারে বিবির বাটীতে উপস্থিত হইলেন। আড্ডিজী তাহাকে দরজার মোড়ার উপরে বসাইয়া ত্বরায় বিবির মাতাকে সমাচার দিলেন। বিবির মাতা কহিলেন, গায়ককে এই স্থানে ডাক, উহার পরিচয় লই।

অথ মিয়া টিল্লুর পরিচয়।

মিয়া টিল্লু সঙ্গীতে উল্লু, বিবির মাতার সম্মুখবর্তী হইয়া উপবেশন করিয়া সেলাম করিলেন। বিবির মাতা তাহাতেই সন্তুষ্টা হইয়া আড্ডিজীর প্রতি দৃষ্টি করিয়া ইঙ্গিতে কহিলেন যে, ইহারদিগের আদব-কায়দা দেখ। ইহা কহিয়া মিয়া টিল্লুকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি কৰ্ম্ম কর? মিয়া টিল্লু এতদ্দেশীয় মোছলমান যাহাকে পাতিনেড়ে কহে। তিনি বাঙ্গালা ভাষা বিলক্ষণরূপ জানেন, তথাচ হিন্দী ভাষায় কথোপ-কখন করিতেছেন যেহেতু হিন্দুস্থানী ওস্তাদের পরিচয়ে পরিচিত হইয়াছেন। এ মতে মিয়া টিল্লু কতক হিন্দী ভাষা কতক বাঙ্গালা ভাষা মিশ্রিত করিয়া যেরূপ টাকাওয়ালা তামাকওয়ালারা হিন্দী কহে সেই ভাষা কহিতেছেন, বিবি হামতো আগে করিমন, রহিমন, উজীরণ, আশুরণ, জহুরণ, আমীরণ, পীরণ, আলফন, মোরাদন, ঝর্ব্বন, লছমন, মক্ষণ, লুতফন, জীতন, ওমদাখানম, ফরখন্দাখানম, পেয়ারোখানম, জীনাখানম, নাজনীখানম, বেলাতিখানম; নাগ্নিজান, বগ্নিজান, মুন্নিজান, সুপনজান, পেয়ারোজান এই সব বাইলোককা বাড়ীমে পীকদানবরদারী, পাঙ্ক্ষাবরদারী, হুক্কাবরদারী, মহলদারী, জমাদারী, খেদমতগারী, ও আর২ সব রকম তাবেদারী ও ফরমাবরদারী কিয়াখা, এখন আমার সে কাম নাই। বিবির মাতা কহিলেন, বাইলোকেরা তোমাকে বায়ুগ্রস্ত অনুমান করিয়া ঝাড়বরদারী কর্ম্ম করিতে কহিয়া থাকিবেক, সে যাহা হউক ঐ সকল লোকের বাটীতে তাবেদারী ও ফরমাবরদারী প্রভৃতি যে কএক দারী ও গারী করিয়াছ আমার এখানে তাহার এক দারীও করিতে হইবেক না। লেখক কহে যে এক এক দারী ও গারী করিতে হইবেক না কিন্তু এখানকার কর্ম পরদারী মাত্র ॥*॥*॥

বিবির মাতা মিয়া টিল্লুর দ্বারা ঐ সকল বাইলোকের নাম এবং দারী গারী ইত্যাদি শব্দ শুনিয়া ভয়যুক্তা হইয়া গানের পরিচয়ের কথা কিছুই জিজ্ঞাসা না করিয়া মিয়া টিল্লুকে মাহিয়ানার বিষয় এবং কৰ্ম্ম কার্য্যের আশয় জানাইলেন। ওস্তাদ উত্তর করিলেন, কর্ম কার্য্যের বিষয় যাহা কহিলে তাহার কিছুই চিন্তা নাই, আমি তোমার সকল কৰ্ম্ম করিব কিন্তু মাহিয়ানা আর কিছু অধিক প্রার্থনা করি। বিবির মাতা কহিলেন, তুমি সংপ্রতি ইহাই স্বীকার করিয়া তালিম দিতে আরম্ভকর, ইহার পরে বিবি স্বয়ং মজুরা করিয়া রোজগার করিলে তোমার মাহিয়ানাও তৎকালীন বেশী হইবেক। মিয়া টিল্লু এই আশ্বাসে বিশ্বাস করিয়া কহিলেক, বহুৎ খুব, হামসে জাহাতক খেদমত হোগা হাজের হেঁয়। ইহা স্থির হইলে পর বিবির মাতা কহিলেন, অদ্য দিন ভাল নহে, কল্য প্রাতে আসিয়া নব বিবির তালিম আরম্ভ করিবা। মিয়া টিল্ল বহুৎ আচ্ছা কহিয়া বিদায় হইলেন।

অথ হিন্দুস্থানীয় ওস্তাদের নিকটে নব বিবির তালিম আরম্ভ।

গদ্য ছন্দ। পর দিবস মিয়া টিল্লু তাহার নিজ কৰ্ম্ম অর্থাৎ মুরগীর ডিম সাহেবলোকের কুঠীতে যোগান দিয়া বিবির বাটীতে উপনীত হইলেন। বিবির মাতা ওস্তাদকে দেখিয়া উচ্চৈঃস্বরে কহিতেছেন, নব বিবি তোমার ওস্তাদ আসিয়াছে, ঘরের ভিতর লইয়া যাও। নব বিবি আসিয়া তাহাকে ঘরে লইয়া গিয়া একটা মেটে গুড়গুড়ীতে তামাক সাজাইয়া দিলেন। ওস্তাদজী তামাক খাইতে২ নব বিবিকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন, তুমি নাচগান কিছু শিক্ষা করিয়াছ? বিবি হাঁ শব্দ নির্গত করিয়া হা করিয়া রহিলেন। ওস্তাদজী পুনরায় জিজ্ঞাসা করাতে নব বিবি তালকানার নিকট যে যে বিদ্যা শিক্ষা করিয়াছিলেন তাহাই প্রকাশ করিতে লাগিলেন। ওস্তাদ তাহা দেখিয়া হাস্য পরিহাস্য করিলেন, কিন্তু ইহারো বিদ্যা তদনুরূপ তবে হাস্য করিতেছেন তাহার তাৎপর্য্য এই যে এক ব্যক্তি খঞ্জ যেমন অন্য খঞ্জকে দেখিয়া ব্যঙ্গ করে সেইরূপ মিয়া টিল্লু হাস্য করিয়া করিয়া বিবিকে কহিতেছেন, বিবি এহ কুচ হুয়া নহী, এহ কাম বহুৎ মুস্কিল হেয় জো হাম বতাতে হেঁ সো শিখে; অর্থাৎ বিবি, ইহা কিছু হয় নাই, এ অতি কঠিন কৰ্ম্ম, আমি যাহা শিক্ষা করাই মনোযোগপূর্ব্বক তাহাই অভ্যাস কর। ইহা কহিয়া মিয়া টিলু তালিম দিতে আরম্ভ করিলেন। প্রথমে বিবিকে কহিতেছেন, উঠ খড়ী হো, অর্থাৎ দণ্ডায়মানা হও। কহো তাথেই তত্তাতৎ। ইহা কহিয়া পা ফেলিবার ধারা শিক্ষা করাইলেন এবং দুই এক টপ্‌পা যাহা এক্ষণে তক্তারয়ার বাইলোক ব্যতিরেকে আর কেহ গান করে না সেই সকল প্রাচীন গান পাঠ দিতেছেন, যথা "গুজরো পানীয়া ভরে আরে অধমতী" ইত্যাদি এবং দুই মজাদারী গীত শিক্ষা করাইলেন, যথা, "মজা উড়ায়লে বুড়ীয়া তের না হোগী জোয়ান গে,” ইত্যাদি টপ্‌পা ঠুংরী সকল শিক্ষা করাইলেন; কিন্তু বিবির মেধার কথা পূর্ব্বেই লিখিয়াছি, সেইরূপ মিয়া টিলুর নিকটে বাইয়ানা গাহনা শিক্ষা করিতে লাগিলেন এবং নৃত্য শিক্ষা করিয়া যখন নাচ করেন তখন বোধ হয় না যে বিবি দুই পদে নৃত্য করিতেছেন কিন্তু চতুষ্পদের ন্যায় অনুমান হয় এবং গান করিতে সেইরূপ বিপরীত শব্দ নির্গত হয়। এইরূপ টিল্লু নব বিবিরে প্রায় দুই তিন বৎসর তালিম দিলেন কিন্তু বিবির নৃত্যগীত শিক্ষা যেমত পূর্ব্বে হইয়াছিল সেইমত এখনও হইল, কিছুই বৃদ্ধি হইল না তথাপি হিন্দুস্থানী ওস্তাদের নিকট তালিম লইয়া দুই চারি হিন্দী কথা বিবির অভ্যাস হইল, যথা দেঙ্গা, লেঙ্গা, খাঙ্গা, মারেঙ্গা, ইত্যাদি।

অথ জ্ঞান শিক্ষা।।

সুলক্ষণা বিবির মাতা অতি বিচক্ষণা অর্থাৎ বহু দিনের প্রাচীনা বেশ্যা, প্রবীণতায় বহুদর্শী হইয়াছেন, বিবেচনা করিলেন যে নব বিবির গান শিক্ষা হইয়াছে এক্ষণে কিছু জ্ঞান শিক্ষা করান উচিত, ইত্যবধানে নব বিবিকে কহিতেছেন যে, বাছা, তোমায় আর তালিম লইবার প্রয়োজন নাই, প্রিয়জন ইহাতেই বশ হইবেক, নৃত্যগীত যাহা শিক্ষা করিয়াছ তাহা বেশ আছে, এক্ষণে তোমার যাহা শিক্ষা করা কর্ত্তবা তাহা আমি কহিতেছি।

পয়ার। গান শিক্ষা করে আর নাহি প্রয়োজন। যৌবন দেখিলে বশ হবে প্রিয়জন। গান গুণে তুমি যদি নিপুণ না হও। তথাপি যৌবন গুণে তুমি ন্যূন নও। শিখিতে উচিত যাহা শিখিয়াছ সব। এখন শিখাব বিবি কেবল কসব। কসবের রীতি নীতি জানা সে উচিত। নব নাগরের মন করিতে মোহিত। আপাতক এই কৰ্ম্ম করয়ে বাছনি। কসবের সার ধর্ম্ম করেছি বাছনি। প্রথমে আইলে বাবু বসাইবে ঘরে। তামাকে রাখিবে মান পান দিবে পরে। মিষ্ট কথা কহে তুষ্ট করিবে নাগর। রসাতে রসিক মন পান ততঃপর। বাবুরে করিবে কাবু নয়নের বাণে। যুবতী কটাক্ষে কেহ নাহি বাঁচে প্রাণে। হাসিয়া কহিবা কথা সকলের সনে। তুষিবে সকল জনে মধুর বচনে। মাথায় কাপড় দিতে উপলক্ষ করে। দেখাইবে সেই ছলে উচ্চ পয়োধরে। ঈষৎ লজ্জার ছলে টানিবে অঞ্চল। সেই টান দেখাইবে হৃদয় অঞ্চল। বসন কসন ছলে বসন খসন। তাহাতেই দৃশ্য হবে মদন সদন। বসন পরনে কটা কসিয়া রাখিবে। ক্ষীণ মাজা পাছা ভারি তাহাতে হইবে। ঠসক ঠমক করে করো চলাবলা। আঁটা আঁটি দেখে বলো আমি হে অবলা। হাব ভাব লাবণ্য কটাক্ষ আদি যত। সকল সাধিবে বিবি প্রয়োজন মত। এখন সংক্ষেপ এই কহিলাম সার। অতঃপর উপদেশ বলিব বিস্তার।

পল্লবখণ্ড সমাপ্ত ॥


অথ কুসুমখণ্ড। অর্থাৎ বিবিরূপ বৃক্ষের কুসুম।

শুন বিবি আমি প্রাচীন হইলাম অনেক দেখিয়াছি তাহাতেই বুদ্ধ বয়সেও এমত চমৎকার বাহার দেখাইতে পারি যে কেহ বয়স ঠাওরাইতে না পারিয়া অবাক হইয়া থাকে এ কেবল পোষাকের গুণেতেই হয় অতএব সেই গুণ শিক্ষা করা তোমার কর্তব্য, পশ্চাতেও. কাজে আসিবেক, বিশেষতঃ এক্ষণে সেগুণ তোমার নবযৌবনে, সোনার উপর নগিনার কাজ হইবেক। দেখ কলিকাতার রাঁড় মহলে হিন্দু বিবিরা মুছলমানীর চলন বলন সকল ধরিয়াছে, তাহারা আপন২ পসন্দ মত চুল কাটিয়া জুল্ল্পী বাহির করেন এবং মেশী দাঁতে দিয়া, দোফের করিয়া কাপড় পরিয়া পাছার বাহার দেখান এবং আপন২। পসন্দ মত পোষাক বিবিধ প্রকার প্রস্তুত করে, যথা পাজামা, আদিয়া, ইতি, দোপাট্টা, আস্তিন, জালি, কুবুতি [৪৩] জালি, কাটোয়া জালি, এবং আন্নিদার জোড়া ইত্যাদি। তদ্ভিন্ন রং সাফ হইবার জন্য সাবান ও. বটান মাখিয়া টিপ টাপ করিয়া ফিটফাট মারিয়া ছাতের উপরে ডিল ডৌল দেখাইয়া বেড়ান। প্রতিবাসিনী কেহ অন্য ছাত হইতে বিবিকে দেখিয়া কোন কথা কহিলে চোটপাট দেন। কেহ২ সাটিনের পায়জামা, গোটা বন্নট লাগান, আঙ্গিয়া তদুপযুক্ত, কুব্‌বৃতি পাঠ দোপাট্টা, কেহ পায়জামা প্রভৃতি সকলি সাদা কাপড়ের পরে এবং বাঙ্গালি রকম পোষাক কেহ২ ঢাকাই ধৃতি কঙ্কাদার, কেহবা রঙ্গিন খান চেরা. বসমাদার, কেহ দেশী ধুতি বিবিধ প্রকার পাড়িদার অর্থাৎ তাবিজপেড়ে, মরিচপেড়ে, কস্তাপেড়ে, রাস্তাপেড়ে, ভোমরাপেড়ে, কোকিলপেড়ে, দাঁতে মেশী পেড়ে, ঠোঁটে হাসি পেড়ে, হাতিপেড়ে, মহারাষ্ট্রপেড়ে, সতরঞ্চীপেড়ে, কুঁচপেড়ে, দোরাখাপেড়ে, সীরপেড়ে, সখীপেড়ে রুমালপেড়ে, খড়কেপেড়ে এবং আহ্লাদে প্রহ্লাদে রাজা পেড়ে চেইনপেড়ে, খাটপেড়ে, কৌচপেড়ে, ইত্যাদি পেড়ে; বেড়ে বেড়ে সাড়ী কেহ২ বিলাতি বক মজলিন ও লেকনেট মজলিন ও মলমল এবং বিবিধ প্রকার নিন্ রঙ্গ করিয়া অর্থাৎ গোলে আনার কাসনি কুসমি সন্দলি, জেঙ্গালি পেয়াজি, ধানি আবি বসন্তি, ইত্যাদি নানা রঙ্গে রঙ্গীন সাড়ি পরিধান করেন, কেহ খালি সাড়ি মিহি মলমলের ব্যবহার করেন, কেহবা তাহাতে সফেদ দোপাট্টা পাঠা লাগাইয়া উড়াইয়া থাকেন এবং নানা প্রকার পাপোস আন্নিদার ছোট আরি জেরপাই নাগোরা মখমলের মুণ্ডা এবং ঘোঁড়তলা ইত্যাদিতে চরণ শোভায় ভক্তজনের মনের লোভ বাড়ান এবং অলঙ্কার প্রতিকার যাহারা সেকেলে তাহারা বাঙ্গালীতর অর্থাৎ মুড়কি মাদুলি, ধানি মাছলি, সোনালি, পৈঁচে, তাবিজ, বাজু, স্বর্ণ পঞ্চনরি, পাসা, ঝুমকা, ইত্যাদি পরেন কিন্তু যাঁহারা একালের তাঁহারা সৌগন্ধ কেশে ও বেশে লেপন করিয়া কাঁকুই দিয়া চুল ফুলাইয়া মেশী মঞ্জন দন্ত মার্জিত করিয়া এবং এই প্রকার অলঙ্কার পরিয়া থাকেন, যথা, দমদম, চৌদানি, বোন্দা, দোলড়া ছল্লা, মুক্তার লজ্জা দেওয়া কর্ণফুল, 'কানবালা, হীরা পান্না ধুকধুকি, মুক্তার সাতনরি, ডায়মনকাটা চিক তাবিজ বাজু হাতের কড়া স্বর্ণ গোট চাবির সিকলি, চন্দ্রহার, গোলমল পাঁওজর ইত্যাদি নানা স্থানে নানা অলঙ্কার যেমন সাজে তাহাই বিবেচনা মতে পরিয়া থাকেন, সেইমত তুমিও নানাবিধ অলঙ্কার পরিধানপূর্ব্বক দিবাবসানে বাবুগণের মনোমীন ধরিবার নিমিত্তে ছাত হইতে টোপ ফেলিবা।

অথ বাবুরদিগের বশ করিবার উপদেশ।

তোমার ঘরে নগরবাসী কিম্বা পল্লীগ্রাম নিবাসী কোন বাবু আইলে তাঁহাকে বহু সমাদরে ঘরে বসাইয়া চাকর ও চাকরাণীকে কহিয়া দিবা যে উত্তম২ তামাকু ভেলসা অম্বুরী, কড়া, মিঠেকড়া সাজিয়া আলবোলা গুড়গুড়ি হুঁকা বিবিধ প্রকার সোনাবান্ধা রূপাবান্ধা, পিতলবান্ধা বিদরী পাথরী ইত্যাদি মুহুর্মুহু যোগাইতে থাকিবেক এবং সরস চরস ও মোহনী গাঞ্জা আর দিবেক যে সে ধূমে যেন মহাধুম লাগিয়া যায়, আর যদি তাহারা আপনারদিগের আহার জন্য কিম্বা কোন মাদক দ্রব্য আনাইবার নিমিত্তে আজ্ঞা প্রদান করেন তবে যে কএক টাকা দিবেক তাহার অর্দ্ধেক আপন বাক্সে রাখিয়া আর অর্দ্ধেক টাকার যে শ্রব্য তাঁহারা আনিতে কহিবেন তাহা আডিজীকে ডাকিয়া আনিতে [বলিবে] আর যে২ বাবুরা বীর তাঁহারা ব্রান্ডি না হইলে রাণ্ডি রাখেন না, অতএব পাত্রানুসারে তাহাও অদেয় অপেয় হয় না আর এই বাবুর দত্ত টাকাতে আড়ডিজীর দ্বারা নানাবিধ মিষ্টান্ন সামগ্রী আনাইবা, যথা, মোণ্ডা মুক্তি মনোহরা রসকরা ক্ষীরপুলি ক্ষীরপোরা বাদমতক্রী বাদাম দেওয়া ছোলাভাজা ছেনাবড়া পানতোয়া সরভাজা মনমত পেলাও মেঠাই যত বরফী বুন্দে খৈচুর সেউ জিলাপী মতিচুর লুচি কচুরি ছানাবড়া, নিমকী ঘেওর সিঙ্গাড়া, গজা খাজা খাস্তা বাদাম কিসমিস পেস্তা মোহনভোগ অদ্ভুত; নিখুঁতি নিখুত; খোয়া খেজুর খরমুজ, ইক্ষু শশা তরমুজ। পানিফল কেসুর, আম জাম আঙ্গুর; দধি ছপ্ত ক্ষীর মাখন বেদানা ইত্যাদি বিবিধ প্রকার মিষ্টান্ন ও ফলমূল দ্রব্য আনাইয়া এবং নিৰ্ম্মল সুশীতল লালদিঘীর জল পান করিতে দিবা এবং অপূর্ব্ব পানদানে সাঁচি পান বাঙ্গালা পান এবং নানা প্রকার মসালা ছোট এলাচি বড় এলাচি লবঙ্গ জায়ফল জয়ত্রী জোয়ান ধনে সুপারি এবং কপূর প্রচুর২ দিয়া পানদান সাজাইয়া বাবুরদিগের-দিবা এবং তাহারদিগের সহিত মিষ্টালাপ ও প্রলাপ আদি নানা-আলাপ বিলাপ করিবা, পরে যেরূপ করিতে হইবেক তাহা পশ্চাত কহিতেছি, মনোযোগপূর্ব্বক শুন ॥

অথ বিহারের রীতি উপদেশ ॥

শুন বাছা যৎকালীন তুমি কুলবধূ ছিলে কুলে থাকিতে তৎকালীন যে ধারা ছিল তাহা এক্ষণে নহে, যেহেতুক এক্ষণে তুমি বেশ্যা হইয়াছ অতএব বেশ্যারদিগের যেরূপ আচার করিতে হইবেক তাহা আমি বলিতেছি। বেশ্যার শরীরের শোভা কেবল পরের মনোরঞ্জনের নিমিত্তে নতুবা তাহার আপন স্বার্থ কেবল বাবুকে কাবু করা মাত্র, অতএব বাবুগণে যাহাতে মোহিত [৪৬] হয়েন তাহাই তুমি করিবা। হাব ভাব কটাক্ষ লাবণ্য দেখাইয়া যাহার যেমত স্বেচ্ছা হয় সেইমত আত্মমত জানিয়া প্রেমালিঙ্গন দিবা যদ্দারা বাবুরদিগের মনের আশকরা মেটে, তুমি সুবোধ মেয়ে বট তাহার ধারা মনেতে বুঝিয়া দেখ তোমাকে প্রায় সকলি শিক্ষা করাইয়াছি, যদ্যপি কথায় না বুঝিয়া থাক বরং অদ আড্ডিজী আইলে তৎকালীন একবার আমার নিকট আসিবা, বিহারের যে যে সকল ধারা কথায় করিয়াছি তাহা সমস্ত স্বচক্ষে দেখিয়া শিখিবা। লেখক কহে, ভালই, সে শিক্ষা মুখে বলা অপেক্ষা দেখাই উচিত। অনন্তর আড্ডিজী প্রাতে বিবির বাটীর সকল কর্ম কার্য্য করিয়া হাটবাজার করিয়া মধ্যাহ্নের পরে তাহার ক্ষণেক সাবকাশ হয় তদবধি সন্ধ্যা পর্যন্ত আড্ডিজীর সহিত বিবির মাতার প্রেমালাপ ও আলিঙ্গনাদি রতিক্রীড়া হইয়া থাকে এবং তাহার দ্বিতীয় সাবকাশ কাল দুই প্রহর রাত্রের পর, কিন্তু তৎকালীন বিবির অবকাশ থাকে না যেহেতু তখন তাহার ঘরে বাবুগণের সমাগম হয়, এই নিমিত্তে দিবসেই সাবকাশক্রমে আড্ডিজীর উপলক্ষে নব বিবিকে বিবিধ বন্ধানে সকল বন্ধ দেখাইলেন, তাহাতে নব বিবি চতুঃষষ্টিপ্রকার বিহার-বিদ্যায় বিলক্ষণ বিচক্ষণা হইলেন।

অথ প্রেম উপদেশ।

বিবির মাতা কহিতেছেন, বিহারের ধারা আর জানিবার অপেক্ষা নাই, এক্ষণে প্রেমের ধারা কিছু কহিতেছি মন দিয়া শুন। প্রেম যাহাকে প্রীতি বলে তাহা ঈশ্বরের সঙ্গেই ভাল, ইহা কেবল যোগীরাই পারেন নচেৎ অন্য প্রেম কপট প্রেম অর্থাৎ স্বকার্য্যোদ্ধার হেতু যৎকিঞ্চিৎ প্রেম যাহা করিতে হয় তাহা মনুষ্য সকলের আন্তরিক নহে প্রায় বাচনিকই অনেক বিশেষত আমারদিগের প্রেম কেবল অর্থ হইলে হয় যেমন স্বপ্রেমকোট তেমনি আমারদিগের সুপ্রেমের কোট এবং প্রাচীন সংগ্রহকারের সংগৃহীত বচন আছে, যথা-কসবী কেসকি জরু আর ভেড়ুয়া কেসকা শালা; অর্থাৎ বেশ্যা কাহার স্ত্রী হয় এবং বেশ্যার ভাই বা কাহার সম্বন্ধী হয়। অতএব বাছা, আমারদিগের প্রেম যাহা হইতে অধিক টাকা পাওয়া যায় তাহারদিগেরই সহিত প্রেম হয়, কিন্তু তাহাও নিপট প্রেম নয়, সেহ কপট প্রেম জানিবা। তুমি এই প্রকার প্রেম করিবা কাহারো দমে ভুলিবা না, বাবুকে আপনার কাবুতে আনিবা ইহার পন্থা এই ছয় ছ শিখিলে হয়, তাহার বৃত্তান্ত কহিতেছি ইহাতে জানিতে পারিবা, যথা-ছলনা, ছেনালি, ছেলেমি, ছাপান, ছেমো, ছেচড়ামি; ১ প্রথম ছ ছলনা তাহার বৃত্তান্ত এই, বাবুর নিকটে ছল করিয়া চক্ষু ছল২ দেখাইয়া কহিবা যে, বাবু আমার মায়ের সহিত আজি বঝকড়া হইয়াছে, অতএব যে সকল জিনিসপত্র এবং গহনাগাঁটি আমার কাছে আছে এ সমস্তই আমার মায়ের তিনি ইহা চাহিতেছেন এবং আমাকে কহিয়াছেন যে আমার জিনিসপত্র এবং গহনাগাঁটি পরিয়া বাবুর নিকট বাহার দেয়া এ তোমার কি নেকরা, বাবুর কি এমন যোগ্যতা নাই যে গহনাগাঁটি আপন ভালবাসার মানুষকে দেন, এইরূপ প্রকার কহিয়া কহিবা, বাবু এই সকল কথা আমাকে অতি শক্ত লাগিয়াছে কারণ তোমার নাম করিয়াছে, এই সকল কথা কহিতে২ দুই একখানা জিনিসপত্র এবং গহনাগাঁটি চাকরাণীর হাতে আমার নিকটে পাঠাইয়া দিবা; পরে বাবুকে কহিবা, বাবু, তোমার নিকট থাকিয়া যদি আমি অলঙ্কার প্রতিকার না পাই তবে তোমারি কলঙ্ক হইবেক আমার গায়ে চারিখানা গহনা থাকিলে লোকে কহিবেক যে ভাল মানুষে রাখিয়াছে বটে তাহাতে তোমারি মুখ উজ্জল হইবেক। এইরূপ ছলনাপূর্ব্বক বাবুগণে প্রেম-তরঙ্গে মগ্ন করিবা অথচ আপনার কর্ম সাধন করিবা যেহেতুক এইরূপ কথায় বাবুর চিড় লাগিয়া তোমাকে গহনাগাঁটি এবং নানাবিধ অলঙ্কার প্রতিকার বিবিধ প্রকার দিয়া পরিতোষ করিবেন।

২ দ্বিতীয় ছ ছেনালি তাহা বিবিধ প্রকার, এক প্রকার এই, যে গৃহস্থের কন্যারা কুলে থাকিয়া আপন পতি ভিন্ন অন্য পুরুষের আকাঙ্ক্ষা করেন তাহাকেই ছেনাল কহেন এবং তাহার কৰ্ম্ম ছেনালি যেহেতু তাহারা ঘোমটার ভিতরে খেমটা বাজান, যেমন তুমি পূর্ব্বে বাজাইতে, আপনার পূর্ব্ব আশ্রম মনে করিয়া দেখ সে সকল ছেনালির লক্ষণ বলক্ষণ স্মরণ হইবেক, যথা; আগে চলে পিছে তাকাবে, সেরকা কাপড়া পলক উঠাবে, লড়কা চুমে বগল দেখাবে, আর ক্যা ছেনাল ঢোল বাজাবে, অর্থাৎ যায়২ ফিরে চায়, পলকে মাথায় কাপড় দেয়, বালকের চুমা খায়, বগল দেখায়, আর কি ছেনাল ঢোল বাজায়। কিন্তু সে ছেনালিকে আমরা ছেনালি বলি না, কারণ উপপতি আমারদিগের পতি তাহা একই হউক কিম্বা অধিক বা হউক গৃহস্থের কন্যাদিগের যেমন পতি ভিন্ন অন্য পুরুযাকাঙ্ক্ষী হইলে তাহার নিন্দা হয় আমারদিগের সেরূপ নয়, তাহারা কেবল মাথার ঘোমটা দিয়া খালি খেমটা বাজাইয়া ছেনালি প্রকাশ করেন, আমারদিগের সর্ব্বাঙ্গে বিবস্ত্র করিয়া খেমটা আড়-খেমটা চৌতাল ঝাঁপতাল বাজাইলে ছেনাল বলে না। আমারদিগের যে একতাল আছে সেই এক তালা তিল প্রমাণ বাজাইলেই তাল সমান হইয়া সমস্ত তালের লয় হয় তাহাকেই আমরা ছেনালি বলি। তোমার রূপলাবণ্য এ পর্যন্ত আছে তথাচ প্রত্যহ প্রাতে উবটান বৈকালে সাবান দ্বারা অঙ্গ মার্জিত করিয়া দাঁতে মেশী ও মাথায় মাথাঘসা সোা দিয়া আতর গোলাব লাগাইয়া গহনা পরিয়া উত্তম মিহি কাপড় পরিধান করিবা তাহাতে যেন গায়ের লোমাদি এবং নিতম্বের প্রতি ভূতি দেখা যায় এইরূপ বেশভূষা করিয়া বাবুজন সহিত আমোদ প্রমোদ করিবা এবং প্রতি কথায় রস দেখাইয়া বশ করিরা এবং শ্লেষ ছাড়া কথা কহিবা না, কথার পেঁচাপেচিতে যেন আসল কর্ম্মের আঁচাআঁচি থাকে, এ কলেতে যদি বাবু কাবু না হয় তবে কাল-সহকারে সকার বকারেই নির্ভর করিবা; কিন্তু যে যে রসিক তাহার নিকট তেমনি ছেনালি করিতে হয় আর অঙ্গভঙ্গির বৃত্তান্ত যাহা পূর্ব্বে কহিয়াছি ছেনালি করিবা অর্থাৎ যে সকল বাবু কেবল কথার রসে বশ না হয়েন তাঁহারদিগকে পাকেপ্রকারে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখাইতে হইবেক কিন্তু এ ছেনালি বড় কঠিন, ইহার তাৎপর্য্য এই যে, তুমি লোকের নিকট সম্ভ্রমে অম্বর সম্বরণ করিয়া অথচ সম্ভ্রমে ভ্রম উপলক্ষ করিয়া অঙ্গ ভঙ্গ আর২ রঙ্গস্থান সকলি দেখাইবা এরূপ ছেনালি করিলে কে না বশ হয় আর মিষ্টালাপ করিবার কালীন নেকা লইবা অর্থাৎ কড়ি, বাড়ি, দাড়ি, ধাড়ি, শাড়ি, গাড়ি, ইত্যাদি শব্দ সকলের পরিবর্তে করি, বারি, দারি, ধারি, শারি, গারি, এইরূপ কহিব এবং টাকা কিম্বা পয়সা যদ্যপি কিছু গণিতে হয় তাহা কোনবার চারি টাকা এক গণ্ডা, কোন বার তিন টাকায় এক গণ্ডা, কোনবার বা পাঁচ টাকাতে এক গণ্ডা গণিবা; যদ্যপি কেহ জিজ্ঞাসা করে যে তোমার গণনা করিবার এ কি ধারা তাহাকে উত্তর করিবা যে এক গণ্ডা কয় টাকায় হয় তাহা আমি জানি না এবং গণনাকালীন এক দুই তিন চারি পাঁচ ছয় সাত আট নয় দশ এই পর্য্যন্ত গণিয়া তের পোনের এগার আঠারো এই এলোমেলো গণনা করিবা ইহাতে কেহ কিছু কহিলে কহিবা যে কাহার পরে কি হয় তাহা আমি জানি না এবং কখন২ জিজ্ঞাসা করিবা যে এক পণ টাকা কত টাকাকে বলে ও আশী টাকাই বা কত টাকায় হয় এই প্রকার প্রতি কথায় ছেনালি করিয়া কথাবার্তা কহিবা।

৩ তৃতীয় (ছ) ছেলেমি অর্থাৎ বয়স অধিক হইলেও বালিকার ন্যায় প্রণালী করিয়া বাক্য কহিবা; যথা হার, ভার, কার; ইত্যাদি পরিবর্তে হাড় ভাড় কাড় ইত্যাদি কহিবা এবং এই প্রকার নেকা হিসাব করিয়া বয়সের হিসাব কম করিবা ও প্রাচীন কবির উক্ত আছে, ফচকে রাঁড়ের চুলবুলনি, জোয়ান রাঁড়ের ছাতা, বুড়া রাঁড়ের পুরাণা কথা আধবয়সীর মাথা; অর্থাৎ প্রথমত যে২ বিবিরদিগের বয়স অল্প তাঁহারদিগের চলন স্বভাবত হুড়াহুড়ি দৌড়াদৌড়ি গালাগালি খেলা-খেলি গোলমাল ইত্যাদি যত করিবে ততই শোভা পাবে; দ্বিতীয়ত বিবিরদিগের যৌবনাবস্থা হইলে তাঁহারদিগের ধন কেবল দুই স্তন তাহাকেই ছাতা কহিয়া প্রাচীন কবি ব্যাখ্যা করেন সেই মনোহর ছাতা দেখাইয়া যুবতীরা বাবুরদিগের মন হরেণ অর্থাৎ ছাতা দিয়া মাথা রাখেন; তৃতীয়ত বিবিসকলের অর্দ্ধেক বয়স হইলে তাহারদিগের ধন আর কিছুই থাকে না কেবল মস্তকে যে যৎকিঞ্চিৎ কেশ থাকে তাহাতেই নানাবিধ সগন্ধ মাথাঘসা সোন্ধা মেথির তৈলাদি দিয়া ছলে কলে কৌশলে আপন কেশপাশ পুনঃ২ বাবুর নাসিকাগ্রে লইয়া যায়েন, ইহার তাৎপর্য্য এই যে তাঁহার কেশের জালে বাবু বদ্ধ হইয়া বশ হয়েন চতুর্থতঃ বিবিসকলে বৃদ্ধা হইলে তাঁহারদিগের বশ করিবার কোন রস থাকে না, কেবল বাক্য রস মাত্র অর্থাৎ প্রাচীন হইলে পুরাণ কাহিনী কহিতে পারে অর্থাৎ পূর্ব্বের লোচ্চা যথা রাজা মহানন্দ মিত্র, দেওয়ানজী ও বাবু নন্দরাম সেনজী ও রামহরিবাবু ইহার-দিগের উপাখ্যান সদা সর্ব্বক্ষণ করিয়া কালযাপন করেন যেরূপ আমি এক্ষণে করিতেছি।

৪ চতুর্থ (ছ) ছাপান। ইহার বৃত্তান্ত এই যে কোন বাবু তোমাকে নিজস্ব করিয়া চাকর রাখিলে তোমাকে দিবেন নাই, দরওয়ান দাসী চাকর ও রসুয়্যা ব্রাহ্মণ ইত্যাদি দাস দাসী নিজের লোক রাখিয়া দিবেন তাহাতে বাবুর নিজ সংসর্গী ব্যক্তি ভিন্ন অপর সাধারণ বাবু-দিগের যাওনের অনুমতি থাকিবেক না, তোমাকে একাকিনী রাখিবেন কিন্তু তখন তোমার কর্তব্য যে বাবুর মনের মত কৌতুক করিয়া মৌখিক প্রীতি দেখাইয়া বাবুকে প্রেমতরঙ্গে মগ্ন করিবা যাহাতে বাবু হাবুডুবু খাইয়া ভেবাচেকা হইয়া থাকেন এবং আর২ অনেক বাবুগণে তোমার সন্দর্শনের বাসনা রাখিবেন কারণ বাবুগণে প্রায় অনেকেই ইহা বোধ করেন যে গোপন প্রেমে অধিক সুখোদয় হয় অর্থাৎ অমুককে অমুক নিজস্ব রাখিয়াছে ইহার সহিত গুপ্তভাবে ভাব করিব, ইহার চেষ্টা ঐ সকল গুপ্ত প্রেমাভিলাষী বাবুগণে বিশেষরূপে পাইবেন, অতএব তুমি আপন বাবু অর্থাৎ তোমাকে যিনি নিজস্ব করিয়া রাখিবেন তাঁহাকে যৎকালীন বিলক্ষণ কাবুতে দেখিবে যে তোমার প্রেমে অত্যন্ত মোহিত হইয়াছেন তৎকালীন বাবুর স্থাপিত দাসদাসীদিগকে অর্থ প্রদানে বশ করিয়া ঐ অপর বাবুগণ যাঁহারা গোপন প্রেমের অন্বেষণে তোমার নিকট সমাচার প্রেরণ করিবেন তাহারদিগের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিবা কিন্তু নিজস্ব বাবু দৃশ্য না হয় তাহাতে তোমারও উপকার অশেষ বিশেষ হইবেক, ইহারি নাম ছাপানি জানিবা ॥*॥*॥

৫ পঞ্চম (ছ) ছেমো। অর্থাৎ যে তোমাকে নিজস্ব রাখিবেন

তাঁহার নিকটে গুপ্তপ্রেম কোন প্রকারে ব্যক্ত হইলে তোমার প্রতি বাবুর ক্রোধ হইবেক, তুমি তাঁহার ক্রোধ ভঞ্জন করিবার নিমিত্তে নিতান্ত চেষ্টা করিবে, যদ্যপি কোন কলে কিম্বা কৌশলে ক্ষান্ত না হয়েন তখন তুমিও সকল কৌশল ত্যাগ করিয়া আপন কুশল দেখিবা অর্থাৎ বাবুকে এইরূপ মিথ্যা বাক্যে প্রবোধ দিবা যে, বাবু তুমি যাহার নাম শুনিয়া ক্রোধ করিয়াছ সে আমার বাপ হয়, তাহার সহিত আমার মায়ের সংপ্রীতি আছে এ নিমিত্তে যে ব্যক্তি আমার মায়ের ঘরে আসিয়াছে তাহার সহিত আমার কোন এলাকা নাই এবং সে কখন আসিয়াছিল ও কখন গিয়াছে তাহা আমি কিছুই জানি না; তোমার নিকট যে পর্যন্ত নিজস্ব আছি সে অবধি তোমাভিন্ন যদ্যপি অন্য পুরুষের সহিত আলাপ করিয়া থাকি তবে তোমারই মাথা খাই। ইহাতেও যদ্যপি বাবুর প্রত্যয় না হয় তবে তাঁহার মাথায় হাত দিয়া মাথার দিব্য করিবা এবং আমাকে সাক্ষী মানিয়া কহিবা, আচ্ছা বাবু, আমার কথায় তোমার প্রত্যয় না হয় আমার মাকে জিজ্ঞাসা কর, তিনি তো মিথ্যা কথা কহিবেন না। এইরূপ ছলে কলে যদ্যপি বাবুজীর ক্রোধ শাম্য না হয় তখন তুমিও ক্রোধ করিয়া মৌনা হইয়া বসিবা তাহার কোন কথার উত্তর দিবা না। ইহাতেই বাবুর ক্রোধ শান্তি হইয়া তোমাকে সাধ্যসাধনা করিবেন, কিন্তু তৎকালীন তুমি কোন কথাই কহিবা না, অনেক সাধ্যসাধনার পরে কেবল এই কথা মাত্র কহিবা যে তুমি আমাকে যত ভালবাস তাহা এক আঁচড়েই জানা গেল, তোমার মাথায় হাত দিয়া দিব্য করিলাম তথাচ তোমার প্রত্যয় হইল না। এই কএক কথা কহিয়া কেবল নীরব হইয়া থাকিবা। এইরূপ হক নাহক ক্রোধ করিয়া মৌনা হইয়া থাকিলে তাহাকেই ছেমো বলে; যদ্যপি প্রবঞ্চনা করিয়া কিঞ্চিৎ কপট রোদন করিতে পার তবে বড়ই ভাল এবং তোমার মাখা খাই এই একটি কথা মাত্র মুখে হইতে অর্দ্ধেক নির্গত করিয়া দুই চক্ষে এক২ ফোঁটা জল বাহির করিয়া নীরব হইয়া থাকিলেই বাবুর ক্রোধ মার্গে ঢুকিবেক, উলটিয়া তোমাকে সাধ্যসাধনা করিবেন এবং তোমাকে যত সাধিবেন তুমি ততই আপনার ছেমো প্রকাশ করিবা। পরে যখন দেখিবা যে বাবুর ক্রোধ সম্বরণ হইয়াছে, তোমার উম্মা ভাঙ্গিলেই তিনি রক্ষা পায়েন তৎকালীন তুমি এই প্রকার বাক্য কহিবা; যথা, ভাল পোড়া বটে, মায়ের ঘরে লোক আসিবেক পোড়া লোকে চক্ষের মাথা খাইয়া তাহা দেখিতে পায় না, এইরূপ রাগ প্রকাশ করিয়া নটনাগরের খট্‌রাগ নিবৃত্তি করিয়া নটখট দূর করিবা।

৬ যষ্ঠ (ছ) ছেঁচড়ামি। অর্থাৎ যে সকল বাবুগণে মংদ কি ঠিকা লুক্কায়িত হইয়া অথবা প্রকাশ হইয়া তোমার বিহারের আশয়ে আসিবেন, তাহারদিগকে প্রথমে ঘরে বসাইয়া একটি ছিলিম তামাক দেওয়াইয়া তাঁহারদিগের স্থানে আপন খরচের টাকা আগেভাগে চাহিবা তাহাতে যদ্যপি কেহ আপত্তি করেন কিম্বা কহেন যে টাকার ভাবনা কি পরে দিব, তুমি তাঁহারদিগের কহিবা যে আমি টাকা চাহি না, আমার মা টাকা চাহিতেছেন। কোনমতে তাঁহারদিগের আপত্তি-জনক বাক্য গ্রাহ্য করিবা না তাহারদিগের হাস্যবদনে মিষ্টবচনে কহিবা, শুন বাবু, আমার মা আছেন এই জন্য টাকার এত তাইস, যদ্যপি তিনি না থাকিতেন তবে তোমরা টাকা নাইবা দিতে তাঁহার অবর্তমানে কোন্ শালী তোমারদিগের নিকট টাকা চাবে, এইরূপ কলকৌশলে আগে আপন হস্তে লইবা ইহাতে যদ্যপি কেহ তোমাকে ছেঁচড়া কহেন তাহাতে তুমি কোন মতে আপন মনে কিন্তু না ভাবিয়া বিলক্ষণরূপ হাস্য পরিহাস্য করিয়া ঐ বাবুরদিগের সহিত পূর্ব্বোক্ত উপদেশ মত আমোদ প্রমোদ করিবা অর্থাৎ পান গান নয়ন-বাণ প্রভৃতি যাহার অঙ্কুর উপদেশ পল্লবখণ্ডের শেষ ভাগে দেওয়া গিয়াছে সেই মত হাবভাবকটাক্ষাদি করিয়া এরূপ প্রেমালিঙ্গন দিবা যে যদ্‌দ্বারা টাকা আগে লওন জন্য যে ছেঁচড়ামি তাহা সকলি বিশ্বত হইয়া যায়েন এবং তাঁহারদিগের মুণ্ড ঘুরিয়া তোমারি দ্বারে ঘুরে ফিরে আইসে। এই ভাবে অর্থোপার্জন করিয়া বাবুগণের সহিত ভাব রাখিবা। এই সকল উপদেশের সবিশেষ যদ্যপি সমস্ত স্মরণ না থাকে ইহার স্কুল বৃত্তান্ত কহিতেছি, তাহাই স্মরণ রাখিলে কৰ্ম্ম সিদ্ধ হইতে পারিবেক।।

অথ উপদেশের স্কুল বৃত্তান্ত।

উপদেশ করিলাম করিয়া মন্ত্রণা। সাধিলে হইবে সিদ্ধ ঘুচিবে যন্ত্রণা। সঙ্গীত বিদ্যার শিক্ষা হইয়াছে যত। তাহাতেই কাবু হবে বাবু কত শত। গান গুণে যদি নাহি হও গুণবতী। তথাচ যৌবনে মান্যা হইবে যুবতী। শিক্ষা অনুসারে সাধ্য সাধন করিবে। অসাধ্য হইবে সাধ্য সাধ পূর্ণ হবে। কহিলাম রসে বশ করিবার ধারা। প্রেমাধীন হবে তাহে লোচ্চা আছে যারা। সহজেই মদে মত্ত রসিক নাগর। দেখাইবে তুমি সব রসের সাগর। বিহারের যথা রীতি দেখিয়া শিখেছ। মুখে বলা বৃথা আর স্বচক্ষে দেখেছ। সেই বন্ধে নানা রঙ্গে করিবে বিহার। সুবিস্তার যত হবে ততই বাহার। বিহারে বাহার হলে একত্র আবার। তাহাতে আহার গুণে জাতি রাখা ভার।। প্রেমতত্ত্ব কথা বলিয়াছি যে প্রকার। সেই তত্ত্বে ছয়মাত্র আছে [ব্যবহার।] তথাপি কিঞ্চিৎ মাত্র পুনরুক্ত আছে। [মন দিয়া শুনে রাখ বলি তব কাছে।] যেহেতুক যদ্যপি হও ইহাতে বিস্তৃত। বৃথা হবে উপদেশ ভস্মে যেন ঘৃত। অতএব স্কুল মূল করিবে নিশ্চয়। পুনর্ব্বার বলি শুন ছয়ের নির্ণয়। প্রথম ছ সাধিবারে করিবে ছলনা। প্রণয় প্রকাশে পূর্ণ হইবে বাসনা। ছলে কলে কথা কবে কান্দিয়া২। কহিবে লয়্যাছে মাতা গহনা কাড়িয়া। বলিবে বাবুরে আমি তোমারি নিতান্ত। যাহা চাবে তাহা পাবে না রবে নিশ্চিন্ত। দ্বিতীয় ছ ছেনালি তা দ্বিবিধ প্রকার। বিশেষ বৃত্তান্ত পূর্ব্বে হয়েছে প্রচার। সংক্ষেপে তাহা মাত্র স্মরণ রাখিবে। অঙ্গ ভঙ্গে রঙ্গস্থান ভ্রমে দেখাইবে। সম্ভ্রমেতে অম্বর করিবে সম্বরণ। অথচ হইবে দৃষ্ট মদনসদন। তৃতীয় ছ ছেলেমি সে অতি চমৎকার। বয়োধিক হইলে ছেলেমি ব্যবহার। বালিকার ন্যায় বাক্যে করিয়া প্রণালী। অমৃত শৈশব বাক্যে দিবে গালাগালি। হুড়াহুড়ি দৌড়া-দৌড়ি তাহাতে করিবে। বালিকার অনুরূপ অপরূপ হবে। চতুর্থ ছয়ে ছাপান হয় এ বিধান। এক জনে ছাপাইয়া অন্য জনে মান। তাহাতে যে করে গুপ্ত প্রেমের বাসনা। গোপনে সাধিবে তার মনের কামনা। পঞ্চমে ছেমোর কথা শুন রসরতী। প্রকাশ যদ্যপি হয় পিরীতি পদ্ধতি। নাগর করিলে ক্রোধ প্রকাশিবে ক্রোধ। ছেমোর ভরেতে থেকে হয়ে বারোধ। তাহাতেও রাগ শান্তি না হয় তাহার। তখন করিবে দিব্য তাহারি মাথার। যষ্ঠ ছয়ে ছেঁাঁচড়ামি তার ধর্ম বলি। ছেচড়ার কৰ্ম্ম সেই জানিবে [৫৬] সকলি। আসিবেন যে যে বাবু ঠিকা বেড়াইতে। আগেতে চাহিবে টাকা হাসিতে হাসিতে। ইথে যাহ ছোঁচড়ামি প্রকাশ পাইবে। হাব ভাব কটাক্ষতে সারিয়া লইবে। স্মরণার্থে এই মাত্র কহিলাম সার। পূর্ব্ব উক্ত যথাপ্রযুক্ত করিবে আচার।

ইতি কুসুমখণ্ড সমাপ্ত।


অথ ফলখণ্ড। অর্থাৎ বিবিরূপ বৃক্ষের ফল।

অতঃপর নব বিবি নব যৌবনে নবানুরাগের সন্ধানে সমস্ত গুণাভ্যাস করিয়া নববাবুবিলাসোক্ত নববাবুদিগের প্রতিক্ষণে ক্ষণ উদ্যোগিনী হইলেন, দৈবাৎ শুভক্ষণে একজন নববাবুর সহিত সম্মিলন হইল। একে অনঙ্গের রঙ্গস্থান অঙ্গনা তাহাতে প্রাপ্তযৌবনা অথচ প্রবীণ কর্তৃক প্রাপ্তোপদেশ হইয়াছেন তাহাতে কি পুরুষের প্রাণ বাঁচে। বিশেষতঃ নববাবু সহজেই কাবু তাঁহারদিগের কি সাধ্য যে বিবির অসাধ্য হইতে পারেন যাহা নববাবুবিলাসে সবিশেষে ব্যক্ত আছে অতএব নব বিবির কটাক্ষবাণে নববাবু জর্জরীভূত হইয়া অস্থির হইলেন, তাহা দেখিয়া নব বিবি অদ্য একটা শিকার পাইয়াছি, এই কথা বারম্বার কহত মহা হর্ষে উপদেশিনীর সন্নিকটে উপস্থিত হইলেন। উপদেশিনী ইহা শ্রবণ মাত্রেই আহ্লাদসাগরে মগ্না হইয়া কন্যাকে ধন্যা বলিলেন। ফলিতার্থ যে ফল ফলিবেক তাহা পশ্চাতে জানা যাইবেক।

অথ নব বিবির শিক্ষার পরীক্ষা।

নববাবু নব বিবিকে নিজস্ব করিয়া রাখিলেন এবং নানা দ্রব্যাদি ও বহু মুদ্রা প্রতিদিন প্রদান করত নিত্য মজা করেন। ক্রমে২ বিবির কায়দায় পড়িয়া পূর্ব্বোক্ত ছয়ে নয়ছয় হইয়া লড্ডু বনিলেন, এবং অবশেষে রসতরঙ্গের পাথারে সাঁতার ভুলিয়া হাবুডুবু খাইতে লাগিলেন। এমত সময় আড়ডিজী বিবির মাতাকে কহিতেছেন যে, এখন আর বিলম্ব কি? তোমার নব বিবি তো শিকার ধরিয়াছে এই সময় যাহা করিতে পার সেই তোমার এবং নামনস্কা বাহির কর তবেই সকল শ্রম সার হয়। নব বিবির মাতা সহজেই ধিঙ্গী, তাহাতে আবার আডিজীকে সঙ্গী পাইয়া তৎক্ষণাৎ নব বিবির নিকটে আসিয়া কহিলেন যে, আমি তোমার এত করিয়াছি এখন তাহার কিছু প্রতিফল দেও যে তোমার দৌলতে আমার মনো আফসোস মিটুক। নব বিবি কহিলেন, তাহার আটক কি? তুমি যাহা চাহ তাহাই দিতেছি। তুমি অনুরোধ করিলে অসাধ্যও সুসাধ্য করিতে পারি। নব বিবির মাতা কহিলেন, ভাল২ তোমার শিক্ষার পরীক্ষা দেখা যাইবেক। সংপ্রতি বসন্ত কাল উপস্থিত, যদি এই সময়ে রতিকামদেবের পূজার উপলক্ষে বাবুকে বলিয়া জাঁক-জমক করিতে পার এবং লোচ্চা লুচ্চির নিমন্ত্রণ আমন্ত্রণ হয় তবে এই বুড়া বয়সে তোমার বাহাদুরীতে আমার সম্ভ্রম প্রকাশ পায়। তদনন্তর নব বিবি নবানুরাগী নববাবুর নিকটে উপস্থিত হইয়া কহিলেন, বাবু আমি তোমারি কাবু, তুমি যখন যাহা বলিতেছ তাহাই করিয়া তোমার মান রাখি, এখন আমার মান রাখ যদি তবে কিছু বলিব, বাবু তখনি স্বীকার পাইলেন যে তুমি যাহা বলিবে তাহাই করিব, তোমাকে আমার অদেয় কি আছে, প্রাণের বড় কিছু নাই তাহাই তোমাকে দিয়াছি; এখন কি চাহ তাহা বল। নব বিবি উত্তর করিলেন, বাবু, আর কিছু নয় সম্প্রতি এক লজ্জায় পড়িয়াছি। দেখ মেছোবাজারের প্রতি ঘরে ঘরে বসন্তরাজার পূজার ধুম পড়িয়াছে, আমি কি তোমার মানুষ হইয়া আপনার ঘর থাকিতে পরের ঘরে দেখিয়া বেড়াইব। বাবু কহিলেন, এ কোন তুচ্ছ কথা, এখনি বল তো পূজার সকল আয়োজন আনিয়া উপস্থিত করি। অনন্তর আডডিজীর টিপুনি মতে নব বিবির মাতা ফর্দ্দ দিলেন। সেই অনুসারে পঞ্চ সহস্র মুদ্রা এক বসন্তপূজায় নব-বাবু নব বিবির প্রীত্যর্থ উৎসর্গ করিলেন। ফলিতার্থ পূজার আয়োজন কেবল বাতাসা, বাকী সকলি তামাসা ও খুসিয়ানা গাওনা বাজনা ও খানা খেলানা রং ঢং সং ইহারি বরাহদ্দ ভারি। পর দিবস বিবির সুপারিশে বাবুর আদেশে আড্ড ডিজী সকল দ্রব্যাদি আহরণ করিয়া আনিলেন। তখন নব বিবি আপন মাতার আজ্ঞানুসারে প্রাচীনা মুমূর্ষু বেশ্যাগণ-যথা বিবিরয়াবাসী খাটওয়ালি বামনী গোপীছিব্ধ ডালি দামড়া গোপী বেতো কিশোরী প্যারি বৈষ্ণবী বকনাপ্যারি রাধাবাই অন্ন গোয়ালিনী, পুখুরে রাসীহরোর মা মণি, কমল পদ্ম রাজকুমার বুড়া২ যত আর বেশ্যামহলে খ্যাতাপন্না মান্যা ধন্যা অগ্রগণ্যা ছিলেন সকলকে নিমন্ত্রণ করিলেন।।

অথ বসন্তরাজার পূজার বাহার।

পর দিবস রাত্রে বসন্তরাজার মন্ত্রতন্ত্র সবলোট ভট্টাচার্য্যের মন্ত্রের চোটে শেষ হইল। তখন নবীনা ও প্রাচীনা বিবিসকল আপন২ বাবু সমভিব্যাহারে বিবির আগারে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। প্রাচীনার-দিগের রূপের শোভা অধিক বর্ণন করা অধিক, তথাপি রসিক সকলে ইহাহ স্থির করিবেন যে তাহারা এখনো বৃদ্ধ বয়সেও ক্ষান্ত নহেন যেহেতুক স্ত্রীলোক ত্রিলোক জয় করিয়া থাকেন তাহার সাক্ষী প্রথমে যখন পয়োধর গাত্রোত্থান করেন তখন উর্দ্ধমুখী হয়েন, তাহার তাৎপর্য্য এই যে উর্দ্ধে স্বর্গস্থ সুরাসুর সকলকে দমন করেন পরে মধ্যবিৎ ভাবে কিছুকাল স্থায়ী হয়েন তাহাতেই মর্ত্যলোক জয় হয়। অতএব ইদানীং প্রাচীনাবস্থায় যদ্যপি পয়োধর নিম্নমুখী তথাপি ইহা দেখিয়া রসিকেরা সুখী ব্যতীত দুঃখী নহেন, যেহেতুক অধস্ত পাতালে তাবৎ লোককেও বশীভূত করা আবশ্যক। সুতরাং সেই পন্থায় পয়োধরের নীচ গতি ইত্যবধানে ঐ সকল মান্যা প্রাচীনা বিবি ও পাঁচন২ বাবুকে সমাদর-পূর্ব্বক নব বিবির মাতা আপন ঘরে লইয়া অপূর্ব্ব আসনে উপবেশন করাইলেন এবং ঐ দৃষ্টান্তে নব বিবি ও সমাগত নব নব বাবু ও নব নব বিবিরদিগে আপনার বৈঠকখানায় বসাইয়া আতর দান ও পান দান পূর্ব্বক মান দান করিলেন, সেই সময় সে চাঁদের হাটে শোভা তাহা কি কহিব যেন সাক্ষাৎ রতি ও রতিপতির সমাগমে বিবির বাটীতে রাসমণ্ডল হইয়া উঠিল। একে ঋতু বসন্তবাহার তাতে রূপে বাহার এবং বাসন্তী পোষাকের বাহার ও গায়ক ও গায়িকার গানেতেও বাহার তখন বাহার বৈ আর কথাই নাই। ইত্যবসরে আহারের ও বিহারের নিমিত্তে প্রাচীনা বিবিসকলে অনুমতি করিলে মহাধুম পড়িয়া গেল। কেহ কহে কালিয়া কাবাব, কেহ বলে লাল সরাব, কেহ বলে আচ্ছা বেরাণ্ডী, কেহ বলে ফাইন ব্রান্ডি, কেহ বলে এখনি পোলাও, কেহ বলে তবল বাজাও, কেহ বলে গাও পাঁচালি, কেহ বলে খেমটাওয়ালী, কেহ বলে বহুৎ মজা, কেহ বলে খেমটা বাজা, কেহ বলে মোহন গাঁজা, [৬০] কেহ বলে ফের লেগে যা, কেহ বলে সরস চরস, কেহ বলে তবল বাজাও, কেহ বলে গাও পাঁচালি, কেহ বলে খেমটাওয়ালী, কেহ বলে বহুৎ মজা, কেহ বলে খেমটা বাজা, কেহ বলে মোহন গাঁজা, কেহ বলে ফের লেগে যা, কেহ বলে সরস চরস, কেহ বলে অঙ্গুরকা রস। এইরূপে চর্ব্বচোষ্যলেহ্যপেয় চতুর্ব্বিধ আহার ও বিলাতী বিপ্রপাদোদক নানা প্রকার আর আফিম সবজী পত্তি মাজুম আর গাঞ্জা গুলি চরসের ধুম একেবারে একত্র হওয়াতে মহাধুম হইল যে সে ধুম-ধামে কাহার বস্তু কে হরণ করে এবং কাহার প্রতি কে বরণ করে তাহার ঠিকানা নাই, কেবল মজা কর মজা কর এই শব্দ মাত্র গানে এবং বচনে এবং যন্ত্রের তানে বাজিতে লাগিল। তখন সন্ধিক্ষণ বুঝিয়া মদন কামদেব রতির সঙ্গে সঙ্গ করিলেন। পূজা এবং পদ্ধতি মতে তৎক্ষণাৎ সর্ব্বাঙ্গ সাঙ্গ হইল, নিমন্ত্রিত সকলে উন্মত্ত হইয়া সুখশয্যায় আহার-বিহার করত রাত্রে বিহার করিলেন। প্রভাতে বিসর্জন ছলে স্ব স্ব বাস-স্থলে প্রস্থানপরায়ণ হইলে এই প্রকার নব বিবি নববাবু সহকারে স্বমাতার আজ্ঞানুসারে নিত্য নিত্য নূতন রঙ্গে রসতরঙ্গে অঙ্গ ঢালিয়া আহার বিহার এবং বাহার করেন এবং ছলে বলে কলে কৌশলে বাবুর ধনাপহরণ করেন, ফলিতার্থ নববাবুকে কেবল মৌখিক ভাবেই সম্ভাব দেখান কিন্তু আন্তরিক ভাবের অনেক ভাবান্তর অর্থাৎ বেশ্যার-দিগের ধনবানের সঙ্গে প্রেম মিথ্যা কেবল রোজগার মাত্র সার কিন্তু ইহাতে এবং আশ্চর্য্য এই যে অবলা কেমনি প্রবলা হউক এবং প্রেম দেখাইয়া কতই পুরুষের মন ভুলাউক কিন্তু তথাপি নিজস্ব কোন এক পুরুষের বশ্য অবশ্য হয়। এমন কোন বেশ্যাই নাই যাহার হাটবাজার করে এবং গাটা পাটা জাঁতিয়া দেয় ও চড়টা লাথিটা খায় এমন একজন ভালোবাসা মানুষ নাই সুতরাং নব বিবি নববাবুর অগোচরে তাদৃশ মানুষের সহিত ব্যবহার জাতীয় ব্যবহার প্রচার করিলেন। কথিত আছে যে দুষ্কর্ম্মের ফল অতি নিকট অতএব বিবির বারাণ্ডার নীচে এক ব্যক্তি ডাকওয়ালা ডাকের দোকান করে। নব বিবি সেই ডাকওয়ালার ডাকে ভুলিয়া তাহারি প্রেমে মোহিত হইয়া হিতাহিত বিবেচনা রহিতা হইলেন এবং তাহারি সহিত গোপনে মনোরঞ্জন করেন। যতক্ষণ নববাবু থাকেন ততক্ষণ তাহার সঙ্গে হাস্যকৌতুক করেন। ঘর ফাঁক পাইলেই ডাক দিয়া ডাকওয়ালাকে লইয়া আহার-বিহার করেন। এইরূপে দুই দিক রক্ষা করেন যদি সাবকাশ কাল পান তবে এদিক ওদিক চাহিয়া অনাহুত রবাহুত বাবু জনেক দুই জন আইলেও তাহারদিগেরও মনোরঞ্জন এবং তদারা ধনোপার্জন করিয়া থাকেন। কোনমতে কোনদিকেই ত্রুটি নাই সম্যক প্রকারে আহরণ করিতে লাগিলেন। যাহার দ্বারা যত পান তাহার কিঞ্চিৎ আপন মাতাকে দিয়া অবশিষ্ট সকলি গোপনে ডাকওয়ালাকে দেন। অথচ বাবুকে তাহার নিজস্ব বলিয়া জানান। এইরূপ কিয়ৎকাল গতে গুপ্ত ভাব ব্যক্ত হইল অর্থাৎ বিবির গুণ বাবু টের পাইলেন। পরে বাবু অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হইয়া মহা বিবাদ উপস্থিত করিলেন। তখন নব বিবি তাহার মাতৃদত্ত উপদেশ ছয় প্রকার ছয়ের সাধনা মতে সমস্ত পরীক্ষা করিবাতে নববাবু নব বিবির নিতান্ত কাবু হইয়া ক্রমে২ সেই প্রেমের অনুক্রমে আপনার আপনার যথাসর্ব্বস্ব দিয়া ফতুর হইলেন। ইহার বিস্তারিত বিবরণ অর্থাৎ বেশ্যার প্রেমে মত্ত হইয়া যেপ্রকারে সর্ব্বশেষে সর্ব্বনাশ নববাবু দীন দুঃখী হয়েন তাহা নববাবুবিলাসেই প্রকাশ গাছে। অতএব বিবি বিলাসে বাবুর বৃত্তান্ত অধিক লিখনাধিক। সুতরাং উক্ত মতে বাবু যখন হৃতসর্ব্বস্ব হইলেন ও তাঁহার হাতে আর টাকা নাই আত্মীয় অন্তরঙ্গ আলাপিত যে কেহ আছে প্রায় সকলেরি স্থানে কিঞ্চিৎ২ ঋণ হইল। কোন স্থানে চুরি জোয়াচুরি অথবা ঝকমারি করিয়াও টাকা পাইবার সম্ভাবনা নাই এবং পুনঃ২ বিবির দুষ্টাচরণ দেখিয়া বেশ্যার প্রেমে বাবুর নিতান্ত অবিশ্বাস জন্মিল তখন নব বিবি বাটীতে গমনাগমন করণে ক্ষান্ত হইলেন।-

অথ নব বিবির প্রতি ডাকওয়ালার মন্ত্রণা ॥

অনন্তর যখন নব বাবুর মার্গ রুদ্ধ হইল তখন বিবি এবং ডার্ক ওয়ালা উভয়ে পরম আনন্দিত হইলেন যেহেতু এক্ষণে নির্ভয়ে উভয়ের বাঞ্ছা পূর্ণ হইবেক; কিন্তু বিবির মাতা বয়স্থা বেশ্যা এবং বয়স্থা হইলেই প্রায় বিষয় পরিদেবনা অধিক হয়। তিনি বিবিকে কহিলেন, হায় হায় একি দায়, তুই কেবল ডাকওয়ালা এক বেটা ঠেটার লেঠায় পড়িয়া বুদ্ধিশুদ্ধি সকলি হারাইলি। এইরূপ কহিয়া তিরস্কার করিয়া ডাক-ওয়ালার প্রতি নব বিবির মনোভেদ জন্মাইবার চেষ্টায় রহিলেন কিন্তু ডাকওয়ালা তাহা বুঝিয়া বিবিকে মন্ত্রণা দিতেছে যে, বিবি, এক্ষণে বাবু বিদায় হইয়াছে তাহাতে নিষ্কণ্টকে রাজত্ব হইবেক কিন্তু কণ্টকী স্বরূপা তোমার মাতা এক মহা দায় আছে, তাহার হাত হইতে চম্পট না করিলে নির্ভয়ে মজা হওয়া ভার, কারণ তোমার মাতা তোমাকে যে যেরূপ কহিবেক তাহাই তোমাকে শুনিতে হইবেক, তাহার মত ভিন্ন অন্য কৰ্ম্ম করিতে কখনই পারিবে না, তাহাতে তোমার প্রাণের কি সুখ হইবেক, কসবী হইয়াও যদ্যপি মাতার অধীনতাপ্রযুক্ত মজা না করে তবে তাহাপেক্ষা নির্বোধ আর কে আছে এবং মজারহিত যে প্রাণ তাহা থাকায় কি সুখ, অতএব যাহাতে প্রাণে সুখ মজা হয় এমন চেষ্টা করহ। নব বিবির মন অত্যন্ত নরম, তাহাতে ডাকওয়ালার গরমাগরম পরামর্শ পাইয়া আরও গলিয়া গেল এবং নব যৌবনের মদেতে মত্ততাপ্রযুক্ত ও মজার লোভহেতু সকল বিশ্বত হইয়া ডাকওয়ালার একান্ত প্রেমে পড়িয়া কহিলেন, তুমি আমাকে যাহা কহিবে আমি তাহা করিব। আমার মা বাপ কে যে আমি তাহার মায়া দয়া করিব এবং আমার বলিয়া ডাকি এমন ব্যক্তি তোমা ভিন্ন কেহ নাই, তুমি সুখ দেও আমি তোমারি প্রেমাধীনা। ডাকওয়ালা অতি চতুর এবং জোয়াচোরের ঠাকুর নব বিবিকে এরূপ নরম ও আপন প্রেমে বাধিত দেখিয়া কহিলেক, তুমি যেমন প্রেমী তোমার উচিত যে কোন স্থানান্তরে গমন করিয়া আপন বশে থাক, আমি তোমাকে জীবনাবধি জীবনের পুত্তলী করিয়া রাখিব অতএব তুমি আমার মন্ত্রণা শুন, কেন মিছে কুটনীর জ্বালায় জ্বলিয়া মরিতেছ, আমার সঙ্গে চল নিরালা বসিয়া মনের সাধে মজা করিবে। ডাকওয়ালার এই সকল পরামর্শ নব বিবির চিত্তরম্য হইল, তখন মনে মনে চিন্তা করিলেন যে ব্যক্তি যথার্থ কহিয়াছে অতএব এহারি সহিত স্থানান্তর গিয়া বাস করা উচিত। ইহা বিবেচনা করিয়া ডাকওয়ালাকে কহিলেন, আমি তোমাকে পূর্ব্বে বলিয়াছি যে তুমি যাহা করিতে কহিবে আমি সেইরূপ করিব, মিথ্যা আর কেন কথা বাড়াহ যেখানে লইয়া যাইতে চাহ সেই স্থানেই যাইতে প্রস্তুত আছি। এই কথা শুনিবামাত্র ডাকওয়ালা অত্যন্ত আনন্দিত হইল।

অথ ডাকওয়ালার সহিত নব বিবির গোপনে বহির্গমন ॥

ডাকওয়ালার সহিত নব বিবি এইরূপ পরামর্শ স্থির করিয়া রাখিয়াছেন। পরে কোন দিবস বিবির মাতা কোন কর্ম্মান্তরে গমন করিয়াছিলেন, সেই সাবকাশক্রমে আপন প্রিয়তম ডাকওয়ালাকে বারাণ্ডা হইতে ডাক দিলেন। ডাকওয়ালা বিবির আজ্ঞানুসারে তৎক্ষণাৎ তাহার সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বিবি তাহাকে দেখিয়া কহিলেন, আর দেখ কি, এই সময়ে অতি সুন্দর সুযোগ হইয়াছে মাগী ঘরে নাই কোথায় গিয়াছে, অতএব যদ্যপি আমাকে স্থানান্তর লইয়া যাইবার বাসনা থাকে তবে চল, আমি তোমার সঙ্গের সঙ্গী এবং রঙ্গের রঙ্গী। ডাকওয়ালা মনে মনে অতি সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, তবে তুমি প্রস্তুত হও, আমি পালকী লইয়া আসিতেছি। এইরূপ বলিয়া ডাক-ওয়ালা আনন্দেতে নৃত্য করিতে লাগিলেন। পরে পালকী আনিতে গমন করিলেন। ইত্যবসরে নব বিবি আপন আয়ত্ত ধন এবং অলঙ্কার প্রতিকার যাহা যাহা ছিল তাহা সমস্ত এ্যন্তব্যস্তে হস্তগত করিয়া বহিদ্বারে পালকীর অপেক্ষায় দণ্ডায়মানা রহিলেন। ডাকওয়ালা অর্তি ত্বরায় আসিয়া ঘোড়াশাকো হইতে এক উড়ের সরদার বেহারার দ্বারায় দুই চারিখানা পালকীর ডাক সাজাইয়া তাহার মধ্যে বসাইয়া উক্ত নব বিবিকে সমাচার দিলেক এবং একখানা পালকী চারি জন বেহারা সুদ্ধ বিবির বাটীর দ্বারে উপস্থিত করিলেক। বিবি তৎক্ষণাৎ পালকীর ভিতর গিয়া বসিলেন। বেহারা পালকী উঠাইবা মাত্র ডাকওয়ালা সেই সঙ্গে স্বয়ং নক্ষত্রগতি ধাবমান হইয়া শেয়ালদহে বিবিকে লইয়া গিয়া এককালে দহে ফেলিলেক অর্থাৎ এক অরণ্যময় বাগানে লইয়া সংগোপনে রাখিলেক। এখানে বিবির মাতা বাটীতে প্রত্যাগমন করিয়া গৃহমধ্যে বিবিকে না দেখিয়া ইতস্তত অন্বেষণ করত উদ্বিগ্নচিত্ত হইয়া প্রতিবাসিনীদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ওগো তোমরা কেহ আমার নব বিবিকে দেখিয়াছ, তাঁরা সকলেই কহিলেন, আমরা তাঁহাকে অদ্য দেখি নাই। ইহাতে বিবির মাতা বৎসহীনা গাভীর ন্যায় অত্যন্ত ভাবিত হইয়া সে পাড়ার সকলের বাটীতে প্রত্যেক২ জনকে সকাতর বচনে বিবির অন্বেষণ করিলেন, কোথাও তত্ত্ব পাইলেন না। তখন বিবি-হার। হইয়াছি ইহাই স্থির করিয়া সজলনয়নে অধোবদনে ভাবিতে লাগিলেন। ইত্যবসরে আড়ডিজী সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন। বিবির মাতা আড় ডিজীকে দেখিয়া তাহার হস্ত ধরিয়া রোদন করিতে২ বিবিহারা হইবার কথা এবং পাড়ায় অনুসন্ধান করিয়া না পাইবার বৃত্তান্ত সকল কহিলেন। আড্ডিজী ইহা সমস্ত শুনিয়া ক্ষণেক কাল নীরব হইয়া চিন্তা করিয়া বিবির মাতাকে বহুতর আশ্বাস দিয়া কহিলেন, কিছু চিন্তা নাই, ডাকওয়ালার সন্ধান হইলে বিবিরও অনুসন্ধান হইবেক, অতএব আমি স্বয়ং গিয়া তাহার ঠিকানা করিয়া আসিতেছি। আড়ডিজী সেই স্থানে আপন রমণীর মনোরমণার্থে বহুবিধ হাঁকডাক এবং দম্ভ প্রকাশ করিয়া ডাকওয়ালার অনুসন্ধানে বাহির হইয়া প্রথমতঃ ডাকওয়ালার বাটীতে উপস্থিত হইলেন, তথায় কোন অনুসন্ধান পাইলেন না। পরদিবস দোকানি পশারি হাটারি বাজারি হারী মৌলী যে যেখানে আছে ক্রমে২ সকলকেই জিজ্ঞাসা করিতে২ বরাহনগর পর্য্যন্ত আসিয়া উপস্থিত হইলেন, তত্রাপি অনুসন্ধান পায়েন না। তখন বিবির মাতা বিবির আশা ভরসা এককালে ত্যাগ করিয়া আডডিজীকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে এক্ষণে ইহার উপায় কি। আড্ডিজী কহিলেন, একবার চিৎপুরে অন্বেষণ করা উচিত, যদ্যপি সেখানেও কোন ঠিকানা না পাওয়া যায় তবে শেষ অসারে জলসার অর্থাৎ থানায় খবর দেওয়া যাইবেক। বিবির মাতা এবং আড্ডিজী উভয়ে এই পরামর্শ ধার্য্য করিয়া অতি অধৈর্য্য হইয়া চিৎপুরে প্রত্যাগমন করিতেছেন। পথিমধ্যে আড়ডিজীর জনেক অন্তঃকরণের বন্ধু অর্থাৎ ইয়ার তাঁহার পরিচ্ছদ মলিন এবং তদুপযুক্ত এক গামছা দোছোট এবং পাদুকা দুই পদে দুই প্রকার, গঠন অতি কদাকার এবং আকার কিম্ভুতকিমাকার, মস্তকে এবং শরীরে প্রায় মাসাবধি তৈল নিক্ষেপ হয় নাই। তিনি আঙুডিজীর সহিত কাপ্তেনির দালালি ব্যবসায় করেন। আডডিজীরও দশ। সেইরূপ অতএব দুই ইয়ারে অতিশয় প্রণয় আছে। পথিমধ্যে সাক্ষাৎ হইবাতে ঐ ইয়ার আঙুডিজীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কও ইয়ার, কোথায় গিয়াছিলে, তোমার চেহারা শুকনা এবং ভাবনাগ যুক্ত কেন দেখিতে পাই? আঙুডিজী কহিলেন, ইয়ার, আমারদিগের সর্ব্বনাশ হইয়াছে কারণ নব বিবিকে অমুক ডাকওয়ালা কোথায় লইয়া গিয়াছে তাহার ঠিকানা পাই না। ইয়ার ইহা শুনিবামাত্র কহিলেক, শেয়ালদহে আমি দালালি করিতে গিয়াছিলাম সেস্থানে শুনিলাম যে কোন এক ব্যক্তি এক সুন্দরী যুবতী লইয়া বাগানে রাখিয়াছে, অতএব যদ্যপি তিনি তোমারদিগের নব বিবি হয়েন তবে সেই স্থানে যাইলে এইক্ষণে তাহার অনুসন্ধান পাইতে পারিবে। এইমাত্র সমাচার পাইয়া বিবির মাতা হর্ষচিত্ত হইয়া আডিজীকে সঙ্গে লইয়া শেয়ালদহে উপস্থিত হইয়া অনেক দুই জন মালিলোককে জিজ্ঞাসা করিবাতে সন্ধান পাইয়া যে বাগানে নব বিবি ডাকওয়ালার সহিত বিরাজ করিতেছেন সেই স্থানে উপনীত হইলেন। নব বিবিকে দেখিয়া স্বয়ং মায়াবী হইয়া মায়াক্রন্দন করিতে২ কহিতে লাগিলেন, ও আমার সোণাবিবি তোমার অদর্শনে প্রাণ থাকিতেও মরিতে বসিয়াছি, এ দুই দিবসে তোমাকে না দেখিয়া আহারনিদ্রা রহিত হইয়াছে এবং কি পর্যন্ত ব্যামোহ পাইতেছি তাহা আমার একমুখে কহিতে পারি না। তুমি যে অবধি বাটা হইতে বাহির হইয়াছ আমি জলস্পর্শ করি নাই। তোমাকে দেখিয়া এখন আমার ধড়ে প্রাণ আইল, ও আমার বাছাধন এ কি কোথাকার কে তাহার নিমিত্তে এককালে আমারদিগের সকলকে পরিত্যাগ করিলে? এ তোমার উচিত নহে, ইহাতে লোক তোমার বিরাগ করিবেক। তুমি সুবুদ্ধি মেয়ে এবং আমার সর্ব্বস্বধন, অতএব বাছা ঘরে চল। এই সকল কথা নব বিবিকে বিষতুল্য বোধ হইল যেহেতু তিনি ডাকওয়ালার প্রেমে এ প্রকার মোহিতা হইয়াছেন যে তাহারি বাক্য ব্যতিরেকে অন্যের বাক্য তাঁহার মনে ঐক্য হয় না। অতএব নব বিবি এই সকল স্নেহের কথায় তুষ্ট না হইয়া রুষ্ট হইলেন এবং কহিলেন, ভাল২ আমি সকলি জানি, আর তোমার মায়াকান্না কান্দিতে হবে না, তুমি যত ভালবাস তাহা আমার অগোচর কি, কারণ তুমি আপনি শিক্ষা দিয়াছ যে বেশ্যারদের মায়া দয়া সকলি মিথ্যা কেবল বিষয়েরি আশয় এবং সেই নিমিত্তেই প্রণয়; অতএব তুমি আমাকে না দেখিয়া আহারনিদ্রা ত্যাগ করিয়াছ একথা আমাকে কেন কহিয়া জানাও। বেদেয় চেনে সাপের হাঁচি বাছা একি দাইয়ের কাছে কোক ছাপি। তবে তুমি যদি একান্তই কিছু না খাইয়া থাক তাহাতে আমার কি ক্ষতি, আমি তোমাকে খাইতে বারণ করি নাই। যাও২ আমি তোমার নিকটে আর কখন যাইব না। বিবির মাতা ঐ সকল নিষ্ঠুর কথা শুনিয়া মর্ম্মের ব্যথায় ব্যথিত হইয়া আড়ডিজীর হাত ধরিয়া ক্রন্দন করিতে২ আপন ভবনে প্রত্যাগমন করিলেন। তথায় দিনেক দুই দিন অতি দুঃখেই কাল হরণ করিলেন, অবশেষে কিঞ্চিৎ সুস্থা হইয়া আজ-ডিজী সম্বোধনে মনোদুঃখে প্রকাশ করিতেছেন।।

অথ বিবির মাতার বিলাপ।

একি দেখি কলি ঘোর, কেবা সাধু কেবা চোর, চিনিতে হইল বড় দায়রে। তনয়া ভাবিয়া যারে, স্নেহ করি বারে বারে, সেই পর ফাঁকি দেয় মায়রে। যে হয় আমার শোক, শুনিলে হাসিবে লোক, প্রকাশ করিতে প্রাণ যায় রে। মন্ত্রণা হইল নষ্ট, সুখেতে ঘটিল কষ্ট, আহা মরি হায় হায় রে। ১।

শিখাইনু যত পড়া, আমার কপাল পোড়া, কি ফল ফলিল সে পড়ায় রে। দক্ষিণান্ত এই শেষ, ধন প্রাণ অবশেষ, গুরুত্ব করিয়া ভাল দায় রে। লালন পালন যত, করিলাম বিধিমত, সে সকল ভস্মে ঘৃত প্রায় রে। আহা মরি হতবিধি, দিয়া কিরে নিল নিধি, একি দুঃখ হায় হায় হায় রে। ২।

অনেক ওস্তাদ দিয়া, গুণগান শিখাইয়া, কি হইল সে সব বিদ্যায় রে। ওস্তাদি আমার সঙ্গে, করিয়া পরম রঙ্গে, নষ্ট সঙ্গে সে গেল কোথায় রে। পক্ষিগণ যত দিন, থাকে তারা পক্ষহীন, তত দিন জুলজুল চায় রে। পালখ উঠিলে পরে, কার সাধ্য তারে ধরে, উড়ে যায় হায় হায় হায় রে ॥৩॥

পয়ঃপানে পরিতুষ্ট, যদি হয় সর্প দুষ্ট, তবু তার বিষ কোথা যায় রে। তেমতি যে নহে শিষ্ট, যদি হয় উপদৃষ্ট, (আমার চুরি করে) পেটের ছুরিতে পেট যায় রে। এ দুঃখ কহিব কারে, কে দুঃখ ঘুচাতে পারে, মরি মরি হায় হায় রে । ৪।

বফিয়া আপন প্রাণ, বাড়াইব তার মান, খাওয়াইব যেই দ্রব্য চায় রে। মনে২ ছিল আশ, থাকিয়া আমার বাস, বৃদ্ধকালে পুষিবে আমায় রে। সে আশা হইল দূর, দেখি সেই বাণী দূর, দূর দূর বলে একি দায় রে। আমি যত সাধি তারে, আমারে দেখিতে নারে, কি হইল হায়২ হায় রে।।

সোণেতে ফলিবে সোণা, সেই লোভে লুব্ধমনা, কৃষিজনা সবে সুখী হয় রে। কুসুমে বাড়িল ভ্রম, নিত্য নিত্য করে শ্রম, অবশেষে ফল ঝনঝনায় রে।। তেমতি নব বিবির, কুসুমে হইল স্থির, ফলে বুঝি ফলাবে সোণায় রে। এখন কি দেখি রীত, সর্ব্বমতে বিপরীত, একি দুঃখ হায় হায় হায় রে।

অথ ডাকওয়ালার সহিত নব বিবির সুখসম্ভোগ ও বিয়োগ ॥

এখানে বিবির মাতা এই দশায় পড়িলেন সেখানে বিবি ডাক-ওয়ালার সহিত রসতরঙ্গে অঙ্গ ঢালিয়া অনঙ্গের যাগ করিতে লাগিলেন দিবারাত্রি নেশায় অর্থাৎ মাদক দ্রব্যেতে মত্ত থাকেন; কখন শুষ্ক পথে কখন বা জলপথে চলেন এ মতে গাঞ্জা গুলী চরস গ্রাফস এবং মদিরার মেদেরা অবধি ব্রান্ডি পর্যন্ত বিবির এ প্রকারে বোতলে চৌপলে সর্ব্বদাই কৰ্ম্ম চলে। কাহার সাধ্য কথাটি বলে! ফলিতার্থ অন্য মজা কিছুই নাই কেবল মদ্যতেই সদ্য সুখ বুঝিয়া সেই সুখে অচেতন হইয়া থাকেন এবং তাহারি আনুষঙ্গিক আহার মাত্র। এ মতে তান মান গান করত প্রণয়ের মান রক্ষা করিলেন। ইহাতে নব বিবির সঞ্চিত ধন যাহা প্রাণপণ করিয়া নববাবু বেচারার গলায় ছুরি দিয়া লইয়াছিলেন তাহা ক্রমে২ সমস্তই বিনাশ হইল। তৎপরে নিজ গাত্রের অলঙ্কার যৎকিঞ্চিৎ যাহা ছিল তাহার দুই একখানা বিক্রমপুরে চলিতে আরম্ভ হইল। যখন সমস্ত গেল তখন ঘটি বাটি এবং অন্যান্য জিনিসপত্র বিক্রয় করিয়া খরচপত্র অতি সামান্যরূপে করিতে লাগিলেন যেহেতু হাতে টাকা নাই। পূর্ব্বে যাহা খরচ হইত পরে তাহার অর্দ্ধেকাপেক্ষা কম হইল। পূর্ব্বে উত্তম বেলাতী ব্রান্ডি আসিত আর ছাগমাংসের নানাবিধ ব্যঞ্জনাদি পাক হইত প্রত্যহ পোলাও কালিয়া কোরমা কোফতা দোপেয়াজা কাবাব সিরবেরঞ্জ ফিরি জরদা আর উত্তম পাঁউরুটি ইত্যাদি হিন্দুস্থানী আহার মদ্য সকল আর বাঙ্গালা ভক্ষণীয় দ্রব্য হব্য কব্য নব্য নব্য প্রস্তুত হইত ইদানীং যেদিন গহনাগাঁটি আর জিনিসপত্র বিক্রয় হইল তখন বেলাতী ব্রাত্তির পরিবর্তে কেবল ধেনো মদেই নির্ভর করিলেন, আর পূর্ব্বে আট পয়সা ছটাক মোহিনী গাঞ্জা আসিত তাহার পরিবর্তে চার পয়সা ছটাক বালচরে পাতি ভরা গাঞ্জা আসিতে লাগিল। আহারের বিষয়ে কালিয়া কাবাব পরিবর্তে দালি ভাতে উদর পরিপূর্ণ করিয়া প্রাণরক্ষা করেন। পরিধান তথৈবচ। আহারের আর পরিধানের বন্দোবস্ত রেস্ত অভাবে সমস্ত কমাইলেন; কিন্তু তাহা অর্থ ব্যতিরেকে হইতে পারে না, সুতরাং ক্রমে২ বন্দোবস্ত চলা ভার হইল; যেহেতু তাহার-দিগের অর্থের আর কোন মতেই আয় নাই ব্যয় তো আছে অতএব আয় ব্যতিরেকে ব্যয় করিলে কুবেরের সমান ধন থাকিলে ক্রমে নির্ধন হয়। তাহাতে নব বিবি সামান্য বেশ্যা ইহার ক্ষমতা কি; কিন্তু তথাপি আড়ে নাহি ফাঁড়ে আছে, কারণ ডাকওয়ালার মুখ দেখিলে সুখে আনন্দে আটখানা হয়েন সুতরাং অন্যের সহিত আলাপনে বিরত হয় বিষয়ান্তরের বিষয় কি। ডাকওয়ালা প্রাতে গাত্রোত্থান করিয়া প্রিয়তমাকে কহেন যে কিছু মালটাল আনাতে পার কিনা। নব বিবির স্বভাব ডাকওয়ালার ভাবে সমভাব প্রাপ্ত তাহাতে ডাকওয়ালার এরূপ কথা শুনিবামাত্র তৎক্ষণাৎ কিঞ্চিৎ তাম্রখণ্ড অর্থাৎ পয়সা প্রদান করেন। ডাকওয়ালা তাহা অম্লান মুখে আপন হস্তে লইয়া পসন্দ মত দেশীয় মদ্য অর্থাৎ ধেনো মদ এবং ভাজাও কিছু ক্রয় করিয়া এবং দুই এক পয়সার শাকসবজী লইয়া নব বিবির ভবনে উপনীত হইয়া দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ পূর্ব্বক কহেন, আঃ আর পারি না। বাবা, আমাদের প্রাণে এত তসদী সহে না। নব বিবি এই কথা শ্রবণ মাত্র ব্যস্তসমস্ত হইয়া জল আনিয়া তাহার মুখ প্রক্ষালন করিয়া দিয়া ঐ আনীত মদ্যের দুই এক পেয়ালা তাহাকে পান করিতে দেন এবং ডাকওয়ালা আপন হস্তে মদ্য ঢালিয়া নব বিবিকে পান করিতে দেন। এই প্রকারে পরস্পর মদ্যপান করিতে২ স্নানাদি বিশ্বত হইয়া সে দিবসের দফা রফা করেন। সমস্ত দিন অচেতনে অন্ত হয়। সন্ধ্যার পর চেতন হইলে দালি ভাতে উদর পরিপূর্ণ করিয়া গাঞ্জার মজা লয়েন। এই প্রকারে নব বিবি ডাকওয়ালার সহিত আহারবিহার করত নিত্য২ মজা করেন। কিন্তু অর্থ কিছু নাই, গহনাগাঁটি ও জিনিসপত্র যাহা ছিল তাহাতে এপর্যন্ত চলিল, তাহারও শেষ হইয়া আর চলা ভার হইল, সর্ব্বস্ব ব্যয় করিয়া অতি দীন দুঃখী হইলেন। তখন নব বিবির এইরূপ দুরবস্থা দেখিয়া ডাকওয়ালা মনে২ বিবেচনা করিলেক যে ইহার যৌবনধন ও অর্থসামর্থ্য সমস্ত ব্যর্থ হইয়া এক্ষণে অনর্থ ঘটিল, ইহার পরে বিপদ হইবেক। এই বিবেচনায় ডাকওয়ালা নব বিবিকে কহিতেছেন যে শুন বিবি, আমরা ডাকওয়ালার জাতি, সুখের পায়রা, দুঃখের কেহ নহি; এক্ষণে তোমার নিজের আহার চলাই ভার হইয়াছে, আমাকে কি খাওয়াইবা। অতএব আমি এক্ষণে স্বস্থানে প্রস্থান করি, তুমি আপন উপায় চিন্তা করহ। এই কথা শুনিয়া নব বিবি আকাশ ভাবিয়া কহিলেন, শুন ভাই, আমি যেখানে যে প্রকারে পাইব তোমাকে খাওয়াইব, তোমার কোন চিন্তা করিতে হইবেক না এবং কোন দায়েও ঠেকিতে হইবেক না, তুমি স্বচ্ছন্দে বসিয়া থাক। এ কথায় ডাকওয়ালা নীরব হইয়া রহিল কিন্তু মনে২ বিবেচনা করিল যে এক্ষণে বিবি কতক চেষ্টা করুন তথাপি পূর্ব্বের মত কদাচই হইবেক না এবং এক্ষণে বৃদ্ধা হইয়াছেন তবে ইহার সহিত প্রীতি রাখায় সুখ কি। ইহা স্থির করিয়া নব বিবিকে কোন কথা না বলিয়া ডাকওয়ালা স্থানান্তরে প্রস্থান করিল।।

অথ নব বিবির ইতর বৃত্তি।

অনন্তর নব বিবি হৃতসর্ব্বস্ব হইয়া যখন দেখেন যে ডাকওয়ালা তাহাকে না বলিয়া পলায়ন হইল তখন দুঃখসাগরে মগ্ন হইয়া মনে চিন্তা করিলেন যে, এক্ষণে আহার চলিবার আর কোন উপায় নাই, অতএব ছুটা কসব করিয়া তাহাতেই কাল যাপন করিব। এই মত স্থির করিয়া নব বিবি বাদামতলায় এক খাপেরেলের ঘর ভাড়া করিয়া সেই স্থানে বাস করিলেন। নব বিবির যেমন দশা হইয়াছে বাসাও তেমনি স্থানে হইল সুতরাং তখন তাহার নিয়মিত কৰ্ম্ম হইল যে প্রাতে গাত্রোত্থান করিয়া এক ভাঁড় হস্তে লইয়া টাটিতে যান। সে কৰ্ম্ম সমাধান করিয়া হাতের চোটে বুকে পিঠে তৈল মর্দ্দন করিয়া নিকটস্থ কোন পুষ্করিণীতে স্নান করিয়া সেই আর্দ্রবস্ত্রে এক পয়সা লইয়া বাজারে গমন করেন। বাজার দুই এক পয়সায় যে প্রকার হয় তাহা রসিক ও চতুর বাবুগণে বিবেচনা করিবেন, তত্ত্ব ত্তান্ত লিখনে আর কি প্রয়োজন। পরে নব বিবি বাজার হইতে প্রত্যাগমন করিয়া স্বহস্তে পাক করিয়া স্বপাকে অপাক আহার করেন, যেহেতুক দুই পয়সার বাজারে স্তূপাক হইবার বিষয় কি। অনন্তর ভোজনান্তে একবার অশ্বনিদ্রার ন্যায় গড়াগড়ি যান, তাহাতেও যদি দুই প্রহরের ছুটিতে কোন মজুরলোক পান তবে নিদ্রারও ব্যাঘাত হয়। পরে বৈকালে রোজগারের পন্থায়২ দণ্ডায়মান অথবা গৃহদ্বারে থাকিয়া কোটর চক্ষে কটাক্ষ বাণ সন্ধান করেন, তাহাতেও যদি আগন্তুক জনকে বশ করিতে না পারেন তবে পচাল বাচালতা প্রকাশপূর্ব্বক ডাকাডাকি করেন, যথা-ও মানুষটি, কোথায় যাইস তুই যদি হিন্দু হইস তবে গরুর দিব্য আর যদি মুসলমান হইস তবে সুয়ারের দিব্য লাগে একবার ফিরে আয়। এই প্রকার ব্যবহার করিয়া রাস্তার লোকজনকে ডাকাডাকি করেন। তাহারা ছোটলোক, সেই সাবকাশে নব বিবির দিব্য দেওয়াতে একবার থমকিয়া দাঁড়ায়। বিবি তাহার হাত ধরিয়া নিজের মন্দিরে লইয়া গিয়া চাল কাষ্ঠ প্রভৃতি যাহা মেলে তাহাই গ্রহণ করিয়া সন্তুষ্টা হইয়া প্রেমালাপ করেন এবং তদ্বারা কথঞ্চিৎ রূপে দিনপাত মাত্র হয়। এইরূপে কিয়ৎকাল পর্যন্ত হইল তখন বেলেঘাটার গরাণহাটার বেঁসোহাটার মুটে প্রায় কেহ বাকি নাই। আর লোকজন যোটে না সুতরাং ছুট। কসবও আর চলে না। বড়ই বিপদ হইল তখন নব বিবি আকাশ ভাবিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কি করিবেন তাহাই চিন্তা করিতে লাগিলেন ।।

অথ নব বিবির দাস্যবৃত্তি।

নব বিবি কিছু কাল ছুটা কসব করিয়া নগরস্থ এবং নগরপ্রান্তর-বাসী মুটে মজুর যে যেখানে ছিল সকলেরই সহিত প্রেমালাপ করিলেন, তাহাতে কাহারো খেদ রহিল না। যে ব্যক্তি একবার যে সুখভোগ করিয়াছে সে পুনরায় তাহার আকাঙ্ক্ষা করে না, যেহেতু অতিপ্রাচীনা গতযৌবনা ললিতমাংসা গলিতদশনা মলিনবসনা হইয়াছে সুতরাং তাঁহার আহ্বানে ভয় পাইয়া যে ব্যক্তি হিন্দু হয়, সে রাম২ কহত প্রস্থান করে ও যদি মুছলমান হয় তবে তোবা বলিয়া পলায়নপরায়ণা হয়। অতএব মুটের ছুট দেখিয়া কাজেকাজেই ছুটো কসবও ছুটিল। এক্ষণে আর কোন উপায় না থাকায় কাহারো বাটীতে দাসিত্ব করিয়া কালযাপন করিবেন ইহাই স্থির করিলেন। কিন্তু কোন ভদ্রলোকের বাটীতে তাঁহাকে রাখিবেক না, কারণ বেশ্যা ভদ্রলোকের পূষ্যা নহে, অতএব জনেক বেশ্যার দাসিত্ব করিতে হইল। এই মনস্থ করিয়া নব বিবি মিত্রের চৌতালায় এক বিবি বসতি করেন তাঁহার নিকট উপস্থিত হইলেন। এ বিবির অবস্থা নব বিবির পূর্ব্বাচার ন্যায় অর্থাৎ গান বাজনা শিক্ষা করেন এবং বাবুগণেও অনেকে তাঁহার সমাদর করিয়া থাকেন। যেরূপ নব বিবি পূর্ব্বে আদরণীয়। ছিলেন এ বিবিও এক্ষণে সেইরূপ সকলি। শেষ দশায় সকলেরই এক দশা। সে যাহা হউক নব বিবি ঐ বেশ্যার নিকট উপস্থিত হইয়া কহিলেন, ওগো, আমাকে তোমরা দাসী রাখিবা। ঐ বেশ্যা নব বিবির আলাপিত বটেন কিন্তু নব বিবির শ্রীছাদ যে প্রকার হইয়াছে তৎপ্রযুক্ত তাহাকে চিনিতে না পারিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ওলো, নাম কি, ঘর কোথায়? নববিবি আপন নাম কহিবাতে সে বেশ্যা নাকে হাত দিয়া কহিলেক, ও দশা, তোমার এমন দুঃখ হইয়াছে যে এক্ষণে চাকরাণীগিরি করিতে আসিয়াছ? নব বিবি কহিলেন, কি করি, পেট তো চলা চাই, আমার আর কোন উপায় নাই। এ কথা শুনিয়া সেই বেশ্যা নব বিবিকে দাসী করিয়া রাখিলেন। নব বিবি বেশ্যার দাসিত্ব কর্ম্মে নিযুক্ত হইয়া উপযুক্ত মতে কৰ্ম্ম করিয়া সেই বেশ্যাকে সন্তুষ্টা করিলেন, তাহার কারণ এই যে বেশ্যার বাটীতে দাসীকে যে২ সকল কৰ্ম্ম করিতে হয় তাহা নব বিবি সবিশেষ জ্ঞাত ছিলেন, যেহেতু পূর্ব্বে তিনি স্বয়ং দাসী চাকর রাখিয়া তাহারদিগের দ্বারা যে প্রকার কর্ম লইয়াছিলেন তদনুযায়িক স্মরণ করিয়া হাটবাজার করা ও ঘর বাটী ঝাঁটি দেওয়া এবং হুঁকা বৈঠক মাজা ও পানদান এবং পিকদান সাফ করা এবং অনবরত জল যোগান ইত্যাদি কৰ্ম্ম করিতে লাগিলেন। কিন্তু মনে২ যথেষ্ট ধিক্কার জন্মিল, যেহেতু তিনি নিজে যৎকালীন নবযৌবনা ছিলেন কত২ দাস দাসী রাখিয়াছিলেন এক্ষণে আপনাকে দাসিত্ব করিতে হইল। সে যাহা হউক, কিন্তু এরূপ দুর্দ্দশাতেও আপন সুখের আয়াস ও লালসা পরিত্যাগ করিতে পারেন, না অর্থাৎ কখন২ স্থানান্তরেও গমন করিয়া পিত্তরক্ষা করিতে যান, সুতরাং তাঁহার মনিব তাঁহাকে উপস্থিত না পাইয়া এবং সর্ব্বদা গর-হাজির দেখিয়া উন্মান্বিতা হয়েন, যেহেতু দাতার অর্থ প্রদান কেবল সাধ্যসাধনের নিমিত্ত কিন্তু এ দাসী তাহা মানে না যেহেতু এত দুঃখেও কিঞ্চিৎ সুখ না করিলে প্রাণ বাঁচে না অর্থাৎ নব বিবি এ দুঃখ-সাগরে থাকিয়া এবং দিনান্তে একবার মুটে মজুর লইয়া আমোদ করেন কিন্তু মনিব তাহা বোঝে না। বেতন দিয়া এ প্রকার গরহাজির কি অনুরোধে সহিষ্ণুতা করিবেক, অতএব এক দিবস কোন কথান্তর হওয়াতে নব বিবিকে বিদায় করিয়া দিলেন। নব বিবি সে স্থান হইতে নিজ বীৰ্য্য প্রকাশ করিয়া স্থানান্তর প্রস্থান করিলেন কিন্তু আহার চলা ভার। তন্নিমিত্তে অন্যত্রও চেষ্টা করিয়া ঐরূপ দাসিত্ব কৰ্ম্মে নিযুক্ত হইলেন। ফলে যেখানে যান সেইখানে প্রিয়জনের প্রয়োজন এই দোয়ে তাঁহাকে কেহ দাসী রাখিতে স্বীকার করে না। নব বিবি তখন বিবেচনা করিলেন যে আমাকে যদ্যপি কেহ দাসিত্ব কৰ্ম্মে নিযুক্ত না করে তবে কালযাপনের নিমিত্ত চেষ্টান্তর পাইতে হইল।।

অথ নব বিবির যোটকতা ব্যবসায়।

যখন নব বিবি দাসিত্ব কৰ্ম্মে সম্যক্ প্রকারে অপারক হইলেন তখন ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিয়া যোটকতা ব্যবসায় অর্থাৎ কুটনীপনায় প্রবর্তা হইলেন। তাঁহার নিজ যৌবনাবস্থায় যে সকল বাবুগণে প্রেমাধীন হইয়া তাহার নিকটে গমনাগমন করিতেন নব বিবি সেই আলাপিত প্রদীপ তাতে নির্ব্বাণ যে হৈল। কুলভয় কুললজ্জা সকল ত্যজিয়া। হইয়াছি কুলটা কুলে জলাঞ্জলি দিয়া। পরে এক বয়স্থার আশ্রয়ে আসিয়া। রহিলাম সমাদরে তারে মা বলিয়া। বয়স্থা করিয়া আস্থা আমারে রাখিল। অবশেষে পোলিসে যে নাম যে লেখাল। প্রকাশিত হৈয়া বেশ্যা বহু পরিশ্রমে। নৃত্য গীত শিক্ষালেক সব ক্রমে ক্রমে।। তাহাতে আসক্ত হৈল এক নব বাবু। প্রেমেতে আমার পড়ে সে হইল কাবু। আমি ছিনু অন্য এক লম্পটে মোহিত। সেহেতু না বুঝিতাম নিজ হিতাহিত। প্রিয়জ্ঞানে শুনিলাম তাহার মন্ত্রণা। পাইলাম নানামতে শেষেতে যন্ত্রণা। সেই প্রেমে সর্ব্বনাশ হইল আমার। কোথায় ভাতার হায় না পাই ভাত আর। এখন উচ্ছিষ্ট আমি মিষ্ট বোধ করি। তাহাতেই কোনরূপে দুখে কাল হরি। পড়িনু বিষম ফেরে একি মহা দায়। অন্ন বিনে ছন্নবেশ মরি হায়২ খুঁজিয়া বেড়াই মাত্র বৈষ্ণবের পাত। যে ছিল মনের আশা গেল অধঃপাত। পরিয়াছি এইমাত্র আছে পরিধান। অদ্বিতীয় পুরাতন ব্রহ্মের সমান। যদি বল ব্রহ্মের নাহিক দশ দশা। ইহাতে এ দেখ ছিন্ন হইয়াছে দশা। যদি বল ঈশ্বরের আদ্য অন্ত নাই। মুড়াচেরা বস্ত্র পরা ইহাতেও ভাই। অস্থি চৰ্ম্ম সার দেখ গাত্রে উড়ে খড়ি। সে কাল নাহিক আর হইয়াছে বুড়ি। যৌবনেতে সমাদর করেছে যে জন। ততোধিক অনাদর সে করে এখন। নিকটে কাহার গেলে কথা নাহি কয়। মনে করে একে কিছু পাছে দিতে হয়। আলাপী কাহাকে যদি পথে দেখা পাই। মনে করি এর ঠাঁই কোন কিছু চাই। চাহিতে না চাহিতে সে বলে কিছু নাই। অপ্রতুল রোজগার কি করিব ভাই।। মনে২ দুঃখ পেয়ে মৌন হয়ে থাকি। ফলেতে জানিতে পারি সে যে দেয় ফাঁকি। আপনার কর্মদোষে এই দুঃখভোগ। কি করি আপনি ডেকে আনিয়াছি রোগ। একুল ওকুল আমি খেয়েছি দুকুল। অকুল পাথারে পড়ে হয়েছি ব্যাকুল। ভিক্ষাবই আর মোর নাহিক উপায়। তাহে পর্যটন করি বুঝি প্রাণ যায়। অধর্ম্মে যদ্যপি লাভ লক্ষ লক্ষ হয়। ধাম্মিকের ধৰ্ম্ম সহ তবু তুল্য নয়। স্বধৰ্ম্মে থাকিয়া যদি দিনান্তে আহার। তথাপি উচিত নয় অধৰ্ম্ম আচার। বলিয়া না হয় শেষ বলিব তথাচ। কেহ যেন নাহি হয় কুলটা কদাচ। সকল গৃহস্থক্যা জানিবে নিশ্চয়। সুখভোগ ইহাতে কখন নাহি হয়। দুঃখ নহে কেবল অধিক অপমান। প্রাণ যায় তবু ভাল রয় যেন মান। প্রথমে ছিলাম আমি গৃহস্থ আশ্রমে। করিলাম এ কৰ্ম্ম কেবল মাত্র ভ্রমে। তার পর কসব করিয়া কিছুদিন। হইলাম যখন সকল অর্থহীন ॥ অবশেষে দাসিত্ব বৃত্তি করিলাম সার। তাহাতে চলিত মাত্র পেটের সর্ব্বশেষে সর্ব্বনাশে নষ্ট হয়ে কষ্ট এত কুলধৰ্ম্ম রক্ষা কর আহার। অতঃপর ছাড়ি দাস্য হইনু কুটনী। লইমু টুক্‌ক্সী। এক জন্মে চারি জন্ম হইল আমার। পাই বার২। অতএব পুনঃ২ করি নিবেদন কুলনারীজন ।।*।।

অগ্রে বেশ্যা পরে দাসী মধ্যে ভবতি কুট্টনী। সর্ব্বশেষে সর্ব্বনাশে সারম্ভবতি টুক্বনী ।।

ইতি নব বিবি বিলাস সমাপ্তঃ ।